
যে চোখ সব কিছু দেখে, সে কিন্তু নিজেকে দেখতে পায় না, তাই চোখে পোকা পড়লে আমরা পাশের লোকটাকে বলি দেখতে। ডাক্তার সবার অপারেশন করে, তার পেটে ব্যামো হলে? জোনাকির নিজের বুকে আলো, তবু সে ধেয়ে আসে আলোর উৎসের দিকে। এ উদাহরণ অন্তহীন। জ্ঞানী লোকেরা হলে উদাহরণ দিয়েই বুঝিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু আপনি পড়েছেন আমার পাল্লায়। অত জ্ঞানী হলে আজ আমি প্রফেসর হতুম। সে যাক গে। ... ...

এর মধ্যে লকেট চট্টোপাধ্যায় বলেছেন এনকাউন্টার চই। 'দোষীদের রাস্তার মাঝখানে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে দেওয়া উচিত।' লকেট বলেছেন যখন, খুবই যুক্তিযুক্ত কথা। কিন্তু কাকে মারা হবে খুব পরিষ্কার নয়। প্রসঙ্গত যোগী প্রশাসনের ময়নাতদন্তের রিপোর্টের কোথাও ধর্ষণের উল্লেখ নেই। বলা হয়, মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যাওয়ার কারণেই তীব্র শ্বাকষ্টের সমস্যা তৈরি হয়েছিল। দু'টি পা এবং হাত অসাড় হয়ে যায়। জিভের একাংশে যে গভীর কামড়ের ক্ষত ছিল, তা-ও ময়নাতদন্তের রিপোর্টে আছে। নেই শুধু ধর্ষণের উল্লেখ ... ...

১৯৭০-এর গোড়া। বাঁকুড়ার ছোট্ট মফস্সল শহর বিষ্ণুপুর থেকে বেরিয়ে পড়লেন তিন তরুণ। দুনিয়া ঘুরে দেখতে হবে। সাইকেলে। ইন্টারনেট নেই। জিপিএস নেই। গুগ্ল ম্যাপ নেই। অর্থবল নেই। মাতৃভাষা বাংলা বই দুটি ভাষা জানা নেই। সম্বল স্রেফ স্বপ্ন। আর জেদ। হাল ছাড়লেন দুজন। ঘুরতে থাকল তৃতীয়জনের সাইকেলের চাকা। ১৭ বছর। ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। ১৫৪ টি দেশ। আজও এ কীর্তিতে তিনি অদ্বিতীয়। এই প্রথম দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সে পরমাশ্চর্য সফরের অনুপুঙ্খ কাহিনি শোনাচ্ছেন জয় মণ্ডল। এ পর্বে চম্বলের ডাকাতের খপ্পর ও ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে সাক্ষাৎ। আলাপে নীলাঞ্জন হাজরা। ... ...

বাংলা লিখিত সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের যুগ থেকে কোম্পানি-রাজের পত্তন পর্যন্ত রচিত নানা বাংলাগাথা চর্ব্যচোষ্যলেহ্যপেয়র রঙিন বিবরণে ভরপুর। উঠে আসে বাঙালির রসনা-সংস্কৃতির বিবর্তনের ছবি। এ কিস্তিতে নিরামিষ ভূরিভোজ। লিখছেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। ... ...

ডেভিড লিভিংস্টোন। আফ্রিকায় বেপাত্তা। কিংবদন্তি মানুষটির খোঁজে আফ্রিকা পৌঁছেছেন মার্কিন সাংবাদিক হেনরি মর্টন স্ট্যানলে। জাঞ্জিবার থেকে শুরু হবে আফ্রিকার গভীরে অভিযান। আপাতত তিনি সেই শহরে। তারপর? স্ট্যানলের সেই বিখ্যাত সফরনামা ‘হাও আই ফাউন্ড লিভিংস্টোন’। শুধু সফরের অ্যাডভেঞ্চারই নয়, শ্বেতাঙ্গ উপনিবেশ-বিস্তার এবং একজন অবনেদি নীচুতলা থেকে উঠে আসা শ্বেতাঙ্গের চোখে ঊনবিংশ শতকের অফ্রিকা এবং সেখানে উপস্থিত ঔপনিবেশিক শাসনকর্তাদের জীবনের এক অমূল্য দলিল। এই প্রথম বাংলায়। তরজমায় স্বাতী রায়। ... ...

ধন্য খিচুড়ি। চাল-ডালের কিংবা বাজরার, নাকি তিলের? নিরামিষ বা আমিষ, হিন্দু নৈবেদ্য, জৈন মহাপণ্ডিতের শাস্ত্র, বৌদ্ধ মঠের অনুশাসন, মুসলমান বাদশাহি মহল-ই-খুরাক পাজ়ি, চিকিৎসকের ভেষজালয়, অকিঞ্চনের হেঁশেল, ভোজের একান্ন পাত—সর্বত্র বিরাজমান এ পাকোয়ানে কী বিপুল বৈচিত্র্যে আমরা ভারতবাসীরা যুগে যুগে একাত্ম হলাম! সে এক মহারহস্য বটে… কম রঙিন নয় কালাপানি পার করে তার বিলেত মায় মিশর পাড়ির কিস্সা। শুরু হল খিচুড়ি মহারহস্য অ্যাডভেঞ্চার। নীলাঞ্জন হাজরা। ... ...

এ কদিন তুমি আসোনি কেন গো?অসুখবিসুখ করেছিল নাকি? সে বলল - না রে বাপ,ছেলেটা মরে গেল। এই কথাকটি বলে জল থাবড়াতে থাবড়াতে সে চিৎকার করে বাটা মাছ,কাৎলা মাছ,পাঙাশ,সিলভার কাপ বলে খদ্দের ডাকতে লাগল। নোয়াপাড়া থেকে আসা আমার প্রতিদিনের দেখা মা, শোককে জলে ডুবিয়ে মাছ বেচতে এসেছে। নাহলে পেটের খাবার জুটবে না।খিদের কাছে ম্লান হওয়া শোক আমার চেতনার ধুড়ধুড়ি নেড়ে দিয়েছে। ... ...

এই তথ্যগুলোর বিচারে বলা যায়, নীতি আয়োগের কৃষি, কৃষক ও কৃষিপণ্য মূল্য নিয়ে যে ধারণা তা অত্যন্ত মায়োপিক। আমাদের কৃষির সমস্যা সমাধানের জন্য নয়, শুধুমাত্র কৃষিপণ্য বাজারে কিছু অ্যাগ্রিগেটরকে জায়গা করে দেওয়ার জন্য এই আইন করা হয়েছে। নতুন আইন কোনো সমাধানই নয়। তেমনি এখনই এর জন্য কৃষকের ভয়ানক সর্বনাশ হয়ে যাবে এমনও নয়। আবার ফড়ে বলে যে সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তারা ভয়ানক অপরাধ করে যাচ্ছে তাও নয়। এটা ঠিক মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়েরা ভোক্তা যে মূল্য পণ্যের জন্য দেয় তার ১০-৭০% বিভিন্ন পণ্যের জন্য পেয়ে থাকে। কিন্তু এই ব্যবস্থা একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে জন্ম নিয়েছে। অর্থনীতিতে কিছু ভূমিকা এরা পালন করেছে, তা নানা কারণে কৃষকের পক্ষে যায়নি। যতক্ষণ না সেই প্রক্রিয়ার পরিবর্তন হয় মধ্যস্বত্বভোগী থাকবেই, তা সে ধুতি পরা গ্রাম্য হোক আর কর্পোরেট সংস্থাই হোক। এই মুহূর্তে কর্পোরেট সংস্থার মাধ্যমে কৃষিপণ্যের বাজারজাত করা শুরু হলে খুব দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, পণ্যসংগ্রহের জন্য কর্পোরেটকে সেই ফড়েদের ওপরেই নির্ভর করতে হবে। নীতি আয়োগের আলোচনায় আরও যা লক্ষ করা হয়নি তা হল অকৃষি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ। ভারতের অর্থনীতির যা চেহারা তাতে একে লুম্পেন অর্থনীতি আখ্যা দেওয়াই যায়। কৃষিতে অবাঞ্ছিত শ্রমিক বা এরপর উপার্জন হারানো ফড়ে (ধরে নিলাম হবে) কোথায় যাবে? গ্রামে শুধু নয়, আমাদের শহরেও লুকোনো রয়েছে বেকারত্ব। এসব দেখেও না দেখার ভান করা কৃষিনীতি ও তার ওপর ওপর বিরোধিতা আসলে নিজেদের সামগ্রিক ব্যর্থতা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা, সরকারের এবং বিরোধী পক্ষের। ... ...

যতবার আপনি নিজের ধারণার পক্ষে আওয়াজ তোলেন, ততবারই আসলে আপনি তথ্য সরবরাহ করেন বিপক্ষের প্রচারের হাতে। আপনি নিজেকে চিনিয়ে দেন। বিপক্ষ আপনাকে প্রচারের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়। আপনি নিজের জগত তৈরি করে তাতে বসবাস করতে থাকেন, বিদ্রোহ, বিপ্লব করতে থাকেন। আপনার বন্ধুবৃত্তের ছোট্টো বৃত্ত তাতে আপনাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দেয়। বিপক্ষ এসবে হস্তক্ষেপ অবধি করেনা। বরং তাদের প্রচার আরও নিখুঁত হয়ে ওঠে। আপনি আপনার বৃত্তে বন্দী হয়ে থাকেন, আপনার এলাকার সম্পূর্ন বাইরে বিপক্ষের প্রচার চলতে থাকে, চুপচাপ। আপনি জানতেও পারেননা। এর জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য একমাত্র আপনার। কারণ আপনি জেনেবুঝেই সমস্ত তথ্য তুলে দিয়েছেন ওই সর্বগ্রাসী ব্যবস্থার হাতে ... ...

কয়েকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হয়নি, ধরা যাক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোভিডের মতো কোনো আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত বিপদের সময় কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে বহাল রাখা যাবে? বন্যা অথবা ঝড় হলে (একটি শহর যেভাবে মোকাবিলা করবে একটি প্র্যত্যন্ত গ্রাম সেভাবে বাস্তবিকভাবেই পারবে না, কোনো দুর্গম অঞ্চলে অবস্থা আরও শোচনীয়) বা এজাতীয় কোনো অস্বাভাবিক ও কঠিন সময়ে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলির কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত? জুলাই মাসে যখন এই নীতিটি প্রকাশ করা হচ্ছে, তখন কোভিডের সর্বাধিক সীমা ছোঁওয়ার একটা পূর্বাভাষ পাওয়া যাচ্ছে, মাসের পর মাস যেখানে স্কুল বন্ধ, তখন শিক্ষাব্যবস্থায় কী বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার, এমতাবস্থায় শিক্ষকরা কীভাবে পড়াবেন এরকম কোনো প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয়নি। অনলাইন এবং অফলাইন লার্নিং-এর কী পদ্ধতি এরকম পরিস্থিতিতে কেমনভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে তার কোনো উল্লেখ নেই। ইন্টারনেট না থাকলে শিক্ষা কীভবে বহাল থাকবে? এরকম কোনো বিষয়ই উঠে আসেনি। এই প্রসঙ্গে বলি, আমি আপ্লুত, যে কোভিডের এই আস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে কিছু নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক আজ সফল। এই কঠিন সময়ে, কোনো সাহায্য ব্যতীত, নিজস্ব উদ্যোগে নতুন শিক্ষণকৌশল উদ্ভাবন করে শিশুদের কাছে পৌঁছোতে পেরেছেন। ... ...

ঋতুপর্ণ ঘোষ বললেন যে “আমি আগুনের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসেছি— যা পোড়বার তা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা বাকি আছে তার আর মরণ নেই।”— এই লাইনটি 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসে নেই। সত্যজিৎ রায়ের নিজের রচনা। তিনি উপন্যাসে কোথাও খুঁজে পাননি। ঋতুপর্ণ ঘোষের নিজের কথায়— "আমি যখন ছবিটা দেখি, আমি ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে এতো ইম্পর্ট্যান্ট একটা লাইন আমি মিস্ করে গেছি! আমি পাইনি! আমি আবার 'ঘরে বাইরে' পড়তে লাগলাম, দেখলাম লাইনটা নেই। তখন আমি বুঝলাম লাইনটা সত্যজিৎ রায়ের বানানো।… ওই জায়গাটা খাঁটি রাবীন্দ্রিক মনে হয়।" কিন্তু এই লাইন দু'টি পাওয়া যাবে 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসে বিমলার শেষ আত্মকথায়। এটি উপন্যাসেরও শেষ আত্মকথা। 'ঘরে বাইরে' উপন্যাস মোট আঠারোটি আত্মকথার সমাহার। আত্মকথাগুলি হচ্ছে বিমলা, নিখিলেশ আর সন্দীপের। এর মধ্যে সাতটি আত্মকথা বিমলার। উপন্যাস শুরু হয় বিমলার আত্মকথা দিয়ে আবার শেষও। মজার কথা কেবলমাত্র ওই দু'টি লাইনই উপন্যাসে আছে বাকিটা সত্যজিৎ রায়ের বানানো। ভয়েস-ওভারে সত্যজিৎ রায়ের নিজস্ব সংযোজনটুকু হল— ... ...

পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের ভিত-প্রতিষ্ঠা হয়েছিল অগণতান্ত্রিকতার মন্ত্রে। স্বাধীনতার শর্তে দেশভাগের ঘোষণা ছিল জনমতের বিপরীতে গৃহীত একটি ব্যক্তিগত অহং পরিতৃপ্তকারী সিদ্ধান্ত। তাই নিরীহ মানুষের রক্তগঙ্গার বিনিময়ে এসেছিল র্যাডক্লিফ-লাইন। একদিকে হিন্দু-শিখ-মুসলমানের লাশের পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে সেদিন উত্তোলিত হয়েছিল ত্রিরঙা পতাকা, বর্ষিত হয়েছিল রক্তমাখা ফুল। ‘মহাত্মা গান্ধী কি জয়’ চিৎকারে ধ্বনিত হয়েছিল আকাশ-বাতাস। অন্যদিকে, গান্ধীজী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর একটি প্রস্তাবের উত্তরে বলেছিলেন, “চতুর্দিকে লোকে না খেতে পেয়ে মরছে। এই ভয়াবহ দুর্দশার মাঝখানে আপনি উৎসবের আয়োজন করতে চান?” সুতরাং, ঠোকাঠুকি লেগেছিলই শুরুতেই। আসলে, যে কোনও অগণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠা গণতন্ত্রমতে চলতে পারে না। ... ...

বিশিষ্ট কিছু বিজ্ঞানীর কথা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের স্বর্ণযুগের কাহিনি, গণ-আন্দোলনে বিজ্ঞানীদের অবস্থান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক প্রচারে অপবিজ্ঞানের জনপ্রিয় ব্যবহার, গণ-মারণাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের ভূমিকা। বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে একগুচ্ছ প্রবন্ধের সংকলন। পড়লেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের কর্মী বিষাণ বসু। ... ...

মিয়া কোতু। আফ্রিকার মোজাম্বিকে বংশানুক্রমে বসবাসকারী শ্বেতাঙ্গ পোর্তুগিজ। পোর্তুগিজ ভাষার শ্রেষ্ঠ আধুনিক সাহিত্যিকদের অন্যতম। পোর্তুগাল ও ব্রাজিলের যুগ্ম ভাবে দেওয়া পোর্তুগিজ সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার কাময়েঁশ (২০১৩) সহ বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত। অ্যানিমিস্ট রিয়ালিজম শৈলীর লেখক। তাঁর সেরা উপন্যাস ত্যারা সুনাম্বুলা (স্বপ্নচারী দেশ)। ১৯৭৫-এ মোজাম্বিকের স্বাধীনতা ও পরবর্তী কালের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষিতে লেখা এক নিরন্তর খোঁজের কাহিনি। পড়লেন পোর্তুগিজ ভাষার শিক্ষক ও তরজমাকার ঋতা রায়। ... ...

মেক্সিকোর শিল্পী ফ্রিদা কালো। তাঁর ডায়ারির বাংলা তরজমা। মৃত্যু, যন্ত্রণা, ভিতরের চাপা বেদনা—এ সবই লিপিবদ্ধ পাতায় পাতায়। কিছু টুকরো টুকরো শব্দ। পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝা দায়। হয়তো তাদের ভিতরে কোনো সংকেত আছে। বিভিন্ন শব্দের আশ্চর্য সম্মোহক সব স্বরভঙ্গির ওঠাপড়া। লিখছেন শিল্পী হিরণ মিত্র। ... ...

আমি গেলেই ডাকতেন, ও খোকা, মিত্তিরবাবুর বাড়ির ছেলে না ? হ্যাঁ, বলতে তাঁর একের পর এক প্রশ্ন ধেয়ে আসত আমার দিকে। “ভাত খেয়েচ? কী দিয়ে ভাত খেলে ? মাছ খেইলে ? কী মাছ। মাছের কালিয়ায় কি ফুলকপি ছিল। টমটমের চাটনি ছিল কি ? ক্ষীর খেয়েচ কাঁটাল দিয়ে। মাংস কবে খেয়েচ খোকা…” এখন বুঝতে পারি ক্ষুধার্ত মানুষের জিজ্ঞাসা ওসব। গরিব কাহার পাড়ার মানুষের না ছিল জমি, না ছিল কাজ। অন্ন সংস্থান হবে কী করে ? ভোটো কাহার রিকশা করেছিল, তা তার নিজের না অন্য কারোর টাকায় কেনা তা জানতাম না। গ্রামের বাঁড়ুজ্যে বামুনের সঙ্গে ভোটো কাওরার খুব বিবাদ ছিল। রিকশায় চেপে তিনি এক টাকা ভাড়া হলে আট আনা দিতেন। আট আনা বাকি থাকল। বাকিটা শোধ দিতেন না। বাঁড়ুজ্জ্যে মশায়ের ছেলেদের নাম ছিল, ধরুন, অমলকিশোর, বিমলকিশোর, কমলকিশোর, কুনালকিশোর...। ভোটো কাহার কী করল, তার ছেলেদের নাম সব বদলে অমলকিশোর, বিমলকিশোর...। করে দিল। সেই নামে ডাকা শুরু করল। বাঁড়ুজ্জ্যে মশায় রেগে কাঁই। একদিন বেজায় খাপ্পা হয়ে রাস্তায় ঝগড়া, তাঁর ছেলের নামে নিজের ছেলের নাম রেখেছে কেন ভোটো ? ভোটো উদাসীন হয়ে জবাব দিয়েছিল, নাম কি কারোর নিজের সম্পত্তি। মেয়ের নামও বাঁড়ুজ্জ্যে মশায়ের মেয়ের নামে রেখেছিল, ছায়া, মায়া... ... ...

পুজোর গামছার প্রধান দুই সমস্যা ছিল তাদের দৈর্ঘ্য এবং ঘনত্বের। সবচেয়ে নিকৃষ্টমানের গামছা সাপ্লাই করা হত পুজোর সময় ব্রাহ্মণদের প্রণামীতে। সেই গামছা প্রায় মসলিনকেও হার মানিয়ে দেয়, অনেকে ভয়ে ভাঁজই খুলত না গামছার, এই যদি ফেঁসে যায়! তবে পুজোতে গামছা এক সিম্বলিক জিনিস ছিল প্রায় – ডাঁই করে রাখা গামছার উপরের কয়েকটায় কিছু সিঁদুর এবং ফুল-গঙ্গা জল পড়ত। তাদের তলার গুলো পুজো শেষ হয়ে গেলে ব্রাক্ষণ ঠাকুর নিজে গিয়ে বিক্রী করে দিয়ে আসত আমরা যেই দোকান থেকে কিনেছি। পরের বছর আবার সেই গামছা আমরা কিনতাম। ... ...

আজ খুব বেশী রান্না হবে না। দুপুরের খাওয়া সেড়ে আজ মুড়ির ধান বানা হবে যে। আজ বাজারের ব্যাগ নিয়ে কোনো রিক্সাওয়ালাও তাই আসবে না। রান্নাঘরের মাচার নীচে রাখা সবজির ধামার তলানিতে যা আছে তা দিয়েই দুপুরের পর্ব সারা হবে। ঠাকুমা কালো পাথরের বাটি হাতে বড়ঘরের দিকে যেতেই আমি পিছু পিছু হাঁটা ধরি, ও ঠাকুমা নেলপলিশের রঙটা কত সুন্দর দেখছো? ঠাকুমা পেছনে ফেরে না, ওসব রঙ ভাল না; আমার দিদি তো রঙ ছাড়াই সুন্দর। আমি থেমে যাই। লাল বারান্দায় বসে ভাবি, কাল ফেরিওয়ালা এলে সব ফিরিয়ে দেবো। ... ...

শুধুমাত্র ছবি আঁকার জোরে টাকা-পয়সা আয় করে কলকাতায় কাটিয়ে এসেছে জয়ি কয়েক মাস, শিল্পী-সাহিত্যিকদের অনেককেই চেনে সে এখন, জয়ি এখন স্বাভাবিক নেতা ওর বন্ধু-বান্ধবীদের। সবাই মিলে ঠিক হয়েছে পরের সংখ্যা থেকে শাম্ব ছাপানো হবে, আর হাতে-লেখা নয়। রাঁচি থেকে শ্যামলিমা-অরুণিমাও এলো; দুজন সম্পাদক, অরুণিমা আর জয়ি। তুলি প্রস্তাব দিয়েছিলো শাম্বর ঠিকানাটাও বদলিয়ে এখন কলকাতায় জেঠুর বাড়ির ঠিকানা দেওয়া হোক, সে প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেলো। জয়ি বললো কলকাতার হাজারো লিট্ল্ ম্যাগাজিনের মধ্যে শাম্ব হারিয়ে যাবে, এখানকার ঠিকানাই ভালো। ... ...

তারপর প্রথম পৃষ্ঠায় সবুজ কালিতে লিখল, ‘আজ প্রথম সর্বশক্তিমানকে দেখলাম। ইনি কাউকে জোর করেন না। কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দেন না। তাঁর কাছে গেলে তাঁর শক্তির কিছুই টের পাওয়া যায় না। তাঁর ব্যবহার অতি মধুর। এই মাধুর্য দিয়েই তিনি সবাইকে জয় করে নেন। আমাকেও তিনি জয় করে নিয়েছেন। একটা সকালেই আমার জীবন বদলে গেছে। এখন প্রতি মুহূর্তে আমার ওপরে তাঁর অপরিসীম প্রভাব আমি টের পাচ্ছি। সম্মোহিত হয়ে আছি আমি। তাঁর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। যাদের শক্তি থাকে না, তারা প্রতি মুহূর্তে নিজেদের শক্তিকে জাহির করে। তিনি সর্বশক্তিমান, নিজের শক্তিকে তাই তিনি অনাবশ্যকভাবে টের পেতে দেন না।’ ... ...