বহুযুগ পরে ট্যারান্টিনোর কিল-বিল দেখছি, একটি দৃশ্যে জাপানী সন্নিসী উমা-দিদিমুনিকে তরোয়াল দিয়ে বললেন, 'If on your journey, you should encounter God, God will be cut' -  মনে হলো আমাদের পাড়াকাকুর মাঞ্জা তো আর দেখো নি, নিশ্চয়ই ট্যারান্টিনোর ঘুড়িও কেটে দিতো।
 
সব গল্পেই একটা খিঁচুটে ভিলেন থাকে, আমাদের ঘুড়ির গল্পে ছিলেন পাড়ার এক দাদু,  নাম ধরা যাক সদার বাবা গদা, নিয়মিত খেলা ভন্ডুল করে দেওয়ায় পাড়ায় তাঁর আদরের নাম ছিলো বাল ঠাকরে। তিনি বাচ্চাকাচ্চাদের ছাদে দেখলেই পরিত্রাহি চিৎকার করতেন আর অমনি আদেশ হতো সুড়সুড় করে নেমে আসার। এতেও ছাদময় ঘুড়ির দৌরাত্ম্য না কমায় তিনি একবার পাড়াশুদ্ধু গার্জেনদের সভা ডেকে বানিয়ে বানিয়ে ভয়ানক গল্প বলতে লাগলেন, কাকে দেখা গেছে কার্নিশ বেয়ে হাঁটতে, কে লগা নিয়ে হাইওয়েতে স্পিড লিমিট ক্রস করে দৌড়চ্ছিলো ইত্যাদি। অল্পেতেই কাজ হলো, অবিলম্বে ব্যান হলো আমাদের ছাদে যাওয়া। মনে আছে সেদিন সেই মিটিং থেকে বেরিয়ে দেখি অধোবদন সদাকাকু গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে, আমাদের দেখে বললেন, বাবার এই কাঠি করার হ্যাবিট-টা না আর গেলো না ...
 
অবিশ্যি সত্যি বলতে গেলেও আমার যে কিছু উন্নতি হতো এমন নয়, মাঞ্জা-টাঞ্জা দেওয়া তো দূর, ঘুড়িও যে খুব একা-একাই দারুণ ওড়াতে পারতাম এমন দাবী করলে পাড়ার বন্ধুরা এসে চাঁটি মারবে। তবে গ্যলারি যদি খ্যালার-ই অঙ্গ হয়, তাহলে আমিও একটা প্রত্যঙ্গ তো বটেই। মিলেনিয়াল-রা জানে কিনা জানিনা, তবে ঘুড়ি যখন ওড়াতে হয়, ছাদ থাকলে ছাদ থেকে সুতো ধরে তলায় ঝুলিয়ে প্রবল একটা হ্যাঁচকা-টর্ক। না থাকলে খোলা মাঠে এক অভাগা এক যোজন দূরে দুহাত তুলে ঘুড়ি ধরে দাঁড়াবেন আর পেশাদার উড়িয়ের কাজ মওকা বুঝে হ্যাঁচকা-টান ... 
ছেলেবেলার সেই খেলার মাঠের সেপিয়া ছবিতে সব্বাই পেশাদার, যে একটি ছেলে এপ্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ছুটে ছুটে সবার ঘুড়ি প্রাণপণে উপরে ঠেলছে সেই ক্যাবলা ছানাটিই আমি। 
 
যৌবনের শুরুতে এক বান্ধবীকে প্রাণপণ ইম্প্রেস করতে চেয়ে বলেছিলাম, 'না ওড়াতে জানিনা, কিন্তু ঘুড়ি কেন ওড়ে সেই মেকানিক্স টা জানি', ফিজিক্স-এ (ও প্রেমে) যে আমার ফুটুরটি নেহাত-ই ডুম, সেই সন্ধ্যেয় প্রথম বুঝি ...
 
 
আর বুঝি, গল্প কেন সত্যি হয় না ... বললাম না, নেহাত-ই নিষ্পাপ এবং ক্যাবলা ছেলেবেলা ছিলো আমার - যা পড়তাম সব ভাবতাম সত্যি ! সেবার পুজোবার্ষিকীতে শীর্ষেন্দুর একটা গল্প পড়লামঃ একজন লোক, যাঁর জীবনে ভারি কষ্ট - তিনি রোজ ঘুড়ি ওড়ান আর রোজ একটা করে আজগুবি আদেশ পেতে থাকেন ঘুড়ির গায়ে লেখা, কোনোদিন বলে বসের মাথায় ঘোল ঢালতে, কোনোদিন বলে ঝাঁপ মারতে তিনতলা থেকে।  ও মা, গল্পের শেষে দেখা যাবে, যা যা করেছেন সবেতেই খুব উপকার হয়েছে তাঁর - বসের টাকে চুল, মাজার ব্যথা গন এবং লাইফ ঝিঙ্গালালা। তো আমার খুব ফ্যান্টাসি হতো, একদিন নিশ্চয়ই মাঠে নেমে আসা শেষ ঘুড়িটা যখন কুড়িয়ে পাবো, আকাশের কোনো এক বন্ধু কিছু পাঠাবে লিখে? হয়তো বলে দেবে কি করলে আর টিফিনে জলের বোতল চুরি হবে না, বা বন্ধুরা আর খ্যাপাবে না ... কিন্তু নাঃ, সে ঘুড়ি আর আসে না! তারপর একদিন ভেবে দেখলাম, ইনকামিং যখন নেই, আউটগোয়িং-ই সই। 
 পাড়াকাকুকে বলে বিশাল দো-ত্তে ঘুড়ির ওপর স্কেচপেনে লিখে রাখতাম মহার্ঘ সব সদুপদেশ, কোনোটা গভীর জীবন-দর্শন, কোনও কোনোটা আবার নিতান্তই ছাপোষা, যেমন "এক মাস নখ কাটবেন না", কিংবা "আজ চান করার সময় একটু শ্যাম্পু খেয়ে দেখুন" ইত্যাদি ...
 
"বোম-মারা" বলে বিকট আওয়াজ হতো কাটা পড়ার সময়, আর বহুদূরে ঘুড়িগুলো হারিয়ে যাওয়ার সময় চেয়ে চেয়ে দেখতাম কোথায় পড়ছে ...
 
আজ বাড়ি ফেরার সময় একবার আকাশের দিকে তাকালাম, নাঃ, তাদের একটাও অতলান্তিক ক্রস করেনি দেখছি ... 
  • বিভাগ : ব্লগ | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৫৬৭ বার পঠিত | রেটিং ৪.৭ (৩ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


    গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
    মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


    পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন