• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • রাতপরী (গল্প)

    Sourav Mitra
    বিভাগ : ব্লগ | ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১২২ বার পঠিত
  • ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো!
    রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো জীবনযাত্রা নেই। ঘুণধরা জীবনগুলি স্মৃতিরও অতীত সময় থেকে যেন এক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে। তেলচিটে বিছানা। কালী, দুর্গা, বোম্বাইয়া নায়িকার ছবি আঁটা চুন-ঝরা দেওয়ালের খুপরিগুলির জলবায়ু চিরকালই স্যাঁতসেঁতে। ইতিহাস সবারই উনিশ-বিশ। কান পাতলে দীর্ঘশ্বাসদের বর্ণ-গন্ধও এক। শরণার্থী যেমন ত্রাণ পেলেই খুশি, পোঁটলায় চিঁড়ে আছে না মুড়ি,- তা নিয়ে মাথাও ঘামায় না, শ্যামলীও ওর প্রায়-শূন্য টাকার পুঁটুলিতে সামান্য কৃপাবর্ষণ হলেই ধন্য। রাত যত গভীর হয়, গলির মুখ থেকে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া বড়রাস্তার দিকে।
    নিজেকে নিয়ে ঘরে তিনখানা পেট। এদিকে মুদির দোকানে যাওয়ার উপায় নেই। মা-টা আবার চোখেও দ্যাখে না ঠিক করে। সে বুড়ি বেশ কয়েকবার বলেছে বটে– স্টেশনে বা মন্দিরে থালা পেতে বসার কথা। ও সায় দেয়নি। ভিক্ষের বখেরা নিয়ে খুব ঝামেলা হয় আজকাল। আর মেয়ে থাকতে মাকে যদি ভিক্ষে করতে হয়, তাহলে অমন মেয়ের মরণ ভাল!

    ‘মরণ নাই গো বাবু। দেখতে দেখতে চোখ দুটা গেছে। বিষের জীবনটা যে ক্যানে যায় না! সোয়ামির ঘরে প্রথ্‌থম বছরটায় কত সোনাই না দেখেছি মন ভরে, কী ফসলটাই না হোত!– মাঠজোড়া পালকশাল ধান, এক-একটা ধানের মধ্যে দুইখানা করে চাল হত। এখনকার লোকে নামই শুনেনি কুনোদিন। ওই পাড়ে যুদ্ধ লাগল, তারপরেই কেমন যেন সব বদলাতে লাগল চারদিকে!’
    ‘তুমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছ?’– কিছুটা উৎসাহী হয় চায়ের দোকানটিতে রাতের আড্ডা মারতে বসা একজন।
    -সোজাসুজি তো দেখিনি, তবে সারা দিন-রাত গোলাগুলির আওয়াজ আসত কানে। বর্ডারের ধারেই ঘর ছিল কিনা, ভয়ে ভয়ে থাকতাম।- হঠাৎ করে একখানা গোলা ছুটে আসতে কতক্ষণ?
    -এসেছিল নাকি?
    -না এসে কি নিস্তার আছে! হিরা আর জহরতে বাঁধানো কপাল আমাদের। স্বপ্নগুলা কোনোদিন সত্যি না হলেও ভয়গুলা ঠিক ফলে যায়। সে মানুষ জনমজুর ছিল তো; সে, তার বাপ, আরও চার-পাঁচজন সেইদিন রবির চাষে নিড়ান দিতে গিয়েছিল। তারা মাঠে গেলেন, আর তখনই খানসেনারা ওদিক থেকে কামন দাগতে লাগল। সেইবার খুব কাছে, ঘরে বসেই আমাদের কানে তালা লাগার দশা! হঠাৎ শুনি চার দিকে তুমুল হইচই,- চাষের মাঠেই গোলা পড়েছে। আমি পড়িমরি করে ছুট দিলাম। দেখি মাঠভরা ফসল দাউদাউ করে জ্বলছে! আমার শ্বশুরঠাকুর আর আরেকজনা মজুর সেখানেই মরেছিল। সেই মানুষটার পায়েও রক্ত ঝরছিল গলগল করে।

    কিছুটা বিরাম নেয় বুড়ি। কোলে নাতনি। সে বেচারি শুকনো স্তন টানতে টানতে সেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে। বুড়ির পাশে পড়শি বিলাস প্রামাণিকের ছেলে ফুচন।- বয়স নয় কি দশ। হাতের তালু সোজা, উলটো করে কয়েকটি ইটের টুকরো লোফালুফি করছে,- তার রোজের খেলার মহড়া।
    বুড়ির পোঁটলায় তামাদি গুঁড়ো দুধের প্যাকেট। চায়ের দোকানের মালিক বিহারী। তার কোন এক জ্ঞাতির ঘর ছিল বুড়ির বাপের বাড়ির জেলায়। সেই ‘কুটুম্বিতা’র সুবাদে রোজ রাতে চায়ের শেষ ডেকচি নামানোর পর নিভন্ত আঁচে এক কেটলি গরম জল বানিয়ে দেয়।- বুড়ি ঘর অবধি ফিরতে ফিরতে সে জল প্রায় জুড়িয়ে আসে। পুরোনো দলা-বাঁধা দুধ,- কতকটা গোলে, কতকটা বেহায়া স্মৃতির মতো জলে ভাসে।- নাতনির সারা রাতের খোশ-খোরাক।
    ঘোলাটে দুই চোখে ছানির পরত। এক নজরে মনে হয়, অন্ধ বুঝি। অবশ্য আদতেও তার চেয়ে খুব একটা ভাল কিছু নয়,- কতবার যে নাতনির মুখের বদলে চোখে কি নাকে দুধ ঢেলেছে!- শিশুটি তখন শ্বাস আটকে কাঁদে, বুড়ি নিজের অদৃষ্টকে গালি দেয়। এক-এক রাতে হাজার অনুরোধেও ঘুমপাড়ানি মাসিপিসিরা বস্তির ঘরে পা ফেলে না। ভাঙা জানালা, ফুটিফাটা ছাদ বেয়ে স্ট্রিটল্যাম্পের আলো উঁকি দেয়। কান্না আর ঘুমপাড়ানি গানের একঘেয়েমি দূর থেকে মনে হয় গোঙানির মতো।- প্রাণের অস্তিত্ব টের পায় রাতের পথচারীরা।
    জল ফুটেছে। গল্প সেদিনের মতো শেষ। ফুচনের হাতে কেটলি। বুড়ি এক হাতে নাতনিকে বুকে জড়িয়ে ধরে, অন্য হাতে গলির দেওয়াল আর পা দিয়ে পথের আন্দাজ করতে করতে ঘরের পথে রওনা দেয়। ঘরে হাঁড়িতে ডাল ভাত মিশিয়ে রাখা আছে। হাতড়ে খুঁজে পেলে রাতের খাওয়া জুটবে, নইলে সকালে মেয়ে ফেরা অবধি গতি নেই।
    ‘ও ঠাক্‌মা, এইদিকে। উদিকে তো ডেরেন!’
    ফুচন হাত ধরে টান দেয়।- এই ছেলেটির দৌলতেই বড় রাস্তা অবধি বুড়ির গতিবিধি।
    -ভোট কবে রে?
    -সামনের মাসে। দিবা নাকি?– তার জন্য লিস্টে নাম তুলতে হয়।
    -এখুন নাকি তেরপলে পোস্টার ছাপে সবাই?
    -ধ্যুস্, কে বলেছে তুমাকে! ওইগুলা তেরপল না, ভিনাইল।
    -ওই হল। পার্টি অফিসে শ্যামলা বুলেছিল, ভোট নামলে এনে দিবে কয়েকখানা। খবর রাখিস তো দাদা, আষাঢ় মাস আসছে। ঘরের চাল ছাইতে লাগে। গেল বছর বিষ্টি পড়লেই ভিতরে জল গড়াত। ঘরে এইটুকুন বাচ্চা-!
    ওরা পৌঁছে যায়। ফুচন নামের ছেলেটা বুড়ির হাত টেনে তাকে থামায়, ‘এই যে তুমাদের ঘর।’
    আলো জ্বালানো অর্থহীন। কুপির সলতে ঠান্ডাই থেকে যায়। হঠাৎ দমকা দিয়ে ওঠে বৈশাখের গরম বাতাস। পথের ধুলো পাক খায় ক্ষণিক। এলোমেলো ছোটে, আবার পথেই লুটিয়ে পড়ে।- ঝড় ওঠে না কোনো।

    সেই ভোররাত থেকে যেন আষাঢ়ে মুরোদ নিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। কারখানার সাইরেন ভোঁ দিয়েছে অনেকক্ষণ আগে, আলোর দেখা নেই। অবশ্য নিজের চোখের ওপর ভরসা নেই বুড়ির। বস্তির ঘুপচি ঘরখানায় একচিলতে জানালা। দরজাখানা বন্ধ করলে দিনের বেলাতেও ঘরের ভেতর সন্ধ্যা নামে। তাই বলে ভরদুপুরে যে মানুষের চোখ নাতনি আর কাপড়ের পোঁটলায় তফাত ধরতে পারে না, সে ভাবছে সকালের আলোর কথা,- ভেবে নিজেরই হাসি পায়।
    গুঁড়ো গুঁড়ো দানার মতো জলকণা আর ধোঁয়ার গন্ধে বাতাস ভারী ভারী লাগে। প্রতি দশ ফুট অন্তর একটি করে সংসার, কয়েক পেট অশ্লীল খিদে আর একটি করে উনুন। আঁচ পড়তে শুরু করেছে। অন্য দিনগুলিতেও গুল-কয়লার ধোঁয়ায় ঢেকে যায় এই বস্তি, সাতসকালেই ভূতুড়ে ভূতুড়ে মনে হয়। এই বৃষ্টির মধ্যেও রাস্তার কলতলায় রোজের চেঁচামেচির কিন্তু বিরাম বিচ্ছেদ নেই। তবে হয়তো অন্যদিনের মতো চাঁদিফাটানো, গা-জ্বালানো রোদ নেই বলে সেই চেঁচামেচির তেজ কিছুটা কম। ঘামাচি মারতে আদুল গায়ে ভিজছে কিছু ছেলে-বুড়ো। বাতাসের ছোট্ট একটা দমকের সঙ্গে কষা মশলার স্বাদু ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে আসে হঠাৎ।
    কাল বিকেলে ‘অকৃত্রিম ভারতবর্ষে’র ছবি তুলতে এসেছিল একদল সাহেব মেম। সেই সুবাদে পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার মাংস ঢুকেছে কোনো এক ঘরে। আ্যালুমিনিয়ামের সস্তা পাতলা কড়াইয়ের কোলে মশলার তো শুধু নয়, ক্রমশ রং খুলছে আশা-আকাঙ্ক্ষা-লালসারও।- প্রায়-সমবয়সি ভাইবোনের তিনজোড়া চোখ কড়াইয়ে স্থির। ঠিক তার ডানপাশের ঘরেই আজ পান্তার সঙ্গে মিয়োনো চানাচুর আর দেড়খানা পেঁয়াজ ছাড়া কিছু নেই। সামান্য নকুলদানা চুরির অপরাধে এই সাতসকালেই বেধড়ক মার খেয়েছে সে বাড়ির বাচ্চাটি।
    মাংসের গন্ধের সঙ্গে লাউগাছের ডগার বিঘতখানেক ছাদ ডিঙিয়ে ঢুকে পড়েছিল বাঁপাশের ঘরটির চৌহদ্দিতে। সে বাড়ির মহিলার চোখে পড়তেই ঘটে যায় বিস্ফোরণ।– এই ঝগড়ার গতিপ্রকৃতি চিরকালই অদ্ভুত। এখানে ঝগড়ার ইচ্ছেটাই মুখ্য, প্রসঙ্গ বিষয়টি নেহাতই অপ্রাসঙ্গিক। ফলে চেঁচামেচি শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে বেচারা লাউডগার কথা কারও খেয়াল থাকে না।- যুযুধান দু-পক্ষ তখন প্রাণপণে যুগপৎ গলা ফাটিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা চালাতে থাকে– অপরজনের অতীতে কত কেলেঙ্কারি, কত কলঙ্কিত তার বংশপরিচয়!
    দুই ঘরের কর্তারা তখন শনিঠাকুরের মন্দিরলাগোয়া চায়ের দোকানের রোয়াকে পাশাপাশি বসে র-চায়ের সঙ্গে দিনের প্রথম বিড়িতে সুখটান দিতে ব্যস্ত। হ্যাঁ, বিড়ি দুটি জ্বালাতে তারা একটিই কাঠি খরচ করেছে।
    বুড়ির ঝিমুনি কাটে। মাঝরাতে ফিরেছিল শ্যামলী। মা-মেয়ে এখনো অঘোরে ঘুমোচ্ছে। সারারাত শুধু তারই চোখের পাতা এক হয়নি।- মনের ওই এক দোষ, ফাঁক পেলেই অতীতে ছোটে। ভাবতে ভাবতে কেটে যায় কিছুক্ষণ।
    -আবার তুমি সক্কাল সক্কাল সাত-পাঁচ ভাবতে বসেছ!
    শ্যামলীর ঘুম ভেঙেছে, তার মেয়েরও। চিন্তার অভিমুখ বর্তমানে ফিরলে নাতনির গলাও কানে আসে।
    -কানা মানুষ, চলতে ফিরতে তো পারি না। বসে বসে শুধু ভাবতেই পারি।... হ্যাঁ রে, দিদি জেগেছে মনে হল। কোন্ রাত্তিরে দু-ফোঁটা দুধ দিয়েছিলাম। এমন পোড়াকপাল, খেয়েছে কি খায়নি, তাও আন্দাজে বুঝতে হয়!
    -তোমার চোখ এবার ঠিক হয়ে যাবে। সামনের মাসে ক্যাম্প বসবে বস্তিতে। নাম লিখিয়ে রাখলে বিনা পয়সায় ছানি কেটে দেবে।
    -সেই ঝঞ্ঝাট আর করিস না।
    -কেন গো?
    বুড়ির গলা স্তিমিত হয়ে আসে। ‘এক জীবনে যা দেখেছি, সব সাধ মিটেছে। ছেলের হাতের আগুন যে পাব – নিজের দোষে আজ সে আশা আর নাই। ছানির পর্দাটুকু চলে গেলে, তখন যে চোখের সামনে নিজের মেয়েকে ওই কাজে-!...’
    বুড়ি কাঁদে। গা জ্বলে যায় শ্যামলীর, ‘তোমার ন্যাকামি আর ঢং যেন শেষ হয় না! শরীর বেচে খাই তো কী হয়েছে বলো তো? অচেনা ব্যাটাছেলেদের সামনে উদোম হই বলে দোষ? সে কি শুধু আমি হই!- তারা হয় না? কই, তাদের তো কোনো দোষ লাগে না! যা করি বেশ করি। গা-জোয়ারি উপোসে খালিপেটের অভ্যাস ধরতে পারে, তাতে খিদা মরে না।
    মেঝের পাতলা বিছানায় ওর মেয়ে কাঁদছিল। কোলে তুলে ও মেয়ের মুখে নিজের একখানা স্তন গুঁজে দেয়। দুধ আর নেই তেমন। তবু শিশুটি সাধ্যমতো টানার চেষ্টা করে যায়। শ্যামলীর মুখ ভাবলেশহীন।

    নর্দমার ধারে বেহুঁশ মাতাল। একটি কুকুর তার মুখ শুঁকছে। আর-একজন প্রথমে শ্যামলীর অস্তিত্বকে পাত্তা না দিয়ে টলতে টলতে এগিয়ে যায়। কী যেন মনে করে আবার ফিরে আসে।
    -আরে, রাতপরি! বিক্রি হয়নি নাকি? আমাকে বেচবি? আমি কিন্তু আগে চেখে পরে দাম দিই।
    গোটা দু-তিনেক চোখা গালাগাল দেয় শ্যামলী। লোকটি খ্যা খ্যা করে হাসতে হাসতে নিজের পথ ধরে।
    বড়রাস্তা নামে যতটা বড়, আদপে ততটা নয়। সন্ধেবেলায় ব্যাপারী, পথচারী, মাতাল, মেছুনি, ড্রাইভার, কন্ডাক্টর, ভ্রমর, নিশিপদ্মের ভিড়ে রাস্তাটিকে মনে হয় ঠিক যেন বাহান্ন তাসের অমনিবাস প্যাকেট।- যেখানে টেক্কা সাহেবদের সঙ্গে অনায়াসে ঠাঁই পায় দুরি-তিরিদের দল! এখন শুনশান। মধ্যরাতের রাস্তালাগোয়া স্ট্যান্ডে সার সার ঘুমন্ত বাস।
    অসহ্য গরম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সারা গা ঘামে ভিজে যাচ্ছে। হাতের ব্যাগে সস্তা সুগন্ধি।- কিছুক্ষণ বাদে বাদে একবার করে ছিটিয়ে নেওয়া। কাজে এলে, খদ্দের হোক না হোক, ঘরভাড়া গুনতে হয় সবার আগে। কিছু রোজগার না হলেই নয়। মেয়ের জন্মের আগে তিন মাস ঠিকঠাক কাজে আসা যায়নি। চারদিকে অনেক ধার দেনা।
    চলতে চলতে বড় রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে যাওয়া। ক-দিন আগেও ‘রাস্তায় দাঁড়ানো’ প্রায় অভাবনীয় ব্যাপার ছিল। ফ্ল্যাটে পুলিশ আসার পর কেষ্টপুরের কিরণদিদি তাড়িয়েছে। এখন বেগতিক। এটা সস্তা পাড়া, খদ্দের এলে এখানকার মাসি প্রথমে জিজ্ঞেস করে, ‘খাটে না চটে?’ খদ্দের ‘খাট’ চায় নাকি ‘চট’,- সেই মুরোদ বুঝে তাকে মেয়ে দেখানো হয়। শুরু হয় দরদাম, দুশো থেকে হাজার-দুহাজার। ফুর্তির শখ যত বাড়ে, রেটও বাড়ে ধাপে ধাপে।
    খদ্দের আর মরণ- কে কখন আসবে, কেউ বলতে পারে না। ধীরপায়ে হাঁটতে হাঁটতে শ্যামলী এগোতে থাকে। শুনশান রাস্তা। দু-একটা বেপরোয়া ট্রাক ছাড়া গাড়িঘোড়া তেমন নেই। মাইলখানেক দূরের এক পাঞ্জাবি ধাবায় ট্রাকের ড্রাইভাররা রাতের খাওয়া সারে। সেখানে গেলে কিছু একটা গতি হতে পারে। কিন্তু, মালতী বলেছিল, ওই ধাবার মালিকের খাঁই অনেক। আর একদল ট্রাকড্রাইভারের হাতে পড়লে শরীরের কিছু থাকে না। সেই অভিজ্ঞতা আছে।- মনে পড়তেই তলপেট মুচড়ে ওঠে।
    ধাবার কাছাকাছি পৌঁছে শ্যামলী কাঁধের আঁচল গুটিয়ে সরু করে নেয়। শাড়ির কুঁচিটা নামিয়ে আনে আঙুল তিনেক। কী আশ্চর্য, দশ মিনিটের মধ্যেই খদ্দের জুটে যায়!– বছর উনিশ-কুড়ির একটা ছেলে, মনে হচ্ছে ওই ধাবা থেকেই মাল টেনে এসেছে। টুকটাক কথাগুলি সেরে ওরা পাড়ার দিকে চলতে শুরু করে।– কিছুটা যেন ঘোরের মধ্যে। বাড়িতে ঢোকার মুখে তার হাত ধরে শ্যামলী,- তালু বরফের মতো ঠান্ডা! বুঝতে দেরি হয় না,- একেবারেই আনকোরা। হয়তো এমন পাড়ায় প্রথম দিন। হয়তো জীবনের কোনো ধাক্কায় হাজির হয়েছে ঝোঁকের মাথায়। শ্যামলী একবার ভাবে ফিরিয়ে দেয়, কিন্তু ঘাসের সঙ্গে সই পাতিয়ে কোন ঘোড়া বেঁচে আছে এই দুনিয়ায়!
    ঘরের দরজায় শিকল তুলতেই ছেলেটির হাত পা গুটিয়ে আসে।
    -আগেই বলে দিচ্ছি, মুখ দিতে পারব না কিন্তু। বেকার ঘ্যানঘ্যানাবা না।
    ছেলেটি যেন পায়ে পেরেক গেঁথে দাঁড়িয়ে থাকে।
    -আরে হলটা কী! সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? ওই টাকায় এক ঘণ্টার বেশি পাবে না। তাড়াতাড়ি কাজ সারো।
    যার উদ্দেশে বলা, সে তখন থরথর করে কাঁপছে,- ‘আমাকে যেতে দিন।’
    -শালা, ন্যাকরাবাজি করার জায়গা পাওনি! দ্যাখো মাইরি, বউনির সময় ঢ্যামনামি ভাল্লাগে না বলে দিচ্ছি।
    -আমি পারব না। প্লিজ-!
    শ্যামলী এবার ছেলেটির ওপর জবরদস্তি চড়ে বসে, ‘বোকাচোদা, পারবি না মানে? আমার কি গতর নাই!’– ধমক লাগায়, ‘খোল শালা।’
    এবার কাঁদো কাঁদো দশা ছেলেটির।- ‘টাকা তো দিয়েছি। আমাকে যেতে দিন।’
    শ্যামলী আবার ধমক লাগায়, ‘ওই টাকায় জম্মের মতো আমার ইয়ে কিনে নিয়েছিস শালা! গতর খাটিয়ে খাই। ভিখারি পেয়েছিস নাকি? দেখবি, লোক ডাকব? যা আছে সব কেড়েকুড়ে ল্যাংটা করে ছাড়বে।’
    ধমক খেয়ে ছেলেটি রীতিমতো ওর হাতে পায়ে ধরতে থাকে। বাড়তি আরও হাজার দুয়েক হাতিয়ে তবে শেকল খোলে শ্যামলী। বাইরের বেঞ্চগুলিতে পাতাখোরদের আড্ডা। আনকোরা লোকের জন্য তক্কে তক্কে থাকে। কুকুর তাড়ানোর ভঙ্গিতে চেঁচায় শ্যামলী, ‘ওই মড়াখেগোর দল, যেতে দে একে। জ্বালাস যদি, চামড়া গুটিয়ে দেব।’
    মুক্তি পেয়ে ছেলেটি ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োতে শুরু করে।- একটা জীবন বেঁচে গেল আজকে। ভয়েই হোক কি ঘেন্নায়, এ ছেলে আর এমন পাড়ার ত্রিসীমানায় ঘেঁষবে না। ভালো মুখে বুঝিয়েসুঝিয়েও হয়তো তাকে ফেরত পাঠানো যেত। কিন্তু, কাঁচা বয়স তো,- এই বয়সে মানুষের মনের ধাত হয় লতাগাছের মতো। একটু মিষ্টি মুখ কি একটু সহন পেলেই খুঁটির মতো আঁকড়ে ধরতে যায়।- বাছবিচার রাখতে পারে না সবসময়। টাকাগুলি ব্লাউজের ভেতরে চালান করতে করতে শ্যামলী হেসে ফ্যালে,- কপালের কী ছিরি! ঘেন্না না কুড়িয়ে মানুষের উপকারও করা যায় না!...
  • বিভাগ : ব্লগ | ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১২২ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • | 236712.158.786712.115 (*) | ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ০৪:৩৪50984
  • বেশ
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত