• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • ওয়েবিনার ও পাশবালিশ

    gargi bhattacharya
    বিভাগ : গপ্পো | ০৯ জুন ২০২০ | ১৩৬৯ বার পঠিত
  • আজকাল দেখছি পাখিদের লাফালাফি বেড়ে গেছে চতুর্গুণ। সক্কাল সক্কাল, পাশবালিশটা চেপে ধরে তৃতীয় দফার ঘুম দেবার চেষ্টা করছি প্রাণপন, দেখি জানলায় ঠক্‌ ঠক্‌ করে টোকা দিচ্ছে কে যেন। এই লক করে দেওয়া জীবনে কার এত অনুপ্রবেশের উৎসাহ? বাধ্য হয়ে বাঁ চোখটা কোনরকমে খুলে দেখি এক ব্যাটা ছাতার পাখি দিব্যি গা ফুলিয়ে মোটাসোটা হয়ে ঠোঁট দিয়ে ঠুকে চলেছে কাঁচের জানলায়। হুসহাস করে তাড়ানোর চেষ্টা করে দেখলাম আরো দু’জন তার সাথে যোগ দিল। ভাবখানা এরকম, আমরা তো বাপু ডানা লাগিয়ে উড়ে যাবো, কিন্তু এই বন্দীদশায় তুমি আমাদের ধাওয়া করতে পারবে কি? দুত্তেরি বলে কানে আরেকটা বালিশ চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লুম।

        

    এর পরের সমস্যাটা অন্যরকম। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম এক সমুদ্দুর এঁটো বাসনের সামনে। কাল রাতে খাবার পর দুর্দান্ত ল্যাদ লাগছিল, তাই একটা থালা-বাটি-চামচ পড়েছে স্রিঙ্কে; কাল দুপুরেও খুব হাই উঠছিল, তাই দুটো কড়াই, হাতা খুন্তি, বাটি, থালা; তার আগের দিন রাতে গরম পড়েছিল, তাই...। নাহ, গুণে লাভ নেই। স্টীল অতি তুচ্ছ জিনিষ, গ্যাস-ওভেনও অতি অর্বাচীন। ওগুলো ওরকমই থাক। মাইক্রোওভেনে চা করে সবে কাপটা নিয়ে বিছানায় আবার পাশবালিশের সন্ধান করছি, মোবাইল বেজে উঠল। আগে সকালবেলায় ফোন এলে মনে মনে গুষ্টির ষষ্ঠি পুজো করে ফেলতুম, এখন বিগলিত হয়ে হ্যালো বললুম।

    - হ্যালো দিদি, আমি ওমুক বলছি। আমরা একটা ওয়েবিনার করছি। আপনার হেল্প লাগবে। বক্তাদের লিস্টে আপনার নাম সবার আগে রেখেছি। একটা লেকচার দিতে হবে যে।

    ওয়েবিনার? সেটা কি বটে? নামখানা তো প্রথম শুনছি বলে মনে হল। তবে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করা মোটেই কোন ভদ্রমহিলার কাজ নয়। তাছাড়া আমায় তো খুব বেশী কেউ ডাকে-টাকে না। সুতরাং উৎসাহিত হয়ে বেশ সুরেলা গলায় “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ভাই, আমি তো সবসময়ই আছি তোমাদের সাথে” এইসব বলে-টলে না জানাটাকে ঢাকা-ঢুকি দেওয়া গেল। তারপর ফোন নামিয়ে সুরুৎ করে জুড়িয়ে যাওয়া চা গলায় ঢেলে গুগুল দাদুর কাছে নতি স্বীকার করলুম।

    খানিক এদিক ওদিক থেকে তথ্য সংগ্রহ করে যা বুঝলাম তা হল এই যে, ওয়েবিনার সেমিনারের ভাই বা বোন। যমজ নয়, চেহারায় একটু বড়, বা বেশ বড়। ধরা যাক যদি আমার সেমিনারে একটি হলের মধ্যে শ’খানেক অংশগ্রহণকারী থাকে (ইচ্ছে করেই সংখ্যাটা একটু বাড়িয়ে বললাম, ফিল গুড বলেও তো একটা ব্যাপার থাকা উচিত), তাহলে ওয়েবিনারে সেই সংখ্যাটা কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে কোন রকম ঝক্কি না পুইয়েই।  এই পাশের বাড়ির মিন্টি থেকে ওদেশের টম, ডিক, হ্যারী পর্যন্ত সেখানে অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারে। এয়ারটিকিটের ঝামেলা নেই, হস্পিটালিটির দায় নেই, ছুটির দরখাস্ত নেই, মায় লাঞ্চ, চা, জল অব্দি নেই, ঘরে বসে বসে জ্ঞানচর্চার মস্ত আয়োজন। বাহঃ, ভালোই তো। আমি আছি, তুমি আছো, সেও আছে, আর আছে ভার্চুয়াল বকবক।  

    দুদিন আগের রান্না ফ্রীজে আর কিছু অবশিষ্ট নেই, নুডুলস খেয়ে চালিয়েছি কাল রাতে। আজ কিছু না রান্না করলে এই করোনার বাজারে আর কিছু না হোক, অপুষ্টিতে মরে যাব। অগত্যা আবার রান্নাঘরে ঢুকলাম। সে সব ছিল বটে আমাদের জমানায় – মানে এই গত মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত আর কি। আলুর খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে মনে পড়ে চুকে-বুকে যাওয়া দিনগুলোর কথা – বিশেষত আমাদের ছাত্র জীবনের কথা। একখান সেমিনার যেতে হলে পাক্কা মাস ছয়েকের ধাক্কা। তার থেকেও বড় যুদ্ধ লেকচার শুনতে শুনতে নিজেকে জাগিয়ে রাখা। প্রোগ্রামের লিস্টি ঘেঁটে যত সিরিয়াস গবেষক হিসেবেই তুমি দাগ দিয়ে রাখো না কেন, যত মনোযোগ দিয়েই তুমি সেমিনার ঘরে বসে গম্ভীর মুখখান দেখাও না কেন, বড়জোড় আধ-ঘণ্টা, তার বেশি ঘুমকে ঠেকিয়ে রাখা দুস্কর। টম আর জেরির মতো পারলে চোখের পাতায় দুখান ক্লিপ আটকে রাখতে পারলে ভালো হত। প্রথম বক্তার বক্তব্যের পুরোটাই উগরে দি, এত ভালো শ্রুতিধর ছিলাম আমি। কিন্তু দ্বিতীয় বা তৃতীয় বক্তা যেই “মাই ডিয়ার ফ্রেন্ডস, এমিনেন্ট স্কলার” ইত্যাদি বলে-টলে শুরু করবেন, অমনি মাথাটা একশো কিলো ভারী হয়ে ঢুলে পড়বে। অথচ আমাদের মাস্টারমশাইদের দেখতাম, এই চশমার আড়ালে চোখদুটো দিব্যি বুজে আছেন, এই ঝপাং করে তিনখান শক্ত শক্ত প্রশ্ন করে বক্তাকে কুপোকাত করে দিলেন, তারপর আবার মাথাটা এলিয়ে দিলেন চেয়ারে। পাশ থেকে সতীর্থ তথা সমব্যথী ফিসফিস করে বললে, “এটা ঘুম নয়, যোগনিদ্রা, বুঝলি? একদিনে হয় না, বহুত প্র্যাক্টিস লাগে বাপু।” আমরাও তাই নিয়মিত অনুশীলন করতুম। চোখটি বুজেও আসলে যে আমি জেগে আছি, এটা বোঝাবার জন্য আমরা ‘ঘুমিয়েও জেগে থাকার একশো উপায়’ ভেবে বের করে ফেলেছিলাম। তাও কেলোরকীর্তি যে সবসময় আটকান যেত, তা নয়।

    সেইবার দক্ষিণভারতে গেছি। ট্রেনে করে পৌঁছতে পৌঁছতেই আমাদের মাছ-আলুপোস্তয় তৈরী শরীর দই-ভাতে টকে গেছে এক্কেবারে। তার ওপর জুনের গরমে আধ-সেদ্ধ আধ-পোড়া হয়ে গেছি প্রায়। ইনগরেশানের দিন ভোর ভোর উঠে সেজে-গুজে ফাইল-পত্তর নিয়ে পূর্ণোদ্যোমে বাসে উঠে পড়া গেল। জলখাবারের পর আবার বাস আমাদের নিয়ে রওনা দিল আর একবার। তারপর একখান ফাঁকা অডিটোরিয়ামের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। আমাদের মত ভিন্‌প্রদেশী গুটিকয়েক সেমিনারে অতি উদ্যোমী লোকজন ছাড়া আর সেখানে কেউ নেই। এইবার শুরু হল আমাদের ঘড়ির সাথে যুদ্ধ, কে বেশী ধীরে চলে। আমরা এদিক ওদিক ঘুরলাম, এমনকি জলট্যাঙ্কির নাম্বার পর্যন্ত মুখস্ত করে ফেললাম। নিজের পেপার, বন্ধুদের পেপার সাত দুকুনে চোদ্দবার পড়ে ফেললাম। তখন ওয়েবসিরিজ ছিল না যে নিজেকে ভার্চুয়াল খুনোখুনির মধ্যে ডুবিয়ে রাখা যাবে। এদিক ওদিক জিগ্যেস করার চেষ্টা করলাম - “ও ভাই, শুরু কব হোগা?”। ভায়েরা সব মাথা নেড়ে নিজেদের ভাষায় কি বলল, কর্ণগোচর হলেও মর্মগোচর হল না। অরগানাইজারদেরও পাত্তা নেই। অবশেষে ও অগত্যা আমরা ঘুমোতে শুরু করলাম। এ ওর ঘাড়ে, সে তার ব্যাগে। দুপুরে লাঞ্চের সময়ে সেই বাস আবার এল। আমাদের তখন ওঠায় কার সাধ্যি। আমরা নিজেদের আপদ-বিপদে চিরসঙ্গী শুকনো চিড়ে-মুড়ি-বিস্কুটের ওপর ভরসা করে দ্বিতীয় দফায় ঘুম আরম্ভ করলাম। দ্বিতীয় পেরিয়ে তৃতীয়-চতুর্থ কত দফা হল কে জানে, বিকেল গড়িয়ে হঠাৎ কাড়া-নাকাড়া বেজে উঠল। বুঝলাম অনুষ্ঠান বুঝি শুরু হল। আমরা একে অপরকে কনুইয়ের গোঁতা লাগিয়ে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সেই বিশাল অডিটোরিয়ামের মৃদু আলোতে, খোলা দরজা দিয়ে আসা সন্ধ্যার ফুরফুরে হাওয়াতে, আর স্টেজ থেকে ছুটে আসা থান ইঁটের মতো শক্ত-পোক্ত বাক্যবাণে আমাদের সব প্রচেষ্টা ধুলোয় মিশে গেল। ফলাফল টের পাওয়া গেল পরদিন সকালে। আয়োজকদের অফিসের নোটিশ বোর্ডে দেখি প্রায় আধপাতা জুড়ে সেমিনারের খুঁটি-নাটি ছাপানো খবরের কাগজ ঝুলছে। তাতে পাঁচটা ছবির মধ্যে একটা আমাদেরই বটে। সকলের মাঝে বসে আমরা চারজন ঘুমোচ্ছি। কাগজটা স্থানীয় ভাষায়। জিগ্যেস করতে ভরসা পেলুম না যে, আমাদের কথা কি কি লিখেছে। কেউ কিছু বলতে এলেই আমরা আতঙ্কিত হয়ে থাকতাম, এই বুঝি ঘুমের প্রসঙ্গ তোলে। তারপর বাকি দুদিন আমরা নিজেদের চিমটি কেটে কেটে জাগিয়ে রেখেছিলাম। একখান সার্টিফিকেটের জন্য এত কষ্ট সহ্য করতে হবে কে জানত।     

    তবে ওয়েবিনারে বুঝি সে সব নেই। তাও নিশ্চিন্তি হবার জন্য আমার এক অধ্যাপক বন্ধুকে ফোন লাগালাম। সে দেখি হাঁফাতে হাঁফাতে ফোন ধরল।  

    -কি রে, হাঁফাচ্ছিস কেন?

    -এই তো, বারান্দায় জামাকাপড় মেলছিলাম।

    -জামাকাপড় কাচাটা বুঝি তোর ঘাড়ে এসে পড়েছে?

    -হ্যাঁ বস। কাচাকুচি আর ঘর মোছা আমার, আর রান্না, ঘর-ঝাঁট, বাসন-মাজা বউএর।

    -ভাগাভাগিটা করল কে?

    -আমি, আবার কে? (এবার গলা নামিয়ে) আরে সব জায়গায় পলিটিক্স চলে। কলেজের কমনরুম তো বন্ধ। তার পলিটিক্স এখানেও চালিয়ে দিলুম আর কি।

    -মানে?

    -আরে ধুর, বুঝলি না? ওয়াশিং মেশিনে কাপড় কাচা আর ঘর মোছা তুই ফ্যান চালিয়ে করতে পারবি। রান্না, ঘর-ঝাঁট – এসবে পারবি? নো ফ্যান। অতএব আমি প্রথমেই ঝাঁপ দিয়ে পড়ে ফ্যান-ওয়ালা কাজগুলো নিয়ে নিলাম। বউ ভাবল বর আমার লক্ষ্মীসোনা।

    আমি খানিক হেসে গড়াগড়ি খেয়ে কাজের কথায় এলাম।

    -আচ্ছা, ওয়েবিনার কি করে হয়?

    -ওয়েবিনার? কি করে হয়? ওটা তো একটা পোর্টম্যান্টো ওয়ার্ড। মানে এর ল্যাজা আর ওর মুড়ো জুড়ে দিয়ে বানানো। ওয়েবের সাথে সেমিমারের শেষ অংশটা জুড়ে তৈরী করেছে।

    -বুঝেছি। যেমন হাঁসজারু। সেসব রাখ। বলছি জিনিষটা কেমন হয়? আমার তো কিছুই জানা নেই। অথচ একটা ওয়েবিনারে বলবার ডাক পড়েছে।

    -অ। তা সে বেশী কিছু শক্ত নয়। তুই এক কাজ কর বরং। আমাদের কলেজে একখান হচ্ছে এ জিনিষ। তোকে লিঙ্ক দিচ্ছি। রেজিস্ট্রেশান করে শুনে নে। একটা আইডিয়া পাবি। একটা সার্টিফিকেটও দেবে।

    মন্দ লাগল না পরামর্শটা। যদিও বিষয়বস্তু দেখে আমার পরিধির বাইরেই মনে হল। তাতেই বা কি? জ্ঞানের কি আর সীমা আছে? তাছাড়া উপরি একটা সার্টিফিকেট দেবে, আমার পরের প্রোমোশানও তো সামনের বছর। এই তালে সিভিটাও একটু ওজনদার হবে।

    তারপর, একটা মক টেষ্ট দেবার মত করে, জ্ঞানের সীমাহীন সাগরে গা ভাসালাম। রেজিস্ট্রেশান ফর্ম-টর্ম ফিলাপ করে, অ্যাপ-ট্যাপ ডাউনলোড করে তিথি-নক্ষত্র মিলিয়ে রণসাজে সজ্জিত হয়ে গেলাম। ও হরি, রণসাজ বলছি বটে, কিন্তু শেষ আড়াইমাস তো আয়নাতে নিজের মুখ দেখা ছাড়া আর কারো মুখোমুখি হই নি। এ ক’দিন তো বাড়ির পোষাকেই চলেছে। শাড়ি-টাড়ি গুছিয়ে কোথায় তোলা কে জানে? সেসব খুঁজতে গিয়ে লেট হলে যদি আর ঢুকতে না দেয়? তাছাড়া চুলে রঙ করি নি কতদিন, নুন-মরিচে মরিচের অংশটা কম লাগছে কি? চারবার ঠাকুরের নাম জপে হাউসকোটটা চাপিয়েই ল্যাপটপের সামনে বসে পড়লাম। ক্যামেরাটা একটু কায়দা করে রাখতে পারলেই হবে।

    “-গোয়িং টু এয়ার, থ্রি, টু, ওয়ান, জিরো –” –এই রে অসময়ে ঢুকে পড়লাম মনে হচ্ছে। নাঃ। শুরু হচ্ছে বলে। একে একে স্ক্রীনে ফুটে উঠতে শুরু করল মুখ – অংশগ্রহণকারী একশোজন ছিল, সকলে তো নেই মনে হচ্ছে। তবে বেশ ভালো লাগছিল একসাথে এতগুলো লোকের মুখ দেখে। কয়েকজন জনের দেখছি স্ক্রীন বন্ধ, মাইক্রোফোনও। আমি কিন্তু স্থির নয়নপাতে চেয়ে আছি হাসি হাসি মুখে। মাঝে মাঝে অবশ্য ঘ্যা-ঘু শব্দ করে করে আটকে যাচ্ছে সব কিছু। নেটওয়ার্ক সমস্যা। বক্তারাও সকলেই দেখি কম বেশী – “আমায় শোনা যাচ্ছে? শোনা যাচ্ছে কি আমায়?” ইত্যাদি বলছেন। ওপাশ থেকে আয়োজকরা “হ্যাঁ, স্যার, বলুন, বলুন, শোনা যাচ্ছে, শুনতে পাচ্ছি –” ইত্যাদি বলে আশ্বস্ত করছেন। একজন বক্তা প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হতেই “আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না, - হ্যালো হ্যালো, অ্যাম আই অডিবল?-” ইত্যাদি বলে উঠে গেলেন সটান। আরেকজন তো বক্তৃতা দিতে দিতে পেছন ফিরে গৃহিণীর সাথে কিঞ্চিৎ বার্তালাপও সেরে ফেললেন। স্পষ্ট শুনলাম “কুমড়োর চেঁচকি আর আলুভাজা”। কিসের মেনু হচ্ছিল কে জানে? এক মহিলা দেখলাম এই লকডাউনেও নিজেকে বেশ গুছিয়ে-গাছিয়ে রেখেছেন। ওয়েবিনারে আসবেন বলে নীল শাড়ি, হাতে নীল চুড়ি, চোখের ওপর নীল আইশ্যাডো লাগিয়েছেন। ক্যামেরায় সবটা দেখা যাচ্ছে না বলেই বোধহয় মাঝে মাঝে মুখের সামনে হাত নেড়ে নেড়ে সেই নীল চুড়ির চকমকানি দেখাচ্ছেন। এদের দেখে আমার কিছু শেখা উচিত। নাঃ, আমার নিজের লেকচারের আগে একটা মেকওভার খুব জরুরী দেখছি।    

    আচ্ছা, আমার সেই অধ্যাপক বন্ধুটি কোথায়? তাকে তো তন্ন তন্ন করে খুঁজেও দেখতে পেলাম না। অথচ তারই কলেজের ওয়েবিনার। হচ্ছেটা কি? ফোন একটা করতেই হয়। এবারেও সে হাঁফাতে হাঁফাতে ফোন ধরল।

    -কি রে? তুই কোথায়? ওয়েবিনারে আসিস নি?

    -কে বলল আসি নি? ঐ দেখ, ডানদিকের কোণের তিন নম্বর খোপটা, ওটা আমি।

    -সেটা তো অন্ধকার।

    -ওটাই আমি।

    -ওটা তুই? মানে? আর এত হাঁফাচ্ছিসই বা কেন?

    -মানে আমি আছি অথচ নেই। ওয়েবে ঢুকে ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন অফ করে দিয়েছি। এখন আমি করেছি, নাকি নেটওয়ার্ক গেছে -- সেটি বোঝবার যো নেই। আমি আপাতত একটা ওয়ালফ্যান কিনতে বেরিয়েছিলাম। পাড়ায় একটা মাত্তর দোকান খোলা ছিল, সেখান থেকে দ্বিগুণ দামে কিনতে হল, নইলে খেতে পাবো না যে।

    -খেতে পাবি না? কেন রে?

    -আরে সেই ফ্যানওয়ালা কাজের পলিটক্সটা বউ ধরে ফেলেছে। এবার বলেছে রান্নাঘরের দেওয়ালে একটা ফ্যান না ঝুলিয়ে দিলে আমার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। অগত্যা।

    -তাহলে ল্যাপটপ চালিয়ে দিয়ে তুই হাওয়া? বলিস কি রে?

    -আবার কি? শোন বাপু, ভার্চুয়াল আর রিয়ালিটির তফাত যতটা, ওয়েবিনার আর সেমিনারে ততটাই। কেন, তুই কি করেছিস? রান্না-বান্না খতম?

    -আমি তো ঠায় সেই ল্যাপটপের সামনেই বসে আছি।

    -পাগল নাকি? ক্যামেরা আর সাউণ্ডটা অফ কর। তারপর নিজের কাজে লেগে পড়। আমিও যাই, ফ্যানটা দেওয়ালে লাগাতে হবে। এখন আমিই মিস্ত্রি, আমিই যোগাড়ে। আজ আবার বাড়িতে একমাস বাদে পাঁঠার মাংস হয়েছে। বউ পুরো তাল বুঝে ঠুকে দিয়েছে। নিরামিষের দিন হলে আমিও ল্যাপটপের সামনেই বসে থাকতাম।

    ফোনটা টুকুস করে কেটে গেল। তার মানে আমাদের সেই সেকেলে ঘুমের সঙ্গে যুদ্ধ-টুদ্ধ এখানে কিছু নেই? ঘুম পেলে উঠে যাও, রেখে যাও অন্ধকারটুকু? আমি হতভম্বের মত বসে রইলাম। “আমাদের এই সময়ে মেন্টাল হেলথ ঠিক রাখা খুবই প্রয়োজন –” ওয়েবিনার হেঁকে চলল।

    অবশেষে সেই মহা লগ্ন উপস্থিত প্রায়। এ ক’দিন আয়োজকবর্গের ঘন ঘন ফোনাঘাত, টেকনো-আঘাত সব চলেছে। নাওয়া-খাওয়া মাথায় ওঠার জোগাড়। পাড়ার কেবলের ছেলেটিকে বলে রেখেছি খবরদার যেন ঐদিন ঐসময় নেটওয়ার্ক ফেল না করে। ইত্যবসরে, বয়স একটু কমিয়ে ফেলেছি। মাথার চুলের সামনের দিকটাতে খানিক কালো রঙ করা গেল, পেছনের দিকটা ঠিক সুবিধা করতে পারলাম না। ও, থাকুকগে, সামনেটাই তো স্ক্রীনে দেখান যাবে, পেছনটা নয়। আমার আবার লেফট প্রোফাইলটা ভালো দেখায়। ল্যাপটপটাকে সেইভাবে রাখতে হবে, যাতে ঐ বাঁদিকটাই বেশী করে দেখা যায়। তসরের শাড়িও একটা গুছিয়ে রেখেছি। নইলে  ঠিকসময়ে খুঁজে না পেলে সেই হাউসকোটটাই চাপাতে হত।

    আগামীকাল সকাল এগারোটায় শুরু। লেকচারের পয়েন্টগুলো শেষ মুহূর্তে ঝালিয়ে নিতে গিয়ে খেয়াল করলাম যে, ওয়েবিনারের একটা মস্ত সুবিধা হল হাঁটুর কাঁপাকাঁপিটা অন্তত বোঝা যাবে না। নইলে নার্ভাসনেসের জন্য মাইকের সামনে দাঁড়ালেই হাঁটুতে হাটুঁতে ঠেকে যাওয়াটা আমার ডিফল্ট সিস্টেমের মধ্যেই পড়ে। এতদিন ছাত্তর পড়িয়েও আমার কোন উন্নতি হল না। সব গোছ-গাছ শেষ। কে বলে ওয়েবিনারের জন্য প্রস্তুতি লাগে না? আমি পাশবালিশ জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। কাল নিজেকে ফ্রেশ দেখাতে হবে তো!

    মোবাইলটা বাজছে। সবে তো সকাল সাতটা। অনেক কষ্টে হাত বাড়িয়ে ফোন ধরে দেখি আয়োজক সেই  ছেলেটি। আরে সেও দেখছি হাঁফাচ্ছে। নাকি, ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছে? আহা, কি হল ভাই? ওয়েবিনার কি এগিয়ে এল দুচার ঘণ্টা? তবে তো এখনি দৌড়তে হয়। ভাই কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “না, না, ম্যাম, আমার ওয়েবিনার চুরি গেছে।” ওয়েবিনার চুরি গেছে? ক্যান্সেল হতে পারে, তাবলে চুরি? এ কি সোনা-দানা-গয়নাগাটি? ভাই খোলসা করে বলল “আমার সাথে এই ওয়েবিনারে আর একজন যে অরগানাইজ করছিল, এখন সে বলছে, সেই নাকি সবটা করেছে। আমি কিছুই নয়। তাই আমি রেগে মেগে আমার নাম উঠিয়ে নিয়েছি। কাল সারারাত ঘুমোই নি দিদি। কি মুখে যে আপনাকে বলব যে আপনি আর এই ওয়েবিনারে নেই, সেই ভাবনায় জেগে বসেছিলাম। ভোর হতেই ফোন করলাম। সরি দিদি, কি বলে যে মুখ দেখাবো –”

    মুখ দেখাদিখি ভাগ্যিস এখন নেই। নইলে আমার এই আদ্দেক মাথা কালো আর বাকি আদ্দেক সাদা – দেখে তুমি ভিরমি খেতে ভাই। আগামীতে আবার কবে মুখ দেখাদেখি হবে তার ঠিক নেই। ততদিনে আশা করি মাথার রঙে সমতা এসে যাবে। নইলে, দুত্তোর, পুরোপুরি নেড়া হয়ে যাব। লোকে ভাববে তিরুপতি ঘুরে এসেছি। যাও বা একখান ওয়েবিনার এই অকালে জুটেছিল এ বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে, তাও হল না। তসরের শাড়িটা দেখে চোখে জল এল। হায় রে। তবু ভরসা, একখানা ওয়েবিনারের সার্টিফিকেট আগেভাগে জুটেছে। প্রোমশানে সেটা অন্তত -। টং করে হোয়াটস আপে মেসেজ ঢুকল । খবরের কাগজের কাটিং – ‘শিক্ষকদের পদোন্নোতিতে ইউজিসি দিল না ওয়েবিনারকে স্বীকৃতি’। সব খতম।

    আমি পাশবালিশটা জড়িয়ে ধরে আবার বিছানায় চড়াও হলাম। এই পাশবালিশই একমাত্র সঙ্গী। এই আছে সাথে, আর সকলই মিথ্যা। ছাতার পাখিটা জানলার কাঁচে আবার ঠুকতে শুরু করল – ঠক্‌, ঠক্‌, ঠক্‌।    

    [সব চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক। এমনকি  লেখকের আমিটুকুও।]

           

         

  • বিভাগ : গপ্পো | ০৯ জুন ২০২০ | ১৩৬৯ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • r2h | 2405:201:8805:37c0:e558:af22:8c87:baa8 | ০৯ জুন ২০২০ ১১:৪৭94155
  • চমৎকার গল্প, ভালো লাগলো!

    আমার একটা তত প্রাসঙ্গিক নয় প্রশ্ন আবার জেগে উঠলো, ছাতারে পাখিগুলোর এমন কাচের জানলায় ঠোকরানোর অভ্যাস কেন? আর কোন পাখি তো এমন করে না!
  • ঝর্না বিশ্বাস | 2401:4900:1d6d:27fa:18f5:7cf7:9929:fd57 | ১১ জুন ২০২০ ১১:০০94218
  • বেশ এঞ্জয় করছি এই ওয়েবিনার...! আপনার লেখা পড়ে ভালোলাগল আরো... 

  • অনিন্দিতা | 146.196.33.11 | ১২ জুন ২০২০ ০৮:৩০94236
  • মনোগ্রাহী লেখা। পরিচিত দৃশ্য। এই করোনার বাজারে অজস্র ওয়েবিনার আর যেমন-তেমন মানের গবেষণাপত্রের বন্যা বইছে। 

  • বিপ্লব রহমান | 37.111.235.15 | ১৪ জুন ২০২০ ০৭:৩৮94291
  • বেশ ঝর ঝরে লেখা। করোনা কালের ডায়েরি বলে এ গল্পকে  দিব্যি চালিয়ে দেওয়া যায়। 

    শুভ  

  • অনিন্দ্য পন্ডিত | 117.194.198.201 | ০৬ জুলাই ২০২০ ১২:১৪94914
  • সমকালকে ছুঁয়ে থাকা সর্বকালের রূপকথা 

  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত