• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • পলিটিক্যাল কারেক্টনেস (বইপাড়ার লকডাউন)

    Sourav Mitra
    বিভাগ : আলোচনা | ১৪ মে ২০২০ | ২৪৯ বার পঠিত
  • ‘‘পশ্চিমবঙ্গ পারিল না, তাহার কারণ শুধু সরকার নহে, বই লইয়া বঙ্গবাসীরও ঔদাসীন্য।’’ (‘বই-বিমুখ’, সম্পাদকীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা ১০-৫-২০২০)।

    না, উদাসীনতা শুধু বই নিয়ে নয়, সার্বিক শিক্ষা নিয়েই হয়তো। যেখানে দেশের প্রথমসারির নেতা-মন্ত্রীরা সগর্বে বলেন ‘দো-চার কিতাব পড়নেওয়ালা' রখলেঙ্গে', সেখানে আর কী আশা করা যায়। তিনি বা তারা বোকা নন, জনগণের পালস্ তারা খুব ভালভাবে বুঝেই এইসব কথাবার্তা বলেন। ভুললে হবে না, সিস্টেমের কাছে ব্যতিক্রমি ভাবনা মাত্রেই থ্রেট। সুতরাং চিন্তা-ভাবনার উৎসগুলোকেই ছেঁটে ফেলো। একসময়ে তা গাজোয়ারি ভাবে হয়েছে, এখন জোর খাটানোর তেমন দরকার পড়ে না, এই যা।

    এদেশের দুটো বড়সড় আন্দোলন ‘ভাঙতে' অত্যন্ত চালাক দুটো পদ্ধতি নেওয়া হয়েছিল।- সাতের দশক থেকে উচ্চপদস্থ ও এনআরআই বাঙালির সংখ্যা আর আটের দশক থেকে কোকেন-হেরোইনখোর/ মাতাল পাঞ্জাবির সংখ্যা হঠাৎ বাড়তে শুরু করা- যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। মোদ্দা কথাটি হল,- ‘নেশা' ধরিয়ে দাও, বুঁদ হয়ে থাকবে। (ছয়ের দশকে গ্রামে-গ্রামে প্রোজেক্টারের সাহায্যে বলিউডি সিনেমা দেখানো বা ভিডিও হলের সংখ্যা বাড়তে থাকা যে মোটেই সংস্কৃতির বিকাশের জন্য নয়, তা বলাই বাহুল্য!) প্রাচীন রোমে একটা কথা চালু ছিল, ‘খাবার আর সার্কাসের জোগান দিলে জনগণ সেনেট-কে কোনওদিন প্রশ্ন করবে না।'- আশ্চর্যের বিষয় হল, একুশ শতকেও কথাটা একদম তামাদি হয়নি!

    তবে এই নেশার মধ্যে বইয়ের/ বা সার্বিকভাবে সাংস্কৃতিক নেশা ব্যাপারটা একটু গোলমেলে। এই সময়ে সিলেবাসের বইয়ের বাইরে কেউ শুরুতেই কোনও গুরুগম্ভীর বই হাতে তুলে নেয় না। প্রথমে বিনোদনের উদ্দেশ্যেই পথচলা, তারপর রুচির বিকাশের সঙ্গে-সঙ্গে সিরিয়াস বইপত্র নাড়াঘাঁটার শুরু। কিন্তু, বই যতদিন শুধু বিনোদন বা নির্বিষ কিছু তথ্যচর্চায় সীমিত থাকে, কোনো চাপ নেই। বই ‘অন্যকিছু’ বলতে শুরু করলেই সিস্টেম বিব্রত হয়। (উদাহরণ হিসেবে) সেই কারণেই সিনেমা যখন ‘কিসসা কুর্শি কা’ হয়ে পড়েছে, নাটক যখন নবান্ন/ টিনের তলোয়ার/ উইংকেল-টুউংকেল হয়ে পড়েছে, উপন্যাস যখন ‘পথের দাবী’ হয়ে পড়েছে, কবিতা যখন ‘হাংরি’ হয়ে পড়েছে, সিস্টেম নড়েচড়ে বসেছে। অবশ্য এখন এসবের দরকার হয় না তেমন।

    ঘটনাচক্রে, কলেজস্ট্রীট বইপাড়ার পত্তনের সঙ্গে হিন্দু কলেজ আর ইয়ং-বেঙ্গল আন্দোলনের ইতিহাস ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। এই ইয়ং-বেঙ্গল যে বাড়াবাড়ি রকম সিস্টেম-বিরোধী ছিল- সে’কথা সবারই জানা। তারপর স্বদেশী যুগ, পাঁচ-ছয়-সাতের দশক, ইত্যাদি অনেক ‘গোলমেলে’ সময়কেই আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে এই পাড়া। সুতরাং, জন্মলগ্ন থেকেই যে সিস্টেমকে কাঠি করে চলেছে, সে বাঁশ খেলে সিস্টেমের বাবার কী? সে ভালমতোই জানে যে, মাঝেমাঝে কলকাতাইয়া ‘সাঙিসকিতিক’ আত্মশ্লাঘায় অল্পবিস্তর ফুঁ দিয়ে আর আড়ালে মুচকি হেসে প্রকাশ্যে কম্ভুকন্ঠে “হোয়াট বেঙ্গল থিংকস টুডে...” চেঁচালেই বারোআনা বাঙালি খুশি মনে টিকটকে নিমগ্ন হবে।

    আবহমান কাল ধরে বইয়ের যে দুটো বিভাজন- ‘পড়ার বই' আর ‘গল্পের বই', সে তো শুধু নোমেনক্লেচার মাত্র নয়, তার পেছনে ভীষণ জোরালো একটা সামাজিক আচার, বা বলা ভাল প্রথাগত বিশ্বাস আছে। অ্যাকাডেমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য বহুদিন আগেই ‘সুপণ্ডিত নাগরিক ও পরিচালক সমাজের সৃষ্টি’ থেকে ‘সুদক্ষ শ্রমিক/ কেরাণী সৃষ্টি’-তে পরিণত হয়েছে। তার পাশাপাশি হাজির হয়েছে বিনোদনের অসংখ্য উপায়। আর দিনে-দিনে তা বেড়েই চলেছে।– তার সঙ্গে বইয়ের সংঘাত যেমন নেই আবার আছেও। চ্যাপলিনের ভাষায়, ‘ইন্ডিভিজুয়াল জিনিয়াস’ নয়, ‘মাস ফ্রম হেডলেস মনস্টার’-ই হল সিস্টেমের উপযুক্ত প্রজা।

    ‘পাঠক’ শত্রু নয়, ‘সিরিয়াস পাঠক’রাই শত্রু। কিন্তু, কোন পাঠক কবে যে ‘সিরিয়াস’ হয়ে উঠবে- সে ঝুঁকি কে নেবে? ‘ইনভিসিবল পোটেন্সিয়াল’ যখন-তখন ‘ইন্ডিভিজুয়াল জিনিয়াস’-এ পরিণত হতে পারে। যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে। তাই বলে গায়ের জোরে ‘ফারেনহাইট 451’ চাপালে সিস্টেমের ইমেজ খারাপ হয়। সুতরাং, গুলিয়ে দাও আর ভুলিয়ে দাও। বই বিষয়টাকেই ‘টাইমপাস’ বানিয়ে দাও, লেখকমাত্রেই ‘আঁতেল’/ ‘অকম্মা’/ ‘দুশ্চরিত্র’ দাগিয়ে দাও। এমনকি, ‘পড়ার বই’য়ের ক্ষেত্রেও ‘যা জবরদস্তি গিলতে হয় এবং চাকরির বাজারে ঠিক যতটা বিক্রয়যোগ্য– সে’টুকু বাদে বাদবাকিটা পাশ করা মাত্র শিকেয় তুলতে হয়’- গোছের অলিখিত আইন চালু করে দাও।

    না, সিস্টেমকে নিজের হাতে এসব করতে হয়নি, তার প্রচলিত অশিক্ষা আর ‘অ্যা-শিক্ষা’ (অ্যাকাডেমিক শিক্ষা) দায়িত্ব নিয়ে সেই কাজ সম্পন্ন করেছে। অন্যভাবে বললে, বৌদ্ধিক লকডাউনের আর দরকার নেই, বহুদিন আগেই মগজে হার্ড-ইমিউনিটি জন্মে গ্যাছে। (সিস্টেমের বাসরঘরের হালে ইন্টারনেট নামক এক নতুন ছিদ্রের আমদানি হয়েছে বটে, সেখানেও নেট-নিউট্রলিটির পিণ্ডি চটকানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে জোরকদমে।) এতকিছুর পর বইপাড়া বাঁচল কি মরল, তাতে সে’পাড়ার বাসিন্দা আর গুটিকয় ভারাটে বাদে কার কী ‘ছিন্ন’ হয়?
  • বিভাগ : আলোচনা | ১৪ মে ২০২০ | ২৪৯ বার পঠিত
আরও পড়ুন
'The market...' - Jhuma Samadder
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • বোদাগু | 172.69.135.99 | ১৫ মে ২০২০ ০২:৩৭93330
  • ব ই পাড়া নিয়ে লিখে ভালো করেছেন। ধন্যবাদ।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত