• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • সেটা কোনো কথা নয়

    Anamitra Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ১৪৩ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার


  • নওলকিশোরের প্রবল জাত্যাভিমান। মানে ব্যাপারটাকে জাত্যাভিমান হয়তো বলা যায় না ঠিক। তবে কিনা তার হেব্বি গর্ব। তার বংশপরিচয়, তার ছোড়দাদুর গানের গলা, তার দূরসম্পর্কের পিশেমশাইয়ের পি এইচ ডি, তার নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া মামার আঁকার হাত, তার বাবার খুড়তুতো ভাইয়ের জার্মানির স্থায়ী ঠিকানা, তার নিজের বোধশক্তি ও বিচক্ষণতা --- মানে একটা তো জায়গা চাই থামবার! এরকমটা হলে কার নাক আর ছোট থাকতে পারে! দোষটা মোটেই নওলকিশোরের নয়! সে বহুবার ভেবে দেখেছে; এরকমটা আশেপাশের অন্যকারো মোটেই নেই।তার ওপর আবার যে দূরসম্পর্কের দিদি তার থেকে বাইশ বছরের বড়ো, তাঁর যিনি বর, তাঁদের পরিবার আবার যেন রাজা রামমোহন রায়-এর পরিবারের কিরকম একটা আত্মীয়।এরপরও কি সে সতীদাহ প্রথা রদ্ হওয়া নিয়ে একটুও গর্ববোধ করতে পারেনা? এটাতো একরকম তার ফ্যামিলিরই ব্যাপার হলো! এরকম একটা পরিবারের ছেলে হওয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবেই যখন কেউ তার মুখে মুখে তর্ক করে নওলকিশোর মোটেই সেটা মেনে নিতে পারে না। আরেকটা সমস্যাও আছে অবশ্য। নওলকিশোরের ডাকনাম নকুল। বলাবাহুল্য নামটা তার পছন্দ নয়।ওই নামে ডাকলে সে এমনিই চটে যায়। তার উপর যদি আবার কেউ একটা মুখে মুখে তর্ক করতে করতে তাকে নকুল বলে সম্বোধন করে তখন সে আর ভেবে উঠতে পারে না তার কি করা উচিত! ছুটে গিয়ে বুকে মাথা দিয়ে ঢুঁসিয়ে দিতে ইচ্ছা করে জিদানের মতো।

    আচ্ছা, জিদানের ডাকনাম কি?

    এই সবকিছুর জন্য নওলকিশোরের মা দায়ী!


    লিখে ফেলার আগে লেখাটাকে একটা টু ডায়মেনশনাল ফর্মে দেখতে পাওয়াটা খুব জরুরি। যতই ভাঙচুর হোক না কেন। লেখা আসলে রৈখিক। প্রথমে লেখাটির গতিপথ কল্পনা করা হয়। তারপর সেই অনুযায়ী বসিয়ে নেওয়া হয় বিন্দু।এইবার কোনো বিন্দুকে আগে প্রকাশ করা হয় তো কোনোটিকে পরে।সবশেষে, জুড়ে দেওয়া হয় বিন্দুগুলিকে ক্রমান্বয়ে। এইভাবে লেখার সম্পূর্ণ রূপটি তৈরী হয় যা কিনা জটিল; যদিও সবের ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে সেই সবার পূর্বে কল্পনা করে নেওয়া রেখাটি।

    একজন লেখক এইভাবে ভেবে থাকেন। একটি ঘটনা, এবং আরেকটি ঘটনা; সম্পর্কিত অথবা বিচ্ছিন্ন, তাদের মধ্যেকার কার্যকারণ সম্পর্ক অথবা তাদের বৈপরীত্য ইত্যাদির সমানুপাতন, ক্রোমের অদলবদল এবং ছেদ এবং তার মাধ্যমে নিংড়ে আনা নির্যাস --- এইসবের মধ্য দিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কাঠামোর নির্মাণ। এবার সমস্যা হলো, কাঠামোটি সম্পূর্ণ হয়না। যতবার লেখক মনে করেন এইবারে লেখাটি শেষ করা যেতে পারে তাঁরমনে হয় তিনি সত্যকে বর্জন করতে বাধ্য হচ্ছেন পাঠকের সুবিধার্থে। কারণ লেখা শেষ হয় না সত্যি অর্থে। লেখা শেষ করতে হয়। জোর করে। কারণ লেখা যখন শুরু হয় আর লেখা যখন শেষ হয়ে আসে (আপাতভাবে) --- এই দুই পর্যায়ে লেখকের অবস্থান এক থাকতে পারেনা কোনোভাবেই। এর মাঝে লেখকের দেখার পরিধি বেড়েছে, বেড়েছে চিন্তার পরিধি। কাজেই এখন লেখাটি শেষ করতে হলে লেখককে একপ্রকার জোর করেই তা করতে হয়।

    লেখক দুই প্রকার। সত্যকাম ও মিথ্যালোভী। এখানে আমরা প্রথম ধরণের লেখকদের কথা বলছি।


    হেমন্তকাল। গঙ্গার ঘাট। বিকেল পেরিয়ে প্রায় সন্ধ্যা। গোধূলির আলো। খাড়া করে রাখা চারটি সাইকেল; একটি ছাব্বিশ ইঞ্চি কাকুলুকিং এবং তিনটি কেতাওলা রেঞ্জার। হাঁমুখ তিন বিহ্ব্লকিশোর হঠাৎ বিস্ময় ও অবিশ্বাসে সময়ের দর্পনে ফ্রিজ! বিকেলের হাওয়ার হালকা পায়ে দ্বিধার চলাফেরা আর ঘাটপার্শ্ববর্তী কালীমন্দিরে একটি বেঁটে ছেলে বিগ্রহের গায়ে নিবিষ্টমনে পুলকিতচক্ষে গর্বিতভাবে একাগ্রতার সাথে সশব্দে মুতে চলেছে।

    ছেলেটি নাটা।
    হাতে বিড়ি।
    পরনে নীল পাঞ্জাবি।
    কাঁধে ঝোলাব্যাগ।

    আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়
    "এ কি করলি!"
    "এ কি করলি!"
    "এ কি করলি!"

    তিনবার!

    ফ্ল্যাশব্যাক: ঘটনার পাঁচ মিনিট পূর্বে ---

    ১ নং - তাহলে প্রমান কর!
    নাটা - প্রমান তোরা কর!
    ১ নং - আমরা কেন প্রমান করতে যাবো? তোর সন্দেহ, তুই প্রমান কর যে নেই।
    নাটা - আমি তো জানি যে নেই। তোরা বলছিস আছে। তাহলে প্রমান করার দায়টা তোদের হলো না?
    ২ নং - এটা কি কথা হলো ভাই? সে তো আমরাও জানি যে আছে। তার প্রমাণ আছে অনেক।
    ৩ নং - আরে বাদ দে না। ও মন থেকে বলছে না। ও নিজেও জানে যে আছে। স্মার্ট সাজার চেষ্টা করছে জাস্ট।
    নাটা - না না না না না না! আমি জানি যে নেই। আর আমি সেটা মানিও। প্রবীরদা তো কবেই লিখেছেন...
    ১ নং - তোর প্রবীর ঘোষ একটা বড়ো বাল!
    নাটা - তোদের শঙ্করাচার্য একটা গাছঢ্যামনা! আর সবচেয়ে বড়ো চুতিয়া তোদের সাঁইবাবা!
    ২ নং - হৈ বাঁড়া! সাঁইবাবা চুতিয়া?
    ৩ নং - এটা কি বললি ভাই, এটা কি বললি?
    ১ নং - বাদ দে! ওর রক্ত বেশি গরম হয়ে গেছে।
    নাটা - না না না না না না! রক্ত মোটেই গরম হয়নি। যা বলেছি যুক্তি দিয়েই বলেছি।
    ১ নং - বলেছিস তো?
    নাটা - হ্যাঁ বলেছি!
    ১ নং - তালে যা কালীমন্দিরের গায়ে মুতে আয় দেখি।
    নাটা - মন্দিরে কেন? মূর্তির গায়ে মুতে দেব দেখবি?
    ১ নং - যা মোত দেখি তোর কত বড়ো বীচি!
    ৩ নং - হৈ ভাই, এটা কি বলছিস?
    নাটা - আমি কিন্তু মুতে দেব।
    ২ নং - আরে ওকে ঘাঁটাস না! মালটা পাগলাচোদা!
    ১ নং - হ্যাঁ যা মোত!
    নাটা - দেখ তালে!

    ফ্ল্যাশ ফরওয়ার্ড :
    মূত্রত্যাগ উত্তর নাটা বাকি তিন কিশোরের দিকে ফেরে। মুখে গর্বিত বিজয়ীর হাসি। তাদের হাঁ মুখের দিকে তাকিয়ে সে প্যান্টের চেনটি টেনে নেয়।
    নাটা - কি বে? ফেটে গেলো?
    বাকি তিনজন তার মাথার পিছনে উপরে আকাশের দিকে বিস্ফারিতচক্ষে তাকিয়ে। তাদের মুখের হাঁ ক্রমশ বড়ো হচ্ছে।
    ৩ নং - নাটা, তুই কাজটা ঠিক করলি না ভাই।
    নাটা - বেশ করেছি। তোর কি? আমি মানি না, আমি করেছি।
    ১ নং - নাটা, বাজে বকিস না বাঁড়া! তোর পিছনে ওটা কি?
    ২ নং - কি নয়, কে! তোর পিছনে ওটা কে বে নাটা?
    নাটা - এটা আবার কি নাটক হচ্ছে! আমার পিছনে আবার কোন...
    ...বলতে বলতে পিছন ফেরে।


    অনেকেই জানে না যে রংলিও নেশা করে। এখনও। কিন্তু রংলির মাথাটা ঠান্ডা। হঠাৎ বাওয়াল করে বসবে এমনটা রংলির স্বভাব নয়। কোনওদিনও ছিল না। নেশাটাকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, মানে কতটা নেশা করবে আর কতটা করবে না সেই ব্যাপারটা। আর যেদিন পারে না, সেদিন বুঝতে হবে তার সত্যিই নেশা হয়ে গেছে। আজকের ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না এখনো। দ্বিজদার কথা শুনতে শুনতে সে প্রায়ই সময়টা দেখতে পাচ্ছে। এটা কি নেশা হয়ে যাওয়ার লক্ষণ? হতেও তো পারে যে তার কল্পনাশক্তির জোর বেড়েছে। যদিও সেটা অবিশ্বাস্য! কারণ সন্দেহাতীত ভাবেই রংলি একজন গাম্বাট। তার মাথার জায়গায় নারকেল থাকলেও ক্ষতি ছিল না। তবে কিনা নারকেলের ভিতরেও তো শাঁস থাকে, জলও হয়। সেভাবেই কি তবে আজ রংলিরও ব্রেনের ব্যাটারিটা চার্জ হয়ে গেলো কোনওভাবে! এইমাত্র দ্বিজদা পঁচাত্তর পয়সা বলার সাথে সাথে রংলি দেখতে পেলো দ্বিজদাকে কেউ একজন হাতে একটা পুরোনো একটাকার কয়েন দিচ্ছে আর দ্বিজদা তাকে লুঙ্গির কোঁচড় থেকে বার করে ফিরিয়ে দিচ্ছে চার আনা। সিকি! --- রংলি ভাবলো মনে মনে, কতদিন আর দেখা যায় না; কিরকম যেন তামাটে রং হতো পুরোনো সিকিগুলোর। এইটা ভাবতেই সে একে একে পাঁচ পয়সা, কুড়ি পয়সা, দশ পয়সা, এক পয়সা, দুই পয়সা, মায় তিন পয়সাও দেখতে পেলো; যেটা কিনা জীবনে সে সাকুল্যে তিনবারও দেখেছে কিনা বলা শক্ত। দেওয়ালে ঘষলে সাদা সাদা কিসব যেন উঠতো পয়সাগুলোর গা থেকে। দস্তা থাকে ভিতরে, কে যেন বলেছিলো, সত্যি মিথ্যে রংলির জানা নেই। তবে কিরকম যেন একটা ধাতব গন্ধ বেরোতো ওই সাদা গুঁড়োটার গা থেকে।

    স্টেশন এসে গেছে।
    রংলি রিক্সা থেকে নেমে পড়লো।

    আসলে কথা হচ্ছিলো সম্পূর্ণ অন্য একটা বিষয়ে। রংলি বলছিলো সে যখন জীবনে প্রথম সিগারেট কিনে লুকিয়ে লুকিয়ে খায় গোল্ডফ্লেকের দাম ছিল নব্বই পয়সা। সেটা শুনে দ্বিজদা জানায় যে সে যেদিন বাঘাযতীন মোড় থেকে বাঘাযতীন স্টেশন যাওয়ার রুটে রিক্সা চালানো শুরু করে ভাড়া ছিল পঁচাত্তর পয়সা ।

    দ্বিজদাকে রংলি চেনে না। আজই আলাপ। সে একটা কুড়ি টাকার নোট দিয়ে খুচরোটা ফেরৎ নেওয়ার জন্য আর দাঁড়ালো না।

    রংলির মনটা ভালো।


    নাটা চিরকাল এরকমটা ছিল না। মানে এরকমটাই ছিল, কিন্তু এতটাও নয়। তাছাড়া তখন তাকে পাত্তা খুব কম লোকই দিতো। গেঁড়েপাকা বাচ্চা বলে এড়িয়ে চলতো সবাই।চড়থাপ্পড়ও লাগিয়ে দিতো মাঝেমধ্যেই। ক্লাস থ্রি এর বাংলা পরীক্ষায় গরু রচনা আসা সত্ত্বেও নাটা তার উত্তর না দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং তার ফলে পৃথিবীতে ক্ষমতার যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে সেই বিষয়ে সাতপাতা প্রবন্ধ লিখেছিলো। এর ফলে তার গার্জেন কল হয়। ক্লাস সেভেনে পড়তে নাটা হেডস্যার শ্যামলেন্দুবাবুর বাড়িতে প্র্যাঙ্ক কল করতো। শ্যামলেন্দুবাবু ফোন ধরলে "রক্ত চাই, কমরেড, রক্ত চাই!" বলে ফোন কেটে দিতো। শ্যামলেন্দুবাবু সিএলআই বসিয়ে ব্যাপারটা তাড়াতাড়িই ধরে ফেলেন এবং তারপর ইস্কুলের মাঠের উত্তরদিকের সুবৃহৎ আমগাছটির ডাল থেকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখেন নাটাকে। নাটাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে সপাং সপাং করে পাছায় বেতের বাড়ি মারছিলেন শ্যামলেন্দুবাবু, আর বলছিলেন, "আমি তো তোকে রক্ত দিতেই চেয়েছিলাম রে নাটা, কিন্তু তুই কি আমায় তোর থেকে স্বাধীনতা দিতে পারবি? যদি নাই পারবি তো রক্ত চাস কিসের অধিকারে!"

    এরপর ক্লাস এইটে নাটা ক্লাস মনিটর হয় আটদিনের জন্য। সাধারণত অন্যান্যরা দুসপ্তাহের জন্য মনিটর হতো, কিন্তু নাটা মনিটর হয়েই এমন হম্বিতম্বি শুরু করে যে ছাত্ররা বা স্যারেরা কেউই আর পেরে উঠছিলো না। হয়েছিল কি, ক্লাসে সাকুল্যে সাতচল্লিশ জন ছাত্র। তার মধ্যে প্রত্যেক পিরিয়ডেই নাটা অন্তত বত্রিশ জনের নাম লিখে রাখতো। ফলে স্যার পড়ানো শুরু করার আগেই শাস্তি দিতে দিতেই ঘন্টা পরে যেত। এতে পড়াশোনার মারাত্মক রকম ক্ষতি হতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, কারো শাস্তি পছন্দ না হলে নাটা স্যারদের সাথে তর্ক জুড়ে দিতো। বিশ্লেষণ করে বোঝাতে শুরু করতো যে ছাত্রটির অপরাধ আসলে কতটা গুরুতর এবং কেন তার আরো কড়া শাস্তি হওয়া উচিত। মাঝেমধ্যে সে বিকল্প শাস্তির প্রস্তাবও রাখতো। এইভাবেই প্রথম সাতদিনে নাটা নিজের পাপের কলসি পূর্ণ করে ফেলে যা কিনে অষ্টম দিনে উপচে যায়।

    একটি ইস্কুলে সপ্তাহে ছদিন ক্লাস হয়। একটি গোটা সপ্তাহের সোম থেকে শনি এবং এমনকি পরের সপ্তাহের সোমবারও ছাত্ররা নাটাকে সহ্য করে নিয়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবার থার্ড পিরিয়ডে পাকড়াশী নাটার কলার পাকড়ে ধরে। নাটারও যেমন বুদ্ধি, পাকড়াশীকে চমকাতে গিয়েছিলো! প্রত্যেকটা অ্যানুয়াল পরীক্ষায় পাশ করলে পাকড়াশীর তদ্দিনে কলেজে পড়ার কথা।তার আবার দুই সাকরেদও আছে যারা কিনা তদ্দিনে মাধ্যমিক পাশ না করে যাওয়ার কোনো কারণ ছিল না পড়াশোনায় মন থাকলে।এখন ঘটনা এইরকম যে, নাটা বেশি তড়পাচ্ছিলো। পাকড়াশীর গেলো সটকে। সে সোজা নাটাকে কলার ধরে টাঙিয়ে দিয়ে বললো, "ডাক তোর কোন স্যারকে না বাপকে ডাকবি বলছিস ডাক!" তার দুই সাকরেদও জুটে গিয়ে দুপাশ থেকে নাটাকে ঘিপাঘিপ বসাতে শুরু করে দিলো। তাই না দেখে বাকি ছাত্রদেরও ভারী ফুর্তি লাগলো প্রাণে। সবাই জানে পাকড়াশী গ্যাং শুরু করেছে মানে দোষটা ওদের ঘাড়েই যাবে। ফলে সবাই মিলে গোল করে ঘিরে ধরে মারতে লাগলো নাটাকে।
    সেইদিন সেই ভিড়ে আরেকজনও ছিল। তাকে আপনারা চেনেন। ভিড়ের মধ্যে ফাঁক খুঁজে ঠিক নাটার চোয়ালে একটা ঘুষি বসিয়েছিলো সে। একটাই।বেশি নয়। তার অবশ্য কোনোদিন নাটার খাতায় নাম ওঠেনি। কারণ ছেলেটির মাথাটা ঠান্ডা। কিন্তু ঘুষিটা তাকে মারতেই হতো। সে নিজে চোখে দেখেছে নাটা কিরকম স্বৈরাচার চালিয়ে গেছে গত সাতদিন ধরে। এইটুকু না করলে সে তার সহপাঠীদের প্রতি অন্যায় করে ফেলতো। আর অন্যায় সে জেনেবুঝে করতে পারে না। কারণ আর যাই হোক, তার মনটা ভালো।

    তো শেষ পর্যন্ত সেদিন ত্রিদিববাবু এসে নাটাকে বাকিদের হাত থেকে উদ্ধার করেন। তবে ব্যাপারটা গণরোষের পর্যায়ে চলে যাওয়ার ফলে কারুরই আর শাস্তি হয়নি।

    নাটার জীবন এরকমই চলছিল।হুট্ করে ক্লাস নাইনের শেষের দিকে নাটা সবাইকে চমকে দিয়ে স্কুলের হিরো হয়ে গেলো।


    নওলকিশোর সক্কাল সক্কাল দাঁত মেজে চা খেয়ে বেরিয়ে পড়েছিল বেশ্যাবাড়ি যাবে বলে।কিন্তু একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে যাওয়ায় ফিরে আসতে হলো। না, নওলকিশোর পাগল নয়। সে বিচক্ষণ।আগে কোনোদিন বেশ্যাবাড়ি যাওয়ার অভিজ্ঞতা না থাকলেও একটু চিন্তাভাবনা করেই সে বুঝতে পেরেছিলো যে যেতে হলে সকালের দিকেই যাওয়া উচিত।সবচেয়ে ভালো হয় দিনের প্রথম কাস্টমার হতে পারলে। কিন্তু সে যাচ্ছিলো কেন? তার কি চরিত্র খারাপ? --- মোটেই নয়।বরং সে তাড়িত, একপ্রকার মজবুরই বলা চলে। আটমাস আগে তার ব্রেকআপ হয়ে গেছে এবং এই আটমাসে সে কোনও মেয়ের দিকে তাকিয়েও দেখেনি। না, মানে তাকিয়েছে হয়তো, কিন্তু ঠিক সেভাবে তাকায়নি। বা, বলা যেতে পারে, সেভাবে তাকালেও উল্টোপাল্টা কিছু করে ফেলতে যাওয়ার ইচ্ছা হয়নি। বা ইচ্ছা হলেও, করে কিন্তু সে ফেলেনি। ফলে মোটের উপর তার চরিত্র ভালোই বলা চলে। এবার কথা হলো, চরিত্র যখন তার খারাপ নয়, তাহলে ব্রেকআপ হলো কেন! কারণটি জটিল এবং মনস্তাত্বিক। নওলকিশোর প্রায় তিনবছর ধরে কেবল এবং কেবলমাত্র তার প্রেমিকার সাথেই প্রেমের সম্পর্কে যুক্ত ছিল। প্রথমদিকে চোখাচোখি, তারপর পরিচয়, ফোন নম্বর দেওয়া-নেওয়া, এসএমএসে কবিতা ও গান চালাচালি, তারপর হাত ধরাধরি, পার্ক-টার্কে যাওয়া, কসম-বাদে-তুমি আমার জন্যে কি কি করতে পারো ইত্যাদি ইত্যাদি, গালে চুমু, সাত সেকেন্ডের জন্য ঠোঁটে শুকনো চুমু; এইসব করতে করতে পেরিয়ে গেলো দুবছর দুমাস। মানে একটা নরমাল প্রেম যেরকম হয় আরকি। কোনো রিপুতাড়িত ব্যাপারস্যাপার নয়, বরং জয় গোস্বামী আর করন জোহরের পারফেক্ট মিশেল। আগেই বলেছি, নওলকিশোর বিচক্ষণ। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভুল জায়গায় ফেঁসে যাওয়ার বান্দা সে নয়। ফলে সে বেশ সময় নিয়েই এগিয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হলো এমন জায়গায় যেটা সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। এমনকি তার প্রেমিকাও কল্পনা করেনি। কিন্তু তাতেই সম্পর্কটা ভেস্তে গেলো। আসলে দুবছর দুমাস কেটে যাওয়ার পর নওলকিশোর নিশ্চিত হয় যে এই মেয়েটির সাথে সে নির্বিঘ্নে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। মেয়েটির নাম রুচিরা, তবে সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেটা জরুরী সেটা হলো যে, নওলকিশোরের এই রিয়ালাইজেশনের সাথে সাথেই সম্পর্কটি একটি শারীরিক পুশ পায়। আর সমস্যার সূত্রপাত সেখানেই। না, মেয়েটির কোনও আপত্তি ছিল না। সে বরং উপভোগই করছিলো ব্যাপারটা। বিয়ের পিঁড়ি ফিরিও দেখতে পাচ্ছিলো দিকচক্রবালে। তাছাড়া আর যেটা থাকে, মানে শারীরিক কোনো সমস্যা, সেটাও ছিল না। মেয়েটিরও না, নওলকিশোরেরও না। থাকলে সে ব্রেকআপ এর এতদিন পর বেশ্যাবাড়ি যাওয়ার সাহস দেখাতো না।

    তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
    --- সে কথায় আমরা পরে আসবো। কারণ ব্যাপারটা ভেঙে বোঝাতে গেলে অনেক যৌনচুপচুপে দৃশ্যের বিবরণ দিতে হবে। আর তাহলেই আজকের অদ্ভুত ঘটনার কথা; যে ঘটনার জন্য নওলকিশোর বাড়ি ফিরে এলো, বেশ্যাবাড়ি গেলো না; আর বলা হবে না। তা সেরকমটা তো আর হতে দেওয়া যায় না। কাজেই...


    পিছন ফিরে নাটা দেখলো, যা: সালা! গোটা ল্যান্ডস্কেপটাই বদলে গেছে। বাড়িঘর গাছপালা সব উধাও। তার বদলে সাদা সাদা ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে আকাশছোঁয়া এক কালীমূর্তি। ঠিক মূর্তি বলা যায়না অবশ্য, কারণ সেটা নি:শ্বাস টিশ্বাস নিচ্ছে। এবং কটমট করে তাকিয়েও আছে। নাটারই দিকে। নাটা আবার তার বন্ধুদের দিকে ফিরলো। তারা সব মুখচাওয়াচাওয়ি করছে। কখনও নিজেদের মধ্যে একে ওপরের দিকে তাকাচ্ছে, কখনও দেখছে নাটার দিকে, তো কখনও নাটার পিছনে ওই আকাশছোঁয়া কালীর দিকে। নাটা আবার মা কালীর দিকে ফিরলো। তিনি তখনও তারই দিকে তাকিয়ে আছেন এবং মাঝে মাঝে খাঁড়া নাচাচ্ছেন একহাতে। হিউজ মা কালী। খাঁড়াটাই জলে ছেড়ে দিলে টাইটানিকের তাও দেড়গুণ হবে মনে হয়। আরও ভালো করে বলতে গেলে, নাটাকে ভিট্রুভিয়ান ম্যান বানিয়ে যদি একটা বৃত্ত আঁকা হয় তাহলে তার যা সাইজ হবে আমাদের এই মা কালীর একেকটি স্তনবৃন্ত তার চেয়ে ইঞ্চিদেড়েক বড় হবে বৈ ছোট নয়। নাটা খানিকক্ষণ ভাবলো। তারপর তার গেঁড়েপাকার মতো পেটেন্ট হাসিটা খেলে গেলো ঠোঁটের কোণে। সে বললো, "না না না না। এটা হচ্ছে না।" মা কালী এবার পাল্টা কথা বলে উঠলেন, ঠান্ডা অথচ ক্রোধান্বিত স্বরে, "কি হচ্ছে না বে নাটা? তোর মোক্ষলাভ হচ্ছে না? আমার গায়ে মুতলি কেন হারামজাদা? জানিস না এই সময় ঠান্ডা লেগে গেলে ভাইরাল ফিভার হয়?"
    নাটা - না না না না! এটা হতে পারে না! (বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে) তোরা কি ওনাকে দেখতে পাচ্ছিস?
    ১ নং - পাচ্ছি ভাই। হুবহু পাচ্ছি।
    ২ নং - শুনতেও পাচ্ছি।
    ৩ নং - কাজটা তুই ঠিক করিসনি নাটা। তুই নাই মানতে পারিস, অন্যরা তো মানে। মানুষের মন বড় অদ্ভুত জিনিস ভাই। সবাই মিলে সৎভাবে বিশ্বাস করলে যেটা নেই সেটাকেও তৈরী করে ফেলতে পারে।
    নাটা - কিন্তু এটা তো জাস্ট হতে পারে না!
    কালী - কেন হতে পারে না বে নাটা? পৃথিবীতে তোর মতো নরকের কীট পয়দা হতে পারে আর ভগবান বলে কিছু থাকতে পারে না? তুই ঠিক করে দিবি কোনটা হবে আর কোনটা হবে না?
    নাটা - না মানে আমি সেরকমটা বলছি না...
    কালী - বলিসও না। তুই অনেককিছু বলে ফেলেছিস অলরেডি। অনেককিছু করেও ফেলেছিস যেগুলো তোর করা উচিত হয়নি।
    নাটা - মানে?
    কালী - (খাঁড়া নাচাতে নাচাতে) মানেটা বুঝিয়ে বলে দেব?
    নাটা - কিন্তু নকুলই তো বললো!
    নকুল - ফালতু কথা বলিস না! আমি ভাবতেও পারিনি তোর এতবড়ো আস্পর্ধা হবে।
    ২ নং - আর ভাই আমি তো তোকে বারণও করেছিলাম।
    ৩ নং - আমিও।
    নাটা - বাহ্! এখন সব দোষ আমার হয়ে গেলো?
    কালী - দোষ তো চিরকালই তোরই ছিল। পয়দা হওয়াটাই তোর একনম্বর দোষ। হ্যাঁচ্চো!
    নাটা - ইঃ! সিকনি ছিটলো!
    কালী - বাঞ্চোৎ ছেলে ওটা দৈব সিকনি ! গায়ে মেখে গড়াগড়ি দে !
    নাটা - (রুমালে মুখ মুছতে মুছতে) না না না না না না! সিকনি সিকনিই! দৈব বলে কিছু হয়না। এসব তো প্রবীরদা কবেই লিখে গেছেন।
    কালি - এন্নাফ !!!

    শোন রে ব্যাটা যুক্তিবাদী পৈতেধারী নাটা
    গাঁড়পাঁচালির শাস্তিতে তোর অন্ড গেলো কাটা

    ২ নং - অন্ড মানে বিচি না?
    নকুল - নাটা, তুই এখনও পৈতে পড়িস?
    নাটা - না না না না না না। এটা আপনি করতে পারেন না।
    কালী - আমি সব করতে পারি রে হারামজাদা! হাত দিয়ে দেখ। আমার নাম মা কালী! আইকার্ড দেখবি?

    নাটা সন্ত্রস্তমুখে নিজের টলের জায়গাটা হাতড়াতে শুরু করে।


    রংলির সিক্রেটটা কেউ জানে না। বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে সেই সবার আগে একা শহরে এসে থাকতে শুরু করে। তখন অবশ্য বলার মতো একটা কারণ ছিল; ইউনিভার্সিটির পড়াশোনা। কিন্তু এমএটা সে শেষ করেনি। মানে হয়তো করেছে, কেউ নিশ্চিত করে সেটা জানে না। কিন্তু যদি করেও থাকে তাহলেও তারপর অন্তত পাঁচবছর কেটে গেছে। রংলি কিন্তু মফঃস্বলে ফেরত যায়নি। না, সে চাকরিও করে না। সে যে কখন কোথায় থাকে, সেটা কেউই জানে না। মাথাও কেউ ঘামায় কি তার বিষয়ে? কেনই বা ঘামাতে যাবে? ছোটবেলার বন্ধুরা যার যার নিজের কাজে ব্যাস্ত, আর বড়বেলায় রংলির আর নতুন করে বন্ধু হয়নি কোনো। বা বলা ভালো সে নিজেই আর বন্ধু পাতায়নি। বন্ধুরা বদলে যায়, রংলি জানে। এই বদলে যাওয়াটা খুব সত্যি। সব মানুষই বদলে যায়। তাই রংলির হিসেবে সব মানুষকেই তার বন্ধু বলা চলে। এই দ্বিজদা যেমন, এক সন্ধ্যের বন্ধু। সে আর কোনোদিন দেখা হলেও বন্ধু, অথবা না হলেও।

    এইজন্যে রংলির সাথে সবার সম্পর্ক খুব ভালো। এমনকি বাড়িওলারও। একটা ঘর তার ভাড়া নেওয়া আছে বাঘাযতীন স্টেশনের কাছে কোথাও। তবে সেই ঘরে সে যে কখন আছে আর কখন নেই বলা ভারী মুশকিল। এতে বাড়িওলা ভদ্রলোক কিছু মনে করেন না।কারণ ছেলে হিসাবে রংলির কোনো ঝামেলা নেই। নেশা করলেও বাওয়াল করে না, ঘরে আড্ডা বসায় না, সবসময় মিষ্টিমুখে কথা বলে।তাছাড়া বাড়িওলাও তো বন্ধুই হলো একপ্রকার। নিশ্চিতভাবেই ভদ্রলোক বাড়িওলা হয়েই জন্মাননি। বদলে যেতে যেতে তিনি বাড়িওলা হয়ে গেছেন একদিন।আর আমরা জানি, যারা বদলে যায় তাদের সবাইকেই রংলি বন্ধু মনে করে। এই যে সেদিন রংলি বললো পেটে ব্যাথা করছে আর ভদ্রলোক তার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, "একটা অ্যান্টাসিড খাবে বাবা?" --- এ কি বন্ধুত্ত্বপূর্ণ ব্যবহারই নয়? এর চেয়ে বেশি কলকাতা শহরে লোকে আর কিসের বন্ধুত্ব খোঁজে? তাছাড়া এই বন্ধুত্বের আরেকটা ভালো দিকও আছে। যতক্ষণ সামনে আছো, আছো, আমিও আছি; আমরা বন্ধু নিশ্চয়ই। কিন্তু যখন তুমি আমার সামনে নেই, যদি মরেও যাও তোমার জন্য কান্নাকাটি করার দায় আমার উপর বর্তায় না। তোমায় কাঁচের শোকেসে পুড়ে সিরিটি নিয়ে যাবে যে ড্রাইভার সেও তোমার বন্ধু, সে তুমি বেঁচে থাকতে তাকে চিনতে কিনা তাতে কিছু এসে যায় না।

    --- এইভাবে সবাই ভাবতে জানলে পৃথিবীতে দাঙ্গাহাঙ্গামা নিশ্চিতভাবেই অনেক কমে যেত। " লা লা লা লা ", সুর করে গেয়ে ওঠে রংলি।সে এখন সুকান্ত সেতুর সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ির আসা যাওয়া দেখছে। সে কি যাচ্ছে কোথাও, নাকি ফিরছে? সে কথা হলফ করে কেউ বলতে পারে না। রংলি নিজেও জানে কি আর?


    নৈহাটী স্টেশন এর বেঞ্চিতে বসে বসে নওলকিশোর বিহারী সাধুটাকে দেখছিলো। মানে সাধুটা বিহারী নাও হতে পারে কিন্তু নওলকিশোর ধরে নিয়েছিল বিহারীই হবে। অসহ্য একেবারে! এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। ছোটবেলা থেকেই নওলকিশোর বিহারীদের সহ্য করতে পারে না। একদম পারে না। তার কাছে অসহ্য আর বিহারী দুটো প্রায় একই শব্দ।যেমন কিনা অসহ্য বাঁদরও বলা যায়, আবার বিহারী বাঁদরও বলা যায়। সত্যি বলতে দ্বিতীয়টা বললেই নওলকিশোরের গায়ের ঝালটা বেশি মেটে। যেকোনো বিরক্তিকর জিনিসই আসলে বিহারী। যেমন বিহারীদের মতো গুটখা খাওয়া, বিহারীদের মতো জামাকাপড়ের চয়েস, বিহারীদের মতো হাতে চাবির রিং নাচানো, ইত্যাদি। মানে বিহারী শব্দটা এসেই যায় কোনো না কোনো ভাবে। এই যেমন ঝিঙে বস্তুটাকে নওলকিশোর মোটেই সহ্য করতে পারেনা। তো একদিন হয়েছে কি, মা দুপুরে ঝিঙেসেদ্ধ দিয়ে ডাল আর সাথে খাবার জন্য ঝিঙেপোস্ত বানিয়েছেন। নওলকিশোরের গেলো মাথা গরম হয়ে। সে মাকে ডেকে বললো, বেশ চেঁচিয়েই, "এসব কি হয়েছে? শুধু এই দিয়ে খাওয়া যায়? এতো খালি ঝিঙে আর ঝিঙে! দিনদিন বিহারী হয়ে যাচ্ছো নাকি?" মা খুব চিন্তিত স্বরে বললেন, "হ্যাঁরে নকুল, বিহারীরা প্রচুর ঝিঙে খায় এমনটা তো কখনও শুনিনি!" --- ব্যাস ! অমনি ছেলে "হাজারবার বলেছি আমাকে ওই নামে ডাকবে না" বলে থালা ফেলে দুদ্দাড় করে উঠে বেরিয়ে চলে গেলো।

    বিহারীরা সত্যিই ঝিঙে খেতে ভালোবাসে কিনা নওলকিশোর জানেনা, তবে ব্যাপারটা অসহ্য যখন নিশ্চয়ই বিহারীই হবে কোনো না কোনো ভাবে। ঠিক যেমন স্টেশনের সাধুবাবাটিও নিশ্চিতভাবেই বিহারী। ভন্ড জোচ্চোর একটা! একগাদা ছবি, তাবিজ, মাদুলি নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছে। এতো বুজরুকিই জানিস যখন তখন আর প্লাটফর্মে বসতে হয় কেন রে ঠগীর বাচ্চা, নিজের লাইফটা শুধরে নিলেই পারিস --- এইসব ভাবছিলো নওলকিশোর। হঠাৎ খেয়াল করলো সাধুবাবা তারই দিকে তাকিয়ে আছেন। বড্ডো ঠান্ডা সে দৃষ্টি। প্রথমে নওলকিশোরের রক্ত হিম হয়ে আসে। তারপর সে ভাবে এতে আর ভয় পাওয়ার কি আছে, বুজরুকরা তো কতরকম অভিনয়ই জানে। নির্ঘাত ব্যাটা কিছু বলবে এবার। কিছু বেচার ধান্দা করবে। আর তখনই ঘটে যায় ঘটনাটা। সাধুবাবা গমগম শব্দে বলে ওঠেন, "আমি যে সে সাধু নই রে নকুল। সতেরো বছর হিমালয়ের গুহায় কাটিয়ে আমি ফিরে এসেছি সমাজের ভালো করবো বলে"। নওলকিশোর প্রথমে বলতে যাচ্ছিলো ওই নামে আমায় ডাকবেন না। কিন্তু বলতে গিয়েই মাথায় এলো সাধুটা তার ডাকনাম জানলো কি করে? তাছাড়া সাধু কথা বলছিলো বটে কিন্তু তার তো ঠোঁট নড়ছিলো না ! এটা কি তাহলে কোনো চক্রান্ত? --- এসব ভাবতে ভাবতেই সে দেখতে পায় সাধুবাবা রূপ বদলে একটা কাকে পরিণত হচ্ছে। কালো কুচকুচে অতিকায় একটা কাক। কাকটার ঠোঁটটা তার একেকটা হাতের সমান। কাকটা তাকে বলে, "বল, এবার বল, আমি একটা বিহারী কাক। বুজরুকি করে পেট চালাই।"

    ধর্ম জনগণের আফিম বটে, কিন্তু নওলকিশোর তো দাঁত মেজেই বেরিয়ে পড়লো। ভুলভাল কিছু তো খায়নি। এক কাপ চা খেয়েছিলো শুধু। কাকটা উড়তে উড়তে তার মাথার উপর আসে, তারপর নখরের মধ্যে খামচে ধরে তাকে, শিকারের মতো। নওলকিশোর বলে, "আপনি কি আমায় খেয়ে ফেলবেন তাহলে?" কাকটা বলে, "খেতে পারলে তো ভালোই হত। সমাজটা পরিষ্কার হত একটু। কিন্তু তোর ভেতর অনেক নোংরা রে। ও আমারও পেটে সইবে না"। কাকটা উড়তে শুরু করে এবার, নওলকে পাঞ্জায় খামচে ধরে রেখে। নওল বলে, "বিশ্বাস করুন, আমি জানতাম না এসব সত্যি সত্যি হয়।একবার দেখেছিলাম বটে। কিন্তু আমার ধারণা ছিল ওটা রংলির কারসাজি। আমি এখনও ভাবছি আমি আসলে প্লাটফর্মে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি"। কাকটা মুচকি হাসে। বলে, "এই জন্যেই তোর নাম নকুল। স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নে ফারাক জানিসনা। না:! তোর ভেতরের নোংরা বরং তোর ভেতরেই থাক !" এইকথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে নওল টের পায় তার গুহ্যদ্বারটি ভ্যানিশ হতে শুরু করেছে। ম্যাট্রিক্স সিনেমায় নিও-র যেমন ঠোঁটদুটো জুড়ে গিয়েছিলো, তারও ওরকমটাই হচ্ছে, তবে সম্পূর্ণ বিপরীত জায়গায়। এই অনুভূতি বলে বা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। এটা যার সঙ্গে ঘটেছে সেই একমাত্র বুঝবে। একটা ফুটো। এই ছিল। এই নেই। --- এ যেন ম্যাজিক ! যেন ফাঁপা খোলে চামড়া পরিয়ে ঢোল বানিয়ে দিলো কেউ। যেন টোকা মারলেই বেজে উঠবে হরেকরকম বোলে।
    ১০

    রংলির বাবার একটা বাক্স ছিল। খুচরোর বাক্স। ছোট। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের হাতের তালুর মাপের। সেই বাক্সে অনেক খুচরো পয়সা রাখা থাকতো সবসময়। কত, রংলি গুনে দেখেনি কখনও। তবে তার কাছে সেটা অনেকই। কারণ আট আনায় কারেন্ট নুন পাওয়া যায় অথবা জোকারের মুখওয়ালা মৌরি লজেন্সের বাক্স। রংলি ভাবতো একদিন তার কাছে পুরো পাঁচ টাকা থাকবে আর সে অনেক আলুকাবলি কিনে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে ইস্কুলে। না, চুরি সে করবে না। হয়তো ভালো কাজ করবে কোনো। তাই বাবা তাকে ওই খুচরোর বাক্স থেকে গুনে গুনে বার করে দেবে পাঁচটা একটাকার কয়েন। পাঁচটাকা যে কোনোদিন একটা কয়েনেই দেওয়া যাবে এ তখনও তার কল্পনার অতীত। ওই কয়েনের বাক্সেই নিচের দিকে রাখা থাকতো সেইসব পয়সাগুলো যেগুলোর আর দাম নেই বিশেষ। দাম না থাকলেও রংলির কাছে সেগুলোই বা কম কি ! একপয়সায় দশটা কুঁচোলজেন্স হয়। মাছ, উট, হাতি, আরও কতরকম ছাঁচে বানানো রংবেরঙের কুঁচোলজেন্স সব।পাঁচ পয়সায় পঞ্চাশটা দিতো মাথায় বেতের ঝুড়ি নিয়ে ঘোরা দাদুটা। দুহাতের আঁজলা ভরে যেত রংলির। মা অবশ্য বলতো "ওরা ছেলেধরা"। ওদের কাছে বেশি যেতে নেই। পান চিবাতো সবসময় দাদুটা। আর ঠিক করে বাংলা বলতে পারতো না। ঠোঁট লাল হয়ে থাকতো সবসময়। সব কথা বোঝাও যেত না ঠিক করে। মা বলতো আসলে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের ধরে ধরে রক্ত খায় তো, তাই পান চিবিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করে। পান খেলে মুখে অনেক থুতু হয় রংলি দেখেছে। তাই সে মুখের মধ্যে থুতু জমিয়ে ঠোঁটের ডগায় এনে বুড়বুড়ি কাটতো। এর জন্য বেশ কয়েকবার তাকে বড়দের হাতে চড় খেতে হয়েছে। তবে কিনা একদিন রংলিও বড় হয়ে যাবে। তার হাতের মাপ তখন হয়ে যাবে বাবার হাতের মতো। কম করে একটাকার কুঁচোলজেন্স ধরবে তখন তার আঁজলায়। তার নিজের খুচরোর বাক্স থাকবে একটা তখন। বাবার খুচরোর বাক্সের মতো। আর সে কাউকে না বলবে না কোনোদিন।সবাইকে চার আনা, আট আনা, একটাকা দেবে রোজ নিয়ম করে। তার বাক্সে পয়সা কখনও শেষ হবে না। শেষ হলে আবার নিজে থেকে ভরে যাবে। আর নকুলকে ইচ্ছেমতো পয়সা নিতে দেবে সে ওই বাক্স থেকে। নকুলের কাছে তো পয়সা থাকেনা কোনোদিন! কিন্তু বেতের ঝুড়িওলা দাদুটা কি বেঁচে থাকবে ততদিন? নকুল জানে না, দাদুটা তাকে একটা বাঁশি দেখিয়েছে। জাদুবাঁশি। দশটাকা দাম বাঁশিটার। কি জাদু সেটা অবশ্য বলেনি। বলেছে তার কাছে যেদিন দশটাকা থাকবে সেদিন বুঝিয়ে বলে একেবারে হাতে দিয়ে দেবে।কিন্তু দশটাকা কবে হবে রংলির কাছে? দশটাকা তো অনেকগুলো টাকা !
    ১১

    নাটার তখন পুরো হায় মেরি বুলবুল অবস্থা ! সে নিজের টল খুঁজে পাচ্ছে না। অনেক হাতড়াহাতড়ি করেও পাচ্ছে না। আর তার তিন বন্ধু খৌয়া খৌয়া করে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিচ্ছে গঙ্গার ঘাটে। কোন একটা মর্কট আবার হাসির তোড়ে সাইকেলের গায়ে পড়ে সাইকেলগুলোকেও উল্টে দিয়েছে। সে কি হাসি ! মুখ দিয়ে পাকস্থলী উঠে আসবে মনে হচ্ছে সবকটার। এইমাত্র রংলি থেমে নকুলকে কি একটা বললো হাঁপাতে হাঁপাতে। তারপর হাতে হাতে তালি বাজিয়ে আবার গড়াগড়ি দিয়ে হাসতে লাগলো দুজনে। এদিকে নাটার তখন কানের পাশে ঝিঁঝিঁ। শিরদাঁড়া ঠান্ডা। মাথায় হাজারখানেক লালপিঁপড়ে কামড়াচ্ছে একসাথে। স্যারেরা বলতেন একদিন তুই টের পাবি নাটা। কিন্তু এইভাবে টের পেতে হবে তাই বলে? সর্ষেফুলের রংটা তবু উজ্জ্বল, নাটা ইস্কাবন দেখছে চোখেমুখে। চিন্তাভাবনার ক্ষমতা লোপ পেয়ে যাচ্ছে তার।

    রংলি আর নকুল ছাড়া আরেকজন যে ছিল, মানে ২ নং, একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে বসেছে এতক্ষনে। মা কালীর দিকে তর্জনী নির্দেশ করে সে বললো, "একদম ঠিক কাজ হয়েছে। এই জিনিষটা অনেকদিন আগেই করা উচিত ছিল। থ্যাংকিউ ভাই, থ্যাংকিউ !" উচ্ছাসে কয়েকফোঁটা থুতু ছিটে গেলো মুখ থেকে। চোখমুখ লালচে। এতক্ষন গড়াগড়ি খাওয়ার ফলে জামাপ্যান্টে ধুলো লেগে আছে। মা কালী অবশ্য তার ধন্যবাদজ্ঞাপনে বিশেষ পাত্তা দিলেন বলে মনে হয়না। তাঁর তখন অন্য সমস্যা। নাক টানতে হচ্ছে বারেবারে। "তোর কাছে রুমাল হবে একটা", জানতে চাইলেন তিনি। নাটাকে অবশ্য দেখে বোঝার উপায় নেই তার ভেতরে তখন কি চলছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে নীলডাউন করিয়ে রেখেছে কেউ বুঝি। শুধু কানের বদলে অন্য জায়গায় ধরতে বলেছে। অথবা সে হয়তো একটা মূর্তি। পাথরের। বেঁচে আছে কিনা তাই বা কে জানে ! হার্ট চোক করে গেছে হয়তো !

    "আমি ভালো হয়ে যাবো।"
    " অ্যাঁ?" তিন বন্ধু সমস্বরে বলে ওঠে।
    "কিছু বললি?" মা কালী জিজ্ঞেস করেন।
    নাটা - সত্যি বলছি। আমি ভালো হয়ে যাবো।আর এরকম করবো না।
    কালী - সে বললে তো হয়না বাবা। ওটা আগামীদিনে ভাবা যাবে। আগে তুমি অতীতের ঋণটা তো চোকাও।
    নাটা - ভবিষ্যতের কথা আর ভাবতে পারছি না আমি। ও:! কি ভয়ানক !
    নকুল - কেন? ভালো লাগছে না তোর? একদিনে তোর গোটা পাপের বোঝাটা হালকা হয়ে গেলো। এমন সৌভাগ্য কজনের হয় বল?
    রংলি - নাটা রে! তুই তো অটোব্রহ্মচারী। অটোয় চেপে ব্রহ্মান্ড প্রদক্ষিণ করবি তুই।
    ২ নং - আর ওই অটোয় চেপেই বেরিয়েও যাবি ব্রহ্মান্ড থেকে। তোর ভাগ্যে অটোব্রহ্ম লেখে আছে ভাই। এ সুযোগ হারাস না।

    নাটা হাতজোড় করে কালীর সামনে বসে পড়ে।
    - আমি ভুল করেছি।আমি নির্জ্ঞান ছিলাম। কিন্তু আমি নির্দোষ।
    কালী - প্রথমত তুই মূর্খ। নির্জ্ঞান বলা যায় না তোকে। আর নির্দোষ তো বলা চলেই না। এখন ফাঁদে পড়ে কাঁদুনি গাইছিস।
    নাটা - তাই বলে দোষের বদলে অন্ডকোষ? এ কেমন বিচার মা, এ কেমন বিচার?

    মা ডাক শুনে কালীর মনটা বোধহয় একটু গললো।
    - একটা উপায় আছে।
    নকুল - না না ! থাকতেই পারে না !
    ২ নং - বারবার পার পেয়ে ব্যাটা। এটা ঠিক নয়।
    কালী - এখন থেকে চল্লিশ কিলোমিটার উত্তরে কলিকাতা নাম এক শহর আছে।
    নাটা - হ্যাঁ জানি তো !
    কালী - সে তো জানবিই। তবে কিনা একদিন ছিল না। আর একদিন থাকবে না আবার। এই মুহূর্তে আছে। তুই যদি শহরটাকে চল্লিশবার প্রদক্ষিণ করতে পারিস...
    নকুল - তাহলেই ফেরত পেয়ে যাবে?
    রংলি - তালে আর কি?
    ২ নং - ধুর ! ধুর !
    কালী - আরে, বলতে দে আমাকে ! ও যদি শহরটাকে চল্লিশ পাক মারতে পারে তাহলে তোরা সবাই একদিন যার যার বিছানায় ঘুম থেকে উঠবি আর জানবি যে এটা একটা স্বপ্ন ছিল যা তোরা প্রত্যেকে আলাদা সময় আলাদা আলাদা তারিখে ঘুমের মধ্যে দেখেছিস। আর তোরা কেউই জানবি না যে বাকিরাও এই একই স্বপ্ন দেখেছে।
    রংলি - বুঝলাম না।
    নাটা - মানে আমি কি ফেরত পাবো নাকি সেটাও স্বপ্ন হয়েই থাকবে?
    কালী - মন দিয়ে শোন।তুই যদি কাজটা করতে পারিস তাহলে এই ঘটনাটা স্বপ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু তুই যদি না পারিস তাহলে এটাই তোর বাস্তবতা।
    নকুল - মানে নাটা যদ্দিন না কোলকাতাটাকে চল্লিশ পাক মেরে উঠতে পারছে তদ্দিন ওর এই দুঃস্বপ্নটা চলবে ! হি হি !
    ২ নং - আর আমাদের সুসময় !!

    পাঠকদের জানিয়ে রাখা ভালো ২ নং এর ভূমিকা এখানেই শেষ হলো। সময়টা তার জন্য খুব একটা সুখের হবে না। সামনের শীতে ভোররাতে মদ খেয়ে বাড়ি ফেরার সময় হাইওয়েতে বাইক অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাবে সে। এবং এই আখ্যানে সে ফিরে আসবে না আর। তাতে অবশ্য আমাদের মূল চরিত্রদের কিছুই এসে যাবে না। কারণ মৃত্যু অতি সামান্য ঘটনা। এরকম দুর্ঘটনা প্রত্যেক শীতেই প্রচুর সংখ্যায় ঘটে থাকে। ২ নং-এর আসল নাম শুভঙ্কর।

    (প্রথম পর্ব সমাপ্ত)
    (চলবে)
    দ্বিতীয় পর্ব - http://www.guruchandali.com/blog/2018/03/06/1520349527914.html
  • বিভাগ : ব্লগ | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ১৪৩ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আরও পড়ুন
কাঠাম - Rumela Saha
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Anamitra Roy | 125.187.48.109 (*) | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৫:১৯64287


  • অনেকেই জানে না যে রংলিও নেশা করে। এখনও। কিন্তু রংলির মাথাটা ঠান্ডা। হঠাৎ বাওয়াল করে বসবে এমনটা রংলির স্বভাব নয়। কোনওদিনও ছিল না। নেশাটাকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, মানে কতটা নেশা করবে আর কতটা করবে না সেই ব্যাপারটা। আর যেদিন পারে না, সেদিন বুঝতে হবে তার সত্যিই নেশা হয়ে গেছে। আজকের ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না এখনো। দ্বিজদার কথা শুনতে শুনতে সে প্রায়ই সময়টা দেখতে পাচ্ছে। এটা কি নেশা হয়ে যাওয়ার লক্ষণ? হতেও তো পারে যে তার কল্পনাশক্তির জোর বেড়েছে। যদিও সেটা অবিশ্বাস্য! কারণ সন্দেহাতীত ভাবেই রংলি একজন গাম্বাট। তার মাথার জায়গায় নারকেল থাকলেও ক্ষতি ছিল না। তবে কিনা নারকেলের ভিতরেও তো শাঁসথাকে, জলও হয়। সেভাবেই কি তবে আজ রংলিরও ব্রেনের ব্যাটারিটা চার্জ হয়ে গেলো কোনওভাবে! এইমাত্র দ্বিজদা পঁচাত্তর পয়সা বলার সাথে সাথে রংলি দেখতে পেলো দ্বিজদাকে কেউ একজন হাতে একটা পুরোনো একটাকার কয়েন দিচ্ছে আর দ্বিজদা তাকে লুঙ্গির কোঁচড় থেকে বার করে ফিরিয়ে দিচ্ছে চার আনা। সিকি! --- রংলি ভাবলো মনে মনে, কতদিন আর দেখা যায় না; কিরকম যেন তামাটে রং হতো পুরোনো সিকিগুলোর। এইটা ভাবতেই সে একে একে পাঁচ পয়সা, কুড়ি পয়সা, দশ পয়সা, এক পয়সা, দুই পয়সা, মায় তিন পয়সাও দেখতে পেলো; যেটা কিনা জীবনে সে সাকুল্যে তিনবারও দেখেছে কিনা বলা শক্ত। দেওয়ালে ঘষলে সাদা সাদা কিসব যেন উঠতো পয়সাগুলোর গা থেকে। দস্তা থাকে ভিতরে, কে যেন বলেছিলো, সত্যি মিথ্যে রংলির জানা নেই। তবে কিরকম যেন একটা ধাতব গন্ধ বেরোতো ওই সাদা গুঁড়োটার গা থেকে।

    স্টেশন এসে গেছে।
    রংলি রিক্সা থেকে নেমে পড়লো।

    আসলে কথা হচ্ছিলো সম্পূর্ণ অন্য একটা বিষয়ে। রংলি বলছিলো সে যখন জীবনে প্রথম সিগারেট কিনে লুকিয়ে লুকিয়ে খায় গোল্ডফ্লেকের দাম ছিল নব্বই পয়সা। সেটা শুনে দ্বিজদা জানায় যে সে যেদিন বাঘাযতীন মোড় থেকে বাঘাযতীন স্টেশন যাওয়ার রুটে রিক্সা চালানো শুরু করে ভাড়া ছিল পঁচাত্তর পয়সা ।

    দ্বিজদাকে রংলি চেনে না। আজই আলাপ। সে একটা কুড়ি টাকার নোট দিয়ে খুচরোটা ফেরৎ নেওয়ার জন্য আর দাঁড়ালো না।

    রংলির মনটা ভালো।
  • Ishan | 202.189.128.15 (*) | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৫:১৯64288
  • এখানে ৩ কি বাদ গেছে? লেখক বললে বসিয়ে দেব। এডিট অপশন নেই যখন।
  • Ishan | 202.189.128.15 (*) | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৫:২০64289
  • আর ৪ টা কমেন্টে এসে গেছে। রিপোস্ট করা হউক।
  • Anamitra Roy | 125.187.48.109 (*) | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৫:২৩64290
  • হ্যাঁ। "হেমন্তকাল। গঙ্গার ঘাট। বিকেল পেরিয়ে প্রায় সন্ধ্যা।" --- এই পার্টটার মাথায় ৩ বসানো গেলে বড়োই ভালো হয়... :(
  • Sutapa | 57.11.192.191 (*) | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৫:৪৭64286
  • লেখাটি সুন্দর, আর পরবর্তী পর্বের জন্যে অপেক্ষা ক্লান্তিকর। তাড়াতাড়ি চাই ।
  • pi | 57.29.184.11 (*) | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ১২:৫১64285
  • তারপর?
  • শঙ্খ | 52.110.150.178 (*) | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০১:২১64292
  • পড়ছি
  • pi | 24.139.221.129 (*) | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৩:৩৪64291
  • একসাথে সময় নিয়ে পড়ব বলে জমিয়ে রাখলাম
  • সিকি | 116.202.81.200 (*) | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৪:৩৯64293
  • গুরু গুরু, কোতায় ছিলে? দেকেচো ব্যান্ডেলের মাল ক্যামন হয়?
  • Anamitra Roy | 125.187.48.109 (*) | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৫:৪৩64294
  • :D
  • pi | 57.29.168.164 (*) | ০১ মার্চ ২০১৮ ০১:১৫64295
  • খাসা লাগছে। ৫ এ এসে নাটাকাহিনি বিশেষ করে পছ্ন্দ হল। রঙলি দ্বিজদেরও। আবার জমিয়ে রাখলাম।
  • Anamitra Roy | 125.187.48.109 (*) | ০১ মার্চ ২০১৮ ০৪:১০64296
  • বেশ :)
  • শিবাংশু | 55.249.72.207 (*) | ০১ মার্চ ২০১৮ ০৭:১৫64297
  • বেশ লাগলো....
  • Anamitra Roy | 125.187.48.109 (*) | ০১ মার্চ ২০১৮ ০৭:৪৫64298
  • শিবাংশুদা, এখনও চলছে...
  • Ishan | 202.189.128.15 (*) | ০১ মার্চ ২০১৮ ০৮:২২64299
  • এটা কীভাবে লেখা হচ্ছে? শুনতে শুনতে নিশ্চয়ই হচ্ছেনা। তাহলে একদম শেষে মতামত দেব।
  • Anamitra Roy | 125.187.48.109 (*) | ০১ মার্চ ২০১৮ ০৯:৪১64300
  • না, শুনতে শুনতে হচ্ছে না। গুরুতে পোস্টানোর কয়েকদিন আগে ডায়রিতে লেখা হচ্ছে। তারপর সুযোগ বুঝে পোস্টিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখানে দেওয়া শুরু করার হপ্তাতিনেক আগে লেখা শুরু করেছিলাম। আপাতত লিডটা দিনদুয়েকে এসে দাঁড়িয়েছে।

    তুমি কি বললে বলতো? শুনতে শুনতে লেখা হলে শেষে মতামত দেবে? নাকি উল্টোটা হলে? :-/
  • রিভু | 117.0.228.218 (*) | ০১ মার্চ ২০১৮ ১০:৪০64301
  • এটা বেশ হচ্চে।
  • Ishan | 202.189.128.15 (*) | ০১ মার্চ ২০১৮ ১০:৪০64302
  • উল্টোটা হলে।
  • Anamitra Roy | 125.187.48.109 (*) | ০১ মার্চ ২০১৮ ১১:১৩64303
  • যাই বলতাম তুমি উল্টোটাই বলতে... এ আমার আগেই জানা ছিল :/
  • শিবাংশু | 55.249.72.20 (*) | ০২ মার্চ ২০১৮ ০৯:১৭64304
  • অপেক্ষা করছি...
  • Anamitra Roy | 126.206.223.129 (*) | ০৩ মার্চ ২০১৮ ০৩:২৮64305
  • আপাতত শেষ। দ্বিতীয় পর্ব কিছুদিন বাদে শুরু করবো।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত