• হরিদাস পাল  অন্য যৌনতা

    Share
  • || স্টোনওয়ালের একান্ন বছর পূর্তি এবং জুন মাস কেন প্রাইড মান্থ ||

    Sudipto Pal লেখকের গ্রাহক হোন
    অন্য যৌনতা | ২৯ জুন ২০২০ | ৪৩১ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • © Sudipto Pal
    বিংশ শতকের মাঝামাঝি। উত্তাল একটা সময়। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে নারীর অধিকার, ক্রীতদাস মুক্তি, শ্রমজীবীদের অধিকার- ইত্যাদি বিষয় নিয়ে একাধিক আন্দোলন হয়েছে এই সময়- লড়াই করেই পেতে হয়েছে এই অধিকারগুলো। তেমনই যৌন সংখ্যালঘু মানুষের (সমকামী, উভকামী, রূপান্তরকামী, উভলিঙ্গ ইত্যাদি) অধিকারের জন্যও একাধিক লড়াই হয়েছে। ইংলণ্ডের মত "সভ্য" দেশে বিজ্ঞানী ও আধুনিক কম্পিউটারের জনক অ্যালান টুরিংকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল সমকামিতার অপরাধে, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংলণ্ডকে বাঁচান, লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ বাঁচান তাঁকে ঠেলে দেয়া হল মৃত্যুর দিকে।

    ছয়ের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমকামিতা তখনও অপরাধ। বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরাটাও অপরাধ ছিল সান ফ্রান্সিস্কো সহ অনেকগুলো শহরে- মেয়েদের থ্রী-পিস-ক্লোদিং বাধ্যতামূলক ছিল। না মানলে গ্রেপ্তার। শুনে ইরান কি কোনো একটা আরবদেশ মনে হয় তাই না? তেমনই অনেক শহরে ছেলেদের মেয়ে সাজা নিষিদ্ধ ছিল- এমন এক উদ্ভট আইন নিউ য়র্কে ২০১১ অবধিও ছিল।

    পুলিশি হেনস্থা, স্রেফ সমকামী হবার জন্য গ্রেপ্তার, যৌন সংখ্যালঘু মানুষের সামাজিক যোগাযোগ স্থলগুলোতে (যেমন গে বারগুলো) পুলিশি হানা মাঝে মাঝেই হত। নিউ য়র্কের স্টোনওয়াল নামক একটি গে বারে পুলিশি হানার সময় মানুষ প্রতিবাদ করে। সেটা ছিল ২৮ জুন, ১৯৬৯ সাল।

    পুলিশ অনেক সময়ই গে বারগুলোয়, বিশেষ করে স্টোনওয়াল বারে হানা দিতে আসত। টাকার লোভে, ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য, মানুষকে হেনস্থা করার জন্য। এক তো নিউ য়র্কে তখন বার চালানো, বারে মদ বিক্রি এগুলোই নিষিদ্ধ ছিল। তাই বারগুলোকে হেনস্থা করা খুব সহজ ছিল। তাছাড়া অন্য লিঙ্গের পোষাক পরার বিরুদ্ধে যে আইন ছিল- সেগুলোকেও পুলিশ ব্যবহার করত। স্টোনওয়াল বারে পুলিশি হানা যখনই হত, তখন একজন মহিলা পুলিশ অফিসার বাথরুমে নিয়ে গিয়ে তদারক করতেন তাদেরকে যারা মহিলাদের মত পোশাক পরত। তারা সত্যি মহিলা কিনা দেখা হত। না হলে গ্রেপ্তার, কারণ ওরকম একটা আইন আছে। এভাবে ক্রসড্রেসারদের হেনস্থা করা হত। কিন্তু ঐদিন ক্রসড্রেসাররা রুখে দাঁড়ালো। অন্য সমকামী ও উভকামী লোকেরাও পুলিশকে নিজেদের পরিচয়পত্র দেখাতে অস্বীকার করল।

    পুলিশ কিছু লোককে গ্রেপ্তার করল। কিন্তু বারের বাইরে তখন পুলিশের বিরুদ্ধে অনেক মানুষের জমায়েত হয়েছে। তারা পুলিশকে ক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করল, কেউ "উই শ্যাল ওভারকাম" গেয়ে উঠল। পুলিশ তখন গ্রেপ্তার করা লোকেদের এক এক করে গাড়ীতে ভরছে। এবং মানুষেরও ক্ষোভ একটু একটু করে বাড়ছে। পুলিশ যত ভীড়টাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করছে, ভীড়টা ততই উত্তাল হয়ে উঠছে।

    ভীড়ের মধ্যে একজন বলে উঠল "ওরা নিশ্চয়ই আজ পুলিশকে তোলা দেয়নি" ("they didn't pay off the cops")। আরেকজন বলে উঠল "Let's pay them off!"। এবং তার উত্তরে শয়ে শয়ে মানুষ পুলিশের দিকে পয়সা ছুঁড়তে শুরু করল।

    ধীরে ধীরে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ল নিউ য়র্কে। অধিকারের আন্দোলন জোরদার হল। গড়ে উঠল গে লিবারেশন ফ্রন্ট- যারা কৃষ্ণাঙ্গ ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন থেকে অনেকটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিল। কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের সাথে একটা অ্যালায়েন্সও গড়ে ওঠে।

    লক্ষ্য করুন, পুলিশ এখানে কীভাবে বিভিন্ন আইন- সমকামবিরোধী আইন, মদ্যবিক্রয় বিরোধী আইন, ক্রসড্রেসিং বিরোধী আইন- এগুলোকে ব্যবহার করছিল। অর্থাৎ তথাকথিতভাবে সংস্কৃতি রক্ষা করার জন্য যখন মানুষকে হেনস্থা করার এইসব আইন তৈরী হয়, সেগুলো কীভাবে পুলিশি যথেচ্ছাচারের সুযোগ দেয়, এবং তা মানুষের পক্ষে কতখানি ক্ষতিকর হয় তার উদাহরণ আমরা এখানে দেখতে পাই।

    স্টোনওয়াল বার বন্ধ হয়ে গেল, কিন্তু অন্য বারগুলোতে পুলিশি হেনস্থা চলতেই থাকল। এক বছর পর ২৮ জুন, ১৯৭০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম গে প্রাইড হল বিভিন্ন শহরে স্টোনওয়ালের স্মৃতিতে। তারই পঞ্চাশ বছর পূর্তি ছিল গতকাল। ধীরে ধীরে আইনের পরিবর্তন হল যুক্তরাষ্ট্রে। স্টোনওয়ালের দাঙ্গা অনুপ্রেরণা দিল পৃথিবীর অন্য দেশের যৌন সংখ্যালঘুদের আন্দোলনকেও। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আইন বদলালো। ভারতে ধারা ৩৭৭ যা যৌন সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হত সেটা সেপ্টেম্বর ২০১৮তে রদ করা হয়, প্রায় তিন দশক লড়াইয়ের পর। ভারতে এখনও সমানাধিকারের আন্দোলন চলছে। এখনও পাকিস্তান, ইরান, সুদান, নাইজেরিয়া, আরব আমীরশাহী, সৌদি আরব সহ অনেক দেশ আছে যেখানে সমকামিতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

    স্টোনওয়ালের স্মৃতিতে পৃথিবীর অনেক দেশেই, ভারতের অনেকগুলি শহরে প্রাইড মার্চ হয় প্রতি বছর জুনে। ভারতে গত ত্রিশ বছরে যৌন সংখ্যালঘুদের আন্দোলন ও আইনি লড়াই হয়েছে তাতেও ছিল স্টোনওয়ালের অনুপ্রেরণা।

    sources:
    https://en.wikipedia.org/wiki/Trousers_as_women%27s_clothing
    https://en.wikipedia.org/wiki/Stonewall_riots
  • বিভাগ : অন্য যৌনতা | ২৯ জুন ২০২০ | ৪৩১ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত