• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ফুলবিলাসীর সংশয় এবং...

    অনিকেত পথিক লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০২ ডিসেম্বর ২০১৬ | ৪২৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • দেখতে দেখতে ডিসেম্বর এসে গেল। শীতকাল আসুক না আসুক, নতুন ৫০০ নোট বাজারে মিলুক না মিলুক, এ টি এম-এ টাকা থাকুক না থাকুক, মরসুমী ফুলের চারা বসানোর সময় এসে গেছে। আর ওইখানে দেরী নট অ্যালাওড ! কুচি কুচি টবে কিম্বা কাগজ মুড়ে ছোট ছোট বান্ডিলে চারা নিয়ে রাস্তার ধারে, দোকানের রোয়াকে যেখানে সেখানে চাটাই পেতে বসে পড়তে দেখা যাচ্ছে চারা ব্যাপারীদের। ফুলবিলাসীর এখন টেনশনের শেষ নেই। এই যে বর্ষা পেরিয়ে পুজোটাও যেতে না যেতেই চন্দ্রমল্লিকায় কুঁড়ি এসে যায় হৈ হৈ করে, এ ভারী জ্বালাতন। একবার কুঁড়ি এসে গেলে গাছগুলোর আর কিছু করা যায় না। তবে দোষ আপনারও কম নয়, বর্ষার শেষের দিকে যখন এই চারা গুলো লকলকিয়ে বেড়ে উঠেছিল তখনই তো তাদের আগাটি কুচ করে কেটে ফেলা উচিৎ ছিল যাতে সঠিক সময়ে সঠিক আকৃতির চারা পান। আর পুরোনো চারা কাটাকুটি করে নতুন গাছ তখনই তৈরী করে নেওয়া দরকার ছিল কিন্তু তখন সেসব কিছুই করেননি। চন্দ্রমল্লিকার ডাল কেটে নতুন চারা বসিয়েছেন কিন্তু পুরনো গোড়াটি কি দোষ করেছে ভেবে মায়া বশতঃ তাকেও ত্যাগ করেননি, এখন আর দুঃখ করে কি হবে ! সেই লতিয়ে যাওয়া ডালই টেনেটুনে বেঁধে গোড়া খুঁড়ে সারটার দিয়ে এখন স্রেফ অপেক্ষা। নাহ এই ডিসেম্বরের শুরুতেও কোনো হিন্ট নেই কবে কোন কুঁড়ি ফুটে কি রঙের ছানা থুড়ি ফুল বেরোয়। কিন্তু কালো কালো পোকার আমদানী হয়ে গেছে ডগায়। এদিকে পিটুনিয়া, ক্যালেন্ডুলা, প্যাঞ্জি, কসমস শুধু বসেই যায়নি দাঁড়িয়েও গেছে, বাড়ছে তরতর করে। কিন্তু গোল গোল পদ্মপাতার মত যে নস্টাশিয়াম, তিনি এখনও দেখা দেন নি। অ্যাস্টরের চারা বসে গেছে কিন্তু এখনও আই-সি-ইউ দশা কাটেনি। রাতে শিশির থেরাপি আর দিনের বেলায় ছায়া থেরাপি চলছে। এই পর্ব কাটিয়ে কবে যে ওরা পাতা মেলবে, আদৌ মেলতে পারবে ক’জন তাও এখন বলা যাচ্ছে না।

    নভেম্বরের মাঝামাঝি এই কুচি কুচি চারা রোপণ করার পর ভারী মজার (ঝামেলারও) একটা ব্যাপার হয়। চারা লাগানো টবগুলো দোতলা থেকে দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবেন না যে ওতে আদৌ সবুজ কিছু আছে, যেন শুধু মাটি। বিশ্বাস হবে না, আবার নীচে নেমে দেখে আসতে হবে, আছে তো ! জল দিতে গেলেন তো কেত্‌রে পড়ে মাটির সঙ্গে মিশেই গেল, তখন তাকে আবার কাঠি দিয়ে ঠেলে তোলা। তারপর আপনার পরিবেশের যাবতীয় পক্ষীকূল, চড়াই, শালিখ, টুনটুনি কখন যে এসে টুক করে আপনার পিটুনিয়ার কচি ডগাটি কি ডায়ান্থসের পাতাগুলো কেটে সাফ করে রেখে যাবে টেরটি পাবেন না। এসব এড়াতে কচি চারা ঘিরে কাঠির বেড়া দেবেন, দিন কিন্তু গাছটা একটু বড় হলে সময় মত বেড়াটা সরিয়ে নিতে হবে না হলে গাছে বাড় ভালো হবে না !

    এভাবেই চলুক এই মাসটা, নজরদারিতে। বছরের শেষে কিছু না কিছু হাতে আসবেই নিশ্চিত। নজরদারি মানে কিন্তু অনেকের কাছে ঘন্টায় ঘন্টায় (মিনিটে মিনিটে বললে ঠিক হত) গিয়ে দেখে আসা মাঝখানের কুচি পাতাটি কত ন্যানোমিটার বাড়ল ! মাঝের পাতাটি বাড়ছে মানে চারাটির আই-সি-ইউ থেকে বেরোবার চান্স আছে। কিন্তু এহ বাহ্য। ফুলবিলাসীর জীবনে কিছু সংশয় আছে, কঠিনতর। যেমন ঘোর গ্রীষ্মে কি ঘনঘোর বর্ষায় যখন এই আহ্লাদী ফুলেরা ছিল না, আপনার টবের মাটিতে আপনমনেই বেড়ে উঠেছিল গোলাপী সাদা নয়নতারা, একপাটী অপরাজিতা, সবুজের ওপর লাল-সাদা ছিট বাহারী কচুপাতা, অযত্নের পাথরকুচি আর নাম না জানা ছোট্ট ছোট্ট গাছে কুচি কুচি ঘন নীল ফুল। সেদিন বর্ষার জলে সতেজ সবুজ সেই চারাই ছিল আপনার শখের বাগান আপনার মুক্তি তাই আপনিও তাদের বাড়তে দিয়েছেন, ইচ্ছেমত, এমনকি জলও (মানে তোল্লাই) দিয়েছেন কখনও কখনও। আজও তারা অনেকেই আছে তেমনই সুন্দর কিন্তু এই ফুলে ফুলে প্রফুল্ল হওয়ার দিনে যখন টবে টানাটানি পড়ছে তখন টান পড়ছে ওই অযত্নের সবুজের বরাদ্দে। ওদের উৎখাত করে টব খালি না করলে যথেষ্ট মরসুমী ফুল ফোটান যাবে না। কিন্তু ওদের গোড়ায় কোপ মারতে গিয়ে আমি জানি হে প্রেমিক, আপনার ভুরুতে খাঁজ মনে গভীর সংশয়। এই গাছগুলোর দোষ কোথায় ? ওরা তো ওদের কাজ করেছে, পাতা দিয়ে রঙ দিয়ে ফুল দিয়েও ভরে রেখেছে আপনার বেরঙিন ঋতু। আর আপনিও যদি বিলাসী না হয়ে প্রেমিক হয়ে থাকেন আপনার কাছে তো গাছে গাছে এমন তফাত হবার কথা নয় যাতে একজনকে জায়গা দিতে আর একজনকে উৎখাত হতে হয় (প্রাণ দিতে হয়-টয় বল্লাম না, কেমন সৈনিক সৈনিক শোনায় !)। তাহলে ?

    তাহলে এই হল যে শেষ অবধি টব খালি করার বাসনা ত্যাগ করে আপনি আবার চল্লেন বাজারে, চারা, সার ইত্যাদির সঙ্গে দু-চারটি টবও এল বাড়িতে, পরের দিন সকালে হাঁটতে বেরোবার সময় লুকিয়ে লুকিয়ে ঝোলায় নিলেন দুটো পলিথিন ব্যাগ, একটা খুরপি, মাঠে-ঘাটে কোথাও মাটি কাটা দেখলে যাতে চুপচাপ ভরে নেওয়া যায়। ফিরে আসার পর যতই লুকিয়ে রাখুন শত্রুপক্ষের চোখে ঠিক পড়ে গেল আবার কিছু গুলিবর্ষণ, সেসবে কান না দেওয়ার ট্রেনিং তো আপনার আছেই। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন আর নয়, টবের সংখ্যা আর কিছুতেই বাড়াবেন না ইত্যাদি। কিন্তু সে সব তো পরের বছরের কথা আপাততঃ আসুন মাটিটা ঠিকঠাক করে সার মিশিয়ে নতুন টবগুলোয় ভরে ফেলি, তারপর চারাগুলো, ছায়ায় রেখে দিই, রাতে শিশির...চলুক।

    পাশাপাশি জেনে নিন, কবিও আপনার এই সংশয় নিয়ে কি বলিয়াছেন।

    # ফুল ফুটুক না ফুটুক আমি বারান্দার টবগুলোয় জল দিয়ে চলি
    মাটি খুঁড়ে দিই সময়মতো সার আর মাপমত ভালোবাসা মিশিয়ে দিই মাটিতে
    যাতে ফুল ফুটুক না ফুটুক গাছের কোনো অভিমান না থাকে
    আমার পরিপাটি আদর বিন্দু বিন্দু জলকণা পৌঁছে যায় দেখতে না পাওয়া শেকড়ের কাছে
    অব্যর্থ
    অদৃশ্য সমঝোতা বেড়ে চলে সমান্তরালে
    ফুল কিম্বা পাতা নয় গোটাগুটি গাছটার সঙ্গে

    কিন্তু মাটি কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্ত তার অঙ্গীকার কার কাছে--
    আমি গাছগুলোর গোড়ায় জল দিয়ে চলি মাটি খুঁড়ে দিই সার মেশাই আর ভালবাসাও পরিমাণমত
    শুধু গাছ আর আগাছায় এখন আর তফাৎ করতে পারি না ।।
  • বিভাগ : ব্লগ | ০২ ডিসেম্বর ২০১৬ | ৪২৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • sch | 55.251.235.196 (*) | ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬ ০৪:০৬58782
  • খুব ভালো লাগল। বিশেষ বিশেষ গাছের জন্য মাটি তৈরীর কিছু টিপস পেলে ভালো লাগত।
    " আপনার কাছে তো গাছে গাছে এমন তফাত হবার কথা নয় যাতে একজনকে জায়গা দিতে আর একজনকে উৎখাত হতে হয় " - একদম
  • Ela | 12.120.101.150 (*) | ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬ ০৯:১৭58783
  • আহা বড্ড মনের মত লেখা!
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু প্রতিক্রিয়া দিন