• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ম্যাজিকের বাক্স | এসব হয়না - ৭

    Anamitra Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২২ আগস্ট ২০২০ | ৪৫৩ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • | | | | | | ৭ |
    স্রোতস্বিনী একটা ম্যাজিক পুষেছিল। কিন্তু ম্যাজিকটার স্বভাব ভালো ছিল না। একথা অবশ্য খুব একটা নতুন কিছু নয়। কবেই বা কোন ম্যাজিকের স্বভাব ভালো হয়েছে? ম্যাজিক মানে সে তো ছড়িয়ে পড়তে চাইবেই চরাচর জুড়ে। তার কি আর ঘরের কোণে পড়ে থাকা পোষায়? ঘরেই যদি থাকবে তাহলে দশজন জানবে কীকরে যে এইখানে একটা ম্যাজিক থাকে? ম্যাজিকেরই তো দায় নিজের কাছে বারবার প্রমাণ করে যাওয়া যে সে আসলেই একজন ম্যাজিক! নাহলে আর দশটা আসবাবের সঙ্গে তার পার্থক্য কী রইলো!

    কিন্তু তত্ত্বকথা থাক। স্রোতস্বিনী ম্যাজিকটাকে একদম তার নিজের করে রাখতে চেয়েছিল। বুকের ঠিক মাঝখানে জমে থাকা একবিন্দু টলটলে ঘামের মতো ব্যক্তিগত; এমনকী তার প্রেমিকের কাছে যাওয়ার সময়ও যেটা স্রোতস্বিনী মুছে রুমালে তুলে রাখাই শ্রেয় মনে করতো। তাই সে ম্যাজিকটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিলো তার খাটের পায়ার সাথে। দোষ তার নয়। ম্যাজিকটাই চলে যেতে চাইতো যে হঠাৎ হঠাৎ! যখন তখন যার তার সাথে চলে যেতে চাইতো সে নিজের খেয়ালে। সে তো ম্যাজিক! তার কিসের দায় কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে থাকার? তাকে তো আর বস্তুর মতো করে ভাবতে পারো না তুমি। তোমার টেবিলে একটা ফুলদানি রয়েছে মানে সেই ফুলদানিটাই তোমার প্রতিবেশীর টেবিলে থাকতে পারে না বটে, কিন্তু ম্যাজিকদের ক্ষেত্রে অমনটা হয় না। ম্যাজিকেরা একই সাথে অনেক জায়গায় থাকতে পারে। যখন তুমি টুপির ভেতর থেকে খরগোশ বের করে আনছো বন্ধুর জন্মদিনে, তুমি বলতে পারো না যে, সেখান থেকে তিনশো ক্রোশ দূরে অন্য কারও হাতের তালুতে শূন্যের মধ্যে একটা পায়রা জন্ম নিচ্ছে না। ম্যাজিক ব্যাপারটাই অনিশ্চিত। এতটাই।

    স্রোতস্বিনী নিশ্চিত হতে চেয়েছিল। সে চেয়েছিল তার ম্যাজিকটা সারাজীবন তারই থাক। তার জন্য চেষ্টার কসুর সে করেনি কখনও। রোজ বিকেলে সে ঘন্টাখানেকের জন্য ম্যাজিকটাকে একা ছেড়ে দিত শুরুতে। যাতে ম্যাজিকটা নিজের মতো ঘুরেফিরে একটু শ্বাস নিয়ে আসতে পারে। তার বিশ্বাস ছিল তার ম্যাজিক যখন তার কাছেই ফিরে আসবে নিশ্চয়ই। কিন্তু ম্যাজিকটা একদিন ফিরলো না। বাধ্য হয়ে স্রোতস্বিনী তখন তাকে খুঁজতে বেরোলো। পাক্কা দেড়দিন পর দেখা গেলো সেখান থেকে তিনটে পাড়া পেরিয়ে একটা হলুদ বাড়ির দোতলায় একজন বয়স্ক মহিলার কোলে শুয়ে ম্যাজিকটা তখন চাঁদের বুড়ির গল্প শুনছে। মহিলাটি অবশ্য বেশ ভালো। স্রোতস্বিনী একবার গিয়ে বলতেই তিনি ম্যাজিকটা সাথেসাথে ফেরৎ দিয়ে দিলেন। বাড়ি ফেরার সময় তারা কেউ কারও সাথে একটাও কথা বলেনি সেদিন। স্রোতস্বিনী শুধু একবার বলেছিল, "তোর কোলে উঠতে ইচ্ছা করে তুই তো আগে বললেই পারতিস!"

    এই ঘটনার পর থেকেই ম্যাজিকটাকে বেঁধে রাখা শুরু করে সে। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। যদিও ম্যাজিকটাকে যে সারাদিনই বেঁধে রাখা হতো এরকমটা মোটেও নয়। রোজ বিকেলে হাঁটতে নিয়ে যাওয়া হতো তাকে। মাঝেমধ্যে স্নান করিয়ে গা-মাথা আচঁড়ে দেওয়াও হতো, তবু তার হয়তো কোনও কারণে দমবন্ধ লেগে থাকবে। সে আবারও পালিয়ে গেলো একদিন দড়ি ছিঁড়ে। এরপর আর ঝুঁকি নিতে চায়নি স্রোতস্বিনী। সে ম্যাজিকটাকে একটা আংটির বাক্সে পুরে আলমারির লকারের ভিতর তুলে রাখে। রোজ একবার করে উঁকি দিত সে বাক্সের ডালা খুলে, আর সপ্তাহে একদিন বাক্স থেকে বের করে খাটের ওপর ছেড়ে দিত ঘন্টাখানেকের জন্য। কিন্তু বিছানা থেকে নিচে নামতে দিতো না মোটেই। সে ঠকে শিখেছে। কে জানে, আবার যদি পালিয়ে যায়! ওইটুকু সময় ম্যাজিকটা লাফালাফি করতো খুব। গায়ে উঠতো, কাঁধ থেকে ঝাঁপ দিতো খাটে, ডিগবাজি খেতো, আরও কত কী!

    এসব বছর ছয়েক আগের কথা। তারপর ম্যাজিকটা একদিন মরে গেলো।

    শেষদিকে সে আর আগের মতো ছিল না। তখন তাকে খাটে ছেড়ে দিলে সে একজায়গাতেই বসে থাকতো। আর লাফাতো না। পাত্রে রেখে দিলে পাত্রের আকারটাই ধারণ করে নিতো জলের মতো। হয়তো সে বুঝে গিয়েছিল বাকি জীবনটা তার বাক্সের মধ্যেই কাটবে। আর স্বাধীনতা বলতে সপ্তাহে একবার ঘন্টাখানেকের জন্য বিছানায় লাফাবার অনুমতি। তার গায়ের নীল আলোটা ক্ষীণ হয়ে আসছিলো ক্রমশ। স্রোতস্বিনী অবশ্য এসব দেখতে পায়নি। সে খুশি ছিল যে ম্যাজিকটা তাকে ছেড়ে আর অন্য কোথাও যাচ্ছে না। সে কোলে শুইয়ে ম্যাজিকটাকে গল্প বলতো তাই। রাক্ষসীর গল্প, রাণীর গল্প, ব্যাঙ রাজপুত্তুরের গল্প, আর ম্যাজিকটা তার চোখের দিকে চেয়ে থাকতো ফ্যালফ্যাল করে। স্রোতস্বিনীর বড় ভালো লাগতো ওই তাকিয়ে থাকাটুকু। তার মনে হতো এতদিনে অবশেষে তাহলে ম্যাজিকটা তার নিজের হয়েছে। এক্কেবারে নিজের। ম্যাজিকের মৃত্যুটা তাই সে মেনে নিতে পারেনি। এখন, একটা ঘটনা ঘটলে যেরকম হয়, দশজন দশরকম মতামত রাখে, এখানেও ব্যাপারটা সেরকমই। কেউ বলছে, বাক্সের গায়ে ফুটো রাখা উচিত ছিল যাতে ম্যাজিকটা হাওয়া-বাতাস পায়। কেউ বলছে, জল খাওয়াতে হতো নিয়মিত দিনে দু'বার। তো কেউ বলছে, আসলে লকারের ভেতরের অন্ধকারটাই ওর কাল হলো; আহা রে অমন সুস্থসবল ম্যাজিক। শুধু স্রোতস্বিনী কিছু বলছে না। আজ তিনদিন হলো ম্যাজিকটা মারা গেছে। স্রোতস্বিনী কোলে নিয়ে বসে আছে ম্যাজিকটাকে। পাশে পড়ে রয়েছে তার ফাঁকা আংটির বাক্স।

    স্রোতস্বিনী ভাবছে, তার ম্যাজিকটা একদিন ম্যাজিক করে বেঁচে উঠবে। কী গল্প বলা যায় তাকে তখন?
    | | | | | | ৭ |
  • বিভাগ : ব্লগ | ২২ আগস্ট ২০২০ | ৪৫৩ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ২৩ আগস্ট ২০২০ ০৫:৪০96556
  • এই ধারাবাহিকটি বিচ্ছিন্নভাবে পড়ছি। তাতে একেকটি পর্বের গল্প ধরতে তেমন  অসুবিধা হচ্ছে না। 

    স্রোতস্বিনীর ম্যাজিকটি যেন ম্যাজিক রিয়েলিটি   

  • Anamitra Roy | ২৩ আগস্ট ২০২০ ২৩:২১96584
  • বিপ্লব দা, এগুলো আলাদা আলাদা লেখাই... যেভাবে খুশি পড়া যেতে পারে।
  • বিপ্লব রহমান | ২৫ আগস্ট ২০২০ ১১:০১96640
  • আরো লেখ ভাই।  তোমার লেখার ক্ষমতা আছে। 

    #

    করোনা শহীদ না হলে নিশ্চয়ই কলকাতা বইমেলা আবারও আসবো, দেখা হবে              

  • Anamitra Roy | ২৬ আগস্ট ২০২০ ১০:৩৫96667
  • <3
    আমাদের ধারে কাছে এলে করোনা-ই শহীদ হয়ে যাবে :-D
  • Shashwata Ganguly | ২৮ আগস্ট ২০২০ ০২:১৯96712
  • বাহ সুন্দর

  • kk | 97.91.195.43 | ২৮ আগস্ট ২০২০ ২৩:৩৫96729
  • খুব ভালো লাগলো লেখাটা।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন