• বুলবুলভাজা  পড়াবই  কৃতী-স্বীকৃতি

  • সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ২০২০ : বাঙালির মননের স্থিতাবস্থা লালিত করেন তাঁর লেখায়

    রাহুল দাশগুপ্ত
    পড়াবই | কৃতী-স্বীকৃতি | ২১ মার্চ ২০২১ | ৮১৬ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার

  • মণিশংকর মুখোপাধ্যায় ওরফে শংকরঅসাধারণ প্রসাদগুণ তাঁর লেখনীতে। বিপুল তাঁর জনপ্রিয়তা। নিটোল গল্প বলেন। কখনো ঝুঁকি নেন না। নাগরিক সমাজের কয়েকটি স্তরকে খুব ভালোভাবে চেনেন। চারপাশের মানুষগুলিকে খুঁটিয়ে দেখার ক্ষমতা তাঁর আছে। তাঁরা কী পড়তে চান, তিনি তা জানেন। তাই পরিবেশন করেন। লিখেছেন রাহুল দাশগুপ্ত




    উননব্বই বছর বয়সে সারা জীবনের কাজের স্বীকৃতি পেলেন মণিশংকর মুখোপাধ্যায় ওরফে শংকর। সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পাওয়ার জন্য তাঁকে অভিনন্দন। শংকর বিপুল জনপ্রিয় লেখক। জনপ্রিয়তা একজন লেখককে পুরস্কার পেতে সাহায্য করে। এটা একটা মাপকাঠি। শংকর সযত্নে বাঙালির মননের স্থিতাবস্থাকে লালন করেন তাঁর লেখায়। বিষয়, ভাষা, আঙ্গিক, উপস্থাপনা কোনও দিক থেকেই তিনি কখনও ঝুঁকি নেন না। সবসময়ই নিটোল গল্প বলেন। বাঙালি পাঠকের একটি বড়ো অংশের মনের মতো করে গল্প বলেন। তাঁর লেখার আবেদন মূলত মানুষের আবেগ ও সংস্কারের কাছে।

    অসাধারণ প্রসাদগুণ আছে শংকরের লেখায়। একবার ধরলে ছাড়া যায় না। তাঁর বাস্তববোধ অতি প্রখর। নাগরিক সমাজের কয়েকটি স্তরকে শংকর খুব ভালোভাবে চেনেন। চারপাশের মানুষগুলিকে খুঁটিয়ে দেখার ক্ষমতা তাঁর আছে। তাঁরা কী পড়তে চান, তিনি তা জানেন। এমনভাবে শংকর বাঙালি জীবনকে পরিবেশন করেছেন, যাতে তা মুখরোচক হয়ে ওঠে। সত্যের সঙ্গে তিনি নিপুণভাবে সেন্টিমেন্ট এবং রোমান্সকে মিশিয়ে দিয়েছেন। কখনও বা নিয়ে এসেছেন মোলায়েম ট্র্যাজডিকে, যা বড়ো কোনও ক্ষতি করে না, কিন্তু মনকে বিষন্নতায় ভরিয়ে দেয়। বাঙালির আবেগ ও সংস্কারকে কখনও আঘাত দেননি, বরং, সেগুলোকে উজ্জ্বল করে তুলে ধরে দেখিয়েছেন। একটা জাতি কীভাবে হেরে যেতে থাকে, পর্যুদস্ত হয়, গ্লানি মাখতে থাকে, তিনি তা খুব ভালো করেই জানেন। তিনি সেগুলো দেখান, প্রচ্ছন্ন সমালোচনা করেন, কিন্তু পাঠককে কখনও আঘাত দেন না, পাছে তাঁরা তাঁর প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে। বরং তিনি সেই বিরূপতার ন্যুনতম সম্ভাবনাকে মুছে দিয়ে এমন এক আধুনিক রূপকথা লিখতে থাকেন, যা বাঙালিকে গৌরবের চরম শিখরে নিয়ে গিয়ে দেখায়।

    গোড়া থেকেই শংকরের যাবতীয় লেখার কেন্দ্রে রয়েছে, মধ্যবিত্ত জীবন। এই জীবনেরই নিটোল গল্প বলেন তিনি, যে গল্পে সবকিছুই পরিষ্কার, যেখানে কোনও রকম অস্বচ্ছতা নেই। শংকর কোনও রহস্যময়তা বা আলো–ছায়া পছন্দ করেন না। প্রতিটি চরিত্রকে পাঠকের চোখে স্পষ্ট করে তোলেন। তাঁর যে কোনও উপন্যাসে একটা রম্য–রচনার মেজাজ আছে। আর বাস্তবিকই, রম্য–রচনার জন্যই জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে তিনি অকাদেমি পুরস্কার পেলেন! তবে একথা ঠিক, শংকরের লেখাগুলো পড়লে এই সমাজকে, নাগরিক, শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত সমাজকে চেনা যায়। শংকরের সাহিত্যগুরু বিমল মিত্রের যাবতীয় লেখার কেন্দ্রে যদি থাকে, 'ইতিহাস', তবে শংকরের ক্ষেত্রে তা হল, 'সমাজ'।

    শংকরের জীবনের সেরা কীর্তি তাঁর আত্মজীবনীমূলক ট্রিলজি, 'কত অজানারে', 'চৌরঙ্গী' এবং 'ঘরের মধ্যে ঘর'। শংকর যে মূলত রোমান্স লেখক, তা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে এই ট্রিলজি। তাঁর লেখাগুলি যেন মনে করিয়ে দেয় উনিশ শতকের ফরাসি লেখক ইউজুন স্যু–কে। এই তিনটি উপন্যাসেই কেন্দ্রীয় চরিত্র, শংকর। স্থানগুলি হল যথাক্রমে, কোর্ট, হোটেল এবং ফ্ল্যাটবাড়ি। এমন তিনটি জায়গা, যেখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এসে মিলিত হয়। 'কত অজানারে' (১৯৫৫) উপন্যাসে কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল বারওয়েলের স্টেনোগ্রাফারের চাকরি পেয়েছিলেন উনিশ বছরের শংকর। আইন পাড়ার মানুষের জীবনের নানা গল্প, বিভিন্ন কেসের ঘটনা উঠে এসেছে এই বইতে। কত রকমের মানুষ এসেছে মক্কেল হয়ে। বারওয়েলের ভারতীয়দের প্রতি গভীর ভালোবাসার নানা কাহিনি উঠে এসেছে। এই উপন্যাসের কেন্দ্র হল, ওল্ড পোস্ট আপিস স্ট্রিট, টেম্পল চেম্বার এবং কলকাতা হাইকোর্ট।



    শংকরের চৌরঙ্গী উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য

    ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয়, 'চৌরঙ্গী', শংকরের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ উপন্যাস। এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, পঞ্চাশের দশকের কলকাতা। মফসসলের ছেলে শংকর পঞ্চাশের দশকের চৌরঙ্গির হোটেল শাহজাহানে কাজ করতে এসে যে বিচিত্র অভিজ্ঞতার ও মানুষের পরিচয় পায়, তা নিয়েই এই রোমান্স–আখ্যান। অসংখ্য চরিত্রের মধ্য দিয়ে এই সমাজের প্রেম, শিক্ষা, আভিজাত্য, মান–অভিমান, অর্থের কৌলীন্য নিয়ে রেষারেষি, নৈতিক অবক্ষয় ইত্যাদির পরিচয় পাওয়া যায়, উপন্যাসের শেষে সবার ভাগ্যেই কোনও না কোনও ট্র্যাজেডি নেমে আসে। তবে এই গ্রন্থের মুখ্য আকর্ষণ হোটেলের চিফ রিসেপসনিস্ট সত্যসুন্দর (স্যাটা) বোসের চরিত্রটি, সবাই যাকে ভালোবাসে, সে বন্ধু ও উপকারী, বিমানসেবিকা সুজাতাকে ভালোবাসে, অথচ বিমান দুর্ঘটনায় সুজাতার মৃত্যুর পর কলকাতা ছেড়ে হোটেলের ম্যানেজার সফল অথচ নিঃসঙ্গ মার্কো পোলোর সঙ্গে আফ্রিকায় চলে যায়। শংকর কিছুদিন টাইপিস্টের কাজ করার পর স্যাটা বোসের প্রধান অ্যাসিস্টেন্ট হয় এবং হয়ে ওঠে স্যাটা বোসের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি। সমাজের লোভ, অপকর্ম ও লজ্জাজনক ব্যবহারের নানা সাক্ষী হয়ে ওঠে শংকর, যদিও এই উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে প্রেম। বহুজাতিক শহুরে জীবনটা যেন ছোটো হয়ে হোটেলের সীমিত পরিধির মধ্যে ফুটে উঠেছে এই রচনায়।

    'ঘরের মধ্যে ঘর' উপন্যাসে কপর্দকহীন, আশ্রয়হীন যুবক শংকর থ্যাকারে ম্যানসনের ম্যানেজার হিসাবে চাকরিতে যোগ দেয়। অদ্ভুত এক ফ্ল্যাটবাড়ি এই থ্যাকারে ম্যানসন। কলকাতার সাহেবপাড়ায় এর অবস্থান। ইংরেজ ঔপন্যাসিক উইলিয়ম মেকপিস থ্যাকারের এক ভক্ত জনসন সাহেব এই ম্যানসনের প্রতিষ্ঠাতা। নানা হাত ঘুরে ইংরেজ, বাঙালি বাবুদের উত্থান–পতনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই ম্যানসনের ইতিহাস, যার সূত্রে পুরোনো কলকাতার ইতিহাসের অনেকটাই উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। এখানেই বিচিত্র সব মানুষের সঙ্গে শংকরের আলাপ হয়। দারিদ্র্যর শাপগ্রস্ত সীমা ওরফে সুলেখা সেনের সঙ্গে এক রহস্যময় সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। পেশায় পতিতা এই মেয়েটি ম্যানসনের চৌত্রিশ নম্বর ঘরের বাসিন্দা। মিস ডরেথি, মিসেস সামতানির কথা খোঁচা দিয়েছে মানবিকতার মুখোশ পরে থাকা সমাজব্যবস্থাকে। পপি বিশোয়াস নামের হাইক্লাস পতিতা স্ট্যাটাস বজায় রাখতে নিমজ্জিত হয় পাপের সাগরে। শংকর নিঃসন্দেহে একজন কুশলি স্টোরিটেলার। এই ট্রিলজি উপন্যাসে বিশাল ক্যানভাসে অজস্র চরিত্রের সমাবেশে তিনি কলকাতা শহর এবং নাগরিক জীবনের এক বর্ণাঢ্য, চিত্তগ্রাহী পরিবেশন করেছেন।

    ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয় শংকরের 'ডাকসাইটে' উপন্যাস 'নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি'। বলা বাহুল্য, এই তকমাটি বইতেই আছে, প্রকাশক না লেখক কার দেওয়া বোঝার উপায় নেই, কিন্তু বেশ চোখ চলে যায় তকমাটির দিকে। কীটপতঙ্গদের নিয়ে গবেষণা করার জন্যই জীমূতবাহনের নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সৃষ্টি। একের পর এক গবেষক সহকারীকে স্ত্রী যখন জামাই করে সরিয়ে দিয়েছেন অনুসন্ধানের জগৎ থেকে, তখন খুবই আত্মিক সংকটে পড়েছেন জীমূতবাহন। অমিতাভকে যখন স্ত্রী ছোটো মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেবার সংকল্প করেছে, তখন একদিন দেখলেন, প্রকৃতির রাজ্যে কামনার বন্যা এসেছে, নির্লজ্জ জোনাকি মহিলারা পুরুষ জোনাকিদের টানছে, উইঢিপির তলায় কুৎসিত মধ্যবয়সিনী উইরানি জন্ম দিচ্ছে অসংখ্য সন্তানের। তাঁর মনে হল, তাঁর দিকে তাকিয়েই মিটমিট করে হাসছে লক্ষ লক্ষ কীটপতঙ্গ। তিনিও স্ত্রীর আকর্ষণ থেকে মুক্ত হতে পারেননি বলেই এতদিন স্ত্রীর দাপট মেনে নিয়েছেন। তখন গবেষিকা ইন্দুমতীর সাহায্য নিয়েই সরিয়ে দিলেন গবেষক অমিতাভকে, পরিণামে শুনলেন, সাপেরাই শুনেছি নিজেদের বাচ্চা খায়। সাপের সঙ্গে মাকড়সার বিয়ে হয় না। বৈজ্ঞানিক ও পিতার দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত জীমূতবাহন শেষপর্যন্ত বিনিদ্র রাতে ব্ল্যাক স্করপিয়ানের (কাঁকড়াবিছে) খাঁচা খুলে তার দংশনে মৃত্যুবরণ করলেন।

    ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয়, শংকরের আর একটি বহুলপঠিত ট্রিলজি উপন্যাস, 'স্বর্গ মর্ত্য পাতাল'। এই উপন্যাস ত্রয়ীর সূচনা সত্তরের গোড়ায়। চাকরিভিত্তিক কর্মজীবনে যে নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে, যে সুখ–দুঃখ, ন্যায়–অন্যায় ও মান–অপমানের অকথিত কাহিনি হাজার হাজার মানুষের হৃদয়ে পাথরের মতো জমা হয়ে আছে, তিনজন যুবকের চোখ দিয়ে তাই দেখিয়েছেন লেখক। 'জন অরণ্য' (পাতাল) উপন্যাসের নায়ক সোমনাথ এক বিপন্ন বেকার। ইন্টারভিউয়ের পর ইন্টারভিউ দিতে দিতে সোমনাথ ও তার বন্ধু সুকুমার হতাশায় ভেঙে পড়েছে। সুকুমার শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে যায়। অর্ডার–সাপ্লাইয়ের পথ ধরে হাজারটা অফিসের গোলোকধাঁধায় ঘুরে বেড়ায়। এই অর্ডার সাপ্লাইয়ের মূলমন্ত্র যে কোনও কোম্পানির পারচেজ অফিসারকে 'নরম করা'। বিবেকবর্জিত হয়ে অর্ডার সাপ্লাইয়ের চিঠি পেয়ে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে।

    বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের অন্যায়ের সঙ্গে গোপন আপোশের ছবি পরের পর্ব, 'সীমাবদ্ধ' (মর্ত্য)। উঁচুতলার মানুষের নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে নিচু কাজের মধ্য দিয়ে উচ্চাশাকে সফল করে তোলার কাহিনি রয়েছে এখানে। 'আশা–আকাঙ্খা' (স্বর্গ) উপন্যাসে রয়েছে তরুণ বৈজ্ঞানিক কমলেশের কথা, সে কঠোর পরিশ্রম করে সার–উৎপাদন পদ্ধতিকে সাফল্যে পৌঁছে দিতে পেরেছে। স্বাধীন ভারতে সার কারখানার গুরুত্ব কত দূর ব্যাপ্ত এবং যথাশীঘ্র সার–উৎপাদন কেন দরকার, তা অনুভব করে একদল বিজ্ঞানী যে আশা–আকাঙ্খার স্বর্গলোক সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, সেই ইতিহাসই লিখেছেন লেখক।



    সত্যজিৎ রায়ের সীমাবদ্ধ ছবির পোস্টার

    শংকরের আর একটা জনপ্রিয় ট্রিলজি, স্থানীয় সংবাদ, সুবর্ণ সুযোগ এবং বোধোদয়— এক মলাটে যাদের নাম 'জন্মভূমি'। তিনটি উপন্যাসেই মূল বিষয়, ভারতবর্ষের উন্নতি নিয়ে উচ্চশিক্ষিত বাঙালীদের প্রচেষ্টা। 'স্থানীয় সংবাদ' উপন্যাসে এসেছে ১৯৭০ সালের কলকাতা। একের পর এক বন্ধ হচ্ছে কলকারখানা, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বেজায় চিন্তিত। সেইসাথে প্রতিদিনই এখানে সেখানে খুনখারাপি হচ্ছে, পরিস্থিতি খুবই অশান্ত। এমন অবস্থায় আমেরিকা প্রবাসী বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ সুপ্রকাশ রায় কেন্দ্রীয় সরকারের আমন্ত্রণে আসলেন পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অবস্থার বিস্তারিত জেনে পরামর্শ দিতে। হরবিলাস কাঞ্জিলাল পশ্চিমবঙ্গের একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি। মধ্যবয়সী শিল্পপতির ঘরে নিরীহ বৌ এবং বিবাহিত সন্তানাদি থাকা সত্ত্বেও তিনি রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মাধুরীর প্রতি আকৃষ্ট। মাধুরী উদ্বাস্তু কলোনীর মেয়ে, হরিবিলাসের রক্ষিতা হওয়ার দরুণ তার পরিবার তাকে ত্যাগ করেছে। সুপ্রকাশ, হরিবিলাস এবং মাধুরী এই তিনের মধ্যে গড়ে ওঠে এক নিবিড় যোগসূত্র।

    'সুবর্ণ সুযোগ' উপন্যাসে বিদেশে পড়াশোনার পরে শিবসাধন চৌধুরী দেশে ফিরে এমন এক মোটর পাম্প উদ্ভাবনের চেষ্টা করে যেটা আবিষ্কার হলে পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম বাংলার অগণিত চাষীর জলে সেচ দেওয়ার কষ্ট ঘুচে যাবে। ডেনভার ইন্ডিয়া লিমিটেডের প্রধান শিবসাধনের বন্ধু আর্থার নিউম্যান এই প্রকল্পে পূর্ণমাত্রায় সহযোগী। এদিকে ভারত সরকার আইন করেছেন সকল বিদেশী কোম্পানিতে ৪০ ভাগের বেশি বিদেশী শেয়ার থাকা চলবে না। যার ফলে বিশিষ্ট ট্রেড কনসালটেন্ট আইনজীবী পতিত পাবন পাইন উঠে গেছেন খ্যাতির চূড়ায়। এই সুযোগে জনৈক কোটিপতি ঘনশ্যাম কানেড়িয়া পতিত পাবন পাইনকে হায়ার করলেন যেভাবে হোক ডেনভার ইন্ডিয়া লিমিটেড নিজের করায়ত্বে আনতে। আইনের ভয়াবহ মারপ্যাঁচে ভরা এই উপন্যাস থ্রিলারের চেয়ে কোন অংশে কম না। 'বোধোদয়' উপন্যাসে আমেরিকা থেকে ফিরছে অনির্বাণ চ্যাটার্জী। বাবা নিষ্ঠাবান শিক্ষক হরিবিলাস একমাত্র ছেলেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'বোধোদয়' বইয়ের লাইন বাই লাইন মুখস্থ করালেও বাস্তবে তার ছেলে এক নম্বরের বাটপাড়, চরিত্রহীন এবং যাবতীয় ইন্দ্রিয়সুখের সন্ধানী এক পুরুষ। আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার পথে অনির্বাণের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতিই বোধোদয়ের মূল উপজীব্য।

    উপন্যাস ছাড়াও শংকর আরও নানা ধরনের লেখা লিখেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ–বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর অনেকগুলি বই আছে। এসব বইয়ের লক্ষাধিক কপি মুদ্রিত হয়েছে। তাঁর ভ্রমণ সাহিত্য খুবই জনপ্রিয়। এগুলির মধ্যে রয়েছে, 'এপার বাংলা ওপার বাংলা', 'জানা দেশ অজানা কথা', 'মানবসাগর তীরে' ইত্যাদি। নানা ধরনের স্মৃতিমূলক রচনা লিখেছেন তিনি। এগুলির মধ্যে তিন খন্ডে লেখা, 'চরণ ছুঁয়ে যাই' বোধহয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। বিমল মিত্র তাঁর মতে, 'আধুনিক কালের মহত্তম ঔপন্যাসিক।' তিনি লিখেছেন, 'আমার সাহিত্যজীবনে পরম পাওয়া দুজন সৃষ্টিধরের সান্নিধ্য। একজন, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, আর একজন বিমল মিত্র।'

    উপন্যাসের মূল ধারা থেকে সরে গিয়ে শঙ্কর ক্রমেই মূলত রম্য গদ্যের দিকে ঝুঁকেছেন। অবশ্য এই রম্যতা তাঁর উপন্যাসগুলিরও বৈশিষ্ট্য। শংকরের উপন্যাস আমাদের ভাবায় না, তা আমাদের অনুভূতির তন্ত্রীগুলোয় নাড়া দেয়। তিনি একজন সেন্টিমেন্টাল লেখক। পাঠকের চোখে জল এনে দিতে পারেন ভক্তি বা প্রেমের রসসিঞ্চনে। নাটকীয় ঘটনার ঘনঘটার পাশাপাশি গুরুগম্ভীর মূল্যবোধের নানা কথায় শংকর পাঠককে মজিয়ে রাখতে জানেন। জনপ্রিয়তার নিরিখে বাংলা সাহিত্যে সামগ্রিকভাবে শংকরের উল্লেখযোগ্য অবস্থান অনস্বীকার্য।



    গ্রাফিক্স: মনোনীতা কাঁড়ার


    কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন


    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • বিভাগ : পড়াবই | ২১ মার্চ ২০২১ | ৮১৬ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ওফফ | 2620:18c:0:192::203 | ২১ মার্চ ২০২১ ০৮:০২103925
  • শংকর, নারায়ণ স্যান্যাল. বুদ্ধদেব গুহ, এরা কী লেভেলের মিডিওকার রিগ্রেসিভ ট্র্যাশ পয়দা করে গেছে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।


    সুনীল-শীর্ষেন্দূর বিশাল ভক্ত না, কিন্তু এদের পাশে পড়লে সু.শী. র ট্যালেন্ট বোঝা যাবে।  এমন কী মাঝে মাঝে সমরেশ মজুমদারও প্যালেটেবল। 

  • অনিরুদ্ধ | 157.40.66.167 | ২১ মার্চ ২০২১ ১১:৩৩103930
  • আমার মা খুব ভক্ত শঙ্কর এর লেখার। 

  • র২হ | 2401:4900:376a:6ae1:1c9c:5351:b5fb:723f | ২২ মার্চ ২০২১ ১০:৪১103958
  • শংকর পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁকে নিয়ে প্রশংসামূলক রচনা বেরুবে, এ তো প্রচলিত প্রথা, অন্তত মূলধারায় মিডিয়ায় তাই হয়।


    কিন্তু এই বিভাগে গুরু থেকে বেরুনো বইপত্রের স্বল্পতা আমার চোখে লাগে। গুরুর প্রতি পক্ষপাত আছে বলেই, তবে নিজেদের বইপত্র প্রোমোট করার দায়িত্ব তো থাকেই। 


    ভাটে লিখেছিলাম আগে, আজ এখানেও লিখলাম। 

  • b | 14.139.196.16 | ২২ মার্চ ২০২১ ১৫:১৫103960
  • ওনার লেখা  নিয়ে তো বলার কিছু নেই, তবে শঙ্করের ছবি  এই প্রথম দেখলাম। মনে হল কমলকুমার ঠিকই বেছেছিলেন বিশেষণটি। 

  • | ২২ মার্চ ২০২১ ১৬:০৭103961
  • এদিকে আমার যেটা ইন্টারেস্টিং লাগল,  এপারের আকাদেমি পুরস্কার পেতেই তাঁর সম্বন্ধে বড়সড় লেখা বেরিয়ে  গেল। কিন্তু ওপারের আকাদেমি পুরস্কার প্রাপকের একটা বই নিয়ে আলোচনাও বহু বহুদিন বাদে বেরোয় তাও বিস্তর জিজ্ঞাসাবাদের পর। 


    @ওফফ 


    শঙ্কর আর নারায়ন সান্যালের (স্যা নয়)   রিগ্রেসিভ বইয়ের একটা লিস্ট পাওয়া যায়? শীর্ষেন্দু যেমন রিগ্রেসিভ সেটা এঁদের দুজনের লেখায় সাধারণভাবে নজরে পড়ে নি। হয়ত খুঁটিয়ে পড়ি নি হতে পারে। লিস্ট পেলে পড়ে দেখার চেষ্টা করব। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন