• হরিদাস পাল  ব্লগ

    Share
  • বদল

    ন্যাড়া লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৯ অক্টোবর ২০১৯ | ২৩৯ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • ছাত্র হয়ে অ্যামেরিকায় পড়তে যারা আসে - আমি মূলতঃ ছেলেদের কথাই বলছি - তাদের জীবনের মোটামুটি একটা নিশ্চিত গতিপথ আছে। মানে ছিল। আজ থেকে কুড়ি-বাইশ বছর বা তার আগে। যেমন ধরুন, পড়তে এল তো - এসে প্রথম প্রথম একেবারে দিশেহারা অবস্থা হত। হবে না-ই বা কেন? এতদিন অব্দি রাস্তায় গাড়ি দেখেছি অ্যাম্বাসেডর আর মারুতি। কন্টেসা দেখলে লোক জমে যেত। সবে বেরোন স্ট্যান্ডার্ড ২০০০ গাড়ি দেখা গেলে বাড়ি থেকে লোক ডেকে এনে দেখান হত। ভেন্ডিং মেশিন দেখিনি কভু - মানে পয়সা ফেললাম আর ঘটাত করে কোকের ক্যান বেরিয়ে এল। ভেন্ডিং মেশিন ছাড়ুন, কোকের ক্যানই দেখিনি। দেহাতিপনার বহরটা বুঝছেন? বম্বে-টম্বের দু'চারটে ছেলে একটু ওপর-চালাকি মারত, হয়ত কোনদিন দুবাই ঘুরে এসেছে, তাই বিদেশী গাড়ি, কোকের ক্যান দেখা আছে। কিন্তু চান করতে ঢুকে ঠান্ডা-গরমের কল চালাতে গিয়ে বিপর্যস্ত হয়নি এমন ছেলের সন্ধান আমি জানিনা।

    কাল্পনিক উদাহরণ দিয়ে কী লাভ। আমার কথাই ধরুন। প্রথমদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় দুপুরের খানা খেতে গেছি। অ্যামেরিকান হ্যামবার্গারের নাম তো অনেক শুনেছি, ভাবলাম সেটাই চেখে দেখা যাক। পড়েছি যখন যবনের হাতে। গিয়ে দেখি দিব্যি ব্যবস্থা। দোকানের সামনে দড়ি দিয়ে লাইন। সেই লাইনে নানাদেশি ছেলেমেয়ে অর্ডার দেবার জন্যে অপেক্ষা করছে। কাউন্টারের পেছনে আলোকোজ্জ্বল বোর্ডে নানারকম খাবারের ছবিসহ নাম-দাম দেওয়া আছে। বোঝার কোন অসুবিধে নেই। ফিরিস্তিটা লম্বা। হ্যামবার্গারের তলায় রয়েছে চিজবার্গার। সে কী চিজ কে জানে! যাকগে, ভাবলাম, আমি তো চোখ বুজে একটা হ্যামবার্গার অর্ডার দিয়ে দিই। হ্যামবার্গারের পাশে লেখা স্যান্ডুইচ - $১.০৯, মিল - $২.১৯। সঙ্গে এক বছরের পুরনো এক পাপী ছিল। সে বুঝিয়ে দিল। বলল, মিলটা নে। তালে সঙ্গে লম্বা ফালি করে কাটা আলুভাজা আসবে। আর আসবে এক গেলাস ঠান্ডা - কোক বা ওই জাতীয় কিছু। তিনটে আলাদা করে কিনতে যা খরচ তার থেকে একসঙ্গে মিল নিলে সস্তা পড়বে। ঠিক আছে। তাই নেব। সস্তায় আমার আপত্তি নেই। অতএব, লাইন ধরে এগিয়ে কাউন্টারের কাছে পৌঁছচ্ছি। এমন সময়ে হঠাৎ হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। এই মেরেছে। কাউন্টারের মেমসাহেব তো ইংরিজি বলবে। বুঝব কী করে? এখনও সাহেব-মেমদের ইংরিজি শুনে বোঝা রপ্ত হয়নি। কী যে সুর করে বলে যায়, দুচারটে শব্দ বুঝি, বাকিটা আন্দাজ। পরক্ষণেই আশা জাগল। বোঝার আর আছেটা কী? বলব তো আমি। খুচরো-টুচরো গুণে রেখেছি। চোখ-কান বুজে "ওয়ান হ্যামবার্গার মিল" বলে দামটা হাতে গুঁজে দেব, আবার কী! তারপরে খাবারটা ভেতর থেকে এনে একটা লাল ট্রে-র ওপর সাজিয়ে হাতে ধরিয়ে দেবে। তাই তো দেখছি সবাইকে দিচ্ছে। কথা বোঝার সুযোগটা কোথায়! মিছামিছি কর কেন চিন্তা!

    কিন্তু তারপরে যেটা হল, সেটা আনপ্ল্যানড। কাউন্টারে গিয়ে আমি কিছু বলার আগেই মেয়েটা অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে কী একটা জিগেস করে ফেলেছে। এরকম তো কথা ছিল না! মেয়েটা - ১, আমি - ০।

    আমি কি ডরাই কভু ভিখারী রাঘবে? আমি ততোধিক তৎপরতায় বলেছি "ওয়ান হ্যামবার্গার মিল"। মেয়েটা - ১, আমি - ১।
    মেয়েটা আবার সেই প্রশ্ন করেছে। তার মানে আমি যে ভেবেছিলাম, প্রশ্নটা আদতে "কী চাই", তা নয়। আমি কমপ্লিট ভ্যাবলা। মেয়েটা - ২, আমি - ১।

    মেয়েটা বুঝে গেল আমি দেহাতি, গ্রামদেশ থেকে এসেছি। ভেতরে গিয়ে খাবার এনে লাল ট্রে-তে দিল। তারপরে ঠকাং-ঠকাং করে ক্যাশ রেজিস্টারে কিসব টিপল, সামনের ডিসপ্লেতে দেখলাম দাম এসেছে আমার হিসেবের থেকে প্রায় কুড়ি সেন্ট বেশি। কেন, সে কথা জিগেস করে লাভ নেই। কারণ বললেও বুঝতে পারব না। কাজেই মানে মানে আরও কুড়ি সেন্ট যোগ করে পয়সা দিয়ে খাবার নিয়ে বেরিয়ে এলাম। মেয়েটা - ৩, আমি - ১।

    তারপরে রিসিটে দেখি কুড়ি সেন্ট বেশি যে এসেছে সেটা ট্যাক্সের জন্যে। আর সেই প্রথম প্রশ্ন? পরে বুঝেছি, ওটা জিগেস করেছিল, "এখানে খাবে না নিয়ে যাবে - For here or to-go?" এখানকার ফাস্টফুড কাউন্টারের বাঁধা প্রথম প্রশ্ন। "নিয়ে যাব" বললে কাগজের ঠোঙায় খাবার মুড়ে দেবে, আর নইলে ট্রেতে।

    ঘটনাটা এত ফলাও করে বললাম এই কারণে যে প্রথম-প্রথম পদে পদে এমন বিপদ ওঁত পেতে থাকত। পাকামি করে স্যালাড কিনতে গেছি, জিগেস করে "কী ড্রেসিং দেব?" এক গাল মাছি! একটারও নাম জানিনা। চালাকি করে জিগেস করলাম, "কী কী আছে?" তখন বলে, "সব আছে।" ব্যস, আমি মরি স্বখাত-সলিলে। কদিন পরেই বুঝে গেলাম, ওপরচালাকি করে লাভ নেই। হাত তুলে অনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

    এইভাবে লোকে আস্তে আস্তে অ্যামেরিকায় অভ্যস্ত হয়। একদিন পাশ করে বেরয়। চাকরি পায়। স্টুডেন্ট ভিসা এফ-ওয়ান থেকে চাকরির এইচ-ওয়ান ভিসায় যায়। নতুন অ্যাপার্টমেন্টে নেয়। প্রথমে আরেকজনের সঙ্গে শেয়ারে, তারপরে একা। বাবা-মা বেড়াতে আসেন। বিয়ের জন্যে চাপ দেন। বিয়ে করে। সন্তান হয়। গ্রীনকার্ড হয়। বাড়ি কেনে। প্রথমে স্টার্টার হোম। টাউনহাউজ হয়তো। তারপরে সিঙ্গল ফ্যামিলি হোম। পেছনে ব্যাকইয়ার্ড। লন মো করতে হয়। দ্বিতীয় সন্তান। গাড়ি লজঝড়ে স্টুডেন্ট কার থেকে সেডান হয়ে মিনিভ্যান হয়। সিটিজেনশিপ হয়। সন্তানের কলেজের জন্যে পয়সা জমানো শুরু করতে হয়। নিজেদের রিটায়ারমেন্টেরও। তৎসহ আধিব্যাধির চিন্তা। ছেলেটা থেকে লোক হয়ে অনাবাসী হয়ে যায়।

    দেশ বদলে যায়।
  • বিভাগ : ব্লগ | ১৯ অক্টোবর ২০১৯ | ২৩৯ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আরও পড়ুন
আয়না - ন্যাড়া
আরও পড়ুন
- - স। র। খান
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • S | 890112.162.564523.249 (*) | ৩০ অক্টোবর ২০১৯ ০৫:৩০51033
  • এই গল্পগুলো চলুক।
  • Swati Ray | 236712.158.786712.67 (*) | ৩০ অক্টোবর ২০১৯ ০৫:৪৩51034
  • তোর এই দারুন লেখাটা প্রায় মিস করে যাচ্ছিলাম। কি যে করিস!
  • :-G | 237812.68.9008912.66 (*) | ৩০ অক্টোবর ২০১৯ ০৬:৪৫51032
  • বি-এর গরুর গপ্পের ওপর আমাদের স্যানিণি কি কিছু মত দিবেন্না? গোরুর পিঠে চড়ে পুরোনো গুরুর দিনে ফির্তে চাওয়া কি খুব্বেশী কিছু চাওয়া? এই বাজারে?
  • Lama | 236712.158.565612.49 (*) | ০৫ নভেম্বর ২০১৯ ০৮:০৬51035
  • জীবনে একবারই আমেরিকা গেছি। খাবারের দোকানের লোকেরা নানা ক্থা জিগায়। হোমিওপ্যাথদের মত। শেষে, খাবারের অর্ডার দিতে গেলে কোনো সায়েব বন্ধুকে শিখিয়ে পড়িয়ে সঙ্গে নিয়ে যেতাম। তাকে দিয়েই খাবারের অর্ডার দেওয়াতাম।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত