• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • হারানো-প্রাপ্তি

    অনিকেত পথিক লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১০ আগস্ট ২০১৬ | ৬৬১ বার পঠিত
  • মুখবন্ধ

    হারিয়ে যাওয়া মানে তো আসলে একরকমের শেষ হয়ে যাওয়া। একটা জিনিসের সঙ্গে, একটা মানুষের সঙ্গে, একটা জীবনের সঙ্গে আমাদের চলাটা ফুরিয়ে যাওয়া। দেখতে গেলে আদি-অন্তহীন এক ফুরিয়ে যাওয়ার মধ্যেই আমরা বাঁচি, প্রতি মুহুর্তই অনবরত ফুরিয়ে যায়, কোনো মুহুর্তই তার আগের-পরের মুহুর্তের মত নয়। কিন্তু যে ফুরোনো হঠাৎ আসে, খবর না দিয়ে আসে, অসময়ে আসে, তাকেই আমরা হারিয়ে যাওয়া বলি। ব্যাগ খুলে দেখি খাপটা পড়ে আছে, কলমটা নেই, সকালে বেরোবার আগে দেখি একপায়ের মোজা নেই, দিনের শেষে কানে হাত দিয়ে দেখি একটা দুল নেই। আধখানা গল্প না-পড়া হয়ে হারিয়ে যায়, আধখানা কবিতা লেখা কাগজ ঝড়ে উড়ে যায়। সেগুলো খুব প্রিয় জিনিস নাও হতে পারে কিন্তু তাদের নিয়ে নিয়ে আমরা বেশি ভাবি, বেশি কষ্ট পাই। তা্দের খুঁজে চলি আনাচে কানাচে। তাদের জুড়িটাকে ফেলতে পারি না, যেন আশা করে থাকি সে কখনও ফিরে আসবে। কিছু জিনিস আবার আশ্চর্য ভাবে ফিরেও আসে। জীবনের পর জীবন জুড়ে সেই সব হারানো-প্রাপ্তির গল্প ছড়িয়ে থাকে, কিছু নিরুদ্দেশের কথাও থাকে, যেখান থেকে অন্য একরকমের হারানো বা ফুরোনো শুরু হয়।
    বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোটবেলাটা হারিয়ে যায় একথা সবাই মানবেন কিন্তু ঠিক কোন দিন বা কোন মুহুর্ত থেকে ছোটবেলা শেষ হয়ে মানুষ বড় হয়ে ওঠে কেউ তা ঠিকঠাক বলতে পারে না। সবাই জানে বড় হওয়া একটা ধারাবাহিক পদ্ধতি যেটা আসলে নানারকম অনুভূতি দিয়ে তৈরী। একটা অনুভূতির নাম যদি হয় লজ্জা তো আরেকটার নাম অভিমান। ঈর্ষা। অধিকারবোধ। মোটের ওপর সোজাসাপ্টা ব্যাপারগুলোর সঙ্গে কিছুটা গোপনীয়তা কিছুটা প্রকাশের ইচ্ছে, নানারকমের রঙের পোঁচ একের পর এক পড়তে থাকে শিশুবেলার সবুজ ক্যানভাসে, কার কোন রঙ বেশি বা কম পড়বে তার কোনও ফর্মূলা নেই। সেইসব নিয়ে গড়ে উঠতে উঠতে একদিন খেয়াল হয় আমরা বড় হয়ে গেছি। আর সেই বড়বেলায় রোজ রোজ নিজেকে ঘসামাজা করতে করতে, কাটাকুটি ও সংশোধন করতে করতে, বদলাতে বদলাতে, একদিন খেয়াল হয় সেইসব রঙ গুলো তো আর নেই। সেসব রঙ কি হারিয়ে গেল না ফুরিয়ে গেল ? একটি বিচ্ছেদ কে স্বীকার করে নিতে পারেনি বলে যে তরুণ সেই নামের আগে চন্দ্রবিন্দুটুকুও বসায়নি কোনওদিন, সেই মানুষই কোন এক তর্পণ মুহুর্তে লিখে ফেলে সেই বিচ্ছেদ নিয়ে তার অনুভূতির কথা। আর কবিতায় সব ব্যক্তিগত কথা সবাই বুঝে ফেলে বলে যে কিশোরী অল্পবয়সে কবিতা ছাপাতেই চায়নি কোনওদিন, প্রৌঢ়ত্বের কাছাকাছি পৌঁছে সেও নিজের হারানো-প্রাপ্তির কথা লিখতে বসে।

    ১। ছোটবেলার বই, কবিতার প্রথম লাইন, গোটা একটা গান, যার শুধু শেষ লাইন মনে আছে

    সে ছিল এক দিন আমাদের শৈশবে ‘কিশলয়’। আমাদের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীর বাঙলার পাঠ্য বই যার প্রথম, দ্বিতীয় আর তৃতীয় ভাগ জুড়ে ছড়ায়-গল্পে-কবিতায় ছিল এক জমজমাট আনন্দের আয়োজন। সেই তিন ভাগে এমন সব লেখা ছিল যা পরে আর কখনও খুঁজে পাই নি। সেটা জীবনের এক আশ্চর্য সম্পদ হারিয়ে ফেলা।
    তিনটে বইতেই অনেকটা জুড়ে রবীন্দ্রনাথ, আরো অন্য অনেক লম্বা-চওড়া রথী-মহারথী মিলে জমিয়ে বসেছিলেন আমাদের বাঙলা শেখাবেন বলে। যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘প্রার্থনা’ কবিতাটা দিয়ে প্রথম বইটা শুরু, তারপর সুখলতা রাও, কচ্ছপ আর হাঁসের গল্প। রবীন্দ্রনাথ। ছায়ার ঘোমটা মুখে টানি থেকে ফাল্গুন, মেলার মজা থেকে দাঁড় ও পালের ঝগড়া, মেঘলা দিনে মায়ের কাছে বসে রাজপুত্রের গল্প শোনা থেকে ইচ্ছামতি নদী হবার ইচ্ছে কিম্বা একদিনের জন্য নৌকো নিয়ে অনেক দুরে চলে যাবার স্বপ্ন, মাঝে হঠা্ত একা একা হারিয়ে যাওয়ার গা ছমছমে কাহিনী জুড়ে জুড়ে তৈরী হয়েছিল আমাদের শৈশবের রবীন্দ্রনাথের ছবি।
    কবিতায় ছিলেন সুকুমার রায়, সুনির্মল বসু, সত্যেন দত্ত, অশোকবিজয় রাহা, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, নজরুল ইসলাম। সেই প্রথম জানা যে বাবা দুরে চাকরী করেন, ইচ্ছে মত আসতে পারেন না ছুটি নেই বলে, তাঁকে ‘হাত-পা-বাঁধা’ বাবা বলে। তিনি পাখি হতে চান, শ্রাবণের মেঘের মত উড়ে যেতে চান, বৃষ্টির মত গলে পড়তে চান সন্তানের কাছে। আশ্চর্য মন কেমন। কিম্বা পুজোর ছুটিতে কোথাও যেতে হবে না দরজা খুলে দাঁড়ালেই যে আশ্চর্য অনেক কিছু দেখা যাবে কিম্বা শুধু দুবেলা চা খেয়েই যে রামসুক তেওয়ারীর গেঞ্জিগুলো পাঞ্জাবী হয়ে গেছিল সেসব ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ খবর আমরা জেনেছিলাম স্রেফ ইস্কুলের বাঙলা বই পড়ে। ভুতের ছানাদের কাজকম্ম, দেশ-বিদেশের নানা আশ্চর্য বিষয়, জাতকের গল্প সেরিবান ও সেরিবার আশ্চর্য কৌটো, রবীন্দ্রনাথের বাবার কাছ থেকে পুরস্কার পাওয়ার কথা আরো কত কি ! শুধু গল্প-কবিতা নয়, আমাদের সেইসব বাঙলা বইতে ছোট আকারের সরস প্রবন্ধও অনেকগুলোই ছিল। নারায়ণচন্দ্র চন্দ, প্রমথ গুপ্ত (ঠিক বল্লাম তো ?) আরও কারা কারা সব মনে নেই। তাতে শিশির-কুয়াশা-মেঘ-বৃষ্টি কি করে হয়, জল কিকরে গরম হয়, জীবজন্তুরা কি ভাবে গা-ঢাকা দেয়, গাছে বীজ কি করে ছড়ায়, এস্কিমোরা কিভাবে বেঁচে থাকে, ইগ্‌লু থেকে মেরুজ্যোতি বা অরোরা বোরিয়ালিস অবধি অনেক কিছুই ছিল। সেগুলোও আমরা গল্পের মত আনন্দ করেই পড়েছিলাম। লুকোচুরি খেলায় সেই রকম গা-ঢাকা দেওয়ার কায়দা দেখাতে চেষ্টা করেছি, শীতের রাত্তিরে লেপের ভেতরে ইগ্‌লু তৈরী করে গুঁড়ি মেরে বসে মেরুজ্যোতির স্বপ্ন দেখেছি, গরমের নিঝুম দুপুরে আমগাছ-লেবুগাছের নীচে খেলা করতে করতে ভেবেছি এই বুঝি ডাইনি বুড়ি পথ আটকাল ! আর একটু বড় হয়ে ওইরকম সহজ ভাষায় ছোট ছোট গদ্য লিখতে শুরু করেছিলাম।
    সাদামাটা সবুজ-কালো, কমলা-কালো কি গোলাপী রঙের ইলাস্ট্রেসনে ভরা আমার সেই তিনভাগ শৈশব হারিয়ে গেছে। যতদুর মনে পরে ১৯৮১-৮২ সাল অবধি ওই বইগুলো পড়ানো হয়েছিল, তারপর নতুন শিক্ষাক্রম চালু হল, নতুন সব বই। সে সব বই কতবার বদলালো, তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সহজ পাঠ এখনও টিঁকে আছে কিন্তু সেই তিনভাগ কিশলয় (তখন ইস্কুলে ফেরত দিয়ে দিতে হত) আর খুঁজে পাই নি। খোঁজ করেছি কলেজস্ট্রীটে, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে, ন্যাশন্যাল লাইব্রেরীতে, কেউ বলতে পারেনি। হয়তো ঠিক ভাবে খুঁজতে পারিনি, কোন প্রেসে সেই বই ছাপা হত জানিনা, জানলে সন্ধান পেতেও পারতাম।
    কে না জানে ছোটবেলায় আকাশ বেশি নীল থাকে, ফুলে বেশি গন্ধ থাকে, ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই ছোটবেলার রূপ-রস-ঘ্রাণ মিশে আছে বলেই হয়ত বইগুলো এমন মিশে আছে অস্তিত্বের সঙ্গে। কবিতাগুলো মনে করার চেষ্টা করি, সঙ্গে কি ছবি ছিল ভাবি খুঁজে বেড়াই ইনটারনেটের লতায় পাতায়। রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলো সবই পাওয়া গেছে রচনাবলীর কল্যাণে কিন্তু যে কবিতার নাম মনে নেই, কবির নামও মনে নেই, এমনকি তার প্রথম লাইনটাও মনে নেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, সেগুলো খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ওই তিনখানা বই এখন প্রায়ই আমার স্বপ্নে হানা দেয়। কি দেখেছিলাম বেশির ভাগই ভুলে যাই শুধু বইগুলোর কথাই মনে থেকে যায়। আর স্বপ্নের তো কোনও দ্বিতীয় দর্শক থাকে না তাই অন্য কাউকে যে দেখিয়ে রাখব তারও উপায় নেই। ভীড় বাসে দাঁড়িয়ে বা হিমেল সকালে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল হয় আমি মনে মনে কিশলয়ের কথা ভাবছি।
    আশা ছাড়িনি এখনও। কারণ কবি বলিয়াছেন ‘তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো প্রভু !’ তেরশ’ সালের শেষভাগে বাচ্চারা প্রাথমিক ইস্কুলে কি পড়ত তার কি কোনো ঐতিহাসিক মূল্য নেই নাকি ! কেউ কি কখনও তা খুঁজে দেখবে না, কোনও গবেষক কি তা নিয়ে খোঁজখবর করবে না ! এমন কি হতে পারে ? আমি বিশ্বাস করি না, তাই ছোট-বড়-মাঝারি যে কোন লোকের সঙ্গে আলাপ হলে কিছুদিন (কি কিছুক্ষণ) পরেই অবধারিত জিজ্ঞেস করি ‘আচ্ছা পুরোনো বইপত্রের খোঁজ রাখে এমন কাউকে চেনো !’
    ***************
    এ তো গেল আস্ত আস্ত বই হারিয়ে ফেলার কথা। কিন্তু সেরেফ একটা লাইন, মানে প্রথম লাইনটা হারিয়ে ফেলার জন্য শিশুকালের একটা ছড়া আমার হাতছাড়া হয়ে গেছিল কতদিনের জন্য। ছোট্টবেলায়, হয়ত সবে ইস্কুলে ভর্তি হয়েছি, কি হইনি, পিসিমণির সেলাই ইস্কুলের রবীন্দ্র জয়ন্তীতে বলার জন্য শেখনো হয়েছিল দুটো কবিতা। সেই শৈশবে প্রায় কিচ্ছু না বুঝে একটু ঘাবড়ে, একটু থেমে সেই যে দুটো কবিতা বলে কিছু আদর কিছু হাততালি নিয়ে এলাম তারপর আর সেই দুজনের সঙ্গে সেভাবে দেখা হয়নি, আর কোথাও বলিনি, কাউকে পাঠ করতে শুনিনি, নিজেও ভাবিনি তাদের কথা। বেশ দু-তিন দশক পরে যখন বেশ ‘আমাদের সময়ে’র কথা ভাববার দিন এসেছে তখন আমার ঝোঁক হল ছোটবেলার ছড়া কবিতা গুছিয়ে তোলার। তখন মন থেকে ডাউনলোড করে দেখা গেল একটি কবিতা ভালোই মনে আছে, তাকে উদ্ধার করা গেল রচনাবলী খুঁজে (রাজা ও রাণী) কিন্তু আর একজনের চেহারাটা প্রায় নিখুঁত মনে থাকলেও মুখটুকু একেবারেই মনে নেই। মানে প্রথম লাইনটুকু বাদে আর প্রায় সবটাই মনে আছে। উল্টোটা হলে কত সহজেই তাকে খুঁজা পাওয়া যেত কিন্তু সে তেমন পরিচিত কবিতাও (আসলে ছড়া) নয় আর তখন ইন্টারনেটে বাঙলা কবিতার লাইন দিয়ে খুঁজে পাওয়া তত সহজও ছিল না। শিশু, শিশু ভোলানাথ ঢুঁড়ে তাকে পাওয়া গেল না। সময়ে-অসময়ে মনে মনে ভাবার চেষ্টা করতাম কি হতে পারে এর আগের লাইন, মনে পড়ত না। এভাবে আমার শৈশবের সেই প্রথম আবৃত্তি করা কবিতা বহুদিন হারিয়েই ছিল আমার জীবন থেকে।
    তারপর একদিন। সেও পঁচিশে বৈশাখ। রাত্তিরে কোন একটা চ্যানেলে অনুষ্ঠান হচ্ছে, বেশির ভাগ ছোটদের কবিতাই পড়া হচ্ছে, দুটি পাঠের মাঝে মাঝে যেন লাইন টানা খাতার কাগজে এক একটা কবিতা পাশে একটা ছবি এভাবেও কিছু কবিতা ‘দেখানো’ হচ্ছে। তার মধ্যেই দেখি আমার সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর মুখ, যাকে চিনে নিতে তখন আর পরের লাইনগুলো অবধি পৌঁছোতে হল না, এমনিই মনে পড়ে গেল “গাড়িতে মদের পিপে ছিল তের চোদ্দ, ইঞ্জিনে জল দিতে ভুলে দিল মদ্য।।।” (খাপছাড়া)। মনে হল এই লাইনটা ভুলে গেছিলাম কি করে ! সেই থেকে মাঝে মাঝে ভাবি যাদি সেদিন টিভি না চালাতাম, ওই অনুষ্ঠান না দেখতাম।।।তাহলে কি আর হত আরো কিছুদিন চেনামুখটা খুঁজে বেড়াতে হত, এই আর কি !
    এভাবেই একেবারে সহায়সম্বলহীনভাবে খুঁজতে শুরু করেছিলাম মাঝখানের দুটি লাইন ‘আমি তোমার স্বপ্নে পাওয়া আঙুল, স্পর্শ করি জলের অধিকারে’। এভাবেই খুঁজে পেয়েও গেছি উৎপলকুমার বসুর সে কবিতা একেবারে অপ্রত্যাশিত ভাবে। শেষ লাইন ধরে খোঁজ শুরু করে পেয়ে গেছি সেই গান যার প্রথম লাইন হল ‘আজি যে রজনী যায় ফিরাইব তায় কেমনে !’ কবীর সুমন অনেক অনুষ্ঠানের শেষে এখন এই গান গেয়ে থাকেন, সেখান থেকেই খোঁজ শুরু হয়েছিল। তবে যা বুঝেছি এই হারানো আর খোঁজা আমার জীবনে আছে এবং থাকবে।
    (চলবে)
    ২। ভেঙ্গে যাওয়া ডাব্‌ল্‌ নেক্‌ড থার্মোফ্লাস্ক ও চারটি মুখ ঃ
    সে আমাদের কলেজবেলা। নব্বইয়ের দশকের গোড়া। সেকালে মফস্বলের কিছু কলেজের হাল যে কিরূপ ছিল (জানিনা এখনও আছে কিনা !) সে আপনারা এই কলকাতায় বসে কল্পনাও করতে পারবেন না। আর সেই সব কলেজে প্র্যাক্টিক্যাল করতে এমন বিষয়ে (মানে ওই ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি) অনার্স পড়া যে কি বিড়ম্বনার ব্যাপার ছিল (বা আছে) সে জানতে গেলে আপনাদের বহু দুর যেতে হবে, অতসবে কাজ নেই, গল্পটা শুনুন, খানিক আন্দাজ পাবেন।
    সেকালে মফস্বলে ঘরে ঘরে টিভি সবে আসতে শুরু করেছে ফ্রিজ ও টেলিফোন নেহাৎই ধনী বাড়ির আসবাব। এহেন কালে কলেজটিতে একটি ফ্রিজ অবধি না থাকায় এবং রসায়নের বিশেষ একটি পরীক্ষায় বরফের ব্যবহার পরিহার্য হওয়ায় একটি অতিউৎসাহী পড়ুয়া স্বেচ্ছায় বরফ সরবরাহের দায়িত্ব নিয়েছিল। তার এক কলাবিভাগীয় ঘনিষ্ঠ সহপাঠিনীর বাড়িতে সে যুগেও ফ্রিজ-টিভ-গাড়ি-টেলিফোন এই চতুরঙ্গই মজুত থাকায় সে সহজেই দায়িত্বটা নিতে পেরেছিল। যথেষ্ট বরফ যাতে পাওয়া যায়, সে জন্য মেয়েটিকে আগে থেকে জানানো ছিল কলেজ যাওয়ার পথে তার বাড়ি থেকে বরফ সংগ্রহ করা হবে, কিসে করে নিয়ে যাওয়া হবে তাও সেই মেয়েটিই ঠিক করে রেখেছিল। নির্দিষ্ট সময়ে তার বাড়িতে গেলে সে একটা বৃহদাকার ডাব্‌ল নেক্‌ড থার্মোফ্লাস্কে ভর্তি বরফ তুলে দিল বন্ধুর হাতে। সঙ্গে বিধিসম্মত সতর্কীকরণ, ফ্লাস্কটা সাবধানে রাখিস, মা কিন্তু জানে না এটায় করে দিয়েছি। খুশিমনে কলেজে পৌঁছে ল্যাবরেটরীতে যত্ন করে ফ্লাস্ক রেখে দেয় সেই পড়ুয়া, প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস শুরু হলে ঠিক বরফের ব্যবহারের প্রাক্কালে বের করে আনে সেই অতিমনোহর বস্তুটি।ব্যস !
    ‘দেখি দেখি’ ‘কি দারুণ !’ ‘কতটা বরফ আছে, সকলের হবে এতে ?’ নানারকম প্রশ্নবাণের সঙ্গে জিনিসটা হাতছাড়া হয়ে যায় এবং এর হাত থেকে ওর হাত হতে হতে একটা তীব্র ঝাঁকুনি আর ঝন ঝন শব্দ। শেষ।
    খুলে দেখা গেল প্রায় অণু-পরমাণুতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে শৌখিন থার্মোফ্লাস্কের অন্দরমহল আর বরফে-কাচে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। কিন্তু দোষ কারও নয় গো মা আর দোষ দিয়েই বা কি হবে ! যেসব ছেলেপিলের হাতে পড়েছিল জিনিসটা তারা তার ব্যবহারই জানত না তো যত্ন কি করে করবে ! বিপদ বুঝে সরে পড়ল অনেকেই কিন্তু যার হাতে ধরা ছিল বস্তুটি আর যে এনেছে বান্ধবীর বাড়ি থকে, তাদের তো পালাবার পথ নেই ! মাষ্টারমশাই এইসব ঝামেলায় থাকতে না চেয়ে পরিস্কার বলে দিলেন দেখ যেন হাত না কাটে আর বরফটা যদি কিছুটা উদ্ধার করতে পার তাহলে আমাকে ডেকো, একটা সেট প্রিপারেশন করিয়ে দেব ! বুঝুন, এই ছিলেন সব মাষ্টার মশাই।
    এতক্ষণে সবাই বুঝেছেন সেই অতিউৎসাহী পড়ুয়াটিই এই কলমবাজ। এখন ভাবলে তার অবাক লাগে, এতটাই কি মেনে নেওয়ার কথা ছিল সেইসব ছাত্রদের, হয়ত তারা তেমন ঝকঝকে ছেলেপুলে নয় কিন্তু এতটাই কি অবহেলার যোগ্য ছিল ! কেউ কি সটান মাষ্টারের চোখে চোখ রেখে বলতে পারত না যে এই দায় আপনারও। পড়াশোনা করা আমাদের দায়িত্ব কিন্তু তার ব্যবস্থা করা আমাদের দায়িত্ব নয়। বাইরে থেকে কিছুটা বরফ কিনে আনাবার ব্যবস্থাও কি আপনি নিতে পারতেন না ? তাহলে তো আজ এই দুর্ঘটনা ঘটত না। কিন্তু সে সব ভাবনার সময় তখন নয়, তখন শুধু চিন্তা কি করে এই থার্মোফ্লাস্ক ফেরত দেওয়া যাবে। সবাই মিলে চাঁদা তুলে একটা ফ্লাস্ক কেনা যায় কিনা পরামর্শ করতে গিয়ে দেখা গেল দলে প্রায় কাউকেই পাওয়া যাছে না, শুধু উপযাচক হয়ে এগিয়ে এল একটাই ছেলে। ‘তোরা এখানেই থাক, আমি দেখি কি করা যায়’ বলে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল।
    গেল তো গেলই, আর আসে না। তখন ভর দুপুর, সেই ছোট্ট শহরের বেশির ভাগ দোকান তখন ঝাঁপ ফেলেছে, বিকেলের আগে খুলবে না, এদিকে সময় গড়িয়ে চলেছে, কথা মত বিকেল চারটে-সাড়ে চারটের মধ্যে জিনিসটা ফেরত দেওয়ার কথা। প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস তো মাথায় উঠল, পরের অন্য ক্লাস কিছুটা দেরীতে, এর পরে কি হতে পারে তা না ভেবে একটা অসাড় মন নিয়ে বসে আছি। তার মধ্যে কোথা হইতে কি হইল জানে শ্যামলাল আর জানে সেই ছেলে। একসময় সে এসে জানাল ব্যবস্থা হচ্ছে, ১২০ টাকা লাগবে। সেকালে ১২০ টাকা মানে বহু টাকা, অত টাকা কারুর পকেটেই থাকত না। তিনজনে ভাগ করে নিলে ৪০ টাকা মাথাপিছু, সেও নেহাত কম নয়। তবে সব টাকা এক্ষুণি না দিলেও হবে গোটা তিরিশেক টাকা দিলেই হবে আর সেটা ও নিজেই দিতে পারবে। আমরা রাজী থাকলে ও ব্যবস্থা করতে বলবে। আমাদের তো রাজী না থাকার কোনও উপায়ই ছিল না, বরং আমরা হাতে চাঁদ পেলাম। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই থার্মোফ্লাস্ক চলে এল আমার হাতে, ভয়ে ভয়ে তার মুখ খুলে ভেতরে তাকাই, ঝকঝকে অন্দরমহলে দুর্ঘটনার চিহ্নমাত্র নেই। এমন রূপকথার মত ঘটনা মানুষের জীবনে খুব কম ঘটে। কাকে ধন্যবাদ দেব, বন্ধুকে, দোকানদারকে না ঈশ্বরকে ভাবতে ভাবতে আগে বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে থার্মোফ্লাস্কটাই ফেরত দিলাম। তার হাতে তুলে দেবার সময় হাত কেঁপেছিল, যদি বুঝে ফেলে। ফেলেনি অবশ্য। তবু ভয়ে ভয়ে ছিলাম বহুদিন।
    সেই ভরদুপুরের গল্পও শুনেছিলাম সেই ছেলেটার মুখে। শিল্পভারতী না ভ্যারাইটি স্টোর না উপহার কোন একটা দোকানের মালিক ওর পরিচিত, তাঁর দোকানে ওইরকম থার্মোফ্লাস্কের মডেল ছিল। তিনি সেদিন রাজী হয়েছিলেন একটা ফ্লাস্কের ভেতরের অংশটা খুলে আমাদের ফ্লাস্কের বডিতে লাগিয়ে দিতে। এমনিতে কাজটা আশ্চর্য কিছু নয়, পরে নিজেদের ব্যাবহারের ফ্লাস্ক দু-একবার সারিয়েছি ওইভাবেই। কিন্তু ঠিক ওইরকম ডাবল নেক্‌ড ফ্লাস্ক যার নতুনের দাম নাকি তখন ২০০ টাকার বেশি সেইরকম ফ্লাস্কের মডেল এমন অনায়াসে সারিয়ে ফেলাটা সেই সময়ে প্রায় গল্পের মত লেগেছিল। যে ছেলেটার হাতে জিনিসটা ভেঙ্গেছিল, তার পক্ষেও সেই টাকাটা খরচ করা বেশ কঠিন ছিল কিন্তু আমাদের কাছে এ ছাড়া আর কোনও সমাধান ছিল না। পরের মাসের টিউশনির মাইনে পেয়ে সে শোধ করেছিল সেই ৪০ টাকার দেনা।
    সেই বান্ধবীর সঙ্গে এখনও যোগাযোগ আছে কিন্তু ওকে জানাতে পারিনি আজও। এত বছর পরে যখন ভাবি সেদিন যদি অন্য কিছু হত, তাহলে সত্যি কতটা ক্ষতি হত ? ওর মা নিশ্চই কিছুটা রাগ করতেন কিন্তু এতটা রাগ কি করতেন যাতে বন্ধুত্ব নষ্ট হয় ! নাকি ও নিজেই তেমন কিছু বলত (কিনে দিতে বলত কি !) যাতে আমি খুব অপমানিত হতাম ? নাহলে সেদিন আমি কেন এত ভয় পেলাম, কেন সেই ছেলেটির সাহায্য নিতে পারলাম যে আমার তেমন বন্ধুই ছিল না কিন্তু যে আমার প্রিয় বান্ধবী যার সঙ্গে শাড়ি থেকে গল্পের বই সবই বদলাবদলি হয় তার সাহায্য নিতে পারলাম না ! মনে হয় এখানেও কোনও একটা শ্রেণীবৈষম্যের মত ব্যাপার কাজ করেছিল, যত প্রিয় বন্ধুই হোক তার সঙ্গে যে জিনিসটার বিনিময়ের ক্ষমতা আমার নেই সেই বিন্দুতে সে আমার সাথী নয়।

    কয়েক মাস আগে লিখলেও এই গল্পটা এখানেই শেষ করা যেত। কিন্তু এখন এই গল্পে আলাদা ফুটনোট জুড়তে হবে। সেই ছেলেটির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না কিন্তু কয়েকদিন আগে খবর পেলাম আমার সেই বিপত্তারণ বন্ধুটি আর আমদের মধ্যে নেই। এক কিশোর ছেলে আর অসুস্থ বৃদ্ধ বাবাকে রেখে সে চলে গেছে। এক হারাবার গল্প লিখতে বসে এভাবেই আর এক হারাবার গল্পে ঢুকে পড়লাম।
    (চলবে)
    ৩। হারিয়ে যাওয়া ফাইল, হারানো ঘড়ি, ফিরে পাওয়া ঃ

    (ক) তখন কলকাতায় সবে পা রেখেছি, ইউনিভার্সিটিতে প্রথম বছর, ক্লাসনোট ধরে পাড়াশোনা। দশ-পনেরো মিনিটের পায়ে হাঁটার রাস্তা ছেড়ে সবে ২৩৭, ২০৪, ২৪০, ৩ ডি /১ বিচিত্র সব নামের বাসের রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অভ্যাস হচ্ছে। এমন দিনে ঘটনাটা ঘটল। ২৪০ নম্বর বাসে চেপে কলেজ স্ত্রীট থেকে ফিরছিলাম, হাতের ফাইল ধরতে দিয়েছিলাম সামনে বসে থাকা একটি মেয়েকে। ফাইলে ছিল যাবতীয় ক্লাসনোট, সদ্য পাওয়া লাইব্রেরীর কার্ড (যেটা আনতে কলেজস্ত্রীট যাওয়া) ইত্যাদি, সেই মুহুর্তে যা যা ছিল জীবনের পুঁজি, বেঁচে থাকার পক্ষে ভীষণ দরকারী (এখন লিখলে লিখতাম ‘হাবিজাবি’)। তখনও গায়ে মফস্বলী গন্ধ, রাস্তাঘাট তেমন চেনা নয়, বাসে উঠলে স্টপেজ আসার আগে থেকেই সচেতন হয়ে থাকা ইত্যাদি। সেই চক্করে কখন নেমে পড়েছি, ধরতে দেওয়া ফাইলের কথা খেয়াল হল একেবারে ডেরায় ফিরে। সে বড় সুখের কথা নয়, এক মুহুর্তে জগৎ যেন অন্ধকার হয়ে গেল। একে আমি ক্লাসনোট ভালো লিখতে পারি না, আবার নিজের হাতে নোট না লিখলে পড়তেও পারি না, অতিকষ্টে বই-টই ঘেঁটে কয়েকমাসের নোট আপডেট করেছি, সে সব গেলে খাব কি !
    এখন ভাবলে হাসি পায়, সে কোন জীবনের কথা যখন নাকি সব ছেড়ে ক্লাসনোট আর লাইব্রেরীর কার্ড জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল ! তখনও বোঝা হয়নি যে এর কিছুদিন পরে ক্লাসে দু-চারজনই ক্লাসনোট লিখবে সবাই সেই নোটই পড়বে। আর লাইব্রেরীর কার্ডও কিছু হারানো কাকাতুয়া নয় যে গেলে আর ফিরে আসবে না। আসলে এসবই জীবনের তৎকালীন অনিশ্চয়তার বোধ থেকে জন্মানো অনুভূতি। সামান্য পুঁজিতে টান পড়লেই যখন প্রাণ করে হায় হায়।।।। ক্লাসে দু-একজনকে জানালাম। নানারকম উপদেশ, মেয়েরা কেউ কেউ আশ্বস্ত করেছিল, দ্যাখ, ঠিক ফেরত পেয়ে যাবি, লাইব্রেরীর কার্ডে তো কি পড়িস কোন ডিপার্টমেন্ট লেখাই আছে ! কেউ বলেছিল জেরক্স করে নিস, এছাড়া আর কিই বা বলবে ! তবে কোনও আশ্বাসেই আমার বিশেষ উপকার হয়নি, বন্ধ করে রাখা দম ছাড়লাম একেবারে পরের দিন যখন দেখতে পেয়েছি সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে কালকের সেই মেয়েটি, যাকে আমি ফাইল ধরতে দিয়েছিলাম। সেই বেগুনী রঙের জামাটাই পড়ে আছে। ফাইলটা হাতে পেয়ে এত নালেঝোলে হয়েছিলাম, ধন্যবাদ দিতেও মনে ছিল না, আমার হয়ে বন্ধুরাই ধন্যবাদ দিয়েছিল। সেই মেয়েটিও ইউনিভার্সিটির ছাত্রী, বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের (তাই ২৪০ বাসে এত আরামের সিটে বসেছিল !), তাই বোধহয় ক্লাসনোটের গুরুত্ব বুঝেছিল কিছুটা। সেটা মোবাইল-ইন্টারনেটের যুগ নয়, কিন্তু এই সূত্রে ওর সঙ্গে একটা বন্ধুত্ব হতে পারত, আমার ক্যাবলামির জন্য যেটা ভেস্তে গেল ! এতদিন পর এই লেখায় সেই মেয়েটিকে একবার ধন্যবাদ দিলা্ম। তবে ২৪০ নম্বর বাসের ওপর আমার ভীতি কাটাতে বহুদিন লেগেছিল !

    (খ) বর্ষায় শান্তিনিকেতন যাব, বহুদিনের সাধ। এক অগস্টে হঠাৎ ঠিক হল শুক্রবার গিয়ে রবিবার ফেরা। কিন্তু সেবছর সেই সময়ে কি দুঃসহ গরম। সেসব সামলে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস যখন বোলপুর স্টেশনে নামিয়ে দিল তখন আকাশে মেঘ, মনটা খুশি। একটা বাড়ির নীচের তলায় হোমস্টে-তে বাগান-ব্যালকনি সমেত সুন্দর থাকার জায়গাও পাওয়া গেল কিন্তু সারাদিন ঘামিয়ে সেই মেঘ অঝোর ধারায় অবশেষে নামল গিয়ে রাত দশটায়। তারপর সারারাত ঝরঝর বৃষ্টি আর সড়সড় জলের আওয়াজ, সকালে উঠে সামনের বাগানে জমে থাকা জলে মেঘ-ভাঙা রোদ্দুর সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। সেদিন শনিবার, তাই খোয়াইয়ের ধারে শান্তিনিকেতনের বিখ্যাত শনিবারের হাট দেখতে বিকেল বিকেল বেরিয়ে পড়া গেল। ছোট্ট জায়গায় সেই হাটের কথা অনেকেই জানেন, মেয়েরা-বৌরা তাদের পসরা নিয়ে বসেছেন। বাটিকের চাদর-পাঞ্জাবী-রুমাল-ব্লাউজপিস, কাঁথাস্টিচের কূর্তা, কাঠের-পুঁতির-ডোকরার গয়না, হাতের কাজের মেলা যেমন হয়। সঙ্গে কিছু খাবারের পসরা, বাড়িতে তৈরী সিঙারা-কচুরী-মালপোয়া, এদিক-ওদিক বাউলগান, সব মিলে জমজমাট। মেলায় গেলে মেয়েদের যে দশা হয়, আমার মায়ের সেই দশা, এ দোকানে ছেলের পাঞ্জাবী পছন্দ হয় তো ওই দোকান থেকে কেউ মেয়ের কূর্তি নিয়ে ডাকাডাকি করে, তার মধ্যেই নাতির জন্য মালপোয়া কিনতে ইচ্ছে হয়। আগের দিনের বৃষ্টির দরুণ জায়গাটায় বেশ কাদা, জায়গায় জায়গায় জলও জমে আছে। তার মধ্যেই কেনাকাটা চলছে নিজের মত। দেখতে দেখতে ভাদ্রের সংক্ষিপ্ত বিকেল শেষ হয়ে আসে, আমরাও ফিরব ফিরব ভাবতে ভাবতে কেনাকাটার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাই। আর ঠিক সেই সময়ে আমার বাঁ হাতের দিকে নজর পড়তে চমকে উঠি ঃ আমার ঘড়ি ! সদ্য উপহার পাওয়া আমার সাধের সোনালী টাইটান, প্রায় গয়নার মত যত্নে যাকে কখনও সখনও পরা হয়, ভ্যানিশ ! বাঁহাতের খালি কব্জির দিকে তাকিয়ে ভাবতে চেষ্টা করি, আজ ঘড়ি পরে বেরিয়েছিলাম কি ? যথারীতি কিচ্ছু মনে পড়ে না। মা-মেয়ে প্রাণপণে খুঁজতে থাকি আর সেই কাদাজলে ভরা মেলাচত্বরের দিকে তাকিয়ে ক্রমাগত হতাশ হয়ে পড়ি। যদি হাত থেকে খুলে পড়ে গিয়েই থাকে তো লোকের পায়ের চাপে ভেঙে যাওয়া কিম্বা কাদার মধ্যে ঢুকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, আর কেউ যদি পেয়েও থাকে সে কি আর ফেরত দেবে, কি করেই বা দেবে। এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে এক খাবার দোকানের মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলাম একটা ঘড়ি পড়ে টড়ে থাকতে দেখেছে কিনা ! সেও কিছুটা আলগোছেই বলল ‘ঘড়ি ! হ্যাঁ কে যেন একটা ঘড়ি হাতে নাচাতে নাচাতে জানতে চাইছিল কার ঘড়ি কার ঘড়ি !’ কিন্ত সে কথায় কিবা আসে যায় কে বলছিল কার ঘড়ি কেই বা তার খোঁজ রাখে। মনে মনে এই ভাবনাও উঁকি দিয়ে যায় যে কেউ পেয়ে থাকলেই কি আর ফেরৎ দেবে !
    আঁধার আরও ঘন হয়ে আসে, এখানে ওখানে দু একটি কেরোসিন বাতি জ্বলে ওঠে, যে যার পসরা গোছাতে শুরু করে আমরাও মেলাচত্বর ছেড়ে পায়ে পায়ে বেরিয়ে আসি, একরাশ মনখারাপ নিয়ে, দু একটা রিক্সা অপেক্ষায় ছিল, আমরা উঠে বসি, রিক্সাওয়ালা প্যাডলে চাপ দেন আর তক্ষুণি পেছনে ডাক ‘ও দিদি !’ দৌড়ে আসছে সেই মেয়েটি ‘তোমার ঘড়ি হারিয়েছে ! ওইখানে খোঁজ করেছ ? ওরা একটা ঘড়ি পেয়েছে বলছিল’ হাতধরে টেনে নিয়ে যায় মেলার একধারে, সেখানে বোধহয় মেলা কমিটির কয়েকজন বসে আছেন, কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস নাকি সেখানে জমা পড়ে। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইলাম, একটা টাইটান ঘড়ি, সোনালী ব্যান্ড।।।
    তারপর মধুরেণ সমাপয়েৎ। সামান্য রসিকতা করে একটি মেয়ে আমার হারানো টাইটান পরিয়ে দিল আমার হাতে। জানাল এই খোয়াইয়ের ধারে কিচ্ছু খোয়া যায় না, এই মেলায় কেউ চুরি করে না, আগের সপ্তাহে একজন তাঁর হারানো ক্যামেরা ফেরৎ নিয়ে গেছেন একসপ্তাহ পরে এসে। নাহ্‌, এই ফেরত পাওয়া এমনই স্বাভাবিক ব্যাপার বলে ওঁরা জানালেন যে তার জন্য ধন্যবাদটুকু দেওয়াও যেন বাড়তি মনে হচ্ছিল। আমরা খুশি মনে ঘুরে এসে আবার রিক্সায় বসলাম।
    সেই অবিশ্বাস্য ফিরে পাওয়া এখনও মনে শিহরণ জাগায় কারণ সেটা আসলে একটা বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প। হারিয়ে যাওয়া জিনিসের দুঃখ সময়ের সঙ্গে কমে আসে, সেই ক্ষতিও জীবনে চিরস্থায়ী হয় না কিন্তু হারানো বিশ্বাস গোটা মানুষকেই বদলে দেয়। সেই সোনালী টাইটান ঘড়ি এখনও আমার সঙ্গী। সেই বিশ্বাসও। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস ফিরিয়ে দেওয়া যে একটা অভ্যাস, সংস্কৃতি, সত্যিই তাহলে এই অভ্যাস গড়ে তোলা এবং বজায় রাখা সম্ভব। এই কথাটা মনে পড়লে এখনও মনটায় ভারী আরাম হয়।

    (চলবে)
    ৪। ভরসা থাকুক ! ঃ

    লোকাল ট্রেনটা দাঁড়িয়েছিল স্টেশনে। লোকজন ওঠানামা করছে, দরজার কাছে কিছু লোক দাঁড়িয়ে, তবে তেমন কিছু ঠ্যালাঠেলি নেই। উল্টোদিকের কোনা থেকে আমি দেখতে পেলাম একজন মহিলা উঠলেন, একটা বাচ্চা ছেলে আরও কে কে যেন, ট্রেন ছেড়ে দিল আর কয়েক মুহুর্ত পরে একটা হৈ হৈ আওয়াজ, কেউ পড়ে গেল নাকি ! ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে দেখি বাচ্চা ছেলেটাকে একজন টেনে ভেতরে নিলেন, দরজার কাছে অনেকেই উত্তেজিত হয়ে কিছু বলছেন, এদিকে ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে নিজের গতিতে দৌড়চ্ছে, ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতেই পরের স্টেশন এসে গেল। ঘটনাটা এইরকম যে, এক মহিলা ওই ছোট্ট ছেলেটার মা, আরও ছোট্ট একটা শিশুকে কোলে নিয়ে ট্রেনে উঠতে গেছিলেন, ছেলেকে আগে তুলে দিয়ে বাচ্চা কোলে (ও ব্যাগ হাতে) মহিলা উঠবার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। মানে এই মুহুর্তে ওই তিন বছরের শিশু ট্রেনে একা, কোথায় যাবে জানে না, কারুর নাম জানে না, ভালো করে কথাই বলতে পারে না। এই বিপত্তিতে বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে সে কান্নাকাটিও শুরু করে দিল। মহিলার কাছে সম্ভবতঃ মোবাইল ফোনও ছিল না আর থাকলেও তার নম্বর শিশুটির পক্ষে বলা সম্ভব নয়।
    শুরু হল নানারকমের পরিকল্পনা। কি করে বাচ্চাটাকে ফেরৎ দেওয়া যাবে ! ইতিমধ্যে এক মাসীমা বাচ্চাটাকে কোলে বসিয়ে নিয়েছেন, কেউ একজন বাচ্চাটার হাতে একটা বেলুন ধরিয়ে দিয়েছে, মুখেও বোধহয় লজেন্স ঠুসে দিয়েছে, তার কান্না থেমেছে কিন্তু সে এদিক ওদিক তাকিয়ে চেনা মুখ কাউকে খুঁজছে। সেটা লোকাল ট্রেন, অনেকেরই ওই লাইনে রোজ যাওয়া-আসার অভ্যাস আছে, কিছু কিছু চেনাজানাও আছে। যে যাকে পারে ফোন করে চলেছে আর মাঝখানে আমি করুণ মুখে শুধু বাচ্চাটার মায়ের কথা ভেবে চলেছি। এই শিশু, তার মায়ের কতই আর বয়েস, দুটো বাচ্চা, ব্যাগ নিয়ে বেচারী একা ট্রেনে উঠতে গেছিল, কেউ কি একটু তুলে দিয়ে যতেও পারত না ! কিন্তু এখন লোকে দোষ তো ওকেই দেবে। আহা নিজে আগে উঠে পড়ে যদি স্টেশনেও কাউকে বলত ছেলেটাকে তুলে দিতে। যাই হোক ঠিক হল পরের স্টেশনে যারা নামছে তারাই কেউ আগের স্টেশনে ফোন করে জানিয়ে দেবে যে কাটোয়া স্টেশনে মাস্টারমশাই এর কাছে বাচ্চাটা আছে। এদিকে বাচ্চাটা মাঝে মাঝেই কান্নাকাটি করছে, তাকে নানাভাবে ভোলাবার চেষ্টাও হচ্ছে। এইসব জল্পনা কল্পনার মধ্যে ট্রেন কাটোয়া পৌঁছল, আমি ভাবছি এই পরিকল্পনা সফল হবে তো ? কোথায় বাচ্চাটাকে বসিয়ে রেখে দেব, কে তার খেয়াল রাখবে, ওর মা এসে পৌঁছোতে তো ঘন্টা দুই লাগবে, কারণ তার আগে আর ট্রেন নেই। এদিকে ট্রেন খালি করে সবাই নেমে পড়েছে, বাচ্চাটি সেই মহিলার হাত ধরে চলেছে, আমিও চলেছি পেছনে পেছনে। সাতপাঁচ ভেবে বলেই ফেল্লাম, বাচ্চাটার কাছে কেউ থাকছে কি ? মহিলা একটু হেসে বল্লেন, আমিই থাকব, ওকে ওর মায়ের হাতে তুলে না দিয়ে আমি নড়ছি না ভাই ! কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের কাজ গেলাম। ঘন্টা দুই বাদে আবার কাটোয়া স্টেশনে এসেছি, ফিরতি ট্রেন ধরব, প্ল্যাটফর্মে সেই মহিলার সঙ্গে দেখা, সঙ্গে বাচ্চাটা নেই। আমাকে দেখে একগাল হেসে আঙুল তুলে দেখালেন, সদ্য ফিরে পাওয়া ছেলের হাত শক্ত করে ধরে কোলের বাচ্চাকে সামলে স্টেশন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন সেই তরুণী মা।
    এইসব কারণেই মাঝে মাঝে জীবনটা বেশ রূপকথার মত লাগে !

    (চলবে)

    ৫। হারানো সম্পর্ক ঃ রুমমেট ঃ

    শুরুতে লিখেছিলাম যা হঠাৎ করে শেষ হয় সেটাই হারানো আর যা কালের নিয়মে শেষ হয় তা ফুরোনো। সে হিসেবে প্রত্যেক মানুষের জীবনে যে অজস্র বন্ধুত্ব কবে কোথায় যেন শেষ হয়ে যায়, তাকে হারানো না ফুরোনো কি বলা যায় সেটা এক জটিল প্রশ্ন। এই পর্যন্ত যা যা লিখেছি সেখানে হারানোটা তত আশ্চর্য কিছু ছিল না, ফিরে পাওয়াটাই ছিল আশ্চর্য। কিন্তু বন্ধুদের নিয়েই তেমন হঠাৎ ঘটনা তো ঘটে যেখানে সামান্য মনোমালিন্যের পর ভেঙেই গেল গভীর বন্ধুত্ব। সত্যিই কথা বন্ধ হয়ে গেল, মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেল, দুজনেই হারিয়ে গেল দুজনের জীবনের থেকে। তাকেও একরকমের হারানোই বলা যায়। কিন্তু যদি এমন হয় যার সঙ্গে পাশাপাশি থাকতে থাকতে তুমুল বন্ধুত্ব, গভীর ভালোবাসা গড়ে উঠল সে একদিন কোন কারণ না দেখিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিল! তেমন হঠাৎ তার ছিঁড়ে যাওয়াকেও আমি হারানো বলেই জেনেছিলাম।
    রুমমেট একটি সম্পর্কের নাম। যে যে বয়সে হোস্টেলে যায় সেই বয়সে তার জীবনে এই সম্পর্ক আসে। আমি রুমমেট পেলাম ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে এসে, যার কথা লিখতে বসেছি সুদূর ত্রিপুরা থেকে আসা সেই মেয়েটি আমার রুমমেট হল, ঠিক পাশের সিটটায়। হোস্টেলের একটা বিশাল ‘রুমে’ ‘উই আর সেভেন’ টাইটেল দিয়ে আমার হোস্টেল বাস শুরু হল আর ভাগ্যবলে (এইখানে ভাগ্যকে বিশ্বাস না করে গতি নেই) রুমমেটদের সঙ্গে ভালোই জমে গেল। বেশ বাড়ি বাড়ি ভাব, হৈ হৈ করে থাকা যাকে বলে। কিন্তু তার মধ্যেও সেই মেয়েটির সঙ্গে এমন একটা বিশেষ বন্ধুত্ব হল যে তাকে প্রায় প্রেম বল্লেই চলে আর কি ! কারুর সঙ্গে কারুর বেশি বন্ধুত্ত্ব তো হয়েই থাকে, সেটা অস্বাভাবিক কিছুই নয়। ওই হট্টমেলার মধ্যেও আমাদের দু-সদস্যের একটা পরিবারের মত তৈরী হয়ে উঠল। শান্ত কিন্তু হাসিখুশি মেয়েটা পড়াশোনায় তো ভালো বটেই চিন্তাভাবনাতেও সিরিয়াস, আদর্শবাদী প্রকৃতির, অন্যরকম মেয়ে নিঃসন্দেহে, যাকে ভালোবাসলে কিছুটা শ্রদ্ধাও ফ্রি দিতেই হয়। আমাদের মধ্যে মিল ছিল অনেক, অমিলও ছিল কিছুকিছু যেমন আমি আরশোলায় ভয় পাই ও কুকুরে। ও ঘোর আস্তিক আমি (তখন) সেমি-নাস্তিক। কিন্তু একটা মেয়ে শুধু সবদিক থেকে ভাল বলেই আমার কাছে চুপিচুপি এতটা গুরুত্ব পেয়ে গেল যে আমার মত শক্তপোক্ত মেয়ে দিনে দিনে দস্তুর মত প্রভাবিত হয়ে পড়লাম (সে-ও অবশ্য কিছুটা একই কথা বলত)। কিছুদিন পরে ঘরটা বদলে একটু ছোট একটা ঘরে আসার পর বন্ধুত্বটা আরও ঘনিষ্ঠ হল। ওর জীবনের অনেক আশ্চর্য ঘটনার কথা ও আমাকে বলেছিল, অনেক ভা্ল আর খারাপ লাগার কথাও। বেশির ভাগই পড়াশোনার কথা, বিভিন্ন মাস্টারমশাই দের কথা, আগেকার হোস্টেলের কথা, বন্ধুদের কথা, ত্রিপুরার কথা। আমার মুখে ওর কথা শুনে শুনে আমার বাড়িতেও ওকে চিনে গেল সবাই। কথায় কথায় ছবি তুলে রাখার দিন তখন অনেক দুরে, নাহলে ওর অনেক ছবিও নিশ্চই থাকত আমার কাছে। স্কুল কলেজে প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে কোনদিন একসঙ্গে একরাতও থাকিনি; খুব ভালবাসার বন্ধুর সঙ্গে দিনরাত্তির একসঙ্গে থাকা, হাজারটা পছন্দের বিষয় নিয়ে তুমুল আড্ডা দেওয়া, রাত জেগে একসঙ্গে পড়াশোনা করা, দোকানে দোকানে ঘুরে কেনাকাটা করার অভিজ্ঞতা অনেক কিছু মনখারাপের মধ্যে হোস্টেলে থাকার দিনগুলোয় কিছুটা চাঙ্গা রেখেছিল।


    তখন একপর্বের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে; পরের পর্বের ক্লাস শুরু হয়েছে কিন্তু পড়াশোনার চাপ নেই। আমরা গল্প করে, বই পড়ে, ঘুরে বেড়িয়ে পুজোর ছুটির অপেক্ষা করছি। ছুটিতে ও ত্রিপুরা যাবে একবছর পর। ওকে প্লেনেই যাতয়াত করতে হত, সেটা নিয়ে আমাদের তুমুল উত্তেজনা, কারণ সেই জন্মে প্লেনে চড়া আমাদের কাছে ছিল বহুদুরের বিষয়। ভোরবেলা ওকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিয়ে আসব আমরা কয়েকজন, আমরা হোস্টেলে ফেরার আগেই ও ত্রিপুরা পৌঁছে যাবে, সেসব পরিকল্পনা হয়ে আছে। এমন অবস্থায় একদিন আমরা রোজকার মত গল্পগাছা শেষ করে রাতে ঘুমোতে গেলাম, আর পরের দিন সকাল থেকে সেই মেয়েটিই কথা বলা বন্ধ করে দিল। আমার সঙ্গে, শুধু আমার সঙ্গে। প্রথমে ব্যাপারটা আমার বিশ্বাসই হয়নি, ওর মাঝে মাঝে একটা চুপচাপ থাকার বা মনখারাপের ‘প্যাচ’ চলত, ভেবেছিলাম, তেমনই। কিন্তু কয়েকদিন পরেই বোঝা গেল এটা ‘প্যাচ’ নয় এটাই ‘লাইফ’।
    ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াল ভারী গোলমেলে, কারণ এই ‘ব্রেক-আপ’-এর পরও পাশাপাশিই থাকতাম আমরা। আর ও যে আমার সঙ্গে কথা বলছে না প্রতি মুহুর্তে আমি সেটা স্পষ্ট করে বুঝলেও অন্যরা অনেকদিন বুঝতেই পারেনি। আসলে কেউ কল্পনা করতেও পারেনি যে প্রায় মানিকজোড়ের মত দুটো মেয়ে কোনও ঝগড়া-ঝাঁটি ছাড়া নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ করে দিতে পারে। সে বড় সঙ্কটময় দিন, একজন প্রিয় মানুষ বিনা কারণে আমাকে বর্জন করে চললে সেটা যতটা কষ্ট তার চেয়েও বেশি অপমান আর সেটা মেনে নেওয়া বড্ড কঠিন। এই সম্পর্ক আমার কাছ থেকে এতটা ভালোবাসা (ও কিছুটা অধিকারবোধে) আদায় করে নিয়েছিল যে সম্পর্কটা থমকে যাওয়ার পর তীব্র অভিমান আর যন্ত্রণার সঙ্গে একটা হতভম্ব অবস্থারও সৃষ্টি হয়েছিল। সোজা রাস্তায় চলতে চলতে আচমকা খাদের ধারে এসে পড়লে হয়তো এই রকম লাগে ! তাই আমি মর্মে মর্মে জেনেছিলাম প্রিয় বন্ধুত্ব হারিয়ে গেছে কিন্তু ওর কাছে জানতে চাইতে পারিনি যে ও কেন আমার সঙ্গে এইটা করল। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইনি যে আমি এটা ডিসার্ভ করি, আমি এমন কিছু করতেই পারি না যার জন্য আমার সঙ্গে এটা করা যায়।
    সেই দিনগুলোয় ক্লাস থেকে ফিরে সন্ধেবেলায় ঘরে থাকা যেত না, নীচে বসে খবরের কাগজ দেখে, টি ভি তে হাবিজাবি যা হোক দেখে সময় কাটানো আর খাওয়ার পরেই গল্পের বইতে ডুবে যাওয়া কিম্বা ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করা, সবই আসলে পালিয়ে বেড়ানো, অন্য রুমমেটদের কাছ থেকে গোপন করা। কিন্তু ছোট্ট বৃত্তে একটা সময়ের পর আর এত বড় ব্যাপারটা গোপন থাকে না। আস্তে আস্তে অন্যরা বুঝতে পারল আর এটাও বুঝল যে এই ব্যাপারটা নিয়ে প্রশ্ন করা চলবে না। সবাই বুঝেও না বোঝার ভান করত, এড়িয়ে চলত বিষয়টা। যখন আমরা সকলে মিলে গল্প করতাম কেউ যেন খেয়ালই করত না যে দুজন নিজেদের মধ্যে কথা বলছে না। এভাবেই চলে এল পুজোর ছুটি। ও যেদিন ভোরে বাড়ি ফিরবে তার আগের দিন আমি কাউকে কিছু না বলে পিসীর বাড়ি বেড়াতে চলে গেলাম, ফিরলাম পরের দিন বিকেলে। আর পুজোর ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার আগে চুপচাপ ঘর বদলাবার দরখাস্ত জমা দিয়ে গেলাম। নানা কারণে ঘরটায় থাকতে অসুবিধে হচ্ছিল, রুমমেটের টানেই ঘর বদলাবার উৎসাহ পাচ্ছিলাম না, এবার আর কোনও বাধা রইল না।
    এখন ভাবলে অবাক লাগে সামান্য ব্যাপারকে কেন এত গুরুত্ব দিয়েছিলাম কিন্তু সেই বয়সটা তো বন্ধুত্বকে গুরুত্ব দেওয়ারই বয়স। যাইহোক, পুজোর ছুটির পরে নতুন ঘরে এসে উঠলাম, ঘরটা গুছিয়ে নিলাম, পুরোনো রুমমেটরা অনেকেই এসে অনুযোগ জানিয়ে গেল, নতুন রুমমেট এল, দিব্যি মানিয়ে গেল তাদের সঙ্গেও। কষ্টটা কমে এল, প্রশ্নটা মাথা থেকে গেল না। অনেক পরে নতুন রুমমেটরা জানতে চেয়েছিল, বলতে পারিনি, বলব কি করে, জানতেই তো পারিনি। শুধু একা একা কাটাছেঁড়া করতাম। সহজে যাদের ‘কানভাঙানো’ যায় ও তেমন মেয়েই ছিল না তাই তৃতীয় কারুর ভূমিকার কথা ভাবতেই পারিনি। বরং মনে হত আমার সঙ্গে বেশি গল্প করে ওর কি পড়াশোনার ক্ষতি হয়েছিল, ওর কি ধ্যানধারণা কিছু ক্ষতিকরভাবে বদলে যাচ্ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। জানতে ইচ্ছে করত ও কি বুঝতে পারল কেন আমি ঘরটা বদলে ফেল্লাম। ঘটনাটা আমার জীবনে বারমুডা ট্রাঙ্গেলের মত রহস্যময়ই হতে রইল আর এইসব টানাপড়েনের ফাঁকে আমাদের একসঙ্গে কাটানো সুন্দর সময়গুলোর স্মৃতি একেবারেই ফিকে হয়ে এল, সেটাও কম হারানো নয়।
    এই গল্পটাও এখানেই শেষ হতে পারত কিন্তু এরও একটা উপসংহার পর্ব আছে। পাশ-টাশ করে যাওয়ার পর হোস্টেল ছেড়ে দিতে হল কিন্তু কলকাতা ছাড়া গেল না। শুরু হল আমাদের এখানে-ওখানে পেয়িং গেস্ট থাকার পালা। চলে গেলাম দমদম, ৩০ বি আর ২০২ নম্বর বাস, ডানকুনি-নৈহাটি-শান্তিপুর লোকাল, জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠল। পুরোনো হোস্টেলের মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, তাদের কাছেই খবর পেতাম আমার সেই বন্ধুও কাছাকাছিই থাকত, আর আশ্চর্য বদলে গেছিল স্বভাবে। শান্ত ব্যাক্তিত্বসম্পন্না হাসিখুশি মেয়েটা হঠাৎই বদলে গেছিল একেবারে অন্যরকম ভাবে যেভাবে ওকে দেখতে ভালো লাগত না কারুরই। ওর সুন্দর স্বভাবের জন্য পুরোনো বন্ধুরা অনেকেই ওকে পছন্দ করত, রূপান্তরটা তাদেরও ভালো লাগেনি। যদিও আমার সঙ্গে আর দেখা হয়নি কক্ষণও কিন্তু আমার কাছে ওর মূর্তিটা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেল, হারিয়ে ফেলাটা সম্পূর্ণ হল।
    তার পরেও দীর্ঘদিন হোস্টেলে থেকেছি, এসেছে গেছে নানারঙের রুমমেট। সকলের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক ছিল, ঘনিষ্ঠতাও অনেকের সঙ্গেই, কিন্তু অত ভাবও হয়নি, ওইরকম বিচ্ছেদও হয়নি অন্য কারুর সঙ্গে । অভিজ্ঞতা বুঝিয়েছে রুমমেট একটি ‘রুমনির্ভর’ অস্থায়ী ও অর্ধতরল সম্পর্ক যাকে যে পাত্রে (মানে রুমে) রাখা যায় কিছুটা হলেও সেই পাত্রের আকার ধারণ করে, পাত্র বদল হলেই তার আকার বদলে যায়। দিনের পর দিন বেশির ভাগ সময়টা একসঙ্গে থেকেও অনেক সময়ই এই সম্পর্ক পরবর্তীকালে বয়ে নিয়ে যাওয়ার মত গুরুত্ব অর্জন করতে পারে না। হোস্টেল ছেড়ে টা-টা করে গাড়িতে স্টার্ট দেওয়ার পর অনেক রুমমেটদের মধ্যে আর দেখাই হয় না, আর সেটাই স্ট্যান্ডার্ড ব্যাপার, তাই নিয়ে কেউ মনখারাপ করে না। তাই এই ঘটনার পরও আমি শেষ পর্যন্ত আস্থা হারাইনি, বন্ধুত্বের ওপর এমনকি রুমমেটের ওপরও। তাই এই গল্পটা আসলে হারাবার গল্প হলেও পুরোটা হেরে যাওয়ার গল্প বোধহয় নয়।

    (চলবে, তবে আর বেশি নয়)
    হারানো প্রিয়জন ঃ

    ওর নাম ‘পায়েস’। সেটা অবশ্য শুধু এই কারণে নয় যে ওর মায়ের নাম ‘মিল্কি’। বিশুদ্ধ দুধসাদা, রেশমী (প্রায় শ্যাম্পু করা) লোমের সুন্দরী মিল্কি যেমন সার্থকনাম্নী এক বিড়ালনি আর ওই বিশুদ্ধ দুধসাদার মধ্যে কিসমিসের মত এখানে ওখানে একটু একটু বাদামী ছোপ নিয়ে ওর ছানা ‘পায়েস’-ও সার্থকনামাই বটে। স্বভাবেও। এক্কেবারে মিষ্টি বিড়ালছানা যেমন হয়।
    এমন বিড়ালছানা পেলে তাকে নিয়ে যা যা আদিখ্যেতা হয় সে সবই যথা নিয়মে হত আমাদের বাড়িতেও। মানে ওই আলাদা করে মাছ আনা, রান্না করা মাছ ভাত দুধ ভাত মেখে খাওয়ানো, প্রায় বেবি-কট এর মত নরম বিছানার ব্যবস্থা, যদিও সে আমাদের বিছানাতেই ঘুমোত বেশির ভাগ সময়। সে সব আর আলাদা করে বলছি না, যাঁদের বাড়িতে পোষ্য ছিল / আছে তাঁরা এসব জানেন আর যাঁদের বাড়িতে নেই, তাঁরা এইসব গল্পে যারপরনাই বিরক্ত হন। যদি বলি পায়েসকে আমরা একমাস বয়স থেকে মানুষ করেছিলাম, তাহলে সবাই খুব হাসবে। কিন্তু আমি সত্যিই বিশ্বাস করি আমাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে পায়েস বেড়াল নয় মানুষই হয়ে উঠেছিল। না হলে কে আর কবে শুনেছে যে বিড়াল বালিশে মাথা দিয়ে পাশবালিশে পা তুলে ঘুমোয়। পাশে কেউ থাকলে পায়েস তার গায়ের ওপর নিজের ছোট্ট পা তুলে দেবার চেষ্টাও করত। মাঝে মাঝে ঘুমের সময় ঘরে আলো জ্বললে পায়েশ খুব বিরক্ত হয়ে চোখের ওপর একটা হাত রেখে ঘুমোত। মানে দেখে তাই মনে হত আর কি !
    পায়েস আমার বিশেষ বন্ধু ছিল, না আমি পায়েসের বিশেষ বন্ধু ছিলাম, সে কথা পরিস্কার বলা কঠিন। তবে আমি ইস্কুল থেকে বা কোথাও থেকে ফিরলে পায়েস যেখানেই থাকুক দৌড়ে এসে আমার গলা ধরে ঝুলে পড়ত। আমি খেতে বসলে ও দুহাতে আমার গলা জড়িয়ে পিঠের ওপর ঝুলে থাকত। ওর একটু দিবানিদ্রার অভ্যেস ছিল বলে ব্যাপারটা এমন হয়েছিল যে পায়েস ঘুমোবার সময় আমি ইস্কুল থেকে বাড়ি এলে ঠাকুমা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করে থাকতে বলতেন, পাছে আমার গলা পেলে ওর ঘুম ভেঙ্গে যায় !
    এহেন পায়েস একদিন সকাল থেকে বেপাত্তা হয়ে গেল। ওর একটু পাড়া বেড়ানো স্বভাব ছিল। মাঝে মাঝেই এক চক্কর মেরে আসাটা ছিল ওর রোজকার ডিউটি। সেইরকমই ভেবেছিলাম। কিন্তু সেদিন বেলা গড়িয়ে গেল, ও ফিরল না। গড়িয়ে গেল দিন, দিনের পর দিন। আমরা বসে থাকিনি, প্রায় চিরুণী তল্লাসি চালিয়ে ফালা ফালা করে ফেলা হয়েছিল গোটা পাড়া, রাস্তার ধার, এমনকি জঞ্জালের স্তূপ অবধি। যদি কুকুরে মেরে ফেলে থাকে ! আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন পড়ার লোকজনও, কিন্তু ওকে পাইনি।
    চিরদিন জেনেছি বেড়াল পার করা কত কঠিন কাজ, সেই যে কে যেন বেড়াল পার করতে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে আবার বেড়ালের পিছু পিছু ফিরে এসেছিল, কিন্তু সেসব গল্প আমাদের ক্ষেত্রে মিলল না। পায়েস ফিরে এল না। আস্তে আস্তে ওর বিছানা গুটিয়ে খাটের নীচে চলে গেল, ওর থালাবাটি সরিয়ে রাখা হল। সবই স্বাভাবিক ভাবেই হল। শুধু তারপর অনেকদিন অবধি রাস্তায় দেখা হলে পাড়ার লোকজন জানতে চাইতেন, ‘পায়েসকে পাওয়া গেল !’ আর তারপর আরও অনেকদিন অবধি আমার মন দিয়ে পড়ার সময়ে, ইস্কুল থেকে ফিরে খাওয়ার সময়ে, এমনকি ঘুমের মধ্যেও কানে আসত একটা আদুরে ‘মিউ’ ডাক। আমি মনে মনে ভেবে চলতাম পায়েস এখন কোথায় আছে, কি করছে, কেমন দেখতে হয়েছে, অনর্গল কথা বলে যেতাম মনে মনে। সে সবও কবে যেন বন্ধ হয়ে গেল এখন আর মনে করতে পারি না।
    ************************
    দৃশ্যম ফিল্মের শেষ দৃশ্য। পুলিশ অফিসার তব্বু আর তাঁর স্বামী রজত কাপুর অজয় দেবগণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। শুধু জানতে চাইছেন তাঁদের ছেলের আসলে কি হয়েছে, সে কি বেঁচে আছে না নেই।।।বলছেন ফোন বাজলেই মনে হয় ওর গলা শোনা যাবে, বেল বাজলেই মনে হয় দরজা খুলে ওকে দেখা যাবে।।।এই অনিশ্চয়তা এতটাই অসহনীয় যে তার থেকে মুক্তি পেতে মানুষ এমনকি মৃত্যুসংবাদও শুনে নিতে চায়। পরিবারের একটি মানুষ সকালে হাঁটতে বেড়িয়ে কি পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে আর ফিরে এলেন না। তাঁর দেহটাও এল না, নেই যে সে খবরও এল না। আছে যে সে ভরসাও হচ্ছে না। সেটাই তো জীবন থেকে একটা আস্ত মানুষ জাস্ট হারিয়ে যাওয়া, যার কোনও ঠিকানা নেই, ভুল করে ডিলিট করে ফেলা ফোন নম্বর যেমন, আছে, হয়ত কোথাও আছে, কিন্তু আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি না। কোথায় কেমন আছে, জানতে পারছি না। নেই ভেবে প্রাণখুলে কাঁদতে পারছি না, আছে বিশ্বাস করে শান্ত থাকতে পারছি না। সেই শ্বাসরোধ করা টেনশন হয়ত ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বোঝে না।
    ২০১০ সাল। স্টিফেন কোর্টের অগ্নিকান্ড। বেশ কিছু মানুষ ছাই হয়ে গেলেন আর কয়েকজন রয়ে গেলেন নিখোঁজ। এক বছর পরের হিসেবও বলেছে ৫-৬ জনের খোঁজ পাওয়া যায় নি। খবরের মুখ বদলে যায়, মানুষের মন সরে যায় এক দুর্ঘটনা থেকে অন্য ঘটনায়। কিন্তু যারা হারিয়ে গেল, তাদের কাছের মানুষের জীবন তো অত সহজে বদলায় না, কি করে দিন কেটেছে, কি করে দিন কাটে সেই নিঁখোজদের পরিবারের ? তাঁরা কি প্রিয়জনের ফেরা-না-ফেরা নিয়ে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন ? বোধহয় সবাই পারেন না।
    স্টিফেন কোর্টে হারিয়ে যাওয়াদের দলে ছিল এক তরুণী। তার নাম সম্ভবতঃ জয়ত্রী; স্মৃতি থেকে লিখছি একটু ভুল হলেও হতে পারে। তার মায়ের কথা খবরের কাগজেই পড়েছিলাম, দুর্ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে। তিনি বিশ্বাস করতেন মেয়ে বেঁচে আছে আর ভালোই আছে। সকাল সকাল কোনোরকমে সংসারের কাজ চুকিয়ে ফেলে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতেন, রাস্তা দিয়ে যাওয়া মানুষের স্রোতের দিকে অপলক চেয়ে খুঁজে যেতেন আত্মজাকে। কখনও বা নিজে নিজেই ভেবে নিতেন কোথায় নাকি মেয়েকে দেখা গেছে, কাউকে কিছু না বলে একা একা বাসে / ট্রেনে চলে যেতেন সেখানে, রাস্তায় রাস্তায় সারাদিন ঘুরে সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরে আসতেন। কিন্তু মেয়ে বেঁচে থাকলে সে কেন বাড়ি আসছে না, বা যোগাযোগ করছে না, সেসব কথা নিয়ে তিনি ভাবতেন না। জানিনা তিনি কেমন আছেন, শেষ পর্যন্ত কি আদৌ কোথাও পৌঁছেছেন ! সেই একই দুর্ঘটনায় তরুণ ছেলেকে হারিয়েছিলেন যে বারিক দম্পতি, তাঁরা পরে একটি শিশুকে দত্তক নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা চালিয়েছেন, কিন্তু জয়ত্রীর মায়ের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নই ওঠেনি, কারণ তিনি মেয়েকে হারিয়েছেন কিনা সেটাই তিনি জানেন নি কিন্তু হারিয়ে ফেলেছেন স্বাভাবিক জীবনের সমস্ত ছন্দ। এই সেই দমবন্ধ করা অনিশ্চয়তা, যা মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিকে ধ্বংস করে দিতে পারে, যার হাত থেকে মানুষ মুক্তি চায়। কিম্বা বলা ভালো এর হাত থেকে মানুষ যে মুক্তিই চায় তাও হয়ত সে জানে না, শুধু কোনদিন মুক্তি পেয়ে গেলে তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে এ একরকম ভালোই হল ! এখানে ভালো মানে শুধু ওই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি। এইভাবেই একটা হারানো আর একটা হারানো থেকে আলাদা হয়ে ওঠে ।

    (চলবে)
    ৭। হারানো বাসভূমি ঃ

    আমার মন কেমন করে। আমাদের মন কেমন করে। কেন ? কাদের জন্য ? কিসের জন্য ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা পৌঁছে যাই সেই চুনসুরকি-আলো-আঁধারি অলিগলিতে যেখানে জমানো আছে আমাদের ফেলে আসা মুহুর্ত। সেই সব মুহুর্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষেরা, মিশে থাকা অনুসঙ্গগুলোও তো একভাবে আমাদের গড়ে তোলে আমাদের বেড়ে ওঠাতে ছাপ রেখে যায়। সেই ছাপ ধরে ধরেই আমরা কখনও পৌঁছে যাই আমাদের ফেলে আসা সময়ে। তার নাম মনকেমন। একটা মধুর বিষণ্ণতা। স্বাভাবিক নিয়মেই আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যাই, ছেড়ে আসি পুরোনো খেলাঘর তাই বদলটা সহজে নজরে পড়ে না। অনেকদিন পর পিছন ফিরে সেই মুখগুলো, সেই ফুটবল, সেই কাঁচের পুতুল দেখতে পেলে আমরা আসলে সেই সময়কার আমি-টাকেই দেখতে পাই, দেখতে পাই কতটা বদলে গেছি। তাই মনকেমন।
    মানে ধরুন যে বাড়িতে আপনি বড় হচ্ছেন, সেই বাড়িও তো আপনার একটা মাপ। চোখ খুলে জানলার খোলা মাঠ দেখছেন না পাশের বাড়ির জানলা দেখছেন সেটাই তো আপনার সকালের রঙ ঠিক করে দেবে। হাত বাড়ালে বন্ধু পাচ্ছেন না বইয়ের আলমারী পাচ্ছেন না কি দুইই পাচ্ছেন তাই তো গড়ে দেবে আপনার ছোটবেলা এবং কিছুটা বড়বেলাও। কিন্তু যাই পেয়ে থাকুন না তার মধ্যেই আপনার অজস্র ছোট-মেজ-বড় ‘আমি’ ছড়িয়ে থাকবে, সেইখানে ফিরে গেলে যাদের আপনি দেখতে পাবেন। কিন্তু যদি সেই ফিরে যাওয়ার রাস্তাটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় ?
    আমি বাড়ি বলতে জেনেছিলাম এক বিরাট ঢেউখেলানো কাঠের ফ্রেমে লোহার শিক দেওয়া গেট (ওই কিছুটা রাজভবনের দরজার মত তবে অত বড় নয়), দুপাশে ইঁটের গাঁথনির ওপর লোহার কাজ করা রেলিং। বাইরে থেকেই দেখা যায় ভেতরে টানা লম্বা বাগান, মাঝখানে নুড়িবিছানো রাস্তা। দুপাশের সেই বাগানে সারি সারি গাছ, এপাশে আম, ওপাশে বকুল, আমের পাশে বাতাবি লেবু, গন্ধরাজ লেবু তো বকুলের পাশে পর পর পাতিলেবুর ঝাড়। রাস্তার ধার ঘেঁসে দুপাশে অগুন্তি বেলফুলের গাছ। জবা, গন্ধরাজ, কাঠচাঁপা, গুলঞ্চ, ডালিম, দুরকম রঙ্গন (লাল ও হলুদ), দুরকম কামিনি (একপাটি ও থোকা), দুরকম ফুরুস (সাদা আর লাল), বর্ষায় ঘন হয়ে ওঠা আগাছা, শরতে শিউলি, আরও কত কি সে লিখতে বসলে এটা বাগানের গল্প হয়ে যাবে। কিন্তু এটা বাগানের গল্প নয়, এটা হারানোর গল্প তাই বাগান থেকে উঠে আসুন টানা লাল সিমেন্টের রঙ চটা চওড়া তিনধাপ সিঁড়িতে, ঠিক যেমন ছবিতে দেখেছেন, দুপাশে বৃত্তচাপের আকারে সিমেন্টের রেলিং। উঠে একটু চাতাল তারপর চওড়া লাল বারান্দা, সেখানে একটা কাঠের বেঞ্চি পাতা। তার পাশে সবুজ কাঠের রঙ করা দরজা। জুতো খুলে ঢুকুন, কালো সিমেন্টের দালান, ডানপাশে পরপর দুটো ঘর, বাঁদিকের দরজা দিয়ে তাকান বাইরে আর একটা চাতাল, কুয়ো, খিড়কির দরজা, যা দিয়ে আবার বাগানেই পৌঁছে যাবেন, চাঁপা গাছে নীচে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে যান, কালো দালানের ঠিক ওপরে দোতলায় লাল দালান, বাঁদিকে পরপর দুটো ঘর, পেরিয়ে সোজা চলে গেলে চওড়া লাল সিমেন্টের দক্ষিণের বারান্দা, যার তিনদিক খোলা, মাথায় ছাদ, দিনের যে কোনও সময়ে সিমেন্টের জাফরী দিয়ে লাল মেঝে আলোর আলপনা। এখানে দাঁড়ালে নীচে বাগান, দুরে সেই সিংহ দরজার মত ‘গেট’, যা কেউ খুলে ঢুকলে একটা ‘ঠক’ করে আওয়াজ হয়। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে বাড়িটার দিকে তাকালে ছবিতে দেখা রাজবাড়ির মতই সম্ভ্রান্ত লাগে এই সাদা বাড়িটাকে।
    কিন্তু আসলে তো সেটা রাজবাড়ি ছিল না, ছিল একটা ভাঙাচোরা পুরোনো আমলের বাড়ি, যা দেখতে আশ্চর্য সুন্দর হলেও বসবাসের পক্ষে মাপে ছোট, ঘর কম, বারান্দা-দালান বেশি। যার ভিত যত শক্তই হোক দেওয়ালের চুন-সুড়কি খসে পড়ে মুর্যা লগুলো রোজ বদলে যায়। ভাঙাচোরা রান্নাঘর, একতলার বারান্দা জুড়ে শিরা-উপশিরার মত অজস্র ফাটল আর হ্যাঁ বেশি বৃষ্টিতে দোতলার একটা ঘর দিয়ে জল চুঁইয়ে পড়া জল। এই মিছিমিছি রাজবাড়িকে বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষমতা ছিল না তখন পরিবারের কর্তাটির। তাই সবদিক বিচার করে আমাদের জীবন থেকে তাকে বাদ দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। অর্থাৎ বাড়ি বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই হল।
    আমি তখন নবম শ্রেণী। দফায় দফায় কয়েক বার এগোনো-পিছোনোর পর বাড়ির মূল অংশটি বিক্রি করে দেওয়া হল, মৃত্যুদন্ড পেল সামনের বাগান। চোখের সামনে কাটা পড়ে গেল আম-বকুল-বাতাবি-গুলঞ্চের ঝাড়। ক্ষীণ হয়ে গেল হাসনুহানার মদির গন্ধ। ভিত উঠল আমাদেরই আধুনিক ছাঁদের নতুন বাড়ির। আমরা তখনও আগের বাড়িতেই আছি। জ্যোহৎস্না রাতে সেই রাজকীয় দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীচে গড়ে ওঠা নতুন বাড়ির রেখা দেখে মনে হত হরপ্পা-মহেঞ্জোদড়োর ছবি। ফুলে ভরা গোলাপ-গন্ধরাজ-কামিনি যেদিন কাটা পড়ল মনে মনে ভেবেছিলাম ওরা কি ক্ষমা করবে কোনওদিন।
    ওরা ক্ষমা করেছিল কিনা জানিনা কিন্তু আমরা বোধহয় কেউই ক্ষমা করতে পারিনি নিজেদের, শুধু সান্ত্বনা দিয়ে গেছি। আমার দাপুটে ঠাকুমা যাকে প্রায় কখনও অসুখে পড়তে দেখা যায়নি, নতুন বাড়িতে গৃহপ্রবেশের দিন থেকে তিনি পড়লেন ভয়ানক জ্বরে, দিন তিনেক টানা জ্বর, ভুল বকা, ঠাকুমার যে সেসব হতে পারে তা সেই প্রথম দেখা। সেসব সামলে অনেকদিন ধরে একটু একটু করে শেষ হল আমাদের বাড়ি। নতুন বাড়িটাকেও আমরা ভালোবেসেই ফেল্লাম, নিঃসন্দেহে সেটা অনেক বেশি সুবিধের। আমরা ভুলে গেলাম যেখানে রান্নাঘর সেখানে লেবুঝোপটা ছিল কিম্বা যেখানে ডাইনিং টেবিল পাতা সেখানেই আমগাছটা ছিল। নতুন বাড়িটা আমাদের আপন হয়ে উঠল কিন্তু চাপা স্বভাবের মানুষ আমার বাবা অনেকদিন পরও মাঝে মাঝে বিষন্ন মুখে বলতেন ‘আর একটু সময় নেওয়া উচিৎ ছিল ! অমন বাড়ি, ওইরকম বাগান তো সহজে পাওয়া যায় না !’
    আমাদের নতুন বাড়িতেও ওপরে নীচে লাল বারান্দা আছে, তবে অনেক ছোট। নয় নয় করে গাছপালাও চাট্টি লাগানো হয়েছিল, ছোট্ট বাগানে মেপেজুপে হিসেব করে, শরতে শিউলি, বর্ষায় জুঁই, বারোমেসে গোলাপ, শীতে চন্দ্রমল্লিকা, অ্যাস্টার আমাদের বাড়ি ভরিয়ে রেখেছে। কিন্তু ওই যে বললাম যে মাপে আমরা বেড়ে উঠছিলাম, বুড়ো হচ্ছিলাম নিজের নিজের মত, সেই মাপটা এক কথায় বদলে গেল। বাড়ির পেছনে ঠাকুরবাড়ির ছাদে ঝরে পড়া নিমফুলের গন্ধ, রোদ্দুর লুটোনো বারান্দায় লতিয়ে ওঠা সাদা গোলাপের থোকা আর চুনবালি খসা দেওয়ালে সিংহের মুখ সবকিছু আমাদের কাছে একসঙ্গে ‘ছিল নেই, মাত্র এই’ হয়ে গেল। যেন ট্রেনটা প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেল এইমাত্র, চোখ বুজে যাকে এখনও দেখা যাচ্ছে কিন্তু চোখ খুলে আর দেখা যাবে না।
    তারপর প্রায় তিরিশ বছর পেরিয়ে গেছে। আমি ওই বাড়ি ছেড়ে আরও গোটা কয়েক বাড়ি পেরিয়ে এখন এক জায়গায় থিতু হয়েছি, বাড়ি বলতে সেটাই বুঝি এখন। ভীড় বাসে দাঁড়িয়ে গরমে কষ্ট পেতে পেতে হয়ত ভাবছি কতক্ষণে বাড়ি ফিরব। কিন্তু হঠাৎ বাড়ি ফেরা বলতে চোখে ভেসে আসে, আমার এখনকার বাড়ি নয়, সেই নতুন (এখন সেও পুরনো) বাড়িও নয় সেই ফাটা-চটা লাল বারান্দা দিয়ে গিয়ে দরজার পাশে জুতো খুলে ঢোকা। মনে মনে ভাবি গভীর দীর্ঘশ্বাসে, ভুল হচ্ছে, কিছু একটা ভুল হচ্ছে কিন্তু বেশ কয়েক মুহুর্ত এই রকমই কাটে। তারপর একটা ঝাঁকুনি খেয়ে বাস্তবে ফিরে আসি। যে কোনও টালমাটাল দিনে, মনখারাপের দিনে সেই বারান্দা, সেই হাসনুহানার গন্ধ আর একটা বিষণ্ণ অবয়বের মত সেই বাড়ি, স্বপ্নে ফিরে ফিরে আসে। বুঝতে পারি সে আমাকে ক্ষমা করেনি কিম্বা সে আমাকে ছেড়ে যায়নি একেবারে।
    ***********************
    আমার এখনকার বসত যেখানে, সেটা যে কলকাতার মধ্যে তা মাঝে মাঝে ভুলে যেতে হয়। বাড়ির সামনে এক পুকুর, তাকে ঘিরে গাছ-গাছালি। শোবার ঘরের পশ্চিম দিকের জানলা দিয়ে তাকালে ওদিকে নীচু নীচু বাড়ি পেরিয়ে নজরে আসত বিশাল এক জামরুল গাছ, আম গাছ, সেসব পেরিয়ে নজর আটকাত তিনটে তালগাছের মাথায়। অর্থাৎ নানারকম জমাট সবুজের মাঝ থেকে সোজা আকাশে দিকে উঠে যাওয়া তিনটে তালগাছের মাথায় এক স্পষ্ট সুতরাং চিহ্ন, এই আমার স্কাইলাইন। এই ছবি দেখতে দেখতে কেটে গেল অনেকগুলো দিন, অনেক রকম রঙের। শীতের দুপুরে তালগাছের মাথায় রোদ চিকচিক করেছে, ওপাশে সূর্যাস্তের পর ঘনকালো সিল্যুয়েটের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছি, কোনও কোনও ঘুম না আসা রাতে কালো ছায়ার মত তালগাছের মাথার দিকে তাকিয়ে গুণেছি রাত কত হল। এই ভাবেই যেন ওরা আমার বন্ধু হয়ে উঠেছিল।
    তারপর একদিন, সকাল থেকে বেজে উঠল তুরী-ভেড়ি-কাড়া-নাকাড়া। কাটা পড়ল আম-জামরুল। ছোট ছোট বাড়িগুলো ভেঙে হৈ হৈ করে মাথা তুলে দাঁড়াল পাকা বাড়ি। আমার সুতরাঙ চিহ্ন তখনও দেখা যাচ্ছে। বাড়ির একটা করে তলা ওঠে আর আমি ভাবি এবার বোধহয় থামবে, ওই যে দেখা যাচ্ছে আমার সুতরাঙ-এর মাথাটুকু, অন্ততঃ ওইটুকু আমার জন্য থাক্‌ !
    তবে এ নেহাৎই ভাবনা-বিলাস। কারই বা এমন দায় পড়েছে আমার সুতরাঙ-কে বাঁচিয়ে রাখতে ! তাই সেই বহুতল মাথায় বেড়েই চলল আর তিনতলা অবধি কোনরকমে বাঁচিয়ে রাখা আমার স্কাইলাইন চারতলায় গিয়ে অদৃশ্যই হয়ে গেল ! এমনকি ছাদে উঠেও আর তাদের দেখা পাই না। তবে ওই যে কে যেন বলেছিলেন ‘রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে’, সেটাই সান্ত্বনা। ওরা আছে ওধারে, ওরা অন্ততঃ বেঁচে থাক ওধারে।
    (চলবে)
    ৮। মৃত্যু ঃ সে আমাকে দেখা দিয়েছিল একবার। ‘আমি’ আস্তে আস্তে নেই হয়ে গেছিলাম। জলের মধ্যে একটা সুগার কিউব বা একটা গাঢ় রঙিন ফোঁটা ফেলে দিলে যেমন সে চারদিক থেকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে গলে গলে যেতে থাকে, মনে হয় যেন সে প্রাণপনে তার নিজের চেহারাটা ধরে রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু সবকিছু তার হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সেইরকম রোজ রোজ আয়নার সামনে আমার নিজের মুখ ভেঙেচুরে হারিয়ে যেতে দেখতাম। অথচ তার তেমন কোনও কারণ ছিল না। যে সময়ে গড়ে ওঠার কথা, ঝলমল করে ওঠার কথা সেই সময়েই সেই একটু একটু করে নেই হয়ে যাওয়ার নাম আসলে মৃত্যু। সে যখন যার কাছেই আসুক না !
    সেটা কলকাতায় পড়তে আসা্র সময়। ইউনিভার্সিটিতে। সমবয়সীদের সঙ্গে হোস্টেলে থাকা, স্বাধীন জীবন, একা কিন্তু তেমন একলা নয়। সেই বয়সে এমন জীবনই তো সবাই চায়। দিনের বেলা ক্লাস, রাত্তিরে চুটিয়ে গল্প, আড্ডা, ছুটির দিনে বিকেলে এদিক ওদিক ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুদের কথায় হেসে গড়িয়ে পড়া। কিন্তু আমি টের পাচ্ছিলাম তার শীতল দৃষ্টিটা আমাকে আটকে রেখেছ, ভেতরে ভেতরে আমি সবসময় ভেঙ্গে পড়ার শব্দটা শুনছি। কারণ আমি জানি যে স্বপ্নের ওপর ভর করে এই জীবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি সেই স্বপ্নটা আমার অস্তিত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে। সোজা কথায় সেই সময়ে আমি কিচ্ছু মনে রাখতে পারতাম না। পড়াশোনা। কেননা আমি কিছুতেই মন দিতে পারতাম না। তার কারণ কি আমি আজও জানি না। ক্লাসে বসে এই প্রথম আমি কিচ্ছু বুঝতাম না, কিচ্ছু লিখতে পারতাম না কারন আমি কিচ্ছু মন দিয়ে শুনতাম না। সেই কারণ-অকারণের দুষ্টচক্রে যে আমিটাকে ছোট থেকে চিনতাম সে দ্রুত গলে-ভেঙ্গে-মিশে যেতে লাগল। এক ঝাঁক উজ্জ্বল মুখের পাশে আমার নিজের মুখ ক্রমশঃই মলিন হয়ে যেতে লাগল আমার নিজেরই চোখে। সে এক অদ্ভুত অন্ধকার, অবসাদ, যার কোনও ডাকনাম নেই, যার হাত থেকে বাঁচতে নিজেকে কেবলই বিভিন্ন জায়গায় সরিয়ে নিয়ে বেড়ানো কিন্তু শেষ পর্যন্তু দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া।
    এই মৃত্যুর বীজ কি আমার ঘরেই লুকিয়ে ছিল ! কি জানি। ঘরটা কিন্তু পছন্দ করেই নিয়েছিলাম, বেডটাও জানলার ধারেই, আমার প্রিয় জায়গা। কিন্তু একটু একটু করে গোলমালগুলো বোঝা গেল। ঘরটা উত্তর মুখী, জানলাটা ছিল কোণাকুণি, মুখের সামনেটা দেওয়াল। রাস্তার লাগোয়া ঘর বলে সারাদিন ঘড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ কষ্ট দিত, গভীর রাত অবধি। বিশেষ করে হোস্টেলের সামনেই ছিল বাসস্টপ, সব গাড়ি কর্কশ শব্দ করে ব্রেক কষত। রোজ সকালে ঘুম ভাঙলে চোখের সমনেটা ঝুপসি অন্ধকার হয়ে থাকত, মনে হত দেওয়ালটা ভেঙে একটা জানলা কেটে বার করি। তবে কি বিছানার পাশে ওই অন্ধকার কোণেই মৃত্যু বসে বসে আমার ওপর নজর রাখত ! হয়তো তাই। খারাপ দিন জীবনে অনেক এসেছিল এর আগে, চূড়ান্ত ব্যর্থতা, কষ্ট, হতাশা, সবই। কিন্তু এই প্রথম জীবনকে রোজ এত একঘেয়ে লাগত, এই প্রথম ! সেটা কিছুটা মা-বাবা-ভাই-বোন ঘেরা জীবনকে ছেড়ে রুমমেট-সর্বস্ব জীবনে ঢুকে পড়ার কারণে। খোলামেলা বাড়ি ছেড়ে হঠাৎ একটা ছয় বাই চার বেডের জীবনে ঢুকে পড়ার কারণে, হট্টগোলবিহীন মফস্বলী জীবন ছেড়ে আওয়াজবহুল কলকাত্তাইয়া জীবনে এসে পড়ার কারণে। কিন্তু সেসব পরিবর্তন তো সকলেরই হয় ! খুব অজানা বা অপ্রত্যাশিত কিছুও নয়, তবে আমার ক্ষেত্রেই তা কেন শুধু ‘মনখারাপ’ না হয়ে এমন মৃত্যুরূপে দেখা দিল ?
    মৃত্যু যখন কাউকে নিয়ে খেলা করে তখন সেই মানুষটি অনেক সময় সেটা বুঝতেই পারে না; আমিও পারিনি। যতদিন ক্লাস চলছিল, একরকম ছিলাম, ক্লাসে বসে যা বুঝতাম না লাইব্রেরীতে গিয়ে গুছিয়ে লিখে নিতাম। আমার তৈরী করা নোট বন্ধুরাও কপি করে নিত, ওদের তৈরী করা নোটও এসে জমত আমার টেবিলে। পড়ে বুঝে যেতাম। শুধু কিচ্ছু মাথায় থাকত না, একটা ভাসা ভাসা ধারণা ছাড়া কিচ্ছু না। ভেবে রেখেছিলাম পরীক্ষার আগে মন দিয়ে পড়ে ঠিক হজম করে নেব, ভুল কিছু ভাবিনি, সেই ভাবেই পড়াশোনা হয় ইউনিভার্সিটিতে। শুধু আমারই মনে মনে একটা চূড়ান্ত অস্থিরতা ছিল যে কারণে মন বসত না।
    কিন্তু ততদিনে সে আমাকে সম্পূর্ণ অধিকার করে নিল। ক্লাস শেষ হয়ে যাবার পর লম্বা ছুটি। মানে স্টাডি লিভ। অথচ আমার তো পড়তেই ভাল লাগত না একটুও। পড়াশোনায় ফাঁকি জীবনে অনেক মেরেছি, ফলও পেয়েছি, নিজের ওপর রাগ হয়েছে কিন্তু এমন আস্তিত্বহীন মনে হয়নি। পড়ছি (মানে ফাঁকি মারছি না) অথচ বুঝছি না, মনে রাখতে পারছি না এই ঘটনা জীবনে আগে ঘটেনি। একপাতা পড়তে পড়তে এসে ওপরের দিকে কি পড়েছি কিচ্ছু মনে নেই। লম্বা ডেরিভেশনের কুড়িটা স্টেপ বুঝে বুঝে পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে সব তরঙ্গই আমার মস্তিস্ক ভেদ করে চলে যাচ্ছে, কোথাও থামছে না, তাহলে এটা কেনই বা আমার মনে থাকবে ! এতদিন জানতাম বুঝে পড়লে তা ঠিক মনে থেকে যায়। তার মানে আসলে কি আমি কিচ্ছু বুঝছি না।।।কেনই বা বুঝছি না, সবাই বুঝছে আমিই শুধু বুঝছি না, এটা কেন হচ্ছে ? যতই এমন মনে হয়েছে ততই বেশি করে পড়েছি বার বার, কিন্তু ধূসর কোষ বেয়ে এক অনন্ত ধূসরতা নেমে ছেয়ে থাকত সব বোধ, আর প্রতিদিন নতুন করে খারাপ লাগত নিজেকে। করুণা হত নিজের ওপর যেন ভুল করে এমন এক জগতে এসে পড়েছি যেখানে কোন কিছুই আসলে আমার জন্য নয়।
    এটা রূপকথার গল্প নয়, এখানে মির্যা ক্‌ল হয় না। হয়নি। পরীক্ষার আগে টেনশন সকলেরই হয় কিন্তু প্রতি মুহুর্তে শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত নেমে যায় যে জানে সে আসলে কিচ্ছু পারবে না। অথচ পরীক্ষা না দেওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই পরীক্ষায় বসা, খাতা জুড়ে যুদ্ধ-কাটাকুটি-অজস্র অসমাপ্ত উত্তরের মধ্যে থেকে পাশ করার (করাবার) রসদটুকু খুঁজে পেতে পরীক্ষকের বিস্তর ঝামেলা হয়েছিল বুঝতে পারি। ইলেক্‌ট্রন যে পোটেনশিয়াল এনার্জির দেওয়াল ভেদ করে ওদিকে যেতে পারে কিম্বা অণু-পরমাণুদের কম্পন-স্পন্দন কিভাবে তাদের বর্ণালীকে প্রভাবিত করে সেসব কিছুই আমি প্রতিষ্ঠা করিতে পারিনি শেষ অবধি, পারার কথাও নয়। সে সবই মৃত্যুর মধ্যে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাওয়ার টুক্‌রো টুক্‌রো কথা। সে সব কেউ দেখতে পেত না, কেউ জানত না আসলে আমি মরে যাচ্ছি, ভাবত পরীক্ষা খারাপ হয়েছে বলে মনখারাপ। পরীক্ষা খারাপ তো হতেই পারে কিন্তু কেন হল সেই গাঢ় অবসাদের কথা কেউ জানত না বুঝত না।
    অবশেষে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা। এত দিন কাগজে কলমে যত সমস্যা হয়েছিল হাতে কলমে অত কিছু হল না, মোটের ওপর পেরেই গেলাম (অত মনে রাখারাখির ব্যাপার তো ছিল না !)। কিন্তু তারও একটা মৌখিক পরীক্ষা হয়, মাত্র দশ নম্বরের, কিন্তু পরীক্ষা তো বটে ! সেই পরীক্ষায় পরীক্ষকের একেবারে মুখোমুখি। যা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তা খুব কঠিন কিছু ছিল না, বরং বেশ পছন্দের প্রশ্ন, বুদ্ধি করেই উত্তর দেওয়া যায়। কিন্তু চিরদিন তুখোড় উত্তর দেওয়া আমি সেইদিন তীব্রভাবে অনুভব করেছিলাম আমি কিছু ভাবতে পারছি না, আমি উত্তর দিতে পারলাম না, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল, ঠান্ডা ঘামে শরীর ভিজে গেল কিন্তু আমার মাথা থেকে কিছুতেই উত্তরটা বেরোল না। আমি বুঝতে পারছি, উত্তরটা খুব সোজা কিন্তু কোনো কিছুই ‘কেন হয়’ আমি জানি না। পরীক্ষক কিছুটা সাহায্য করেছিলেন, শেষে খুব বিরক্ত হয়ে হাতের ইঙ্গিতে চলে যেতে বললেন, মানে ‘ঢের হয়েছে, তোমার দৌড় বোঝা গেছে !’ সেই মুহুর্তে আমার মৃত্যু সম্পূর্ণ হল।
    তখন বয়স কম, পড়াশোনা-কেরিয়ারই জীবন। কিন্তু শুধু রেজাল্ট খারাপ বা কেরিয়ারের ক্ষতিই নয়, এই পরিণত বয়সে এসেও মনে করি নিজেকে সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যেতে দেখার সেই শূন্যতা মৃত্যুই বটে। সেই যে পরীক্ষকের হাত নেড়ে যেতে বলার ভঙ্গী সে তো ইউনিভার্সিটিতে পড়া কোনো ছেলেমেয়ের সঙ্গে হওয়ার নয় ! যে স্টুডেন্টের সঙ্গে কথা খরচ করাও অতিরিক্ত বলে মনে হয় আমি যদি সেই স্টুডেন্টই হয়ে গেলাম তবে আর মরে যেতে বাকি থাকল কিসের ! এইসব মৃত্যু-টিত্যু বলে কিছুটা অন্যরকম রঙ চড়ালেও আসলে তো সেটা একটা গ্লানি, আমার ক্লাসের আর পাঁচটা ছাত্র যা যা পারে সেগুলো না পারার গ্লানি। পরের দিন আবার মৌখিক পরীক্ষা, হাসিখুশি এক পরীক্ষক, আবার প্রশ্ন, খুব সোজা প্রশ্ন, আবার সেই একই না পারা। তবে পরীক্ষকের মুখের হাসিটি মেলায় না। হেসেই বলেন, এত নার্ভাস হওয়ার কি হল ! (ভাবতেই পারেন না যে এই প্রশ্নের উত্তর কেউ নাও জানতে পারে)। কিন্তু আমি তো জানি যে আমি আসলে জানি না, বেরিয়ে আসি তারপর কিছুক্ষণ পরে হঠাত ভেবে পেয়ে যাই উত্তরটা। আবার পরীক্ষার ঘরে ঢুকি বলি, আমাকে নম্বর দিতে হবে না, কিন্তু আমি জাস্ট উত্তরটা দিতে চাই। উত্তরটা শুনে উনি খুশি হন, বলেন তোমাকে নম্বরটা দেব (দিয়েছিলেন কিনা জানিনা)। সামান্য নম্বর কিন্তু সেই আমার মৃত্যুর হাত থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম পা।
    তবে ফিরে আসাটা খুব সহজ ছিল না। পরীক্ষার পর কয়েকদিন ছুটি, তারপর দ্বিতীয় দফার পড়াশোনা শুরু। কিন্তু আমি কি পরের দফার পড়াশোনা শুরু করব, যদি পাশই না করি ! শরতের পড়ে আসা বিকেল, পুজোর কেনাকাটার ভীড় সবকিছু ছাড়িয়ে আমি উত্তর কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় একা একা নিজেকে খুঁজে বেড়াতাম। সোনালী রোদ্দুরে দাঁড়িয়েও মাঝে মাঝে ভয়ানক শীত করে উঠত, মনে হত আমি স্বচ্ছ হয়ে গেছি, কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। লম্বা পুজোর ছুটিতে আমাদের মফস্বলের রাস্তায় একা একা ঘুরে আমি নিজেকেই ফিরে পেতে চেষ্টা করতাম। শুধু জানতাম না কিভাবে ফিরে পাওয়া যাবে।
    তারপর একদিন ভুলে যাওয়া পাসওয়ার্ড মনে পড়ে যায়, হঠাৎ দেখা যায় জং ধরা চাবি দিয়েই তালা খোলা যাচ্ছে। কান ঘেঁসে পাশনম্বর, পরিচিত মাস্টারমশাই দের চোখে চোখ রাখতে লজ্জা, কেউ কেউ ডেকে তীব্র বকাবকি বা বন্ধুদের দুঃখিত মুখ জানতে চাওয়া কি হয়েছিল।।।এ সবই ফিরে আসার পাঠক্রম। এসবই মৃত শরীরের শিরা-উপশিরায় নতুন করে রক্ত-সঞ্চালন যা কি করে হল তাও জানিনি কোনদিন। তবে পুজোর ছুটি থেকে ফিরে ঘরটা বদলেছিলাম, দোতলার একেবারে পেছনের দিকে কোণার ঘর, নতুন রুমমেট, জানলা দিয়ে নীচে তাকালে কলঘর, বেলা আটটা-সাড়ে আটটা থেকে সেখানে বেজায় ঠেলাঠেলি-ডাকাডাকি। কিন্তু বাকী সময় বিশেষ গোলমাল নেই। মাথার দিকে জানলাটা খুলে দিলে শীতের রোদ্দুর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে। কলঘরের পরে হোস্টেলের সীমানার ওপারে একটা জারুল গাছ। তার পাশে দোতলা বাড়ির জানলা দিয়ে এক বালকের মিষ্টি মুখ। মাঝে সে মার খেত মায়ের কাছে, কান্নার আওয়াজ পেতাম। এক একদিন তার মাকে চিৎকার করে বারণও করেছি। তার পাশে ছিল এক ব্যান্ড পার্টির রিহার্সাল রুম, সন্ধের পর তারাও প্রবল জগঝম্প সমেত রেওয়াজ করত কিন্তু এই সব মিলেই ছোট্ট ঘরটা বেশ মানিয়ে গেল। মৃত্যুরাখাল তার জাল গুটিয়ে নিয়ে ফিরে গেল, কিন্তু দাগ রেখে গেল আমার পরীক্ষার রেজাল্টে। সে কেন এসেছিল কেনই বা ফিরে গেল জানি না শুধু মাঝে মাঝেই ভাবি যদি ওই ঘরটায় না থাকতাম তাহলে কি মৃত্যু আমাকে এইভাবে দেখা দিতে পারত ! সে উত্তর আর পাইনি আজও।

    উপসংহার
    শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে আমাদের জীবন, দিনে দিনে শব্দেরা আকার পেয়ে আমাদের ধরা-ছোঁয়ার মধ্যেকার জীবনটা তৈরী করে দেয়, এই কথার কোনও ব্যাখ্যা দরকার নেই। কিন্তু সমস্ত শব্দ সকলের জীবনে আসে না, আবার যেসব শব্দেরা সত্যি ছিল তারাও মাঝে মাঝে টুপ্‌টাপ্‌ ঝরে পড়ে যায়, এভাবেই আমাদের জীবনের চেহারা একটু একটু করে বদলে যায় রোজই। হারিয়ে যাওয়া শব্দরা কখনও রাস্তা চিনে ফিরে যে আসে না তা নয় কিন্তু যে শব্দরা ফিরে আসার রাস্তাই খোলা রাখেনি তারাও কি কোথাও থেকে যায় না ? কখনও ঘুমের ঘোরে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চুকাকা, ফুলপিসী, শাশ্বত, অরুণিমা দের কি আমরা ডেকে উঠি না ! এইখানেই বোধহয় হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে ফুরিয়ে যাওয়ার তফাত। না হলে কিশোরবেলায় মা ডাক যার জীবন থেকে হারিয়ে গেছিল সত্তর বছরে পৌঁছে তিনিই কেন নতুন করে কথোপকথন শুরু করেন, ‘মা, যদি তুই আকাশ হতিস, আমি হতেম গাছ।।।’।

    পুনশ্চ ঃ এই লেখার সূত্র ধরে যদি কেউ কেউ নিজের নিজের হারিয়ে যাওয়া / ফুরিয়ে যাওয়ার কাছে পৌঁছে যেতে পারেন আর যদি সেইসব কথা কিছুকিছু ভাগ করে নেন, সেইরকম একটা ক্ষীইইইণ আশা রইল এককোণে।

    (আর চলবে না)
  • বিভাগ : ব্লগ | ১০ আগস্ট ২০১৬ | ৬৬১ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Titir | 138.210.106.129 (*) | ১০ আগস্ট ২০১৬ ০৭:৫৬55808
  • হারানো প্রাপ্তি পড়তে পড়তে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল এ যেন আমার যুগের কথা বলছে।
    ফুটনোট পড়তে গিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল।
  • asmita | 162.79.255.200 (*) | ১০ আগস্ট ২০১৬ ০৭:৫৯55809
  • ইতি তোমার হাত পা বাঁধা বাবা - কবিতাটা পুরো মনে আছে কারো?
  • Abhyu | 208.137.20.25 (*) | ১০ আগস্ট ২০১৬ ০৯:২৪55810
  • বড় ভালো লেগেছিল এই লেখাখানি। আর ঐ ফুটনোটটা - কার যে কখন সময় আসে। আর যারা রয়ে যায় স্মৃতিটুকু নিয়ে। হারানো প্রাপ্তি। একান্ত ব্যক্তিগত।
  • Ranjan Roy | 132.180.17.115 (*) | ১০ আগস্ট ২০১৬ ১২:৪১55807
  • চলুক; পড়ছি।
  • Ranjan Roy | 132.180.17.115 (*) | ১১ আগস্ট ২০১৬ ১২:১৩55811
  • স্মৃতি উসকে দিইঃ

    কিশলয়ের শুরুতে বোধহয় ধীরেন্দ্রমোহন দত্ত মশায়ের একটা ভূমিকা থাকত, নীচে 'শিক্ষা অধিকর্তা'। গোড়ার বাঁ-পাতায় অবন ঠাকুর বা নন্দলাল বসুর জলরঙে আঁকা কোন ছবি-- বর্ষাকালে মেয়েরা ক্ষেতে রোয়া লাগাচ্ছে, এমনি কিছু।
    রামসুক তেওয়ারি বেশ লেগেছিল।

    বাঙলায় কাটাইয়া গোটা দুই বর্ষা,
    রামসুক তেওয়ারির পরকাল ফর্সা।
    প্রাতে আর সন্ধ্যায় চা ধরেছে নিত্য,
    আজ বাড়ে অম্বল, কাল বাড়ে পিত্ত।
  • d | 144.159.168.72 (*) | ১২ আগস্ট ২০১৬ ০৮:৩০55812
  • এই শেষ পর্বটা অদ্ভুত। খুব মন খারাপ হল আপনাদের দুজনের জন্যই। আমার সেই ক্লাস এইটের বন্ধু, তখন বলতাম বেস্ট ফ্রেন্ড, এখনও তেমনি 'বেস্ট ফ্রেন্ড', প্রায় ৩৬-৩৭ বছরের বন্ধুত্ব আমাদের। তাই আপনার গল্প পড়ে কেমন অবাক যে লাগল কি বলি!
  • Arpita | 75.93.17.35 (*) | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০১:১১55814
  • খুব ভালো লাগলো।
  • de | 69.185.236.53 (*) | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১২:২৪55813
  • কি ভালো! ক্ষীইইই ভালো!!
  • অচেনা আপনজন | 113.237.76.18 (*) | ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ ০৮:১৫55815
  • হারিয়ে জাওয়া মানে শেষ হয়ে যাওয়া নহে.........
  • pi | 233.176.52.77 (*) | ২২ জানুয়ারি ২০১৭ ০৮:২৭55816
  • সেই বন্ধুকে মুখবইতে কখনো খুঁজেছ ? খুঁজতে ইচ্ছে হয়েছে?
  • AP | 24.99.99.171 (*) | ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ ১০:১০55817
  • হ্যাঁ খুঁজেছি শুধু আছে কিনা এই কৌতুহলে। খুঁজে পেতে মানে যোগাযোগ করতে আর ইচ্ছে হয়নি / হয়না।
  • Du | 182.58.105.114 (*) | ২৫ জানুয়ারি ২০১৭ ০৭:১৭55818
  • লেখাটা আমার এত ভালো লেগেছিল মন্তব্য করিনি দেখে খুবই আশ্চর্য্য হচ্ছি
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন