• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • শিক্ষা দীক্ষা ভাগ্য ও নাগপাশ

    Sourav Mitra
    বিভাগ : ব্লগ | ০১ জুন ২০১৯ | ৩১৯ বার পঠিত
  • বাংলাভাষায় ‘দীক্ষা’ শব্দটি বড়ই অভাগা। ‘শিক্ষা-দীক্ষা’-র মতো যুগলে ছাড়া সে এককভাবে কানে এলেই কেমন একটা ‘ধম্ম-ধম্ম’ গন্ধ পাওয়া যায়! বেশিরভাগ অভিধানেই শব্দটির অর্থ হিসেবে পাওয়া যায়, ‘হিন্দুধর্মীয় সংস্কারবিশেষ’ বা ‘গুরু কর্তৃক শিষ্যকে বিশেষ কোনো দেবতার মন্ত্র দান’ বা ‘নির্দিষ্ট দেবতার উপাসনায় উপদেশ দান’, ইত্যাদি।

    এই কথা ঠিক যে, হিন্দুধর্ম্মে শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব, ইত্যাদি বিভিন্ন মতে দীক্ষার প্রচলন আছে। তান্ত্রিক মতে দীক্ষা দুই প্রকারের হয়, ‘বহির্দীক্ষা’ ও ‘অন্তর্দীক্ষা’। পূজা, হোম প্রভৃতি বাহ্যিক অনুষ্ঠানের নিয়মকানুন বা আচার বহির্দীক্ষার অন্তর্গত। অন্যদিকে, মানুষের আত্মশক্তি বা কুন্ডলিনীশক্তির জাগরণ ঘটে অন্তর্দীক্ষার মাধ্যমে। কিছু তান্ত্রিক পুঁথিতে তিন প্রকার দীক্ষার উল্লেখ পাওয়া যায়; শাম্ভবী, শাক্তী ও মান্ত্রী।... মোটের কথা হল, এই পথে চললে ‘দীক্ষা বিষয়টি গুরুবাদী ও ধর্মীয় আচার বিশেষ’ -এই ধারণা আরও বেশি পোক্ত হয়। কিন্তু, এ-হেন একটি শব্দ আধুনিক যুগেও ‘শিক্ষা’ শব্দের (ও পদ্ধতির) লেজুর হিসেবে রয়ে গিয়েছে কেন?

    ভেবে দেখার বিষয় হল, কোনও আধুনিক পাঠ্যক্রমের শেষে বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি (ডিগ্রী) প্রদানের অনুষ্ঠানকে বা ‘দীক্ষান্ত ভাষণ’-এর অনুষ্ঠানকে ‘সমাবর্ত্তন’ (বা সমাবর্ত্তন) কেন বলা হয়? ‘সম আবর্ত্তন’ বা ‘একই কক্ষপথে ঘোরা’-এর সাথে এই অনুষ্ঠানের কী সম্পর্ক?

    অসীম জ্ঞানের শিখা (শি)–কে কর্তিত করে/ কেটেছেঁটে/ সংক্ষিপ্ত করে (ক্ষ)[1] বা আজকের ভাষায় ‘Curriculum’ বা ‘পাঠ্যক্রম’ বানিয়ে প্রদান ও গ্রহণ করা হল ‘শিক্ষা’। আর সেই ‘কর্তিত জ্ঞান’ বা ‘বিদ্যা’-এর প্রয়োগপদ্ধতি (application) হল ‘দীক্ষা’। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ত্রিকোণমিতি শিখল। এখানে ত্রিকোণমিতি হল বিদ্যা, যার অধিকার বলে সে ‘বিদ্বান’ বা ‘ত্রিকোণমিতিবিদ’ হয়ে ওঠে। নিজের হৃদয়ে সেই বিদ্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবন, তার সামগ্রিক বোধের উত্তরণ, ইত্যাদি হল তার ‘শিক্ষা’। তারপর সেই ত্রিকোণমিতির বিদ্যা ‘কাজে লাগিয়ে’ পর্ব্বতের উচ্চতা মাপার পদ্ধতি শিখল, -এই হল তার ‘দীক্ষা’। যার সুবাদে হয়তো সে একদিন সুদক্ষ ‘ভূ-বিজ্ঞানী’ হয়ে উঠবে।

    প্রয়োগপদ্ধতিকে বারবার অভ্যাস (practice) করে বা ‘সম-আবর্ত্তন’ করতে করতে ক্রমশঃ আমরা ‘দক্ষ’ বা ‘expert’ হয়ে উঠি। এই প্রসঙ্গে ইংরেজীর ‘con-vocation’ শব্দের পাশাপাশি vocational training, advocate, provoke, revoke, vocabulary (অভ্যাসের দ্বারা রপ্ত হওয়া শব্দভাণ্ডার), ইত্যাদি শব্দগুলিকে বিবেচনা করা যেতে পারে। এই শব্দগুলির সৃষ্টি হয়েছে ‘প্রোটো ইন্দো-ইউরোপীয়’ ভাষার ‘wekw’ (বাক্, বাক্য, ইত্যাদি) থেকে। সহজ ভাষায়, শিক্ষা হল জ্ঞানের ‘প্রবেশ’ পদ্ধতি ও দীক্ষা হল জ্ঞানের ‘নিঃসরণ’ পদ্ধতি। (যা কিনা চিরাচরিত ‘Theory & Application’–এর ধারণার থেকে কিছুটা আলাদা।) যে পথে ‘প্রবেশ ও নিঃসরণ’ উভয়ই ঘটে, তাকে বলে ‘মুখ’। স্মর্তব্য: গুহামুখ, ইত্যাদি শব্দ। এছাড়াও ‘নাটকাদির সন্ধিবিশেষ’;[2] অর্থাৎ যখন আগের অঙ্কের কুশীলবগণ মঞ্চ থেকে নির্গত হয় ও পরের অঙ্কের কুশীলবগণ মঞ্চে প্রবেশ করে, -তাকেও মুখ বলে। (ঠিক তেমনই, মানবদেহের যে অঙ্গের মাধ্যমে খাদ্য-পাণীয় ‘গ্রহণ’ ও বাক ‘নিঃসরণ’ ঘটে, তাকেও ‘মুখ’ বলে।) জ্ঞান আহরণ ও তার প্রয়োগের যুগপৎ চর্চাকে বলে ‘মুখস্থ’ করা। কিন্তু, দুঃখজনক ভাবে সবকিছু ভুলে ‘মুখ’ শব্দের অর্থ শুধুমাত্র ‘mouth’ ধরে বসায় ‘পড়া মুখস্থ’-এর নামে বিদ্যার্থীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তোতাপাখিতে পরিণত হয়ে চলেছে!

    ‘দীক্ষা’ সম্পর্কিত আলোচনার শেষ ভাগে উপনীত হওয়ার আগে বলে রাখা ভাল, এই অংশে ‘জপ’, ‘মন্ত্র’, ‘পাতক’ ইত্যাদি এমন কিছু শব্দের আগমন ঘটবে, যেগুলিকে প্রচলিত ভাবে ‘ধর্মীয় পরিভাষা’ হিসেবেই আমরা চিনি। সেই ধারণাগুলিকে আপাতত ছেঁটে শব্দগুলির ব্যুৎপত্তিগত/ ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ ধরতে হবে। যেমন ‘জপ’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত/ ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ হল ‘উচ্চারণ’/ ‘কথন’/ ‘পাঠ’। ‘মন্ত্র’ শব্দের অর্থ হল ‘মন-কে ত্রাণ করে যা’ (‘কে করে’ –তা নিয়ে কোনও বস্তুবিচার নেই)। ‘পাতক’ শব্দের অর্থ হল ‘যা বিস্তৃত হয়ে গিয়েছে/ ছড়িয়ে গিয়েছে’। এই ‘পাতক’ শব্দটির ‘পাপী’ অর্থে বহুল ব্যবহার আছে। কিন্তু বিস্তারের সঙ্গে পাপের কী সম্বন্ধ?

    ব্যক্তির খ্যাতি/ কর্ম্ম/ যশ/ পরিচয় যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন ব্যক্তি নিজের সেই পরিচয়ের দ্বারা প্রতিপালিত হতে শুরু করে। অর্থাৎ নিজের যে পরিচয়-কে সে এতদিন পালন করছিল, সেই পরিচয় এখন তাকে পালন করছে। -এমন কাজ ‘ত্যাগ-মাহাত্ব প্রধান’ প্রাচীন দর্শন অনুসারে ছিল বর্জনীয়, ‘পাপ। কবি কালিদাস রায়ের ‘ত্রিরত্ন’ কবিতার দু’টি পঙক্তি-তে বিষয়টি সুন্দর ভাবে উপস্থাপিত করা আছে। বৃ্ন্দাবনের রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামীর শিষ্য শ্রীজীব এক মথুরাবাসী দাম্ভিক পণ্ডিত-কে তর্কে পরাজিত করার পর সমবেত জনতা তার নামে জয়ধ্বনি দিতে শুরু করে। তখন সে গুরুর সামনে এসে দাঁড়ালে, গুরু রূপ গোস্বামী বলছেন;-

    “শুচি হয়ে আজ আসো নাই তুমি স্নান করি যমুনায়,
    যশ-প্রতিষ্ঠা শূকরীবিষ্ঠা মেখে এলে সারা গায়।
    মুখদর্শন করিব না তব –বৃথা তোমা পালিলাম,
    রাজসভা তব সুযোগ্য ঠাঁই, নহে এই ব্রজধাম।”

    ‘পাপ’ শব্দের ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ ‘পালকের পালন-কারক/কারী’। মনে রাখতে হবে, যে পুত্র-কে পালন করা হয়, তার দ্বারা প্রতিপালিত না হওয়ার জন্য বার্ধক্যের শুরুতে পিতা-মাতার বানপ্রস্থ গ্রহণের রীতি ছিল। সংক্ষেপে বললে, এই হল ‘পাতক’ রহস্য। শাস্ত্র অনুসারে, দীক্ষা যথাযথ ভাবে সম্পূর্ণ না হলে সেই দীক্ষা অল্প সময়ের মধ্যেই লক্ষ ‘উপ-পাতকে’ ও কোটি ‘মহা-পাতকে’ দগ্ধ করে। কাব্য হোক কি দর্শন, গণিত হোক কি ইতিহাস, বিজ্ঞান হোক কি যুদ্ধবিদ্যা, – যা কিছু ‘মন-কে ত্রাণ’ (relief, rescue, deliverance, protection, etc) করে, তা-ই হল ‘মন্ত্র’। প্রাচীন দর্শন অনুসারে, জ্ঞান জগতে তিন ধরণের মন্ত্র আছে, ‘পুং-মন্ত্র’, ‘স্ত্রী-মন্ত্র’ ও ‘নপুংসক মন্ত্র’।[3] -সৃজনশীল উদ্ভাবনী/ নেতৃত্বের মন্ত্র, সৃজনশীল সহকর্ম্মের মন্ত্র ও (সৃজনশীলতাহীন) পুনরাবৃত্তির মন্ত্র। আধুনিক ইংরেজিতে বললে ‘knowledge for leadership/ innovation’, ‘knowledge for fellowship’ ও ‘skill for repeatative (non-inovative) actions’। (‘ধর্মীয় আচার’ সংক্রান্ত মন্ত্রগুলির মধ্যে যেগুলির শেষে ‘হুঁফট্’, ‘স্বাহা’ ও ‘নমঃ’ থাকে, সেগুলি যথাক্রমে ‘পুং-মন্ত্র’, ‘স্ত্রী-মন্ত্র’ ও ‘নপুংসক মন্ত্র’।)

    উদাহরণের কবিতাটিতে শ্রীজীব-কে বলা হয়েছে, ‘রাজসভা তব সুযোগ্য ঠাঁই’। কিন্তু, বলার ভঙ্গীতে তাচ্ছিল্য বা তিরষ্কারের ভাব মোটেই চোখ এড়িয়ে যায় না। কিন্তু, রাজসভায় ঠাঁই পাওয়া বা জীবনে ‘সুপ্রতিষ্ঠিত’ হওয়াকে এই নজরে দেখার কারণ কী? – ‘প্রতিষ্ঠা পাওয়া’, ‘থিতু হওয়া’, ‘stability’ বা ‘নিজের পায়ে দাঁড়ানো’ –যে ভাবেই/ ভাষাতেই বলা হোক না কেন, এই প্রতিটি অভিব্যক্তির ক্রিয়াগুলিই ‘থেমে যাওয়া’ বা ‘গতিহীনতা’-র অর্থ ধারণ করে। বর্ত্তমান সময়ের নিরিখে ‘প্রতিষ্ঠিত হওয়া’-কে ‘গতিহীনতা’ বললে অনেকেই কপাল কুঁচকোবেন। বলবেন, ‘গতিহীনতা’ নয়, একেই বলে ‘অগ্রগতি’!

    জর্জ বার্নার্ড শ্য (সম্ভবতঃ ‘Man and Superman’ নাটকে) একটি সুন্দর উদাহরণের মাধ্যমে এই তর্কের নিরশন করেছেন। - মৌমাছি আর পিঁপড়েদের জীবনের কথা ভেবে দেখা যাক। এই দুই পতঙ্গ-কে কোনওমতেই অলস বলা যায় না। জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি নিজের চাক বা বাসার প্রতি তাদের অঙ্গীকার প্রায় অতুলনীয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা ‘শুধুমাত্র’ সেই চাক বা বাসা-কে একই ‘গতে’ একই পথে ভরণপোষণ করে চলে। কিন্তু, তার চাক/ বাসাটুকুই তো সৃষ্টির সবকিছু নয়! এই পুনরাবৃত্তির ফলে তাদের প্রজাতি হয়তো টিকে আছে, জাতির সার্বিক কোনও ‘অগ্রগতি’ হয় নি। কয়েক হাজার বছর ধরে ‘প্রতিষ্ঠিত’ ও ‘গতে বাঁধা’ চলাফেরার পরও মৌমাছিদের মধুপ্রকোষ্ঠ বা পিঁপড়েদের বাসার আকার অবধি বদলায় নি!

    উপযুক্ত দীক্ষা ছাড়া শিক্ষায় প্রাপ্ত মন্ত্রের ‘জপ’ বা পাঠ ব্যর্থ হয়। ফলে জ্ঞান অর্জ্জন করলেও মানুষ প্রকৃত অর্থে ‘জ্ঞানী’ হয়ে উঠতে পারে না। -একেই বলে ‘শিব গড়তে বাঁদর’ হওয়া! এই প্রবাদটির তাৎপর্য হল, ‘চেয়েছিলাম হতে জ্ঞানের শিখা বহনকারী জ্ঞানীপুরুষ (শিখাধারী ব্রাহ্মণ/ পণ্ডিত), হলাম ডিগ্রী/ উপাধির লেজধারী শিক্ষিত চাকুরে’! স্মরণীয়, আজ-ও ডিগ্রী/ উপাধিকে ‘নামের পিছনের লেজ/ লাঙ্গুল’ বলা হয়।

    লাঙ্গুল, লাঙ্গল, লিঙ্গ –শব্দগুলি ‘লঙ্’ ধাতু থেকে সৃষ্ট। ‘√লঙ্’ = সৃষ্টি করা। লাঙ্গুল (লেজ), লাঙ্গল, লিঙ্গ –শব্দগুলি বিভিন্ন ভাবে সৃষ্টিশীলতার/ সৃজনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। যাই হোক, এই লেজের সাহায্যে শিক্ষিত চাকুরেগণ ‘management tree’-এর ‘branch’-এ বা সমাজবৃক্ষের শাখায় ঝুলতে থাকে। যখন যে শাখায় ঝোলে, তখন সেই শাখা থেকে জীবনধারণের রসদ জোগাড় করে। এই শাখায় শাখায় তারা ‘অনুসন্ধান করে’ চলে (√মৃগ্), তাই তারা ‘শাখামৃগ’-ও বটে! ইংরেজিতে জ্ঞানী সন্ন্যাসী অর্থে ‘monk’ও বানর অর্থে ‘monkey’ শব্দদুটির ধ্বনিগত সাদৃশ্য-ও লক্ষ্যণীয়। এই বানরদের ডিগ্রী/ লাঙ্গুলের তেজ মারাত্বক! রামায়ণের বর্ণনা অনুসারে, এরা ডিগ্রীর জোরে জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ/ ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠদের (রাবণ)–এর চেয়েও উঁচু আসন নিয়েছিল।

    ‘শব্দকল্পদ্রুম’ অভিধানে ‘বানরঃ’ শব্দের প্রথম অর্থটি হল ‘বা বিকল্পিতো নরঃ’ (‘বা’ = going/ hurting/ weaving, ‘বিকল্পিত’ = prepared/ arranged, ‘নরঃ’ = person/ hero/ a man or piece at chess or draughts[4]! এই বানরকুলের মধ্যে যে/ যারা অপেক্ষাকৃত অধিক জ্ঞানী, ‘থিতু’ জনগণের মধ্যে যারা কিছুটা হলেও গতিশীল, -তাকে/ তাদের-কে বলা হোত ‘হনুমান’। ‘হনু’ শব্দটি এসেছে ‘হন্’ ধাতু থেকে। যার অর্থ ‘গমন করা’।[5] (আজও ‘বিজ্ঞ-বিজ্ঞ ভাব’ দেখানো মানুষের সম্বন্ধে ‘বড়ো হনু’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়!) প্রবল পরাক্রমীরাও (ভীম) এই ‘হনু’-দের ডিগ্রীর (লাঙ্গুলের) ভার তুলতে পারে না!

    একফাঁকে বলি, - পাইকপাড়া, জেলেপড়া, তাঁতিপাড়া, মুচিপাড়া, শাঁখারিটোলা, পটুয়াটোলা, কুমারটুলি, খালাসিটোলা, ভট্ট/ ভাটপাড়া, খানকিনাড়া (কাঁকিনাড়া), ইত্যদি স্থাননাম থেকে যেমন সেখানকার আদি বাসিন্দাদের পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনই ‘বানরীপাড়া’ (ঢাকা) নামটি থেকে বোঝা যায় আদিতে সেখানে শিক্ষিত কর্ম্মচারীগণ বাস করত। অভিজাত উচ্চপদস্থ কর্ম্মচারীদের একটি বাসস্থানের নাম ‘বরাহনগর’। পাড়া, টোলা, টুলি, ইত্যদির পরিবর্তে এখানে ‘নগর’ শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয়। (‘বরাহ’ শব্দটিকে বিশদে আলোচনা করা হয়েছে ‘ত্রিশূলে ত্রিশূলে চরণচিহ্ন দিয়ে যাও’ প্রবন্ধে।)

    আইবুড়ো বা অবগাহনকারী

    ‘খণ্ডিত’ শিক্ষা ‘সম্পূর্ণ’ হলে বিদ্যার্থী ‘স্নাতক’ হয়। একই গুরুর ছাত্রেরা একে অপরের ‘সতীর্থ’ হয়। কিন্তু শিক্ষাগ্রহণের সঙ্গে স্নান বা তীর্থস্থানের সম্পর্ক কী? এই প্রশ্নের উত্তরে প্রচলিত ‘বিদ্যালয় তীর্থের সমতুল্য’ –জাতীয় ভাবনায় আবেগ যত আছে যুক্তি ততটা নেই। ‘তীর্থ’ শব্দের অর্থ শুধুই ‘দেবস্থান’ নয়।

    ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অভিধানে ‘তীর্থ’ শব্দটির যা যা অর্থ পাওয়া যায় তাদের কয়েকটি হল, - অবতরণপ্রদেশ, সৎপাত্র, খেয়াঘাট বা ঘট্ট, দেবস্থান, রতিস্থল, গুরু, শাস্ত্র, যজ্ঞ, উপায়, দর্শন, মন্ত্রি প্রমুখ রাষ্ট্রনেতা, যোনি, পুণ্যকাল, নিদান, ইত্যাদি। -এক কথায়, ‘তিরতির করে বহমান কোনও ধারার সঙ্গে মিলিত হওয়ার স্থান। এই ‘ধারা’-র প্রকারভেদ জলধারা (খেয়াঘাট), কর্ম্মধারা (যজ্ঞ), বংশধারা (যোনি), ভক্তিধারা (দেবস্থান), বিদ্যাধারা (শাস্ত্র), জ্ঞানধারা (গুরু), কালধারা (পুণ্যকাল), শাসনধারা/ আইনধারা (রাষ্ট্রনেতা), ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে।

    বিদ্যার্থীগণ এই জ্ঞানধারায়/ বিদ্যাধারায় ‘স্নান’ করে ‘স্নাতক’ হয়ে ওঠে। ঘটনাচক্রে, ওপরে বর্ণিত ধারা/ তীর্থগুলির মধ্যে সমাজের মূখ্য আট প্রকার ‘তীর্থ’-এর বিষয়ে খোঁজখবর রাখা/ সেই ‘তীর্থ’গুলিকে করায়ত্ত রাখা-কেই ‘আটঘাট জানা’/ ‘আটঘাট বাঁধা’ –এই বাগধারাটির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। বহুল প্রচলিত ব্যখা অনুসারে, তবলার আটখানি করে গাঁঠ/ ঘাট থাকে, যা বাজনার আগে তালে বাঁধতে হয়। সেই থেকে নাকি ‘আটঘাট বাঁধা’! না, তবলার সঙ্গে এই বাগধারাটির কোনও সম্পর্ক নেই।

    কিছু আগেই বলা হয়েছে ব্রহ্মচর্যের সঙ্গে আইবুড়োমির কোনও সরাসরি সম্বন্ধ নেই। তাহলে স্নাতকের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘bachelor’ কেন? -
    পাশ্চাত্যের শিক্ষাব্যবস্থায় যাকে ‘Liberal Education’ বলা হয়, মধ্যযুগে তাকেই বলা হোত ‘Liberal Arts’। (যার সূত্র ধরে, কয়েক দশক আগে অবধিও বিজ্ঞান, কলা বা বাণিজ্য সমস্ত বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে উত্তীর্ণ বিদ্যার্থীদের যথাক্রমে ‘Bachelor of Arts’ ও ‘Master of Arts’ উপাধি দেওয়া হোত।)

    এই ‘Liberal Arts’-এর দুটি পর্যায়ক্রম ছিল, ‘Trivium’ ও ‘Quadrivium’। ‘Trivium’-এর অন্তর্গত ছিল ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র ও তর্কশাস্ত্র –এই তিনটি বিষয়। উচ্চতর ‘Quadrivium’-এর অন্তর্গত ছিল পাটিগণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিত ও সঙ্গীত, –এই চারপ্রকার গণিতভিত্তিক বিষয় (হ্যাঁ, সঙ্গীতকেও গণিতভিত্তিক বিষয় ধরা হোত)। এরপর রাজশক্তি ও যাজকশ্রেণীর যৌথ উদ্যোগে পাশ্চাত্যে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন শুরু হয়। সেখানে প্রথমে ‘ঈশতত্ত্ব’, পরে একে একে ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন, ল্যাটিন/ গ্রীক সাহিত্য, ইত্যাদির চর্চা শুরু হয়।

    এর পাশাপাশি ‘Quadrivium’-এ প্রবেশ করে জীববিদ্যা, বিভিন্ন ধরণের জড়বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো বিষয়গুলি। এই শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল ঈশ্বর, প্রকৃতি, সমাজ ও মানবদেহ –এই মূখ্য বিষয়গুলিতে সুপণ্ডিত নাগরিক/ পরিচালক সমাজের সৃষ্টি। তাই হিসাবরক্ষণ, প্রকৌশলবিদ্যা, যন্ত্রবিজ্ঞান-এর মতো বৃত্তিমূলক বিষয়গুলি পড়ানো হোত বিশ্ববিদ্যালয়ের তথা ‘Liberal Education’-এর চৌহদ্দির বাইরের কিছু প্রতিষ্ঠান বা ‘Institution’-এ।

    ‘Liberal Education System’-এর বিদ্যাগ্রহণ সম্পূর্ণ হওয়ার পর বিদ্যার্থীরা যে উপাধি অর্জ্জন করত, তা ছিল ‘Bachelor of Arts’। এই ‘Bachelor’ শব্দটির উৎস ল্যাটিন ‘baccalaureus’। -যার অর্থ অল্পবয়সী বীরযোদ্ধা বা ‘Knights’। এই ‘baccalaureus’ শব্দটি আবার আরেকটি ল্যাটিন শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত, - ‘baccalaria’। গোড়ার দিকে ‘baccalarius’ ও ‘baccalaria’ শব্দদুটির অর্থ ছিল যথাক্রমে পুরুষ ও নারী শ্রমিক। একসময় কিছু মানুষ ‘ক্ষেতি’ ছেড়ে ‘ক্ষত্রধর্ম্ম’ পালন করতে শুরু করে। আর মোটামুটি চতুর্দশ শতাব্দী থেকে শব্দগুলিও ‘Knights’ সম্পর্কিত হয়ে যায়।

    তারও পরে ‘Bachelor' শব্দটি সভা, সংঘ, সমবায়, ইত্যাদির কমবয়সী সদস্যদের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হোতে শুরু করে। এরপর-পরই পাশ্চাত্য একটি নতুন শব্দের আমদানি হয়, ‘bachiler’। -এর অর্থ ছিল ‘শিক্ষনবিশ’। স্বাভাবিক ভাবেই, শিক্ষনবিশ/ অল্পবয়সী যোদ্ধা থাকাকালিন মানুষজন বিয়ে-থা করত না। সেই সূত্র ধরে মোটামুটি অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে ‘Bachelor’ শব্দটি ‘আইবুড়ো’-অর্থেও ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

    অস্বীকার করার উপায় নেই, আদিতে যে সমস্ত বৃত্তিমূলক বিষয়গুলির বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে প্রবেশাধিকার ছিল না, বর্ত্তমান দুনিয়ায় সেইগুলিরই বাজারদর সবচেয়ে বেশি। –এর মূল কারণ (মূলতঃ শিল্পবিপ্লবের পর থেকে) সমাজের, সমাজবেত্তাদের ও সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিরও মূল উদ্দেশ্য বদলে যাওয়া। তখন আর ‘সুপণ্ডিত নাগরিক ও পরিচালক সমাজের সৃষ্টি’ নয়, শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য পরিণত হয় বৃহৎ শিল্পের ও তার পরিপোষক সমাজের চাহিদা মতো ‘সুদক্ষ ও কর্ম্মকুশল শ্রমিক সৃষ্টি’-তে। (তার ভাল-খারাপের বিচার না হয় সময় করবে। করছেও।)

    বানরের ‘ভাগ্যে’ তবে রয়েছে কী?

    প্রশ্ন হল, কালিদাস রায়ের কবিতার শ্রীজীব গোস্বামীই হোক বা ‘বানরকুল’ –তাদের কি পেট চালানোর দায় থাকতে নেই? ‘থিতু’ হতে চাওয়া নিন্দনীয় হলে তাদের কি নিয়তি বা ভাগ্যের ভরসায় জীবন চালানোর বিধান ছিল?... উত্তর: হ্যাঁ ও না। ‘থিতু’ প্রসঙ্গে একটি পরে আসা যাবে। আপাতত বলে রাখা ভাল, ‘নিয়তি’ বা ‘ভাগ্য’ –শব্দগুলিকে আজকে যেই যেই অর্থে বোঝা হয়, প্রকৃত অর্থ তার চেয়ে কিছুটা অন্যরকম ছিল। ‘নিয়ত/ হামেশাই যা ঘটে’, তা ছিল ‘নিয়তি’।

    শুরুতে ঋক, সাম ও যজু –এই তিনটি সংহিতা ছিল। এদের একত্র ‘ত্রয়ী’[6] বলা হোত। অথর্ব্ব বেদ পরবর্তিকালে সংযুক্ত হয়। ‘নিয়তি’ শব্দটি শুনলেই যে ‘অদৃষ্ট’ (অচেনা অদেখা শক্তি), ‘ভগবানের কৃপা’ বা ‘এলাহী ভরসা’ –জাতীয় ভাবনাগুলি মাথায় ভিড় করে, তেমন কোনও বিশ্বাসের কথা ঋগ্বেদে পাওয়া যায় না। এই গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে মানবিক শ্রম আর পুরুষকারের জয়গাথার বর্ণনা করা হয়েছে। সাম বা যজুর্বেদও যে ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলেছে। ব্ৰাহ্মণ গ্রন্থগুলিতে সংকটে অথবা নিত্য প্রয়োজনে করণীয় বিভিন্ন যজ্ঞের (কর্ম্মযজ্ঞের) প্রসঙ্গ আছে (তবে, ঠিকমতো অর্থোদ্ধার না করলে যাদের-কে অলৌকিক বলে ভ্রম হয়)। বরং জৈমিনির ‘পূর্বমীমাংসা’-এর মতো পরবর্তি সময়ের গ্রন্থগুলিতে আচারনিষ্ঠতার প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেখানে ‘যথাযথ ভাবে অনুষ্ঠিত যজ্ঞের ফলে অপূর্ব বা অলৌকিক শক্তিবিশেষ উৎপাদিত’ হওয়ার যে বিধান ও বিবরণ পাওয়া যায় তার থেকে যজ্ঞ-কে কর্ম্মযজ্ঞের পরিবর্তে জাদুটোনা বলে ভ্রম হয়।[7] তবে এক্ষেত্রেও ঠিকমতো অর্থোদ্ধার না হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

    এর পাশাপাশি (বলাই বাহুল্য) শুরুতে ‘ভাগ্য’ শব্দটিও ঠিক ‘luck’ বা ‘fortune’ অর্থে ব্যবহৃত হোত না। সামাজিক ক্রমবিকাশের সঙ্গে মোটামুটি সমান্তরাল ধারায় মানুষের এই ‘ভাগ্য’ পরিবর্তিত হয়েছে। আদিতে, সমাজে ব্যক্তি মালিকানার প্রথা চালু হওয়ার আগে মানুষ যাবতীয় সামাজিক উৎপাদন বা সংগ্রহ নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে বন্টন বা ‘ভাগ’ করে নিত। এই ‘ভাগে’ পওয়া সম্পদ ছিল তার ‘ভাগ্য’ {ভাগ্ + য (যাওয়ন/ যোগ্যতা)}। সনাতন যুগের জ্ঞানী-কর্মীর যৌথসমাজে মানুষ নিজের কাজের (কর্ম্মের) বিণিময়ে ও কাজের পরিমাণ অনুযায়ী ভাগ পেত। সুতরাং, তখন ভাগ্য ছিল ‘কর্ম্মফল’। বৈদিক যুগে সম্পদের অধিকার ছিল বর্ণাশ্রম অনুযায়ী। চতুর্বর্ণ, অর্থাৎ ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্র যথাক্রমে শাদা, লাল, হলুদ ও কালো বর্ণের তিলক ধারণ করত। (ব্রাহ্মণ সর্ব্বস্ব ত্যাগ করত বলে ‘শ্বেতবর্ণ’, শূদ্র সর্ব্বস্ব গ্রহণ করত বলে ‘কৃষ্ণবর্ণ’, ক্ষত্রিয় বল বা শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটাত তাই অগ্নিবর্ণ বা ‘লোহিতবর্ণ’ ও বৈশ্য পান ও পালন করত তাই ‘পীতবর্ণ’ তিলক ধারণের রেওয়াজ।[8]) আবার নিজ-নিজ গোষ্ঠী বা গোত্র অনুসারে সেই তিলকের নকশা পরিবর্তিত হোত। -আজও বৈষ্ণবদের মধ্যে যে প্রথা দেখা যায়। তিলক আঁকা হয় কপালে বা ললাটে। সে’যুগে তিলক দেখে মানুষের সামাজিক অবস্থান ও সেই সাথে সামাজিক সম্পদের কতটুকু ‘ভাগ’ তার অধিকারে যাবে –তার নির্ণয় হোত। তাই এই সময় থেকে ভাগ্য–কে ‘ললাটলিখন’ বা ‘কপালের রেখা’ হিসেবে উল্লেখ করা শুরু হল।

    বাণিজ্যতন্ত্রের যুগে শুরু হল ভাগ্যে বিভিন্ন ‘গ্রহের’র প্রভাব। এই ‘গ্রহ’রা হলেন সূর্য্য (রাষ্ট্রীয় পুঁজি), চন্দ্র (বণিক পুঁজি), মঙ্গল (চিরপ্রচলিত আচার, যা কল্যাণকারী), বৃহস্পতি (‘সুর’ বা বাণিজ্যের উপযোগী আইন-ব্যবস্থার অথবা ‘দানের মাধ্যমে তুষ্টকারী’ ‘দেবতা’দের গুরুগণ), শুক্র (শুক্রাচার্য্য বা ‘সুর’ বিরোধী বিকল্প ব্যবস্থার গুরুগণ), রাহু (রাষ্ট্রীয় পুঁজি ও বণিক পুঁজি –উভয়কেই যে ‘গ্রাস’ করতে চায়। সামাজিক বিশৃঙ্খলা), শনি (যার দৃষ্টি পড়লে কিছু না কিছু মূল্য চোকাতে হয়, -জরিমানা, রাজস্ব/ শুল্ক সংগ্রাহক), ‘কেতু’ – যারা মস্তকহীন বা ভাবনাচিন্তাহীন, দেহসর্ব্বস্ব, ভ্রাম্যমান, ধ্বজাধারী, উৎপাত। এরা সামাজিক রোগবিশেষ।[9] সমাজে এদের ভূমিকা অনেকটা আজকের ভাষায়, ‘নৈরাজ্যবাদী’ বা ‘anarchist’-দের মতো, যাদের ‘মাথা’ বা দলপতি (রাহু) আবার রাষ্ট্রীয় পুঁজি বা বণিক পুঁজি কোনও কিছুকেই গ্রাস করতে পিছ-পা হয় না।[10]

    এগুলি ছাড়াও আরেকটি ভাগ্য-নিয়ন্ত্রক ‘গ্রহ’ হল বুধ। পৌরাণিক মতে, যে কিনা চন্দ্রবংশ বা (বণিকপুঁজির পৃষ্ঠপোষকদের) প্রতিষ্ঠাতা।[11] ‘শব্দকল্পদ্রুম’ অভিধানে ‘গ্রহবিশেষ’ বা ‘চন্দ্রবংশের প্রতিষ্ঠাতা’ ছাড়াও শব্দটির যে অর্থগুলি পাওয়া যায়, তা হল ‘ধীমান্’, ‘পণ্ডিতঃ’, ‘কৃতী’, ‘বিচক্ষণঃ’, ‘দূরদর্শী’, ইত্যাদি। ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্র অনুসারে ‘বুধ’ শব্দের একটি অর্থ ‘বৈয়াকরণ’।[12] -যাকে নিছক ‘grammarian’ ধরে বসলে তা অর্থ সংকোচনের শিকার হয়। ‘ব্যাকরণ’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘বিশেষভাবে বিশ্লেষণ’, বা সহজ কথায় ‘নিয়ম-নীতি’। যা কিনা ভাষার পাশাপাশি সামাজিক বা অন্য কোনও ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। (‘ক্রিকেটের ব্যাকরণ’ বা ‘ছবি আঁকার ব্যাকরণ’ –গোছের শব্দবন্ধ তো হামেশাই ব্যবহার করা হয়।) সুতরাং, ‘He who pays the piper calls the tune.’ –প্রবাদটির বাস্তবতা মানলে বণিকপুঁজির রমরমার সময়ে তার পৃষ্ঠপোষকেরাই যে সমাজ পরিচালনার নিয়ম-নীতি নির্ধারণ করবে, -তেমনটিই তো স্বাভাবিক!

    এই প্রসঙ্গে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার কথাই ভেবে দেখা যাক। সেখানে ‘সূর্য্য’-এর লেঠেল বা ‘চন্দ্র’-এর চাকর বানানোর উদ্দেশ্যে জ্ঞানজগত-কে কেঁটেছেঁটে প্রথমে একটি ‘সিলেবাস’ খাড়া করা হয়। ঠিক করা হয় একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেই সিলেবাস বিদ্যার্থীদের গেলানো হবে। -সবার গলার নলী, পেটের মাপ বা হজমশক্তি যে এক নয়, -এই সাধারণ বাস্তবতাও বর্জন করা হল! ফলে যে যার মতো গিলে ‘স্নাতক’ বা ‘স্নাতকোত্তর’ –জাতীয় পরিচয়গুলির পাশাপাশি ‘প্রথম বিভাগ’, ‘দ্বিতীয় বিভাগ’ ইত্যাদি ‘উপ-পরিচয়’ অর্জ্জন করল। কিন্তু, এই পাকচক্রে সিলেবাসের থেকেও সময়সীমা মুখ্য হয়ে উঠল না কি? জ্ঞানজগতের হিসেবনিকেশ সোজাসাপটা, - হয় ‘জানি’ অথবা ‘জানি না’ (০ অথবা ১০০%)। কিন্তু, প্রথম/ দ্বিতীয় বিভাগ জাতীয় উপপরিচয়গুলির মানে কী দাঁড়ায়? –রাম ৯০ শতাংশ জানে, শ্যাম জানে ৫০ শতাংশ, যদু মাত্র ৩০ শতাংশ...। এ যেন জ্ঞানের পূর্ণতার বদলে অপূর্ণতার পরিমাপ! শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য যদি শিক্ষাদান-ই হোত, তাহলে অন্ততঃ সিলেবাসটুকু অনুসারে হলেও, প্রতিটি বিদ্যার্থীর সমপরিমাণ জ্ঞানী হয়ে ওঠা হোত তার বিধেয়। ‘অমুক তারিখের মধ্যে তমুক অবধি পড়ে শেষ করতে হবে’ –এই ধরণের জ্ঞানবিমুখ ভাবনার সেখানে অস্তিত্ব থাকত না। কিন্তু ‘বুধ’-এর এমনই কৃপা যে, ওপরের প্রশ্নগুলি-কে একমুহূর্তে যুক্তিপূর্ণ মনে হলেও পরমুহূর্তেই সেই প্রশ্নের উত্থাপন-কে মনে হবে অবান্তর, আর কোনও বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা-কে মনে হবে অবাস্তব!

    যাই হোক, একটি সময়ে এসে ‘ভাগ্য’ আর ‘কর্ম্মফল’ বা ‘ললাটলিখন’ তো নয়ই, এমনকি ‘গ্রহের ফের’-ও আর রইল না। পরিণত হল ‘বিধির বিধান’, ‘অখণ্ডণীয়’, ‘অনিবার্য’-এ![13] এই পালাবদলের সুচনাকাল সম্ভবতঃ বৌদ্ধযুগের পতনের পর, ‘হিন্দু প্রতিক্রিয়া যুগ’-এর গোড়ার দিক থেকে। মনে রাখতে হবে, বৌদ্ধযুগ বাণিজ্যের বিকাশের যুগও বটে। আর তার পরবর্তী কয়েকটি শতাব্দী জুড়ে বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি রফতানি (কালাপানি) সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এই সময় থেকেই বর্ণাশ্রম প্রথা কর্ম্মগত থেকে জন্মগত হয়ে যায়। ফলে (উদাহরণস্বরূপ), শূদ্রসন্তানের ব্রাহ্মণত্ব অর্জ্জন বা ক্ষত্রিয়সন্তানের বৈশ্যত্ব গ্রহণের মাধ্যমে ‘ভাগ্য পরিবর্তনের’ কোনও অবকাশ থাকে না। -যেন জন্মমাত্রই অখণ্ডণীয় ‘ঠিকুজি-কোষ্ঠী’ লিখিত হয়ে যায়![14]

    অতঃপর, ‘থিতু হওয়ন’ বা ‘নগত্ব’

    যার ‘গম’ (গমন) নেই, সে-ই ‘নগ’। আর নগ + ষ্ণ = নাগ (তদ্ধিত প্রত্যয়)। অর্থাৎ, নগ থেকে জাত হয় ‘নাগ’। যে দর্শন বা সত্ত্বার কোনও ‘গমন’ হয় না বা যা যে দর্শন বা সত্ত্বা স্থির, তার থেকে জন্ম নেয় ‘স্থিতাবস্থা’ বা স্থিতাবস্থার পালনকারী দর্শন বা মানুষজন।

    তাহলে কি ‘নাগ’ শব্দের অর্থ শুধুমাত্র ‘সাপ’ বা ‘সর্প’ নয়? – না। নাগ শব্দের একটি অর্থ সীসা।[15] প্রকৃতিবাদ অভিধান (১৮৬৬) অনুসারে নাগ শব্দের কয়েকটি অর্থ হস্তী, মুণ্ডক, মেঘ। ‘অভিধান চিন্তামণিঃ’–এর ‘তির্য্যক্ কাণ্ডঃ’ অনুসারেও একপ্রকার হস্তীর নাম নাগ। অমরকোষ অনুসারে, ‘নাগ ও কাদ্রবেয় শব্দে মনুষ্যকার এবং ফণাবিশিষ্ট অনন্তাদিসর্পকে বুঝায়’। ‘বাঘ থেকে নাগ পর্য্যন্ত আঠারোটি শব্দ নাকি শ্রেষ্ঠত্ববাচক![16]

    ‘নাগনির্য্যূহ’ শব্দের অর্থ ‘গৃহের ভিত্তিনির্গত কাষ্ঠদণ্ড’ (সূত্র: প্রকৃতিবাদ অভিধান)। ভিত্তির বা ভিতের কাজই হল ‘গৃহ’ বা যে কোনও কাঠামোকে অটল বা স্থির রাখা। ‘নাগরঙ্গ’ শব্দের অর্থ সিঁদুর, যা কিনা এক প্রকার স্থায়ী সম্পর্ক অথবা সম্পর্কের স্থায়ীত্বের প্রতীক। ‘নাগর’ শব্দের অর্থেও স্থবিরতা! -‘বাঁধা প্রেমিক’ অথবা ‘বাঁধা খদ্দের’। ‘নাগ’ শব্দের ব্যাখ্যায় ‘সুখবোধ’ ও ‘শব্দকল্পদ্রুম’ অভিধানে বলা হয়েছে ‘এরা ধনাভিলাষী’ ও ‘বাঁকা কথায় (বক্রোক্তি-তে) বিশেষ ভাবে পারদর্শী’। নাগগণ ‘বিষময়’। বঙ্গীয় শব্দকোষ অনুসারে, গরল ছাড়াও বিষ শব্দের একটি অর্থ ‘স্থাবর’ (বিষয় = স্থাবরসম্পত্তি)। ‘ফণাবিশিষ্ট সর্প’দের অন্তরের বিষ হল ‘গরল’। আর ‘মনুষ্যকার’ নাগেদের বিষ তাদের সম্পত্তি। (আর চরিত্রগত ভাবে তারাও ‘গিলে খায়’!)

    মহাভারত অনুসারে নাগগণের মধ্যে একে-একে বাসুকি, ঐরাবত, তক্ষক, কর্কোটক, ধনঞ্জয়, কালিয়, মণিনাগ, আপূরণ, পিঞ্জরক, এলাপত্র, বামন, নীল, অনিল, কল্মাষ, শবল, আর্য্যক, উগ্রক, কলশপোতক, সুরামুখ, দধিমুখ, বিমলপিণ্ডক, আপ্ত, করোটক, শঙ্খ, বালিশিখ, নিষ্ঠানখ, হেমগুহ, নলুষ, পিঙ্গল, বাহ্যকণ, হস্তিপদ, মুদ্‌গরপিণ্ডক, কম্বল, অশ্বতর, কালীয়ক, বৃত্ত, সংবর্ত্তক, শঙ্খমুখ, কুষ্মাণ্ডক, ক্ষেমক, পিণ্ডারক, করবীর, পুষ্পদংষ্ট্রক, বিল্বক, বিল্বপাণ্ডর, মূষকাদ, শঙ্খশিরাঃ, পর্ণভদ্র, হরিদ্রক, অপরাজিত, জ্যোতিক, শ্রীবহ, কৌরব্য, ধৃতরাষ্ট্র, শঙ্খপিণ্ড, বিরজাঃ, সুবাহু, শালিপিণ্ড, হস্তিপিণ্ড, পিঠরক, সুসুক, কৌণপাশন, কুটর, কুঞ্জর, প্রভাকর, কুমুদ, কুমুদাক্ষ, তিত্তিরি, হলিক, কর্দ্দম, বহুমূলক, কর্কর, অকর্কর, কুণ্ডোদর এবং মহোদর নামক নাগেরা পৃথিবীতে জন্মেছে।[17]

    এর মধ্যে কৌরব্য, ধৃতরাষ্ট্র, ইত্যাদি নামগুলির উপস্থিতি প্রমাণ করে ‘নাগ’ শব্দটি শুধুই ‘সাপ’ বোঝাতে ব্যবহৃত হোত না। ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধত্ব রাষ্ট্রব্যবস্থার স্থবিরতার প্রতীক। অন্যদিকে সুরোধন/ দুর্যোধন, দুঃশাসন, প্রমুখ কৌরব্য শাসনব্যবস্থার স্থবিরতার প্রতীক। অন্য শব্দগুলির ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ নিষ্কাশন করলে ‘নাগগণ’-এর ঐতিহাসিক পরিচয়ের একটা সার্বিক চিত্র পাওয়া যাবে। তবে পুরাণ/ মহাভারত অনুসারে, নাগেদের মধ্য সর্ব্বপ্রথম যে জন্মগ্রহণ করেছে, আশ্চর্য্যজনক ভাবে তারই নাম নাকি ‘শেষনাগ’! ‘শেষের শুরু’ বা ‘খারপ দিন আসছে’ অর্থে হিন্দিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘উলটি গিনতি চালু’। প্রথম নাগের ‘শেষনাগ’ নামকরণ হয়তো তেমনই কোনও ইঙ্গিত বহন করে!

    বাহ্যিক বা সাদৃশ্যগত ভাবে ‘নগ’ বা পর্ব্বতের গাত্রে জন্ম নেওয়া সাপেদের বলা হয় নাগ। সৃজনশীলতাহীন ‘শিক্ষিত’ (কিন্তু অদীক্ষিত) কর্মীবাহিনী বা তাদের কর্ম্মের একক অস্তিত্ব প্রায় মূল্যহীন। সৃজনশীলতা নেই, তাই তাদেরকে ‘quality’–এর বদলে ‘quantity’–এর ওপরই ভরসা করতে। এই ‘quantity’ নিশ্চিত করতে তাদের পক্ষে ‘পর্ব্বে পর্ব্বে বিন্যস্ত’ একটি ধাঁচার (পর্ব্বতের বা আজকের ভাষায় ‘hierarchical administration’-এর) অন্তর্গত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। - খেয়াল করা যেতে পারে, যেখানে সৃজনশীলতার কোনও ভূমিকা নেই, তেমন একই ধাঁচের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ অধিক পরিমাণে জমে থাকলে আজও আমরা তাকে ‘কাজের পাহাড়’ বলি।

    অপরপক্ষে, ‘নগর’ শব্দটির প্রাচীন অর্থ হিসেবে যা পাওয়া, তা হল ‘যেখানে নগ অর্থাৎ অচল আয়তন সৌধগুলি থাকে’,[18] বা গুণগত ভাবে অচলায়তনের ভাব রক্ষিত হয়। এখানে ‘গম’ (গমন) শব্দের মর্মার্থ স্রেফ ‘চলাফেরা’ ধরলে সরীসৃপ-ই হোক বা বৃহত্তর কিছু, -কোনওটিকেই ধরা সম্ভব হবে না। ভোলা উচিৎ নয়, যে পারঙ্গম, হৃদয়ঙ্গম, ভুজঙ্গম, বিহঙ্গম, ইত্যাদি শব্দগুলি বিশেষ বিশেষ ধরণের ‘সক্ষমতা’ প্রকাশ করে।

    বর্ত্তমানে ‘নগর’ শব্দটির অর্থ ‘শহর’ বুঝলেও প্রাচীনকালে শহরের তিনটি ভেদ ছিল, -‘নগর’, ‘পত্তন’ ও ‘খর্বট’। রাজ্যের রাজধানীকে বলা হোত পত্তন। খর্বটগুলির অধীনে কম-বেশী দু’শোটি করে গ্রাম থাকত আর নগরের অধীনে থাকত আটশো করে গ্রাম।

    কিন্তু, যে নগর বা নগরীগুলি মূল বৈশিষ্টই হল সর্ব্বক্ষেত্রে গতি (vibrancy), তার সাথে ‘গমন না থাকা’-এর বিষয়টা কিছুটা খাপছাড়া নয় কি? – এই গতি আসলে সেই বার্নার্ড শ্য-এর মৌমাছির গতি। যার উদ্দেশ্য শুধুই টিকে থাকা। মানুষের ক্ষেত্রে সেই উদ্দেশ্য তার স্থিতাবস্থা বা ‘status quo’ বজায় রাখা।

    প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, পুরাণ অনুসারে নাগ-গণের বাসস্থানের নাম ‘ভোগাবতী’ বা ‘ভোগবতী’।[19] - কথাগুলি যে ধাঁচে বলা হল, তা শুনলে যে কোনও চিন্তাশীল মানুষই পুরোনো প্রশ্নগুলি আবার তুলবেন। এক; নাগত্ব বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চাওয়া কি খারাপ? ও দুই; নগর জীবনের বা নাগেদের উদ্দেশ্য বা ভবিতব্য যদি স্থিতাবস্থা-ই হয় তা হলে পৃথিবীতে বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রগতি (শ্রীবৃদ্ধি বা advancement অর্থে) সম্ভব হচ্ছে কী ভাবে?...

    স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে সারা জগৎ চায় তার স্থিতাবস্থা বজায় থাকুক। হয়তো সেই কারণেই জগৎকে ধারণকারী শক্তি, জগতের স্থিতাবস্থা রক্ষাকারী শক্তি বা ‘জগদ্ধাত্রী’ কে বলা হয়েছে ‘নাগরূপ যজ্ঞোপবীতধারিণী’[20]। সামগ্রিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নাগত্ব বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চাওয়া অবশ্যই জরুরী। -ঠিক ততটাই, যতটা শরীরের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জরুরী খাদ্যগ্রহণ।

    কিন্তু, ঠিক যেমন খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ না থাকলে শরীরের সেই অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে ওঠে, তেমনই নিরঙ্কুশ (unhindered) নাগত্ব সমাজ বা ব্যাক্তিকে ‘status quo’ দেওয়ার পরিবর্তে ‘static’ করে ফেলে। অনুচ্ছেদের শুরুতে যে উদাহরণটি দেওয়া হয়েছিল তার খেই ধরে বলতে গেলে, সে তখন আর ‘বাঁচার জন্য খায়’ না, ‘খাওয়ার জন্য বাঁচতে’ শুরু করে! -এই উদ্দেশ্য বিধেয় গুলিয়ে যাওয়াই হল নাগত্বের বশ্যতাস্বীকার বা ‘নাগপাশ’-এ বদ্ধ হওয়া। - স্থবিরতা চাইতে চাইতে, স্থবিরতা বজায় রাখতে রাখতে একটি সময় আসে, যেখানে স্থবিরতা মানুষের জ্ঞান বোধ বুদ্ধি –সবকিছুই হরণ করে তাকে মৃতবৎ বানিয়ে ফেলে!

    নাগেরা সবসময় ‘status quo’ বজায় রাখতে চায়। হয়তো সেই কারণেই একজন রাষ্ট্রনেতা প্রকাশ্য জনসভায় বুক ঠুকে বলতে পারেন, ‘ম্যায় পড়ালিখা আদমি নেহি হুঁ।’... তাজ্জব ব্যাপার, –যে অশিক্ষা মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড়ো অভিশাপ, তা নিয়ে কেউ গর্ববোধ করে! নাকি সমাজের নিম্নবর্গের সাথে আত্মীয়তাকে প্রমাণ করার জন্য এই বজ্রনির্ঘোষ? এই ঘটনার উত্থাপন-কে (অনুগ্রহ করে) ব্যক্তিগত আক্রমণ না ধরে নিয়ে বিচার করলে কী দাঁড়ায়? - উক্তিটি আসলে নিম্নবর্গীয়দের অশিক্ষার ‘status quo’ বজায় থাকার বা রাখার প্রতি সচেতন বা অবচেতন আস্থা নয় কি!

    না, সব দোষ নেতা বা ‘ব্যবস্থা’-এর ঘাড়ে চাপিয়ে লাভ নেই। ‘নাগরিক’ সমাজ এমনই। সে রবিবার বিকেলে সততার সাথে ‘দারিদ্র দূরীকরণ কর্ম্মসূচি’তে অংশগ্রহণ করে সোমবার সকালে যদি দেখে ‘মালতির মা’ কাজে আসে নি, –তার অসুবিধা হয়। সে জানে, এই ‘মালতির মা’য়েদের অন্যের বাড়ীতে বাসন মাজার প্রয়োজন ফুরোলে তার নিজের জীবনচর্যার ‘status quo’ বিঘ্নিত হবে। এই ‘নাগরিক’ আজীবন চার দেওয়ার মাঝে ‘আমি এই পরিবারের/ অফিসের মাথা, আমার কথামতোই সবকিছু হবে’ –এমন কথা বলে বা বলার ইচ্ছে পোষণ করে। সে যে কোনও সমালোচনা-কে শত্রুতা মনে করে। তার মেয়ে কাকে বিয়ে করবে বা করবে না -সে’ বিষয়ে ‘শক্ত হাতে’ সিদ্ধান্ত নেয়। ছেলে বিজ্ঞান পড়বে নাকি রিক্সা চালাবে –সে’ বিষয়েও হুকুম চালায়। এরপর, সেই লোকটিই আবার পাড়ার চায়ের দোকানে বা অভিজাত পানশালায় বসে আক্ষেপ করে, ‘দেশে গণতন্ত্র বলে কিস্যু নেই!’...

    গণতন্ত্র যে প্রথমে ‘ব্যক্তিগত অভ্যেস’, তারপর ‘পারিবারিক অভ্যেস’, তারও পরে ‘সামাজিক’ ও শেষে ‘রাষ্ট্রীয়’ অভ্যেস। রাষ্ট্রব্যবস্থার ভাল মন্দ দোষ গুণ যে আপন চরিত্রেরই কয়েকগুণ বিবর্ধিত অভিক্ষেপন (projection) মাত্র, -তারা এই সাধারণ সত্যটুকুও ভুলে যায়। ‘নাগরিক’ জীবন পদে পদে এমনই চুড়ান্ত মূর্খামি ও নির্লজ্জ দ্বিচারিতায় পূর্ণ। কে জানে, হয়তো শিক্ষার এই ধরণের পরিণতি দেখেই ‘লাওৎ সে’ বলেছিলেন, ‘Banish wisdom, discard knowledge. And the people shall profit a hundredfold’!

    বেদ-রহস্য ও গুরু-ছাত্র সংবাদ

    শিক্ষা দীক্ষা নিয়ে এত কথা হল, অথচ গুরু আর ছাত্রের সাথে পরিচয় হবে না, তা কি হয়? কিন্তু, বিপত্তি ‘ছাত্র’ শব্দটি নিয়েই। ‘ছাত্র’ ও ‘ছত্র’ শব্দদুটি যে একই পরিবারভুক্ত তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। তবে ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ ও ‘প্রকৃতিবাদ অভিধান’-এ শব্দটির অর্থ হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে, ‘গুরুর দোষাবরণশীল’। অর্থাৎ কিনা ‘যে গুরুর দোষ ঢেকে রাখে’! এই অপকর্ম্মটি আধুনিক যুগের বেশিরভাগ ‘গুরু’র ভবিতব্য হতেই পারে, তাই বলে অভিধানে এমনধারা গোলমেলে অর্থ থাকবে কেন! প্রাচীন সংস্কৃত অভিধানেও (‘শব্দকল্পদ্রুম’) পাওয়া যাচ্ছে, ‘ছত্রং গুরুর্দোষাণামাবরণং তচ্ছীলমস্যেতি’। -সেই একই কথা!

    এদিকে প্রাচীন অভিধানগুলিতে ‘গুরু’ শব্দের অর্থ খোঁজে প্রথমেই পাওয়া গেল একরাশ বিশেষণ। - বৃহৎ, মহান, বিশাল, ভারবান্, অতিশয়, উৎকট, সুদীর্ঘ, দুস্পচ, দুর্জ্জর, উত্তম, প্রধান, পরাক্রমী, বলবান্, ইত্যাদি! ‘শিক্ষক’ জাতীয় অর্থের সন্ধান পাওয়া গেল কিনা আইনগ্রন্থে! - ‘স গুরুর্য্যঃ ক্রিয়াঃ কৃত্বা বেদমস্মৈ প্রযচ্ছতি’ (যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা ১.৩৪) ও ‘নিষেকাদীনি কর্মাণি যঃ করোতি যথাবিধি... সম্ভাবয়তি চান্নেন স বিপ্রো গুরুরুচ্যতে’ (মনুসংহিতা, ২.১৪২)। বাংলায় বললে, ‘যিনি গর্ভধানাদি উপনয়ন পর্য্যন্ত সংস্কার করিয়া বেদশিক্ষা দেন’ (কৃতজ্ঞতা: ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’)।

    প্রসঙ্গতঃ বলে রাখা ভাল গুরু (teacher), আচার্য্য, উপাধ্যায় (অধ্যাপক?) ও ঋত্বিক (শিক্ষক/ trainer/ coach) সমার্থক নয়। যিনি উপনয়ন পর্য্যন্ত সংস্কার করে ব্রহ্মচারী-কে উপদেশ দান করেন, তিনি ‘গুরু’র পদের উপযুক্ত। যিনি কোনও রকমে উপনয়ন করিয়েই বেদশিক্ষা শুরু করে দেন, তিনি ‘আচার্য্য’। যিনি পূর্ণাঙ্গ বেদ নয়, তার অংশ মাত্রের অধ্যাপনা করেন, তিনি ‘উপাধ্যায়’। ও যিনি শুধুমাত্র ‘যজ্ঞপদ্ধতি’ (কর্ম্মযজ্ঞের কৌশল বা প্রযুক্তি) বাৎলে দেন, তিনি ‘ঋত্বিক’। (তবে ‘মাতা’-র স্থান এদের সবার ঊর্ধ্বে।)[21]

    ওপরের অনুচ্ছেদটির মর্মার্থ অনুধাবন করতে কয়েকটি শব্দের অর্থ সঠিকভাবে বোঝা জরুরী। ‘ব্রহ্মচারী’ শব্দের অর্থ ‘অক্ষতযোনি’ নারী বা ‘অ-প্রহর্তাশিশ্ন’ পুরুষ নয় (তাই বলে ব্রহ্মচারীগণ যথেচ্ছযৌনাচারী ছিল, –এমনটাও বলা হচ্ছে না)। শব্দটির অর্থ ‘ব্রহ্মে চারণ করে যে’ বা ‘জ্ঞানপিপাসু’। ‘উপনয়ন’ শব্দের অর্থও ‘বামুনের ছেলের পৈতে’ নয়, ‘জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন’। ঘটনাচক্রে, প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য –তিন বর্ণেরই উপনয়ন-যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। গর্ভধারণের পর ষোল বছর অবধি বা মোটামুটি পনেরো বছর বয়স অবধি ব্রাহ্মণের উপনয়নকাল। ক্ষত্রিয়ের গর্ভধারণের পর বাইশ ও চব্বিশ বছর অবধি। বৈশ্যের উপনয়নকাল গর্ভধারণের পর একুশ ও তেইশ বছর বয়স অবধি। এরপরে আর উপনয়নের কাল নেই। তখন তারা ‘পতিত’, ব্রাত্য, যাবতীয় ‘ধর্ম্মে-কর্ম্মে’ অনাধিকারী।[22] -সেই হল শূদ্রত্ব!

    ‘বেদ’ শব্দটি নিয়ে আলোচনায় ঢোকার আগে কয়েকটি প্রচলিত ও পরিচিত তথ্য-কে একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক; - (১) বেদ ‘অপৈরুষেয়’, অর্থাৎ তা কোনও মানুষের রচনা নয়, ব্রহ্মা বলেছিলেন আর সরস্বতী লিখেছিলেন, (২) বেদ ‘বিভাজন’ করার সুবাদে কৃষ্ণদ্বৈপায়নের নাম হয় ‘ব্যাস’, (৩) তদকালীন সমাজের একাংশ বেদ বিভাজনের বিরোধিতা করেছিল, তারা বেদ-কে অস্বীকার করেছিল, ইত্যাদি।

    প্রথম প্রশ্ন হল, এখানে বেদ বলতে (পারিভাষিক) ‘গ্রন্থবিশেষ’-এর কথা ধরা উচিত নাকি (আভিধানিক) ‘সম্যক জ্ঞান’-এর কথা? গ্রন্থবিশেষ ধরলে যুক্তিগত ভাবে তাকে মানুষের রচনা হতেই হবে। দ্বিতীয়ত, কোনও একটি মোটাসোটা গ্রন্থ-কে (যদিও শুরুতে কয়েক হাজার বছর তা শ্রুতিতেই ছিল) চারটে খণ্ডে ভাগ করা কী এমন হাতি-ঘোড়া কাজ? সারা বিশ্ব জুড়ে প্রকাশকদের ঘরে ঘরে ‘গ্রন্থ বিভাজন’ রোজ হয়ে চলেছে! আর বিরোধিতা-ই বা ঠিক কী নিয়ে ছিল, -‘বেদ’ নাকি ‘বেদ বিভাজন’? –এমন অনেক প্রশ্ন পরপর মাথায় ভিড় করে।

    এইবার ‘বেদ’ শব্দটি-কে ‘সম্যক জ্ঞান’ অর্থে ধরে তথ্যগুলিকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করা যাক। - ‘ব্রহ্মা’ বা ‘আদি জ্ঞানীপুরুষদের মহাসঙ্ঘ’[23] প্রথমবার এই ‘আদি-অন্তহীন সম্যক জ্ঞান’-এর উপস্থিতি অনুভব করে ও তার দার্শনিক চর্চা শুরু করে। -হতেই পারে তা ‘জগতের সৃষ্টি কিভাবে হল’, ‘সূর্য্য কেন ওঠে’ বা ‘মহাজগতের সাপেক্ষে মানুষের জীবনের উদ্ধেশ্য কী’, ইত্যাদির মতো প্রাথমিক বা মৌলিক প্রশ্নগুলি।

    প্রচলিত গল্প অনুসারে, যেমন মাটিতে আপেল পড়ার বাস্তবিক অভিজ্ঞতা থেকে আইজ্যাক্ নিউটন বা চৌবাচ্চার উপচে পড়া জল থেকে আর্কিমিডিস পেয়েছিলেন সত্যের সন্ধান। অনেকটা তেমনই নদী-সরস্বতীর জলধারায় পুষ্ট জনগণ সেই দর্শন-কে তাদের চারপাশের বাস্তবিক জগতের আঙ্গিকে অনুধাবন করতে শুরু করে। সম্ভবতঃ এমন ঘটনা-কেই রূপকার্থে ‘সরস্বতীর দ্বারা লিখিত’ বলা হয়েছে। (স্মর্তব্য, গ্রন্থ-বেদ আদিতে যে শুধু শ্রুতি ও স্মৃতি ছিল তা-ই নয়, বেদ অনুসারেই তা ‘লেখা’ নিষিদ্ধ ছিল।)...

    ‘জগৎসৃষ্টির যে নিয়ম, আমাদের ভাবসৃষ্টিরও সেই নিয়ম। মনোযোগ করিয়া দেখিলে দেখা যায় আমাদের মাথার মধ্যে প্রকৃতি পুরুষ দুই জনে বাস করেন। এক জন ভাবের বীজ নিক্ষেপ করেন, আর এক জন তাহাই বহন করিয়া, পালন করিয়া, পোষণ করিয়া তাহাকে গঠিত করিয়া তুলেন। এক জন সহসা একটা সুর গাহিয়া উঠিন, আর এক জন সেই সুরটিকে গ্রহণ করিয়া, সেই সুরকে গ্রাম করিয়া, সেই সুরের ঠাটে তাঁহার রাগিণী বাঁধিতে থাকেন। এক জন সহসা একটি স্ফুলিঙ্গ মাত্র নিক্ষেপ করেন, আর এক জন সেই স্ফুলিঙ্গটিকে লইয়া ইন্ধনের মধ্যে নিবিষ্ট করিয়া তাহাতে ফুঁ দিয়া তাহাকে আগুন করিয়া তোলেন।’ (সূত্র: ‘প্রকৃতি পুরুষ’ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

    বলাই বাহুল্য, এই পুরুষ-প্রকৃতি মোটেই ‘biological male-female’ নয়। সাংখ্যদর্শনের মতে, জগৎ দু'টি সত্যের দ্বারা গঠিত, পুরুষ ও প্রকৃতি, - চেতনা ও পার্থিব জগৎ। প্রকৃতি চিরন্তন, তা অব্যক্ত, অকারণ, চিরসক্রিয় ও মনের অগোচর। প্রকৃতি সবরকম জাগতিক বস্তুর উৎস। অপরপক্ষে, পুরুষ হল চেতনাময় সত্তা, সনাতনদর্শন মতে –সক্রিয়তা, বেদান্তদর্শন মতে -আত্মা। ভোগ্যা প্রকৃতির ভোক্তা হল পুরুষ।

    ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ’...। -এই সবুজ হওয়া পান্নার প্রকৃতি। কিন্তু আমার (আত্ম) চেতনা (পুরুষাকার) ছাড়া পান্নার সেই ‘চিরসক্রিয়’ প্রকৃতি রয়ে যেত ‘অব্যক্ত’! (শুরুর উদাহরণের খেই ধরে বললে,) মহাকর্ষ বা প্লবতা হল প্রকৃতি। নিউটন বা আর্কিমিডিসের পুরুষাকার যাদের সূত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু, প্রকৃতি-কে ‘অকারণ’ বলা হয়েছে কেন? –উদাহরণ হিসেবে প্লবতার কথাই ধরুন। আর্কিমিডিসের সূত্র তার ‘কী’ বর্ণনা করেছে যথার্থ ভাবেই। কিন্তু, প্লবতার অস্তিত্বের কারণ অনুসন্ধানে তরল পদার্থের আণবিক, পরমাণবিক বা কোয়ান্টাম অবধি পৌছে গেলেও জ্ঞানের ঝুলিতে যা জোটে, তা আসলে একের পর এক ‘কী’ এর উত্তর। - প্লবতা থাকার ফলে কী হয়েছে, বা না থাকলে কী হোত, - তার সওয়াল-জবাব। ‘কেন আছে’ –তার জবাব চিরকালই অধরা।... হ্যাঁ, বেদ বা সম্যক জ্ঞান ‘প্রাকৃতিক’ বলেই তা ‘অপৌরুষেয়’। -প্রচলিত অর্থে কোনও ‘ভগবানের লেখা’ বলে নয়।

    একটা সময় এসে মানুষের আরোহিত বিশাল পরিমাণ জ্ঞান-কে সংক্ষেপণের ও বিষয়ভিত্তিক বন্টনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তখন ‘ব্যাস’ গোষ্ঠীভুক্ত মানুষজন সেই ব্যাবহারিক ও গাঠণিক বিভাজনে দায়িত্ব পালন করে। এই ব্যাবহারিক বিভাজনগুলি হল, ঋক (ইতিহাস ও মন্ত্র সংকলন), সাম (মন্ত্রপাঠের নিয়মাবলী ও সঙ্গীত), যজু (কর্ম্মযজ্ঞের নিয়মাবলী) ও অথর্ব্ব (মূলতঃ ঋগ্বৈদিক জ্ঞানের প্রয়োগপদ্ধতি)। অপরপক্ষে, গাঠনিক বিভাজনগুলি হল, ‘সংহিতা’ (নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসারে একত্রিত মন্ত্র-সংকলন), ‘ব্রাহ্মণ’ (অনুষ্ঠানপদ্ধতি), ‘আরণ্যক’ ও ‘উপনিষদ’ (জীবনদর্শন)।

    ‘অ-রণ’ শব্দটির অর্থ, ‘যেখানে রণ/ যুদ্ধ নেই’। ‘অরণ্য’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘রণশূন্যতার যোগ্য’ বা ‘যখন/ যেখানে রণ অনুপস্থিত থাকে’। ‘আরণ্যক’ (মূলতঃ) বানপ্রস্থকালে পালনীয়/ করণীয় বিভিন্ন যজ্ঞ ও আচারের বর্ণনার পাশাপাশি এমন কিছু দর্শনের সংকলন, যা কিনা পরবর্তী সময়ে রচিত শতাধিক উপনিষদের উপজীব্য বিষয় হয়ে ওঠে। তবে ‘বানপ্রস্থ’ শব্দটিও শুধুমাত্র ‘জঙ্গলে বাস করা’ জাতীয় স্থানবাচক অর্থ ধারণ করে না। ‘বন্’ শব্দটির অন্য কয়েকটি প্রাচীনতর অর্থ হল সেবা, যাচন, উপকার, শ্রদ্ধা, ইত্যাদি। সুতরাং, ‘বানপ্রস্থ’ একপ্রকার জীবনদর্শন। বাসস্থান হিসেবে বন-জঙ্গল এই ক্ষেত্রে মূখ্য বিবেচ্য ছিল না।

    ব্রাহ্মণ আরণ্যক উপনিষদ্ ছাড়াও সেই যুগে রচিত হয়েছিল বেদাঙ্গ সাহিত্য। বেদাঙ্গ সাহিত্যের উপজীব্য ছিল মোট ছয় প্রকার বিষয়। – শিক্ষা, ব্যাকরণ, ছন্দ, নিরুক্ত, জ্যোতিষ এবং কল্প। (আভিধানিক অর্থে) ‘বেদ’ প্রথমে ছিল বিমূর্ত ‘সম্যক জ্ঞান’। অনুমান করা যায়, তারপর সেই জ্ঞানের প্রায়োগিক দিক-কে নিশ্চিত করতে বা অন্য কোনও কারণে সেই সম্যক বা পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান-কে খণ্ডিত ও কাঠামোবদ্ধ করা হয়। এই খণ্ডকরণ ও কাঠামোবদ্ধকরণ-কেই বলা হয়েছে ‘বেদ বিভাজন’। আর ‘বেদ’ শব্দটিও তার প্রাচীনতর অর্থ খুইয়ে পরিণত হয়েছে ‘গ্রন্থবিশেষ’-এ।

    মানুষ সম্যক ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি, -এগুলির বিরোধী হয় না, ইতিহাসের দৃষ্টিভঙ্গীর বিরোধী হয়, সাহিত্যের অভিব্যক্তি বা দর্শনের বিরোধী হয়। বৈজ্ঞানিক সূত্রের ব্যামোহ, বর্জন ও ব্যতিক্রমের (ignorance, exclusions and exceptions) বিরোধী হয়, রাজনৈতিক পন্থার/ দৃষ্টিভঙ্গীর বিরোধী হয়। বিষয়গুলির সামগ্রিক অপব্যবহারের বিরোধী হয়। যতদূর মনে হয়, অতীতের সেই ‘খণ্ডিত ও কাঠামোবদ্ধ’ বেদের বিরোধিতার ধাঁচ অনেকটা তেমনই।

    এই ‘বেদ বিরোধী’রা যে মোটেই সম্যক জ্ঞানের বিরোধী ছিল না, বা বেদ-বিভাজনকারীরাও যে তাদের সমালোচকদের প্রতি খড়গহস্ত ছিল না, - তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়তো বৈদিক ভাষ্যে ‘অনেকান্তবাদী’[24] (মুক্তমনা, বহুত্ববাদী) জৈন দর্শনের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের সসম্মান উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়।

    বেদের প্রসঙ্গ আপাতত এটুকুই থাক। পুরোনো প্রশ্নটিতে ফেরা যাক, - ছাত্র গুরুর কোন্ দোষ আবরণ করে আর কেনই বা করে? – এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবতঃ লুকিয়ে আছে গুরু-র অর্থজ্ঞাপক ‘...উপনয়ন পর্য্যন্ত সংস্কার করিয়া বেদশিক্ষা দেন’ -বাক্যটির ‘সংস্কার’ শব্দটির মধ্যে।

    গুরু যা দান করেন তা প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক বা পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান নয়, সংস্কারকৃত। -যা ছিল তার কিছুটা রেখে, কিছুটা বদলে, কিছুটা জুড়ে, কিছুটা ফেলে দেওয়ার পর পড়ে থাকা অংশটির চর্চা। সে হল বিষয়বস্তুর প্রয়োজনমতো কাটছাঁট করা একটি রূপ। - ‘মুক্ত চৈতন্য’ থেকে ‘বদ্ধ চৈতন্য’-এ উপনীত হওয়া। যাতে কিনা ‘সংস্কারিত’ শিক্ষা বা সার্বিক ভাবে জ্ঞানচর্চা-কেই তদকালীন ‘সভ্যতা’র প্রয়োজনগুলির সঙ্গে সমতুল্য ও পরিপূরক করে তোলা যায়। (হয়তো বৈদিক যুগের সেই সভ্যতা রাজনৈতিক দিক থেকে তার ভিতরে রাষ্ট্রব্যবস্থার শৈশব বা বাণিজ্যতন্ত্রের অঙ্কুর-এর উপস্থিতি অনুভব করেছিল বলেই এই সংস্কার। -কে জানে!)

    তবে ‘সংস্কার’ যে শুধু বিদ্যারই হয়, তা নয়। সংস্কার হয় বিদ্যার্থীরও। এই সংস্কার ‘দশবিধ’। বিদ্যার বা মন্ত্রের ‘দশবিধ’ সংস্কার হল, - জনন, জীবন, তাড়ন, বোধন, অভিষেক (অধিকারপ্রাপ্তির বা শান্তকরণের জন্য মস্তকে জলসেচন/ ‘শান্তির জল’), বিমলীকরণ (বিশুদ্ধিকরণ), আপ্যায়ন[25], তৰ্পণ[26], দীপন (দীপ্তকরণ) ও গুপ্তি।[27] এদের মধ্যে অন্তিম সংস্কার, ‘গুপ্তি’ বিশেষ অর্থবহ। এ যেন জ্ঞান বা সত্য-কে কুক্ষিগত করার, জ্ঞানজগতে সর্ব্বসাধারণের প্রবেশাধিকার খর্ব করার বিধান! কারণ? - ‘বন্দুকের নল’ বা অন্য কোনও অস্ত্র নয়, যুগে যুগে ‘সত্যগোপন’ই হল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।...

    অন্যদিকে মনুসংহিতা, যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতা, পরাশরসংহিতা, প্রভৃতি অনুসারে ‘দ্বিজগণে’র জীবনের ‘দশবিধ’ সংস্কার হল, - গর্ভাধান, পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন, জাতকর্ম্ম, নামকরণ, অন্নপ্রাশন, চূড়াকরণ, উপনয়ন, সমাবর্তন ও বিবাহ। (‘দ্বিজ' অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য। স্মর্তব্য: ‘সংস্কারাৎ দ্বিজ উচ্চতে...’।) তবে অন্য একটি মতে মনুসংহিতার গার্হ্যসূত্রে ‘ষোড়শ সংস্কার’-এর কথা বলা হয়েছে। যথা: গর্ভাধান, পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন, জাতকর্ম্ম, নামকরণ, নিষ্ক্রমণ, অন্নপ্রাশন, চূড়াকরণ, কর্ণভেদ, বিদ্যারম্ভ, উপনয়ন, বেদারম্ভ, কেশান্ত ও ঋতুশুদ্ধি, সমাবর্তন, বিবাহ ও অন্ত্যেষ্টি। এই দশ বা ষোড়শ সংস্কারের বেশ কয়েকটি আজও আচার হিসেবে পালিত হয় বটে, কিন্তু ঠিক যেমন ‘উপনয়ন’-এর অর্থ ‘বামুনবাড়ীর ছেলের পৈতে হওয়া’ নয়, তেমনই ‘গর্ভাধান’-এর অর্থ শুধু ‘বেদপাঠরত অবস্থায় শারীরিক ভাবে লিপ্ত হওয়া’, ‘পুংসবন’-এর অর্থ শুধু ‘পুত্র (male) সন্তান কামনায় মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান’, ‘সীমন্তোন্নয়ন’-এর অর্থ ‘সাধভক্ষণ’, ‘জাতকর্ম্ম’-এর অর্থ শুধু ‘সদ্যজাতের মুখে ঘি মধু দান’ বা ‘চূড়াকরণ’ শুধুমাত্র ‘মস্তকমুণ্ডণ’ নয়।

    তাই যদি হোত, তাহলে ‘গর্ভাধান’ থেকে ‘উপনয়ন’ –এই ছয়টি সংস্কার গুরুর কর্ম্ম হোত না। ‘গর্ভাধান’ একমাত্র জন্মদাতা পিতার পক্ষেই সম্ভব। ‘যাহাতে সীমন্তের উন্নয়ণ হয়’ –তা ভালমন্দ খাওয়া নয়। ‘জাত-কর্ম্ম’ হল ‘পিতা-মাতার দ্বারা শিশুর প্রাথমিক চরিত্রগঠন, মূল্যবোধের পাঠ’, – একটি সদ্যজাত শিশুর মুখে মধু ঢাললেই সে মিষ্টভাষী হয়ে যায় না! চরিত্র মধুময় হয় কৃষ্টির গুণে। ‘চূড়াকরণ’ হল যা চূড়াকৃতি ধারণ করে (বুদ্ধি, বোধ, চেতনা, অহংকার, ইত্যাদি), তার ছেদন, – মাথা কামানো নয়! ... এক কথায়, ‘সংস্কার’ এমন কিছু পদ্ধতি, যা কিনা প্রাকৃতিক বিকাশ সুনিশ্চিত করে ‘মাটির মানুষ’ গড়ার বদলে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যযুক্ত বা উদ্দেশ্যবাহিত ‘সভ্য’ নাগরিক নির্মাণ করে।

    ‘সভ্য’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘সভার সদস্য’ বা গোষ্ঠীবিশেষের অংশ হয়ে ওঠা। সুতরাং ‘সভ্যতা’ বিষয়টিও ‘গোষ্ঠীকরণ’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। ঠিক এখানেই গুরু বা তার সংস্কারিত শিক্ষা সৃজনশীলতা ছেড়ে পুনরাবৃত্তির মুখাপেক্ষি হয়ে পড়ে। সামগ্রিকতার বদলে নির্দিষ্টিকরণের ঝোঁক দেখা যায়। এই ব্যবস্থায় যে যত বেশি শিক্ষিত, সে যেন তত বেশি সম্যকবোধহীন!

    বেদেই আছে (১.১৮.৭) ‘যস্মাদৃতে ন সিধ্যতি যজ্ঞো বিপশ্চিতশ্চন স ধীনাং যোগমিন্বতি’। অর্থাৎ, যাকে ছাড়া বিশিষ্ট জ্ঞানীদেরও শুভকর্ম্ম সম্পূর্ণ হয় না, তার সঙ্গে মন্ত্রের বা অনুষ্ঠানের জোরে নয়, বোধের দ্বারাই মিলিত হওয়া যায়। -এই ‘তিনি’, অর্থাৎ প্রাকৃতিক সার্বিকতাই হলেন প্রকৃত ঈশ্বর। রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘কর্মের ক্ষেত্রে যেখানে অন্তঃকরণের যোগধারা কৃশ হয়ে ওঠে সেখানে নিয়ম হয়ে ওঠে একেশ্বর। সেখানে সৃষ্টিপরতার জায়গায় নির্মাণপরতা আধিপত্য স্থাপন করে। ক্রমশই সেখানে যন্ত্রীর যন্ত্র কবির কাব্যকে অবজ্ঞা করিবার অধিকার পায়।’ (সূত্র: ‘আত্মপরিচয়’)

    (উদাহরণ হিসেবে) ভেবে দেখুন না, গুরু দ্রোণের শ্রেষ্ঠতম ছাত্র তার শিক্ষাভ্যাসের সময় যখন ‘পাখির চোখ’-টিকে ছাড়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনও কিছুই ‘দেখতে পায় না’, গুরু উচ্ছসিত প্রশংসা করেন। আবার সেই ছাত্রই বৃহত্তর ক্ষেত্রে বা মহোত্তর উদ্দেশ্যে সেই সংস্কারিত/ খণ্ডিত শিক্ষা প্রয়োগের সময় উদ্দেশ্য বিধেয় গুলিয়ে কিংকর্ত্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ে! তার পূর্ব্ববর্তী যাবতীয় সাফল্য হঠাৎ যেন মূল্যহীন হয়ে যায়! তখন আবার তাকে অখণ্ড জ্ঞানের ‘crash course’ পড়িয়ে, ব্যক্তিরূপ ও ব্যাক্তরূপের গভীরের ‘বিশ্বরূপ’ দেখিয়ে (এক কথায়, গুরুর দোষ আবৃত করে) কার্য্যোদ্ধার করাতে হয়! ... এই আধুনিক যুগের যাবতীয় ‘finishing school’, ‘internship’, ‘on the job training’, ‘orientation programme’, ইত্যাদি ‘গুরুর দোষ আবরণ’-এর প্রাগৈতিহাসিক পরম্পরা ছাড়া অন্য কিছু কি?...

    প্রশ্ন উঠবে, গুরু দ্রোণেরা যদি তাদের যার যার ছাত্র-কে ‘বিশেষজ্ঞ’ হয়ে ওঠার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তা কি ভুল? - হয়তো না, হয়তো বা হ্যাঁ। কিন্তু, তার পাশাপাশি এটিও সত্য, যে কোনও খণ্ডজ্ঞান সহজাত ভাবেই তার গভীরে এক ধরণের সূক্ষ্ম অসম্পূর্ণতা, সংকীর্ণতা ও পক্ষপাতদুষ্টতার ভাব বহন করে। কোনও একটি বিষয়ে মোটামুটি গভীর বিদ্যে আর বাকি ন’শো নিরানব্বইটি বিষয়ে আকাট মূর্খামির যোগফল-কেই যদি ‘শিক্ষা’ বলা হয়, -তা মর্মান্তিক।

    কিন্তু, একটি কাঠামোবদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা (জ্ঞানের চেয়েও বেশি মাত্রায়) কোনও না কোনও ‘বৃহত্তর কাঠামো’-র প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ও দায়বদ্ধ থাকে। ফলে সেই শিক্ষাও উদ্ভাবনের পরিবর্তে উদযাপনে ব্রতী হয়। সৃজনশীলতার বদলে নিয়মনিষ্ঠা আর নকলনবিশি অধিক ‘গুরু’-ত্ব পেয়ে বসে। এদিকে উদ্ভাবকদের ক্রিয়াকর্ম্মের ধাত-ই হল কাঠামোর বিনির্মাণ আর পূণর্গঠন। - কাঠামোপন্থীর গাত্রদাহ হয়তো এখানেই।

    ‘গোরুদের সমাজে’ পুরুষ গরুর চার রকম প্রভেদ আছে। - (১) বীর্যবান বা সৃজনশীল কিন্তু স্বেচ্ছাচারী ‘ধম্মের ষাঁড়’ (২) বীর্যহীন বা সৃজনশীলতাহীন ‘বলদ’, (৩) রুগ্ন, ‘গৃহপালিত’ ও গৃহস্বামীর আদেশানুসারে সৃজনশীল ‘এঁড়ে’ ও (৪) পরিণত বয়সে যাদের ‘সৃজনক্ষমতা কর্ত্তন’ করা হয়, সেই ‘আণ্ড্রাকাটা’। (তবে ‘গবোত্তম’ কোনও সমাজেও এ-হেন প্রকারভেদের উপস্থিতি দেখা গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই![28])

    জ্ঞানের চেয়েও ডিগ্রী মূখ্য। তাই সংসারে রোজের জোয়াল টানতে বলদেরই কদর বেশি, ‘ধম্মের ষাঁড়ে’রা বহুদিন ধরেই উপহাসের পাত্র! হ্যাঁ, ‘ধম্মের ষাঁড়’ বাগধারা-টির অর্থ ‘স্বেচ্ছাচারী’। কারণ, ‘অপরেচ্ছা’ পালন করে সৃজনশীল হওয়া সম্ভব নয়। (‘বৃষোৎসর্গ’ পালনের মর্ম্মার্থ মোটেই ‘পাড়া গাঁয়ে ষাঁড় ছেড়ে দেওয়া’ ছিল না।)

    কিন্তু, আজ অবধি মানবসমাজে যেদিকে যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তার কৃতিত্ব যুগে যুগান্তরে ‘গতের বাইরে থাকা’ কিছু ‘ধম্মের ষাঁড়ে’দেরই। জর্জ বার্নার্ড শ্য তার ‘Man and Superman’ নাটকে বলেছেন, ‘The reasonable man adapts himself to the world: the unreasonable one persists in trying to adapt the world to himself. Therefore all progress depends on the unreasonable man.’

    তবুও কাঠামোপন্থী ও ‘সংস্কারক’ গুরুগণ বারবার প্রাকৃতিক জ্ঞানচর্চাকারীদের একতা (এক) ছেদন (লব্য) করতেও উদ্যত হয়।... এরই মধ্যে কোন ফাঁকে যেন ‘Re-creation’-এর ভাবার্থ পরিণত হয়ে যায় ‘বিনোদন’-এ!

    যে জ্ঞান প্রাকৃতিক, তা মানুষের অনুভব-কে সম্পৃক্ত করে। সংস্কারকৃত জ্ঞান মানুষের মেধায় বা ‘intellect’-এ শান দেয়। যে কোনও বিষয়কে ক্রমাগত ব্যবচ্ছেদ করতে করতে সে বিষয়টির সম্বন্ধে একের পর এক তথ্য খুঁড়ে আনার ব্যাপারে ‘intellect’-এর জুড়ি মেলা দায়। কিন্তু, জোড়ার বেলায় অপারগ! আসলে ‘intellect’-এর স্বভাব চরিত্র অনেকটা ধারালো ছুরির মতো। আর ছুরি দিয়ে জোড়া যায় না! তার জন্য লাগে অনুভব।

    সংস্কারকৃত জ্ঞানে তথ্য আছে, তত্ত্বও আছে। আছে নিয়ম, প্রণালী, পদ্ধতি, যুক্তি, প্রযুক্তি, আইন কানুনের সমাহার। আছে উদ্দেশ্য-বিধেয়, কার্য্য-কারণের সুবিশাল তালিকা। কিন্তু, সেখানে অনুভবের স্থান কতটুকু? আর অনুভবই যদি ব্রাত্য হয়, তাহলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার পথ কী?

    আর এই কথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে, শতকরা নব্বই ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা শিক্ষাজগতে প্রবেশ করি ভাত-কাপড় ও সার্বিক পদমর্য্যাদাগত নিরাপত্তাহীনতার কারণে। এই পাকচক্রে আজ নিজের ‘মাতৃভাষার আশ্রয়’কেও অনিরাপদ ভাবছি, কাল ‘মাতৃ-আশ্রয়’ও অর্থহীন মনে হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই!... এর পাশাপাশি আরেকটি অপ্রিয় সত্য হল, গুরু যদি ‘শিক্ষাব্রতী’ হওয়ার পরিবর্তে নিজের ভাত-কাপড় বা পদমর্য্যাদা জোটানোর ধান্দায় শিক্ষাদানে রত হয়, তাহলে তার তার শিক্ষাও ভাত-কাপড় বা পদমর্য্যাদার চাইতে ‘বড়ো কিছু’ অর্জ্জনের সহায় হতে পারে না।

    *****

    --------------------------------------------------------------------------------

    [1] ‘ক্ষ’-এর অর্থ যে ‘কর্ত্তন’ (সূত্র: বঙ্গীয় শব্দকোষ), তা বোঝার জন্য ক্ষয়, ক্ষতি, ক্ষুদ্র, ক্ষরণ, ক্ষেত্র (যখানে কর্ত্তন করা হয় বা যাকে লাঙ্গলাদির দ্বারা কর্ত্তন করা হয়) ক্ষত্রিয় (যা অপর করে কর্ত্তন করে), ক্ষণ (কর্ত্তিত সময়), ক্ষমা (হিংসা, ক্রোধ, ইত্যাদির কর্ত্তন), ক্ষুদ্ (‘খুদ’, কর্ত্তিত/ চুর্ণিত শষ্যদানা), ক্ষার (যা ক্ষয়কারক), ক্ষুণ্ণ (চুর্ণিত বা পিষ্ট), ক্ষীণ (কর্ত্তিত সত্তা/ অনুভব), ‘ক্ষিপ্’ (‘to scatter’, ক্ষিপ্ থেকে ক্ষিপ্র, ক্ষিপ্ত), ইত্যাদি শব্দগুলিকে খেয়াল করা যেতে পারে। ‘ক্ষয়’ শব্দটির একটি তদ্ভব রূপ হল ‘খোয়া’, - যা কিনা ‘হারিয়ে ফেলা’, ‘নষ্ট করা’, ‘অপব্যায় করা’, ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। আবার তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে দুধের ‘ক্ষয়’ করাতে করাতে একেবারে শুকিয়ে ফেলে যে খাদ্যবস্তু প্রস্তুত করা হয়, তাকে ‘খোয়া ক্ষীর’ বলা হয়।

    [2] তথ্যসূত্র: ‘বিশ্বকোষ’, অষ্টম ভাগ – নগেন্দ্রনাথ বসু।

    [3] তথ্যসূত্র: ‘হরিভক্তিচন্দ্রিকা’ - রসিকচন্দ্র রায়, ‘যোগতত্ত্ব-বারিধি’ - সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য, ইত্যাদি।

    [4] সূত্র: ‘Andhrabharati Sanskrit to English Dictionary’

    [5] সূত্র: ‘ধাতুপারায়ণ’ - বন্দ্যোপাধ্যায়ি শ্রীযুক্ত লালকমল বিদ্যাভূষণ।

    [6] ‘ত্রয়ী বৈ বিদ্যা’ - (শতপথব্রাহ্মণ, ৪.৬.৭.১), ‘ত্রৈবিদ্যা মাংসোমপাঃ পূতপাপা’ - (গীতা, ৯.২০), ‘ত্রৈবিদ্যেভ্যস্ত্রয়ীংবিদ্যাৎ’ - (মনুসংহিতা, ৭.৪৩)...।

    [7] ঋণস্বীকার: ‘নিয়তিবাদ উদ্ভব ও বিকাশ’ - সুকুমারী ভট্টাচার্য্য।

    [8] সূত্র: ‘সুন্দর হে সুন্দর’ – রবি চক্রবর্তী ও কলিম খান। ... ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ ও ‘অমরকোষ টীকা’য় বৈশ্যের বর্ণ ‘পীত’ শব্দটির অর্থ হিসেবে হরিদ্রা, ইত্যাদি ছাড়াও তিনটি অদ্ভুত অর্থ পাওয়া যায়; - ‘গোরোচনা’, ‘গোমেদ’ ও ‘পুষ্পরাগ’। এর মধ্যে ‘গোমেদ’ যে ‘গরুর মেদ’ নয় তা বলাই বাহুল্য। বাহ্যিকভাবে ‘Cow Urine’ এর পাশাপাশি ‘Zircon’ ও ‘Topaz’ রত্নগুলির রঙ-ও বেশিরাভাগ ক্ষেত্রে হলুদ হয় ঠিকই, তবে ‘পীত’ বর্ণের সঙ্গে শব্দগুলির সম্পর্ক আরও আন্তরিক। ‘ত্রিশূলে ত্রিশূলে চরণচিহ্ন দিয়ে যাও’ ও ‘কদমতলায় কে’ প্রবন্ধদুটিতে ‘গো’ ও ‘পুষ্প’ শব্দগুলির ব্যুৎপত্তিগত/ ক্রিয়াভিত্তিক যে অর্থগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তা হল (যথাক্রমে) ‘ধনসম্পদ’ ও ‘উৎপাদন’। অপরপক্ষে, ‘রোচনা’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘প্রীতিকর’ (সূত্র: ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’), ‘মেদ’ শব্দের অর্থ ‘উদ্বৃত্ত/ অবশিষ্ট’ ও ‘রাগ’ শব্দের একটি অর্থ ‘মাৎসর্য্য’ (সূত্র: ‘মেদিনীকোষ’)। এই সূত্র ধরে ‘গোরোচনা’, ‘গোমেদ’ ও ‘পুষ্পরাগ’ শব্দগুলির একপ্রকার ব্যুৎপত্তিগত/ ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ হয় যথাক্রমে ‘ধনসম্পদের প্রীতিকর অংশ’, ‘উদ্বৃত্ত ধনসম্পদ’ ও ‘উৎপাদন/ পণ্য বিষয়ক পরশ্রীকাতরতা’। একটু তলিয়ে ভাবলেই বিষয়গুলির সঙ্গে বৈশ্যগণের বাহ্যিকের পাশাপাশি গভীরতর ‘বর্ণগত’ সম্পর্কের আন্দাজ পাওয়া যায়!

    [9] ‘কেত’ (√কিৎ + অ) থেকে কেতন, কেতা, কেতু, প্রভৃতি শব্দ সৃষ্টি হয়েছে। ‘কেত’ শব্দের অর্থ শরীর, চিহ্ন, ধ্বজা, আবাস, ইত্যাদি। ‘কেতু’ শব্দের অর্থ হল ‘উৎপাতবিশেষ’ (সূত্র: মনুসংহিতা), প্রজ্ঞাপক বা পতাকা (সূত্র: ঋগ্বেদ), রোগবিশেষ, ইত্যাদি। (কৃতজ্ঞতা: বঙ্গীয় শব্দকোষ ও প্রকৃতিবাদ অভিধান)

    [10] বহু পণ্ডিতেই বলে গিয়েছেন, system থাকলে system–এর মধ্যে অস্থিরতা ও anarchy থাকবেই। আধুনিক বিজ্ঞান অনুসারে, এই ‘সত্য’ শুধু সমাজ নয়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় অস্তিত্বের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ইলিয়া প্রিগোজিন তাঁর ‘বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব’ (Chaos Theory)-এর মাধ্যমে ‘অখণ্ডতা’ (Wholeness)-কে বর্ণনা করতে গিয়ে ‘নিরসনশীল সংগঠন’ (Dissipative Structure)-এর কথা বলেছেন। (Source: ‘Chaos Theory’ – Prigogine and Stengers, 1984) যে কোনও ‘বিকাশশীল আকার’ (evolving structure) আসলে ‘মুক্ত সংগঠন’ (open system)। এই মুক্ত সংগঠনগুলির আকার ও গঠন বজায় থাকে শক্তি (energy)-এর ক্রমাগত ব্যবহার ও নিরসন (dissipation and consumption)-এর মাধ্যমে। এই ‘নিরসনশীল সংগঠন’গুলির গভীরে থাকে ‘অস্থিরতাজনিত শৃঙ্খলার নীতি’ (Principle of Order through Fluctuation)। বিবর্ধনমূলক তথা অবঘাতী (evolutionary) দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, একমাত্র এই অস্থিরতা (fluctuation)-গুলিই প্রকৃতির সমস্ত ‘অপরিবর্তনীয় প্রক্রিয়া’ (irreversible process)-কে ব্যাখ্যা করতে পারে। মানুষ সহ ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি ‘সংগঠন’ (system) আসলে অনেকগুলি করে ‘অধীনস্থ সংগঠন’ (sub-system)-এর দ্বারা গঠিত। আর প্রতিটি ‘অধীনস্থ সংগঠন’ (sub-system) সবসময়ই অস্থির (fluctuating)।

    [11] সূত্র: বঙ্গীয় শব্দকোষ, বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ।

    [12] ‘বুধৈর্বৈয়াকরণৈঃ প্রধানভূত-স্ফোটরূপ-ব্যঙ্গ্য-ব্যঞ্জকস্য শব্দস্য ধ্বনিরিতি ব্যবহারঃ কৃতঃ।’ - কাব্যপ্রকাশঃ, প্রথম উল্লাস।

    [13] সূত্র: ‘আত্মহত্যা থেকে গণহত্যা: আসমানদারি করতে দেব কাকে’ – কলিম খান।

    [14] খ্রীষ্টপূর্ব্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে বৌদ্ধযুগের তথা পতন হয়েছিল। -যা কিনা শ্রেষ্ঠীশ্রেণীর হাতে প্রসারিত বাণিজ্যতন্ত্রেরও পতনের শুরু। আপাতভাবে সম্বন্ধহীন, কিন্তু দেখা গেল, বাণিজ্যের সেই অভূতপূর্ব্ব বিকাশের পরের পর্য্যায়েই ধর্মীয় বিধি-নিষেধের প্রতাপ ও প্রকোপ দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ... কিন্তু প্রশ্ন হল, সমাজের বৃহত্তর অংশের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এহেন পট পরিবর্তন কি সম্ভব? – না। বৃহত্তর অংশ এতে সায় দেবে কেন? – উত্তর, নিরাপত্তাহীনতা। একজন মানুষ যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখন (বুঝে বা সহজাত প্রতিবর্ত্ত ক্রিয়ায়) প্রথমে সে নিজে উদ্যোগী হয় সেই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে। সম্ভব না হলে সে পর্য্যায়ক্রমে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের স্মরণাপন্ন হয়। সেখানেও ফল না মিললে সে অলৌকিক, দৈবী শক্তি, ধারণা/ বিশ্বাস, ধর্মীয় আচারগুলির স্মরণাপন্ন হতে শুরু করে। ... একজন সমসাময়িক চাকরিপ্রার্থীর কথা ধরা যাক; প্রথমে সে নিজের যোগ্যতায় ইন্টারভিউ উৎরানোর চেষ্টা করল। বিফল হয়ে প্রথমে নিজের আত্মীয়-স্বজন, তারপর বন্ধুবান্ধব-পরিচিতদের কাছ থেকে ও শেষে নেতা-মন্ত্রীদের কাছ থেকে সুপারিশ জোটানোর চেষ্টায় রত হল। সেখানেও ফল না মিললে দেখা যাবে সে বিভিন্ন তাগা-তাবিজ, রত্ন ধারণ করতে শুরু করেছে! (এই পরিস্থিতিতে যুবকটি স্বউদ্যোগী হওয়ার চেষ্টাও করতে পারে, অথবা অন্য কিছু। কিন্তু, সেক্ষেত্রেও নিরাপত্তার অভাব হলে দেখা যাবে একই চক্রের আবর্ত্তন ঘটছে!) ... ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখুন, ‘Globalization’ রথে অসীন এই একুশশতকীয় বাণিজ্যতন্ত্র প্রায় সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হওয়ার পরপরই মোটামুটি সারা বিশ্ব জুড়ে ধর্ম্মীয় বিধিনিষেধের প্রসঙ্গ রাজনৈতিক তো বটেই, কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক ভাবেও হঠাৎ যেন বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে! ... (এই প্রবণতার কিছু ‘ঐতিহাসিক’ প্রক্ষাপট বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে ‘পৌরাণিক ঘরওয়াপ্‌সি’ প্রবন্ধে।)

    [15] ‘নাগং গণ্ডুপদভবং বপ্রং সিন্দুরকারণম্। বর্ধ্রং স্বর্ণারি-যোগেষ্টে যবনেষ্টং সুবর্ণকম্॥’ - ভূমিকাণ্ডঃ, অভিধান-চিন্তামণিঃ - শ্রীহেমচন্দ্র সূরি।

    [16] ‘স্যুরুত্তরপদে ব্যাঘ্রপুঙ্গবর্বভকুঞ্জরাঃ। সিংহশার্দ্দুলনাগাদ্যাঃ পুংসি শ্রেষ্ঠাত্বগোচরাঃ॥’ (সূত্র: অমরার্থ-চন্দ্রিকা, অমরকোষ) ব্যাঘ্র, পুঙ্গব, ঋষভ, কুঞ্জর, সিংহ, শার্দ্দুল, নাগ, তল্লজ, প্রকাণ্ড, উদ্ঘ, ইত্যাদি শব্দ কোনও পদের পরে বসলে তা শ্রেষ্ঠত্ববাচক হয়। যেমন, নরসিংহ, বীরপুঙ্গব, নৃপশার্দ্দুল, ইত্যাদি।

    [17] সূত্র: পঞ্চত্রিংশ অধ্যায় - ‘নাগগণের নামনিরুক্তি’, আদিপর্ব্ব, মহাভারত (কালীপ্রসন্ন সিংহ অনূদিত)।

    [18] সূত্র: পৌরাণিকা অভিধান – অমল কুমার বন্দোপাধ্যায়।

    [19] ‘নাগাঃ পুনঃ কাদ্রবেয়া স্তেষাং ভোগাবতী পুরী।’ - তির্য্যক্ কাণ্ডঃ, অভিধান-চিন্তামণিঃ।

    [20] ‘সিংহস্কন্ধসমাঢ়াং নানালঙ্কারভূষিতাম্। চতুর্ভূজাং মহাদেবীং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম্॥’ - জগদ্ধাত্রীর ধ্যানমন্ত্র।

    [21] ‘স গুরুর্যঃ ক্রিয়াঃ কৃত্বা বেদমস্মৈ প্রযচ্ছতি। উপনীয় দদদ্বেদমাচার্য্যঃ স উদাহৃতঃ॥ একদেশমুপাধ্যায় ঋত্বিগ্ যজ্ঞকৃদুচ্যতে। এতে মান্যা যথাপূর্বমেভ্যো মাতা গরীয়সী॥’ (সূত্র: ‘যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা’, প্রথম অধ্যায়, ৩৪-৩৫।) ... যে শিষ্য-কে উপনীত করে কল্প (বেদাঙ্গ) ও রহস্য (উপনিষদ) সহ বেদের সমস্ত শাখা অধ্যয়ন করান তার নাম ‘আচাৰ্য্য’। যে জীবিকার নিমিত্তে বেদের অংশবিশেষ বা বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করান, তাকে উপাধ্যায় বলে। যে গৰ্ত্তাধানাদি সংস্কার করে ও অন্ন দ্বারা প্রতিপালন করেন, সে হল গুরু। যে কৰ্ত্তব্য কৰ্ম্ম, ও পাক যজ্ঞ, ইত্যাদি যজ্ঞ সম্পন্ন করেন, তিনি ঋত্বিক্। আর যারা যথার্থ ভাবে বেদ (সম্যক জ্ঞান) ধ্বনির দ্বারা দুই কান পরিপূর্ণ করেন, তাদের পিতা ও মাতার স্বরূপ জানতে হয় ও কখনও তাদের অপকার করতে নেই। (‘উপনীয় তু যঃ শিষ্যং বেদমধ্যাপয়েদ্বিজঃ। সকল্পং সরহস্যঞ্চ তমাচাৰ্য্যং প্রচক্ষতে॥ একদেশন্তু বেদস্য বেদাঙ্গান্যপি বা পুনঃ। যোহধ্যাপয়তি বৃত্ত্যর্থমুপাধ্যায়ঃ স উচ্যতে॥ নিষেকাদীনি কৰ্ম্মাণি যঃ করোতি যথাবিধি। সত্তবেয়তি চান্নেন স বিপ্রো গুরুরুচ্যতে॥ অগ্ন্যাধেয়ং পাকযজ্ঞানগ্নিষ্ট্রোমাদিকান্ মখান্। যঃ করোতি বৃতেীযস্য স তস্যর্ত্বিগিহোচ্যতে॥ য আবৃণোত্যবিতথং ব্রহ্মণ শ্রবণাবুভৌ। স মাতা স পিতা জ্ঞেয়স্তং দ্রুহেৎ কদাচন॥’ - সূত্র: মনুসংহিতা, ২.১৪০-১৪৪)

    [22] ‘প্রতিবেদং ব্রহ্মচর্য্যং দ্বাদশাব্দানি পঞ্চ বা। গ্রহণান্তিকমিত্যেকে কেশান্তশ্চৈব ষোড়শে॥ আ ষোড়শাব্দাদ্ দ্বাবিংশাচ্চতুর্বিশাশাচ্চ বৎসবাৎ। ব্রহ্ম-ক্ষত্র-বিশাং কাল ঔপনায়নিকঃ পরঃ॥’ - ‘যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা’, আর্য্য-শাস্ত্র, ১.৩৬-৩৭।

    [23] ‘ব্রহ্মা’ = ব্রহ্মজ্ঞানের আধার (আ)/ ব্রহ্মজ্ঞানীদের সংঘ। সূত্র: ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’।

    [24] ‘অনেকান্তবাদ’ শব্দটি প্রথমবার মহাবীর ব্যবহার করেছিলেন। মুক্তমনস্ক হওয়া, সকল মতাদর্শ গ্রহণ ও বিভিন্ন বিশ্বাসের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন –কে ‘অনেকান্তবাদ’ বলা হয়। এটি বিপরীত ও বিরুদ্ধ মতবাদগুলিকে বিবেচনা করার শিক্ষা দেয়। বহুত্ববাদকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এই দর্শন অনুসারে, একটি মাত্র দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে তা সম্পূর্ণ বিচার করা যায় না। তাই সত্য ও বাস্তবতাকে সমস্ত ধরণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা উচিত। ‘অন্ধের হস্তীদর্শন’ উপাখ্যানের মাধ্যমে এই তত্ত্ব-কে ব্যখ্যা করা হয়েছে। -একদল অন্ধের কেউ হাতির পায়ে হাত দিয়ে ভাবছে ওই পা-টিই হাতি, কেউ শুঁড়ে হাত দিয়ে ভাবছে ওই শুঁড়-টিই হাতি, কেউ লেজে হাত দিয়ে ভাবছে ওই লেজ-টিই হাতি, কেউ কানে হাত দিয়ে ভাবছে ওই কান-টিই হাতি...। আসলে কেউ-ই ‘সম্পূর্ণ’ হাতিটির গায়ে হাত না দেওয়ায়’ তাদের একজনেরও জ্ঞান সম্পূর্ণ হচ্ছে না। প্রত্যেকেই খণ্ড খণ্ড বাস্তবিকতা-কে সত্য মনে করার ভ্রমের শিকার হচ্ছে। ... অনেকান্তবাদের দর্শন-কে পরবর্তি সময়ে ‘স্যাদবাদ’-এর দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। সংস্কৃতে ‘স্যাদ্‌’ শব্দটির অর্থ ‘হয়তো’। এই স্যাদবাদের সাতটি অনির্দিষ্ট ধারণা বা ‘সপ্তভঙ্গি’ হল, - (১) ‘স্যাদ অস্তি’ বা ‘হয়তো আছে’, (২) ‘স্যাদ নাস্তি’ বা ‘হয়তো নেই’, (৩) ‘স্যাদ অস্তি নাস্তি’ বা ‘হয়তো আছে কিম্বা নেই’, (৪) ‘স্যাদ অস্তি অবক্তব্যঃ’ বা ‘হয়তো আছে ও তা বর্ণনার অতীত’, (৫) ‘স্যাদ নাস্তি অবক্তব্যঃ’ বা ‘হয়তো নেই ও তা বর্ণনার অতীত’, (৬) ‘স্যাদ অস্তি নাস্তি অবক্তব্যঃ’ বা ‘হয়তো আছে কিম্বা নেই ও তা বর্ণনার অতীত’ এবং (৭) ‘স্যাদ অবক্তব্যঃ’ বা ‘হয়তো তা পুরোপুরিই বর্ণনার অতীত’।... হ্যাঁ, সত্যের প্রকৃত রূপ এমনই ‘অনির্ণায়ক’ বা ‘non-deterministic’! সেই কারণে স্যাদবাদে বিভিন্ন অভিব্যক্তির মাধ্যমে সময়, স্থান, বস্তু, তার আকার ও আকৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে সত্যের জটিল ও বহুমুখী প্রকৃতি-কে অনুভবের চেষ্টা করা হয়। সত্যের এই জটিলতাকে অস্বীকার করাও এক জাতীয় গোঁয়ার্তুমি ও গোঁড়ামি! (সূত্র: ‘Ahimsā, Anekānta, and Jaininsm’ by Tara Sethia ও ‘Wickipedia’)

    [25] ‘আপ্যায়ন’ শব্দটি বর্ত্তমানে ‘felicitation’ অর্থে ব্যবহৃত হলেও শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল স্থুলকরণ, প্রীতিকরণ, পরিপূরণ, উপচয়ন, বিবর্দ্ধন, ইত্যাদি। (সূত্র: ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’)

    [26] মানুষ জন্মের পর তিন ধরণের অধিকার পায়। -তার পারিবারিক ও সামাজিক পরিচয়, তার পারিবারিক সম্পত্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদ, এবং তার জন্মের আগের মুহূর্ত অবধি সমগ্র মানবজাতির অর্জিত যাবতীয় জ্ঞান। (এই জ্ঞানের অধিকার না থাকলে তাকে পশুশিকার, আগুন/ চাকা আবিষ্কার থেকে জীবন শুরু করতে হোত!) এই অধিকারগুলির প্রতি পালনীয় কর্তব্যকে বলে ‘তর্পণ’। একটি বিশেষ দিনের বিশেষ সময়ে নদীতে দাঁড়িয়ে নদীর জল ছেটানো, –প্রকৃত তর্পণ নয়, তা একটি আচার মাত্র। যাই হোক, পরিবার ও সমাজের ভরণপোষণ হল পিতৃতর্পণ। পারিবারিক ও প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষা ও সমৃদ্ধিদান হল দেবতর্পণ। আর (শুধুমাত্র উপার্জন বা নিছক বিনোদনের মতলবে নয়) কৃতজ্ঞ চিত্তে জ্ঞানচর্চার ধারায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ হল ঋষিতর্পণ।

    [27] ‘জননং জীবনং পশ্চাত্তাড়নং বোধনন্তথা। অথাভিষেকে বিমলীকরণাপ্যায়নে পুনঃ। তৰ্পণং দীপনং গুপ্তিদর্শৈতা মন্ত্রসংস্ক্রিয়াঃ॥’ — সূত্র: ‘গৌতমীয়-তন্ত্রম্‌’ ও ‘পুরোহিত দর্পন’।

    [28] ‘Bringing up’-কে বাংলায় বলা হয় ‘লালন-পালন’। নিজের সন্তানকেও কেয় বলেন ‘মেরে লাল’, কেউ বলেন ‘আমার পোলা’। এদের মধ্যে ‘পালন’ না বোঝা গেল, কিন্তু লালন কী? (না, ‘লাল’ রঙের সঙ্গে লালনের কোনও সম্পর্ক নেই। রঙ অর্থে ‘লাল’ শব্দটি আদতে ফারসি।) এই ‘Bringing up’ বা ‘মানুষ করা’ বিষয়টি ‘লালন-পালন’ নামক দুটি বিপরীতমুখী ও পরিপূরক ক্রিয়ার সমাহার। ‘লালন’ শব্দের অর্থ ‘লাই দেওয়া/ আশকারা দেওয়া’। (‘আশা-করণ’ → আশকারা/ আসকারা।) অপরপক্ষে ‘পালন’ শব্দটি ‘খাইয়ে পরিয়ে শাসন করে শারীরিকভাবে বড়ো করা’র অর্থে ব্যবহৃত হয়। উৎকৃষ্ট পালন মানুষ-কে শৃঙ্খলাপরায়ণ, নিয়মানুবর্তী, সুদক্ষ করে তোলে। প্রকৃষ্ট লালন মানুষের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায়। ‘লালন-পালন’ শব্দটি আমাদের মুখে বেঁচে থাকলেও কালচক্রে আমাদের আচার আচারণ থেকে ‘লালন’ প্রায় মুছে যেতে বসেছে। ফলে সমাজেও ‘সংসারের ঘানি বা জোয়াল টানার উপযুক্ত ‘বলদ’-এর সংখ্যায় ঘাটতি না হলেও উদ্ভাবক, আবিষ্কারক ‘ধম্মের ষাঁড়’ হয়ে উঠেছে লুপ্তপ্রায়। আর সামান্যতম সৃজনশীলতা থাকলেও হয় তারা রুগ্ন এঁড়ে হয়ে কারো না কারো খাটালে জাবর কাটায় রত, নইলে ‘আণ্ড্রাকাটা’য় পরিণত হয়ে তারাও ঘানি টানতে ব্যস্ত! (কৃতজ্ঞতা: ‘অবিকল্পসন্ধান’ – কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী)
  • বিভাগ : ব্লগ | ০১ জুন ২০১৯ | ৩১৯ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • মানিক | 78900.84.6767.126 (*) | ০১ জুন ২০১৯ ০৪:৪৭49173
  • আপনাকে তো কালটিভেট করতে হচ্ছে মশায়। সেই যে হাঁ করেছি, মুখ আর বন্ধ হচ্ছে না।
  • বেঙ্গলী | 7845.11.454512.126 (*) | ০২ জুন ২০১৯ ০৩:২৯49174
  • উই কনগ্র্যাচুলেট দি ডিস্টিঙ্গুইসড অথার অভ দিস মনুমেন্টাল প্রোডাকশন (ডাবল ডিমাই অকটেভো ৯৭৪ পেজেস) হু ইজ এভিডেন্টলি ইন পজেশন অভ এ স্টুপেন্ডাস অ্যামাউন্ট অভ অ্যাস্টাউন্ডিং ইনফরমেশন।
  • Sourav Mitra | 671212.193.124512.69 (*) | ০৩ জুন ২০১৯ ০৫:১১49175
  • আপনার লেখাগুলো বইয়ের আকারে আসা উচিৎ।
  • sourav mitra | 671212.193.124512.69 (*) | ০৩ জুন ২০১৯ ০৫:৩৮49176
  • যা তা রকম ধেড়িয়েছি। গুরুর আরেকটা পেজ একসঙ্গে খোলা ছিল। ওপরের কমেন্টখানা সেখানে করতে গিয়ে নিজের লেখাতেই পড়ে গিয়েছে। বিড়ম্বনার আর শেষ রইল না!
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত