• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ছাদ

    Nirmalya Nag লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ৩১ জুলাই ২০২১ | ৬৩৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৩ জন)
  • ছাদে এখন আর তেমন যাওয়া হয় না। প্যানডেমিকের কাল, ওয়ার্ক ফ্রম হোম চলছে, বিকেল চারটেয় কাজে বসা, চলে অনেক রাত অবধি। অনেক সময়ে দেড়টা-দুটোও বেজে যায়। কখনও সখনও তাড়াতাড়ি কাজ শেষ হলেও ঘুম আসতে চায় না, দেরি করে শোওয়া অভ্যাস হয়ে গেছে। ফলে ঘুম থেকে উঠতে দেরি, তারপর টুকটাক গৃহস্থালীর কাজকর্ম এবং পুনরায় কম্পিউটারের সামনে বসে পড়া। চোখ আটকে থাকে ১০ ফুট বাই ১০ ফুট ঘরের দেওয়ালের গায়ে। এর মাঝে দৃষ্টি প্রসারিত করার জন্য ছাদ নামক খোলা জায়গায় বিকেল বা সন্ধ্যায় যাওয়ার সময় কোথায়? দুধের বদলে পিটুলি গোলার (বা তার চেয়েও খারাপ কিছুর) মত এক চিলতে বারান্দাই কেবল ভরসা।

    অফ-এর দিনগুলোয় বিকেলের দিকে মাঝে সাঝে অবশ্য যাওয়া হয়। ফ্ল্যাট বাড়ির পাঁচ তলার ছাদ থেকে দেখা যায় জুলাইয়ের আকাশের রঙ বদল হচ্ছে। উজ্জ্বল নীল বা সূর্যাস্তের কমলা থেকে ধীরে ধীরে ধূসর বর্ণের হয়ে ক্লান্ত কালো রঙের আড়ালে চলে যায় আকাশ।

    আজও তেমন একটা দিন।

    ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি চলছে সকাল থেকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় গিয়ে সদ্য বৃষ্টির ফলে মাটি থেকে ওঠা সোঁদা গন্ধ পেয়েছি। তারপর বৃষ্টি কখনও বাড়ছে, কখনও কমছে, আবার কখনও বা থামছে। এমনই এক থামার পর যাওয়া গেল ছাদে। শেষ বিকেল। হাওয়া দিচ্ছে না যদিও, তবু গরমও লাগছে না। আকাশের পুব দিকটা কালচে আর পশ্চিম দিকটা ঝলমলে, যদিও সুয্যিমামার দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি চলে গেছেন দূরের ওই সব চেয়ে উঁচু বাড়িটার আড়ালে। তার পিছন থেকে আসা উজ্জ্বল হলুদ আলোয় বাড়িটা সিল্যুট হয়ে গেছে। একটা মাঝারি আকারের কালো লম্বাটে মেঘ যেন বাড়িটার ডান দিক থেকে বাঁ দিক একটা ছাতা ধরে আছে। জেট প্লেনের ধোঁয়ার মত একটা ঋজু দীর্ঘ সাদা দাগ সেই মেঘটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেছে। আর কিছু ছোট ছোট সাদা মেঘ ইতিউতি ভেসে বেড়াচ্ছে। আর তারই মাঝ দিয়ে তীরের ফলার মত আকার নিয়ে পাখির দল বাসায় ফিরছে। কেন জানি না এ দৃশ্য যেন কখনো পুরনো মনে হয় না। কে যেন বলেছিল পাখিরা নাকি ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স মেনে ওড়ে। ওড়ে হয়তো, তবে অঙ্কের কচকচি দিয়ে এমন চিরকালীন অথচ চিরমধুর দৃশ্যের ব্যাখ্যা করার কোনও মানে হয় না।

    প্রতিবেশী ফ্ল্যাটবাড়ি গুলোর ছাদে হাঁটাহাঁটি করছে বড়রা, পাশের একটা তুলনায় নিচু বাড়ির ছাদে ছুটোছুটি করে খেলে বেড়াচ্ছে তিনটে বাচ্চা, রান্নাঘরের চালে বসে থাকা সেই কোন যুগের তিনটে শালিকের মত তারা মাঝে মধ্যে ঝগড়াও করছে। দেখে ভাল লাগল তাদের মায়েরা এর মধ্যে নাক গলালেন না।

    টের পাচ্ছি আলো কমে আসছে। ছাদের অন্য পাশে যেতে গিয়ে চোখে পড়ল জামাকাপড় মেলার খালি দড়িগুলো। সরু, মোটা, প্লাস্টিক, নাইনল, জি-আই তার নানারকম। আর তাদের মধ্যে মিল একটাই। প্রতিটা তারের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত পর্যন্ত জুড়ে রয়েছে ঝুলতে থাকা সারি সারি ছোট বড় জলের ফোঁটা। বৃষ্টি থেমে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে, তবে হাওয়া দিচ্ছে না বলে এখনও ফোঁটাগুলো আটকে আছে, মনে হল আমার জন্যই আটকে আছে। একটা ফোঁটায় আঙুল ছোঁয়াতে গিয়ে হাত লেগে গেল তারে, জলের বিন্দুরা ভিজে ছাদের ওপর টুপটুপ করে ঝরে পড়ল।

    সরে গেলাম ওখান থেকে। দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে দেখি ইরিগেশন ডিপার্টমেণ্টের কমপাউণ্ডের মধ্যে হলুদ রঙের বাড়ি গুলোর সবুজ জানলা বন্ধ। একটা পুকুর আছে ওখানে, ছাদ থেকে দেখা যায় না। যেটা যায় তা হল একটা ফাঁকা জায়গার পুরোটা জুড়ে ছোট ছোট সবুজ ঝোপঝাড় আর তাদের মাঝে অল্পস্বল্প হলুদের ছোঁয়া। অত নিচু গাছে স্বর্ণলতা হয় নাকি? কে জানে? অজানা পাখির ডাক ভেসে আসছে ও দিক থেকে, শোনা যাচ্ছে কারও বাড়িতে পুজোর ঘণ্টা বাজছে। পূর্ব দিকে ভিআইপি রোডের ফ্লাই ওভারের ওপর দিয়ে অ্যম্বুলেন্সের তীব্র প্যাঁপ্যাঁ শব্দ চাপা দিয়ে দিল ঘণ্টার আওয়াজ।

    দমদম বিমানবন্দরের দিক থেকে একটা প্লেন এসে বাঁক নিয়ে পশ্চিম দিকে উড়ে গেল। ঘাড়টা পিছন দিকে কাত করে ওপরের দিকে তাকালে আকাশটা যেন বড় হয়ে যায়। ছোটবেলায় সল্টলেকের বাড়িতে থাকার সময়ে লোডশেডিং হলে গরমের সন্ধ্যায় জলের ট্যাংকের ওপর উঠে শুয়ে পড়তাম। অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘হারিয়ে যাওয়া’ কবিতার বামীর মত যেন। অনন্ত আকাশ তারায় তারায় ভরা আর আমি লোডশেডিং-এর অন্ধকারে হারিয়ে গেছি। আর একটা অনুভূতিও হত, যেটা অনেক পরে পাহাড়ে ট্রেক করতে গিয়ে ফের টের পেয়েছিলাম। আমি, আমার অস্তিত্ব এই বিশালের কাছে কত তুচ্ছ!

    প্রায় অন্ধকার হয়ে এল। পাশের বাড়ির ছাদের পাঁচিলের ওপর একটা কাক ডাকছে। নিজের ঘরে ফেরেনি পাখিটা এখনও? যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের হাট কবিতায় নিশা নেমেছিল “শ্রেণীহারা একা ক্লান্ত কাকের পাখে”। এই কাকটাও কি ক্লান্ত? নাহ, এবার ফ্ল্যাটে ফিরতে হবে। অন্যমনস্ক ভাবে এগোতে যাব সিঁড়ির দিকে, হাঁটুর নিচে একটা খোঁচা খেলাম। গোলাপের কাঁটার খোঁচা। এই বিল্ডিং-এরই কেউ টবে লাগিয়েছিল সখ করে, বোধ হয় তার সখ মিটে গেছে, শুকিয়ে আসছিল গাছটা অযত্নে। এখন দেখি প্রায় মরে যাওয়া গোলাপ গাছটা বর্ষার জল পেয়ে ফের তাজা হয়েছে, নতুন পাতা গজিয়েছে। হয়তো ফুলও আসবে শিগগিরই। তখন আবার আসব এই খোলা ছাদে।

     

  • আরও পড়ুন
    হাত - Nirmalya Nag
  • বিভাগ : ব্লগ | ৩১ জুলাই ২০২১ | ৬৩৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৩ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ০৬ আগস্ট ২০২১ ০৬:২৭496486
  • খোলা ছাদে এখনো তীরের ফলার মত আকার নিয়ে পাখির দলকে বাসায় ফিরতে দেখা যায়। সত্যি, এই দৃশ্য পুরনো হওয়ার নয়। 


    আরো লিখুন। শুভ 

  • Nirmalya Nag | ২৪ আগস্ট ২০২১ ১৪:৩২497053
  • ধন্যবাদ বিপ্লব রহমান।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি প্রতিক্রিয়া দিন