খারাপ দিক বলতে একটাই - সেটাও তর্কসাপেক্ষ বটে, এত কৃত্রিমতায় প্রকৃতির আসল রূপটা ধরা পড়ে না। কিন্তু সে বোধ হয় এসব হবার আগেও পড়ত না। প্রকৃতির মাঝে একখণ্ড পার্কের দরকার আছে কি নেই, তা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু এই পার্ক যদি কিছু মানুষের রুজির ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে থাক। সব কৃত্রিমই কিছু অশ্লীল নয়। আমার মোটের ওপর ভালই লাগল এইসব পরিবর্তন।
লাঞ্চ এখানেই করব বলে নীচে নেমে একটা জুৎসই রেস্তরাঁ খুঁজছিলাম, মেঘের চোখে পড়ে গেল "সান্টা বান্টা ধাবা"। সান্টা বান্টার যেসব গল্প শুনেছি, তাতে খুব একটা ভরসা পাচ্ছিলাম না, কিন্তু মেঘ ইনসিস্ট করল। কোথাও একটা ঢুকে পড়া দরকার ছিল, কারণ আমাদের সফরসঙ্গী তখন হাওয়ার সঙ্গে জুটে রীতিমত হাড় কাঁপাচ্ছিল। কাজেই তিনজনে তড়িঘড়ি ঢুকে পড়লাম সেই সান্টা বান্টারই খপ্পরে। বিকাশবাবু এলেন না - বললেন এখানে পার্কিং এর সমস্যা, তাছাড়া উনি আগেই খেয়ে নিয়েছেন নাকি। অগত্যা।
ভিতরে ঢুকে এক ঝলকে মন্দ লাগল না - কাঠের দেওয়াল, মেঝে - গাছের গুঁড়ির টেবিল। জানলার বাইরে পাহাড়ের ঢাল - কুয়াশায় ঢাকা। জানলার পাশেই একটা টেবিলও পাওয়া গেল। মেঘের ভাত, আমাদের রুটি, চিকেন ভর্তা, মাশরুম কারি। কিন্তু কার্যত মাশরুম কারি আর চিকেন ভর্তা দেখতেও একরকম, খেতেও। এবং কোনটাই ঠিক মাশরুম কারি বা চিকেন ভর্তার মত খেতে নয় (কান্নার ইমোজি)। মেঘের অবশ্য তাতে বিশেষ কিছু যায় আসে না, সে দিব্যি খুশী।
যাই হোক লাঞ্চ সেরে আবার বেরোনো গেল। এবার রকি আইল্যান্ডের দিকে। আভা আর্ট গ্যালারির একটু আগে থেকে বাঁ দিকে (দার্জিলিং এর দিকে মুখ করলে) নেমে গেছে - একদম খাড়াই ঢাল। সুভা কাকীমা () আর রাণাদের বাড়িটার পাশ দিয়েই রাস্তা। আমাদের ছোটবেলায় এই স্পটটা ছিল না, তবে ২০০৫ এ এসে দেখে গেছিলাম। খাড়া নামতে নামতে পথে অরেঞ্জ ভ্যালি টি এস্টেট। এখানে গাড়ি একটু দাঁড়াল - ম্যান্ডেটরি পারচেজ - ফার্স্ট ফ্লাশ দার্জিলিং টি। তারপর আবার হুড়হুড় করে প্রায় গড়িয়ে নেমে যাওয়া রকি আইল্যান্ডের দিকে।
শেষ পর্যটক আমরাই - তারপরে টিকিট দেওয়া বন্ধ করে দিল। পাহাড়ের গা বেয়ে পাথর ফাটিয়ে নেমে আসা ঝরণা আর তাকে কেন্দ্র করে সাজানো বাগান। ঝরণার বিভিন্ন উচ্চতায় ছোট ছোট সাঁকো, খোয়া বাঁধানো রাস্তা, বড় বড় গাছের ছায়া। একটু নীচের দিকে একটা বড় পুল মত তৈরি হয়েছে। আর এই টিকেটেড এরিয়ার বাইরে, একটু নীচের দিকেে জলের মাঝখানে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো একটা ঢাউস পদ্ম - পুরো জায়গাটার অ্যাবোমিনেশন। এটা আমার একেবারেই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। ঘুরে টুরে এসে দেখি মিষ্টি দেখতে একটি নেপালি মেয়ে চায়ের দোকান বন্ধ করার তোড়জোর করছে। আমাদের সে লাস্ট কাস্টমার হিসাবে দু কাপ ভারি সুন্দর চা খাওয়াল, সঙ্গে বিস্কুট।
ফেরার পথে ম্যালের আগে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডেই নেমে গেলাম। হাঁটতে হাঁটতে আবার গ্লিনারিজ। মেঘের আরেক প্রস্থ ঘোড়সওয়ারির ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সোমবার ঘোড়াদের ছুটি থাকে। গ্লিনারিজে আজ শুধু মাফিন, পেস্ট্রি আর দুটো বড় কেক কেনা হল - একটা প্লেন, একটা ফ্রুট অ্যান্ড নাট। তারপর বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটু ঘোরাঘুরি, কিউরিয়ো শপগুলোয় হানা দিয়ে কিছু ছোটখাটো জিনিষ নেওয়া, ম্যালের দুধারের কাপড়ের দোকান। কিন্তু সেরা অবশ্যই মহাকাল মন্দিরের রাস্তার ফুটের বাজার। সেসব সারতে সারতে, হাঁটতে হাঁটতে হোটেল। ম্যাল থেকে আমাদের হোটেল অবধি হেঁটে যাওয়ার এই রাস্তাটা বেশ রহস্যগল্পের প্লটের মত। ডানদিকে খাদ আর বাঁদিকে পাহাড় - দুইই খাড়া, জঙ্গলে ঢাকা। বাঁদরেরা স্বচ্ছন্দ, কুকুরেরাও, আমাদের দু-পেয়েদের একটু গা শিরিশির তো করেই। অনেক নীচে দেখা যায় গুরুং বস্তি, লেবং রেসকোর্স, আঁকাবাঁকা ফিতের মত রাস্তা। সন্ধ্যে হলে অজস্র আলোর ফুটকি।
রুমে আজ হুইস্কির বদলে কফি আর কেক নিয়ে বসা গেল। গ্লেনারিজ এর এই কেক এর তুলনায় আসে একমাত্র নাহুম'স। এই দুটোর মধ্যে একটাকে বাছতে বললে অবশ্য আমি বিপদে পড়ব। ছোটবেলার দোহাই দিয়ে গ্লেনারিজকেই বাছব হয়তো। দার্জিলিং এ অদ্যই শেষ রজনী - তাই সবারই একটু মন খারাপ।

  • বিভাগ : ভ্রমণ | ০৯ এপ্রিল ২০২১ | ৭০৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


    গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
    মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


    পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন