• বুলবুলভাজা  আলোচনা  পরিবেশ

  • সুন্দরবন সংলাপ: দ্বিতীয় পর্ব

    আমরা এক সচেতন প্রয়াস
    আলোচনা | পরিবেশ | ১৯ জুন ২০২১ | ৭৬৬ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব
    সুন্দরবন ডেল্টা আজ অস্তিত্বের সঙ্কটের মুখে। একদিকে গোটা সুন্দরবন ভূমিরূপ গঠনের দিক দিয়ে যেমন নবীন, অন্যদিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে তীব্র হচ্ছে সংলগ্ন জনবসতির ‘ক্লাইমেট রিফিউজি’ হওয়ার সম্ভাবনা। বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে একদিকে যেমন বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা। একই সঙ্গে তীব্র হয়ে উঠছে বাড়তে থাকা জনবসতির বেঁচে থাকার আর্তি। পরিবেশবিদ ও ভুতাত্ত্বিকেরা সুদুরপ্রসারি দৃষ্টি দিয়ে বাঁচাতে চাইছেন গোটা প্রকৃতি। আর স্থানীয় মানুষ চাইছেন বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আশু উন্নয়ন। গণদাবী হয়ে উঠছে কংক্রিট বাঁধ। ফলে, ‘বনাম’ হয়ে মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে 'উন্নয়ন’ আর ‘নিসর্গ’। ‘বনাম’ হয়ে মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে ‘কংক্রিট বাঁধ’ আর ‘মাটির বাঁধ’। ‘আমরা এক সচেতন প্রয়াস’ দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে ‘সংঘর্ষ ও সহবস্থান’ নিয়ে সমীক্ষা ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। আয়লা, আম্ফান ও ইয়াস পরবর্তী ‘উন্নয়ন বনাম নিসর্গ’র এই আলোচনায় অভিনিবেশও তার কাছে আজ সময়ের দাবি। ‘আমরা’ একটি পরিসর তৈরি করতে চাইছে যেখানে বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, ভূ-তত্ত্ববিদ, সামাজিক আন্দোলনকর্মী থেকে সাধারণ মানুষও তার মতামত রাখতে পারেন। এটি ধারাবাহিকভাবে সুন্দরবনের সংকটের নানা আঙ্গিক ও সমাধান সুত্রের সামগ্রিক পর্যালোচনার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। গত ১লা জুন থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক আলোচনার দ্বিতীয় পর্বের বিষয় ‘বাঁধরক্ষা : যুক্তি, প্রযুক্তি ও লোকজ জ্ঞান’।

    স্বাগতকথনে ফারুক-উল ইসলামঃ

    আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং বিভিন্ন পরিসরে এই নদীবাঁধ এবং সুন্দরবনের উন্নয়নের ব্যাপারে বিভিন্নরকমের বক্তব্য শুনতে পাই, যেগুলো প্রায় পরস্পরবিরোধী এবং সেগুলো পরস্পরবিরোধী হলেও তার পিছনে যুক্তিগত একটা দিক অবশ্যই থাকে, তাকে অস্বীকার করা যায় না। সেই জায়গা থেকে আমরা একটা পরিসর তৈরি করতে চেয়েছি, যেখানে সবাই তার বক্তব্য রাখতে পারে, সে যতটাই মতপার্থক্য বা বৈপরীত্য থাকুক না কেন, সে দৃঢ়ভাবে তার বক্তব্যটা বলবেন এবং যুক্তিকতার সঙ্গে আমরা সেই পরিসরটা তৈরি করতে চেয়েছি।

    আজকে আমাদের সঙ্গে আছেন সুজিত কুমার মণ্ডল, উনি যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পড়ান এবং সুন্দরবনের একজন ভূমিপূত্র। ওঁর জন্ম, বড় হওয়া সবটাই সুন্দরবনে। অর্থাৎ সুন্দরবন সম্পর্কে উনি যতটা জানেন তা আমাদের থেকে অবশ্যই অনেকটা বেশি। সঙ্গে আছেন আমাদের আরো তিনজন যারা সুন্দরবনেরই ভূমিপুত্র। আছেন মনোজিৎ মণ্ডল, তিনিও সুন্দরবনবাসী এবং সুন্দরবন সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে ভাবনাচিন্তা করছেন। আছে শ্যামল গায়েন, তিনি সুন্দরবনের মানুষ এবং পেশায় শিল্পীও। আছেন রাধাকান্ত সর্দার, তিনিও বিভিন্ন সমাজসেবার কাজে যুক্ত। এরা প্রত্যেকেই সুন্দরবনের মানুষ। আমরা তাদের কথা শুনবো---

    সঞ্চালনায়ঃ অমিতাভ সেনগুপ্ত

    আমরা কয়েকদিন আগে বলতে পারছিলাম যে আমরা পোস্ট-কোভিড সিচুয়েশনে আছি, কিন্তু এখন আর পোস্ট-কোভিড বলা যাচ্ছে না, নিও-নর্মালটাই আমাদের ধরে নিতে হচ্ছে। এটাই আমাদের নিও-নর্মাল যে, কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝেই আমরা অনেককে হারিয়ে ফেলবো। এইটুকু নিয়েই আমাদের চলতে হবে। যে প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল যে "আমরা এক সচেতন প্রয়াস" গত দশ বছরের বেশি সময় ধরে মূলত সংঘর্ষ ও সহাবস্থান নিয়ে কাজ করে এসেছি।

    'ইয়াস'-পরবর্তী প্রাকৃতিক বিপর্যয় সুন্দরবনের মানুষ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সেখানে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে সেটা হল নদীবাঁধ। এই নদীবাঁধ তার যথাযথ সংরক্ষণ হলে, তাকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করলে, সেই নদীবাঁধের বিষয়ে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা নিলে হয়তো এ বিপর্যয়কে ঠেকানো যেত। এ প্রসঙ্গে বিভিন্নরকম মতামত উঠে আসছে, যেমন এই বাঁধকে কংক্রিটের বাঁধ করা হবে নাকি এই বাঁধকে মাটির বাঁধের প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হবে। আজ আমাদের আলোচনার শিরোনামঃ "বাঁধরক্ষা, যুক্তি-প্রযুক্তি ও লোকজজ্ঞান"। যুক্তি এবং প্রযুক্তি এইটা আমাদের বক্তারা যাঁরা আছেন তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে, তাঁদের অ্যাকাডেমিক জায়গা থেকে অবশ্যই বলবেন এবং সুন্দরবনের মানুষ হিসেবে যাঁরা তাঁদের জীবনে-যাপনে এই বিপর্যয় দেখেছেন তাঁরা অবশ্যই বলবেন। এর সঙ্গে আমরা একটা বিশেষ বিষয় যোগ করতে চাইছি সেটা হচ্ছে লোকজ জ্ঞান। অর্থাৎ এই যে সাত হাজার বছরের গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ, এখানে মানুষ এসেছে কবে? এখানে মানুষ এসেছে ব্রিটিশের যে ইজারাদার ব্যবস্থা 1773 এর পর থেকেই। আজ সুন্দরবনে 45 লক্ষ মানুষ বাস করে। শুধু পশ্চিমবঙ্গের প্রায় 102 টি দ্বীপের 54 টিতে মানুষ বাস করেন এবং প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার নদী বাঁধ মানুষ বানিয়েছে।

    আজকের পরিস্থিতিতে বারবার আমরা দেখছি, বিগত বছরগুলোতে কতগুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে, আয়লা-বুলবুল-ফণী গতবছর আম্ফান এবং এই বছরই ইয়াস। নদীবাঁধ ভেঙেছে, নোনাজলে প্লাবিত হয়েছে চাষের জমি, বৃষ্টির জলে পুকুর নষ্ট হয়েছে, মানুষের জীবন-জীবিকা ভয়ঙ্করভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।

    আমি অনুরোধ করব যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর সুজিত কুমার মণ্ডলকে, উনি যদি আমাদের সামনে তার বক্তব্য রাখেন---

    ডঃ সুজিত কুমার মণ্ডল: ‘বাঁধরক্ষা : যুক্তি, প্রযুক্তি ও লোকজ জ্ঞান’ আমাদের আলোচনার জন্য স্থির হয়েছে। সত্যি বলতে কি সুন্দরবনের আগেকার চেহারা কি কিছু আছে! বেশিরভাগটাই খাঁড়ি ছিল, অন্তত একটা নদী তো ছিল, সেই নদীগুলোকে আর আদৌ নদী বলা যায় না, সেগুলো একরকম বঙ্গোপসাগরের অংশ হয়ে গেছে, সেটা আজ স্বল্প পরিসরে আমরা আলোচনা করতে পারবো না। কিন্তু নদীবাঁধটাই মোটামুটি একটা গ্রহণযোগ্য লব্জ, আমরা স্থানীয়ভাবেও সেটা বুঝি এসেছি, বাইরের লোকজনদেরও বোঝার সুবিধা, ফলে সেটা ধরেই আমরা এগোতে পারি এবং আমি সরাসরি আমাদের সমস্যাপটে চলে যাবো। প্রথম পর্বে ডক্টর চৌধুরী যা বলেছিলেন এবং আমার সহকর্মী বন্ধু অমিতেশদা যা বলেছিলেন তার প্রত্যেকটা পয়েন্ট এর সঙ্গে আমি একমত, তা বলাই বাহুল্য। ওঁরা যেগুলো বলেছিলেন সেগুলো আজ আর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না।

    আমি সরাসরি বাঁধেরর বিষয়ে চলে যাচ্ছি। মূলত কথা হচ্ছে মাটির বাঁধ না কংক্রিটের বাঁধ নিয়ে। সেটা ঘিরেই লোকজ জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার কথা যেটা বলা হচ্ছে সেই জায়গা থেকেই মূলত আমরা কথা বলবো, কারণ আমি অন্তত এই যে বাঁধ, যার সঙ্গে প্রযুক্তির একটা সম্পর্ক আছে এবং প্রশাসনের একটা সম্পর্ক আছে এবং কর্মীদের সম্পর্ক আছে তার কোনোটাই নই। আমি বাঁধের প্রযুক্তি বিশারদও নই, বাঁধ-বিষয়ক বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যে প্রশাসন তারও অংশ নই, আবার তা হাতে-কলমে নির্মাণ করেন বা তৈরি করেন যে কর্মীরা সেই দলেও পড়ি না। কাজেই, সেই জায়গা থেকে বলার অধিকার আমার নেই। আমি যে জায়গা থেকে বলব সেটা হচ্ছে আমরা যেমনটা দেখেছি, তার মধ্যে আমার দেখাটা খুব একটা কম নয়, এটা আমি জোর গলায় বলতে পারি। সেটা সুন্দরবন অঞ্চলে ছোটবেলায় কাটিয়েছি বলেই শুধু নয়, পরবর্তীকালে নানা ধরনের কাজকর্মের জন্য সুন্দরবনের পশ্চিম থেকে পূর্ব কেন প্রায় সবটাই আমি ঘুরেছি বলতে পারি। সাগর থেকে শামশেরনগর পর্যন্ত সুন্দরবনের যতগুলো দ্বীপ আছে ষতগুলো গ্রাম পঞ্চায়েত আছে তার প্রায় সবটাই আমি ঘুরেছি। বাংলাদেশ সুন্দরবনেরও পশ্চিম থেকে পুব প্রায় 47 টা ইউনিয়ন পরিষদ যার মধ্যে পড়ে সেটাও আমি ঘুরেছি এবং সেটাও শুধুমাত্র সুন্দরবনের জঙ্গল লাগোয়া যে জনবসতি সেই অঞ্চলে। সেটাও কাজের সূত্রে, বিশ্বব্যাঙ্কের সমীক্ষায় সুন্দরবনের ভালনারিবিলিটি বিষয় হিসেবে ছিল, ফলে সেখানেও মূলত বাঁধ এবং তার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকা ইত্যাদি নিয়ে আমাকে কাজ করতে হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে এটা ভাবতে ভালো লাগে সুন্দরবনের জন্মেছি, বড় হয়েছি। আমরা সবাই জানি যে জন্মানো-বড় হওয়া মানুষদের অনেকেই, একটা বেশ ভালো শতাংশ মানুষ সেই অর্থে স্যাংচুয়ালি বলতে যে এলাকাটা বুঝি এখনো দেখে উঠতে পারেনি। সেরকম একটা অবস্থা থেকে আমি যে সামগ্রিক সুন্দরবন, তার পশ্চিম থেকে একেবারে পুব পর্যন্ত দেখে উঠতে পেরেছি তা আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। যেহেতু নদীবাঁধ ধরে ধরেই আমাকে কাজটা করতে হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতার জায়গা থেকেও আমি এই তিনটে জিনিসকে বলার চেষ্টা করব। তার দুটো আমি বলেছি, মাটির বাঁধ ও কংক্রিটের বাঁধ। তার সঙ্গে আরো একটা জিনিস যোগ করব যেটা একটা লেজুড় হিসাবে আসবে, বাঘের পিছনে ঘোগ আসার মত। সুন্দরবনের যেসব শ্রোতা ভাইবোনেরা আছে তারা নিশ্চয়ই পরিচিত। বাঁধের প্রসঙ্গে এই শব্দটার অনেক গুরুত্ব আছে। রিংবাঁধ খানিকটা লেজুড় হিসেবেই এই আলোচনাতে আসবে।

    আসলে বাঁধ নিয়ে কথা বলতে যাওয়ার অনেক সমস্যা আছে। অন্তত ভারতের যে সুন্দরবন অংশ সেখানে অনেক বছর পর্যন্ত, বেশ কয়েক দশক পর্যন্ত আমরা শুনে আসছিলাম সুন্দরবনের নদী বাঁধের দৈর্ঘ্য হচ্ছে আড়াই হাজার কিলোমিটার সব মিলিয়ে। যেটা সম্ভবত তুষারবাবুর বারবার লেখা একটা সংখ্যা, যে সংখ্যাই আমরা ব্যবহার করে আসছিলাম। মাত্র কিছুকাল আগে পর্যন্ত ওটাই সংখ্যা জানতাম। সম্প্রতি বাঘ নিয়ে চর্চা হচ্ছে এমন এক জনপ্রিয় দৈনিক থেকে জানতে পারছি সংখ্যাটা আরেকটু বেশি হবে, সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজারের মাঝামাঝি কিছু একটা। আমরা যেটা জানতাম আড়াই হাজার তার থেকে অনেকটাই বেশি। সেটা কী করে হয়েছে আমি জানি না। তাহলে ধরে নিতে হবে আরো কিছু বদ্বীপ বেড়েছে। অথবা এই নদীর চর ঘিরে যে নতুন করে বসতিস্থাপন হয়েছে সেই বাঁধগুলো যুক্ত হয়েছে। তাতেও প্রায় আক্ষরিক অর্থেই দ্বিগুণ কিভাবে হয়ে যেতে পারে আমি বুঝতে পারছি না। হয় আমরা এখন এই পরিমাপটা ভুল বলছি বা এতদিন ভুল জেনে এসেছি। এইটা একটু মাথায় রাখার অনুরোধ করব। তার সঙ্গে আমি যেটা বলব সেটা হচ্ছে যে, এই যে বাঁধের পরিমাপ আড়াই হাজার হোক বা সাড়ে চার হাজার এর চেয়ে একটু বেশিই হোক, এর বেশিরভাগটাই যে মাটির বাঁধ সে বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই, চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে তাঁরা খুব ভাল করেই জানেন। এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আমি এটাও খেয়াল করিয়ে দেবো এই বেশিরভাগ মাটির বাঁধের বেশিরভাগটাই কিন্তু দ্বীপের ভিতরের বাসিন্দাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমরা কতখানি বাঁধ ভেঙে গেছে সে দিকে যদি একটু তাকাই (এই হিসাবটা নিয়েও যদিও সমস্যা আছে) এবং কতখানি বাঁধ ভাঙেনি, উপচে জল উঠেছে সেইটা যদি আমরা মাথায় রাখি (এখন পর্যন্ত কাগজে সংখ্যাটা 134 বলা হচ্ছিল, সেই সংখ্যা বাঙালির মাথায় অনেকটা ঢুকে গেছে সেই কারণে হয়তো এই ফিগার আমরা পেয়েছিলাম, পরে যেটা হয়েছে 170 এর কাছাকাছি যদি ধরে নিই বাস্তবে সেটা 200-এর কাছাকাছি) সেটা কিন্তু খুবই কম। খুব কম বলে যে সেটার গুরুত্ব দেওয়া হবে না এই প্রশ্নে কিন্তু আমি যাচ্ছি না। আমি এটা বলতে চাইছি যে মাটির বাঁধ যে সুরক্ষা দিতে পারে, সেটা কিন্তু সুন্দরবন অঞ্চল নিজেই তার যথেষ্ট প্রমাণ। কেননা, বেশিরভাগ এলাকাকে, হয়তো 98 শতাংশের বেশি এলাকাতে সুরক্ষা দিতে পেরেছে সেটা আমাদের চোখের সামনেই আছে। এখন যে জায়গাগুলো পারেনি, সেগুলোতে নিশ্চয় অন্য কারণ কাজ করেছে, সেগুলো নিয়ে হয়তো আমাদের কথাবার্তা বলতে হবে।

    এখনই মাটির বাঁধ নিয়ে যদি আরেকটু কথা বলি তাহলে বলব যে, সেটা একটু উঁচু করবার দরকার আছে, আরেকটু শক্তপোক্ত করার দরকার আছে। এটা খুব কমন সেন্সের একটা কথা যেটা সুন্দরবন বা বাইরের কোন জায়গার সাধারণ শিশুরাও বুঝতে পারবে। কিন্তু সেটা যে কোথাও কোথাও ঘাটতি থেকে গেছে উঁচু করা বা আরেকটু শক্তপোক্ত করার, সে আমরা প্রায় সকলেই জানি। সেই জায়গাগুলো দিয়েই যে বেশ কিছু মানুষকে বিপদের মধ্যে পড়তে হয়েছে এবং প্রতিটা ঝড়ের আগে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে হয়, সেটাও আমরা দেখেছি। মাটির বাঁধ শক্তপোক্ত করার জন্য বেশ কিছু কথা বলা হয় যার মধ্যে খুব সম্প্রতি একটা কথা বলা হচ্ছে যে কিছু একটা খাস লাগানোর হতে পারে। সেই ঘাসের ছবি আমি দেখেছিলাম। যেটা আমি এখনও পর্যন্ত ঐ ঘাসটা সম্পর্কে গবেষণা করে উঠতে পারিনি সেটা হচ্ছে ওই ঘাসটা বৃষ্টির জলেই শুধুমাত্র বেড়ে ওঠে-বাঁচে, নাকি জলের পক্ষেও টেকসই বা সহনশীল? এখন এই নোনা জল বা মিষ্টি জলের চরিত্র যে সম্পূর্ণ আলাদা এবং বিশেষ করে ভেজিটেশনের প্রশ্নে সব ধরনের গাছ যে নোনাজলক সইতে পারেনা বা বেঁচে থাকতে পারে না, এই প্রশ্নটা মাথায় রাখা খুব জরুরি। যখন প্রশাসনিক স্তর থেকে খুব বড় একটা সিদ্ধান্ত হিসেবে, নদিয়া বা মুর্শিদাবাদে যেটা সফল হয়েছে সেই ঘাস দিয়ে বাঁধকে টিকিয়ে রাখা হবে এই ভাবনাটা যদি সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও ভাবা হয় তখনও একটা পরীক্ষা করে দেখার বিষয়---- যে ঘাসটার কথা ভাবা হচ্ছে সেটা আদৌ নোনাজলে টিকতে পারবে কিনা। তার বদলে ভাবা যেতে পারে আর এক ধরনের ঘাস যেটা সুন্দরবনে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, সেটা অনেক সময় সাধারণ মানুষ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতেন, সেটা হচ্ছে ধানি ঘাস। যারা সুন্দরবনে বেড়াতে গেছেন তারা দেখেছেন যে একটু নদীউপকূলের চরে সবুজ এক-দেড়-দুই-আড়াই হাত উঁচু ঘাসের মত জিনিস রয়ে আছে, সেখান হরিণ চরতে থাকে যা আমাদের দেখতে খুব ভালো লাগে--- সেই ধানি ঘাস লাগানো যেতে পারে কাঁচাবাঁধের ক্ষেত্রে এবং সেটা চমৎকার হতে পারে। এটা বাঁধকে শক্তপোক্ত করতে পারে। এছাড়া খুব প্রাকৃতিকভাবে, স্বাভাবিকভাবেই আর ঘিরিয়া পালং আর যদু পালং, এই দুই-ধরনের অন্তত ম্যানগ্রোভ যেটা খুবই ন্যাচারালি হয় সেগুলো কিন্তু লাগানো যেতে পারে। এই ঘাসের যে কার্যকারিতা কথা বলা হচ্ছে, সেটাও হতে পারে।

    এই প্রসঙ্গে আর একটা জিনিস আমি বলি যে মাটির বাঁধ কিন্তু সেইক্ষেত্রে খুবই উপযুক্ত হবে যেখানে বাঁধের থেকে নদীর দিকে খানিকটা চর আছে। আর এই চর থাকা জায়গার কারণেই মাটির বাঁধের উপরে আক্ষরিক অর্থে প্রায় বেশিরভাগ জায়গাতে চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যাবে। তাকে একটু উঁচু করতে হবে, শক্তপোক্ত করতে হবে। আর আমি এটা কখনো বলবো না যে ম্যানগ্রোভ লাগাতেই হবে। আমি যে ধানি ঘাস বা ঘিরিয়া ঘাস, যদু পালঙের কথা বললাম সেগুলো লাগাতে হবে এরকম দাবি আমি করছি না। 5 কোটি গাছ লাগানোর কোন দরকার নেই কিন্তু তার একটা বিকল্প অনুরোধ আমার করবার আছে সেটা হচ্ছে ম্যানগ্রোভ গাছ। ম্যানগ্রোভ খুব ভালো মানুষ চেনে। কয়েক হাজার বছর আগের আর্কিওলজিকাল এভিডেন্স যদি দেখেন তাহলে দেখবেন যে, রাজমহল পাহাড়ের যে পাদদেশ অর্থাত্ বিহার-বাংলা সীমান্ত পর্যন্ত, আমরা ম্যানগ্রোভের উপস্থিতির দৃষ্টান্ত পাচ্ছি। তো, মানুষের দ্বারা সেটা এখন শুধু সুন্দরবনে গিয়েই ঠেকেছে। তাই, ম্যানগ্রোভ মানুষের দয়ার উপর নির্ভর করে না।

    ম্যানগ্রোভ যেভাবে বেঁচে ওঠে বেড়ে ওঠে, দুই মেরুপ্রদেশ বাদ দিলে পৃথিবীর সর্বত্রই যেখানে নোনাজল আছে, খাঁড়ি এলাকা আছে সেখানে ম্যানগ্রোভ আছে। ম্যানগ্রোভ নিজেই সেই ব্যবস্থা করে নিয়েছে, নদীর যদি একটুকরো চর পড়ে থাকে বা নদীবাঁধ যদি কাঁচা হয় তাহলে। যে প্রয়োজনীয় ম্যানগ্রোভগুলো বাঁধকে সুরক্ষা দিতে পারে, মাটিকে ভাঙনের হাত থেকে বাঁচাতে পারে, সেগুলো ম্যানগ্রোভ নিজেই করে নিতে পারে। তারপরেও গাছ লাগানোর প্রশ্ন আসছে? সেটার কারণ হচ্ছে ওই গাছগুলো আমরা কেটে ফেলি। আঞ্চলিকভাবে হোক আমাদের সচেতনতার অভাবে হোক আমরা গাছগুলো কেটে ফেলি ব'লে--- আবার সেখানে গাছ লাগানোর প্রশ্ন আসছে।

    তো, এই দুটো কাজ একসাথে করবার দরকার নেই যে আমরা গাছ লাগাব আবার যাতে কাটা না হয় দেখব। গাছ লাগানোর দরকার নেই, ওটা ম্যানগ্রোভের হাতে ছেড়ে দেওয়াটাই যথেষ্ট। ম্যানগ্রোভ নিজেই আসবে, গজাবে এবং যথেষ্ট জায়গা নিয়ে তার উপযুক্ত প্রাকৃতিক নিয়মেই হবে। আমাদের শুধু একটা দায়িত্ব নিলেই হবে যে ওগুলো যেন আমরা কেটে না ফেলি। এরকম একটা পরিস্থিতিতে আমার মনে হয় মাটির বাঁধই যথেষ্ট। বেশিরভাগ জায়গার ক্ষেত্রে সুন্দরবন অঞ্চলে, আমাদের অন্যকিছু নিয়ে দুশ্চিন্তার কোন কারণ আছে বলে মনে হয় না।

    তাহলে, কংক্রিটের বাঁধের প্রশ্ন কোথায় আসছে? কংক্রিটের বাঁধ কি আদৌ দরকার নেই? এমনিতে আজকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস, যদি সত্যি সত্যি আমাকেই জিজ্ঞাসা করেন তাহলে আমি বলব, বিশ্বের কোথাও হয়তো কংক্রিটের বাঁধের কোনকালেই সেরকম প্রয়োজন ছিল না। কাজেই, নদী বাঁধের ক্ষেত্রেও সেটা হয়তো খানিকটা সত্যি। কিন্তু আমরা জানি, গোটা দুনিয়াটা যে আইডিয়ালিস্টিক ওয়েতে চলে এরকম তো কিছু না। নানান ধরনের স্থলন-পতন, মানুষের লোভ-প্রবৃত্তির নানান কিছু আছে। যে কারণে আমাদের কিছু জিনিস অন্যভাবে ট্যাকেল করতে হয়। কংক্রিটের বাঁধ নিয়ে প্রশ্নটাতে আমি সেই জায়গাতেই যাব। কিছু জায়গা অন্তত আমরা যে চাক্ষুষ করেছি আর একটা কথা বলি এই যে ছোটখাট কিছু একটা ঝড় আসে আর ঝড় অনেক যে বাঁধ উপচে পড়ে, বাঁধ ভেঙে পড়ে, এটা কিন্তু বাংলাদেশের ছবি নয় বাংলাদেশের যেহেতু আমি সুন্দরবন সংলগ্ন প্রায় 95% ইউনিয়ন পরিষদ ঘুরেছি জলপথ এবং বেশ খানিকটা নদীবাঁধ বরাবরাই, সেখানে যে পর্যন্ত রাস্তা বলা হয় যে নদীবাঁধগুলোকে, সেগুলো আমরা বিশ্বাস করতে পারব না চোখে না দেখলে। যারা দেখেছে তাদের নিশ্চয়ই মনে থাকবে সেগুলোর যা দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ, আড়ে-বহরে যতটা বড় রাস্তা সেগুলো, আমাদের এখানে আড়েবহরে সবচেয়ে বড় রাস্তাটাও হয়তো সেরকম নয়। কাজেই কথায় কথায় সামান্য কিছু একটা ঝড় এলে, আমরা নিশ্চয়ই জানি গত 20/30 বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যাবে যে বাংলাদেশের সুন্দরবনকে অনেক বেশি আঘাত নিতে হয়েছে। যার মধ্যে সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে কঠিন আঘাতটা সিডারের সময় ছিল যেটা বাংলাদেশের জঙ্গল এলাকাগুলো নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। এবার আমাদের আয়লার সময়ে যে ত্র্যহস্পর্শ ঘটেছে, জলোচ্ছ্বাস-ঝড়-ভরা কোটাল (কোটালকে কোথাও কোথাও 'কটাল' বলা হচ্ছে, কেন বলা হচ্ছে সেটা আমি জানি না, সেই নিয়ে একটা আলোচনা হতে পারে)।

    বাংলাদেশে বাঁধের দৈর্ঘ্য প্রস্থ আমি যা দেখলাম সেটা ওদের অনেকটা বাঁচিয়ে দিয়েছে। ওদের ওখানে সামান্য ছোটখাটো ঝড়ের বিকট পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, বিপুল পরিমাণ মানুষ তারা অসহায় অবস্থায় খোলা রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে জনবেষ্টিত হয়ে দাঁড়াচ্ছে, পরিস্থিতি কিন্তু এমন নয়। বাংলাদেশ খুলনার দক্ষিণাঞ্চলে কিছু এলাকায় আমি দেখেছি, জানিনা সেটা আমার উত্তর 24 পরগনার কোন প্রভাব সেখানে আছে কিনা। দুটো এলাকা সাংস্কৃতিকভাবে ভীষণ কাছাকাছি, রাজনৈতিকভাবে যতই আলাদা হোক না কেন।

    কৈখালি এবং ইছামতীর এপার ও ওপারে যে ভেড়ি কালচার, সেটা আমি স্থানীয়ভাবে কথা বলে যা শুনেছি সেটা পনেরো কুড়ি বছরের বেশি নয়। এই ভেড়ি কালচার এবং উত্তর 24 পরগনার দিকে যদি তাকান, তাহলে বাঁধের উপরে ভেড়ি সংস্কৃতি-ভেড়িকে ঘিরে যে সমাজ এবং রাজনীতি এবং অর্থনীতি তার প্রভাবের দিকে যদি খেয়াল রাখেন, তার খানিকটা অনুরূপ পরিস্থিতি দক্ষিণে মুন্সিগঞ্জ-ঈশ্বরীপুর-কৈখালি ও হিঙ্গলগঞ্জের উল্টো পারের বেশকিছু এলাকাতে এটা শুরু হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশে আমার এই ভ্রমণটা আয়লার দু আড়াই বছর পরে ছিল, ফলে জিনিসটা আমার মাথায় ছিল এবং স্থানীয় লোকের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলে বুঝেছিলাম এখানেও ওই ভেড়ি এলাকাগুলোতে যেখানে সচেতনভাবে এবং নানা কারণে ওই বড় বাঁধ শক্তপোক্ত রাখতে দেওয়া হচ্ছে না। যে ঘটনাটা আমাদের উত্তর 24 পরগনার ক্ষেত্রে সত্যি। সন্দেশখালি ইত্যাদি এলাকার ক্ষেত্রে, সেই ঘটনার এখানেই পড়েছে এবং এখানে সমস্যা বলতে শুধুমাত্র সেই সমস্ত এলাকাগুলোয়। কেউ হয়তো যুক্তির খাতিরে এটা বলতে পারেন যে, ভারতের সুন্দরবন এলাকায় যে তিনটে বা চারটে খুব বড় বড় নদী (এক সময় নদী ছিল, যেটা এখন আর নদী বলবো না, খাঁড়িই বলবো) যেটা বয়ে গেছে---জনবসতি দেশগুলোকে যতটা ভারনারেবল করেছে---শব্দমুখী থেকে শুরু করে রায়মঙ্গল পর্যন্ত মাঝখানে মাতলা, ওদিকে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র আছে --- এই চারটে বড় নদী যেগুলো মোহনার কাছে পৌঁছলে সাগরের মতো মনে হয়। ঘটনা হল, বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকা বেশি এলাকা জুড়ে হলেও সেখানে এরকম ছবি নেই। আমরা জানি সুন্দরবনের প্রায় বেশিরভাগটাই, প্রায় 65 শতাংশ বাংলাদেশের, ফলে, স্থানীয় মানুষের বসতি যে দ্বীপে সেখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত জঙ্গলদ্বীপের বিস্তৃতি আছে। সেটা হয়তো বাংলাদেশের একটা অ্যাডভান্টেজ যেটা আমাদের অনেক ক্ষেত্রেই নেই। আমাদের পশ্চিমাংশে সমস্যাটা নেই।

    কিন্তু বাংলাদেশের বাঁধের চেহারা দেখে আমরা শিক্ষা নিতে পারি, মাটির বাঁধের উপরে অনেকটা আস্থা রাখতে পারি। মাটির বাঁধ যতই শক্তপোক্ত করার কথা বলা হোক সামান্য কিছু পকেট কিন্তু আমরা দিতে বাধ্য। এক নম্বর, সেখানে আমাদের হঠকারিতার জন্যই হোক বা আমরা এতদিন বাঁধের যত্ন নিইনি বলেই হোক বা প্রাকৃতিক নিয়মেই হোক (প্রাকৃতিক নিয়মে হতে পারে) অমিতেশদা যেটা বলছিলেন, নদী যে সর্পিলভাবে যাতায়াত করে তাতে করে সে একদিকে ক্ষয় করে, আরেকদিকে জমিটাকে তুলে দেয়, এইভাবে তার যাতায়াতটা চলতে থাকে। সাপকে যেরকম সর্পিলভাবে যেতে হয় তার একটা প্রযুক্তি আছে, নদীও যেভাবে বয়ে যায় তার মধ্যে এই বাঁক নেওয়ার ঘটনাটা ঘটে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়কার্যটাও ঘটে। সেটা প্রাকৃতিক নিয়মেই স্বাভাবিকভাবেই ঘটে। ফলে সেটাও একটা কারণ। সুন্দরবনের কিছু কিছু এলাকায় আমরা দেখব যেখানে চর থাকছে না, চরের একটা ভাঙন স্বাভাবিক নিয়মেই হচ্ছে সেরকম এলাকায় আমাদের কংক্রিটের কথা ভাবতে হবে। এরকম কিছু টপোগ্রাফিকাল রিজিয়ন আছে যেটাকে আমরা সুন্দরবনের অঞ্চলে বলি --- "কোণা"। মানে এমন একটি এলাকায় যেটার তিনদিকেই হয়ত জল, ফলে স্রোত বা ঝড়-ঝাপটা তাকে তিনদিক থেকেই সহ্য করতে হয়। ফলে, মাটির বাঁধ সেখানে হয়তো যথেষ্ট নয়, ভারনারেবল।

    আবারও বলবো যে, যদি আমরা সুন্দরবনের পরিমাপ দেখি, এই ধরনের ভারনারেবল এলাকার সংখ্যা কিন্তু বেশি নয়। অন্তত বিশ-ত্রিশ বছর আগে এত বেশি ছিল না। আমাদের অবহেলার দরুন সেটা এখন হয়তো একটু বেশি হয়েছে। আজকেও কাগজে দেখছিলাম যে এই ধরনের জায়গায় কিন্তু কংক্রিটের বাঁধ বেশ খানিকটা সুফল দিয়েছে। যদি কংক্রিটের বাঁধও কাজ না করে, (কংক্রিটের বাঁধ যে কাজ করবে না সেটাও খুবই প্রাকৃতিক নিয়ম, সেটা আগের দিন অমিতেশদা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছিলেন যে, নদীখাতে যে স্রোতটা থাকে সেই গতিটা একসময় নদীর তলার দিকে বাঁধ বরাবর বইতে শুরু করে। ফলে উপরে কংক্রিট আর যা-ই দিন সেটা ভেঙে পড়তে বাধ্য। বাধ্য কারণ, বাঁধের ভিতটাই থাকছে না।) সে ক্ষেত্রে আমি যে এ প্রস্তাবের কথা বলেছিলাম, যেটা আমার প্রস্তাব নয়, সর্বজনগ্রাহ্য একটা প্রস্তাব, যেটা অনেককাল আগেই গ্রহণ করা হয়েছে এবং খুব সফল ভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে সেটা হচ্ছে রিং বাঁধ। (রিং বাঁধ, যার একটা চমৎকার বাংলা পেলাম--- বেড়ি বাঁধ। এটা নিশ্চয়ই জনপ্রিয় প্রাবন্ধিকরা ব্যবহার করলে একসময় জনপ্রিয় হবে এবং সবাই বেড়ি বাঁধ বলবে, সেটা বলতে পারলেই ভালো।) মুশকিল হচ্ছে, রিংবাঁধ জিনিসটা আমরা যে জায়গাগুলোতে করেছি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, আমরা খুব একটা মন দিয়ে জিনিসটা করিনি, তাই এটাও যে সবসময় খুব সফল হয়েছে এমন কিন্তু নয়। মন দিয়ে করিনি কেন? ধরুন নদীকে যে জমিটা আমি ছাড়লাম--- ধরে নিচ্ছি, জমিটা খুবই চর। মজাটা হচ্ছে, আপনারা খেয়াল করবেন রিংবাঁধ যত জায়গায় আছে---ওই বাঁধটা দেয়া হয়েছে নদীকে দেওয়া সদ্য চরের মাটিটা দিয়ে এবং চরের মাটিতে এমন ভাবে কেটে বাঁধটা দেয়া হয়েছে যে, নদীকে আসলে আমি চরটা দিলাম না। সেটাকে গর্ত বানিয়ে আমি অলরেডি নদীখাতের সাথে মিশিয়ে দিলাম। অথচ আমি যদি নদীকে ওখানে যে জমিটা ছাড়লাম সেটা চর হিসেবে রাখতাম এবং যেহেতু অংশটা 100-500 মিটারের বেশি নয়, সেইটুকু জায়গায় আপৎকালীন বিপদ লাগিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারতাম। কবে ন্যাচারালি ম্যানগ্রোভ হবে তার জন্য অপেক্ষা না করে শুরু থেকেই ম্যানগ্রোভ লাগিয়ে দিতে পারতাম , সে খুব দ্রুত বাড়ে কাজেই সমস্যা নেই। সেটা কিন্তু আমি কোথাও দেখিনি। সর্বত্র দেখেছি রিংবাঁধের জন্য যে জায়গা ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, সেই জায়গাটা-ই নদীখাতের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটা নিয়ে বাঁধটা তৈরি করা হচ্ছে। আপনারা জানেন বিভিন্ন কারণ আছে, কেন রিংবাঁধগুলো নতুন অথচ পুরনো বাঁধের থেকে নিচু, কেন রিংবাঁধই বরাবরই বারবার ভাঙে, তার পিছনে কী রাজনীতি?

    আমি তিন ধরনের বাঁধ নিয়ে বলে ফেলেছি। এই তিন ধরনের বাঁধের মধ্যে, আমি সংক্ষেপে একটি বাক্যেই বলি, মাটির বাঁধ সেটাই যথেষ্ট।

    দুই, মাটির বাঁধ কোন কোন ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়, এই জায়গার পরিমাণটা কম। কাজেই কংক্রিটের বাঁধ দরকার। অর্থনৈতিক দিক থেকে সেটুকু না করতে পারার কোন কারণ আমি দেখি না।

    তিন, কংক্রিটের বাঁধ কোন কোন ক্ষেত্রে ভেঙে পড়তে পারে, সে ক্ষেত্রে আমরা রিংবাঁধের দিকে এগোব।

    অমিতাভ সেনগুপ্ত: আমরা খুবই ইমপর্টেন্ট কতগুলো জায়গা পেলাম, এই যে প্রেস্ক্রিপশন আসছে যে রাতারাতি পাঁচকোটি ম্যানগ্রোভ চারা লাগাতে হবে। এটার ভিতর ডক্টর মণ্ডল একটু সংশয় প্রকাশ করেছেন যে এটা বোধহয় খুব বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হবে না। আরেকটা বিষয় ওনার কথাতে এসেছে, উনি ভার্টিপ্ল্যান্ট ঘাসের কথা বলছিলেন এবং বলছিলেন এটা নিয়ে আরেকটু গবেষণা করতে হবে। কিন্তু প্রথাগতভাবে এর বিকল্প হিসেবে যদি স্থানিক জ্ঞান হিসাবে যদি এর চর্চাটা হত বাঁধ বাঁচানোর বা সুন্দরবনের ভূমির রক্ষার ক্ষেত্রে, উনি এই যে যদু পালং বা ন্যাচারাল ম্যানগ্রোভের কথা বলছিলেন, এগুলো যথেষ্ট লাগানো হয়েছে বলছিলেন এবংবলছিলেন ভূমিক্ষয়ের ক্ষেত্রে কার্যকরী ফলাফল হয়েছে। এটা দীর্ঘকাল ধরে গ্রামের মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের স্থানিক জ্ঞান থেকে লাগিয়ে এসেছে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা তথ্য আমাদের জন্য। কারণ সম্প্রতি এই ভার্টিপ্লান্ট গাছ নিয়ে একটা কথা উঠে এসেছে, কিন্তু শেষপর্যন্ত তুষার কাঞ্জিলালের রেফারেন্স দিয়ে ডক্টর মন্ডল বললেন --- শেষ পর্যন্ত কিন্তু আমাদের মাথায় রাখতে হবে যতটুকু বাঁধ ভেঙেছে তার তুলনায় যতটা বাঁধ রক্ষা পেয়েছে লড়াই করে, সেটা অনেকটাই। এবং বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে উনি বলছিলেন যে, বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমরা দেখব যে সুন্দরবনের একটা বড় অংশ বাংলাদেশে এবং সেখানকার অনেকেই নদী পাড়ের মানুষ। তারা কিন্তু এখনও পর্যন্ত বাঁধের পাড়েই আছেন, বাঁধকে রক্ষা করতে পেরেছেন এবং বাঁধ গ্রাম বাঁচাতে পেরেছে।

    তো আমরা এরপরই সুন্দরবনের রাঙাবেলিয়া একজন মানুষ আছেন আমাদের সাথে, বন্ধু মনোজিতদা। এবং আরেকজন আছেন তিনিও সুন্দরবনেরই মানুষ, রাধাকান্ত সরদার। মনোজিত মণ্ডলকে বলব আমাদের সামনে অল্প সময়ে তার অভিজ্ঞতা, প্রফেসর মণ্ডল যেভাবে বললেন সে বিষয়ে কোন মতামত থাকলে জানাতে---

    মনোজিত মণ্ডল: আমার কথা হচ্ছে, হঠাৎ করে আমাদের সুন্দরবনবাসী জেগে উঠেছে এ কারণে যে, কোন একটা বড় বিপর্যয় ঘটে গেলে তখন মানুষ জেগে ওঠে। তারপরে কিন্তু মানুষ সেই জা়গাটা আবার ভুলে যায়। আমরা কী করছি? ত্রাণ পাচ্ছি, চারিদিক থেকে ত্রাণের বন্যা বয়ে আসছে, সরকার সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিচ্ছে, তারপর আবার কিন্তু ভুলে যায়। তারপরে সুন্দরবনের কথা, আমরা কেউ মাথায় রাখি না।

    ঘটনা হচ্ছে, আমাদের সুন্দরবনবাসী যদি না জাগে, সেটা কংক্রিটের বাঁধ হোক বা চওড়া করে মাটির বাঁধ হোক যে কোনো একটা করতে হবে। এই যে বারেবারে বিপর্যয় হতে হতে আমাদের সমস্ত কিছু দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, ফলে প্রতিবার এমনভাবে বিপর্যয় আসে, আমরা যেভাবে ভয়ে থাকি, যেভাবে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়, গভর্নমেন্ট তো সেই ক্ষতিপূরণটা করতে পারে না। তারপরও যেটা হয়, গভর্নমেন্টের এত পরিমাণ অর্থ তছনছ হয়, সেটা দিয়ে যদি সুন্দরবনের শক্তপোক্ত নদীবাঁধ করা যায় তবে খুবই ভালো হয়। সুন্দরবনে শক্তপোক্ত নদীবাঁধ আমি দেখেছি আমার রাঙাবেলিয়াতে, বহুরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমাদের এখানে হয়েছে। একটা সময় দেখেছি নদীর চরও ছিল, ম্যানগ্রোভ এবং ধানিঘাসও ছিল--- সে বাঁধও আজ আর নেই।

    এখান মণ্ডল স্যার যে বললেন যে রিংবাঁধের কথা, তাও আমি আমার চোখে দেখেছি এখানে। এখানে সেচ দপ্তর থেকে বিভিন্ন রকম প্লানিং করে ইঞ্জিনিয়াররা যে খাঁচা তৈরি করে তোলে, সেই খাঁচাগুলো কিছুদিন পরে আবার টেনে নিয়ে গিয়ে নদীগর্ভে অবস্থান করে দেয়, যেখানে পলি জমে যায়। এই যে ধানি ঘাসটা দেখেছি আমি, চর যেখানে তৈরি হয় সেখানে কিন্তু ধানি ঘাসটা লাগানোর কোন প্রয়োজন হয় না, অটোমেটিক্যালি ঘাসটা জন্মে যায়। ফলে দেখা যাচ্ছে, বড় বড় বাঁধগুলোও অনেক নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। আমার বাড়ির সামনে এই কদিন আগে যে ঘটনাটা ঘটে গেল,একটা খাল কেটে এমন ভাবে টেনে নিয়ে গেছে যে একটা বড় খালের মতো হয়ে গেছে।

    এখানে কী হচ্ছে নোনা জলের যে মিষ্টি মাটিটা তার শক্তি হারিয়ে ফেলে। তো, আমাদের সুন্দরবনে যদি কংক্রিটের নদীবাঁধ হয়, ১৫০ ফুট একটা ঢাল করে যদি নদী বাঁধকে তৈরি করা যায। অর্থাত কান্ট্রিসাইডে যদি ১৫০ ফুট এবং মাথার দিকে ১৫/২০ ফুট রাখা যায়, এই জলোচ্ছ্বাসটা হয়তো আটকানো যেতে পারে আর নদীভাঙন রোধ করা যেতে পারে। এবং এই কান্ট্রিসাইডে যে ঢালটা আছে ওখানে কিন্তু প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগানো যেতে পারে। এখানে কোন ধরনের গাছ গুলো বেশি লাগানো যেতে পারে? দীর্ঘমেয়াদি যে কাজগুলো, আমার মনে হয় যদি নারকেল গাছ লাগানো যায় বা তাল গাছ লাগানো যায়। এগুলো কিন্তু খুব দীর্ঘমেয়াদি এবং শক্তপোক্ত, নোনা জলে নষ্ট হয়না। এই ধরনের কাজগুলো যদি লাগানো যায় প্রচুর ম্যানগ্রোভ কিন্তু এখানে হবে।

    কিন্তু কংক্রিটের নদীবাঁধ, বৈজ্ঞানিক মহলে যেটা নিয়ে শুনতে পাচ্ছি যে নদীবাঁধ হলে ক্ষতি হবে, অমুক হবে- তমুক হবে। আমাদের কথা হচ্ছে নদীবাঁধ কংক্রিটের হলে খুবই ভালো হয়। আয়লার পরে আমি যেটা তুষার কাঞ্জিলাল বাবুর কাছে শুনেছি, এখানে যখন মিটিং হত, আয়লার পরে একটা বড়ো বিপর্যয় হয়ে যাবার পরে তিনি সুন্দরবনের উন্নয়ন দপ্তরে ছিলেন, বিভিন্ন জায়গায় চিৎকার চেঁচামেচি করে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের কাছ থেকে একটা টাস্কফোর্স গঠন হয়েছিল। টাস্কফোর্স গঠন হওয়ার পরে বিভিন্ন রিপোর্ট তৈরি হয়, সবাই মিলে এটা করেছিল। তাহলে তার যে পরিকল্পনাটা তৈরি হয়েছিল সেই প্ল্যানিং অনুযায়ী আর কাজ হয়নি। কিছু কিছু জায়গায় বোধহয় কাজ হয়েছিল আরকী। সেখানেও কেন্দ্রীয় সরকার অর্থদপ্তর থেকে ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি কিছু অনুমোদনও হয়েছিল, কিন্তু লাগবে যেটা সেটা হচ্ছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। সেই টাকাটা কোথা থেকে আনা যায় উনি ব্যাখ্যাও করে দিয়েছিলেন।

    আমার কথা হল, যে পরিকল্পনাটা হয়েছিল সেই কাজগুলো এতদিনেও বাকি থেকে গেল কেন! আর আমি জ্ঞানত কোনোদিন দেখিনি নদীবাঁধগুলোতে মাটি পড়তে, নদীবাঁধগুলো কঙ্কালসার হয়ে দাড়িয়ে আছে। এখানে রাজনৈতিক নেতাদের একটা সোনার হাঁসের ডিম পাড়ার মতো অবস্থা হয়ে গেছে। আয়ের উত্স তৈরি হয়ে গেছে তাদের। নদীর বাঁধে প্রতি বছর দু-ঝাড়া মাটিও দেওয়া হবে আর দশ ঝাড়ার টাকা তুলে নিজেদের পকেট ভরানো হবে। এবং কন্ট্রাকটারদের নিজেদের মধ্যে মারামারি এই নিয়ে যে, কে কাজটা নেবে? কোন দফাদার কাজটা করতে পারবে। এই নিয়ে একটা বড় বিবাদের সৃষ্টি হতে দেখেছি।

    অমিতাভ সেনগুপ্ত: মনোজিৎদা, আমাদের আজকের আলোচনায় আমরা জোর দিতে চাইছি, আপনাদের স্থানীয় মানুষ নিজেদের ১০০ বছরের কাছাকাছি সময় ধরে ধরুন দুই জেনারেশন ওখানে আছেন, সেখানকার প্রবীণ মানুষেরা কীভাবে নদীর বাঁধ রক্ষা করতেন? যাঁরা স্থানীয় তাঁরা কী বলছেন? দ্বিতীয় কথা, আরেকটা দৃশ্য যেটা দেখছিলাম আপনারা একরকম পুনর্বাসনের দাবিও করছেন। তো আপনারা যখন পুনর্বাসনের দাবি তুলছেন, এটা নিশ্চয় মাথায় রাখছেন যে সুন্দরবনের আজকের যে পরিচয় সারা বিশ্বজুড়ে তার পরিচিতি একজন সুন্দরবনবাসী হিসেবে নিশ্চয় জানবেন বায়োস্ফিয়ার বায়োডাইভার্সিটিটা অর্থাত্ তার জীববৈচিত্র্য কী? সেটা তার সম্পদ। সেখানে কি একটা কোনো সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে? আপনাদের ওখানকার প্রবীণ বয়স্ক মানুষেরা কী বলছেন, তারা কীভাবে বাঁধ রক্ষা করতেন?

    মনোজিত: আমি আজকে একজন প্রবীণ মানুষের কাছে শুনেছিলাম, উনি আমাকে বললেন এটা যে, আমরা যখন ছোটো ছিলাম নদীবাঁধ খুবই চওড়া ছিল এবং তার ঢালটাও ছিল, চরও ছিল। তখন খুব একটা ভাঙত না। কয়েকবছর পর দেখা যাচ্ছে নদীবাঁধ আস্তে আস্তে ভাঙছে কারণ সেই জায়গায় মাটিগুলো পড়তো না আর। তারপর এই ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে, অল্প অল্প মাটি পড়ছে। তখন কিন্তু মানুষের দ্বারা বাঁধগুলো তৈরি হত। সরাই করে মাটি নিয়ে সেই জায়গাতে ফেলতো। মাটি সরাই দিয়ে ফেললে সে জায়গাগুলো টাইট থাকে। বর্তমানে কি হচ্ছে, যে জায়গাগুলো ভেঙে যাচ্ছে সেখানে কিছু পাইলিং করে দেওয়া হচ্ছে দু-ধারে। পাইলিং করে দিয়ে বস্তা সেটিং করে দেয়া হচ্ছে। তার উপর এই জেসিপি দিয়ে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। জেসিপি দিয়ে যে মাটিটা দেয়া হচ্ছে, সেটা কিন্তু আলগা হয়ে থাকছে। যেহেতু নদীর মিষ্টি মাটি নিয়ে বাঁধ দেয়া হচ্ছে ফলে নোনা জল লেগে ঐ জায়গাগুলোর দ্রুত ভাঙন হচ্ছে।

    অমিতাভ সেনগুপ্ত: এবার শ্যামলদাকে একটু বলতে বলবো। শ্যামল গায়েন, সুন্দরবনেরই মানুষ। এই সমস্যা সমাধানের সমাধানে শ্যামলদার মতামত শুনবো---

    শ্যামল গায়েন: আসলে আমার বেড়ে ওঠার একটা পর্যায় সুন্দরবনে, ফলে আমি কিছুদিন কর্মসংস্থানের জন্য দেশে-বিদেশে মানে কলকাতা-সুন্দরবন যাওয়া আসা করি। আমার ছোটবেলার যে অভিজ্ঞতাটা বেশি বেশি করে মনে পড়ে, মানে আমার 1989 এ জন্ম অর্থাৎ থার্টি থ্রি আমার বয়স, এই বয়সে আমার যে অভিজ্ঞতা তাতে আজও পর্যন্ত কংক্রিটের বাঁধ বলে কিছু আমার চোখে আসেনি। এই কংক্রিটের বাঁধ যদি দেয়া হত তাহলে কি সেটা যথোপযুক্ত? প্রশ্নটা এটা। আমার স্কুল ছিল এমন একটা জায়গায় যে জায়গাটা আমাকে নদী রাস্তা বরাবর যেতে হতো। নদীরাস্তা ছিল সরু এবং সেই রাস্তা দিয়ে যখন আমি যেতাম, জোয়ার ভাটা আসতে দেখি। তো, সেখানকার জলের যে খরস্রোত বা আস্তে আস্তে বয়ে চলা, তার যে গতি সেটা সাবলীল ছিল। কিন্তু এখন নাব্যতা হারিয়ে আস্তে আস্তে গতিটা হারিয়ে ফেলল। ফলে নদীবাঁধের ভাঙনের যে অবস্থানটা , এখান থেকে দশ পনের বছর আগে একটা অবস্থান ছিল সেটা হচ্ছে ঝড় বন্যা হতো না এমন নয়, এই যে 2009 এর আয়লা পরবর্তী সমস্ত ঝড়গুলো যেভাবে আছড়ে পড়েছে সুন্দরবনবাসী অর্থাত্ আমাদের উপরে, তাতে প্রত্যেকটা নদীবাঁধ আস্তে আস্তে করে ভেঙে গেছে বা কোথাও জল উপচে পড়েছে। এবং শুধু তাই নয়, আপনি বলছিলেন নয়ের দশকের বাঁধ গুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে যে, বাঁধগুলোর উচ্চতা খুব একটা ছিল না, কিন্তু তার একটা স্বাভাবিক অবস্থান ছিল। সেই তুলনায় এখনকার বাঁধের উচ্চতা অনেকটা বেশি থাকার পরেও নদীবাঁধ গুলো টিকছে না এবং জল কিন্তু ছাপিয়ে পড়ছে। ফলে, আমার প্রশ্ন যেটা সেটা হচ্ছে এখানে পরিবেশগত দিকটা বেশি করে নজর দেওয়া উচিত। যতই কংক্রিটের বাঁধ করি না কেন, আমাদের বাঁধের সমস্যা সমাধান কিন্তু হবে না, কারণ প্রকৃতি তার নিয়মে চলবে। নদীবাঁধ দিয়ে হয়তো কিছুদিনের জন্য তাকে আটকে রাখা যাবে। আবার কিছুদিনের মধ্যে সেটার ভাঙ্গন হবেই, সেটাকে আবার রিপেয়ারিং করতে হবে। সুন্দরবনবাসীর যে জীবনকাহিনি বা বাঁধের কাহিনি সেটা এইভাবেই চলতে থাকবে। ফলে কংক্রিট কোনো বাঁধের সিদ্ধান্ত, এটা গর্ভমেন্ট বা সরকার যেকোনভাবে আটকাতে চাইছি, এটা কিন্তু আটকানো যাবে না। ফলে সাধারণ মানুষের সচেতনতার উপরে এখানে জোর দিতে হবে। সেটা হচ্ছে যে, যখন বেলডার ছিল, তখন মাটির বাঁধ এর প্রত্যেকটা জায়গাগুলোতে যে ফাটল দেখা দিত বা ভেঙে যেত, অল্প অল্প চুঁইয়ে জল ঢুকতো বা গর্ত হয়ে যেত এইসমস্ত জায়গা গুলো প্রতিনিয়ত চেকিং হত। ফলে সে নদীবাঁধগুলো দীর্ঘস্থায়ী হত। এখন আর সেটা হয় না, এই কারণে যে, গোটাটাই একটা রাজনৈতিক, তার সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক জীবন সবমিলিয়ে মানুষের সময় না দিতে পারা, দেশি বিদেশি গণসংস্থানের চলে যাওয়া। গোটা বিষয়গুলো এরকম একটা পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে করে আমার মনে হয় সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষের স্থানীয় যে নদী বাঁধ-প্রকৃতি-গাছপালা এবং যে জীববৈচিত্র, বাস্তুতন্ত্রের সমস্যা সমস্ত জায়গা থেকে একটা সচেতনতার জায়গায় যদি আমরা আসতে পারি তাহলে মনে হয় নদীর বাঁধ টেকানো সম্ভব। আপাতত আমার জ্ঞানে এইটুকু বলতে পারি।

    কিন্তু, এখনকার যে বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন পরিকল্পনা করা হচ্ছে কংক্রিটের বাঁধ নিয়ে, তাতে করে সাধারণ মানুষ এক রকম প্রভাবিত। কংক্রিটের বাঁধ যে আমি চাইছি না এমন কথা নয়। বাঁধ অতি অবশ্যই প্রয়োজন কারণ মানুষের জীবন-জীবিকা, বেঁচে থাকা, সবকিছু মিলিয়ে দরকার আছে। ফলে এরকম দাবির জায়গা থেকে আমি একমত নই যে কংক্রিটের বাঁধ হয়ে গেলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমাদের একটু পিছন ফিরে দেখতে হবে, যেখানে নদীর বাঁধ থেকে প্রায় 100/200 মিটার চর রেখে সেখানে ম্যানগ্রোভ লাগিয়ে যদি ঢেউটাকে গাছের গায়ে লাগানো যায়, যাতে সরাসরি গিয়ে বাঁধে আঘাত না ফেলে। সেই গোটা দিকটা একটু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে।

    সুন্দরবনের গোটা ইতিহাস যদি দেখা হয় যেখানে চাষ বা জনবসতি অঞ্চল গড়ে উঠেছে, তাতে করে জমির উচ্চতা এবং নদীর যে নিম্নগামী উচ্চতা সেটার অনেকটা পার্থক্য ছিল, ফলে সেখানে জোরপূর্বক আমাদের বসতি গড়ে ওঠানোর জন্য কিছু কিছু ঘেরি বাঁধ দিয়ে সেটাকে তৈরি করা হয়েছে। সেটা আমরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, ফলে কোনরকমভাবে বলতে পারিনা যে---- দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ তৈরি হোক। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, কিন্তু কিছুদিনের জন্য সম্ভব।

    প্রকৃতি ও তার বাস্তুতন্ত্রের উপর জোর দেয়া উচিত আমাদের বেশি বেশি করে, যাতে সুন্দরবনকে বাঁচানো যায়।





    গ্রাফিক্স: মনোনীতা কাঁড়ার
    প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব
  • বিভাগ : আলোচনা | ১৯ জুন ২০২১ | ৭৬৬ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ২১ জুন ২০২১ ১৪:৩৩495164
  • এই পর্বটা কিরকম এবড়ো খেবড়ো হয়ে গেল। আগের পর্বটার মত সলিড লাগল না।  

  • SUDIPTA BASU | ১৮ জুলাই ২০২১ ১৪:০৬495914
  • আনন্দবাজারের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী এবারের যশ দুর্গতি র পর দেখা গেছে যে সকল যায়গায় "জি-প্লেট" লাগানো ছিল সঙ্গে ন্যচরাল ম্যানগ্রোভ রয়েছে, সেইসব এলাকা তে ক্ষয়ক্ষতি কম ই হয়েছে, মাটির বাঁধ ও ভাঙেনি। এই বিষয় টা কি সঠিক? 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া দিন