• বুলবুলভাজা  পড়াবই  সীমানা ছাড়িয়ে

  • নিশিতে পাওয়া এক দেশের কাহিনি

    ঋতা রায়
    পড়াবই | সীমানা ছাড়িয়ে | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫৭৮ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • পর্তুগিজ সাহিত্য - ১
    মিয়া কোতু। আফ্রিকার মোজাম্বিকে বংশানুক্রমে বসবাসকারী শ্বেতাঙ্গ পোর্তুগিজ। পোর্তুগিজ ভাষার শ্রেষ্ঠ আধুনিক সাহিত্যিকদের অন্যতম। পোর্তুগাল ও ব্রাজিলের যুগ্ম ভাবে দেওয়া পোর্তুগিজ সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার কাময়েঁশ (২০১৩) সহ বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত। অ্যানিমিস্ট রিয়ালিজম শৈলীর লেখক। তাঁর সেরা উপন্যাস ত্যারা সুনাম্বুলা (স্বপ্নচারী দেশ)। ১৯৭৫-এ মোজাম্বিকের স্বাধীনতা ও পরবর্তী কালের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষিতে লেখা এক নিরন্তর খোঁজের কাহিনি। পড়লেন পোর্তুগিজ ভাষার শিক্ষক ও তরজমাকার ঋতা রায়


    আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ভারত মহাসাগরের তীর বরাবর মোজাম্বিক, বা পোর্তুগিজ উচ্চারণে, মুসাম্বিক। ১৪৯৮ সালে প্রথমবার ভারতে আসার পথে ভাশকু দা গামা এখানে নেমেছিলেন। তারপর ১৫০৫ থেকে ১৯৭৫ অবধি মুসাম্বিক ছিল পোর্তুগালের উপনিবেশ। ১৯৬৪ থেকে অবশ্য শুরু হয়ে গেছে স্বাধীনতার যুদ্ধ, যা আফ্রিকায় পোর্তুগালের তিনটি উপনিবেশে (আঙ্গলা, মুসাম্বিক ও গিনে-বিসাউ) একসঙ্গে চলতে থাকা বৃহত্তর ‘গেরা কুলোনিয়াল পুর্তুগেজা’-র (১৯৬১-১৯৭৪) অংশ। ১৯৭৪ সালের ২৫ এপ্রিল রেভলুসাঁও দ্য ক্রাভু (কার্নেশান বিপ্লব) ইউরোপের দীর্ঘতম একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটায়। তারপরই এক-এক করে এই আফ্রিকার উপনিবেশগুলি স্বাধীন হয়। মুসাম্বিক স্বাধীন হয় ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন। ক্ষমতায় আসে মার্কসবাদী ফ্রেলিমো (ফ্রেন্তে দ্য লিবেরতাসাঁও দ্য মুসাম্বিক)। এদের বিরোধিতা করে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের মদতপুষ্ট রেনামো (রেজিশ্তেন্সিয়া নাসিউনাল মুসাম্বিকানা)। এই দুই দলের মধ্যে চলে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, যা শেষ হয় ১৯৯২ সালের অক্টোবরে। এরই পটভূমিকায় রচিত মিয়া কোতুর প্রথম উপন্যাসত্যারা সুনাম্বুলা (ইংরেজি অনুবাদের নাম: Sleepwalking Land)। প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে, পোর্তুগালে।

    আন্তনিউ এমিলিউ লাইত কোতুর ছদ্মনাম মিয়া কোতু। জন্ম ১৯৫৫ সালে মধ্য মুসাম্বিকের সুফালা প্রদেশের রাজধানী বাইরায়। ছদ্মনামের হেতু মার্জার-প্রীতি। ভূমিপুত্র নন, তাঁর পরিবার বাইরায় বসতি স্থাপন-করা শ্বেতাঙ্গ পোর্তুগিজ। তবে স্বাধীনতার পরও যে অল্প-সংখ্যক পোর্তুগিজ মুসাম্বিকে থেকে যান, মিয়া কোতু ও তাঁর পরিবার তাঁদের দলে পড়েন। ডাক্তারি পড়তে সতেরো বছর বয়সে বাইরা থেকে চলে আসেন দেশের রাজধানী লোরেন্সু মার্কেশে (এখনকার মাপুতু)। কিন্তু দু-বছর পরেই ফ্রেলিমোর ডাকে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। দশ বছরেরও ওপর সাফল্যের সঙ্গে সাংবাদিকতা করে ১৯৮৫ সালে আবার পড়াশোনায় ফিরে আসেন। এবার পড়েন জীববিজ্ঞান, এদুয়ার্দু মোন্দলানে বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি ইকোলজির অধ্যাপক। লেখক হিসেবে নানান দেশ থেকে অজস্র পুরস্কার পেয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নিউস্টাট পুরস্কার (২০১৪), যাকে ‘আমেরিকান নোবেল’-ও বলা হয়ে থাকে, আর কাময়েঁশ পুরস্কার (২০১৩)। পোর্তুগিজ ভাষায় লেখা সাহিত্যের জন্য সর্বোচ্চ এই পুরস্কার পোর্তুগাল ও ব্রেজিল যুগ্ম ভাবে দিয়ে থাকে।




    মোজাম্বিকের পোর্তুগিজ ভাষার সাহিত্যিক মিয়া কোতু (জন্ম ১৯৫৫)


    মিয়া কোতুর লেখালিখি শুরু চোদ্দো বছর বয়সে, বাইরায় থাকতে। শুরুটা হয়েছিল অবশ্য কবিতা দিয়ে। জীবনের প্রথম বইও কবিতার—১৯৮৩ সালে প্রকাশিত রাইশ দ্য অরভাল্যিউ (শিশিরের শিকড়)। তারপর পর পর দুটি গল্পসংগ্রহ ও সাংবাদিক জীবনে লেখা গদ্যের একটি সংকলন। এরপর ১৯৯২ সালে প্রথম উপন্যাস, যেটি এখন পর্যন্ত তাঁর শ্রেষ্ঠ লেখা বলে মনে করা হয়—ত্যারা সুনাম্বুলা, যার বাংলা করতে পারি ‘স্বপ্নচারী দেশ’।

    সরাসরি উপন্যাসের আলোচনায় যাবার আগে মিয়া কোতুর ব্যবহৃত ভাষা, বিশেষ করে তাঁর শব্দচয়ন সম্পর্কে দু-চার কথা বলতে হয়। বলতে হয় তাঁর লেখার শৈলী নিয়েও। মিয়া কোতুর ভাষার সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট হল তাঁর তৈরি নতুন নতুন শব্দ; একদিকে যেমন প্রচুর স্থানীয় ভাষা থেকে নেওয়া শব্দ আছে (যেগুলির মানে তিনি পাদটীকায় দিয়ে দেন) তেমনি আছে দুটি পোর্তুগিজ শব্দ জুড়ে তৈরি তৃতীয় একটি শব্দ। যেমন, আলোচ্য উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হল ‘সুন্যিয়াম্বুলান্ত’; দেশের সম্পর্কে লেখক এই ক্রিয়াবিশেষণটি ব্যবহার করেছেন। শব্দটি তৈরি হয়েছে ‘সুন্যিয়ার’ (ক্রিয়াপদ sonhar, যার অর্থ স্বপ্ন দেখা) আর আম্বুলান্ত (বিশেষণ ambulante, মানে ভ্রাম্যমাণ) জুড়ে। মিয়া কোতুর রচনা জুড়ে এরকম অনেক শব্দের ছড়াছড়ি। এ ছাড়াও উনি পোর্তুগিজের প্রচলিত বাক্যগঠন নিয়েও খেলা করেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্পসংকলনটির নাম ‘ভজেশ আনয়তেসিদাশ’; ‘আনয়তেসের’ ক্রিয়াটির অর্থ সন্ধে নামা বা আঁধার করে আসা, তার পাস্ট পার্টিসিপল ‘আনয়তেসিদু/দা’ যা বিশেষণও বটে। ‘ভশ (বহুবচনে ভজেশ) শব্দের মানে কণ্ঠ, আওয়াজ। এই বইটির ইংরেজি অনুবাদ বেরোয় ১৯৯০ সালে, ‘ভয়েসেস মেড নাইট’ নামে। তাঁর শৈলীর কথা বলতে গেলে আসে ‘অ্যানিমিস্ট রিয়ালিজম’-এর কথা। লাতিন অ্যামেরিকার সাহিত্যে আছে ম্যাজিক রিয়ালিজম আর আফ্রিকার সাহিত্যে আছে অ্যানিমিস্ট রিয়ালিজম। আফ্রিকান জগতে ‘প্রাকৃতিক’ ও ‘অতিপ্রাকৃত’ সহাবস্থান করে, কারণ দুটোই সেখানকার অধিবাসীদের কাছে ঘোর বাস্তব, যদিও একটাকে সাদা চোখে দেখা যায় কিন্তু অন্যটাকে নয়, এটাকেই অ্যানিমিজম দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয় এবং তার ফলেই লিটারারি এস্থেটিক্স হিসেবে অ্যানিমিস্ট রিয়ালিজমের উদ্ভব।

    এবার ‘স্বপ্নচারী দেশ’ উপন্যাসে আসি। উপন্যাসে সমান্তরাল দুটি কাহিনি চলতে থাকে; প্রথমটির মুখ্য কুশীলব দুজন—বৃদ্ধ তুয়াইর আর কিশোর মুইদিঙ্গা। দুজনের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। তুয়াইর মুইদিঙ্গাকে পায় একটি শরণার্থীশিবিরে, বা লেখকের ভাষায়, ‘বাস্তুচ্যুত লোকেদের’ শিবিরে। দেশে তখন গৃহযুদ্ধ চলছে। এইসময়ে এরকম একটি শিবিরে বেশ কিছু মৃত বালক ও কিশোরকে মাটিতে পুঁততে সাহায্য করার জন্য তুয়াইরকে ডাকা হয়। সে দেখে এদের মধ্যে একজনের দেহে তখনও প্রাণ আছে; সেই কিশোরটির সব দায়িত্ব সে নেবে এই কথা দিয়ে তাকে জীবন্ত সমাধির হাত থেকে বাঁচাতে সক্ষম হয়। ছেলেটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে বটে কিন্তু তার স্মৃতি লোপ পায়, এমনকি সে কথা বলতে বা হাঁটতেও ভুলে যায়। তুয়াইরই তার নাম দেয় মুইদিঙ্গা। তাকে পরম যত্নে সারিয়ে তোলে, কথা বলতে শেখায়, হাঁটতে শেখায়, ভাবতে শেখায়। তারপর একদিন দুজনে ওই শিবির ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে, মুইদিঙ্গা নিজের বাবা-মাকে খুঁজে পেতে চায়। তুয়াইরের এতে সায় নেই, মুইদিঙ্গা যে তাকে ‘খুড়ো’ বলে ডাকে সেটাও তার পছন্দ নয়। সাবধানে পথ চলতে হয় কারণ পথে আছে সশস্ত্র ডাকাতদলের ভয়। চলতে চলতে পথে পড়ে একটা পুড়ে যাওয়া ‘মাশীঁম্বম্বু’ (বাস); তার ভেতরে সিটে-বসা লোকগুলো পুড়ে ঝামা হয়ে গেছে। এই বাসের ভেতরেই তারা আশ্রয় নেওয়া স্থির করে। তুয়াইর একেবারে পেছনের সিটটা থেকে কয়েকটা মড়া সরিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে, তার কোনো ঘেন্নাপিত্তি নেই। কিন্তু মুইদিঙ্গা আর মৃতদের সঙ্গে বাস করতে চায় না। তার উপরোধেই শেষটা বুড়ো তুয়াইর রাজি হয় মড়াগুলোকে গোর দিতে। একটা বড়ো গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যেই সব ক-টা দেহকে চাপা দিয়ে ফেরার পথে তারা দেখতে পায় আর-একটা মৃতদেহ—একে গুলি করে মারা হয়েছে আর সে খুব বেশিক্ষণ আগে নয়, এবং তার পাশে পড়ে-থাকা একটা স্যুটকেস। মৃতদেহটাকে ওই আগের গর্তটাতেই চালান করার পর দুজনে স্যুটকেসটা নিয়ে বাসে ফেরে। তার ভেতর থেকে পাওয়া যায় কয়েকটা জামাকাপড়, একটা বাক্সে কিছু খাবারদাবার অনেকগুলো বাচ্চাদের স্কুলের খাতা, সেগুলো ইকড়ি-মিকড়ি লেখাতে ভরতি। সেই লেখা দেখে মুইদিঙ্গা বুঝতে পারে যে অসুস্থ হবার আগে সে পড়তেও শিখেছিল, কারণ এখন সে দিব্যি এগুলো পড়তে পারছে।

    তুয়াইর চায় খাতাগুলো রাতে আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহার করা হোক কিন্তু মুইদিঙ্গা চায় সেগুলো পড়ার জন্য বাঁচিয়ে রাখতে। এইটি হল প্রথম পরিচ্ছেদ। এরপরে যে অধ্যায়টি আসে তা হল মুইদিঙ্গার পড়া একটি খাতা। এইভাবে একটি করে পরিচ্ছেদ তুয়াইর আর মুইদিঙ্গার কাহিনি বর্ণনা করে আর তারপরে আসে একটি করে খাতার লেখা। সর্বমোট এগারোটি পরিচ্ছেদ আর এগারোটি খাতা। এগারো নম্বর খাতা দিয়েই উপন্যাসটি শেষ হয়। কাহিনি যত এগোয় ততই নিরক্ষর তুয়াইরের খাতাগুলি শোনার আগ্রহ বাড়ে। একাদশ পরিচ্ছেদে গিয়ে আমরা দেখি মুমূর্ষু তুয়াইর একটা ভেলায় করে সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায় মুইদিঙ্গার মুখে এগারো নম্বর খাতার কাহিনি শুনতে শুনতে। খাতার কাহিনি লিখেছে কিন্দজু (খুব সম্ভবত গুলিতে মৃত লোকটি), কাহিনির শুরু দেশ যখন স্বাধীন হল, আর শেষ গৃহযুদ্ধ যখন শেষের দিকে।

    প্রথম খাতায় বর্ণিত ঘটনা যখন শুরু হয় তখন কিন্দজু বেশ ছোটো, তার বাবা তাঈমুজেলে কিন্তু সারাদিন ‘সুরা’ (তাড়ি) খেয়ে পড়ে থাকে আর রাতে স্বপ্নে ‘ভোগে’ (যেমন লোকে রোগে ভোগে); স্বপ্ন দেখতে দেখতে নিশিতে পাওয়ার মতো করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, অরদিন ছেলেরা তাকে খুঁজে আনে আর তখন সে তাদের স্বপ্নের গল্প বলে। তার পূর্বপুরুষেরা নাকি স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে তাকে ভবিষ্যতের খবর পাঠায়। এরই মধ্যে স্বাধীনতা আসে আর কিন্দজুদের অনাগত ছোটোভাইটির জন্মের আগেই নামকরণ হয়ে যায় ‘ভিন্তিসিঙ্কু দ্য জুন্যিউ’ (পঁচিশে জুন), কালক্রমে সেটা হয়ে দাঁড়ায় জুন্যিউ বা জুন্যিতু। এরপর লাগে গৃহযুদ্ধ, আসে ঘোর দুঃসময়। তাঈমুর একসময়ে মনে হয় পরিবারের কেউ একজন মারা যাবে; এবং জুন্যিতুই বোধহয় সেইজন, তাই তাকে বাইরে মুরগির খোঁয়াড়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় যাতে সে মুরগি হওয়ার শিক্ষা নেয়, কারণ ডাকাতরা তো আর একটা মুরগিকে মারবে না। জুন্যিতুর শিক্ষা যখন প্রায় সম্পূর্ণ তখন একদিন সে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। উপন্যাসের শেষে, এগারো নম্বর খাতায় দেখা যায় যে মাতিমাতিতে যখন কিন্দজু ছাড়া আর সকলেই মানুষ থেকে বিভিন্ন পশুতে রূপান্তরিত হচ্ছে তখন জুন্যিতু ফিরে আসে এবং আবার মানুষে রূপান্তরিত হয়।

    এই উপন্যাসে দুটি জিনিস লক্ষণীয়—প্রথমত পুরো উপন্যাস জুড়েই একটা খোঁজ জারি আছে; সবাই কিছু না কিছু খুঁজছে। মুইদিঙ্গা খুঁজছে তার বাবা-মাকে। কিন্দজু খুঁজছে নাপারামার নামের জাদুকরদের আশীর্বাদধন্য প্রাচীন যোদ্ধাদের, তারা নাকি যুদ্ধ যারা বাধায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আর এই করেই নাকি তারা দেশের উত্তরাঞ্চলে শান্তি নিয়ে এসেছে। তাঈমু মারা যাওয়ার কিছু দিন পর কিন্দজু নৌকো করে এদের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে এবং পথে তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কাহিনি নিয়েই বাকি দশটা খাতা। যাদের সঙ্গেই তার পথে দেখা হয় তারা সবাই কিছু না কিছু খুঁজছে। তার প্রেমিকা ফারিদা প্রথমজীবনে খুঁজেছিল তার না-দেখা যমজ বোনকে, তার খোঁজে সে তার গ্রাম ছেড়েছিল। কিন্তু মাতিমাতিতে তাকে দেখেও সে চিনতে পারেনি (কিন্দজু কিন্তু বুঝেছিল কারুলিন্দা তার সেই হারিয়ে যাওয়া বোন) কারণ তখন সে তার ছেলে গাশপারকে খুঁজছে। ফারিদাকে তার শ্বেতাঙ্গ পোর্তুগিজ পালকপিতা রুমাঁও পিন্তু ধর্ষণ করে, তার ফলস্বরূপ গাশপারের জন্ম। সঙ্কর জাতির সন্তানকে কাছে রাখতে ভয় পায় ফারিদা, তাই তাকে মিশানে রেখে আসে। পরে জানতে পারে যে সে মিশান থেকে পালিয়ে গেছে। সে তাকে আকুল হয়ে খুঁজতে থাকে, কিন্দজু তাকে কথা দেয় যে গাশপারকে সে তার কাছে নিয়ে আসবে। একটা সময়ে কিন্দজুকে জিজ্ঞেস করা হয়, কাকে চায় সে—নাপারামারদের না গাশপারকে। শেষে কাউকেই সে খুঁজে পায় না, জুন্যিতুকে ছাড়া, যাকে সে আসলে খোঁজেনি। তবে বাসে করে গ্রামে রওনা দেবার আগের রাতে সে স্বপ্ন দেখে, যেটা তার শেষ খাতায় লেখা ছিল–একটা পোড়া মাশীঁম্বম্বু গাছে ধাক্কা খেয়ে কাত হয়ে আছে, তার মাথায় হঠাৎ আঘাত লেগে রক্তের বন্যা ছোটে আর সে পড়ে যায়, পাশে পড়ে থাকে তার স্যুটকেস, সামনে দিয়ে হেঁটে যায় এক কিশোর যাকে সে ‘গাশপার’ বলে চেঁচিয়ে ডাকতে সে ফিরে চমকে ফিরে তাকায়, হাতে তার কিন্দজুর খাতাগুলো। তাহলে কি মুইদিঙ্গাই গাশপার? এটাই এই উপন্যাসের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট—এর বৃত্তাকার গঠন; কাহিনি দুটি যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেখানে এসেই শেষ হয়, আর তা একই বিন্দুতে। তাঈমু মারা যাবার পর যে ভেলাতে করে তাকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই ভেলাতে করেই তুয়াইর মৃত্যুর সন্ধানে সমুদ্রে ভাসে।

    এই উপন্যাসে বর্ণিত আর-একটা আশ্চর্য বিষয় হল কিন্দজু আর মুইদিঙ্গা বাসে আশ্রয় নেবার পর কিন্তু আর কোথাও যায় না, বরং তাদের আশপাশের প্রকৃতিই হেঁটে চলে বেড়ায়। এই রাস্তাই একদিন চলতে চলতে এই দুই অসমবয়সী সহযাত্রীকে সমুদ্রতীরে এনে ফেলে, যেখান থেকে তুয়াইর তার শেষযাত্রা শুরু করে। মুইদিঙ্গার কথায়—আমি রাত্রে একটা করে কিন্দজুর খাতা পড়ি আর পরদিন সকালে উঠে দেখি আশেপাশের সব কিছু বদলে গেছে; রাস্তার দু-পাশের মাঠঘাট গাছপালা সাভানা সব বদলে বদলে যায়। তুয়াইর বলে, “আমরা কোথাও যাচ্ছি না।… দেশটাই ওখানে সার দিয়ে চলেছে, স্বপ্ন ভ্রাম্যমাণ।” এখান থেকেই উপন্যাসের নাম ‘স্বপ্নচারী দেশ’। মিয়া কোতুর এই দেশকে যেন নিশিতে পেয়েছে।




    The Paris Review পত্রিকায় মিয়া কোতু-র সাক্ষাৎকার পড়ুন এখানে



    ইংরেজি তরজমায় ও মূল পোর্তুগিজে ‘Sleepwalking Land’ সহ একাধিক বই অনলাইনে পাওয়া যাবে এখানে


    গ্রাফিক্স: স্মিতা দাশগুপ্ত
    পর্তুগিজ সাহিত্য - ১
  • বিভাগ : পড়াবই | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫৭৮ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Anindita Datta. | 2409:4060:2185:5e1f::2303:18a1 | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২০:৫৭97747
  • ১। খুব  ভালো লাগলো 

    ২।  রীতা  দির   হাত  ধরে  মিয়া কতুর সাথে নতুন পরিচয়  হলো 

  • মৌলিক | 2409:4066:29d:4948::182:e0a0 | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২২:০৫97767
  • পড়লাম। ভাল লাগল

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন