• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  শনিবারবেলা

  • সার্টিফিকেট (৩)

    রাহুল দাশগুপ্ত
    ধারাবাহিক | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ২৮০ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • ~৩~

    নিমাই টেরও পায়নি, কখন নাবিকটি এসে তার পেছনে দাঁড়িয়েছে। তার দিকে তাকিয়ে সে বলল, এবার আপনি খেয়ে নিন।
    নিমাই দেখল বাবা তার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন।
    নিমাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে, একটা বেলুন ফাটার আওয়াজ হল। নিমাই গ্রাহ্য না করে নাবিকটির সঙ্গে ডাইনিং রূমে এসে হাজির হল। খাদ্যের আয়োজন দেখে তাজ্জব হয়ে গেল সে। এটা বাবার নিজস্ব ডাইনিং রুম। খাবারগুলির দিকে ইশারা করে নাবিকটি হঠাৎ বলে উঠল, খেয়ে নিন, সবাই তো আর এখানে খেতে পারে না!
    অর্থাৎ, ‘তুমি যখন সুযোগ পেয়েছ, তখন লজ্জা না পেয়ে কাজে লাগাও সেটা।’
    খুবই সত্যি কথা। কিন্তু গরিব হলেও এতটা তুচ্ছতাচ্ছিল্যে সে অভ্যস্ত নয়। তাই কথাটা তাকে চমকেই দিল। তারপর নাবিকটিকে অবাক করেই যেন সে বলে উঠল, আমি খুব কম খাই। এত তো পারব না...
    নাবিকটির মনে পড়ল, কয়েক মাস আগে এই দ্বীপে একটি ছেলে এসেছে। ছেলেটির নাম, অচ্যুৎ। সেও প্রথমদিন এরকম খেতে বসেছিল। আর যত খাচ্ছিল, ততই যেন তার খিদে বেড়ে যাচ্ছিল। মুখে কিছু বলতে সংকোচ হচ্ছিল হয়তো, তবু নাবিকটি কীভাবে যেন সবই টের পেয়ে যাচ্ছিল। প্রতিবার তার প্লেটটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল আর নাবিকটি তৎক্ষণাৎ সেই ফাঁকা অংশটি ভরে দিচ্ছিল নতুন নতুন খাদ্যে। আর মৃদু হেসে বলছিল, যা লাগবে বলবেন। নইলে কিন্তু বাবা অখুশি হবেন।
    বাবাকে অখুশি করার স্পর্ধা অচ্যুতের ছিল না। তাই সে খেয়েই চলেছিল। তার খাওয়ার দিকে নাবিকটি তীক্ষ চোখে তাকিয়ে ছিল। শিকারি যেভাবে শিকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে সে বলেছিল, ব্যাটা, ধরা পড়ে গেছে। ও বুঝতেই পারেনি, ওকে খেতে দেওয়া নিছক খেতে দেওয়া নয়। একটু একটু করে জাল ফেলে ধরা। ও ধরা পড়তে শুরু করেছে। এভাবেই একটু একটু করে একদিন পুরোটা ধরা পড়ে যাবে। আর তখনই ঠিক হবে, ওর জায়গাটা কোথায়! ওকে সম্মান দেওয়া হবে না জবাই করা হবে!
    কিন্তু এই ছেলেটি সম্পুর্ণ অন্যরকম। নিমাইয়ের স্বল্পাহার শেষ হয়েছে দেখে নাবিকটি বলল, এবার আপনি কাজ শুরু করতে পারেন। তবে আগে পোশাক বদলে নিন।
    নিমাই বলল, আমি তো আর কোনো পোশাক আনিনি।
    বাবা আপনার জন্য পোশাক পাঠিয়ে দিয়েছেন।
    বাবার পোশাক শরীরে গলাতে গিয়ে অচ্যুতের নিজেকে ধন্য মনে হয়েছিল। নিমাইয়ের শরীরে কিছুতেই আঁটল না সেই পোশাক। বাধ্য হয়ে নাবিকটি নিজের একটা পুরোনো ফতুয়া আর পাজামা নিয়ে এল। ঠিক হল, সেটা পরেই নিমাই আপাতত কাজ চালাবে! কিন্তু দরজিও ডাকা হল তৎক্ষণাৎ। নিমাইয়ের মাপে জামাকাপড় তৈরির ব্যবস্থা হল।
    নাবিকটি মনে মনে বলে উঠল, তাজ্জব ব্যাপার তো! অদ্ভুত মাপের মানুষ। কারও পোশাকই ঠিক যেন লাগসই হয় না। একেবারে ওরই মাপের হতে হবে...
    আবার একটা অন্ধকার সরু করিডোর। বাংলোর পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল ওরা। তারপর সমুদ্রের ধার দিয়ে দু-ধারে ঝাউ আর নারকেল গাছকে রেখে প্রায় আধ ঘণ্টা হেঁটে তার জন্য বরাদ্দ করে রাখা ছোট্ট আর একটা কাঠের বাংলোয় এসে পৌঁছোল নিমাই। আসার সময় পেরিয়ে এল একটা গোলাপের বাগান। একটাই ঘর এই বাংলোয়। তার জানলা দিয়ে সমুদ্র দেখা যায়। আর দেখা যায় সেই প্রাচীন দুর্গ আর পুরোনো চার্চ। এগুলোই খুব ভালো লাগল নিমাইয়ের। নাবিকটি চলে যাওয়ার পরে সে নিজের নোটবুক খুলে বসল।
    তারপর প্রথম পৃষ্ঠায় সবুজ কালিতে লিখল, ‘আজ প্রথম সর্বশক্তিমানকে দেখলাম। ইনি কাউকে জোর করেন না। কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দেন না। তাঁর কাছে গেলে তাঁর শক্তির কিছুই টের পাওয়া যায় না। তাঁর ব্যবহার অতি মধুর। এই মাধুর্য দিয়েই তিনি সবাইকে জয় করে নেন। আমাকেও তিনি জয় করে নিয়েছেন। একটা সকালেই আমার জীবন বদলে গেছে। এখন প্রতি মুহূর্তে আমার ওপরে তাঁর অপরিসীম প্রভাব আমি টের পাচ্ছি। সম্মোহিত হয়ে আছি আমি। তাঁর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। যাদের শক্তি থাকে না, তারা প্রতি মুহূর্তে নিজেদের শক্তিকে জাহির করে। তিনি সর্বশক্তিমান, নিজের শক্তিকে তাই তিনি অনাবশ্যকভাবে টের পেতে দেন না।’


    ~৪~

    নিমাই একমনে কাজ করছিল। একটা হারিয়ে যাওয়া অতীতকে ফিরিয়ে আনা সহজ কাজ নয়। তার জন্য গভীর নিষ্ঠা আর অখণ্ড মনোযোগ প্রয়োজন। গোটা দুনিয়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিমাই তার কাজে ডুবে ছিল। ফাইলের পর ফাইল ঘেঁটে বার করে আনছিল হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজের ছেঁড়া টুকরো, অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া সেইসব লেখা পড়ার চেষ্টা করছিল, তারিখ অনুযায়ী সেগুলোকে সাজাচ্ছিল, সেগুলোর গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করছিল।
    হঠাৎ নিমাইয়ের মনে হল, দরজার ফুটোয় একটা চোখ। সেই চোখ তার দিকে লক্ষ রাখছে।
    চকিতে পিছনে তাকাল নিমাই। তারপর বিছানা থেকে উঠে দরজার কাছে গেল। দরজার ফুটোয় চোখ রেখে দেখল, কেউ নেই। ধু-ধু নীল সমুদ্র আর সামনের উঠোনের ফাঁকা শূন্যতা। নাবিকটি বলে গেছে, কেউ তাকে বিরক্ত করবে না। সে সম্পুর্ণ নিজের মতো করে কাজ করতে পারবে। কোনো দরকার হলে ফোন করে বললেই হবে। তাহলে কে তাকে লক্ষ রাখছিল? একটা অস্বস্তি শুরু হল নিমাইয়ের। তার মনে হল, তাহলে কী সবটাই মনের ভুল? কেউ ছিল না ওখানে? কেউ নজরদারি চালাচ্ছিল না তার ওপরে? কিন্তু কেন সে? তাকে কেউ চোখে চোখে রাখতেই বা যাবে কেন? কী গুরুত্ব আছে তার?
    হঠাৎ তার মনে হল, আসলে তার একটা জেরা পর্ব চলছে। ইন্টারভিউ। আর তা চলছে, তার অজান্তেই!
    হয়তো সার্টিফিকেট পাওয়ার এটাও একটা শর্ত। সবাই জানে না।
    কিন্তু এই অস্বস্তিটি ছাড়া চমত্কার লাগছিল নিমাইয়ের। সে যেন এক ইচ্ছাপূরণের দেশে এসে পৌঁছেছে। এখানে সবকিছুই সম্ভব। বুড়ো অভিনেতা বলেছিলেন, ওর যদি তোমাকে মনে ধরে, তাহলে তোমার জীবনে কোনো কিছুই আর অপূর্ণ থাকবে না!
    বাবার কী আমাকে মনে ধরবে?
    তুমি রূপবান, যোগ্য ও প্রতিভাবান। সৎ, মেধাবী ও পরিশ্রমী। তাহলে মনে ধরবে না কেন? আবার, একটু থেমে তিনি বলেছিলেন, অন্য কিছুও হতে পারে। আমি তো জানি না। আসল কথা হল, সার্টিফিকেট। আগে ওটা পাও। তারপর সবকিছুই সহজ হয়ে যাবে তোমার কাছে।
    বুড়ো অভিনেতার কথা শুনে নিমাই মনে মনে আশ্বস্ত হয়েছিল। এখানে আসার পর, সেই আশ্বাস যেন আরও বেড়ে গেছে। বাবা তাকে দেখে খুশি হয়েছেন। প্রথম থেকেই পছন্দ করেছেন। সেও ঠিক করেছে, নিজেকে উজাড় করে দেবে। নিজের শ্রম ও প্রতিভাকে। নিজের হাতে কিছুই রাখবে না। একটুও লুকোবে না নিজেকে। সবটাই বাবাকে দিয়ে দেবে। সবটাই বাবার হাতে তুলে দেবে। উনিই তো শ্রেষ্ঠ বিচারক! বাবা যদি তার ভেতরটা দেখতে পান, সেই ঐশ্বর্য দেখে নিশ্চয়ই চমৎকৃত হবেন, আর তখন তাকে সার্টিফিকেট দিতে একটুও দ্বিধা করবেন না।
    সে আবার কাজে মন দিল। হঠাৎ তার মনে হল, কে যেন ঠিক তার পিছনে এসেছে দাঁড়িয়েছে। সে চমকে তাকাতেই দেখতে পেল, সমবয়স্ক নাবিকটিকে। নাবিকটি মনোযোগ দিয়ে তার কাজ দেখছে। নিমাই বলল, আপনি এখানে?
    হ্যাঁ, একটু আগেই ঢুকেছি।
    কিন্তু দরজা তো বন্ধ ছিল।
    তা ঠিক। তবে আমার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে।
    নিমাই আবার অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করল। তার ঘরে এই নাবিকটি তার ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে তাহলে যখন-তখন ঢুকে পড়তে পারে? তার অনুমতি ছাড়াই? এই ঘর তাহলে তার ব্যক্তিগত নয়। এখানে কোনো গোপনীয়তা ও নিভৃতি নেই। বাবার দৃষ্টিসীমার ভেতরই এর স্থান। এই নাবিকটি যেন বাবার চোখের মতো। এরকম বহু নাবিক গোটা দ্বীপে ছড়িয়ে রয়েছে। তারাই বাবার সহস্র চোখ। বাবা একচুল না নড়েও গোটা দ্বীপটিকে যেন সহস্র চোখে দেখতে পাচ্ছেন। দ্বীপের কোথায় কী ঘটছে, তার প্রতিটি খুঁটিনাটি একদম তাঁর নখদর্পণে!
    নাবিকটির মুখে তৃপ্তির হাসি। সে জানতে চাইল, কাজ তাহলে ভালোই এগোচ্ছে!
    হ্যাঁ, ঠিকঠাক।
    কতদিন এইসব ফাইলে হাত দেওয়া হয়নি! অথচ...
    নিমাই জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
    নাবিকটি বলল, বাবার সমস্ত শক্তির উৎসেই আছে অভিনয়। বাবার জীবনের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ প্রেম। একটা ঘটনা বলি...
    নাবিকটি বলছিল। নিমাই শুনছিল। অভিনয় করতে গিয়েই এই দ্বীপের আগের অধিকর্তার সঙ্গে আলাপ হয় বাবার। অধিকর্তা একটা বিশেষ কাজে নিমাইয়ের গ্রামে এসেছিলেন। সেই কাজটি হল, তাঁর এক বন্ধুর ছেলেকে তিনি সার্টিফিকেট দেবেন বলে হৃদয়পুরে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। সে ছিল এক চমৎকার অভিনেতা। পরে এই ছেলেটিরই নাম হয়, বুড়ো অভিনেতা। অধিকর্তা গ্রামে পৌঁছে জানতে পারেন, বন্ধুটি হঠাৎ মারা গেছে। তিনি বন্ধুর ছেলেকে সার্টিফিকেট দেওয়ার কথা বলেন। সেই সময় সেই ছেলেটির বন্ধু হিসেবে বাবাও উপস্থিত ছিলেন সেখানে। দুজনেরই তখন অল্প বয়স, খুব বেশি হলে ষোলো সতেরো। রাতে অধিকর্তা দুজনকেই একটা রেস্তোরাঁয় খাওয়াতে নিয়ে যান। তারপর ঠিক কী হয়, কেউ-ই বলতে পারে না। পরদিন সকালে দেখা যায়, অধিকর্তার বন্ধুর সেই ছেলে নয়, বাবাই অধিকর্তার সঙ্গে লঞ্চের সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন। বাবাকে ওইভাবে যেতে দেখে বন্ধুর ছেলেটি কিছুই বুঝতে পারে না। গ্রামের সবাই তাকে ঘিরে ধরে। জানতে চায়, কেন এরকম হল। কিন্তু তখন তার কথা বলার কোনো শক্তিই নেই। মুখ থেকে শুধু একটা গোঁ গোঁ আওয়াজ ছাড়া কিছুই বার করতে পারে না সে। বেশ কয়েক মাসের জন্য শয্যাশায়ীও হয়ে পড়ে। বাবা আর কোনোদিন নিজের গ্রামে ফিরে যাননি। অধিকর্তা বুড়ো অভিনেতার বদলে বাবাকেই সার্টিফিকেট দেন। বাবাকে তিনি চোখে হারাতেন। বাবা হয়ে ওঠেন, অধিকর্তার নাম্বার ওয়ান, ‘ইয়েসম্যান’।
    নিমাই দারুণ বিস্ময়ে জানতে চাইল, এরকম হল কেন?
    নাবিকটি হাসতে হাসতে বলে উঠল, বাবা তো বলেন, এর পেছনে আছে অভিনয়। উনি আগাগোড়া অভিনয় করেছিলেন। অথচ অধিকর্তা সেটা ধরতেই পারেননি। বন্ধুটিও নয়। উনি ওই অভিনয়ের জোরেই অধিকর্তার চোখে পড়ে যান। আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। মানুষের আস্থাভাজন হয়ে ওঠার অসাধারণ ক্ষমতা আছে বাবার। অধিকর্তার মন বদলে যায়। বাবাই শেষপর্যন্ত সার্টিফিকেট পান। দিনের পর দিন অধিকর্তার আস্থাকে ধরেও রাখেন তিনি। একটুও সম্পর্কটাকে কমজোরি হতে দেননি। ফলে অধিকর্তা বেঁচে থাকাকালীনই বাবাকে এই দ্বীপে তার উত্তরাধিকার হিসাবে নির্বাচিত করে যান। সেই যে বাবা এই দ্বীপে এলেন, আর ফিরে যাননি। পরে তিনিই হন এই দ্বীপের অধিকর্তা। আসলে যারা মহামানব হয়, তাদের জীবনের অনেকটাই হয় দুর্বোধ্য আর রহস্যময়। ওসবের ভেতর না ঢোকাই ভালো। শুধু গোলোকধাধায় ঘুরে মরতে হবে!
    একটু পরে নাবিকটি চলে গেল। প্রতিটি চিঠি, কাগজের টুকরো খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে দেখছিল নিমাই।
    কোনো গুরুত্পুর্ণ জিনিস যাতে বাদ না যায়, সেদিকে লক্ষ রাখছিল। তার ওপর বর্তেছে, একটা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস পুনরুদ্ধারের দায়। মহামানবের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কিন্তু মুছে যাওয়া একটা অধ্যায়। একটু একটু করে সেই অধ্যায়ের প্রতিটি পৃষ্ঠাকে পুনরাবিষ্কার করতে হবে! একটু অসতর্ক হলে দেশ ও জাতির সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা। কিন্তু সত্যিই কী মুছে গেছে এই অধ্যায়? নাকি, বাবা জীবনটাকেই অভিনয় করে তুলেছেন! অভিনয়কে তাই আর আলাদা করে শনাক্ত করা যায় না? নাবিকের গল্প শুনে কেমন একটা কৌতূহল হয় নিমাইয়ের।
    হঠাৎ নিমাইয়ের মনে হল, কেউ যেন তাকে লক্ষ করছে। সে সামনে পিছনে ডানে বাঁয়ে তাকাল। শুধু দেয়াল। ছাদের দিকে তাকাল। আর তখনই মনে হল, ঠিক মাঝখানটায় যেন একটা ফুটো রয়েছে, আর সেই ফুটোয় একটি চোখ। তার দিকে চোখ পড়তেই সেই চোখ সরে গেল। সে বেশ কিছুক্ষণ সেই ফুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যিই কী ওখানে কোনো ফুটো আছে? মনের ভ্রম নয়তো? অত উঁচুতে তার হাত যাবে না। তাহলে বোঝার উপায় কী, ওখানে কোনো ফুটো আছে কি নেই?
    যদি ওখানে কোনো ফুটো থাকে, তবে চোখও আছে। ওই চোখ তার ওপর নজর রেখে চলেছে। কিন্তু কেন? হঠাৎ সে আবার ছাদের দিকে তাকাল। সেই চোখ। চোখের ভুল নয় তো? নিমাই চোখ কচলে ছাদের সেই ফুটোর দিকে আবার তাকাল। কিছু নেই। বেশ কয়েকটা ছেঁড়া পৃষ্ঠা গুছিয়ে একটা প্লাস্টিকের ফাইলে সে ভরে নিল। সঙ্গে নিল কয়েকটা ছবি।
    তারপর নোটবুক খুলে সবুজ কালিতে লিখল, ‘বাবা অভিনয় করেন না, তাঁর জীবনই অভিনয়। জীবনকে তিনি শিল্পে পরিণত করেছেন। আমি শৈশব থেকেই অভিনয় করার চেষ্টা করে এসেছি। কিন্তু জীবনকে আলাদা রেখেছি। শিল্প ও জীবন আমার কাছে আলাদা। বাবার সঙ্গে আমার তফাতটা টের পেতে শুরু করেছি। বাবার মতো হতে চেয়েছি চিরকাল। অথচ এখানে এসে কয়েক ঘণ্টাতেই বুঝতে পারছি, আমরা দুজন আলাদা ধাতুতে গড়া। বেশ বুঝতে পারছি, বাবাও সেটা খেয়াল করেছেন। তিনি অবিরাম আমার ওপর নজর রাখছেন। আমার দিকে প্রতি মুহূর্তে তাক করা রয়েছে, রহস্যময় সব চোখ। কিন্তু তাদের কাছে আমার কিছু হারাবার নেই। লুকোবারও নেই। সার্টিফিকেট নিতে আমি এখানে এসেছি। সেটা পেলেই
    নিশ্চিন্তে ফিরে যাব।’


    ~৫~

    নিমাই ভেবেছিল, ঘরে ঢুকেই বাবাকে সে দেখতে পাবে। এটাই বাবার দপ্তর। এখানে বসেই তিনি নিজের কাজ করেন। নাবিকটি তাকে দরজা দেখিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ভেতরে ঢুকে কোথাও সে বাবাকে দেখতে পেল না।
    বাবার বদলে টেবিল-চেয়ারে এক অচেনা বৃদ্ধ বসে রয়েছেন। এই বৃদ্ধর মুখের ভেতরে একটা কালো অন্ধকার গর্ত। কোনো দাঁত নেই। মাথায় কোনো চুল নেই। তাঁর মুখটা বিশ্রিভাবে ঝুলে পড়েছে। অসম্ভব নিষ্ঠুর দেখাচ্ছে সেই মুখ। দেখলেই মনে হয়, এই বৃদ্ধের মনে কোনো দয়া-মায়া নেই। তাঁর উপস্থিতিতে যেন শক্তির নির্দয় প্রকাশ। অনেক কিছুই হারিয়েছেন তিনি। বার্ধক্য গ্রাস করেছে তাঁর অনেকটাই। কিন্তু তাতে তাঁর শক্তির কোনো কম-বেশি হয়নি। তাঁর উপস্থিতিতে দন্ত, স্পর্ধা, ঔদ্ধত্য প্রবলভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নিমাইকে ঢুকতে দেখেই বিদ্যুতের বেগে তিনি পাশের ঘরে চলে গেলেন। তাঁর টেবিলে একটা ভারী মুখোশের নীচে চাপা পড়ে রইল গোছা গোছা ব্যাংকের চেক। বসে বসে ওই চেকগুলো থেকেই একটার পর একটা হাতে নিয়ে তিনি সই করছিলেন।
    জানলা দিয়ে গোধূলির আলো ঢুকে ঘরের ভেতরটাকে গেরুয়া করে তুলেছিল।
    কিছুক্ষণ পর পাশের ঘর থেকে এসে যিনি ঢুকলেন, তিনি নিমাইয়ের পূর্বপরিচিত। বাবার মুখে সেই স্মিত হাসি, মাথাভরতি চুল, ঝকঝকে সাদা দাঁত, তার উপস্থিতিতে অদ্ভুত এক প্রসন্নতা। ইনিই সেই মহামানব, যাঁর ছবি নিমাই তাদের দ্বীপের আনাচে-কানাচে দেখেছে। রাস্তার মোড়ে, টিভির বিজ্ঞাপনে, ক্যালেন্ডারে-ডায়েরিতে তাঁরই ছবি। তাঁকে ঘিরে কত জল্পনা। মহিলারা তাঁকে দেখে এখনও মুগ্ধ হয়ে যায়। নিজেদের মধ্যে তাঁর কথা বলাবলি করে। তাঁকে একবার চোখের দেখা দেখবে বলে ছটফট করে। ইনিই তিনি।
    নিমাইয়ের দিকে তাকিয়ে বাবা কয়েক মুহূর্ত কিছু যেন খোঁজার চেষ্টা করলেন। খুবই তীক্ষ্ণ তাঁর দৃষ্টি। হয়তো তিনি তাঁর মনের ভাব বুঝতে চাইছিলেন। তারপর হেসে বললেন, কাজ এগোচ্ছে ঠিকঠাক?
    মাথা নেড়ে নিমাই জানাল, এগোচ্ছে।
    এই কেবিনে সবসময়ই যেন একটা অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করছে। মনের স্বস্তিও আবার ফিরে এসেছে। একটু আগেও পেছনে যে চোখটি অনুসরণ করে আসছিল, হঠাৎই যেন সেটা উধাও হয়ে গেছে। এখানে শুধুই সমুদ্রের গর্জন, আর কিছু নেই।
    নিমাইয়ের সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। ওই বৃদ্ধ লোকটি কে? তিনি কোথায় গেলেন? তিনিই কী বাবা? উনি যদি বাবা হন, ইনি তাহলে কে? ইনি যদি বাবা হন, উনি তাহলে কে? দুজনেই কী সত্যি? নাকি, একজনই সত্যি, অপরজন অভিনয় করে চলেছেন! নাকি দুজনেই অভিনয় করে চলেছেন দুটি ভূমিকায়! হঠাৎ বাবাকে দেখে তার আবারও মনে হল, অভিনয়কে বাবা ভুলতে পারেননি। ওটা তার কোনো পূর্বজীবনের ব্যাপার নয়। বরং সবসময়ের সঙ্গী!
    কিন্তু সবসময় যদি কাউকে অভিনয় করতে হয়, তাকে সুখী বলা যায় না। তাহলে কী বাবাও আসলে অসুখী? বাবার ওই প্রসন্ন মুখ দেখলে সেকথা তো মনে হয় না!
    ভুরু কুঁচকে বাবা নিমাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হয়তো তিনি তার মনের কথা ইতিমধ্যেই পড়ে ফেলেছেন। সফল মানুষেরা দুর্দান্ত থট-রিডার হয়। মুখ দেখেই মনের কথা পড়ে ফেলতে পারে।
    বাবা মৃদু হেসে বললেন, দ্যাখো, কতটা কী উদ্ধার করা যায়!
    আমি বিষয় ও তারিখ অনুযায়ী ফাইলগুলোকে সাজিয়েছি। এখন কাগজগুলো পড়ে পড়ে দেখছি, সেগুলো একত্র করছি। এরপর ফাইল অনুযায়ী সেগুলো ভরব।
    বাঃ, বেশ মাথা খাটিয়েছ দেখছি। শরীরেও ধকল যাচ্ছে। তাই না?
    নিমাই লজ্জা পেল খুব। তারপর বলল, ওর মধ্যে অনেক চিঠি আছে, ছবি আছে, ডায়েরির ছেঁড়া পাতা আছে, খুব ব্যক্তিগত…
    তুমি পড়ে দ্যাখো। তারপর যেটা দরকারি, সেটাকে আলাদা করো।
    এর নামই কী স্বাধীনতা? বাবার কথা শুনে নিমাই আশ্চর্য হয়ে গেল। এত সুন্দর ব্যবহার ওঁর। কতটা চেনেন উনি তাকে? ওঁর সঙ্গে তার কতটুকু পরিচয়? অথচ, এর মধ্যেই উনি তাকে এতটা বিশ্বাস করে ফেলেছেন? তার ওপর এতটা ভরসা করতে চান? মানুষকে উনি এত স্বাধীনতা দেন?
    ধ্রুপদি বলেছিল, স্বাধীনতা দিলেই যোগ্য মানুষের কাছ থেকে সেরা কাজটা পাওয়া যায়! উনি খুব দূরদর্শী!
    হঠাৎ নিমাই লক্ষ করল, বাবার টেবিলের এক কোণে তার সার্টিফিকেটটা পড়ে আছে। নিজের ছবি দেখে চিনতে পারল সে। সেটার গায়ে পুরু হয়ে ধুলোর স্তর জমেছে। নিমাইয়ের ইচ্ছে হল, যত্ন করে ওই ধুলোগুলো মুছে দেয়।
    বুড়ো অভিনেতা পরে বলেছিলেন, তোমার জায়গায় আমি থাকলে ওই সার্টিফিকেটটা ওঁর দিকে বাড়িয়ে দিতাম। তারপর বলতাম, একবার সময় করে দেখুন। আমি ওখানেই আছি। ওটাই আমার আসল কাজ। যদি সত্যিই স্নেহ করেন আমাকে, তাহলে তার প্রমাণ দিন। এই ফাইলগুলোর পিছনে আমার শ্রম আছে ঠিকই। আত্মা নেই। আমার আত্মা রয়েছে ওই সার্টিফিকেটটার মধ্যে।
    বাবা এবার নিমাইয়ের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বললেন, তোমার জন্য ওই ছোট্ট টেবিলে একটা নেলকাটার রেখেছি। যাওয়ার সময় নিয়ে যেও।
    ছোট্ট টেবিলটার দিকে তাকিয়ে সে দেখল, একটা নতুন নেলকাটার।
    তারপর নিজের হাতের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল, নখগুলি সত্যিই বেশ বড়ো হয়ে গেছে...
    নিজের ঘরে ফিরে নিমাই সবুজ কালি দিয়ে নিজের নোটবুকে লিখল, ‘সবাই নিজেকে লুকোতে চায়। টুকরো কাগজ সবই আমার হাতে তুলে দিলেন। সেগুলো পড়ার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিলেন। স্বাধীনতা, এত স্বাধীনতা আগে কখনও পাইনি। যাকে নিয়ে কত রহস্য, গোটা জাতির জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই, নিজেকে তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন? কতটা বিশ্বাস করেন উনি আমাকে! কতটা ভরসা করেন! আর ওই নেলকাটারটা? কত ছোটোখাটো ব্যাপারেও উনি আমার খেয়াল রাখেন! শুধু উনি যদি একবার আমায় সার্টিফিকেটটা দিয়ে দিতেন! ফাইল গোছাতে গোছাতে ক্লান্ত আমি। অথচ নিজেকে আমি মেলে ধরতে চাই ওঁর কাছে।’


    ~৬~

    রাতে শুতে যাওয়ার আগে আবার একবার বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেল নিমাই। শুধু একবার চোখের দেখা। তাঁকে দেখার জন্য মনটা খুবই ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। বাবার জন্যই সে এখন এই হৃদয়পুর দ্বীপে। ইতিমধ্যেই এই দ্বীপে সবার নজরে পড়ে গেছে সে। একটু সময়ের জন্য সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গিয়েছিল, তখনই লক্ষ করেছে। বাবার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা কারও নজর এড়ায়নি। সবাই তাকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে। নিজেদের চোখের ভাষায় যেন বলতে চাইছে, খুবই সৌভাগ্যবান তুমি! দেখা যাক, এই সৌভাগ্য নিয়ে কত দূর কী করতে পার...
    নিমাই যেন বাবার প্রেমে পড়ে গেছে! সারাক্ষণ বাবার কথা ভেবে তার মন অস্থির হয়ে উঠছে। আর তখনই তার মনে হচ্ছে, কী চমৎকার মানুষ তিনি! আর কী অসম্ভব বিনয়ী! ক্ষমতাবান ও প্রতিপত্তিশালী মানুষদের এতদিন সে শুধু টিভিতেই দেখেছে। দেখলেই মনে হত, তারা খুব দাম্ভিক ও উদ্ধত। সাফল্যের গর্বে মাটিতে তাদের পা পড়ে না। কিন্তু বাবা সম্পূর্ণ অন্যরকম। কত অল্প পরিচয় তার সঙ্গে। অথচ নিজের ব্যক্তিগত জীবনের অংশীদার করে নিলেন নিমাইকে! সেখানে অবাধে কাজ করার স্বাধীনতা দিলেন!
    এক জটিল রহস্যের সামনে নিমাই যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। বাবা যেন তার মনে একটি স্থির ছবি হয়েই ফুটে আছেন। সেই ছবির দিকেই তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে তার। আর থেকে থেকেই মনটা কেমন হু হু করে উঠছে। মনে হচ্ছে, বাবার জন্য জীবনের সবটুকু দিয়ে দেয়। নিঃস্ব করে দেয় নিজেকে। অমন বিরাট যার হৃদয়, উদার যার মন, তার জন্য কী না করা যায়!
    তখন নিমাই বুঝতে পারেনি, তাকে দেখামাত্রই বাবা তার অন্তঃকরণটি কত নিখুঁতভাবে পড়ে নিয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তার হৃদয় আত্মনিবেদনের জন্য কতটা উন্মুখ হয়ে আছে!
    নিমাইয়ের সঙ্গে ছিল নাবিকটি। ভেতরে ঢুকতেই দেখল বাবা তার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছেন। মুখে মিটিমিটি হাসি। অথচ মন দিয়ে তিনি কী একটা কাজ করছিলেন। তাঁর টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখল, সেখানে ডাঁই করে রাখা আছে ব্যাংকের ফাঁকা চেক। বাবা মাথা নীচু করে একটি একটি করে এই চেকগুলিই লিখছিলেন। সকালে নিমাই ঠিক এই কাজটি করতেই তাঁকে দেখেছিল। সারাদিনে ক-টা চেক লিখতে হয় বাবাকে?
    নিমাই বলল, অনেকগুলি চিঠি পড়ে ফেলেছি।
    বাবার ভুরু একটু কুঁচকে গেল। কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য। তারপরই স্বাভাবিক হয়ে এল কপাল। ঠোঁটে ফিরে এল সেই স্মিত হাসি। বললেন, বেশ তো!
    একটা বেশ রাগী চিঠিও পেলাম। কর্তব্যের খাতিরেই বলতে বাধ্য হল নিমাই।
    তাই নাকি? কার লেখা? বাবা একটু কৌতূহলী হয়েই তাকালেন।
    একটু সংকোচ করল নিমাই। তারপর বলল, বুড়ো অভিনেতার।
    তাই নাকি! বাবা যেন একটু কৌতুক বোধ করলেন। তারপর বললেন, ও তো আমার পুরোনো বন্ধু। কী লিখেছে সে?
    একটা সময় আপনি তাঁর কাছ থেকে অনেক সাহায্য নিয়েছেন। আপনাদের একটা নাটকের দল ছিল। সেই দল চালানোর খরচ ছিল অনেক। তখন বুড়ো অভিনেতা নিয়মিত আপনাকে অর্থসাহায্য করতেন। কিন্তু পরে আপনি আর তাঁকে মনে রাখেননি। পুরোপুরি ভুলে গেছেন। এখন তাঁর মনে হয়...
    বাবা আবার কৌতূহলী হয়ে তাকালেন।
    মনে হয়, একটু চুপ থেকে নিমাই বলল, আপনি তাঁকে স্রেফ ব্যবহার করেছেন।
    নিজের ভাবনায় তলিয়ে গেছিল নিমাই। বুড়ো অভিনেতা এসব কথা কখনও বলেননি তাকে। ব্যাপারটা ব্যক্তিগত স্তরেই রেখেছেন। ব্যক্তিগত চিঠিতে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। হয়তো নিজের ক্ষোভ নিয়ে নিজেই নিঃসন্দেহ হতে পারেননি। তাই আবারও বাবার ওপরে আস্থা রাখতে চেয়েছেন।
    বাবা মিটিমিটি হাসছিলেন। একটু চুপ থেকে বললেন, আশ্চর্য!
    নিমাই নিতান্ত যান্ত্রিক স্বরে জানতে চাইল, এই চিঠিটি নিয়ে কী করব?
    রেখে দাও। বাবার উদারতার যেন শেষ নেই। আমি সত্যিই জানি না, বাবা একটু বিষণ্ণ হয়েই বললেন, কেন সে অমন একটা অভিযোগ করল! নাঃ, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না...
    কেন জানি নিমাইয়ের মনে হল, বাবা অভিনয় করছেন! শুধু একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন, এই যে! তাই অভিনয়কে অভিনয় বলেই যেন মনে হচ্ছে কিছুটা। তিনি জানেন। সবই জানেন। এই চিঠির প্রতিটি অক্ষর সত্যি।
    বাবা বললেন, সত্যি কথা বলতে কী, এই চিঠিটার কথা আমার একদমই মনে নেই। সত্যি, কিছুই মনে পড়ছে না আমার...
    নিমাই বলল, একটা চিঠি পড়ে চমৎকার লাগল। আপনার অভিনয় নিয়ে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। অভিনয় সম্পর্কেও অনেক কথা লিখেছেন। আমার অবশ্য মনে হয়...
    বাবা আবার কৌতূহলী হয়ে নিমাইয়ের দিকে তাকালেন।
    টানা দশ মিনিট ধরে নিমাইয়ের যা মনে হয় তাই বলে গেল। অভিনয় নিয়ে রীতিমতো পড়াশুনো করেছে সে। অনেক কিছু ভেবেছে। সেইসব ভাবনা থেকেই আলোচকটির ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলি তুলে ধরল।
    সে থামতেই বাবা বললেন, তুমি তো নিজেই দেখছি এ ব্যাপারে রীতিমতো স্কলার!
    দশ মিনিট ধরে সে যেন সত্যিই একজন শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করে গেছে। আর উনি এক বাধ্য ছাত্রের। আর এই ঘরটা হয়ে উঠেছে একটা ক্লাসরুম। কোন্‌ পর্যায়ের হঠকারিতা এটি? যিনি বিচারক তিনিই যখন ছাত্রের ভূমিকা নেন, তখন মনে হয় না দুনিয়াটাই উলটে গেছে? তখন তার বিনয় নিছক বিনয় থাকে না, তাকে মহত্ত্ব বলেই মনে হয়?
    হঠাৎ একজন মধ্যবয়সী মহিলা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল। মেয়েটির মুখে বাবার মুখের আদল। নাবিকটি নিমাইয়ের কানে কানে বলল, বাবার মেয়ে!
    পরমা নিমাইকে দেখেই থমকে দাঁড়াল। তারপর বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বলল, এই ছেলেটি?
    নিমাই। মৃদু হেসে বাবা বললেন। আমাদের দ্বীপের।
    ওঃ, এ তো খুব গুণী ছেলে!
    হ্যাঁ, ওদের দ্বীপে কয়েক মাস আগেই তো গেছিলাম। বেশ নামডাক হয়েছে ওর।
    আজ সারাদিনে ফাইলের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে । আমি তো মুগ্ধ...
    ওর অভিনয় আমাকে তুমি দেখতে বলেছিলে না?
    নিমাই চমকে উঠল। বাবার ভুরু কুঁচকে গেল। তবু মুখে হাসি ফুটিয়েই তিনি বললেন, এতদিনে একজন ভালো ফাইল গোছানোর লোক পাওয়া গেছে!
    পরমা এবার তাড়া দিল, ঠিক আছে, চলো, চলো, আমার বন্ধুরা সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে...
    বাবা যেন নিমাইয়ের কথা ভুলেই গেছেন, এমনভাবে, হস্তদন্ত হয়ে দরজা দিয়ে বার হয়ে গেলেন। নিমাই কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভেবেছিল, চলে যাওয়ার আগে উনি নিশ্চয়ই একবার তাকে বলে যাবেন। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। ওঁর যা বিরল সৌজন্যবোধ!
    কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কে যেন তার কাঁধে হাত রাখল। সে ফিরে তাকাতেই নাবিকটি মৃদু হেসে বলে উঠল, উনি চলে গেছেন।
    নিমাই শুনতে পেল পরমা ফোনে কাকে বলছে, না, না, বাবা আসছেন। আরে, ওই যে ফাইল গোছানোর ছেলেটি এসেছিল, তাই একটু দেরি...
    নিমাইয়ের মনটা যেন বিকল হয়ে গেল। ফাইল গোছানোর ছেলে! বুড়ো অভিনেতা বলেছিলেন, এ দেশের অভিনয় জগতে তরুণ প্রতিভাদের মধ্যে তুমিই...। কিন্তু বুড়ো অভিনেতার কথা এখন থাক। তা ছাড়া তিনিই তো বলেছিলেন, সৎভাবে অপরকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদারতা যাদের থাকে, তাদের কোনো ক্ষমতা নেই। আর যাদের ক্ষমতা আছে, তারা শুধু অপরকে ব্যবহার করতে চায়।
    অন্ঢোকার সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে নিজের নোটবুকে সবুজ কালিতে লিখল নিমাই, ‘নিজের হাতে কিছুই রাখিনি আমি। সবটাই বাবার হাতে ছেড়ে দিয়েছি। উনিই ঠিক করুন, আমাকে নিয়ে কী করবেন! উনিই বিচারক। আমি শুধু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাব। ফলাফলের ব্যাপারটা উনিই দেখবেন। কিন্তু একটা সংশয় আমার কিছুতেই যাচ্ছে না। উনি কী আমার অভিনয় দেখেছেন? কেন উনি খোলাখুলি নিজের মতামত আমাকে জানাচ্ছেন না? কেন উনি ফাইল গোছানোর ব্যাপারেই শুধু জোর দিয়ে যাচ্ছেন? আমি একজন শিল্পী। আর কোনো পরিচয় চাই না আমি। আর কোনো পুরস্কারে আমার প্রয়োজন নেই। নিজের দায়বদ্ধতার ব্যাপারে আমি সচেতন। আমাকে ফাইলের সঙ্গে জড়িয়ে আমার নতুন একটা পরিচয় তৈরি করা হচ্ছে এখানে। এই পরিচয় আর যারই হোক, আমার হতে পারে না। কিন্তু আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে এই পরিচয়। হাঁপিয়ে উঠছি আমি। আমার সার্টিফিকেটেই আমার আসল পরিচয় রয়েছে। সবার আগে, ওটাই এখন আমার দরকার।’


    ~৭~

    রেলিং ধরে দঁড়িয়েছিল নিমাই। ওর বাংলোর চারপাশে এই লাল রেলিং রয়েছে। এক ফালি আয়তাকার বারান্দা ঘিরে আছে কাঠের বাংলোটি। তারপরই উঠোন। সামনে অন্ধকার সমুদ্র। সেই সমুদ্রের ফেনা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কেমন একটা চাপা গর্জন যেন উঠে আসছে সমুদ্রের ভেতর থেকে। আকাশে ঝলমল করছে অজস্র তারা। হঠাৎ কে যেন তার পাশে এসে দাঁড়াল। নিমাই তাকিয়ে দেখল, রূপবান এক যুবক। মাথায় ছোটো করে কাটা চুল। ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। দেখলেই বোঝা যায়, বেশ অবস্থাপন্ন ও সংস্কৃতিমান পরিবার থেকে এসেছে।
    কিন্তু তবু কেন যেন একটু খটকা লাগল নিমাইয়ের। ছেলেটির চোখের দৃষ্টি খুব লোভী। মুখের ভাব খুব চতুর। ছেলেটি বলল, আমার নাম অচ্যুৎ। তুমি নিশ্চয়ই নিমাই?
    হুঁ। নিমাই মাথা নাড়ল।
    বাবার কাছে আজ যতবার গেছি, শুধু তোমার কথাই শুনেছি। তোমাকে পেয়ে বাবা খুব খুশি হয়েছেন। যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে তাকেই বলছেন তোমার কথা।
    বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতায় নিমাইয়ের মন ভরে এল। সে কৌতূহলী হয়ে অচ্যুতের দিকে তাকিয়ে রইল। আমি অভিনয় করি। অচ্যুৎ বলল। অসম্ভব বিনয়ী সে। কথা বলার সময় বারবার মাথা নুইয়ে ফেলছিল। সবসময় যেন বশংবদের মতো হাবভাব। সে বলে চলল, কয়েক মাস আগে বাবা আমাদের দ্বীপে গেছিলেন। সেখানেই প্রথম আমার অভিনয় দেখেন। সেটা ছিল সন্ধেবেলা। আমাদের নাটক শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বাবা কিছুই বললেন না। তারপরও অনেকটা সময় আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছিলাম। রাতে খাওয়ার পরে আমাকে ডেকে উনি বললেন, মঞ্চের মধ্যে তুমি যে অভিনয় করলে, মঞ্চের বাইরে তোমার অভিনয় তার চেয়ে অনেক ভালো। তুমি আমার সঙ্গে যাবে? পরদিনই বাবার সঙ্গে এই দ্বীপে আমি চলে আসি। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই বাবা একটা অভিনয় কোম্পানিতে আমার পার্ট চাইম চাকরির ব্যবস্থা করে দেন।
    হ্যাঁ, সবাই বাবার কাছাকাছি আসতে চায়। থাকতে চায়। এ দেশের এটাই নিয়ম। কে যেন পিছন থেকে বলল। দুজনেই পিছনে তাকিয়ে দেখল, নাবিকটি দাঁড়িয়ে আছে। ওদের দিকে তাকিয়ে নাবিকটি মিটিমিটি হাসছিল। কথা শুনলেই বোঝা যায়, এই মানুষটি খুব চতুর ।
    নাবিকটি বলল, আসলে সবাই সেলিব্রেটি হতে চায়। পুরস্কার পেতে চায়। মিডিয়ার স্নেহধন্য হতে চায়। জনপ্রিয় হতে চায়। আর বাবা ছাড়া কে এসব পাইয়ে দেবেন? আর কারও সেই হিম্মত আছে? কেউ পারবে সার্টিফিকেট দিতে?
    নিমাই জানতে চাইল, তুমি সার্টিফিকেট পেয়ে গেছ?
    নাবিকটি হাসল। তারপর বলল, উনি এখন সেলিব্রিটি!
    নিমাই ঠিক বুঝতে পারল না। অচ্যুৎ বলল, বাবার সঙ্গে এই দ্বীপে আমি যেদিন আসি, সেদিন লঞ্চে বসেই উনি আমাকে সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছিলেন।
    নিমাইয়ের চোখে ভেসে উঠল সেই ভেজা, স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার করিডোর। হাজার হাজার ছেলেমেয়ে। সার্টিফিকেটের জন্য সেই হাহাকার, বিষাদ, কত অপূর্ণ স্বপ্ন, বিচ্ছেদ, কত যুবক-যুবতির ভুল পথে হারিয়ে যাওয়া!
    নাবিকটি বলল, বাবা লোক চেনেন!
    অচ্যুৎ সে কথা গ্রাহ্য না করে বলল, বাবার কাছে থাকলেই কত কিছু শেখা যায়! হাতে ধরে উনি কিছুই শেখান না। ওঁর উপস্থিতিই যথেষ্ট। ওঁকে কাছ থেকে মন দিয়ে দেখলেই অনেক কিছু শেখা যায়। সত্যি, ওঁর মতো অভিনয়ের শিক্ষক এদেশে আর একজনও আছেন?
    নিমাই বাধা দিয়ে বলল, না, না, একথা ঠিক নয়। আরও কেউ কেউ হয়তো আছেন। তবে তাঁদের অত নাম নেই। লোকেও তাঁদের সেভাবে চেনে না।
    অচ্যুত আর নাবিক, দুজনেই নিমাইয়ের দিকে স্তম্তিত হয়ে তাকাল। তারা হঠাৎ বুঝতে পারল না, এই মন্তব্য স্পর্ধা, বোকামি না সারল্য? বাবার দ্বীপের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই সামান্য ছেলেটি...
    অচ্যুৎ বলল, আমি অবশ্য তেমন কাউকে চিনি না। তুমি চেন নাকি?
    হ্যাঁ, কাউকে কাউকে। তাদের সঙ্গে বেশ ভালো আলাপ আছে আমার। এই জাহাজে আসার আগে তাদের দু-একজনের বাড়িতে আমি নিয়মিত যেতাম। তাদের মুখেই শুনেছিলাম, অচ্যুৎ বলে একটি ছেলেও তাদের কাছে খুব আসে। অভিনয়ের খুঁটিনাটি জানতে চায়। সে কী তুমি?
    আমি! একটু ঘাবড়ে গিয়েই অচ্যুৎ বলে উঠল, না, না, হবে অন্য কেউ...
    অচ্যুৎ বলে সেই ছেলেটি তাদের লেখা কয়েকটি বই নিয়ে গেছে বলেও শুনেছিলাম। অভিনয় নিয়ে লেখা চমৎকার সব বই। ছেলেটি লাইন দিয়ে দাগিয়ে সেসব বই পড়ত। বিশেষ করে, ‘বুড়ো অভিনেতা’ ছদ্মনামে আমাদের দ্বীপে সত্যিই এক বুড়ো অভিনেতা কয়েকটি বই লিখেছেন। তিনি ছিলেন অচ্যুতের প্রিয় লেখক।
    তার অভিনয়ও অচ্যুৎ সুযোগ পেলেই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখত। ভূরিভূরি প্রশংসা করত তার। তোমার নাম শুনে ভাবলাম, হয়তো তুমিই সে।
    অচ্যুৎকে দৃশ্যতই একটু বিব্রত দেখাচ্ছিল। কিন্তু খুব দ্রুত নিজেকে সে সামলে নিয়ে বলল, না, না, বাবা ছাড়া আর কারও বই-ই আমি জীবনে কখনও পড়িনি।
    আমি পড়েছি। নিমাই বলল। ছোটোবেলা থেকেই বই পড়া আমার শখ। অভিনয় আমার প্যাশন। বাবার লেখা বই ছাড়াও দেশ-বিদেশের বই পড়ে আমি অভিনয়ের খুঁটিনাটি শেখার চেষ্টা করেছি।
    অচ্যুৎ আর নাবিক নিজেদের মধ্যে ইঙ্গিতপুর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করল। অচ্যুৎ যেন বলতে চাইল, তোমার এত জ্ঞানগম্যি তোমার কৃতিত্ব বলে গণ্য করা হবে না। বরং তোমার ক্ষতিরই কারণ হবে। বেশি জেনে যাওয়া লোককে কে চায়? আর নাবিকটি যেন বলতে চাইল, তুমি যে একটা নির্বোধ, তা নিয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহই আর নেই। বেশি বাহবা পেতে চেয়ে তুমি না তলিয়ে যাও...
    দূরে কোথাও সমুদ্রের বুকে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। ঝিরঝিরি বৃষ্টি শুরু হল। ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করল। সেদিন বিছানায় শুয়ে হঠাৎ একটা বাজ পড়ার শব্দে নিমাইয়ের মনে পড়ে গেল, বুড়ো অভিনেতার ঘরে একবার অচ্যুৎকে দেখেছিল সে। খুবই ঝাপসা ছবি। বহুদিন আগের কথা। কয়েক মুহূর্তের দেখা। অচ্যুতের নিশ্চয়ই মনে নেই। একটা বই নিয়ে অচ্যুৎ বেরিয়ে যাচ্ছিল আর নিমাই একটা বই পড়ে সেটা ফেরত দিতে ঢুকছিল। দুজনে একই ব্যক্তি। এ নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। তাহলে অচ্যুৎ অস্বীকার করল কেন?
    নিমাই উঠে বসে সবুজ কালিতে নিজের নোটবুকে লিখল, ‘অচ্যুৎ খুব চতুর ও পাকা অভিনেতা। ও অভিনয় করেই সফল হতে চায়। ও দেখাতে চায়, বাবা ছাড়া ওর আর কোনো শিক্ষক নেই। আর কারও বই ও কখনও পড়েনি। আর কারও কাছে কখনও কিছু শিখতে যায়নি। বাবার কাছেই নিজেকে ও পুরোপুরি সঁপে দিয়েছে। সত্যকে ও আড়াল করতে চায়। মিথ্যার সঙ্গে আপস করতে চায়। কারণ সাফল্যই ওর একমাত্র লক্ষ্য। মিথ্যা ও আপসের প্রয়োজনেই ওর অভিনয়। আমি অভিনয় করি নিজের সত্যকে প্রকাশ করার জন্য। নিজের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও আত্মার সত্য। অভিনয় আমার কাছে শিল্প। আর তাই শিল্প, যা সত্যকে প্রকাশ করে। ওর সঙ্গে আমার মিলবে না।’


    ~৮~

    ওপরে নিজের বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীচের সমুদ্রতীর দেখতে পাচ্ছিল নিমাই। বহু মানুষ অলসভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়াচ্ছে, চোখে-মুখে বাতাসের ঝাপটা মাখছে, ছোটো ছোটো ঢেউ আর ফেনাজলের ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে আরও বেশি ঢেউয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রতীরে কোথাও শামিয়ানা টাঙানো, কোথাও রঙিন ছাতা। তাদের তলায় বহু মানুষ বসে আরাম করছে। কেউ কেউ মিহি বালিতে শুয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মেয়েরা ছোটাছুটি করে ঝিনুক কুড়োচ্ছে।
    পাশ থেকে অচ্যুৎ বলে উঠল, দেখতে পাচ্ছ?
    নিমাই বলল, হ্যাঁ।
    এত পোকামাকড়? এই দ্বীপে? কোথেকে এল বল তো?
    নিমাই অবাক। চোখ কচলে ভালো করে আবার তাকাল। তারপর বলল, পোকামাকড়? কই? ওখানে তো সব মানুষ...
    মানুষ? অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল অচ্যুতের মুখে। তারপর বলল, তুমি এখনও ঘুমের ঘোরে আছ। যাও চোখে-মুখে জল দিয়ে এসো...
    নিমাই সে কথা গ্রাহ্য না করে মুখ ফিরিয়ে আবার সমুদ্রের দিকে তাকাল। কিন্তু কেন জানি না, চলতে শুরু করল সিঁড়ির দিকে। তারপর ধীরে ধীরে নামতে লাগল নীচের দিকে। সমুদ্রতীরে পৌঁছে খুব শান্তভাবে সে হেঁটে যেতে লাগল। ওরা নিজেদের মতো ব্যস্ত আছে। ওর দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না।
    ওর পিছন পিছন অচ্যুৎও নেমে এসেছে। ফিসফিস করে কাকে যেন সে বলল, আমাকে চিনতে পার? আমি তোমাদের মতো নই। আমি তোমাদের কেউ নই। আমি আলাদা। আমার সার্টিফিকেট আছে। তোমার আছে? তোমাদের আছে?
    সে অবাক হয়ে অচ্যুতের দিকে তাকাল। তারপর চোখ নামিয়ে নির্বিকারভাবে চলে গেল। অচ্যুৎ রেগে গিয়ে বলে উঠল, পোকাটার স্পর্ধা দেখলে?
    নিমাই শান্তভাবে বলল, তোমার ভুল হচ্ছে অচ্যুৎ। এখানে কোনো পোকা নেই। সবাই মানুষ।


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ২৮০ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন