• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • হাত

    Nirmalya Nag লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৮ জানুয়ারি ২০২১ | ৫৫৪ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ছুটির দিনের রাত। ঠাকুরপুকুরের কাছে এক আলো-আঁধারি বাস-স্টপে দাঁড়িয়ে আছি, এসপ্ল্যানেড যাব। দুটো তিনটে বাস ছেড়ে দিলাম, বড্ড ভিড়। নাঃ, দেরি হয়ে যাচ্ছে, এবার যা পাব তাতেই উঠে পড়তে হবে। একটা সরকারি বাস এল, হাওড়া যাবে। এটায় আগের গুলোর চেয়েও বেশি ভিড়। দরজায় লোক ঝুলছে। কিছু করার নেই। উঠতে গেলাম। পাদানিতে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, দরজায় হেলান দিয়ে বাসের সামনের দিকে মুখ করে। সে তার পা একটুখানি সরিয়ে আমায় পা রাখার জায়গা দিল। টং টং করে কন্ডাক্টরের ঘন্টার শব্দ, বাস ছেড়ে দিল। ঝোলার অভ্যাস নেই অনেক দিন। দু দিকের রড ধরে বিশ্রী ভাবে বিরাট একটা ফোসকার মত বাসের গায়ে ফুলে আছি। পা স্লিপ করতে পারে যখন তখন। একটা দাঁড়িয়ে থাকা অটোরিক্সায় ধাক্কা খেতে খেতে বেঁচে গেলাম। যে লোকটা পা সরিয়ে জায়গা দিয়েছিল, সে এবার তার বাঁ হাতটা আমার পিছন দিক দিয়ে নিয়ে গিয়ে সামনের রডটা ধরল।  পিঠে একটা সাপোর্ট পেলাম, আর পড়ে যাবার ভয় নেই।

    একটু পরে বাসের ভেতরে যেতে পারলাম আর... আশ্চর্য ব্যাপার, ওই ভিড়ের মধ্যে বসতেও পেয়ে গেলাম। জানলার ধারে বসে যাচ্ছি... মনে হল ওই অচেনা লোকটির কথা, যে আমায় সম্ভাব্য বিপদ থেকে বাঁচাল। কি দায় পড়েছিল তার? আমার মুখটাও সে দেখেছে বলে মনে হয় না, আমি তো দেখিইনি। কোন দিন দেখা হলেও কেউ কাউকে চিনতে পারব না।

    এক বন্ধু একটা গল্প বলেছিল। আদতে শিলিগুড়ির ছেলে সে। কলেজে পড়তে কলকাতায় এসে বাসে ঝুলে যাবে, হিরোগিরির ব্যাপার। কিন্তু ঝুলে যারা যায়, তারা ঝোলার কায়দা জানে। এর তা জানা নেই। বিভিন্ন বাসে বিভিন্ন লোক দায়িত্ব নিয়ে নতুন ছেলেটিকে শিখিয়ে দিয়েছিল “রড ধরে ঝোলাটার ট্যাকটিক্স”।

    এক পরিচিত ভদ্রমহিলার কথা মনে পড়ল। তিনি সব সময়েই একটু অন্যমনস্ক থাকেন। জলের পাইপ বা ইলেকট্রিকের লাইনের জন্য খোঁড়া গর্তে পড়ে যাবার মুহূর্তে তাঁকে ধরে ফেলেছিলেন পাঠান স্যুট পরা এক কাবলিওয়ালা। কি এসে যেত তাঁর এক শাড়ি পরা বাঙালি হিন্দু মহিলাকে না বাঁচালে? এগুলো ‘instinct’। পলকের মধ্যে নেওয়া সিদ্ধান্ত। যাঁরা করেন, তাঁরা এভাবেই করেন। ভাবনা চিন্তা করে, পরে কী হতে পারে ভেবে কি আর সব কাজ হয়? 

    খবরের কাগজ খুললেই চারদিকে অমানবিক মুখের মিছিল। তার মাঝে কিছু উজ্বল ব্যতিক্রম যে থাকে না তা নয়। তবে তেমন ‘বড় মাপের’ মানবিকতা না দেখালে তো আর কাগজে জায়গা পাওয়া যায় না। তবু মনে হয় ছোট সাহায্যও কি কম? প্রতিদিনের এমন কত ছোট ছোট সাহায্য যে কত মানুষকে অন্য ভাবে খবরের কাগজে নাম ওঠান থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে কে তার হিসেব রাখে।

    কবীর সুমন এক ভারী আর বেঢপ চেহারার লোকের বাসে ওঠার গল্প বলেছিলেন। বাঁ হাতে চটের ব্যাগ আর ডান হাতে ছুটন্ত বাসের হাতল ধরে লোকটাও ছুটছে। একবার ফুটবোর্ডে উঠতে গিয়ে পা ফসকেছে লোকটার। তারপর...
    "পড়ি-কি-মরি'র জোরে শেষমেশ ফুটবোর্ডে উঠে/ দেখলো লোকটা, ঠিক দু-তিনটে হাত যায় জুটে/ রোজকার মত আজও লোকটা অনেক দূর যাবে/ ডানপিটে লোকটাকে কারা, কোন যুদ্ধে হারাবে!"

    এই দু-তিনটে হাতের মালিকদের কেউ কোনও দিন খুঁজে পাবে না। তবু তাঁরা ছিলেন, আছেন, থাকবেন, ডানপিটে  মানুষদের অনেক দূর যেতে, তাদের জীবনযুদ্ধে জিততে অলক্ষ্যে থেকে সাহায্য করবেন। আর এই সমস্ত মানুষদের জন্যই শঙখ ঘোষের 'যমুনাবতী' নতুন আঙ্গিকে দেখা দেয় - "নিভন্ত এই চুল্লিতে মা / একটু আগুন দে,/ আরেকটুকাল বেঁচেই থাকি/ বাঁচার আনন্দে!"

     

  • বিভাগ : ব্লগ | ২৮ জানুয়ারি ২০২১ | ৫৫৪ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Enakshi Nandi | 43.251.88.190 | ২৮ জানুয়ারি ২০২১ ২২:২৮102152
  • একে অপরের প্রতি অজানা ভরসাতেই তো টিকে আছি

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন