• হরিদাস পাল  বাকিসব  নেট-ঠেক-কড়চা

    Share
  • এক লহমার টুকিটাকি || পর্ব – ২ || খেলা

    একলহমা লেখকের গ্রাহক হোন
    বাকিসব | নেট-ঠেক-কড়চা | ২৭ মার্চ ২০২০ | ৬৮০ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • করোনাত্রাসে বিশ্ব ত্রস্ত, অবরুদ্ধ। আতঙ্কে আমাদের চিন্তা-চেতনা চূড়ান্ত বিপর্যস্ত।

    তনয়া চিকিৎসালয়ে কর্মরতা। ঘরে আবদ্ধ থাকার প্রশ্ন নেই। তাই, তার এবং তার জীবনসঙ্গীর সামাজিক দূরত্বের বেড়া নিশ্ছিদ্র নয়! আমাদের দুজনের অবস্থাও তথৈবচ। বুড়োবুড়ি থাকি তাদের থেকে ঘন্টাখানেকের দূরত্বে। অত্যাবশ্যক পরিষেবায় যুক্ত। অতিরিক্ত শারীরিক ঝুঁকির কারণে আমার কিছুটা ছাড় আছে, সপ্তাহখানেক বাড়ি থেকে কাজ করছি। স্ত্রীকে নিয়মিত ল্যাবরেটরিতে যেতে হয়। দুজনেই এখন ভুগছি শরীরের সেই অংশের ঝামেলায় যেখানে এই মারণবীজ প্রথম ঘাঁটি গাড়ে। গলা। আমি বেশী। দিনের হিসেবে আমার এগারো দিন হয়ে গেল। স্ত্রীর কয়েক দিন কম।

    হয়ত আমাদের বিশেষ কিছুই হয়নি – সাধারণ অ্যালার্জী। কিংবা অতি সাধারণ আর কোন কিছু। কিন্তু নিশ্চিৎ করে জানা নেই। এখনও পর্যন্ত জ্বর নেই। সেইটা ভালো। ঝামেলা হল, অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বারণ। বিধান দেওয়া হয়েছে - নির্দিষ্ট ফোনলাইনে ফোন করতে। ফোন করার পর জানানো হল, আর তিন-চারদিন দেখে অবস্থার উন্নতি না হলে সার্স ভাইরাসের উপস্থিতির পরীক্ষা করতে হবে। কতটা কঠিন এবার সামনের দিনগুলো? জানা নেই। শুধু প্রতীক্ষা আছে। আশা করি, পরীক্ষা দিতে যেতে হবে না।

    আমার সাধ্যের চূড়ান্ত অতীত এ প্রলয়। যা করতে পারি, করতে বলা হয়েছে, করেছি। এ নিয়ে আমার কথা নেই কোন। যাঁরা পারছেন, বলছেন এ নিয়ে। আমি বরং অন্য কথা বলি। প্রায় নিজের মনে, আমার এই প্রতীক্ষার দিনগুলো কাটানোর জন্য। একদিন হয়ত লেখা হবে – করোনার দিনগুলিতে প্রেম - লাভ ইন দ্য টাইম অব করোনা। আমার এ লেখা সে রকম মহৎ কিছু নয়। আমি ডুব দিয়েছি আমার সামান্য সঞ্চয়ে – আমার ছোটবেলায়। যা উঠে এল। খেলা নিয়ে টুকিটাকি, সেই শৈশবের। ভুলে থাকা – এক লহমার।

    আমার সেই দূর শৈশবের দিনগুলোতে সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল রাস্তায় রাস্তায় একটা চাকার পিছনে দৌড়নো। নিজের চাকা ছিল না। বন্ধুরা কেউ দিত। তারা কোথা থেকে চাকাগুলো পেত, জানি না। পরনের জামাপ্যান্ট কি পাঠ-পঠনের হিসাবনিকাশে আমরা সবাই হয়ত এক গ্রহবাসী ছিলামনা। কিন্তু, দিনের খন্ড অংশের যূথচারী জীবনে আমরা অবশ্যই একই গোষ্ঠীর সন্তান ছিলাম। তাই আমাদের সব সম্পত্তির উপর সবারই কিছু না কিছু অধিকার থাকত। আর, আমার থেকে বছর খানেকের ছোট আমার মেজ ভাই যে কারো সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলতে অতীব দক্ষ ছিল। সে ছিল আমার সমস্ত কাজের সঙ্গী। তাই চাকা আমার জুটে যেত।

    বড় চাকা হিসেবে ব্যবহার হত বাইসাইকেলের চাকার টায়ার। একটা ছোট কাঠি দিয়ে ক্রমাগত সেটাকে ছোট ছোট পিটুনি দিতে দিতে সেটার পাশে পাশে দৌড়তে থাকা। কখনো একা, কখনো দল বেঁধে, এক চক্কর বা কয়েক। বড় চাকা নিয়ে এই দৌড়টা একটু কম মর্যাদার খেলা ছিল। বড় মর্যাদার খেলা ছিল – ছোট চাকা নিয়ে দৌড়। সম্ভবতঃ সাত-আট ইঞ্চি ব্যাসের ধাতব চাকা, ইঞ্চির আটভাগের এক ভাগ বা তার কাছাকাছি পুরু – নিরেট, একেবারে মাঝখানে একটু ফাঁকা। একটা ধাতব কাঠির এক মাথা বাঁকিয়ে একটা ছোট ইংরেজী ইউ বানিয়ে সেই ইউ-এর ভিতরটায় ঠেকনা দিয়ে চাকাটা দাঁড় করিয়ে তারপর চাকাটা ঠেলে ঘোরাতে ঘোরাতে তার পিছন পিছন দৌড়নো। খুব দক্ষরা মাঝে মাঝে ইউটা চাকার মাঝখানে রেখেও দৌড়তে পারত।

    অনেকক্ষণ দৌড়নোর পর সবাই মিলে জিরোতে বসতাম – মাঠে, কারো বাড়ির রোয়াকে বা পুকুরপারের বাঁধানো ঘাটে। অন্ধকার নেমে এসেছে। এই সময় ধাতব কাঠিটা দিয়ে নিরেট চাকাটার গায়ে একটু জোরে মারলে ঠং করে আওয়াজের সাথে আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠত, কখনো কখনো একটা হাল্কা পোড়া গন্ধ। বড় হতে হতে চাকা-দৌড়ানোর এই খেলাটা হারিয়ে গেল। নাঃ ভুল হল! এই খেলাটাই জীবন হয়ে গেল – নানা রকমের চাকার সাথে বা পিছনে দৌড়ে চলা।

    চাকা নিয়ে দৌড়ানোর খেলা ছাড়া অন্য ছুটোছুটির খেলা ঐ ছোটবেলায় আমার খুব একটা খেলতে ইচ্ছে করতনা। লুকোচুরি, ডাংগুলি, পিট্টু - খেলতাম এসব, অল্প। আসলে বাবার কড়া শাসনে বাইরের সময়টা খুব সংক্ষিপ্ত ছিল। ঘরের খেলায় বেশী সময় কাটত। বারোটা ঘনকের একটা পাজ্‌ল-গেম ছিল – পাশ পাল্টে পাল্টে ছটা ছবি তৈরী করা যেত। অজস্রবার খেলেও ওটা আমার কখনো পুরনো হত না।

    আর একটা ছিল স্থাপত্য বিদ্যার খেলা। অনেকগুলো আয়তঘন, কয়েকটা ঘনক, কিছু কৌণিক, অর্ধগোলক, আর কয়েকটা গোলাকৃতি খিলান নিয়ে বেশ জমজমাট একটা বাক্স। সাথে কয়েকটা ছবি যেগুলো দেখে দেখে বাড়ি, দরজা আরো কি কি সব যেন বানাতে হত। বানাতাম বেশীটাই যদিও - খামখেয়ালীমত। ভারসাম্য রেখে টুকরোগুলোকে দাঁড় করিয়ে রাখা প্রায়ই ইচ্ছের সাথে বাদ সাধত।

    তবে এই খেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তেজনারটি ছিল এক যন্ত্রবিদ্যার খেলনা। সেটার নামও বোধ হয় ছিল মেকানিক্স বা ঐরকম কিছু। দুই থেকে ছয় ইঞ্চি লম্বা অনেকগুলো ধাতব পাত ছিল। ধারগুলো গোল, যাতে কেটেকুটে না যায়। পাতগুলোতে ফুটোর সারি। সাথে নানা আকৃতির টুকরো - এল আকৃতির, এক্স আকৃতির, ত্রিভুজ, গোল, পিঠ আর বসার জায়গা জুড়ে চেয়ার, মেঝে আর দেয়াল একসাথে ধরবার জন্য জোড়াপাত। সবার গায়ে সুসমঞ্জস ফুটোর সারি। আর, অনেকগুলো নাট, বল্টু, ওয়াশার। সেগুলো লাগাবার জন্য রেঞ্চ, স্ক্রু-ড্রাইভার, সুতো, কাঁচি – এলাহি ব্যাপার। বেঞ্চ, দোলনা, ঢেঁকি, সেতু, গাড়ি, বাতিস্তম্ভ – কত কি যে বানানো যেত!

    টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার বাবার বোধ হয় ইচ্ছে ছিল ছেলে ঘর-বাড়ি-সেতু বানানোর বিশারদ হবে। হলনা। প্রিয় খেলনার টুকরোগুলো আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল। আর আমিও যত দিন গেল, যন্ত্রবিদ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে গেলাম। অনেক পরে অবশ্য জীবন যাপনের এক পর্যায়ে জৈব অণুর কাটাকুটি আর জোড়া লাগানোকে যন্ত্র প্রকৌশল বলায় চাপা কোন আনন্দ পেয়েছিলাম। শৈশবের দিনগুলোর স্মৃতি তখন হয়ত ভিতরে কোথাও একটু সুর তুলে বেজে গিয়েছিল।

    এসব খেলার পাশে অন্যরকম কিছু খেলা ছিল যেগুলো মনে হয় এখন আর কোথাও কেউ খেলে না, খেলবে না।

    সেই সময় ভারতে স্বাধীনতা আসার যুগটির কিছু অবশেষ এদিক ওদিকে পাওয়া যেত। যেমন – মাঝখানে বড় ফুটোওয়ালা চাকতির পয়সা। ফুটো পয়সা। প্রায় সমস্ত হামা দেওয়া বাচ্চাদের কোমরে দেখতাম - শক্ত সুতো, আমরা বলতাম কার, দিয়ে একটা ফুটো পয়সা বাঁধা আছে। সময়ের পথ ধরে এই ফুটো পয়সার মত বাতিল হওয়া আর এক বিনিময়-মাধ্যম ছিল কড়ি। এখন অনেকে গয়নায় পড়েন। আচার-অনুষ্ঠানেও ব্যবহার হয় - আধ থেকে দেড় কড় মাপের ছোট সামুদ্রিক শামুকের খোলা। চকচকে, সুদৃশ্য, চ্যাপ্টা-পেট ডিমের মত, পেটের দিকটা মাঝবরাবর লম্বালম্বি খাঁজ কাটা। চ্যাপ্টা হওয়ায় ঐ দিকটা দিয়ে বসালে কড়িটা সুস্থির থাকে।

    মা-ঠাকুমার সাথে বসে কড়ি খেলতাম। আরো মেয়েরাও জুটে যেত। কয়েকটা কড়ি মুঠো খুলে উপরে ছুড়ে দিয়ে মাটিতে পড়ার আগে মাটি থেকে একটু উপরে সোজা বা উল্টো করে মেলা হাতের পাতায় তাদের ধরে রাখা, পড়তে না দেয়া। অথবা মুঠো করে মাটিতে ছড়িয়ে দিয়ে একটা কড়িকে দিয়ে আঙ্গুলের টিপে আর একটা কড়িকে টোকা লাগানো। বড় হয়ে যে বিদ্যেকে ক্যারম খেলায় বড় মাপে পেয়েছি।

    এখন এই কড়িগুলো বড়দের কাছে যত সুলভ হোক, ছোটদের কাছে তাদের পরিমাণ সীমিত ছিল। তাই ঠাকুমা কড়ির এক বিকল্প শিখিয়ে ছিল আমাদের। অন্য বাড়িতে কি হত জানিনা, আমাদের বাড়িতে কাঁঠালের বীচি শুকিয়ে রেখে দেয়া হত – সাড়া বছর ধরে বাহারি খাদ্য হিসেবে কাজে লাগানোর জন্য। মা-ঠাকুমার অনুমতি নিয়ে কিছু কাঁঠালের বীচি জাঁতি দিয়ে দু’রকম ভাবে অর্ধেক করে আমরা ছোটরা ব্যবহার করতাম দু রকমের বিকল্প খেলনার জন্য। লাট্টু আর কড়ি।

    প্রথমটার জন্য দুই মেরুপ্রদেশ অক্ষুণ্ণ রেখে বিষুবরেখা বরাবর কেটে ফেলতাম। তারপর বিছানা ঝাড়ার জন্য নারকেল শলার যে পরিষ্কার ঝাঁটাটা ব্যবহার হত সেইটার একটা শলা ভেঙ্গে বের করে নিতাম দুটো ছোট টুকরো। দুই শলার টুকরোকে কর্তিত কাঁঠাল বীচির দুই টুকরোর নরম চ্যাপ্টা দিকটার ঠিক মাঝখানটায় অর্ধেকমত গেঁথে দিলেই হয়ে গেল দুটো লাট্টু। এবার মেরু বিন্দুতে ভর করিয়ে, দুই আঙ্গুলে শলা ধরে দাও পাক মেরে। ঘুরতে থাকুক কাঁঠাল বীচির লাট্টু।

    কড়ির বিকল্প বানানো আরো সহজ ছিল। ঠিক মাপের কাঁঠাল বীচির দুই মেরুর মধ্য দিয়ে দ্রাঘিমা বরাবর অর্ধেক করলেই পাওয়া হয়ে গেল দুইখানি বিকল্প কড়ি। খেলতে থাকো এবার যত খুশী। কড়ি হারিয়ে ফেলার দুশ্চিন্তা আর রইলনা। বড় হয়ে দেখলাম - বিশ্বজোড়া খেলাঘরে বিকল্পর ছড়াছড়ি।
  • বিভাগ : বাকিসব | ২৭ মার্চ ২০২০ | ৬৮০ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • r2h | 162.158.22.249 | ২৭ মার্চ ২০২০ ১৪:২৮91809
  • চমৎকার সুখপাঠ্য, স্মৃতিময়।
    আমাদের ছিল প্লাস্টিকের, মেকানো বলতাম।
    আর ঐ গোল চাকা, সাইকেলের চাকার ধাতব রিম বা বাতিল টায়ারের মালিকেরা খুব শ্লাঘা নিয়ে চলতো। আর্থলি সামান্য পোলাপান বাঁশ বেত দিয়ে বানিয়ে নিত গোল।

    আমি অবশ্য নিজে কখনো ওগুলো খেলিনি, বাড়ির পাশের মাঠ পেরিয়ে রাস্তায় বেরুনো বা মার্বেল খেলা ওসব একেবারে কঠিন নিষিদ্ধ ব্যাপার ছিল!

    আরেকটা জিনিস খেলতো অনেকে, গোল ফাঁপা বাঁশের একদিকে গাঁট, অন্যদিক খোলা, মাপ মত আরেকটা সলিড বাঁশ, ফাঁপা বাঁশের ভেতর কিযেন একটা বুনো ফল পুরে দিয়ে সলিড বাঁশ দিয়ে জোরে চাপ দিলে বিপুল ফটাশ আওয়াজ হতো।

    আর আস্তে আস্তে ডাঙ্গুলি খেলোয়াড়রা সব ক্রিকেট খেলোয়াড় হলো।
  • একলহমা | 108.162.237.165 | ২৭ মার্চ ২০২০ ২০:১১91817
  • ধন্যবাদ হুতো!
    বাঁশ দিয়ে পিচকিরী বানিয়েছি। কিন্তু ওরকম আওয়াজ বানানোর খেলা খেলিনি। :)
    আমার ডাঙ্গুলি খেলতে ভয় লাগত, ক্রিকেট খেলতেও! :))
  • r2h | 162.158.31.161 | ২৭ মার্চ ২০২০ ২১:২৯91818
  • "...ভিজে ঝােপ-ঝাপ—কত পটপটি ফল দুলচে গাছে গাছে। বড় বড় পটপটি ফল। আজকাল সব ছেলেই বর্ষাদিনে পটপটি ফল ছোড়ে, তাদের শিখিয়েছিল সেই রজুন কাকা। একটা বাঁশের চোঙের মধ্যে পটপটি ফল পুরে একটা কাঠি দিয়ে ঠেলে দিলেই ফট-ফটাশ! যেন বন্দুকের শব্দ! তাই ওর নাম পটপটি ফল।..."
    - তেঁতুলতলার ঘাট
    বিভূতিবাবু, আর কে।

    আমরা অবশ্য পটপটি বলতাম না বোধয়, অন্যকিছু, যদ্দূর মনে পড়ে।
  • একলহমা | 162.158.186.65 | ২৭ মার্চ ২০২০ ২২:০৩91819
  • দারুণ তুলে আনলেন।
    আমাদের ছিল আরেকরকম ফলের গল্প। ছোট্ট বরবটির মত ফল। অপরাজিতা ফুলের ফল হতে পারে বা নাম-না-জানা। শুকনো পাকা ফল জলে ফেললেই ফট করে ফেটে যেত!
  • সুকি | 172.68.167.15 | ২৮ মার্চ ২০২০ ০৯:০২91825
  • পড়ছি কিন্তু -

    টায়ার নিয়ে খেলা আমাদের সময়েও ছিল - যদিও ব্যক্তিগত ভাবে আমার প্রিয় না।
  • একলহমা | 162.158.187.42 | ২৮ মার্চ ২০২০ ১০:১৪91828
  • ধন্যবাদ, সুকি!
  • রৌহিন | 172.68.146.199 | ২৮ মার্চ ২০২০ ১০:২৯91830
  • কত কিছু মনে পড়ে গেল। একলহমা কি আমার চেয়ে একটু বড় হবেন? আমি কড়ি খেলিনি। এক চাকার গল্পটা আমারও প্রায় একই রকম, আমি একটা চাকা বাগাতে পেরেছিলাম কিছুদিনের জন্য।

  • একলহমা | 162.158.187.118 | ২৮ মার্চ ২০২০ ১৪:২৯91833
  • ধন্যবাদ, রৌহিন!
    হতে পারি।
  • শিবাংশু | 162.158.166.136 | ২৮ মার্চ ২০২০ ১৫:১২91834
  • যেখানে হুতো, রৌহিন বা সুকি নিজেদের ছোটোবেলা খুঁজে পায়, সেখানে আমার আসাটা বোধ হয় একটু 'অধিক হৈল' হয়ে যায়। তবু অনেকগুলো চেনা শব্দ দেখে একটু প্ররোচিত হচ্ছি। টিভি-অ্যান্ড্রয়েডহীন বালককালে একলহমার স্মৃতিবাহিত 'ছেলেখেলা'র সাইকেলের জংধরা রিম বা বড়ো টায়ার, অথবা ট্রাইসাইকেলের ছোটো টায়ারের সঙ্গে রাস্তায় ছোটা এবং পিছনে গার্জেনদের 'এবার গাড়ির তলায় পড়বে' জাতীয় হতাশ আক্ষেপ তো খুব দূরে নয়। গরমের ছুটি, লুডো এবং বাণিজ্য বা ট্রেড অবিচ্ছেদ্য। লাট্টু চালানোর স্কিল খুব জরুরি ছিলো। ছিলো দাঁড়িয়া বান্ধা বা সাতগুটি। যাকে পিট্টু নামে চেনানো হয়েছে। কড়ি খুব সুলভ ছিলোনা। তবে তেঁতুলবিচি অর্ধেক করে ঐ একই খেলা চলতো। আমাদের গ্রামে ঘুড়ি ওড়ানোর কোনও দিনক্ষণ ছিলোনা। পুরো গ্রীষ্মকালই চলতো। মেক্যানোর সবুজ ফুটো করা পাত আর লাল ফুটো চাকতি স্ক্রু দিয়ে জুড়ে ভবিষ্যতের ইঞ্জিনিয়রদের মহলা দেওয়া বহুদিন। আমাদের শহরে আক্ষরিক অর্থে একটা ঢিল মারলে দশটা 'আসল' ইঞ্জিনিয়রের মাথা ফাটানো যেতো। 'আসল' মানে প্রোডাকশন বা মেন্টেন্যান্স কাজের সঙ্গে যুক্ত হেলমেট মাথায় লোকজন। কাচের মার্বেল আর লোহার আন্টা,তারও গ্ল্যামার ছিলো খুব। ফুটবল খেলার দিন শুরু হবার আগে থেকেই সারা বছর দুই হাঁটুতে ঘা ও লাল ওষুধের হোলি। সাইকেল শিখতে শুরু হবার পর থুতনিতে কাটা এবং এবং 'কটা স্টিচ পড়লো' জাতীয় সম্মান থাকাটা প্রয়োজনীয় ছিলো।

    সবই কি ভিডিও গেম খেয়ে ফেলেছে ?
  • একলহমা | 108.162.237.21 | ২৮ মার্চ ২০২০ ২০:১৫91843
  • ধন্যবাদ শিবাংশু!
    আমার সেই গহীন শৈশবের দিনগুলোতে বাণিজ্য বা ওইরকমের খেলাগুলির সন্ধান জানা ছিল না। সেগুলি পেয়েছিলাম আরো কয়েক বছর পার করে। কিন্তু প্রথম শ্রেণীতে পড়ার সময় পাওয়া শক্তপোক্ত ধাতুর পাতের অজস্র সুচারু টুকরোর মেকানিক্স ক্রমে হারিয়ে গিয়ে যখন সপ্তম কি অষ্টম শ্রেণীতে হাল্কা, মোটা মোটা, সীমিত সংখ্যক, যথার্থই খেলনা টুকরোর মেকানো হয়ে ফিরে এল তখন সেই দিনগুলোয় শুধু আমাদের মত মফস্বল শহরের ছোটদের নয়, বড়দের জগতেও বিশাল পরিবর্তন - খাদ্য আন্দোলন, নক্সালবাড়ি, যুক্তফ্রন্ট, আসছে সত্তরের দশক - চেনা পৃথিবী আমূল পাল্টে যাচ্ছিল।
  • ar | 108.162.219.55 | ২৮ মার্চ ২০২০ ২৩:৪৯91848
  • @একলহমা

    লেখাটার জন্য ধন্যবাদ! খেলাগুলোর সাথে বেশ একাত্মবোধ করতে পারলাম।

    আমার ছোটবেলায় দুটো খেলার কথা বলি। একটা হল গুলি খেলা, মানে কাঁচের মার্বেল নিয়ে খেলা আর কি। তার আবার অনেক্গুলো ভাগ ছিলো। তথাকথিত ভদ্রবাড়ির লোকেদের কাছে একটু নিম্নশ্রেণীর খেলা!! কিন্তু সে কথা বলে শ্রেণী-বৈষম্যে ঘোরতর না-বিশ্বাসী ছেলেপুলেদের কে আর কবে বেঁধে রাখতে পেরেছে? আমরাও চুটিয়ে খেলতাম। সেই গুলিখেলার একটা খেলা ছিল, যার নাম মনে হয়, "গোছপার"। মাটির ওপরে চৌকো মতন ঘর কেটে তার বিভিন্ন দিকে গুলি সাজিয়ে বাইরে থেকে আরেকটা মোটা ভারী গুলি দিয়ে সেইগুলোকে মেরে বার করতে হত। সেটাকে মনে হয় "মাত্তিসগুলি" বলতাম।

    ছেলেবেলায় কয়েকবার উত্তর আসামে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। উত্তর আসামের মতন অমন সুন্দর জায়গা পৃথিবীতে খুব কম দেখেছি। তো এই গুলি খেলার সৌজন্যে বেশ কিছু ছেলেপুলের সাথে "ফ্রেণ্ডশীপ" ও হয়ে গিয়েছিলো। এই সবই প্রাক- অগপ, আসু কালের কথা। কখন কোন ঝামেলা হয়েছিলো বলে মনে পরে না। এই "গোছপার" খেলাটর অহমিয়া নাম সম্ভবত ছিল "দুনোমুনো"। সকাল হলেই পাশের কোয়ার্টারের "বন্ধু" ডাকতে চলে আসত। কোডে ডাকটা ছিল, "দুনোমুনো খেলিবি"? "খেলিবি দুনোমুনো" । "হোয়" বলেই এক দৌড়ে পুল পাড়ে গিয়ে শুরু করে দিতাম। এখন মাঝেমাঝে অবচেতনে "দোলমুখ চাড়ালি", স্টেশন চাড়ালি তে ঘুরে বেড়াই!!!

    আরেকটা খেলা ছিলো।। প্রাইভেট বাসের টিকিট আর চিপ্পু দিয়ে।। চিপ্পু আর কিছুই নয়। খালি জুতোর কালির বাক্সে মাটি ভরা। একটু ভারী হয়ে যেত, সেটা মাটিতে ফেলে দিয়ে ডাক দিতে হত। অন্য লোকে তার চিপ্পু নিক্ষেপ করে আমার চিপ্পুর কাছাকাছি এক বেগদার মধ্যে (মডিফাইড এক বিঘৎ !!) চলে এলে, যত টিকিটের কল হবে তাকে দিতে হবে। বেগদার মধ্যে না এলে যত কল হবে আমাকে দিতে হাবে। তো সেই বাসের টিকিট সংগ্রহ করতে আমরা খালধারে প্রাইভেট বাসের স্ট্যডে চলে যেতাম, আর সেখানে রাস্তায় ওপরে লোকের ফেলে দেওয়া টিকিট কুড়োতাম। এই ভাবে ধীরে ধীরে আমাদের ব্যক্তিগত সঞ্চয় বৃদ্ধি হত!!

    (lol!!)
  • একলহমা | 162.158.187.72 | ২৯ মার্চ ২০২০ ০০:৫০91850
  • ar, ধন্যবাদ!
    আমিও খেলেছি, মাত্তিসগুলি আর বাসের টিকিট-এর খেলা। চিপ্পু অবশ্য জুতার কালির কৌটোতেই সীমাবদ্ধ থাকতনা। নানা কিছু দিয়ে বানানো হত‌। এই নিয়েও একটু লেখার ইচ্ছে আছে (lol) ।
  • ar | 162.158.63.67 | ২৯ মার্চ ২০২০ ০৯:৫৫91857
  • @একলহমা

    ধন্যবাদ! পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম!
  • i | 108.162.250.52 | ২৯ মার্চ ২০২০ ১০:৩৩91858
  • ব্যক্তিগতভাবে স্মৃতিচারণ কি ছোটোবেলার কথা পড়া বা লেখা পছন্দের প্রথমদিকের সারিতে আসেই না। সময়াভাবে কিছু পছন্দ অপছন্দ তো বেছে নিতেই হয়।
    কিন্তু লহমার লেখা নিয়মিত পড়ছি। ডিটেইলিং খুব ভালো লাগছে- ' ঠং করে আওয়াজের সাথে আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠত, কখনো কখনো একটা হাল্কা পোড়া গন্ধ'...
    বেজায় জ্যান্ত ।
  • একলহমা | 162.158.187.162 | ২৯ মার্চ ২০২০ ১১:১২91861
  • ছোটাইদি, আমার ডিটেইলিং-টা হল কম রসদে আকর্ষণ সৃষ্টির প্রয়াস। এই সব টুকিটাকি হাবিজাবি দিয়ে বড় রান্না ত আর হয়না। যেটার চেষ্টায় থাকি সেটা ঐ - পাড়ার কোন বিশেষ দোকানের কোন বিশেষ তেলেভাজা - কেন খেতে ইচ্ছে করবে ঠিক জানা নেই, কিন্তু করবে - অফিস থেকে কি টিউশনি সেরে বাড়ি ফেরার সময় - ঐ রকম কিছু বানানো - ঝালনুনটা - উল্-স্ খুব ইম্পরট্যান্ট, খুব। :)
    উৎসাহ দেয়া জারি রাখার জন্যে অনেক ধন্যবাদ‌।
  • | 162.158.50.219 | ২৯ মার্চ ২০২০ ১১:২২91863
  • শুধু মেকানো ছাড়া আর বাকী কিছুই খেলি নি।
    পড়তে ভাল লাগল খুবই।
  • একলহমা | 162.158.187.118 | ২৯ মার্চ ২০২০ ১১:৫৮91867
  • অনেক ভালো লাগল দমুদি! আপন জন বেড়াতে এলে যেমন লাগে, ঠিক তেমনি।
  • Rajkumar Raychaudhuri | 172.69.135.105 | ০১ এপ্রিল ২০২০ ১৫:২৪91945
  • লিখুন চট জলদি, অপেক্ষায় আছি।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত