• হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • দার্জিলিং ব্লুজ - পর্ব ৬। ১০ই মার্চ, ২০২১

    রৌহিন লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ১১ এপ্রিল ২০২১ | ১৪৭ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • যেতে যেতে যেতে এক নদীর সঙ্গে দেখা
    -----------------------------------------
    পরেরদিন ব্রেকফাস্টের টেবিলে সন্দীপন জানালেন, আজও উনি স্বয়ং আমাদের সারথী। এই কটা দিন ওনার ফাঁকা সময়, তাই নিজেই তুলে নিয়েছেন আমাদের দেখভালের ভার। দশটা নাগাদ বেরোনো গেল। যে রাস্তা দিয়ে কাল এসেছিলাম, সেটা ধরেই আরো ঢালু - নামতে নামতে এসে তিস্তা বাজারে আগের দিনের ছ মাইলে ছেড়ে আসা পেশক রোডকে আবার ফিরে পাওয়া গেল। তিস্তা বাজার এক তিনমাথার মোড় - যার এক মুখে সেবক, এক মুখে ঘুম আরেক মুখে গ্যাংটক এবং কালিমপং। সিকিমে ঢোকার প্রধান দ্বার। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে তিস্তা আর তার ওপরে ব্রীজ। আমাদের ছোটবেলায় ছিল ঝোলানো ক্যান্টিলিভার ব্রীজ - এখন পাকাপোক্ত, উন্নয়নে সামিল।
    আমরা দার্জিলিঙে এত কেনাকাটা করে ফেলেছি যে মাল ধরাতে পারছিলাম না। অগত্যা আরেকটি রুকস্যাক কেনা হল তিস্তা বাজার থেকে পছন্দ করে। বেশ সস্তাই পেলাম। তারপর আবার এগিয়ে গিয়ে ব্রীজ পেরিয়ে চলে আসা গেল তিস্তা রিভার ক্যাম্প সাইটে। এখানেই মিলিত হয়েছে দুই উদ্দাম পাহাড়ি নদী - তিস্তা আর রঙ্গিত। নদী আর নদের লিঙ্গ নির্ধারণ কিসের ভিত্তিতে হয় আমার জানা নেই, কিন্তু স্থানীয় লোকগাথা বলে রঙ্গিত হল নদ আর তিস্তা নদী। এদের প্রেমগাথা এই এলাকায় বহুল প্রচলিত। আমরা এসে দাঁড়ালাম একদম সেই মিলনক্ষেত্রটিতে।
    নদীর তীরে অজস্র ছোট ছোট তাঁবু - বহু টুরিস্ট এখানে তাঁবু খাটিয়ে থাকতে আসেন - মাছ ধরেন। তাতে হয়তো এখানকার স্থানীয় অর্থনীতির কিছু সুরাহা হয় - প্রকৃতির কতটা ক্ষতি হয়, বাইরে থেকে বোঝা কঠিন - কিন্তু তাঁবুগুলি যে দৃষ্টিকটু, তাতে কোন সন্দেহ নেই।সেই এলাকা ছাড়িয়ে সন্দীপনের পরামর্শ মত আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম একদম নদীর বাঁকের মুখে। ঠিক এইখানটাতেই ডান দিক থেকে রঙ্গিত এসে প্রায় ১২০ ডিগ্রি কোণে তিস্তার সাথে মিশেছে। তিস্তার জল ঘন সবুজ - রঙ্গিতের কালচে - জলবিভাজিকায় এই দুই রঙের সুস্পষ্ট কনট্রাস্ট।
    এখানে জল বেশ গভীর আর স্রোতও প্রবল। আমরা নদীর পাড়ে বসলাম কিছুক্ষণ, চুপচাপ। শ্রোতা হয়ে যেতে পারলে নদীর অনেক গল্প থাকে বলার মত। এক মুখে আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে সে "আসছি" বলে অন্য মুখে উধাও হয়ে যায় যখন তখন। তার কলরব শুনলে মনে হবে এই তো, কাছেই আছে। আসলে সে কখন কোথায় থাকে, বোঝা কঠিন। মেঘ বালিতে কিছু একটা বানাচ্ছে। আসলে নিজেই কনফিউজড হয়ে গেছে কী বানাবে - গণেশ না থানোস। এদিকে একটা পাথরে চুপ করে বসে আছে তিনটে ঘন কালো পাহাড়ি ভোমরা। খুশী গল্প করছে রঙ্গিতের সাথে। মেঘ শেষ অবধি প্যাগোডা বানিয়েছে দেখা গেল।
    এখান থেকে ফেরার সময়ে কিছু পাথর কুড়ালাম। এই পাথরের কারণে এয়ারপোর্টে আটকে যাচ্ছিলাম প্রায় - কিন্তু সে গল্প পরে। আপাতত আমাদের গন্তব্য পাহাড়ের ওপরে - লাভার্স পয়েন্ট। এই তিস্তা আর রঙ্গিতের মিলনের জায়গাটাই অনেক ওপরে, বার্ডস আই ভিউ থেকে দেখা। এখানেই বিখ্যাত লোপচুর প্যাঁড়া কিনলাম, সেই সঙ্গে মেঘ কিনল মার্শমেলো, আর ওর ফার্ম হাউসের বন্ধুদের জন্য চকোলেট। ডাব খাওয়া হল, কিনলাম তিতোড়া আচারের প্যাকেট।
    এসব সেরে বেরোচ্ছি, দেখি শিবাংশু দা () । বৌদিও। ওঁরা আছেন তিনচুলেতে। একটু গল্পগুজব হল। তিনচুলেতে দেখা হবার সম্ভাবনা আছে জানিয়ে যদিও শেষ অবধি দেখা আর হয়নি এ যাত্রা - দাদা ওঁর বাড়ি যাবার নিমন্ত্রণ দিয়ে রেখেছেন) এবার পেশক রোড। এবার সোজা ওপরে। আস্তে আস্তে কুয়াশাও বাড়ছে। এবারে যাচ্ছি লামাহাটা। দেখতে দেখতে পৌঁছেও গেলাম। কিন্তু এখানে গাড়ি থেকে নেমে বোঝা গেল, কেলো একটা হয়েছে। বড়া মাঙ্গোয়া বা তিস্তা বাজারে তো ঠান্ডার ঠ নেই, আমরাও গরমজামা কিছু আনিনি - আমি আর মেঘ তো হাফ হাতা টি শার্ট শুধু। লামাহাটায় কুয়াশা - শীত করছে। ওপরে পাইনের বন আরো ঠান্ডা হবে এখান থেকেই বোঝা যাচ্ছে। কী করা যায় ভাবতে ভাবতেই দেখি রাস্তার উল্টোদিকে ফুটপাথে এক দিদি সোয়েটার, হুডি নিয়ে বসেছেন। সেখান থেকে আমাদের গরমজামা কিনলাম। সন্দীপনের ফুল শার্ট এর ওপরে একটা পাতলা জ্যাকেট গাড়িতেই ছিল। অতঃপর আমরা লামাহাটার বাগানে প্রবেশিত হইলাম।
    পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে পাইন গাছের সারি। তার ফাঁক দিয়ে আঁকাবাঁকা নুড়ি বেছানো হাঁটা পথ। সেই পথ বেয়ে বেয়ে পাহাড়ের একদম চূড়ায় উঠে গেলে নির্জনতার কোলে এক ছোট্ট হ্রদ। এই হল লামাহাটা। মেঘ আর সন্দীপনের খুব ভাব হয়ে গেছে, কারণ সন্দীপন ওর অনর্গল বকবকানি মন দিয়ে শুনছে। হ্রদটার ডানদিকে পাহাড়টা আস্তে আস্তে অন্য ঢাল পেয়েছে - সেদিকটায় লোকজন বেশী আসে না - যদিও জঙ্গলের মাঝে হাঁটাপথের চিহ্ন বলে দেয় এদিকে স্থানীয় লোকেদের আনাগোনা আছে। জায়গাটা একদিকে একটা প্ল্যাটু মতন - তার মাঝামাঝি একটা চ্যাপটা পাথর। এখানে স্বভাবতই ছবি তুলতে আসে লোকজন। কিন্তু অন্যদিকটা নির্জন। আর গাছের ফাঁকে ফাঁকে জড়িয়ে থাকা মিস্ট। কেমন একটা সাররিয়াল পরিবেশ। যেন যে কোন মুহুর্তে ওই কুয়াশার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে এক ধবধবে সাদা ঘোড়া - অথবা নীল রঙের একটা আস্ত ড্রাগন।
    গাছের ফাঁক ধরে বেশ কিছুদূর গিয়েও অবশ্য ড্রাগনের কোন চিহ্ন মিলল না - তবে দেখা হয়ে গেল এক বন্য অর্কিডের সঙ্গে। আমি অর্কিড চিনি না - নামও জানিনা। ছবি দেখে যারা চিনবেন, জানিয়ে দিয়েন দয়া করে। এখান থেকে যেতে ইচ্ছে করছিল না একটুও - তাও একসময়ে তো ফিরতেই হয় গৃহী মানুষকে। আবার সেই পাইনবন ধরে উৎরাই। নীচে নেমে এক কাপ করে কফি। তারপর ফেরার পথ। কিন্তু সন্দীপনের পকেটে আরো একটা তাস তখনো ছিল। পেশক রোড ধরে এবারে আর তিস্তা বাজার অবধি না নেমে তার একটু আগেই ডানদিকে বাঁক নিয়ে বড়া মাঙ্গোয়ার রাস্তা ধরা যায়। সেটা ধরে কিছুদূর গিয়ে এক জায়গায় গাড়ি থামল। দেখি ডানদিকে কমলালেবুর বাগান। আর বাঁ দিকে তাদের একটা ছোট্ট আউটলেট। বাগানে এখন ঢোকার উপায় নেই, বাইরে থেকেই দেখলাম আশ মিটিয়ে। আর আউটলেট থেকে কেনা হল অরেঞ্জ মার্মালেড, জিঞ্জার জ্যাম, অরেঞ্জ জুস। একটা করে জুস খেয়েও ফেললাম মেঘ আর আমি - খুশীর তো ডায়েট (চোখ মারা ইমোজি)।
    ফার্ম হাউসে আসার আগেই গাড়ি স্ট্যান্ডের চায়ের দোকানে আমাদের ওয়েলকাম পার্টি মজুদ ছিল - ঢোলু, ক্যামব্রে আর টাইসন। চা পর্বের পর তারাই আমাদের গাইড করে নিয়ে চলল রুম অবধি। আজ ইভনিং স্ন্যাক্সে ওনিয়ন পকোড়া আর চিকেন মোমো। যে ছেলেটা খাবার, জল নিয়ে যাতায়াত করছে, তার নাম কলিপ - মেঘের থেকে খুব জোর তিন চার বছরের বড় হবে। কলিপ এখানেই থাকে - পড়াশুনা করছে, তবে লক ডাউনের কারণে এখন কলেজ টলেজ নেই। বড়ই মিষ্টি, শান্ত স্বভাবের ছেলে কলিপ। এখানকার বাকি স্টাফেরাও সবাই এখানেই থাকেন - কোয়ার্টার্স নয়, ওদের বাড়িগুলো একটু একটু উঠোন সহ ওদের নামেই করে দেওয়া হয়েছে ফার্ম হাউসের পক্ষ থেকে। এক চিলতে খেলার মাঠও আছে - তাতে ভলিবলের নেট টাঙানো - যদিও সীজন টাইমে খেলার সুযোগ খুব একটা হয় না কলিপ বেচারার।

  • বিভাগ : ভ্রমণ | ১১ এপ্রিল ২০২১ | ১৪৭ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন