• হরিদাস পাল  বাকিসব  নেট-ঠেক-কড়চা

    Share
  • এক লহমার টুকিটাকি || পর্ব – ৩ || বিস্ময়

    একলহমা লেখকের গ্রাহক হোন
    বাকিসব | নেট-ঠেক-কড়চা | ০৩ এপ্রিল ২০২০ | ৩৯৮ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • শৈশবের সম্ভবতঃ সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি – অনন্ত বিস্ময়, সহর্ষ বিস্ময়। যা কিছু করা গেল অথবা গেলনা, সব কিছুই আশ্চর্য লাগে। কিছু কিছু ভয় জাগানিয়া, বেদনার ছোঁয়া লাগা বিস্ময়ও থাকত। কম তারা। বেশীর ভাগ-ই আনন্দের, প্রিয়তার। বড় হতে হতে যাপিত জীবনের পৌনঃপুনিকতায় একদিকে বিস্ময় হয়েছে দুর্লভ, নয়ত বেদনার, অন্যদিকে একসময়ের বিস্ময়ের স্মৃতি, আনন্দের স্মৃতিগুলি ক্রমাগত ঝাপসা হয়ে গেছে। শুধু কিছু বিস্ময় শত ঝড়-জলে জেগে আছে, বাতিঘরের ঘুরে চলা আলোর রেখার মত। দূর পরিক্রমার শেষে সেই রেখা ধরে ঘরে ফেরা। হয়ত।

    দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি। বছর শুরু হয়েছে। শিবানী দিদিমণি আমায় ক্লাস মনিটর করে দিলেন। কোন গুণে জানি না, ১ম শ্রেণী থেকে ১ম হয়ে উঠেছিলাম, সেটা একটা কারণ হতে পারে। সকলের আদর্শ হব এই রকম একটা সরল বিশ্বাস আর কি। কারণ যাই হোক - আমি ক্লাস মনিটর। কে কখন বাথরুমে যাবে, কি থুতু ফেলতে বাইরে যাবে – আমার অনুমতি নিতে হবে। আশ্চর্য! প্রথম ক্ষমতার স্বাদ!

    আমার দাম বেড়ে গেল। টিফিনের অনেক আগে থেকেই কারো কারো টিফিনের কৌটো আমার হাতে চলে আসত। প্রয়াত মিত্র সাহেবের লেখনী অনুসারে সে আমার বড় সুখের ঋতু। কিন্তু একদিন একটা অন্য ভেট জুটল। আর জীবনটা বদলে গেল।

    দ্বিতীয় পিরিয়ডের শেষ দিকে হাতে হাতে ঘুরতে ঘুরতে অন্য কোন বেঞ্চে বসা কোন ছেলের কাছ থেকে তার একটা খাতা আমার কাছে চলে এল। খাতার মাঝখানে একটা পাতলা বই। সেই প্রথম গোপনীয়তার স্বাদ, সেই প্রথম গল্প বই পড়া।

    চমকে গেলাম - কী আশ্চর্য যে সেই বই! এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলতে লাগে! এই না হলে লেখা! বাকি সারাটা দিন সব কটা ক্লাস কি ভাবে যে কাটল! দেখলাম বন্ধুদের কয়েকজনের ইতিমধ্যেই অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে, বাকিদের মধ্যে অনেকেই অধীর হয়ে আছে পড়বে বলে। তিন চারজন যোগানদার। সেই থেকে কাজের বই পড়ায়, উন্নতির জন্য প্রয়োজনের বই পড়ায় চিরকালের মত আগ্রহ ঘুচে গেল। আসল লেখা তো গল্প বইয়ে!

    কিছুদিনের মধ্যেই মনিটরত্ব ঘুচে গেল। কিন্তু গল্প বই পড়ার নেশা চিরকালের জন্য জীবনে জুড়ে গেল। সেদিনের সেই বইয়ের লেখকের নাম, এ পার বাংলার আমার বয়সী সব পাঠক-ই সম্ভবতঃ জানেন – স্বপনকুমার। ডাক্তার সমরেন্দ্রনাথ পান্ডে। বড় হয়ে অনেক হাসাহাসি হয়েছে স্বপনকুমারের গল্প নিয়ে। কিন্তু সেদিনের সেই প্রথম বারের মত লুকিয়ে লুকিয়ে গল্পের বই পাঠের সেই যে বিস্ময়, যে উত্তেজনা, সেটা আজও প্রায় হাতে ধরতে পারি।

    কয়েকজন বন্ধু মিলে আমাদের একটা ছোট্ট দল হয়ে গিয়েছিল। সেই দলের একজন একদিন একটা আশ্চর্য বই নিয়ে এলো। বইটার আকার-আকৃতি এখন আর মনে নেই। শুধু মনে আছে, সেটা পড়বার বই নয়। সেটার পাতার পর পাতায় ছোট-বড় কত যে রঙিন ছবির সমাহার! সেই ছবিগুলো ঐ বইয়ে আটকে থাকবার নয়, সেখান থেকে বের হয়ে অন্য আরও অনেক বইয়ে, কে জানে কত কত জায়গায়, ছড়িয়ে পড়বার, ফুটে উঠবার – একটুখানি জলের ছোঁয়ায়। জলছবি।

    সেদিন টিফিন-এর সময়টায় ঐ বই থেকে অনেকগুলো ছবি ছড়িয়ে গেল আমাদের বন্ধুদের বইয়ে বইয়ে। পরের বেশ কিছুদিন সেই বই তার মালিকের ব্যাগ-বাহিত হয়ে আমাদের ক্লাস ঘুরে যাওয়ার সাথে সাথে তার কলেবর ক্ষীণ হতে হতে একসময় ব্যবহারের মত আর কিছু পড়ে রইল না। ঐ ছবির বইয়ের নিশ্চয় অনেক দাম ছিল, একবার ফুরিয়ে গেলে আবার আর একটা বই পাওয়ার সম্ভাবনা কমই ছিল। যতদূর মনে পড়ে, সে ছেলেকে দ্বিতীয় বার আর ঐ রকম বই আনতে দেখিনি। কিন্তু সম্পদ ত তখন-ই সম্পদ যখন তা প্রিয়জনদের সাথে ভাগ করে নিই। অন্ততঃ আমরা তখন তাই ভাবতাম।

    পরবর্ত্তীকালে শখে এবং দরকারে, শুকনো এবং ভেজা দু’ভাবেই বিভিন্ন ছবি প্রতিস্থাপন করতে হয়েছে। কিন্তু সেই দিন সেই অপূর্ব রঙ্গিন ছবিগুলো একটু জলের ছোঁয়ায় আমার বইয়ের পাতায় যে ভাবে ফুটে উঠেছিল তা বার বার দেখতে আমার চোখ বন্ধ করতে লাগে না।

    একটা মাঠ ছিলো। আমার জন্য অনেক বড়। বাবার হাত ধরে আমি সেই মাঠে যেতাম। আমার হাত ধরে আমার পরের ভাই। বাবা খবরের কাগজ নিয়ে যেত। মনোযোগী পাঠক। পছন্দসই যায়গায় বসে গিয়ে নানা কৌতুহল মেটাত এ পাতা থেকে ও পাতায় বিচরণ করে। আমার কৌতুহল মিটে যেত ঘাসে ঘাসে বিচরণে। আর, নিজের মনের গহনে ভেসে ভেসে।

    মনের গহনে ভেসে ভেসে, কারণ, খুব বেশী কৌতুহল আমার ছিলো না। আর ভুলেও যেতাম। আসলে, যত জানা এসে জমা হত, তাদের গুছিয়ে তুলতে তুলতে, আবার যাতে খুঁজে পাওয়া যায় এমন ভাবে সাজিয়ে নিতে নিতে, যে জানারা ক্রমাগত খসে যেত, ঝরে যেত, তাদের খোঁজে মনের পথে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে আমি ক্রমাগত হারিয়ে ফেলতাম আমার মুহূর্তগুলোকে।

    যতক্ষণ পারা যায় পড়া শেষে বাবা হাতের কাগজ নামিয়ে ছড়িয়ে নিত ঘাসের উপর। তারপর কাগজে পিঠ রেখে শুয়ে পড়ত। বাবার দু’পাশে আমরা দু’ভাই। কাগজ পিঠের নীচে আমরাও শুয়ে আছি। আকাশে তখন তারারা ফুটে উঠেছে। অন্ধকার গাঢ় হত। তারার মেলা। বাবা আঙ্গুল তুলত তারাদের দিকে, ওটা কালপুরুষ। আমার বুক কেঁপে উঠত। ওটা লুব্ধক, কালপুরুষের শিকারী কুকুর। ওটা … আমার দেখতে ইচ্ছে করত না। বড্ড বেশী রহস্যময়, বড্ড বেশী ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি উপুড় হয়ে যেতাম।

    আস্তে, আস্তে সন্ধ্যা নেমে আসত। সাঁঝবাতিরা জ্বলে উঠত রাস্তায়-রাস্তায়, বাড়িতে, দোকানে, ক্লাবঘরে, এখানে-ওখানে। কখনো পাশ ফিরে শুয়ে, কখনো ঘরে ফিরতে ফিরতে দেখতাম। দেখতে দেখতে ভিতরে একটা নাড়া লাগত। কিরকম এক বেদনার মত। এক আশ্চর্য অনুভূতি! এখনও ফিরে ফিরে আসে। একসময় বাবা ডাকত – বাড়ি যাবি? আমরা উঠে পড়তাম।

    রাস্তার আলোগুলোর নীচে, দোকানের আলো ঘিরে মানুষের আওয়াজ – বেচাকেনা। কারা ওরা? ওদিকে, বাড়িগুলোর জানালায় জানালায় পর্দা টাঙ্গানো। পর্দার ওপাশে আলো জ্বলছে ঘরে ঘরে। কারা থাকে ঐ সব ঘরে? কেমন লোক তারা? কি করছে এখন? গল্পের পর গল্প ভেসে আসত। হঠাৎ বাবা ডাকত – সাবধানে, রাস্তা দেখে!

    তারা-ভরা আকাশ দেখার ভয়ার্ত বিস্ময়কে মনের ভিতরে চেপে রেখে আমি সাবধানে, রাস্তা দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরে আসি। আমার হারিয়ে যেতে ভয় লাগে।

    হারিয়ে যেতে ভয় লাগে। আর, ক্রমাগত হারিয়ে চলি। নুতন জরীপ ফেলে যায় পুরাতন জনপদ। প্রতিটি আহরণে ছেড়ে এসেছি কিছু সঞ্চিত অর্জন। আয়নায় তাকালে নিজেকে চিনতে পারি না বহুকাল। মনের আয়নাতেও অচেনা হয়ে পড়ি থেকে থেকে। সামান্য কারণে নিজেকে সঁপে দিই অসামান্য রুক্ষতায়। আমার কাজের প্রতিফলনে নিজেকে দেখে চমকে উঠি। অথচ কোন উপায় নেই, এগিয়ে চলা ছাড়া। ফেলে আসা পথের চিহ্ন কাজে লাগে না, কারণ, ফেরা নেই। বাতিঘরের আলো ঘুরে যায়, ঘুরে যায়।
  • বিভাগ : বাকিসব | ০৩ এপ্রিল ২০২০ | ৩৯৮ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Rajkumar Raychaudhuri | 162.158.50.219 | ০৩ এপ্রিল ২০২০ ০৮:৫৫91978
  • কৃত্রিম আলোর জোয়ারে আমাদের কাছে রাতের তারার স্নিগ্ধ আলো ফিঁকে। চারিদিকে বড় বড় ফ্লাটের আনাগোনায় মাঠ ও অমিল।

    ভাল হচ্ছে লেখাটা। এগিয়ে যান।

  • একলহমা | 162.158.187.42 | ০৩ এপ্রিল ২০২০ ২১:৪৩91998
  • কোথায় এগোব ভাই! এ করাল দিনে কি যে সব ছাই-পাঁশ লিখে যাচ্ছি!
  • Rajkumar Raychaudhuri | 162.158.50.254 | ০৪ এপ্রিল ২০২০ ১৭:২৮92011
  • সময় যখন অবরুদ্ধ, তখন লেখনী মনে তৃপ্তি দেবে।

  • সুকি | 172.69.135.231 | ০৪ এপ্রিল ২০২০ ১৮:১৫92015
  • পড়ছি সবগুলো পর্বই কিন্তু। আমার মতে, নিজের অভিজ্ঞতার কথা লেখা কখনো ছাই-পাঁশ হতে পারে না।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত