• বুলবুলভাজা  আলোচনা  পরিবেশ

  • সুন্দরবন সংলাপ : তৃতীয় পর্ব

    আমরা এক সচেতন প্রয়াস
    আলোচনা | পরিবেশ | ৩০ আগস্ট ২০২১ | ৬৩৫ বার পঠিত
  • সুন্দরবন ডেল্টা আজ অস্তিত্বের সঙ্কটের মুখে। একদিকে গোটা সুন্দরবন ভূমিরূপ গঠনের দিক দিয়ে যেমন নবীন, অন্যদিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে তীব্র হচ্ছে সংলগ্ন জনবসতির ‘ক্লাইমেট রিফিউজি’ হওয়ার সম্ভাবনা। বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে একদিকে যেমন বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা। একই সঙ্গে তীব্র হয়ে উঠছে বাড়তে থাকা জনবসতির বেঁচে থাকার আর্তি। পরিবেশবিদ ও ভুতাত্ত্বিকেরা সুদুরপ্রসারি দৃষ্টি দিয়ে বাঁচাতে চাইছেন গোটা প্রকৃতি। আর স্থানীয় মানুষ চাইছেন বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আশু উন্নয়ন। গণদাবী হয়ে উঠছে কংক্রিট বাঁধ। ফলে, ‘বনাম’ হয়ে মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে 'উন্নয়ন’ আর ‘নিসর্গ’। ‘বনাম’ হয়ে মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে ‘কংক্রিট বাঁধ’ আর ‘মাটির বাঁধ’। ‘আমরা এক সচেতন প্রয়াস’ দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে ‘সংঘর্ষ ও সহবস্থান’ নিয়ে সমীক্ষা ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। আয়লা, আম্ফান ও ইয়াস পরবর্তী ‘উন্নয়ন বনাম নিসর্গ’র এই আলোচনায় অভিনিবেশও তার কাছে আজ সময়ের দাবি। ‘আমরা’ একটি পরিসর তৈরি করতে চাইছে যেখানে বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, ভূ-তত্ত্ববিদ, সামাজিক আন্দোলনকর্মী থেকে সাধারণ মানুষও তার মতামত রাখতে পারেন। এটি ধারাবাহিকভাবে সুন্দরবনের সংকটের নানা আঙ্গিক ও সমাধান সুত্রের সামগ্রিক পর্যালোচনার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। গত ১লা জুন থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক আলোচনার তৃতীয় পর্বের বিষয় ‘সুন্দরবনের ভূত-ভবিষ্যৎ: পরিকল্পনা ও ব্যর্থতা’।


    সুন্দরবনের ভূত-ভবিষ্যত : পরিকল্পনা ও ব্যর্থতা

    আপনারা জানেন যে ‘আমরা এক সচেতন প্রয়াস’ মূলত ফিল্ড রিসার্চ গ্রুপ। দীর্ঘ এক দশক ধরে সহবস্থান ও সংঘর্ষের উপর আমরা এক ধরণের গবেষণা মূলক কাজ করে আসছি। সাম্প্রতিক কিছু ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক ঘটনা – এই সবের উপর আমাদের কিছু রিসার্চ ওয়ার্ক রয়েছে, যেগুলো আমরা আমাদের ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশ করে আসছি। আমাদের একটা প্রকাশনী সংস্থা রয়েছে যেখান থেকে আমরা রিপোর্ট আকারে বই বা পত্রিকা প্রকাশ করে থাকি।

    সাম্প্রতিক কালে সামাজিক মাধ্যম সহ বিভিন্ন মিডিয়া বা আমাদের আলোচনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাবে উঠে আসতে দেখেছি ইয়াস-পরবর্তী সুন্দরবনের বিপর্যয়। আসলে যে সুন্দরবন সারা পৃথিবীর কাছে বিখ্যাত তার বায়ো-ডাইভার্সির্টি আর বায়ো-স্ফিয়ারের জন্য, সেই সুন্দরবন ছিল বাঙালির কাছে নেহাতই একটা রোমাঞ্চে ভরা নদী বা বনবিবি আর জঙ্গলের দ্বীপসমূহ হিসাবে। আয়লা-পরবর্তী সময়ে আমরা সাধারণ মানুষ যেভাবে সুন্দরবনকে জানতে পেরেছি, সেটি একটু অন্যরকম। আমরা বুঝতে পারছি বা বুঝতে শিখেছি আস্তে আস্তে, যে সুন্দরবন কিন্তু আসলেই এসময় একটি সংকটের মুখে। তাই সুন্দরবনের সংকটের উত্তরণ নিয়ে আমরা সচেতন মানুষ-মাত্রই বিভিন্ন ভাবে চিন্তা করছি, মত প্রকাশ করছি। মত প্রকাশ করছি বিভিন্ন মাধ্যমে, নানা মত এবং অমত, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেগুলো পরস্পরবিরোধীও হয়ে উঠছে। তাই আমরা একটা পরিসর তৈরি করতে চেয়েছি যেখানে বিভিন্ন মতামত সমন্বয় গড়ে উঠতে পারে এবং আরো বেশি গঠনমূলক হয়ে উঠতে পারে।

    সুন্দরবনের উন্নয়ন বা প্রকৃতির ব্যাপারে সচেতন বা সংশ্লিষ্ট ভূতাত্ত্বিক থেকে শুরু করে পরিবেশবিদ সমাজকর্মী এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষ – যাদের স্থানিক জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা কম্পার্টমেন্টালাইজ বিশেষজ্ঞতার বাইরে আরেকটা ওয়াইডার অ্যাঙ্গেল থেকে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে চেয়েছি। আমরা পুরো আলোচনাটাই ডকুমেন্ট হিসেবে রাখতে চাই – যা পরবর্তীকালে সরকার বা অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন – যারা এটা নিয়ে কাজ করছে, তাদের নীতি নির্ধারণে সাহায্য করতে পারে।

    এ বিষয়ে আমরা পূর্ববর্তী যে দু’টো পর্ব চালিয়েছি, তার সারমর্ম তুলে দিতে চাইছি – আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি – সুন্দরবন একটা বেসিনের মত – যেখানে সমুদ্রের জল সমতলভূমি থেকে একটু উঁচুতে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের প্রায় সাত হাজার বছরের পুরনো এই ডেল্টায় প্রায় 157 টির বেশি দ্বীপ আছে এবং এর এক-তৃতীয়াংশ এখন মানুষের বাস। ঔপনিবেশিক সময় থেকে, অর্থাৎ 1773 সালের পরে, এখানে জনবসতি স্থাপন শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছিল একটা আনস্টেবল ভূমির উপর একটা স্টেবল রাজস্ব আদায়ের জন্য। স্বাধীনতার পরে, সত্তর দশকের কাছাকাছি এসে, আমরা বুঝতে পেরেছি – কোথাও একটা ত্রুটি থেকে গেছে। সারা বিশ্বে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর সঙ্গে সমুদ্রের উচ্চতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ দিন দিন আরও অনিশ্চিত হতে শুরু হয়েছে। জলতল প্রায় ২ মিলিমিটার বাড়ছে প্রতিদিনে। জলের তাপমাত্রা অলরেডি বেড়ে গেছে প্রায় 1.7 ডিগ্রী সেলসিয়াস। ফলে ঝড়-ঝঞ্ঝার মত, সাইক্লোনের মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোরও তীব্রতা ও ফ্রিকোয়েন্সি একই সাথে দিন দিন বাড়তে শুরু করেছে। কিছু দ্বীপ অলরেডি জলের তলায় তলিয়ে গেছে এবং মৌসুমী দ্বীপ সহ আরো কিছু দ্বীপ নিয়ে লোক আশঙ্কা করছে, যে আগামী দশ পনেরো বছরের মধ্যে সেগুলো জলের তলায় তলিয়ে যাবে।

    এখন ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু ততক্ষণে এখানে জনসংখ্যা প্রায় 50 লাখ এর কাছাকাছি ছাড়িয়ে গেছে। তাদের জীবন-জীবিকা সবকিছু জড়িয়ে গেছে সুন্দরবনের নদী মাটি পরিবেশের সঙ্গে। তাহলে সমাধান-সূত্র কী? আমাদের প্রথম পর্বের শিরোনামে যেটা ছিল ‘সুন্দরবনের স্থায়ী সমাধানে মাটির বাঁধ না কংক্রিটের বাঁধ?’ প্রথম পর্বে আমাদের সঙ্গে ছিলেন ডঃ অমিতাভ চৌধুরী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ অমিতেশ মুখার্জি। ডঃ অমিতাভ চৌধুরীর, পেশায় চিকিৎসক হওয়ার সূত্রে, সুন্দরবনের জনজীবনের সঙ্গে একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি যেগুলো বলেছিলেন, সেগুলো বেশ প্রণিধানযোগ্য। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর মধ্যে যে ভৌগোলিক কারণগুলো আছে – সেইগুলো ছাড়া তিনি কিছু সামাজিক খামতি বা চ্যুতি দেখেছেন। তিনি মনে করেন, একসময় সুন্দরবন ছিল সুন্দরবন বাসিন্দাদের নিজস্ব। তার বনবিবি ছিল, তার নিজস্ব সংস্কৃতি ছিল, তার বাদা-বন ছিল, তার ছিল কাঠ-মধু, সবমিলিয়ে জঙ্গলের উপর তার নিজস্ব অধিকার ছিল। ফলে জঙ্গল রক্ষার যে তাগিদ ছিল, তা ছিল অনেক বেশি ঐকান্তিক। কিন্তু গত চল্লিশ বছরে সেই তাগিদটা ক্রমশ অন্য চেহারা নিয়েছে, কেননা তাদেরকে বাইরে থেকে বিভিন্ন ভাবে খণ্ডিত করার ও আন্ডারমাইন করার প্রক্রিয়া চলেছে বলে তিনি মনে করেন।

    এখন সুন্দরবন চাল বণ্টন দপ্তরের হয়েছে, ব্যবসায়ী কল্যাণ দপ্তরের হয়েছে, 100 দিনের কাজের প্রকল্প হয়েছে – বিভিন্ন ভাবে সেটা খন্ডিত হয়ে গেছে। সুতরাং সুন্দরবনের যে সামাজিক ঐক্য, সেটা আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। সুন্দরবনের মানুষ সিপিএম-কংগ্রেস-টিএমসি, হিন্দু-মুসলমানে ভেঙে টুকরো হয়েছে। তারা বিভিন্ন রকম জীবিকার দায়ে, পেশায় – কেউ ভেড়ি ব্যবসায়, কেউ পরিযায়ী শ্রমিক – এইভাবে আস্তে আস্তে টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেছে। ফলে তাদের অতীত কৌমজীবনও অস্ত গেছে। তিনি সুন্দরবনের উন্নয়নে, আলাদা জেলা ও তার স্বায়ত্ত-শাসনের প্রয়োজনীয়তার পক্ষেও কিছু কথা বলেছেন।

    2010-এ ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের যে রিপোর্ট বেরিয়েছিল, তাতে সুন্দরবনের জনবসতিকে ভায়েবল বলে দেখান হয়নি। এই ভুখণ্ড ও তার বাসিন্দারা অনিশ্চিত এবং তার ভবিষ্যতও অনিশ্চিত, সুতরাং এখানে কোন ডেভেলপমেন্টকে ভায়েবল বলে তারা মনে করেনি। তারা রিট্রিট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে পুরো সুন্দরবন অধিবাসীকে, তার জনবসতিকে অন্য জায়গায় প্রতিস্থাপনের কথা বলেছেন। কিন্তু তার মডেল কি হবে? এই ব্যাপারে স্পষ্ট কোনও নির্দেশ এখনও সেভাবে পাওয়া যায়নি।

    ডঃ অমিতেশ মুখার্জি আমাদের সঙ্গে ছিলেন আলোচনায়। তিনি বলেছিলেন, প্রথমত সুন্দরবনের স্থায়ী সমাধানে মাটির বাঁধ বনাম কংক্রিটের বাঁধ বিতর্ককে তিনি অবান্তর মনে করেন। সুন্দরবনের প্রায় সাড়ে চার হাজার বাঁধের প্রায় 90 শতাংশ মাটির বাঁধ এবং সেই মাটির বাঁধ ভুখণ্ডকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে তিনি কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে কংক্রিট বাঁধের পক্ষেও সওয়াল করেছেন। তিনি মনে করেন, যে কংক্রিটের বাঁধ মানেই যে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান তা নয়। তার কারণ নদীর একটা নিজস্ব গতিপথ আছে, সেই গতিপথ মানুষের বাঁধ-ভাবনা নিরপেক্ষ, বাঁধের অবস্ট্রাকশনকে সে মানতে চায় না। ফলে ভাঁটার সময় নদীর জলতলের যে উচ্চতা থাকে, সেটা বাঁধগুলোর যে বেস – তার কাছাকাছি চলে আসে। ফলে খাত বরাবর তার নিজস্ব স্রোত আর বাতাসের যে স্বাভাবিক প্রবাহ – সব মিলিয়ে একটা ভূমিক্ষয় প্রতিদিন নীরবে চলতে থাকে, কিন্তু প্রতিদিনের এই আটপৌরে ঘটনা আমাদের তেমনভাবে চোখে পড়ে না। একটা সময় কিন্তু পুরো কংক্রিট বাঁধও এতে করে ভেঙে পড়বে এবং এই ভেঙে পড়া বাঁধটা নদীর গর্ভে জমা হবে – নদীর গর্ভে জমা হলে নদী তার নাব্যতা হারাবে – নদীর নাব্যতা হারালে জলোচ্ছ্বাসের সম্ভাবনা আস্তে আস্তে বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা করেছেন। রিট্রিট ম্যানেজমেন্টের প্রসঙ্গে সুন্দরবনের জল ও স্থলের বৈপরীত্য যে ভাবা হচ্ছে, সেভাবে ভাবা উচিত হবে না বলেই তিনি মনে করেন। সুন্দরবন-বাসীর জীবনে জল এবং স্থলের আলাদা ডায়নামিক্স আছে, জীবন-জীবিকার প্রশ্নে তাকে জল থেকে ডাঙায় তুললেই যে সুবিচার করা হয় – এমনটা তিনি মনে করেন না। তিনি এ-ও মনে করেন না, যে শুধু আরবান অ্যাসপিরেশনের প্রভাব দিয়েই এটা ভাবলে চলবে। তিনি মনে করেন, একজন মানুষের জীবনে কম্প্লেক্সিটি ইস্যুজ এবং ডাইভার্সিটি ইস্যুজ আছে সেটাকে মাথায় রাখতে হবে। সেটা মাথায় রেখে আমাদের নীতি-নির্ধারণ করতে হবে। যেহেতু জীবনের ক্ষেত্রে একজন মানুষকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন রূপে রোল-প্লে করতে হয় এবং সেই রোলটা অনেক সময় আপাতভাবে মনে হয় পরস্পর-বিরোধী কিন্তু এটা আসলে তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এবং কোনোটাকেই অস্বীকার করা যায় না। তিনি মনে করেন যে নদীর সর্পিল যে স্বাভাবিক গতিপথ আছে, সেই স্বাভাবিক গতিপথে কিছু কিছু জায়গায় যেমন ভূমিক্ষয় হয় তেমন ভূমি গঠনও হয়ে থাকে। সুতরাং ভূমিক্ষয়ে উচ্ছেদ হওয়া মানুষের জন্য নতুন গঠিত জমির উপরে তার অধিকার থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন। এইজন্য তিনি প্রশাসনিক যে ইন্টার ডিপার্টমেন্টাল কো-অপারেশন সেটাকে আরও মজবুত হওয়ার কথা বলেছেন।

    আমাদের দ্বিতীয় পর্বের শিরোনাম ছিল, “যুক্তি, প্রযুক্তি ও লোকজবিদ্যা”। এ প্রসঙ্গে সুন্দরবনের ভূমিপুত্র এবং কর্মসূত্রে নদী বাঁধ নিয়ে কাজ করেছেন এমন একজন ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর সুজিত কুমার মন্ডল। তিনিও মাটির বাঁধ এর পক্ষে সওয়াল করেছেন। কিছু কিছু কংক্রিটের বাঁধের প্রয়োজন তিনি স্বীকার করেছেন এবং বাঁধরক্ষার বিষয়ে তিনি হারিয়ে যাওয়া বেলদারি প্রথাকে ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন। আগে বেলদারি প্রথা সুন্দরবনের দেখা যেত, সারা বছর ধরে বাঁধরক্ষার কাজ চলতো কিন্তু নব্বইয়ের দশকে বেলদারি প্রথাটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলে তিনি বলেছেন। আমাদের সঙ্গে সে আলোচনায় আরো কিছু স্থানীয় মানুষ ছিলেন যারা মনে করেন, বেলদারি প্রথায় যেভাবে বাঁধ সংরক্ষণ করা হতো, যেভাবে ঝাঁকা দিয়ে মাটি ফেলা হত বাঁধে, তাতে শক্ত হতে পারত বাঁধ। এখন যে পদ্ধতিতে জেসিবি দিয়ে মাটি ফেলা হয় সেটা যথেষ্টভাবে শক্ত হয়না, ফলে বাঁধও তেমন মজবুত হয় না। স্থানীয় মানুষ কিন্তু বেলদারি প্রথার পক্ষে কথা বলেছেন যে, বেলদারি প্রথা যদি ফিরে আসে তাহলে সেখানে জীবন-জীবিকারও কিছুটা সুরাহা হতে পারে। যে হাজার হাজার কোটি টাকা বাঁধ-সুরক্ষার নামে ব্যয় করা হচ্ছে সেটা যদি সুন্দরবনের নিজস্ব শ্রমিকদের পিছনে খরচ করা হতো তাহলে সেটা জীবন-জীবিকার প্রশ্নে কিছুটা ভালো হত।

    সরকার এখন সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ এবং বিশেষ প্রজাতির ঘাস রোপণের কথা বলছে। সেক্ষেত্রেও সুজিতবাবু কিছু কথা বলেছেন, যে আসলে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ স্বাভাবিকভাবেই হয়, এর জন্য আলাদাভাবে রোপন বা তার রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয় না, সেখানে নিজস্ব যে ধানিঘাস এবং যদু পালং বলে যে ঘাস আছে সেইগুলো বরং রক্ষা করার কথা বলেছেন। কারণ সেইগুলোকে ভূমিক্ষয় রোধে যথেষ্ট বলেই তিনি মনে করেন এবং তিনি রিংবাঁধ এর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন।

    আমাদের সঙ্গে সেদিন ছিলেন অখিল মিত্র, তিনি লোকজবিদ্যার উপর চর্চা করেন। তিনি বলেছিলেন যে লোকজবিদ্যাকে সমমর্যাদায় গুরুত্ব দেওয়ার দরকার আছে এবং স্থানীয় মানুষদের যে প্রথাগত জ্ঞান সেটাকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেছেন।
    আজকে আমাদের আলোচনার শিরোনাম আমরা রেখেছি, “সুন্দরবনের ভূত-ভবিষ্যৎ : পরিকল্পনা ও ব্যর্থতা”। এ জন্য আমাদের কাছে আজকে আছেন নদী বিশেষজ্ঞ সুপ্রতিম কর্মকার এবং পরিবেশবিদ ডঃ অমিতাভ আইচ। আজকে তারাই বলবেন তাদের মূল্যবান কথাগুলো। আজকে পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করবেন ডঃ অমিতাভ সেনগুপ্ত।

    ডঃ অমিতাভ সেনগুপ্ত: আজকে আমাদের সঙ্গে আছেন নদী বিশেষজ্ঞ সুপ্রতিম কর্মকার ও অধ্যাপক ডঃ অমিতাভ আইচ। সুপ্রতিমবাবু আজকের প্রজন্মের একজন অত্যন্ত সুলেখক ও প্রথম সারির নদী গবেষক। তার লেখা আপনারা অনেকেই নিয়মিত পড়ে থাকেন। সুন্দরবনের ব্যাপারে তিনি সত্যিই কথা বলার যোগ্যতা ও গভীরতা রাখেন। সুপ্রতিম আমার বন্ধু। একটি নদী আন্দোলনের সূত্রে আমি তার সঙ্গে পরিচিত হই। তারপর থেকেই তার লেখার আমি ফ্যান হয়ে গেছি। ডঃ অমিতাভ আইচ সম্পর্কে ছোট করে বলতে গেলে, ইয়াস পরবর্তী সময় এবং তার আগেও সুন্দরবন, পরিবেশ, ম্যানগ্রোভ ফরেস্টশন এবং নদী বাঁধ নিয়ে ডক্টর আইচ কিছু কথা অপ্রিয় হলেও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বিজ্ঞানসম্মত ভাবে বলে চলেছেন। অন্তত আমি সাম্প্রতিক অতীতে অন্য কাউকে এত বিজ্ঞানসম্মতভাবে এত স্পষ্ট করে কাউকে বলতে শুনিনি।


    সুপ্রতিম কর্মকার: আমরা এক সচেতন প্রয়াসকে ধন্যবাদ যারা এমন একটা উদ্যোগ নিতে পেরেছেন। দীর্ঘ 16 বছর শুধুমাত্র নদী নিয়ে সামান্য কাজ করতে গিয়ে দেখেছি যে, আগে সাধারণ মানুষ পরিবেশ সচেতনতার ব্যাপার একটু দূরেই ছিল। কিন্তু এখন একটি সুন্দর ভাবনার জন্ম নিয়েছে। এখন বহু মানুষ পরিবেশে সম্পর্কে বেশ আগ্রহী হয়েছেন। সবাই সবটা জানেন তেমনটি তো নয়; তবু আমি যতটা বুঝেছি সেটাই একটু সহজ করে বলার চেষ্টা করছি। আগের পর্বগুলিতে অনেক পন্ডিত মানুষ বলে গেছেন। সেখানে প্রায় সবকিছুই চলে এসেছে। নতুন কিছু বলার জায়গা তেমন নেই। তবু একটা জিনিসকে উল্টা দেখলে পাল্টে যায়। আমার সেই পাল্টে যাওয়াকেই একটু বোঝার চেষ্টা করব। আজকে আমি বলার জন্য যে বিষয়টাকে চিহ্নিত করেছি সেটা হল: “বিপন্ন সুন্দরবন : বেঁচে ওঠার টুকরো ভাবনা”। ছোট ছোট টুকরো ভাবনাকে যদি একসাথে জড়ে দেওয়া যায় তবে একটা বৃহৎ ভাবনার জন্ম নেয়। তাই এই ছোট ছোট টুকরো ভাবনাকে আমরা জুড়ে দিতে চাইছি - আমরা এক সচেতন প্রয়াস এর মধ্য দিয়ে। এখন প্রশ্নটা হল সুন্দরবন কেন বিপন্ন? সহজ কথা সহজ করে বলতে গেলে সুন্দরবন বিপন্ন কারণ প্রকৃতি বিপন্ন। এবার প্রশ্ন হল কেন প্রকৃতি বিপন্ন? এই প্রশ্নই আজ লক্ষ টাকার সমান। এই বিপন্নতা কে বুঝতে গেলে যা বলতে হয় তা হল, আগে বুঝতে হবে যে এই পৃথিবীটা একটা নীল চাদরে মোড়া। সে চাদর হলো বাতাসের চাদর। সে বাতাসে একটা বিষ় গ্যাস থাকে। সেই বিষ গ্যাসের নাম হল কার্বন-ডাই-অক্সাইড। এই কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ যদি বাড়ে তবে পৃথিবীর কষ্ট হয়। পৃথিবীর গায়ে জ্বর আসে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যায়। পৃথিবীর মানুষের মত একটা জীবিত সত্তা আছে। এই সত্তাতে সে কষ্ট পায়। এবং এই কষ্ট তার সমস্ত উপাদান - তার মাটি, তার জল, তার বাতাস - সবকিছুর উপর পড়ে। Intergovernmental Panel on Climate Change সংস্থাটি আমাদের খুব সচেতন করে দেয়। তারা চোখে আঙুল দিয়ে বলে পৃথিবীর এই অংশে এই কারণে ক্ষতি হচ্ছে। তাঁরা দেখিয়েছিলেন, এই পৃথিবীতে বর্তমানে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ হল 410 পার্টস পার মিলিয়ন (পি পি এম)। এই মাত্রা বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড এর স্বাভাবিক মাত্রা থেকে অনেকগুণ বেশি। ফলে যখনই বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বা গ্রিন হাউজের পরিমাণ বাড়লো এই পৃথিবীর বিপন্ন হল। জ্বর আসল তার শরীরে । উষ্ণ হয়ে উঠল। তাঁরা সতর্ক করলেন এই কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা 2017 সালে যা ছিল তাতে আমাদের 49 শতাংশ কমাতে হবে। 2030 সালের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা 0.5 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডও যদি বাড়ে তাহলে তা বাস্তুতন্ত্রকে প্রবল ভাবে আঘাত করবে। আসলে বাস্তুতন্ত্র বলতে আমাদের বা মানুষকে কেন্দ্র করে বা আবৃত করে যা কিছু রয়েছে চারিপাশে তাই হল বাস্তুতন্ত্র। অর্থাৎ পুরো সিস্টেম বা সামগ্রিক বিষয়টা দিয়ে আমাদের যাপিত জীবনের ধারাপাত রচনা করতে হবে। পৃথিবীর শরীরের তাপমাত্রা বাড়াকেই আমরা বিজ্ঞানের ভাষায় বলছি বিশ্ব উষ্ণায়ন। এবং এই বিশ্ব উষ্ণায়নের ভয়ংকর পরিণাম তৈরি করবে। এটির একটা বড় প্রভাব পড়ছে আমাদের সমুদ্রের উপর। পৃথিবী তার একটা বড় অংশকে ঢেকে রেখেছে জল দিয়ে। সে জল থাকে সাত সমুদ্রে। সেই সমুদ্রের উপর তার একটা বড় প্রভাব পড়ল। কি রকম প্রভাব পড়ল? বিপন্নতার ছাপ পড়ল সুন্দরবনের উপর। সাইক্লোন ধেয়ে আসল সুন্দরবনের উপর। পাল্টে দিল সুন্দরবনের মুখ। একটু পিছনে তাকালেই আমরা দেখবো ধেয়ে আসা 20টি সাইক্লোনকে। ১) অক্টোবর 1999 সুপার সাইক্লোন ২) অক্টোবর 2000 সাইক্লোন ৩) মে 2003 সুপার সাইক্লোন ৪) মে 2004 সাইক্লোন ৫) অক্টোবর 2005 সুপার সাইক্লোন ৬) এপ্রিল 2006 সুপার সাইক্লোন। এছাড়াও 2007 সালে তিনটি, 2008 সালে দুটি, 2009 সালে আয়লা, 2010 সালে গিরি, 2013 সালে ফাইলিন, 2015 সালে কোমেন, 2018 সালে তিতিলি, 2019 সালে ফনি, 2020 সালে আম্ফান, 2021 ইয়াস। এই এতগুলো ঝড় – তাদের শরীরে যে খিদে ছিল, তা সহ্য করেছে সুন্দরবনকে খুবলে খেয়ে। আমরা দেখতে পাচ্ছি - প্রথমে নিম্নচাপের সৃষ্টি হচ্ছে। পরে যত সে উপকূলবর্তী এলাকায় পৌঁছাচ্ছে, তত সে সাইক্লোন থেকে সুপার সাইক্লোনে পরিণত হচ্ছে। শক্তি বাড়াচ্ছে। প্রবল গতিতে আছড়ে পড়ছে ভূমিভাগে। এমন কেন? এটা নিয়ে যে খুব বেশি গবেষণা হয়েছে তা নয়। কিন্তু ছোট ছোট কিছু জিনিস জুড়ে দিয়ে আমরা একটা উত্তর পেতে পারি। একটা ছোট্ট উত্তর হল, দেখা গেল, যখন উষ্ণায়ন হল পৃথিবীতে, বঙ্গোপসাগরের জলস্তরের উষ্ণতা বেড়ে গেল – কোথাও কোথাও প্রায় 28 থেকে 29 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। এটাই তো স্বাভাবিক ছিল না। এবং যেটা উল্লেখযোগ্য সেটা হল এই প্রবণতাটা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আরবসাগরের ক্ষেত্রে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় এক মাস। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের ক্ষেত্রে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে তার তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তার একটা কারণ হল আমাদের গঙ্গা এবং তার বয়ে আনা জল। কারেন্ট সায়েন্স 2006 সালের জানুয়ারি মাসে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। সেই গবেষণাপত্রে তারা দেখায়, যে গঙ্গা বঙ্গোপসাগরে পড়ার পর প্রায় 100 কিলোমিটার ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সাইক্লোন এই অঞ্চলে এসে তার শক্তি অনেক বেশি বাড়িয়ে ফেলে। গঙ্গার জল যেহেতু সাগরের জল অপেক্ষা একটু মিষ্টি তাই সে হালকা হয় এবং সাগরের উপরের স্তরে থাকে। আর এই হালকা জলে উষ্ণতার কারণে বাষ্প হয়ে যাবার প্রবণতা বেশি। এই একই কারণে সে মৌসুমী বায়ুকে ডাকে এবং সাইক্লোন এর শক্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে আমরা দেখতে পাই সাইক্লোন উপকূলবর্তী এলাকার কাছে এসে উপরের স্তরে ভেসে থাকা এই মিষ্টি জলের সংস্পর্শে এসে তার শক্তি অনেক বাড়িয়ে ফেলে। এক্ষেত্রে আরও বেশি গবেষণার প্রয়োজন আছে। এখানে আরো কিছু মুক্তচিন্তার জন্ম হতে পারে যা সুন্দরবনের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণে সাহায্য করবে।

    এবার আমরা আসি পরের কথায়। আমরা দেখেছি যে সাগরের উপর ভেসে থাকা গঙ্গার জল সাইক্লোনের ক্ষমতাকে বাড়িয়ে সেটাকে সুপার সাইক্লোনের জন্ম দেয়। এই সুপার সাইক্লোনের উদাহরণ সম্প্রতি আমাদের চোখের সামনে আসলো, সেটা হল খুব রিসেন্ট সময়ে 'আম্ফান', ‘আয়লা’, তারপর এল ‘ইয়াস’। এই ‘ইয়াস’-এর পর বা ‘আয়লা’-র পর গতবছর যখন পৃথিবী ‘করোনা’ অতিমারিতে আক্রান্ত ছিল, সেই সময় যে ঝড়ে বিপন্ন হয়েছিল দ্বীপবাসি মানুষেরা তখন তারা বুঝেছিল যে, এই বাঁধটাই তাদেরকে বাঁচিয়েছে। এটা তো ঠিক, এবং অনেকেই বলেছেন যে মানুষের সুন্দরবনের বুকে বসতি স্থাপন করা একটা ঐতিহাসিক ভুল ছিল। এই ভুলটাকে পাল্টানোর জন্য তারা নানারকম নীতির কথা বলছেন, নানারকম পথ তারা দেখাচ্ছেন, সে কথা আমরা পরবর্তীতে আসব। কিন্তু আমরা একটু দেখে নেওয়ার চেষ্টা করব এই যে ঝড়গুলো হল, একদম সদ্য ঝড় ইয়াস-এর ফলে যে ক্ষতি হল আমাদের প্রিয় সুন্দরবনের বাদাবনের – তা দেখার। নবান্ন সূত্রে খবর হচ্ছে 10 মিলিয়ন মানুষ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তিন লক্ষ মানুষের ঘর ভেঙেছে, 134 টি নদীবাঁধ ভেঙেছে। আয়লা-র সময় আমরা দেখেছিলাম নানারকম সরকারি নথি ঘেঁটে, যে, 1000 কিলোমিটার নদী বাঁধ ভেঙেছিল সুন্দরবনে। পুরো সুন্দরবনে, মানে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে যে মোট নদীবাঁধ রয়েছে তার দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১০,৫৮৪ বর্গ কিলোমিটার। সেচ দপ্তরের 2018 সালের রেকর্ড থেকে এই তথ্যটা পাচ্ছি। সেখানে সুন্দরবনের নদী বাঁধ কমবেশী আছে ৩,৫০০ কিলোমিটার। একদম 2019 এর 'আম্ফান' পর্যন্ত এই তথ্যটা ধরা যেতে পারে। এখন হয়তো সামান্য কম বেশি কিছু হয়েছে। ওম্যালি সাহেবের কাছ থেকে আমরা জেনেছিলাম যে, সুন্দরবনের বাঁধের দৈর্ঘ্য ছিল 212 মাইল। তাহলে তো সুন্দরবনে নদীবাঁধ ছিলই – এটা নিয়ে আমাদের আর চিন্তা করার দরকার নেই। আমি যেটা বলতে চাইছি বা আমাদের যেটা ভাবনা সেটা হচ্ছে, বাঁধটা আজকের নয়, সেটি অতীতকাল থেকে আছে এবং সেটা সেখানকার মানুষ বাঁচিয়ে রেখেছিল নানা পদ্ধতিতে। আসলে সুন্দরবনের এই যে নদী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল সেই নির্মাণের কিছু ধারা ছিল।

    একটা খুব সুন্দর কথা মনে পড়ায় আমার বলতে ইচ্ছা করছে। সুন্দরবনের প্রায় নানান জায়গায় থাকা হয় বা যাওয়া হয়, সেখানে একটা জায়গা রাঙাবেলিয়াতে আমরা গিয়েছিলাম। সেখানে একদিন মালপাহাড়ি সম্প্রদায়ের একটি মানুষ আমাদের কাছে এসেছিলেন, এখন বয়স হয়েছে, তিনি বংশপরম্পরায় পাড়-বাঁধ নির্মাণ করেন এবং পাড়-বাঁধ নির্মাণ নিয়ে তার সাথে কথা হওয়ার সময় পরিষ্কার করে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, নদী কি কিছু খায়? বললো, হ্যাঁ নদীরও তো খিদে লাগে, নদী মাটি খায় - এই কথাটি তিনি বলেছিলেন। কোন মাটি খায়? আর কোন মাটি খায় না? - এই ছিল পরের প্রশ্ন। এবার তিনি সুন্দরবনের নানারকম মাটির কথা বললেন, সেগুলো হচ্ছে তার বংশ পরম্পরায় অধিগত বিদ্যা। এ প্রশ্নে তিনি একটা অসাধারণ কথা বললেন, যে মাটির একটা খাবার মাটির আরেকটা খাবারকে আঁকড়ে ধরে রাখে এবং সহজে গলে না - সেই মাটি নদী খায় না। তাহলে মাটির খাবার আর একটা মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখার ক্ষমতা কি কখনো বেড়েছে না কমেছে? তখন তিনি বলছেন যে, যখন তরুণ ছিলেন তখন তিনি সুন্দরবনের নানারকম মাটি দেখেছিলেন এবং মাটি বুঝতেন। মাটি টিপে, মাটির উপর পা ফেলে, মাটির গন্ধ শুঁকে মাটিড় চরিত্রকে বোঝার চেষ্টা করতেন। নানারকম নামও দিতেন টাড়া। এখন সেই চরিত্র কিন্তু পাল্টে গেছে। পাল্টে গেছে কেন? বলছে নদীর জল তো খুব বেশি দুধ-নোনতা হয়ে গেছে। এই "দুধ-নোনতা" শব্দটা আমাকে পরে খুব ভাবালো। এমনিতেই এই অঞ্চলের মানুষেরা জলকে বলে দুধ-নোনতা জল। খুব বেশি দুধ-নোনতা হয়ে গেছে অর্থাৎ লবণতার পরিমাণ বেড়েছে।

    সুন্দরবনের লবণতা নিয়ে একটা কাজ 2009 সালে করা হয়েছিল খুব সামান্য একটা ছোট্ট অংশে। তার আগে 1970 - 1972 সালে একটি কাজ করা হয়েছিল। তারপর লবণাক্ততা নিয়ে সেরকম উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ সুন্দরবনের বুকে হয়নি। সেইজন্য সুন্দরবনের ক্ষেত্রে নানান বিষয় নিয়ে কাজ হলেও, লবণতা কিভাবে বাড়ছে, তাতে মাটির উপর কী প্রভাব পড়ছে তা নিয়ে যেমন ভাবা হয়নি। প্রত্যেকটা ক্রিকে (সুন্দরবনে তো কোনটাকে নদী বলা যায় না, এখানে প্রত্যেকটা খাঁড়ি) কারণ, জোয়ারের সময় জল ঢোকে এবং ভাটার টানে আট ঘণ্টা ধরে সেই জল ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। এটাই হচ্ছে সুন্দরবনের যাপন এবং সুন্দরবনের শরীর এই নদীর মিষ্টি জল এবং সাগরের জল একসাথে মিশে সাগর আর নদীর সন্তান বাদাবনকে জন্ম দেয়, এটাই হচ্ছে এই অঞ্চলে চরিত্র। সেই চরিত্র কিন্তু আস্তে আস্তে পাল্টে গেল এবং পাল্টে যাওয়ার জন্য আমরা দেখলাম যে লবণতার পরিমাণ যত বাড়ছে, তত এই অঞ্চলে চরিত্র পাল্টে যাচ্ছে। এই অঞ্চলে যে পরিমাণে বাদাবন জন্মানোর কথা ছিল সেগুলো জন্মাচ্ছেও না। এই কথাগুলো সেই মালপাহাড়ি মানুষটি আমাকে বলেছিলেন।

    আগের প্রাককথনে ফারুকদা বলেছেন যে, বেলদারি প্রথাটি ধ্বংস হয়ে গেছে। সেটার একটা বড় প্রভাব পড়েছে। এটা ঠিক, যে প্রথা দীর্ঘদিন ধরে চলে তার একটা অধিগত বিদ্যা থাকে, সেই বিদ্যাকে যখনই আমরা অস্বীকার করি তখনই কিন্তু বিজ্ঞান থেকে, মাটির শক্তি থেকে আমরা পথ হারিয়ে ফেলি। তার ফলে হয় কী, আমরা যে আধুনিক বিদ্যাকে প্রয়োগ করি সেই প্রয়োগের সঙ্গে প্রাচীন অধিগত বিদ্যার কোন মিল না থাকায় তা কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কার্যকরী হয়না। এই যে সমন্বয়টা - মাটির বিজ্ঞান ও আমাদের ল্যাবরেটরির বিজ্ঞান এই দুটোর মধ্যে একটা সেতুবন্ধন হওয়া দরকার, তাহলে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এই যে মানুষটির কাছ থেকে যাপনটি বা বলা চলে পাড়-বাঁধ সম্পর্কে দৃষ্টি, এটা কিন্তু আমাদের একটা পথ দেখাতে পারে। একটা জিনিস বুঝতে হবে যে, বাঁধগুলি যে তৈরি হচ্ছে তার যে স্ত্রাটা ডেপ্থ (অর্থাৎ যেখানে নদী খুব পাক খায় এবং এক খুবলে খাওয়ার চেষ্টা করে মাটিকে, যেখানে থেকে শুষে নেয় সেই এলাকার মাটিগুলোকে)। সেই নিম্নতল থেকে বাঁধকে যে বিজ্ঞানসম্মত স্ট্রাকচারে তৈরি করা হয়, অনেকসময়ই তা স্ট্রাটুটরি লেভেলে পৌঁছাতে পারে না। তার আগে থেকেই বাঁধটিকে নির্মাণ করে দেয়া হয়। খুব টেকনিক্যাল কিছু ভুল থেকে যায় বাঁধগুলো নির্মাণে। সেই টেকনোলজির বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা আমাদের খুবই দরকার। সুন্দরবনের ক্ষেত্রে সমস্ত অঞ্চল গুলোতে আমরা যে বাঁধগুলো নির্মাণ করছি সেখানে কোন কোন এলাকা গুলোতে আমাদের বাঁধ দিতে হবে আর কোন কোন জায়গাগুলোতে দিতে হবে না, কোথায় মাটির বদলে কংক্রিটের বাঁধ দরকার, সেখানে কিন্তু আমাদের ইন্ডিজেনাস কিছু টেকনোলজির ব্যবহার করতে হবে। বাঁধগুলো দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে আগল দেওয়ার জন্য যে বাদাবনের জঙ্গলের নির্মাণ, তারো নানা বিজ্ঞানসম্মত মডেল আছে। সেগুলো অতটা এখানে সাসটেইন করবে না করবেনা, সেইটা হচ্ছে আমাদের প্রশ্ন। যদি আমরা অধিগত বিদ্যার সঙ্গে মিলিয়ে সেই কাজটা করতে পারি তাহলে এটা কিন্তু একটা অল্টারনেটিভ হয়ে উঠতে পারে। মাটির যে চরিত্র মানে মাটির দৃঢ়তাকে বাড়ানোর জন্য আমরা মাটির সঙ্গে আরও বিশেষ কিছু উপাদানকে মিশিয়ে কিছু ভাবনা ভাবা যেতে পারে। সেটা নিয়ে বেশ কিছু কাজ হওয়া দরকার। কিছু সামান্য কাজ হয়েছে, মডেল টেস্ট হয়েছে, সেটাকে আমাদের আরেকটু ভাবতে হবে।
    যে বিষয়টা আমার পরবর্তীতে ছিল সেটি হচ্ছে পরিবেশগত উদ্বাস্তু। সেটা না হয় আমি অন্যদিন বলবো।

    অমিতাভ সেনগুপ্ত: একদম খুবই সংক্ষেপে যেটা বলার সেটা হচ্ছে যে এই যে সুপ্রতিমবাবু কুড়িটি ঝড়ের সাতকাহন প্রাসঙ্গিকভাবে এনে আমাদের বলছিলেন যেখানে আমাদের আজকের শিরোনাম “সুন্দরবনের ভূত-ভবিষ্যৎ” – সেটা অনেকটা পর্যন্ত অবশ্যই এসেছে এবং “পরিকল্পনা ও ব্যর্থতা”-র জায়গাটা হয়তো আরেকটু আসতো, সময় অভাবে আমরা বাধ্য-ই হলাম ওঁকে একটু সংক্ষেপিত করতে। কিন্তু একটা কথা সুপ্রতিমবাবু সম্পর্কে বারবার বলবো যে, সুপ্রতিমবাবুর বক্তৃতা আমি যেখানেই শুনি – ওঁর কাজের মধ্যে বা ওঁর বক্তৃতার মধ্যে একটা এথনোগ্রাফি্ক কাজের ধারণা থাকে সবসময় এবং ওরাল হিস্ট্রি নিয়ে কাজ করার একটা দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সুপ্রতিমবাবুর আছে। সুপ্রতিবাবু ওই যে দুধ-নোনতার কথা বলছিলেন, অতিসম্প্রতি আমি সরলা দেবীর “জল-বনের কাব্য” নামে অত্যন্ত চমৎকার একটি ব্যক্তিগত অ্যাখানমূলক গদ্য পড়ছিলাম, যেখানে ভদ্রনদীর উপর দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বলছেন যে ভদ্রনদীর জল দুধ-নোনতা এবং সেখানে গুণ-বেগুণ – যে শব্দগুলো প্রায় আমাদের শহরে কোলকাতার কানে অপরিচিত, সেই কথাগুলো প্রায়ই সুপ্রতিমবাবুর লেখায় ফিরে আসে। সুপ্রতিমবাবুর বলার শেষের দিকে যেটা পাচ্ছিলাম, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলতে বলতে স্থানিক জ্ঞানকে আমরা কিভাবে কাজে লাগাতে পারি, যে আলোচনাটা আমাদের গতদিন খানিকটা এসেছে সেই এসেন্সটা আমরা খানিকটা পাচ্ছিলাম। তো, একটা কথা-ই আমার শুধু বলার যে, বেলদারি প্রথা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে কিনা এই প্রশ্নটা আমি রাখবো আপনার কাছে পরবর্তীতে সময় হলে। কারণ অতি সম্প্রতি তিনদিন আগে কুলতলীর দেউলবাড়ির একটা বাঁধের পাড়ে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম যে, এখনো নাকি বেলদারি প্রথা আছে এবং বেলদারি প্রথাতে যারা নিযুক্ত তারা তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেন না, এবং সেখানে ফরেস্ট-এর সাথে নানা রকম দুর্নীতির প্রশ্নও উঠে আসছিলো।

    এরপরে আমি চলে যাব অধ্যাপক ডঃ আইচ এর কাছে। ডঃ অমিতাভ আইচের কাছে যাওয়ার আগে আমি একদম স্পষ্ট ভাবে বলবো যে, ডঃ আইচ সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখায় এক জায়গায় বলছেন যে, এই পলিপ্রপিনের চাদর বিছিয়ে নদীর দিকে বেসমেন্ট পিচিং করার যে বাঁধ তৈরির পদ্ধতি – এটা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক এবং আনফিজিবল। এই সূত্র ধরেই ডঃ আইচের কাছে যাব। এবং আমরা এই সূত্রেই আলোচনায় আনার চেষ্টা করব পরিকল্পনা এবং ব্যর্থতা - যেটা আমাদের আজকের আলোচনার অন্যতম একটা দিক।


    ডঃ অমিতাভ আইচ: বেসিক্যালি এখন সুন্দরবন সম্পর্কে আমাদের বৈজ্ঞানিক যে তথ্য এবং জ্ঞান খুব নতুন কিছু নয়, সকলের কাছেই তার সূত্র আছে। সুন্দরবন একটা নবীন ভূখণ্ড, 5/6 হাজার বছর তার বয়স এবং এটি পৃথিবীর নবীনতম ভূখণ্ড। তার হেলে পড়াটা পূর্বের দিকে রয়েছে এবং এইভাবে মোহনা তৈরি হয়েছে ও নানাভাবে ভূমিরূপ গঠন হয়েছে। এই বদ্বীপে প্রচুর পরিমাণে নবীন পলি বয়ে আসছে। তো, খুব স্বাভাবিকভাবেই এরকম একটা এসচুয়ারীতে যদি আপনি ওই রকম ভারী নদী বাঁধ বানান তো সেটা বসে যেতে পারে। আর একটা হচ্ছে, যেকোনো রকমই বাঁধ-ই এইরকম এসচুয়ারীতে রাখতে গেলে বাঁধকে বাঁচাতে হবে। আমরা হয়তো ভাবছি আমরা কিকরে বাঁধ দিয়ে বাঁচবো, কিন্তু বাঁধকে কে বাঁচাবে? ব্রিটিশরা নিঃসন্দেহে ভেবেছে, হেংকেল সাহেবের আমল থেকে এই ধরনের বাঁধ দেওয়া শুরু হয়েছে চালের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য। বেসিক্যালি দে ওয়ান্টেড টু মেক ইট আ রাইস বৌল। যদিও তখন অনেক ট্র্যাডিশনাল রাইস ছিল কিন্তু ওরা ওটাকে ফ্রেশ ওয়াটার রাইসের বৌল বানাতে চেয়েছিল। ওই জন্য তারা বাঁধটা দিয়ে ওরকম করেছে। সুপ্রতিম যে ট্র্যাডিশনাল নলেজ এর কথা বলছিল সেই সময়ের - সময় তো অনেক পরিবর্তিত হয়ে গেছে 200 বছরে, নদী অনেক উপরে উঠে গেছে পলি পড়ে পড়ে। একটা অদ্ভুত ঘটনা হলো, পলি যা-ই আসুক না কেন নদীর উপরে যারা কাজ করেন তারা বলবেন ফারাক্কা থেকে বয়ে আসা পলি কমেছে, তাও যথেষ্ট পলি আসছে যার তুলনায় জল আসছে না। তার ফলে সাংঘাতিক রকমের লবণাক্ত হয়ে গেছে।

    এসচুয়ারীকে যদি আমরা তিন ভাগে ভাগ করি – নিচের এসচুয়ারি নিম্ন, ডিপ এসচুয়ারি মিডল অ্যান্ড আপ, আর সুন্দরবনের ওই পূর্বদিকে পুরোটাই ডিপ এসচুয়ারি এখন।আর লবণাক্ততার কথা বলতে গেলে কুড়ি-র উপরে স্যালিনিটি এখন, একটা সমুদ্রে স্যালাইনিটি থাকে 35 গ্রাম পার লিটার। সুন্দরবনে এই মুহূর্তে, ইয়াস- পরবর্তীকালে আমি নিজে দেখেছি ওটা 22-এর উপরে আছে এবং যে জল ভিতরে ঢুকেছে তার স্যালিনিটি 22 গ্রাম পার লিটার, মানে ধানক্ষেতের উপর 22 গ্রাম পার লিটার স্যালিনিটির জল দাঁড়িয়ে আছে। মোটকথা, ধানাই-পানাই করে বলার কিছু নেই, সোজা গল্প হচ্ছে যে, বাঁধটাকে কে বাঁচাবে? কারণ বাঁধকে বাঁচানোর জন্য যে ম্যানগ্রোভ সেটা চলে গেছে। এবার ম্যানগ্রোভ চলে যাওয়ার পর আপনি রাতারাতি ম্যানগ্রোভ তৈরি করতে পারবেন না, কারণ ওরকম ভাবে ওটা তৈরি হয় না। ম্যানগ্রোভ প্ল্যান্টেশনে সারা পৃথিবীতে 10-20 ভাগ সফলতা আসে। মর্টালিটি প্রচন্ড হাই, এবং তার অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথম কথা হচ্ছে, হাইড্রোলজি এবং সেডিমেন্টশন প্যাটার্ন না দেখে আপনি ম্যানগ্রোভ করতে পারবেন না, কারণ ম্যানগ্রোভ স্বাভাবিক ভাবে যেসব জায়গাগুলোতে হয় তার আগে পায়োনিয়ার স্পিসিস মানে প্রথমে যা হবে – ধানিঘাস – এগুলো তৈরি হবে। সেডিমেন্টেশন হচ্ছে কিনাদেখতে হবে, তার পিছনে আস্তে আস্তে সল্টমার্স এবং তার পিছনে আস্তে আস্তে ম্যানগ্রোভের প্লান্টেশন নিচের থেকে উপরের দিকে যায়। কিন্তু মানুষের পক্ষে এটা চট করে করা পসিবল নয়। ঐগুলো যদি না থাকে এটা করা খুব মুশকিল। এবং মনুষ্য বসতি ঠিকই, রিক্লেইমড এরিয়া এগুলো, কিন্তু প্রত্যেকটা দ্বীপের বাইরে ম্যানগ্রোভের যে একটা জায়গা ছিল সেটা নানান কারণে চলে গেছে। একটা মূলত কাঠ কাটার জন্য শেষ হয়ে গেছে আর একটা হচ্ছে ভেড়ি বানানোর জন্য শেষ হয়ে গেছে।

    মানুষের পপুলেশন বেড়েছে, পপুলেশন তো বাড়বেই, ইনফ্যাক্ট মর্টালিটি কমছে ও আমাদের লঞ্জিবিটি বাড়ছে। বিজ্ঞান তো কিছু উন্নতি করেছে, স্বাভাবিকভাবেই মেডিকেল সাইন্সও কিছু উন্নতি করেছে, তো পপুলেশন বাড়াটা স্বাভাবিক। আমরা মানুষকে ওখানে থাকতে দিয়েছি এবং তারা ওখানে গেছেন, তাদের তো আলাদা করে কোন দোষ নেই। আমরা এই কান্ডটা করেছি বা বৃটিশরাই করুক, তারা স্বাধীনতার মধ্যে-ই 50 শতাংশ ম্যানগ্রোভ হাওয়া করে দিয়েছে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের পপুলেশন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, ওখানে তো লাইভলিহুড সেভাবে নেই, যার ফলে ন্যাচারাল রিসোর্সের উপর চাপ পড়ে সেটা নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু শুধু তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আর ম্যানগ্রোভ এখন যদি আমরা বানাতে চাই, আমি রিসেন্ট আমার লেখাতেই বিষয়টি নিয়ে বলার চেষ্টা করেছি,কারন এই কথাটা বাদ চলে যাচ্ছে অনেকসময় - ইউরোপ যখন এসচুয়ারিতে এরকম জনপদ তৈরি করছে তার সামনে একটা লম্বা সল্ট মার্স আছে এবং সল্টমার্স গুলো আর্টিফিশিয়ালি ট্রিগার করা হয়েছে। ওরকম রিচ বা স্ট্রাকচার দিয়ে। যেগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় পার্মিয়েবল ড্যাম বলে। পার্মিয়েবল ড্যাম এখন বানানো যায়, ওই বাঁশ ও অন্যান্য ব্রাশহূড (ডালপালা) মাঝখানে রেখে দুটো লেয়ারে স্ট্রাকচার তৈরি করা যায় T আকৃতির - সেইগুলো বেসিক্যালি জলের গতি হ্রাস করে সেডিমেন্টেশনটা বাড়ায়। ধরে নেওয়া হয় এই সেডিমেন্টেশনটা বাড়ার পর ওখানে একটা চর তৈরি হবে (একে চেনিয়ার বলে) এবং পিছনের দিকে হাল্কা একটা সেডিমেন্টেশন বাড়বে কিন্তু সেটা এমন হবে না যে যাতে করে অ্যাক্রেশন বাড়ার ফলে অন্যদিকে ইরোশন হয়। তারপর আস্তে আস্তে ওখানে ন্যাচারালি ম্যানগ্রোভটা তৈরি হবে এবং ম্যানগ্রোভটা তৈরি করার জন্য আমরা একটা রাস্তা পাবো। দুম করে আপনি গিয়ে ওরকম ম্যানগ্রোভ লাগাতে পারবেন না। মাটির স্যালিনিটি এবং আসিডিটি বা PH কী আছে, ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ডাকটিভিটি এগুলো খুব ইম্পপর্টেন্ট। এগুলো মাপা হয় না। আর ম্যানগ্রোভ পাথরের উপর খুব একটা বাঁচে না। কাজেই আপনি দুম করে চার কোটি-পাঁচ কোটি- ছ’কোটি ম্যানগ্রোভ লাগানোর প্ল্যান করতেই পারেন কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে আপনার কাছে কিন্তু চারাটি নেই। এটা কিন্তু একটা অসাধারণ কমিউনিটি প্রজেক্ট হতে পারে। এ নিয়ে প্রচুর কাজ হয়েছে যে বাঁধকে কিভাবে রক্ষা করা যায়। তুষারবাবু নিজে অনেক কিছু বলেছেন। এখন তো বিজ্ঞানীরাও জানেন বাংলাদেশেও এ নিয়ে কিছু অবজারভেশন আছে, যদিও ওরা নিরন্তর এ নিয়ে আলোচনা করছে কারণ ওখানকার সমস্যা আর আমাদের সমস্যা অনেকটা একই রকম। ভীষণ দুর্নীতি পরায়ন রাজনীতি। তবে ওদের ক্লাইমেট এক্টিভিটি একটু স্ট্রং এবং ইন্টারন্যাশনালি কানেক্টেড, খুব ভালো লাগে এটা। বাংলাদেশ একটা ছোট্ট দেশ ব'লে ন্যাচারালি ক্লাইমেট ইমারজেন্সিটা অনেক ভালো বুঝতে পারছে। পশ্চিমবঙ্গ যদি একক একটা দেশ হতো, একইরকম ভাবে বুঝতে পারতো। সেখানে এবং আমাদের এখানেও কাজ হয়েছে নানা রকম ঘাস ও ইত্যাদি দিয়ে, যেমন ভেটিভার। ভেটিভার যদিও ইন্ডেজিয়াস নয়, অনেকে ভাবতে পারেন এটা ইনভেসিভ। ভেটিভার এর অনেক লোকাল ভ্যারাইটি রয়েছে এবং ভেটিপারে উপরের অংশটা খুব ভালো গো-খাদ্যও বটে। কিন্তু ভেটিভার এর সল্টি সয়েলে গ্রোথ অত ভালো নয়। তা সত্ত্বেও অনেক রকম প্রযুক্তি আছে যা দিয়ে বানানো যায়। ওখানে পলিপ্রপিলিন এর বদলে যদি জিও জুট যদি আমরা ইউজ করতাম। জিও জুট দিয়ে সয়েলকে কম্প্যাক্ট করে... যেধরনের মাটির কথা সুপ্রতিম বলছিলেন। মানুষ সেসব মাটির কথা জানেন ঠিক-ই। জিও জুট করে তার উপর ভেটিভার যদি আমি বুনি এবং ভেটিভারের নার্সারি হতে পারে, তাতে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। এটা যারা মেইনটেন করবে সেটা একটা কমিউনিটি প্রজেক্ট হতে পারে। তো সেইগুলো চিন্তা না করে ঠিকাদার কোম্পানির হাতে সমস্ত প্রজেক্ট তুলে দিলে – সেটা যে জনপদ নিয়ে ভেঙে পড়বে সেটা তো কেউ বানাতে পারবে না, কারণ কোটি কোটি টাকার দরকার। তার চেয়েও বড় ব্যাপার এরকম দুম করে বাঁধ দিলে স্কারিং এর ব্যাপার আছে – কেউ যখন ওঠে তখন তো রিফ্লেক্টেড হয়। ডাইরেক্ট রিফ্লেক্ট যখন হচ্ছে ধাক্কা খাচ্ছে এবং ব্যাক করে ওটা স্কার করে নিয়ে চলে যায়। রিফ্লেকশন এন্ড স্কারিং, এটাকে বন্ধ করবে কে! এটা যদি তীব্র ভাবে চলতে থাকে তাহলে কেউ আটকাতে পারবেনা। দীঘার মতো জায়গায় গার্ডওয়াল রাখা যায় না, আর এটা তো ভীষণ রকম ডায়নামিক। যায়নি, তার কারণ তো দিঘাতে স্যান্ডউইন্ডগুলো উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যে দীঘাতে “মরুতীর্থ হিংলাজ” সিনেমার শুটিং হয়েছিল এবং যেখানে বেলুচিস্তানের মরুভূমি তৈরি করা হয়েছিল - সেখানে বাড়ি-ঘরদোর তৈরি করা হয়েছে এবং ট্যুরিজম সেন্টার তৈরি করা হয়েছে, ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি হয়েছে। সাধারণ মানুষকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য ড্র্যাগ করা হয়েছে। তারা কোনদিন বোঝেনি কী বিপদের মধ্যে পড়তে চলেছে। এটা হয় আমাদের দেশে। এগুলো হল পার্ভারশন। এগুলো নতুন কিছু নয়।

    একটা সুসংবাদ আপনাদের জানাই, জানিনা এর ফল কী হবে! আমরা যখন কথা বলছি--- পশ্চিমবঙ্গের বনদপ্তর সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বাঁধ দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করে বসে আছে - আপনারা জানেন কিনা জানিনা। পশ্চিমবঙ্গের বনদপ্তর EOI অর্থাৎ এক্সপ্রেশন অফ ইন্টারেস্ট আহ্বান করেছে - প্রাকৃতিক বাঁধ নিয়ে আমাদের যার যার কাছে যে প্রযুক্তি আছে তা নিয়ে এক্সপ্রেশন অফ ইন্টারেস্ট চেয়েছেন তারা, বিনা পয়সায়। কোন পয়সা দিতে হবে না তাকে সরকারকে অবশ্যই। এ নিয়ে কী হবে আমি জানিনা কিন্তু এতে বোঝা যাচ্ছে যে বোধোদয় হচ্ছে। একটু ছোট্ট করে বললাম, এর অনেক লেয়ার আছে। এ বিষয়ে ছোট আলোচনা বড় মুশকিল।

    অমিতাভর প্রশ্নের সূত্র ধরে বলি, আপনারা আমার যে লেখাটার কথা বলেছেন সেখানে আমি দেখিয়েছি বাংলাদেশে ট্রাডিশনাল নলেজ এখনো আছে। সেখানে এখনো যদু পালং, ধানি ঘাস ইত্যাদির এর চাষ হয়। এগুলো পাইয়োনিয়ারিং স্পিসিস। আমি ভিতরকনিকাতে এর চাষ দেখেছি। তাঁরা এগুলোকে গোরু-মোষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে।
    ধানি ঘাস হল ম্যানগ্রোভ এর পাইওনিয়ার স্পিসিস। যেখানে চর তৈরি হয় সেখানে ধানী ঘাস তৈরি হয়। এভাবে তৈরী হওয়া চরে জনপদ অনেক বেশি সুরক্ষিত। বাংলাদেশে এখনো ট্রেডিশনাল নলেজের ব্যবহার আছে। সেখানে ধানি গাছের চাষ হয়। এটাকে তারা গো-খাদ্য এবং অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছে। আমি ভিতরকণিকাতে অনেক জায়গায় দেখেছি তারা ধানি ঘাস নিয়ে গরু-মোষকে খাওয়ায়। এইগুলো দিয়ে বাঁধ সুরক্ষিত করা যায় না কারণ এইগুলো চরে হয়। আমরা বাঁধকে যেভাবেই বানাইনা কেন বাঁধকে সুরক্ষা কে দেবে? বাঁধের আগে যদি একটা ক্ষয়িষ্ণূ, তীব্র, রাগী একটা নদি চলতে থাকে তাকে তো শান্ত করতে হবে। তাকে শান্ত করতে হলে তার গতিপথ বুঝে বাঁধ করতে হবে।


    আরেকটা টার্ম এখন নতুন করে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটি হল পারমিয়েবল ড্যাম। এবছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের একটা থিম ছিল। সেটা হল “রি-ইমাজিন, রি-ক্রিয়েট অ্যান্ড রি-স্টোর”। আমরা ঠিক করেছি আগামী দশ বছর আমরা রেসটোরেশন ইকোলজী নিয়ে কাজ করব। যা আমরা নষ্ট করেছি, ভেঙ্গে ফেলেছি তাকে আগে সামলাবো। কিভাবে সামলাবো সেটার ব্যাপারে দুটি আন্তর্জাতিক জার্গণের ব্যবহার করতে হচ্ছে। এক নম্বর হল, ABA বা ইকোসিস্টেম বেসড অ্যাপ্রচ। এটি অনেকটা ট্র্যাডিশনাল নলেজ বেসড, আরেকটা হল NBS বা নেচার বেসড সলিউশন। তাতে আমরা সবকিছু ফেরত পাব না। কারণ অনেক কিছুই ইরর্রিভার্সবল লস হয়েছ। ঠিক জলবায়ু পরিবর্তনের মত। আমরা যা কিছুই করি না কেন প্রকৃতিকে নিয়ে প্রকৃতিকে বুঝে আমাদের করতে হবে। সেক্ষেত্রে ভেটিভার একটা অপশন মাত্র। তার আগে অনেক কিছুই আমাদের করতে হবে। কিন্তু আমাদের তেমন স্পেস নেই। আমরা দেখব যে নদী খেলতেই পারছে না। নদীর খুব কাছে মিড ওয়াটার লেভেল থেকে ওটাকে তুলে দেওয়া আছে। প্রতিটি হাইয়েস্ট হাই টাইডে বা ভরা কোটালে জল ঢুকে যেতে পারে। এরকম জায়গায় বাঁধটা আছে। স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্ন ওঠে। আমরা এটাকে রিট্রিট করতে পারতাম কিনা। কিছুটা অংশ রিট্রিট করে আমরা সল্ট মার্স তৈরি করে তার পেছনে বাঁধ তৈরি করতে পারতাম। কিন্তু এগুলো করতে গেলে পূনর্বাসনের প্রশ্ন আসবে। কিন্তু সেটাতো সরকার করতে রাজি হবে না। কারণ এতগুলো মানুষের দায়িত্ব তারা নিতে রাজি নয়। তাছাড়া বাঁধের কাছে যারা থাকে তারা সবচেয়ে গরিব মানুষ এবং লোয়ার কাস্ট বা ডাউন কাস্টেড। ভিতরের দিকে থাকার মতো আর্থিক অবস্থা তাদের নেই। সুতরাং এগুলো বলা সহজ, কিন্তু করা সহজ নয়।

    আরেকটি ইম্পর্ট্যান্ট কথা একটু সংক্ষিপ্ত ভাবে বলে দিই। শুধু বাঁধের উপর কনসেনট্রেট করলে হবে না। জীবন জীবিকার পরিবর্তন করতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানানসই করে। জলবায়ু পরিবর্তন নিরোধি বা ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট কিছু ভাবতে হবে। এগুলো শুনতে ভারি শোনালেও বিষয়গুলো তেমন ভারী নয়। সুন্দরবনে কেউ বলেনি হাই ইয়েল্ডিং ভ্যারাইটির ধান করতে। আমরাই এটা ইন্ট্রোডিউস করিয়েছি। আমরা লম্বা ধানের বদলে বেটে বেটে ধানের চাষ করিয়েছি। আলটিমেটলি সল্ট-টলারেন্ট ভ্যারাইটিগুলো কমে গেল। এখন সরকার নোনাস্বর্ণ বলে একটা ভ্যারাইটির কথা ভাবছে। সরকার এখন প্রানপণে ওগুলোকে প্রকিওর করার চেষ্টা করছে প্রাইভেট কালেক্টরদের কাছ থেকে। কিন্তু সে বীজ সরকারের হাতে নেই। এগুলি প্রকিওর করতে 3 / 4 বছর সময় লাগে। পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। সরকার রাতারাতি সবার হাতে তুলে দিতে পারবে না। সব জায়গায় রুই-কাতলা চাষ হচ্ছে। এগুলোর কোনো অর্থ হয় না। যেখানে স্যালিনিটি ইরিগেশন আছে সেখানে সল্ট-টলারেন্ট ফিশ করতে পারি। এছাড়াও অনেকগুলি লাইভলিহুড অগমেন্টেশন আছে। ওখানে অনেক জায়গায় ধান ক্ষেতের মাঝে কলাগাছ। কোন প্রয়োজন ছিল না। নোনা জল ঢুকে সব হলুদ হয়ে গেছে। আমাদের সেন্ট্রাল সল্ট স্যালিনিটি রিসার্চ ইনস্টিটিউট কিছু টেকনিক বলেছে ওদের। তারা কিছু কিছু উঁচু উঁচু আল করে তার ওপর সবজি করেছে। মাঝখানে ধান আছে আর এদিক ওদিক আলের উপর সবজি করে এদিক থেকে ওদিক বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু জমিগুলো নিচু এবং জল উচু। এখানে ফ্লাড হল ওয়াটার ফলের মত। অর্থাৎ জল উপর থেকে নিচের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

    আরেকটা বিপজ্জনক সমস্যা হল পানীয় জল। গরিব মানুষের বাড়িগুলো নিচু জমিতে। টিউবওয়েলগুলো জলে ডুবে যায়। টিউবওয়েল গুলো ফ্লাড রেজিলিয়েন্ট করার জন্য নানা রকম মডেল আছে। কিন্তু স্থানীয় যারা টিউবওয়েল করে তারা ব্যবসার স্বার্থে উল্টোপাল্টা টিউবওয়েল লাগিয়ে দেয়। সেখানে বরো ধানের জন্য প্রয়োজনীয় জলস্তর নষ্ট হচ্ছে। আগেকার দিনে জমিদাররা বড় বড় রিজার্ভার তৈরি করত। নানাভাবে রিজার্ভার তৈরি করা যেত বা যায়। আইলার পরে বিভিন্ন অঞ্ছলে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের একটি প্রজেক্ট হয়েছিল। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের কাজটা অনেক খারাপ হয়। সে সময় অনেক ফ্লাড সেন্টার তৈরি করা হয়েছিল। ফ্লাড সেন্টার প্রজেক্টে রিসোর্স সেন্টার প্রয়োজনীয় ছিল। সেখানে জলের বন্দোবস্ত খুব ভালোভাবে করা যায়। এখন সেখানে জলের তীব্র হাহাকার আর প্লাস্টিকের পাউচ ঢুকেছে। এগুলো চিন্তাভাবনা না করে শুধু বাঁধ নিয়ে ভাবলে মুশকিল। মনে রাখতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারটা ইররিভার্সিবল পর্যায়ে চলে গেছে। যে SDG বা সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল গুলো আছে তাঁরা ওয়ান পার্সেন্টও অ্যাচিভ করতে পারেনি। এই মুহূর্তে বে অফ বেঙ্গলের টেম্পারেচার আছে 34 ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মত। মে আর অক্টোবর এ বেশি থাকে। এর উপরের লেয়ারের জল টেম্পারেচার 1° বাড়লে সাত পার্সেন্ট জল শোষণ ক্ষমতা বেড়ে যায়। ফলে ম্যাসিভ সাইক্লোন আসতে পারে। সুতরাং আমরা যদি ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট প্লানিং না করি তাহলে হবে না।

    এর আগেও বড় বড় ঝড় হয়েছে। সাইক্লোন ভোলাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হয়। সেটা বাংলাদেশের সাংঘাতিক বিপর্যয় নিয়ে এসেছিল। এই শতাব্দীতেই ঘটে যাওয়া সীডার 40% ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করেছিল। ঝড়ের ফ্রিকোয়েন্সি নিশ্চয়ই বাড়বে। বছরে দুটো ঝড় ঘটে যাবার মতো পরিস্থিতিতে চলে এসেছি। আমাদের তাই ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট প্ল্যানিং একটা দরকার। ইউনাইটেড নেশনস জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে একসেপ্ট করেছে, “রিইমাজিন রিক্রিয়েট রিস্টোর”। অর্থাৎ প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে। আমাদের যাবতীয় টেকনোলজি আছে। আমরা টেকনোলজি দিয়ে বলে দিতে পারি সুন্দরবনের কনজারভেশন বা প্রটেক্টেড এরিয়ার মধ্যে যে ম্যানগ্রোভ রয়েছে তাদের অবস্থা ভালো নয। স্যাটেলাইটের ছবি দেখে তাদের ক্লোরোফিল কনটেন্ট বোঝা যায়। আমাদের কাছের টেকনোলজি প্রচুর আছে কিন্তু আমাদের প্রকৃতিকে রেস্পেক্ট করতে হবে। আমাদের ট্রাডিশনাল নলেজকে রেস্পেক্ট করতে হবে। আমাদের টেকনোলজি অনেক আছে কিন্তু তাদের প্রয়োগ হতে হবে প্লেস-বেসড বা অবস্থান অনুযায়ী।

    আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা এখানে বলে দিয়ে যাচ্ছি পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে ভারতের গরিবতম মানুষরা থাকেন। পলিটিক্যাল উইলে সুন্দরবনের গুরুত্ব যতটা বায়োডাইভারসিটি জন্য বা বায়োস্ফিয়ার এর জন্য ততটা গুরুত্ব মানুষ অনেক সময় পান না। ইউনাইটেড নেশনশ -এর কিন্তু ‘বায়োস্ফিয়ার’ তৈরি করা হয়েছে,মানে UNESCO-র “ম্যান এন্ড বায়োস্ফিয়ার” বলে প্রোগ্রাম আছে একটা। কিন্তু সেটা বনদপ্তরের একটা বিষয় হয়ে রয়ে যাওয়ার জন্য নয়। মানুষ এবং প্রকৃতি মিলেমিশে থাকবে তার মিথোজীবিতার মাধ্যমে। এই জন্য এটা বায়োস্ফিয়ার। সেটা আমাদের এবং সরকারি দপ্তরকে মনে রাখতে হবে।

     

  • বিভাগ : আলোচনা | ৩০ আগস্ট ২০২১ | ৬৩৫ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ramit Chatterjee | ৩০ আগস্ট ২০২১ ২৩:২৮497392
  • ডক্টর আইচ এর কথা গুলো ভীষন ভীষন গুরুত্বপূর্ণ এবং আরো আরো মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার। প্রকৃতির সামনে কেউ দুর্নীতি করে পার পাবে না। এই ব্যাপারটা এখনো কিছু লোক বুঝতে চায় না। খুবই দুঃসময়।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন