• হরিদাস পাল  ব্লগ

    Share
  • চাঁদের দেবতা | এসব হয়না – ৩

    Anamitra Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৮ জুলাই ২০২০ | ৩৪২ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • | | ৩ | | | | |
    এক দেশে এক গ্রাম ছিল জঙ্গলের ধারে। সেই গ্রামে খুব চাঁদ উঠতো। 'খুব চাঁদ' মানে, তেমন চাঁদ আর কোথাও ওঠে না বড় একটা। সেই গ্রামে অমাবস্যা বলে কিছু ছিল না। কেউ কখনও শুনেছে এমনও? সারা পৃথিবীতে আকাশ যখন কালো এই একটা গ্রামের ওপর জেগে থাকতো চাঁদ। যেন চাঁদের গা থেকে একটা কালো চাদর নেমে এসে মুড়ে রেখেছে গ্রামখানা। গ্রামের বাইরে পা রাখলেই চাঁদ অদৃশ্য হয়ে যাবে।

    সত্যি বলতে সেই গ্রামের বাইরে বেরোলে বেশ কিছুদূর অবধি আকাশ দেখাই যেত না। এমন ঘন ছিল সেই জঙ্গল। তারপর গাছেদের মাথার ভীড় হালকা হয়ে এলে যখন আকাশে তাকাতো কেউ, চাঁদ আর থাকতো না সেখানে। মানে, এসব অমাবস্যার রাতের কথা বলছি। অন্যান্য রাত্রে সারা দুনিয়া যখন দেখছে একফালি, দু'ফালি কিংবা দশফালি, এই গ্রামের আকাশে জ্বলজ্বল করতো গোটা একটা চাঁদ। গ্রামটির নাম ছিল তাই 'চিরপূর্ণিমার গ্রাম', অথবা 'চাঁদের গ্রাম'; অথবা আসলে নামটা এরকম ছিল না।

    নামটা ছিল একটা মাত্র শব্দে, যার মানে করতে গেলে এরকম একটা মানে দাঁড়াতো। কিন্তু সেই ভাষা জানতো যারা তাদের কেউ আজ আর বেঁচে নেই। ফলে শব্দটা ঠিক কি ছিল আজ আর জেনে উঠতে পারা যাবে না। গ্রামের বাইরে ছিল শুধু জঙ্গল জঙ্গল আর জঙ্গল। যতদূর চোখ যায় আর যতদূর মানুষ যেতে পারে। মানুষের তো স্বভাব হেঁটে দেখা কতদূর যাওয়া যায়। তা, সেরকম মানুষ সব সময়েই থাকে। যারা ছিল সেরকম সেদিন, তারা যদি কেউ সেই জঙ্গলের শেষ দেখেও থাকে, গ্রামে আর ফেরেনিকো তারা। ফলে বলা মুশকিল জঙ্গলের ওপাশে আদৌ কিছু ছিল কিনা! পৃথিবীটা তো আর আজকের মতো ছিল না তখন যে জেনে ফেলতে চাইলেই জেনে ফেলা যাবে। মানুষ ছিল, আর একটা পৃথিবী ছিল। আর ছিল একটা পৃথিবীতে যা যা থাকে। আজকে বসে সেই পৃথিবীর কথা ভেবে উঠতে পারাও কঠিন। তবে এই গল্পটা তাদের নয় যারা গ্রামে ফিরে আসেনি। যারা ফেরে না তাদের একটা সময়ের পর সবাই ভুলেই যায়। তাই না? শুধু লোককথার মতো মনে থেকে যায় যে কেউ একজন যেন কোনও একদিন হারিয়ে গিয়েছিলো। বিস্মৃতিরও স্মৃতি হয় যেমন।

    এই চাঁদের গ্রামে থাকতো একজন কবি। এখন 'কবি' মানে কী জিজ্ঞেস করলে ভারী মুশকিল হবে। কারণ এই কথার কোনও উত্তর হয় না। কবি মানে কি যে ছড়া কেটে কেটে ছন্দে কথা বলে? কবি মানে কি যার গোলগোল চোখ? --- মানেটা বরং গল্পটা পড়তে পড়তে বুঝে নেওয়াই ভালো। আর তাছাড়া শব্দটাও তো 'কবি' ছিল না সত্যিই। শব্দটা যা ছিল আর তার যা মানে, সেইটা আমাদের ভাষায় বলে উঠতে চাইলে 'কবি' শব্দটাই তার কাছাকাছি যেতে পারে। অথবা তাকে 'চন্দ্রগ্রস্ত'-ও বলা যায়। কিন্তু দুটি শব্দের রেখে যাওয়া ভাবদুটির তুল্যমূল্য বিচার করলে তাকে 'কবি' বলাই শ্রেয় বলে মনে হয়। অথবা নাও হতে পারে, সে তো গল্পটা পড়লেই বোঝা যাবে। গল্পটা ততটাও বড় নয়। এই কবি একদিন চাঁদকে চিঠি লিখেছিলো। আর চাঁদ লিখেছিলো সেই চিঠির উত্তর।

    ব্যাস! এটুকুই।

    আসলে কবির কিছু অলৌকিক শক্তি ছিল বলা যেতে পারে। যদিও জঙ্গলের ওপার থেকে কেউ কখনও ফিরে আসেনি কোনওদিন, আর যদিও জানা যায় না জঙ্গলের আদৌ কোনও ওপার ছিল কিনা, কবি যেন কিভাবে জেনে ফেলেছিলো স্বাভাবিক পৃথিবীর কথা। যেখানে পূর্ণিমার চাঁদ ছোট হতে হতে একদিন অমাবস্যা হয়, আবার অমাবস্যার চাঁদ ক্রমশ বড় হতে হতে ফিরে আসে পূর্ণিমার রাত। কবি তাই চাঁদকে লিখেছিলো, "আমার এমন ভরাচাঁদ, আমাদের গ্রামের প্রতি তোমার যে এমন পক্ষপাতিত্ব সে যে কেবল আমারই জন্য আমি কিন্তু তা বুঝি। আমি শুধু তোমারে বলতে চাই, এমনটাই থেকো। বদলে যেও না।"

    কবি যে এইসব লিখলো সেটা মনে হয় ততটাও দোষের না। কিন্তু কবি যে একদিন চাঁদকে পাঠিয়ে ফেললো সেই চিঠি সেটাই হয়তো দোষের হয়ে থাকবে। কোথায় সে চাঁদ চিরন্তন আর কোথায় সে দু'দিনের কবি! চাঁদ তাই জবাবে লিখেছিলো, "শোনো হে কবি, নিজেকে এত গুরুত্ব দিয়ে ফেলো না। আমি উঠি বা না উঠি সেটা আমার বিষয়। তুমিও আটকা পড়ে আছো পৃথিবীতে আর আমিও আটকা পড়ে আছি। আমরা যার যার নিজের মতো করে সহ্য করে নেওয়ার উপায় খুঁজছি মাত্র। এর বেশি কিছু তুমি ভেবে থাকলে সে তোমার কল্পনা এবং তার দায় নিতে আমি রাজি নই।"

    এমন চিঠির কথা কি আর চাপা থাকে কখনও? ধীরে ধীরে এই গল্প গোটা গ্রামে চাউর হয়ে যায়। প্রথমে শোনা যায় চাঁদ নাকি কবিকে চিঠি লিখেছে। তারপর জানা যায়, না, প্রথম চিঠিটা আসলে কবিই লিখেছিলো। কি হয়েছিল না হয়েছিল এইসব আলোচনা চলছে যখন হঠাৎ কারও খেয়াল হয় কবিকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সত্যিই সেদিনের পর সেই গ্রামে আর কবিকে কেউ দেখেনি কোনওদিন। কবি কোথায় গিয়েছিলো কেউ জানে না। সত্যি বলতে এসব গল্প আদৌ সত্যি কিনা তাই বা কে জানে! চাঁদ কি আর চিঠি লিখতে পারে সত্যিই?

    আসলে এক দেশে এক গ্রামে রয়েছে এক 'চাঁদের দেবতা'-র মন্দির। মন্দিরের ভিতরে রয়েছে একটি নেকড়ের বিগ্রহ। নেকড়েটি আকাশের দিকে মুখ করে ডাকছে যেন দু'পায়ে দাঁড়িয়ে। সেই গ্রামের বুড়ো লোকেরা এইসব গল্প বলে। এক লেখক এসেছিলো সেখানে ঘুরতে একবার। শহুরে লেখক, তার গলায় ঝুলছিলো একটা ইয়াব্বড় লেন্স আর একটা ডিজিট্যাল ক্যামেরা। সে ব্যাটা সেই ক্যামেরা দিয়ে নেকড়ের মূর্তিটার ছবি তুলে ছবিসমেত এইসব গল্প তার ব্লগে লিখে দিয়েছে।

    শোনা যায় লেখকটির পসার বেশ ভালোই!
    | | ৩ | | | | |
  • বিভাগ : ব্লগ | ২৮ জুলাই ২০২০ | ৩৪২ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ফরিদা | 182.64.79.150 | ২৮ জুলাই ২০২০ ২০:৫৭95639
  • জিও গল্প।

    গাছ কি দেখতে পায়? যেভাবে মানুষ দেখে গাছ, গাছের ফাঁকে চাঁদ বা কোন ফল পাকা তার অথবা কেটে ফেললে সব দিয়ে থুয়ে কতটা আমদানি?

    চাঁদ শুনলাম দেখে, চিঠিও পাঠায় দেখলাম গল্পের মধ্যে কবিকে। আগে জানতাম - সে নাকি অনন্ত কুয়োর জলে পড়ে গয় কবিকে মাতাল ও কাঙাল করেছিল।

    আমরা কি দেখতে পাই বলে এত কম দেখি। এত কম জানি?

    কাকে আলো বলে, কাকে অন্ধকার - কে জানে!
  • Anamitra Roy | 202.8.116.233 | ০১ আগস্ট ২০২০ ২২:০২95813
  • যাহা আলো তাহাই অন্ধত্ব। নাহলে আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে যেত কেমনে?

  • aranya | 2601:84:4600:9ea0:55f1:8c00:b9d1:106b | ০২ আগস্ট ২০২০ ০৩:৫৮95822
  • বেশ লেখা
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত