• হরিদাস পাল  বাকিসব  মোচ্ছব

  • মঞ্চায়ন

    gargi bhattacharya লেখকের গ্রাহক হোন
    বাকিসব | মোচ্ছব | ২৮ জানুয়ারি ২০২১ | ৭১২ বার পঠিত | ২ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  •  

    হঠাৎ কবে জীবননাট্যের যবনিকা পতন হবে, সে শুধু পরিচালকই জানেন। তবে যেদিন কার্টেন কল হবে, সেদিন নিজের আসল পরিচয়টুকু জানিয়েই মঞ্চ থেকে নেমে যেতে হবে, ‘আচ্ছা রোসো আসছি’ – বলার সময়টুকুও পাওয়া যাবে না। তাই মাঝে মধ্যে ভাবি যে, গ্রিনরুম থেকে শুরু করে মঞ্চের মধ্যিখানে, অনেক আলোর নীচে, কিংবা উইংসের আড়ালে উঁকি ঝুঁকি মেরে যেসব নেপথ্য কাহিনি লেখা হয়ে গেল নিজের খেয়ালে, তা তো জানল না কেউই। যেটুকু জানল, বুঝল, তা কেবল সাজিয়ে গুজিয়ে সংলাপ মুখস্থ করে হাজারো মহড়া দিয়ে তৈরি – সেখানে সত্যির থেকে অ-সত্যির ভাগ বেশি বই কম নয়। পাঠক বলতেই পারেন, মঞ্চের পেছনের গপ্পো শুনে আমার লাভ কী? আমরা তো ইস্তেহার দিয়ে ছাপানো বিজ্ঞাপনের চটকে চোখ-ধাঁধাঁনো রঙ্গ দেখতেই এসেছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, মঞ্চের পিছনে বিনা আয়াসে স্বতস্ফূর্ত আবেগ-উচ্ছ্বাসে যা অভিনীত হয়ে যায়, তার রঙ্গ কমতি কিছু নয়। কী হাস্য, কী শৃঙ্গার, কী করুণ – রসোত্তীর্ণ হবার যোগ্যতা আপনা-আপনিই এসে পড়ে, মেক-আপ, সেট-সেটিং, প্রপ - কিছুই লাগে না। আর তার রেশ থেকে যায় প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে গেলও – আজীবন, আমরণ। 

     

    মনে আছে, আমার বয়স তখন সদ্য বারো ক্লাশ পাশের। পুরোনো কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় তখন শনি-রবিবারের বিকেলে একটা আঁকার স্কুল থাকার রেওয়াজ ছিল, নিয়ম ছিলও বলা যায়। আমাদের পাড়াও পেছিয়ে ছিল না। তাতে ফি বছরে ‘বার্ষিক বিচিত্রানুষ্ঠান’ নামে একখান বিচিত্র-অনুষ্ঠান বরাদ্দ ছিল। অমন এক অনুষ্ঠানে পেল্লাই মঞ্চে এক খুদে নেমেছে সংলাপ বলতে। অতি উৎসাহে এগোতে এগোতে আলোর সীমারেখা পার করে ফেলে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে হাত পা ছুঁড়ে প্রাণপণ গলা চিরে চেঁচাচ্ছে। প্রৌঢ় মাস্টারমশাই ফিস-ফিস করে, চোখ মটকে, নানা রকম ইশারায় উইংসের আড়াল থেকে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন অনেকক্ষণ ধরে। তাতে ছানার মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে, সে পারফর্ম করেছে, এত বাধা সহ্য হয় নাকি? তাই বেমালুম সংলাপ থামিয়ে কোমরে হাত দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো। এক অডিটোরিয়াম শুদ্ধু লোকের সামনে অত্যন্ত বিরক্তির স্বরে উঁচু গলায় মেজাজে বলল, কিছু বলছেন স্যার? স্যার তো থ। কী বলবেন যে, তিনি কী বলছিলেন? বাকরুদ্ধ স্যারকে অপাঙ্গে মেপে নিজের প্রতি অগাধ বিশ্বাসে ‘ফোঁৎ’ করে নাক দিয়ে সব নস্যাৎ করে আবার নিজের সংলাপ শুরু করল ছানা। দর্শকদের অবস্থা কী হয়েছিল আজ আর মনে নেই, যেমন মনে নেই সেই খুদে ছানার নাম। 

     

    পাকা আমিও কিছু কম ছিলাম না। লেখালিখিতে হাত মকসো করতে শুরু করেই নাটক লিখে ফেলেছিলাম একখান। নামটাও বেশ বিদেশী – মেডুসার মুণ্ড। কী করে জানি না, সেখানা নামকরা মঞ্চে অভিনয়ও করে ফেলা গেল। তিনটে চরিত্রের মধ্যে একজন অবশ্যই আমি। তবে সে গল্পে পরে আসছি। সেসব উঠতি বয়সের কথা, আজ নাহয় মাথার চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু ঢেঁকি আজও ধানই ভানে। শুধু আজ কেন, ছাত্রাবস্থা কাটিয়ে অধ্যাপনার চাকরিতে ঢুকেই বুঝলাম, এখানে আমার পাকামি দেখাবার যথেষ্ট প্রশস্ত জায়গা আছে। ছেলেমেয়েরাও না জানি কেমন করে বুঝে গেল সেকথা। তারই ঘটনাক্রমে কবে দেখি অন্যকে ঝাড়াই-মাড়াই করে পালিশ লাগাবার কাজে জুটে গেছি আপনা-আপনিই। একে ডায়ালগ বলতে শেখাও - উঁহু, উঁহু, হচ্ছে না, গলার স্বর পেটের এক্কেবারে ভেতর থেকে টেনে বের করতে হবে। ও কে মঞ্চে হাঁটতে শেখাও – না, না, দর্শকদের দিকে পেছন করে ঘোরা যাবে না। তাকে আবৃত্তির ‘উশ্চারণ’ শেখাও – আরে, আরে, লাইনের শেষের কথাগুলো খেয়ে ফেলছ কেন? - এরকম সব কাজ আরকী।

    আমার ভারি মজা, কেমন যেন বয়সটা কমতির দিকে হাঁটতে লাগল। এমন সময়, কোন এক অনুষ্ঠানের পূর্ব-প্রস্তুতিতে এক নবীন, উৎসুক, অথচ জড়িয়ে মড়িয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলা কবিতাপাঠ-কারের জিভের, গলার, চোয়ালের আড় ভাঙানোর দায়িত্ব (বা দায়) পড়ল আমার চওড়া কাঁধে। আমাদের ছোটবেলায় ডাঁশা পেয়ারা লম্বালম্বি কামড়ে খেয়ে শক্ত চোয়াল নরম করার নিয়ম ছিল। হাঁ যত বড় হবে, সেই অনুসারে চোয়াল সহজ হবে, উচ্চারণের জড়তা কেটে যাবে। দিলুম সেই ফর্মূলা এখানে অ্যাপ্লাই করে। যেই না দেওয়া, অমনি ছাত্র মাথা চুলকে, ঘাড় নিচু করে যথোচিত নম্রতার সঙ্গে এমন একটা বডি-ল্যাঙ্গুয়েজ পেশ করল, বুঝলাম পেয়ারা কেনার উপদেশের সাথে সাথে অর্থমূল্য ধরে দেবারও প্রয়োজন আছে। সে আজ থেকে এক যুগেরও আগের কথা। মনে মনে হিসেব করে কুড়ি টাকা এগিয়ে দিলাম –  আশা করলাম, অনেকগুলো পেয়ারা এতেই হবে, চোয়াল তাতেই তুলতুলে না হলেও কাজ চালাবার গোছের নরম হবে। কুড়ি টাকা দিলাম, এবং দিতেই থাকলাম। কুড়ি কুড়ি কুড়ি করে কত কুড়ি যে হল, কিন্তু সে ছেলের জিভ, চোয়াল, বলার ভঙ্গি – কোনকিছুরই আড় ভাঙলো না। রেগে মেগে একদিন ভর্তি ক্লাশেই দিলাম বকুনি। পেয়ারার পয়সা নিচ্ছো, খাচ্ছো না তাহলে? সে বালক কাঁদো কাঁদো হয়ে আমায় বিশ্বাস দেবার চেষ্টা করল সে পেয়ারা খাচ্ছে, কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না। কিন্তু আমি মানবো কেন সেকথা? আরেকটু চোখ পাকাবো বলে মনের জোর আনছি, ওমা দেখি ক্লাশ শুদ্ধ ছেলেরা একসঙ্গে বন্ধুর পোঁ ধরল। হ্যাঁ দিদি, ও তো ডাঁশা পেয়ারা খায় রোজই। শুধু ও কেন, এই আমরা সকলেই খাই, ভাগ করে খাই। একটা পেয়ারা কুচি কুচি করে নুন-লঙ্কা মাখিয়ে সকলে মিলে খাই। সবে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। কিন্তু চোয়ালের আড় ওরও ভাঙ্গছে না, আমাদেরও নয়। দোষ কার? কারো নয়, কারো নয়, দোষ শুধু আমার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিরস্ত হলাম। তবে আমাকে পাষণ্ডিনী মনে করবেন না, অনুষ্ঠান হওয়া পর্যন্ত গোটা ক্লাশকে পেয়ারা খাওয়ানোর দায়িত্ব আমি নিয়েছিলুম, খালি শক্ত চোয়াল কড়মড়ে শক্তই থেকে গেল, এই যা।

     

    বাংলা কবিতা আবৃত্তি করাতে গিয়ে যদি এমন নিদারুণ দশা হয়, তাহলে সংস্কৃত সংলাপ বলতে গিয়ে কী কী হতে পারে, সহজেই অনুমেয়। সেবার রিইউনিয়ানে নাটক হচ্ছে শ্রীহর্ষের রত্নাবলী। অভিনেতারা ঠিক বালক নয়, একটু উচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী, ভালো নাম – রিসার্চ স্কলার। আদ্যোপান্ত সংস্কৃত নাটক, এবং শৃঙ্গার রসের। তা সংস্কৃততে প্রেম করা (বা প্রেমের অভিনয় করা) যে এত কঠিন হয়, তা আগে বুঝি নি। পাত্র-পাত্রী দেখি কাঠ-কাঠ ভঙ্গিতে সংলাপ বলে, - মম হৃদয়বল্লভ, প্রিয়তমে -। যত বলি ওরে একটু সহজ হ, তারা তত বলে, চিন্তা করবেন না দিদি, স্টেজে ঠিক মেরে দেব। বারবার জোরের সঙ্গে ‘মেরে দেব’ ‘মেরে দেব’ বলাতে বুঝলাম, স্টেজে ওরা মেরেই দেবে - শৃঙ্গার রসের নাটক হাস্যরসে এসে থামবে। কিন্তু কী অদ্ভুত, কুশীলবের একজন অনেক পরে চাকরি-বাকরি পেয়ে বিয়ে-থা করে জানিয়েছিল যে, সে তার হবু বউকে এই নাটকের ডায়ালগ শুনিয়েই কাত করছে। (অনুবাদ সহ কি?)। কে বলে জীবন আর নাটক আলাদা?

     

    এতো গেল ভাষার সমস্যা। তার থেকেও বড় সমস্যা ড্রেস। নায়িকা দুজন। মঞ্চে যেমন, সামনাসামনিও প্রবল প্রতিযোগিতা – কাকে বেশি সুন্দরী লাগে। মহড়া যত না হয়, তার থেকে বেশি সময় যায় নায়িকাদের শাড়ী বাছাই করতে। এদিকে হোস্টেলে থাকা ছেলের দল চিন্তিত ধুতি নিয়ে। বেশি করে সমস্যা রাজার ধুতি, মন্ত্রীর ধুতি। এমনি কোরা সাদা ধুতি হলে তো চলবে না। তাহলে? তাহলে আর কী? একে একে কাঞ্জীভরম, ইক্কত, নারায়ণপেট, গাদোয়াল, জামেবার - আমার আলমারী খালি করে নাটকের দলে নাম লেখাল। আমার শাড়ি হয়ে গেল রাজপুরুষদের ধুতি। সঙ্গে সঙ্গে গেল গলার মুক্তোর হার, কানের দুল, মেক-আপের সরঞ্জাম ইত্যাদি, প্রভৃতি। আমি প্রায় নিঃস্ব হয়ে অনুষ্ঠানের দিন অবশিষ্ট দুখী দুখী তাঁতের শাড়ি পরেই রওনা দিলুম।

     

    চিন্তা ছিল অন্য একটা। ছেলেদের বলেছি, পুরোনো দিনের নাটক যখন, রাজা-রাজড়াদের ব্যাপার, দুল তো পরতেই হবে। কান ফুটো না করে কী করে পরবে ভেবে দেখ। কী করেছে কে জানে? গিয়ে যা দেখলাম, তাতে চক্ষু চড়কগাছ। তামার তার দিয়ে কানের সাথে নকল লতির মতো তৈরি হয়েছে। তাতে দুলও ঝুলছে দিব্যি। বাহ্‌ রে ছেলে, এই বুদ্ধি পড়াশোনায় লাগালে নোবেল আটকায় কে?

     

    নাটক শুরু হল। হিসেব অনুসারে দু’এক জায়গায় ডায়লগ ভুলল কমবেশি সবাই। এহ বাহ্য, হঠাৎ দেখি, কারাগারের রক্ষী চশমা পরে মঞ্চে উঠে পড়েছে। হাতে বল্লম, পেছনে কারাগার, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। আমি হুস হাস করে ইশারা করতে গিয়েও থামলাম। তীর হাত থেকে বেরিয়ে গেছে। এদিকে ঐন্দ্রজালিক বলে কিনা, সকলে ডান দিকের উইংস দিয়ে ঢুকছে, আমি বাঁ দিক দিয়ে ঢুকলে ফোকাস কম পাব। আচ্ছা পাগল তো? তাকে রীতিমত ধমকে-ধামকে বাঁ দিক দিয়েই ঢোকান হল। বিদূষক একবার পা ফস্কাল, দৌবারিকের গালের নকল আঁচিল খুলে হাতে চলে এল, আর বড় কিছু অঘটন ঘটল না।

      

    দুটো দৃশ্যের মাঝে আলো নিভছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম যে, আলো নিভলে ছেলে কুশিলবরা মঞ্চে আবার ঢুকে সটান শুয়ে পড়ে কিছু একটা খুঁজছে। তারপর সেটা হস্তগত করে আবার ভালোমানুষের মত উইংসের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। ব্যাপারটা কী? হাত নেড়ে একজন ছোট পার্টওয়ালাকে ডাকলাম। সে যা বলল, তার সারাংশ দাঁড়াল এই যে, আমি তো বলেই খালাস যে ছেলেদের দুল পরতে হবে। তারপর কী হল? হল এই যে - ছেলেরা গেল কস্টিউম জুয়েলারির দোকানে। এগারো জোড়া কস্টিউম জুয়েলারির দুলের দাম পড়ে এগারোশো টাকা। মুখের কথা নাকি? তাও মেয়ে হলে কথা ছিল। ছেলেরা নাটকের পর সেই দুলগুলো নিয়ে কী করবে? (আশ্চর্য, গার্লফ্রেন্ড ছিল না কারো?) তাই দোকানদারকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে জপিয়ে-তপিয়ে এগারো জোড়া দুল ভাড়ায় এনেছে। মাত্র দুশো টাকায়। কশান মানি জমা আছে আরো দুশো। তবে শর্ত একটাই। দুল হারিয়ে গেলে তার দাম দিতে হবে, জোড়ার মধ্যে একটা হারালেও (অবশ্যই, কেউ নিশ্চয়ই এককানে দুল পরবে না!) পুরো পয়সা দিতে হবে। তাই ঠিক হয়েছে নিজ দুল নিজ নিজ দায়িত্বে থাকবে। ফলে অভিনয় করতে গিয়ে তামার তারের তৈরি নকল লতি থেকে ঝোলা দুল ছিটকে ছিটকে পড়ে গেলে, দৃশ্যের শেষে অন্ধকারে মঞ্চে লাফিয়ে পড়ে সটান শুয়ে সে দুলের জোড়া খোঁজা ছাড়া কি আর কোন উপায় থাকে? কানের দুল যে ভাড়া পাওয়া যেতে পারে আমার এই কন্যা-জন্ম ইস্তক আমি শুনি নি। আহা, আগে জানা থাকলে কত টাকা যে বাঁচত! সে যাই হোক, নাটক ভালোয় ভালোয় পার হল, টমেটো, পচা ডিম ছাড়াই সব উদ্ধার হল, এমনকি প্রচুর হাততালিও পাওয়া গেল, সবচেয়ে বড়ো কথা যে, দুলগুলো সব নিজেদের জোড়া অক্ষুণ্ণ রেখে আবার দোকানে ফিরতে পেরেছিল।

     

    প্রপ নিয়ে কেলেঙ্কারি নাটকে খুব সাধারণ ব্যাপার। বার বার হয়, কিন্তু ক’টাই বা মনে থাকে? ওই যে বলেছিলাম নাটক লিখেছিলুম ‘মেডুসার মুণ্ড’, এক বর্ষাঘন দিনে শোনা গল্প থেকে আইডিয়া চুরি করে, তাতে মেডুসার মুণ্ডটাই ছিল বড় প্রপ। তার সঙ্গে দরকার ছিল দুজোড়া কালো চশমা, ভালো বাংলায় যাকে বলে গগল্‌স। একটা আমার, আর একটা তার – নাহ্‌, তার সত্যি নাম বলব না, মিথ্যে নাম দিতে পারব না, বরং অনামাই থাক। সেই অনাম-বাবু ফুটফুটে সুন্দর দেখতে কলেজে পড়া এক ঝকঝকে ছেলে। হ্যাণ্ডসাম বলে গর্ব নিশ্চয় ছিল, নইলে কি আর বলে, অমুকদি, আমার গগল্‌স আমিই আনব, আলাদা করে প্রপের লিস্টে ঢুকিও না? বুঝলাম বাহারি কালো চশমা আসছে হিরোর জন্য। তাই সই, আমি আমারটার ব্যবস্থা করলাম। তৃতীয় দৃশ্য, নাটক জমে উঠেছে, দর্শক টানটান হয়ে বসে। আচমকা খেয়াল হল অনাম-বাবুর গগল্‌স কোথায়? সেটা তো আবার সংলাপ অনুযায়ী আমারই দেবার কথা তাকে? ওরে অনাম-বাবু, তোর গগল্‌স কই? অনাম-বাবুও চমকে গেছে, ভয়ে মুখ সাদা, আমার ডায়ালগের ফাঁকে নিচু গলায় বলল, ওই তো প্রদীপকাকুর কাছে। প্রদীপকাকু আমাদের প্রম্পটার, মঞ্চের পেছনে অন্ধকারে টর্চ জ্বেলে কুশীলবকে প্রম্পট করতে ব্যস্ত। আমার কথা তার কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমিও ঘামতে শুরু করেছি। কিছু না হলেও অন্তত শচারেক মানুষ সামনে বসে, ক্লাইম্যাক্স চলছে। উইংসের পাশে আরেক পাড়াতুতো কাকু দাঁড়িয়ে। ইশারায় বোঝাবার চেষ্টা করলাম কী হচ্ছে এবং কী হতে চলেছে। এর পরই আমার হাতে চলে এল একখান গগল্‌স। মঞ্চের আলোয় হাত খুলে দেখি ওমা, গগল্‌স কোথায়? এতো সাধারণ চশমা। দরকার তো কালো চশমার। অগত্যা, আমার নিজের নাটক, নিজেই নতুন করে সংলাপ বানানো শুরু করলাম। মনে মনে অনাম-বাবুকে অজস্র গালাগালি। আমার দেখাদেখি সেও খানিক ম্যানেজ দিল।    

     

    মঞ্চের নাটক ম্যানেজ হল, জীবনেরটা হল না। অনাম-বাবু যোগাযোগ রেখেছিল বহুদিন। সেই ছোটবেলার পাড়াতুতো সখ্য। আমি ক্লাশ সিক্স, সে ওয়ান। তারপর আমাদের চারপাশের উত্তাপ আমাদের কী ছাঁচে গড়ল কে জানে? বড় হলাম, বুড়ো হলাম, সংসারী, অসংসারী হলাম, আর এই হতে হতে পুরোনো বাঁধন আলগা হল। কবে একদিন ফোন করে কথা বলতে চাইল, আমি ব্যস্ত-সমস্ত মানুষ - কাজ, অকাজ, নকল কাজ – আরো কত কী। আবার ফোন, আবারো, আবারো। বিরক্ত গলায় বললুম, হল কী রে তোর? জানিস না আমি খুব অসুস্থ। আর খুব ব্যস্তও? ওপাশ থেকে একটু চুপ। তারপরে বহুদূরের গলায় বলব, অমুকদি, এর পরের বার যখন ফোন করব, তখন ধরো কিন্তু। অনেক কথা আছে। আমি ‘হুম্‌’ বলে আবার ডুবে গেলাম নিজের স্বার্থে। সময় কেটে গেল। বুঝিনি কার্টেন কলের সময় এসেছে।

     

    শীতের দুপুর। ছাত্রছাত্রীদের সাথে বনভোজনে হাসিখুশিতে ব্যস্ত, তার মাঝে অচেনা নম্বর মোবাইল স্ক্রিনে। অচেনা গলা জানালো অনাম-বাবু নেই। নেই মানে নেই, মাল্টি অর্গান ফেলিওর, হঠাৎ। শালের দীর্ঘ বনে তপ্ত নিঃশ্বাস উঠল, ঝোড়ো বাতাস বইল উথাল-পাথাল, নদীতে বান ডাকল। সময় কিন্তু একবগ্‌গার মত সামনে চলল। ওরে, কেউ তো থামা। আমাদের স্ক্রিপ্ট বলা যে এখনো শেষ হয় নি।

      

    ওর সংলাপ শোনা হল না, আমারো প্রতি-সংলাপ বলা হল না। মধ্যিখানে কালো যবনিকা পড়ে গেল, মঞ্চের এপারে থেকে গেলাম আমি ও আমরা। এমন করে কত তুমি, তোমরার গল্প ওই মঞ্চায়নের নেপথ্যে থেকে গেল, থেকে যায়। সেই যে, যে ছেলেটা কাগজের গাছের আড়ালে বসে প্রম্পট করবে বলে আগাগোড়া সংস্কৃত নাটক মুখস্থ করে ফেলেছিল, কিংবা পুলিশের রোল করে যে নিরিহ ছাত্রের নাম বরাবরের জন্য ‘পুলিশ’ হয়ে গেল, পাঠ ভুলে গিয়ে ডিগবাজি খেয়ে যে উইংসের কাছে গিয়ে বাকিটা শুনে আসত, কিংবা নায়ক-নায়িকার হয়ে অভিনয় করতে করতে যারা সত্যিকারের প্রেমে পড়ে ল্যাজে-গোবরে হল – তাদের সক্কলে ওই বিনা মহড়ার কুশীলব। জীবননাট্যের থার্ডবেল কখন বেজেছিল জানি না, ভরপুর প্রেক্ষাগৃহ কখন ফাঁকা হয়ে যাবে, একখানি প্রদীপ কেবল জ্বলবে তিরতির করে – কবে -  জানি না। জানি কেবল মাঝের সময়ে প্রতিদিন কত নাটক। আমরা যে সকলেই অভিনেতা, অভিনয় করে চলি ইচ্ছায়, অনিচ্ছায়, পরেচ্ছায়।      

     

       

               

            

  • বিভাগ : বাকিসব | ২৮ জানুয়ারি ২০২১ | ৭১২ বার পঠিত | ২ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
দরজা - gargi bhattacharya
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ২৯ জানুয়ারি ২০২১ ০১:২৪102158
  • খুব সুন্দর লিখেছেন। আরও শুনতে চাই। 

  • Ranjan Roy | ২৯ জানুয়ারি ২০২১ ০১:২৪102157
  • খুব সুন্দর লিখেছেন। আরও শুনতে চাই। 

  • Ranjan Roy | ২৯ জানুয়ারি ২০২১ ০১:২৪102156
  • খুব সুন্দর লিখেছেন। আরও শুনতে চাই। 

  • Ranjan Roy | ২৯ জানুয়ারি ২০২১ ০১:২৭102159
  • একী,  তিনবার?


    শারদোৎসব গুরুমশাইয়ের ডায়লগ?

  • gargi bhattacharya | 14.140.229.202 | ২৯ জানুয়ারি ২০২১ ০৮:৪৫102165
  • ধন্যবাদ। আরো লিখবার ইচ্ছে আমারো রইল।

  • shamik nandi | ২৯ জানুয়ারি ২০২১ ১১:১৮102168
  • বেড়ে লাগলো। আরও চাই।

  • বিদ্যুৎ মণ্ডল.... | 2405:201:9003:9096:6472:be38:1e1b:7454 | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৭:২৫102552
  • ম্যাম,,, প্রণাম নেবেন......।।  খুব সুন্দর লাগলো।।। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন