• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  রাজনীতি  শনিবারবেলা

  • ভাটপাড়া তথ্যানুসন্ধান - ৬

    আমরা এক সচেতন প্রয়াস
    ধারাবাহিক | রাজনীতি | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩৩৪ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • সমস্যাবলি: হারানো শৈশব

    আমরা-র তরফ থেকে কিছু মনোবিদ শেল্টার-এর শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন, বিশেষ করে মেয়েদের সঙ্গে। শিশুদের সবাইই ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সী, সবাই ঠিকঠাক কথাও বলতে পারেনি, থমকে গেছে, চুপ করে থেকেছে, হয়তো তারা যেসব ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে, তা-ই তাদের হতবাক করে দিয়েছে। এখানে তেমনই কিছু কথোপকথন সংক্ষেপে দেওয়া হল।

    প্রথম শিশু: আমরা বাড়ি ছিলাম না। এখন আমাদের কোনো বাড়ি নেই। নানির বাড়ি গেছিলাম কাছেই, ওনার শরীর ভালো যাচ্ছিল না। তখনই বোম পড়া শুরু হয়। আমরা বাড়ি ফিরতে পারিনি। বাইরে বেরোতে ভয় করছিল। পরের দিন সকালে জানতে পারি লোকজন সব ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে মসজিদে লুকিয়েছে। আমরা গর্বা লাইনের শ্রমিক বস্তিতে থাকি।
    দ্বিতীয় শিশু: আমি বারুইপাড়া গেছিলাম নানির বাড়ি, মায়ের ভোট দেওয়ার কথা ছিল তাই। ভোটের দিনই বোমাবাজি শুরু হলে পরে আমরা ওখানেই থেকে যাই। খবর পেয়েছিলাম বাড়িঘর সব লুট করে নিয়েছে। সবাই ওখানে ফিরে যেতেও বারণ করল। তখন থেকে এখানেই আছি।
    আমরা: এখনও যাওনি একবারও? কী অবস্থা সেখানকার?
    দ্বিতীয় শিশু: সব লুটপাট করে নিয়েছে, এমনকি জামাকাপড়ও। ইদের নতুন জামাকাপড়গুলোও ছাড়েনি।
    প্রথম শিশু: আমারও নতুন জামাকাপড় সব ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছে।
    আমরা: তোমরা কেউ তাদের দ্যাখনি? তাহলে কে দেখেছে?
    দ্বিতীয় শিশু: কিছু মহিলা ছিল সেখানে।
    প্রথম শিশু: আমাদের লাইনে দুজন ঘরে ফিরে গিয়েছিল। পরের বার যখন গুন্ডাগুলো ফিরে এসে ঘরের দরজায় ধাক্কা দেয়, ওরা খোলেনি। গুন্ডারা সব জোর করে ঘরে ঢুকে পড়ে। ঘরে লোকটার বাচ্ছা আর ভাইও ছিল। বাচ্ছা মেয়েটা ওদের দেখে চেঁচাচ্ছিল, “তোমরা তো আমায় চেন, তাই না?” গুন্ডাগুলো ওকে গালি দেয়। বাচ্চাটা কাঁদতে কাঁদতে ঘর ছেড়ে চলে যায়। ওইদিন আমার অবস্থাও খুব খারাপ ছিল, যখন শুনলাম আমাদের বাড়ির কোনো কিচ্ছু আস্ত নেই, সব লুট হয়ে গেছে, মনে হচ্ছিল গলা ছেড়ে কাঁদি। (ফোঁপাতে ফোঁপাতে) সব শেষ হয়ে গেল।
    আমরা: তোমার কি মনে হয় আবার এমন হতে পারে?
    প্রথম শিশু: বলতে পারব না। গতবছর রামনবমীর সময়েও এমন হয়েছিল। সকালে আমরা দাঁত মাজছিলাম, হঠাৎ হইহই আওয়াজ উঠতে শুরু করে। আমরা ভয় পেয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে যাই। আমার ছোটো ভাইও ছিল, ওর জন্যই ভয় বেশি লাগে। ওরা এসে ভাঙচুর করে সবকিছু। মা আমাদের ঠেলে খাটের তলায় ঢুকিয়ে দেয়। মিনিট দশেকের মধ্যে সব চুপ। কাঁকিনাড়া হিন্দি হাই স্কুলে পুলিশ এসেছিল, অর্জুন সিংও এসেছিলেন। আমরা গিয়ে দেখি ওরা সব ভেঙেচুরে বাইরে ছড়িয়ে রেখে গেছে। তারপর আমরা একদম মাঝখানের ঘরটায় ঢুকি, সেখানে সব মহিলারা ছিলেন।
    দ্বিতীয় শিশু: মসজিদের পাশের রাস্তাটা ধরে আমরা দেশে ফিরে যাই। তিনমাসের জন্য সকলেই চলেযায়। কিন্তু ফিরে এসে দেখি অবস্থা আরও খারাপ, কিচ্ছু আস্ত নেই আর। থাকাও যায় না সেখানে। দরজা-জানলা সব ভাঙা।
    আমরা: ঘরে ঢুকেছিলে?
    দ্বিতীয় শিশু: হ্যাঁ, কিচ্ছু ছিল না, সব চুরি হয়ে গেছিল। এই ঘটনায় আমরা তো আতান্তরে পড়ি! সবাই পুলিশের কাছে যায়।
    আমরা: তোমরা এখন স্কুল যাচ্ছ?
    দ্বিতীয় শিশু: না, কাল থেকে যাব।
    আমরা: তোমরা সবাই কি একই স্কুলে পড়?
    দ্বিতীয় শিশু: না, আমরা দুজন কাঁকিনাড়া হাই স্কুলে উর্দু মিডিয়ামে পড়ি আর ও হিন্দি মিডিয়ামে।
    আমরা: স্কুলে তো হিন্দুরাও পড়ে নিশ্চয়ই? হিন্দু আর মুসলিম ছাত্রছাত্রী তাও কতো হবে?
    দ্বিতীয় শিশু: ৫০ জন মুসলিম আর ১০০জন হিন্দু।
    আমরা: দাঙ্গার পর স্কুল গেছ এখনও?
    প্রথম শিশু: কী করে যাব? খাতা, বই, ব্যাগ—কিছুই নেই।
    তৃতীয় শিশু: আমারও নেই। আমাদের ব্যাগবই কিছুই নেই।
    দ্বিতীয় শিশু: আমি গেছিলাম, আমার দুটো বইও আছে। স্যারেরা স্কুলে যেতেও বলেছেন।
    আমরা: তুমি হিন্দু বাচ্ছাদের সাথে মেলামেশা কর?
    দ্বিতীয় শিশু: কালকেই একজনের সাথে দেখা হল, আমি জিজ্ঞেস করলাম স্কুল খুলেছে? কিছু না বলেই চলে গেল।
    আমরা: এই ঘটনার আগে তাদের সাথে খেলতে তোমরা?
    প্রথম শিশু: হ্যাঁ, এই কাছেই একটা মাঠ আছে। ওখানে একসাথেই তো খেলতাম আমরা। দাঙ্গার আগের দিনই তো ক্লাবের সামনে গোপাল রাউত এসে বসেছিলেন, উনি তো আমাদের বাড়িতেই চা-জলখাবার খেয়ে থাকেন। মা ব্যস্ত থাকে বলে আমি আর ঠাকুমাই দেখাশোনা করি। দাঙ্গার আগের দিনই ফ্রিজ থেকে জল চেয়ে খেয়ে গেল, আর পরের দিন সেই ফ্রিজটাই ভাঙা।
    আমরা: এরাই কি আক্রমণকারী? বাইরের কেউ নয়?
    প্রথম ও তৃতীয় শিশু: না ।
    দ্বিতীয় শিশু: আমরা ওখানে ছিলাম না, তবে বড়োরা দেখেছে।
    আমরা: বড়োদের কি বক্তব্য ?
    দ্বিতীয় শিশু: বড়োরা খুব চিন্তায় আছে, আর আমরাও। আমার আবার এবছরেই বোর্ডের পরীক্ষা আছে, তাই চিন্তাটা একটু বেশিই। আমরা আপাতত নানির বাড়িতে আছি, কিন্তু সেখানেই বা আর কতদিন? বাড়ি তো বাড়িই। আমাদের একটা নতুন বাড়ি দরকার, আর বাড়ি বানাবার জন্য দরকার টাকা। আমরা ট্রেনে যাতায়াত করছি এখন। সবাই আলাদা আলাদা জায়গায় থাকছে—সোদপুর, জগদ্দল, খড়দা; কিন্তু তার জন্যও টাকার দরকার।
    আমরা: যাতায়াতের পথে কোনো সমস্যা হচ্ছে?
    প্রথম শিশু: একবার হয়েছে, কিছু বয়স্ক হিন্দু বলছিল আমরা নাকি ওদের ঘর লুট করেছি, এবার ওরা আমাদের লুট করবে, আমরা শুনে থাকলেও কিছু না বলে বাড়ি ফিরে আসি।
    আমরা: তোমরা তো ওদের সাথে খেলেছ, তখন কথা মনে হয়নি ওরা হিন্দু আমরা মুসলিম?
    প্রায় সবাই: না আগে কখনও মনে হয়নি, আমরা মেয়েরা নানাধরনের খেলা খেলেছি। কিন্তু এখন মনে হয়।
    প্রথম শিশু: আমার মনে হয় আসল কারণ হল তৃণমূল আর বিজেপির সংঘর্ষ। ওরা কেন ধরেই নেয় যে মুসলিম হলেই তৃণমূলকে সমর্থন করতে হবে?
    আমরা: তোমাদের দেশের বাড়ি কোথায়?
    চতুর্থ শিশু: আমরা টিটাগড় চলে যাওয়ার কথা ভাবছি, এখানে আর থাকা যাবে না।
    আমরা: এই জায়গা ছেড়ে চলে যাবে? নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে?
    চতুর্থ শিশু: ঠিক জানিনা, তবে ভাবতে তো হবেই।
    আমরা: কী হবে যদি আবার কোনো হিন্দু এলাকায় গিয়ে থাকতে হয়?
    দ্বিতীয় শিশু: গেলে তবেই তা জানতে পারব। সব হিন্দু খারাপ নয় তো, আবার সব মুসলিমও খারাপ!
    আমরা: এরকম ঘটনা অনেক জায়গাতেই ঘটছে। কী মনে হয়? এর কারণ কী?
    প্রথম শিশু: জানই না, তারা কেন এরকম করছে জানার জন্য আমাদের তো তাহলে তাদের মাথায় ঢুকতে হবে। আগে এমন হলে প্যারামিলিটারি আসত, কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ঠান্ডা হয়ে যেত। আমরা আমাদের ঘরদোর সারিয়ে নিয়ে আবার শান্তিতে থাকতে শুরু করতাম। আবার যে এরকম ভয়ানক কিছু যে ঘটবে, তা আমরা কখনও ভাবতেই পারিনি।
    আমরা: তোমার কী মনে হয়, হিন্দুরা চান না তোমরা এখানে থাক?
    প্রথম শিশু ও দ্বিতীয় শিশু: না, চায় না।
    প্রথম শিশু: ভোটের আগে গোপাল রাউতের ছেলেরা এসে বিজেপির লিফলেট বিলি করে যায়। ভোটের আগে একটা লাল বোতামওয়ালা মেশিন দেখিয়ে বলে ২ নম্বর বোতামটা টিপতে হবে। একজন মহিলা জানতে চান ২ নম্বর বোতাম না টিপলে কী হবে। ওরা বলে, ২৩ তারিখ ফল বেরোতে দাও, তারপর সবাইকে এলাকা ছাড়া করব।
    দ্বিতীয় শিশু:গোপাল রাউত আমাদের বাড়ি এসে মাকে একটা কাগজে ২ নম্বর লিখতে বলে, মা না লিখতে চাইলে ২৩ তারিখের পর ঘরছাড়া করবে বলে চলে যায়।
    প্রথম শিশু: আমাদের জয় শ্রীরাম বলতে বলে।
    দ্বিতীয় শিশু: আমাদের দেয়ালটা ভেঙে তাতে জয় শ্রীরাম আর বিজেপি লিখে চলে যায়।
    আমরা: তোমার কী মনে হয়, ভোটের জন্যই এত কিছু? মানে ভোটের পর এসবই থিতিয়ে যাবে?
    দ্বিতীয় শিশু: ওই একই জায়গায় কত হিন্দু বাড়িও তো ছিল, ওগুলোতে কিছু করল না তো, আমাদের দেয়ালেই তবে কেন জয় শ্রীরাম লিখল? আমাদেরই কেন ২ নম্বর লিখে সই করতে বলল? আমরা কী করে জানব হিন্দু-মুসন্মান দাঙ্গার জন্য এমনটা হয়েছে, নাকি বিজেপির জন্য? আপনাদের কী মনে হয়? এটা কীভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত? এটা তো পরিষ্কার যে ওরা চাইছে আমরা বিজেপিকে ভোট দিই। কিংবা বলা যেতে পারে, আমরা কেন তৃণমূলকে ভোট দিয়েছি—ওরা তার জবাবদিহি চাইছে। আমাদের সংবিধান তো আমাদের ধর্মাচরণের স্বাধীনতা দিয়েছে, তাহলে এটা সংবিধান-বিরোধী হল না?
    (একটুক্ষণ চুপ করে থেকে কাঁদে আর হা-হুতাশ করে)
    দ্বিতীয় শিশু: (ফের বলতে শুরু করে) দর্মা লাইনে আর কিচ্ছু বাকি নেই, জামাকাপড় ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, কোরানের পাতা ছিঁড়ে ছড়িয়ে রেখে দিয়েছে। আমাদের খুব খারাপ লেগেছে। ওরা আমাদের ঘরবাড়ি লুট করেছে, তাও ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করবে কেন? এ তো আমাদের ধর্মের অবমাননা! তোমাদের কাছে রাম গণেশ এনারা যেমন আমদের তেমনই কোরান, এভাবে তার অপমান করা কি উচিত?
    আমরা: আজ ওরা তোমাদের বিশ্বাসে আঘাত করল, কাল কি তবে এর জবাব দিতে তোমরা গণেশের মূর্তি ভাঙবে?
    দ্বিতীয় শিশু: কখনোই না, আমরা জানি কারও ধর্মে আঘাত করলে তার কতটা খারাপ লাগে। আমাদের সাথে আজ যা হয়েছে, আমরা চাই না কারও সাথেই সেরকম কিছু হোক।
    আমরা: এই ঘটনার পরে হিন্দুদের সাথে কথা বলেছিলে?
    দ্বিতীয় শিশু: কিছু লোক বলছিলেন খারাপ হয়েছে, তোমাদের সঙ্গে এসব হয়েছে দেখে খুব খারাপ লাগছে! তবে লুট চলাকালীন তাদের মহিলারাই এসে আমাদের গয়না, বাসন, আসবাব চুরি করছিল। দুজন সাক্ষীও আছে, তবে সেনা মোতায়েন হওয়ার পর আর কোনো সমস্যা নেই।
    দ্বিতীয় শিশু: আমরা ফিরে যেতে চাইলেও পারব না, লোকে দাঁড়িয়ে দেখবে, অপমান করবে। আমরা চারজন সেদিন গেছিলাম, একজন মহিলা আমদের হুমকি দিয়েই যাচ্ছিলেন।
    তৃতীয় শিশু: আমাদের এখন আর ভয় লাগে না। এবার আসুক বের করতে, দেখি কত জোর?
    দ্বিতীয় শিশু: আমরা নিজেদের বাড়িতে ফিরতে অবধি ভয় পাচ্ছি।
    তৃতীয় শিশু: এটা কি ওদের একার জায়গা? এটা আমাদেরও জায়গা, এখানে আমাদেরও বাস করার অধিকার আছে।

    সমস্যাবলি: শ্রান্ত যৌবন

    ভাটপাড়ার দাঙ্গায় ঘরছাড়া হওয়া, অসুবিধায় পড়া, সমস্ত প্রতিকূলতার সম্মুখীন হওয়া দুই তরুণতরুণী তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছিলেন। এমকম পাঠরতা তমন্না পারভিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং শাহবুদ্দিন মনসুরি এমবিএ পাঠরত। ২০১৯-এর ২৮ জুলাই তাদের সাথে আমাদের কথা হল।

    আমরা: আপনারা কী দেখেছিলেন আর শুনেছিলেন?
    তমন্না: আমরা দরমা লাইনে আমাদের কোয়ার্টারে থাকতাম। ২০ মে, সকাল ৬টায় জনাপঞ্চাশেক লোক পিস্তল আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এখানে ঢুকে আসে। তারা কোন্‌ পার্টির লোক বোঝাও যাচ্ছিল না, মুখ ঢাকা ছিল সবারই। আমাদের ঘুম থেকে তুলে বলে এই জায়গা ছেড়ে চলে যেতে নচেৎ ফল ভালো হবে না। প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি ওরা হিন্দু না মুসলিম। পরে জানতে পারি টিনা গুদাম আর দরমা লাইনের মুসলিম বাড়িগুলোই ওদের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বারুইপাড়ায় দু-তরফেরই ঘরবাড়ি লক্ষ করে আক্রমণ করা হয়। এতদিন আমরা এখানে বাস করছি, আমাদের কোনো সমস্যাই হয়নি। ১৪ তারিখ ভোট নিয়ে বোধ হয় খানিক গণ্ডগোল বাধে। আমরা সাধারণ মানুষ। কোনো ধরনের হিংসা মারামারিতে নেই। কিন্তু একথা ঠিক, যে বেছে বেছে শুধু মুসলিম বাড়িগুলোতেই আক্রমণ করা হয়।
    আমরা: ছোটোবেলায় এমন কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছে?
    তমন্না: এক দিনও না, আমি ৭ বছর বয়স থেকে এখানে আছি। আমার দাদুও বলে এমন হিংসাত্মক ঘটনা সম্পর্কে তাঁদেরও কোনো অভিজ্ঞতা নেই। রাজনীতি, রাজনৈতিক দাঙ্গা বরাবরই ছিল, কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এখনই চোখে পড়ছে। আমরা তো বেশ নিজেদের মধ্যে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া হইচই নিয়ে মেতে ছিলাম। আর এখন গিয়ে দেখুন, এখন একটা চায়ের চামচ অবধি পড়ে নেই।
    আমরা: হিন্দু প্রতিবেশীরা কথা বলছে?
    তমন্না: উপায় কী! আমাদের ওদের সাথে কথা বলতেই হবে।
    আমরা: তাদের কী বক্তব্য?
    তমন্না: তারা তো বলছে আমরা কিছু করিনি, আমরা কাউকে চিনি না, আমরা তখন ঘুমাচ্ছিলাম। ওরা সব বাইরের লোক, কী কথা বলব ওদের সাথে? কিন্তু আমার কথা হল, ওরা যদি সব বাড়িতেই আক্রমণ করত, তাহলে কিছু বলার ছিল না। বন্যা এলে ক্ষতি সবারই হয়। কিন্তু এখানে বেছে বেছে মুসলিমদের ওপরেই হামলা চালানো হল কেন?
    আমরা: যদি সব বাইরের লোকই হয়, ওরা মুসলিম বাড়ি আলাদা করে চিনল কীভাবে?
    তমন্না: সেটাই অবাক করার মতো ব্যাপার, আমাদের গলির ৩২ টা বাড়ি মুসলিমদের। আমাদের সামনের সারির বাড়িগুলো সব হিন্দুদের, টিনা গুদামেও একই অবস্থা। ওখানেও হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ই থাকে। এগুলো শ্রমিক বস্তি। আমাদের নিজের বাড়ি নয়। কিন্তু থাকতে থাকতে নিজেদের বাড়ির মতোই হয়ে গেছে।
    আমরা: মহিলাদের প্রতি কোনো দুর্ব্যবহার করা হয়েছে?
    তমন্না: না, ওরা আমাদের তক্ষুনি এলাকা ছেড়ে পালাতে হুমকি দেয়। ওরা শুধু আমাদের জিনিসপত্র নিয়েই ক্ষান্ত হয়েছে। একসময় এখানকার ঘরগুলো দরমার তৈরি ছিল। সাধারণত জুট মিলের লোকেরা থাকে, চার-পাঁচজন একই ঘরে। পরে গ্রাম থেকে লোকজন এসে এখানে থাকতে শুরু করলে লোকজন বাড়তে থাকে। এখন অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। কিছু কিছু বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনও দেখবেন। গ্যাস ওভেন, মোবাইল ফোন, সেলাই মেশিন তো ঘরে ঘরে। ওরা কিচ্ছু নিতে বাদ রাখেনি।
    আমরা: আপনি ওদের লুট করতে দেখেছেন?
    তমন্না: সেটা কী করে সম্ভব? আমরা তখন প্রাণভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছি। পালিয়ে এসে সবাই নয়াবাজারে ঠাঁই নিয়েছিলাম। এখন দাঙ্গার আঁচ এখানেও পৌঁছে গেছে।
    আমরা: পুলিশ স্টেশন যাননি?
    তমন্না: গেছিলাম, বলল এখন সব জায়গায়ই গোলাগুলি বোমাবাজি চলছ, এত সামলাবে কীভাবে। তার ওপর এও বলল যে ওদের অ্যাকশান নেওয়ার কোনো অর্ডার নেই।
    আমরা: লুটপাটের সময় কোনো স্লোগান শোনেননি?
    তমন্না: ওইদিন নয়, তবে আমরা আমাদের ভাঙা বাড়ির ছবি দেখেছি। সেখানে দেয়ালে স্লোগান লেখা আছে দেখলাম—হিন্দু স্লোগান।
    আমরা: আচমকাই তো আর এত বড়ো একটা গণ্ডগোল, দাঙ্গা হতে পারে না! সচেতন নাগরিক হিসেবে কোনোরকম চক্রান্তের আঁচ পেয়েছিলেন কি?
    তমন্না: আদৌ না। রাজনৈতিক দাঙ্গার সাথে আমরা পরিচিত। এখানে তৃণমূল মানে মুসলিম আর বিজেপি হিন্দু, এই বিভেদটা আগে ছিল না। এটা আমদানি করা হয়েছে। ওরা যে সাধারণ মানুষের ক্ষতি করতে পারে এটা আমরা আন্দাজ করতে পারিনি। আমরা ভেবেছিলাম এই দ্বন্দ্বটা হয়তো পার্টি স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
    আমরা: বড়োরা তৃণমূলের নেতাদের কিছু জানাননি?
    শাহবুদ্দিন: হ্যাঁ, আমরা আন্দাজ করেছিলাম ওরা সমস্যা করতে পারে। ওনারা সুরক্ষার ব্যবস্থাও করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু বস্তির ভিতর থেকেই যে সমস্যা আসতে পারে সেটা বোধ হয় ওঁরা বুঝে উঠতে পারেননি।
    তমন্না: আমরা তো সবাই হুমকির ভয়ে পালিয়ে আসি, তাই কিছু দেখতে পাইনি। কিন্তু একজন মা তার বাচ্ছাকে নিয়ে আটকে পড়ে, তারা সব দেখেছে।
    শাহবুদ্দিন: গতরাত্রে আমরা কিছু ফিসফাস শুনলাম, চতুর্দিক থেকে বোমার আওয়াজ পাচ্ছিলাম, রাত্তিরে মসজিদে মাথা গোঁজার কথা চলছিল। কেউ কেউ গেছিলও, তবে সকলে নয়। রমজান চলছিল তাই কিছু লোক সেহরি করতে ভোরবেলা বাড়ি চলে আসে। আজান পড়ার ডাক দেওয়া হয়েছিল।
    আমরা: আপনারা বাড়িতেই সেহরি করেছিলেন?
    তমন্না: হ্যাঁ, আমরা সবে শুতে গেছি। তখনই বীভৎস বোমাবাজি শুরু হয়ে যায়। আমরা এখনও ওখানে যেতে ভয় পাই।
    আমরা: বাড়ি কি এখন সিল করা?
    শাহবুদ্দিন: হ্যাঁ, কোম্পানি থেকে সিল করে গেছে। সারাই হবে শুনলাম। আমরা বাইরে থাকব, তবু ওখানে যাব না। কিন্তু আর সকলকে তো ঘরে ফিরতেই হবে, এটাই বাস্তব। আপাতত মসজিদে থাকলেও এজায়গা আর সুরক্ষিত নয়, ওরা মসজিদেও বোমা ফেলেছে।
    আমরা: হ্যাঁ, আমরা ছোটা মসজিদের ইমামের সাথে কথা বললাম।
    শাহবুদ্দিন: মসজিদেও আপনারা বোমার ছাপ পাবেন। এই শুক্রবারই তো পড়ল। এই নিয়ে তিনবার হল। সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও তারা উঠে যেতেই আবার পুরদমে বোমাবাজি শুরু হয়ে যায়। টিনা গুদামের কাছে তিনটে মসজিদ আছে বড়ো মসজিদ, ছোটা মসজিদ আর খুল্লা মসজিদ। ওরা খুল্লা মসজিদে তিন তিনবার বোমা ফেলেছে।
    আমরা: আপনারা পড়াশোনা কীভাবে চালাচ্ছেন? (শাহবুদ্দিনকে)
    শাহবুদ্দিন: আপাতত ক্লাসে যাওয়া বন্ধ, ছেলেরা তবু বাইরে থেকে চালিয়ে নিলেও মেয়েদের পক্ষে বেশ অসুবিধাজনক। কিন্তু কী করা যাবে! আগে তো জানে বাঁচতে হবে! আমরা যখন পুলিশের কাছি গিয়েছিলাম, তখন ওরা আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছিল, এখন অরাই ফিরে যেতে বলছে। এখন পাঁচজন পুলিশ মোতায়েন থাকলেও সে আর কত দিন! এই ভরসায় কি আমাদের পুরোনো এলাকায় ফেরা যায়? আমাদের সুরক্ষার গ্যারেন্টি কে নেবে?
    আমরা: আপনাদের প্রতিবেশী হিন্দুদের কী বক্তব্য?
    শাহবুদ্দিন: সারাইয়ের কাজ দেখতে গেছিলাম, কিছুজন বললেন ফিরে আসতে, ওরা বাইরের লোক ছিল, এমন কিছু আর হবে না, কিছুজন ওখানে বেশি জিনিসপত্র রাখতেও বারণ করলেন।
    আমরা: কেউ ভরসা দিল না?
    তমন্না: সবাই সমান নয়, কিছু লোক এই দুর্ঘটনা ঘটবার আগেই আমাদের সাবধান করেছিল। তবে একথা যেমন ঠিক যে ওরা আমাদের জিনিসপত্র বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি, তেমনই এও তো ঠিক যে ওদের মধ্যে অনেকেরই খারাপ লেগেছে। সবচেয়ে বড়ো কথা হল, আমরা আর ওখানে আগের মতো থাকব কী করে? বাইরে যেতে গেলে তো আমাদের ওদের এলাকা পেরিয়েই যেতে হবে।
    শাহবুদ্দিন: এখন নতুন সমস্যা দাঁড়িয়েছে কোম্পানি আমাদের কোয়ার্টার সিল করে দিচ্ছে।
    আমরা: কেন? এই বিপদের সময় ট্রেড ইউনিয়ন কী করছে?
    তমন্না: গোপাল রাউত হল সব সমস্যার মূল। মিলমালিকদের উনিই চালনা করেন। অর্জুন সিং ওনার গুরু। মমতাদিদি এসেছিল যখন তখন এই গোপাল রাউত আর তার পোষা গুন্ডারা জয় শ্রীরাম বলে চেঁচাচ্ছিল।
    শাহবুদ্দিন: রাজ্য সরকারের তরফে প্রতি পরিবার পিছু ৬৩০০ টাকা আমরা পেয়েছি। ওরা আমাদের কোয়ার্টার ঠিক করে দিলেছে। কিন্তু মিল কিছুই দেয়নি। প্রায় প্রতিটা পরিবারেরই কেউ না কেউ মিলে কাজ করে। যদিও বেছে বেছে কোয়ার্টার সিল করেছে।
    আমরা: ধর্মের ভিত্তিতে, তাই তো? মানে শুধু মুসলিমদের?
    শাহবুদ্দিন: হ্যাঁ, হয়তো আমরা আমার ঠাকুরদার কোয়ার্টার পেয়েছি বলে, কিংবা তমন্নার ভাই জুট মিলে কাজ করে, এখন গ্রামে চলে গেছে বলে—কিন্তু এগুলো তো কোনো কারণ হতে পারে না। তাই যদি হয়, তাহলে সকলের ক্ষেত্রেই তা-ই হওয়া উচিত। ৩২ টি মুসলিম কোয়ার্টারের মধ্যে এপর্যন্ত ১৫ টাই সিল করে দেওয়া হয়েছে।
    তমন্না: পার্টি, মিল সকলেই আমাদের মধ্যে ভেদাভেদ করছে। অথচ এই দাঙ্গার আগে আমরা এধরনের কোনো সমস্যার সম্মুখীন হইনি। এমনকি আমরা যে আলাদা—একথা মনেও আসেনি। এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে হিন্দুরা যদি আমাদের সঙ্গে কথা বলতে আসে তাহলে ওদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ওরাও ভয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে।
    শাহবুদ্দিন: আমাদের এখন বাড়ির দরকার, কতদিন এই মসজিদ আর আত্মীয়দের বাড়িতে থাকব?
    আমরা: ক-টা লাইন আছে এখানে? ১৪০০ পরিবার আছে সেটা জানি।
    শাহবুদ্দিন: প্রায় ৩০-৪০ টা লাইন হবে, প্রত্যেক লাইনে ৩০ বা ৫০ টা করে ঘর।
    আমরা: আক্রান্ত লাইন কোন্‌গুলো?
    শাহবুদ্দিন: ১৩ নম্বর, ৬ নম্বর, আমাদের ৪০ নম্বর, টিনা গুদাম, সর্দার গলি, সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ টার কাছাকাছি পরিবার ঘরছাড়া।
    আমরা: ভবিষ্যতের কোনো পদক্ষেপ?
    তমন্না: না, ইতিমধ্যে তিন মাস হয়ে গেছে আমরা ঘরছাড়া। কেউ একবারও এসে জিজ্ঞেস করেনি আমরা কেমন আছি। আমি চাকরির জন্য পড়ছিলাম। দাঙ্গাবাজের দল সব কিছু লুটপাট করে নিয়েছে, এমনকি আমার সব বইপত্র পুড়িয়ে দিয়েছে। আমরা এখন আছি নানির বাড়িতে। একটা জামা অবধি বোনের থেকে চেয়ে পরতে হচ্ছে (গায়ের জামাটা দেখায়)। গত ইদে মসজিদের জাকাত বাবদ ৩-৪ হাজার টাকা আমরা পেয়েছি। এখন দয়াভিক্ষা করে দিন গুজরান করতে হচ্ছে। আক্ষরিক অর্থেই আমরা পথে বসেছি। (কাঁদতে থাকে)

    দাঙ্গা পরবর্তী অবস্থান

    মে, ২০২০-তে দর্মা গলি পৌঁছে দেখলাম ওই ঘটনার পর পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। প্রায় দশ মাস আগে শেষ বার ভাটপাড়া এসেছিলাম। আসল জায়গাটা খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। বছর তিরিশের একজনকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, “মিয়াঁপাড়া যাবেন? ওরা তো আর ওখানে থাকে না, ওখান থেকে বের করে দিয়েছি, এমন বোমা ফেলেছি, প্রাণভয়ে পালিয়েছে।” আমরা জিজ্ঞেস করি, “আপনি কি বিজেপি কর্মী নাকি?” তার সরাসরি জবাব, “আগে ছিলাম, এখন তৃণমূল করি, ওরা আর বিজেপির হয়ে কাজ করতে দেয় না। কিন্তু মিয়াঁগুলোর ওপর এখনও রাগ আছে, যে পার্টিই করি না কেন, আমি হিন্দু!”

    এক বছর ধরে এলাকাভিত্তিক পরিদর্শন আর তথ্যানুসন্ধানের পর নতুন এটুকু জানা গেছে যে, দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বেড়েছে। যে-কোনো সময় যে-কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে দাঙ্গা বেধে যেতে পারে।

    মুসলমানরা নিষিদ্ধ

    এতদাঞ্চলের চটকলগুলিতে মুসলিম কর্মীদের কাজ পাওয়া যথেষ্ট অসুবিধাজনক হয়ে উঠেছে। বারবার যাতায়াতের ফলে বেশ কিছু মুসলিম যুবকের সঙ্গে আমাদের চেনাশোনা হয়ে যায়, তাদের সবারই কিছু না কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে এবিষয়ে।

    মেহতাব আলম (নাম পরিবর্তিত) ভাটপাড়া মিউনিসিপ্যালিটির ১৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা বললেন, “আমরা জানতে পারি কাঁকিনাড়া জুট মিলে কিছু পদ খালি আছে, অ্যাকাউন্টেনট, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর—যারা GST, TALLY জানবে এমন। আমরা যোগাযোগ করতে বলা হয় এমন কোনো চাকরির পদ ফাঁকা নেই। যদিও জানতে পারি যে ফাঁকা পদগুলিতে অ-মুসলিমদের নিয়োগ হয়ে গেছে। মিল্গুলির তরফ থেকে প্রকাশ্য কিছু ঘোষণা করা না হলেও ভিতরের সত্যিতা এটাই যে ওরা আর মুসলমানদের কাজে নেবে না ঠিক করেছে।

    ধর্ম ও রাজনীতির ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের পদক্ষেপ

    পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মাত্র ২৫,০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ বাবদ বরাদ্দ করা হয়েছিল। যদিও আমরা সাধারণ মানুষের থেকে সেই ত্রাণ, ক্ষতিপূরণ টাকা, চাকরি নিয়ে জাতিভিত্তিক অসম বণ্টনের কথা জানতে পারি। পুলিশের এনকাউন্টারে মৃত প্রভু সাউয়ের বিধবা স্ত্রী শ্যামলী সাউ কিছু পাননি (আমরা ‘আক্রান্তদের বয়ান’ অংশে তাঁর সেই কথোপকথন যোগ করেছি)।
    আক্রান্ত পরিবারগুলির জন্য যে চাকরি ঘোষণা করা হয়েছিল তার নিয়োগের ক্ষেত্রেও রয়েছে ধর্ম আর রাজনিতিত্র খেলা। অর্জুন সিং আর তার পুত্রের হিন্দুদের হয়ে সমর্থন মুদ্রার একপিঠ হলে অপর পিঠে আছে তৃণমূল এবং তাদের মুসলিম তোষণ। অর্জুন সিং তৃণমূল ছেড়ে এসে বিজেপিতে যোগ দিলে ভাটপাড়া মিউনিসিপ্যালিটি তাদের দখলে চলে আসে। মৃত রামবাবু সাউয়ের ভাইয়ের জন্য মিউনিসিপ্যালিটির অস্থায়ী কাজ, অন্যদিকে মহ. হালিমের বড়ো ছেলের জন্য রাজ্য সরকারের চাকরি তোষণের ছবিটা আরও স্পষ্ট করে দেয়।

    প্রধান প্রধান সমস্যা

    এখানকার মানুষজনকে প্রতি মুহূর্তে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, একটা দলবদ্ধ আলোচনার মাধ্যমে আমরা সেই সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করেছি। নীচে সেগুলির বিবরণ দেওয়া হল —
    বিদ্যালয়: লুটপাটের পর দেখা যায়, এলাকার শিশুদের শিক্ষাসামগ্রী আর অবশিষ্ট নেই। বই, পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে স্কুলের পোশাক সবই গেছে। প্রায় আট থেকে দশ মাস অনেক অভিভাবকরাই তাঁদের শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেননি। সামনে পরীক্ষা থাকায় এখন তারা আবার বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করেছে। কিছু কিছু সংস্থা ছাত্রছাত্রীদের জন্য বইখাতা ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা করছে। অধিকাংশ অভিভাবকরা বিদ্যালয়ের বেতন পর্যন্ত জোগাতে অপারগ। কিছু পরিবার ধার নিয়ে বিদ্যালয়ের বেতন ভরেছেন বলেও শোনা যায়।

    বিদ্যুৎ বিল: দশ মাসের প্রচুর বকেয়া হলেও, এলাকাবাসীর অনুরোধে সংযোগ কাটেনি বিদ্যুৎ পরিবাহক সংস্থা। কিন্তু বাকি থাকা টাকা কিস্তিতে শোধ করাটাও একটা বড়ো বাধা বইকি, যত দেরি তারা করবে, মাশুলের পরিমাণ ততই বাড়বে।

    এলপিজি বা জ্বালানি: লুঠতরাজের সময় প্রায় সব পরিবারই তাদের গ্যাস সিলিন্ডারগুলি হারায়। তাদের কারও পক্ষেই নতুন করে কানেকশান নেওয়া সাধ্যের অতীত। কুড়িয়ে-আনা কাঠ-পাতা জ্বালিয়ে আপাতত তাদের কাজ চলে যাচ্ছে। ঘিঞ্জি বস্তির মতো একটা জায়গায় এভাবে রান্না করা খুবই বিপদজনক। বলা নিষ্প্রয়োজন যে ৭০-৮০ টাকার কেরোসিন তাদের কাছে বাহুল্য ছাড়া আর কিছুই নয়।

    ক্ষতিপূরণ: দাঙ্গার ঠিক পরেই যেসমস্ত কথা প্রতিশ্রুতি হিসেবে বলা হয়েছিল তা কোনো ভাবেই পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি, ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসারের দপ্তরের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৫,০০০ টাকা পাওয়া গেলেও আক্রান্ত ২০০ পরিবারের মধ্যে প্রায় ১০০ টি পরিবার কিছুই পাননি, জরুরি দস্তাবেজ পেশ করার পরেও।
    শ্রী দেবাশিষ পালের কথায়, “কাঁকিনাড়া পুলিস এই বিষয়ে অনুসন্ধান খুবই দায়সারা ভাবে সেরেছে। যারা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন তাঁদেরকেও তার জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। যাঁরা বাকি আছেন তাঁরা আর পাবেন কি না আমার সন্দেহ আছে, তাঁদের বলা হয়েছে তাঁদের নাকি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রই নাকি নেই।”

    স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা: অর্থের বিনিময়েও সঠিক চিকিৎসা পাওয়া এখন দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি বিনামূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্প চালালেও সেকাজে তাদের প্রায় ২৫০০-৩০০০ টাকা লাগে। তহবিলে টান পড়ায় বিগত দু-এক মাসে কোনো ক্যাম্প হয়নি।

    অসহায়তা: গোপাল রাউতের মতো প্রভাবশালী নেতারা কীভাবে দাঙ্গা চালিয়েছেন সেটা সবাই দেখেছেন, স্বভাবতই এলাকাবাসী এখন কার ওপর নির্ভর করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। আগে গোপাল রাউত ছিলেন বিজেপিতে এখন যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। শোনা যায় তাঁর ওপরে চলা একাধিক কেস থেকে বাঁচবার জন্যই তাঁর এই পদক্ষেপ। এলাকাবাসীর পাশে এই মুহূর্তে কেউ নেই। তাঁরা কোনো সমস্যা নিয়ে গোপাল রাউতের কাছে গেলেও তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন। কৌশিক সেন, অপর্ণা সেনের মতো বিখ্যাত নাট্যব্যাক্তিত্ব, তিস্তা শীতলাবাদের মতো সমাজসেবীরা এসে দেখা করে গেলেও, তাদের নিজেদের কাউন্সিলর মাকসুদ আলম একবারও জানার চেষ্টাই করেনি এলাকাবাসীরা কেমন আছেন। তৃণমূল কেবল এলাকার মুসলিম ভোট কুক্ষিগত করার জন্যই মাকসুদ আলমকে মিউনিসিপ্যালিটির সহসভাপতির পদে আসীন রেখেছে। রাজ্যসরকারের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম একবার এসেছিলেন, সেই শেষ, আর কেউ ফিরে দেখবার প্রয়োজন বোধ করেনি।

    ভীতি: এলাকা ছেড়ে বেরোলেই তাদের অপমান করা হচ্ছে, এমনকি জল আনতে গেলেও। মুসলিম মহিলাদের ভয় দেখানো হচ্ছে “শেষবার জিনিসপত্র লুঠেছি এবার তোদের লুটব।” এমনকি শিশুদেরও ভয় দেখানো হচ্ছে “এবার তোদেরও মেরে ফেলব” বলে। এমনকি তারা বলছে, “দো হাজার উন্নিশ আধা ফিনিশ/দো হাজার বিশ পুরা ফিনিশ।” “আমরা যদিও কিছু বলিনি”—বিপরীত গোষ্ঠীর থেকে জানা যায়। পুলিশকে নিরাপত্তার কথা বলেও কোনো সুরাহা হয়নি এবিষয়ে, উলটে তাদেরই স্বাধীন ভাবে চলাফেরার পথে পুলিশ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোলির সময় ৯ এবং ১০ মার্চ দিনের বেলা শুধু তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হলেও রাতে কেউই ছিল না।

    উপকূলের উপকথা

    এই রিপোর্ট তৈরি করার পথে অনেক বাধা এসেছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে আমরা এইসব তথ্য পেয়েছি। তাঁদের নাম আমরা প্রকাশ করতে পারব না, কারণ তা অনৈতিক হবে। কিন্তু এই রিপোর্ট তৈরি করতে গিয়ে যে ইঙ্গিত আমরা পেয়েছি, তা যথেষ্ট উদ্‌বেগজনক। আমরা যা বুঝছি তার সারকথা হল—‘এখানে ধর্মীয় মেরুকরণ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে, যার ফলে যে-কোনো সময় আবার দাঙ্গা লাগতে পারে।’
    দাঙ্গা বাধিয়ে জমি অধিগ্রহণ: ভাটপাড়ার ৮ নং ওয়ার্ড শিল্পাঞ্চলের মধ্যে পড়ে, অতএব দাঙ্গা বাধিয়ে জমি অধিগ্রহণের কথা একেবারে নাকচ করে দেওয়া যায় না, ভাটপাড়া মিউনিসিপ্যালিটির দপ্তর, সদর থানা, বড়ো বাজার সবই আছে এখানে। এমনকি চটকলের কিছু কোয়ার্টারে বংশানুক্রমে থেকে আসছেন এমন লোকেরও দেখা মেলে। দাঙ্গা-পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মুসলিমদের থেকে সেসব জায়গা ফাঁকা করার জন্য কলমালিকদের হাত একেবারে অস্বীকার করার মতো নয়।
    তমন্না পারভিন এবং শাহবুদ্দিন মনসুরি এই কোয়ার্টার ফাঁকা করার বিষয়ে ভুক্তভোগী, তাদের কথা অনুযায়ী কলের মালিকরা বরাবরই হিন্দুত্ববাদীদের সমর্থক। মৃত মুস্তাক আলির পুত্র ইমতিয়াজের মুখ থেকে আর-একটা কথা শোনার পর সত্যিই ভয় লাগে, ‘মুসলিম মুক্ত ভাটপাড়া’ খুব শীঘ্রই বাস্তবায়িত হতে চলেছে।
    চটকল মালিক, গুন্ডাবাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলির দুষ্টচক্র: চটকল মালিকেরা সবসময় ক্ষমতায় আসীন রাজনৈতিক দলগুলির সমর্থক হবে তাতে কোনো সন্দেহই নেই, আর গুন্ডাবাহিনীর কাজ রাজনৈতিক দলগুলির অধিকার বজায় রাখা। ভাটপাড়া মানেই বুথ দখল আর বোমাবাজি। ট্রেড ইউনিয়নের একজন পুরোনো অভিজ্ঞ সদস্যের থেকে জানতে পারি, “পার্টিগুলো একে অপরকে সহ্য করতে না পারলেও, মিলমালিকদের অনুষ্ঠানে সব এক গেলাসের বন্ধু।” সাধারণ কর্মীদের প্রতি তাদের দুর্ব্যবহার ব্যবহার নতুন কিছু নয়, এমনকি মালিকপক্ষ বা ট্রেড ইউনিয়ন কেউই এর বিরোধিতা করে না। মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে প্রভিডেন্ড ফান্ড আর গ্রাচুইটির টাকা না দেওয়ার অভিযোগ বহুকালের। উলটে রাজনৈতিক দলগুলির তেলা মাথায় তেল দিয়ে সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রেখেছে মালিকপক্ষ, কবির ভাষায়—“দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে।”
    রাজনীতি ও হিন্দুত্ববাদে গুন্ডারাজের প্রভাব: ২০১৬ থেকে ২০২০ পর্যন্ত আমরা এই এলাকায় যে সমীক্ষা চালাই, তা থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য সামনে আসে। যেমন ২০১৬-তে নৈহাটির হাজিনগর এলাকায় যে দাঙ্গা বাধে তা থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি স্পষ্ট হয়—
    ১। সকালে তৃণমূল, রাতের আঁধারে হয় জামাতি নয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ।
    ২। জল যেমন ঢালের অভিমুখে গড়ায়, তেমনই রামনবমীর মিছিলের জল গড়ায় বিজেপির দরজায়।
    ৩। দাঙ্গাবাজ এবং আক্রান্তরা প্রত্যেকেই প্রাথমিক পর্যায়ে তৃণমূলী হলেও, পরবর্তী কালে হয়ে যায় মুসলিমরা তৃণমূল এবং হিন্দুরা বিজেপি।
    ৪। ব্যারাকপুর সাব ডিভিশনে গুন্ডা পুষে রাজনীতি নতুন কোনো বিষয় নয়। গুন্দাদের রাজনীতিতে আসা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক গুন্ডাগিরি—এ তো আমরা গত দশকেই দেখেছি, এখন সেই রাজনীতি আর গুন্ডাগিরিতেও ধর্মীয় মেরুকরণ লক্ষ করা যায়।

    অশেষ শেষকথা

    ভাটপাড়ায় ঘটে যাওয়া দাঙ্গাটি ঐতিহাসিক, বহুস্তরীয় এবং জটিল বিষয়, তাই এককথায় এর কোনো উপসঙ্ঘার টানা সম্ভব নয়। তবে এই দাঙ্গার নিম্নলিখিত দিকগুলির প্রতি আলোকপাত করা জরুরি–
    ১। ধর্মীয় আবেগ এখানে বহু বছর ধরেই শিকড় ছড়িয়েছে। দাঙ্গার ভয়াবহতা ও ধারাবাহিকতায় একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে স্থানীয় মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত দাঙ্গায় অংশ নেয়।
    ২। দাঙ্গাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু যে ভাটপাড়া আর কাঁকিনাড়া সে কথা বলা বাহুল্য। স্থানীয় মানুষজন সরাসরি আঙুল তুলেছে তৃণমূল ও বিজেপির দিকে। বিজেপির অর্জুন সিং এবং তৃণমূলের মদন মিত্রের কামারহাটির গুন্ডাবাহিনীর মধ্যেকার সংঘর্ষই এখানে দাঙ্গা লাগানোর কাজ করে।
    ৩। আলাপ-আলোচনা নয়, এই অঞ্চলের রাজনীতি বহুলাংশে নির্ভর করে অস্ত্র এবং গুন্ডাবাহিনীর ওপর। টিনা গুদামের মতো এলাকায় যেখানে হিন্দু মুসলিম দুই গোষ্ঠীরই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল, সেখানেও এই দাঙ্গাগুলি শেষপর্যন্ত সংখ্যাগুরু হিন্দু ভোটারদেরই সংগঠিত করে তোলে।
    ৪। সত্যি বলতে কি, দাঙ্গার কারণ নির্ণয় করা খুব মুশকিল, কারণ জনসাধারণের শৌচালয় থেকে শুরু করে স্নানাগার এমনকি কাজ করার জায়গা পর্যন্ত দুই গোষ্ঠী মিলেমিশে ব্যবহার করে। যতদূর বোঝা যায় যে, দীর্ঘকাল ধরে ধর্মীয় মেরুকরণ, গুণ্ডা পোষা রাজনীতি আর মিলমালিক আর ঠিকাদারদের দুর্নীতি আর গাফিলতি এবং দুঃসহ দারিদ্র্যই দাঙ্গার অন্যতম প্রধান কারণ।
    ৫। দীর্ঘদিন ধরে “হিন্দু খতরে মে হ্যাঁয়” এই একটা কথাটির মধ্য দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মনে এমন ভীতির সঞ্চার করানো হয়েছে যে আজ আর তারা প্রকাশ্যে তাদের মুসলিম-বিদ্বেষের কথা জানাতে দ্বিধা করে না। মুসলিমরা চপার রাখে, কুরবানি দেয়—এইসব ধারণা কিংবা লালা চৌধুরীর ছিন্নভিন্ন দেহের বর্ণনা দেওয়ার সময় ‘এ নিশ্চয়ই মুসলমানদের কাজ, ওরা তো কসাই’ এমন মন্তব্য থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
    ৬। এখনও অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়ে গেছে, যেমন, রাজেশ সাউ কেমন করে তার হাত হারালেন? মানুষজন তৃণমূলীদের হাত থেকে বাঁচতে জুটমিলে ঢুকলেন কেন? গুন্ডারা কি সত্যিই পুলিশের পোশাকে ছিল? এরকম আরও অনেক প্রশ্ন। এটা মেনে নিতেই হবে যে বছরের পর বছর সমীক্ষা চালিয়েও আমরা ভাটপাড়ার এই বহুস্তরীয় ও জটিল ঘটনার শুধু বাইরের মোড়কটুকুই উন্মোচিত করতে পেরেছি।

    ভাটপাড়া অনেকদিন ধরেই আমরা-র কর্মস্থল এবং যাবতীয় কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দুও বটে। আমরা বিভিন্ন পেশার মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ করি—উকিল, গবেষক, সমাজসেবী, মনোবিদ, বিভিন্ন পরিচিত ও খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী। তাঁদের থেকে এবিষয়ে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন সাহায্য পেয়েছি। বলা বাহুল্য যে, শান্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল আমাদের মূল উদ্দেশ্য, এবং তা করতে গিয়ে এই ঘটনার আইনগত দিকগুলিও আমাদের নজরে আসে। আমাদের মনে হয় কোলকাতা প্রধান বিচারালয়ের একজন বিচারপতিকে নিয়ে একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা হোক যাঁরা এই দাঙ্গার বিষয় ও কারণ সম্পর্কে অনুসন্ধান করবেন। স্থানীয় প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত অফিসারদের উৎসাহ জোগানো উচিত, যাতে তাঁরা যাবতীয় বেআইনি পদক্ষেপগুলি নথিভুক্ত করেন। আরও বেশি এফআইআর দরকার, যাতে একটি নিরপেক্ষ সংস্থা আইনানুগ ভাবে এইসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পারে। এলাকায় উদ্‌বেগ কমাতে সাম্প্রদায়িক ভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলিতে, বিশেষত যেখানে সংখ্যালঘুদের বাস, চব্বিশ ঘণ্টার জন্য পুলিশি টহলদারির ব্যবস্থা করতে হবে। সমগ্র ভাটপাড়া জুড়ে খানাতল্লাশি চালিয়ে যাবতীয় বেআইনি অস্ত্রশস্ত্র ও বিস্ফোরক পদার্থ আটক করা উচিত।


    দাঙ্গাবিধ্বস্ত অঞ্চল সমীক্ষা ৮
    পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সংঘাত
    ভাটপাড়া সত্যানুসন্ধান
    প্রকাশের তারিখ – ১৫ জুলাই, ২০২০
    দলের সদস্য–
    সুস্মিতা রায়চৌধুরী, শমীন্দ্র সরকার, তুতুন মুখার্জি, মোহিত রণদীপ, ফারুক উল ইসলাম, শুভপ্রতিম রায়চৌধুরী, সুমন নাথ, অমিতাভ সেনগুপ্ত, আকাশ ভট্টাচার্য, প্রমোদ গুপ্তা, দেবাশিস পাল, সন্দীপ সিনহা রায়, বিজয় রজক
    চিত্রগ্রহণ: ফারুক উল ইসলাম এবং সুমন নাথ
    সম্পাদনা: সুমন নাথ এবং শুভপ্রতিম রায়চৌধুরী
    প্রকাশনা: মোহিত রণদীপ
    আমরা, এক সচেতন প্রয়াস ফোরাম (AAMRA—An Assemblage of Movement Research and Appraisal)
    ৪১/১, এন সি ব্যানার্জি রোড , হুগলি – ৭১২২২২, পশ্চিমবঙ্গ , ভারতবর্ষ
    ফোন নং- ৮৬৯৭০৯৫৭৭৬, ৯৪৩৩৮৭৯১৫৮, ৮৮২০৮৫২০৫৪
    Email: [email protected]
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩৩৪ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত