• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • সার্টিফিকেট (৭)

    রাহুল দাশগুপ্ত
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১২ ডিসেম্বর ২০২০ | ১০১২ বার পঠিত
  • -
    পঞ্চম দিন

    What shall it profit a man if he gain the whole world and lose his own soul?

    Alfred Hitchcock



    আজই হৃদয়পুর দ্বীপে নিমাইয়ের শেষদিন। তার কাজ শেষ হয়ে গেছে। গতকাল রাতেই বাবা হাসপাতাল থেকে নিজের বাংলোয় ফিরে এসেছেন। নিমাই বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার অনুমতি চাইতে এসেছিল। যদি অবশ্য বাবা সার্টিফিকেটটা দেন! আসলে এখানে আর একদিনও থাকতে ইচ্ছা করছিল না তার। মা আর বুড়ো অভিনেতার কথা খুব মনে পড়ছিল। কিন্তু বাবা বললেন, আরও একদিন থাকতে। পরদিন দুপুরে তিনি নিজে উপস্থিত থেকে ওকে লাঞ্চ খাওয়াবেন। সঙ্গে যেন ধ্রুপদীও থাকে।
    নিমাই জানতে চেয়েছিল, “সার্টিফিকেটটা কি তখনই দেবেন?”
    বাবা বলেছিলেন, “দেখি। তুমি যাওয়ার আগে পেয়েই যাবে।”
    নিমাই থেকে গেছিল। ধ্রুপদীও।
    বাবা কেন থাকতে বলেছিলেন, তার কারণ অবশ্য জানা গেছিল পরে। ভোরবেলা নিমাইয়ের ঘুম ভেঙে গেছিল কলিংবেলের শব্দে। দরজা খুলতেই সে দেখতে পেয়েছিল, অচ্যুত দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাজসজ্জা করে একদম তৈরি। নিমাইকে দেখে অচ্যুত একটু অবাকই হল। তারপর বলল, “তোমাকে খুব অসুস্থ দেখাচ্ছে। কিছু হয়েছে নাকি?”
    —কাল সারারাত ঘুমোতে পারিনি। নিমাই বলল।
    অচ্যুত কারণ জানতে চাইল না। শুধু বলল, “বাবা কিন্তু অসুস্থ মানুষ একদমই পছন্দ করেন না।”
    —তাই নাকি?
    —একবার তো টানা এক মাস আমি বিছানায় শুয়ে ছিলাম। বাবা একবারও খবর নেননি, আমি কেমন আছি। এদিকে আমি রোজই ভাবি, বাবা নিশ্চয়ই আজ খবর নেবেন। আমাকে এত স্নেহ করেন উনি। এইভাবে মাসখানেক কেটে গেল। একটু সুস্থ হয়ে একদিন বাইরে বেরিয়েছি, নাবিকটির সঙ্গে দেখা। একটু অভিমান করেই তাকে বললাম, এক মাস শুয়ে রইলাম, একটা খবর নিলে না? নাবিকটি গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, আপনি জানেন না, বাবা অসুস্থতা একদম পছন্দ করেন না? তখনই আমি বুঝতে পারলাম, আমি মরে গেলেও ওরা কোনো খবর নিত না। স্রেফ আমার ডেডবডিটা সকার করার ব্যবস্থা করত।
    হোহো করে হেসে উঠল অচ্যুত।
    এবার অচ্যুতের বেশভূষা লক্ষ করে নিমাই জানতে চাইল, “কোথাও যাচ্ছ তুমি?”
    —শুধু আমি নয়, তুমিও যাচ্ছ। লঞ্চ দাঁড়িয়ে আছে।
    নিমাই প্রথমে অবাক হয়ে গেছিল। তারপর দ্রুত তৈরি হয়ে নিয়েছিল। লঞ্চ ওদের নামিয়ে দিয়েছিল একটি সুদৃশ্য দ্বীপে। এই দ্বীপে একটি বিশেষ অভিনয় প্রদর্শণীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদেশ থেকেও বেশ কয়েকজন অভিনেতা এসেছেন। একটি বড়ো অডিটোরিয়ামে প্রচুর দর্শকের সমাগম হয়েছে। সেখানেই একের পর এক অভিনেতা অভিনয় করে দেখাবেন। অচ্যুত ও নিমাইও রয়েছে তাদের মধ্যে।
    নিমাই ভাবতেই পারছিল না, ঠিক বিদায়বেলায় এমন একটা সুযোগ বাবা তার জন্য করে দেবেন! কিন্তু এ এক চমৎকার সুযোগ। সে একেবারেই তৈরি হওয়ার সময় পায়নি। কিন্তু পেশাদার জগতে এসব কথা কেউ শুনবে না। সেখানে যখন সুযোগ আসবে, তখনই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। আর মনের ভেতরে সে তো একটু একটু করে প্রস্তুতি নিয়ে চলছিলই...
    হাতে রয়েছে মাত্র দুটি ঘণ্টা। খুব সমাদর করেই ওদের একটা দামি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হল। এই দ্বীপের কর্তাব্যক্তিরা সকলেই অচ্যুতের পরিচিত। এর আগেও অচ্যুত এখানে এসেছে। অনুষ্ঠান করে গেছে। তারা খুব খাতির করছিলেন অচ্যুতকে। বরং নিমাই তাঁদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। তার নাম কেউ কখনও শোনেনি। তার সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। তার অভিনয় কেউ আগে দেখেনি। তবু সে-ও খাতির পাচ্ছিল। স্বয়ং বাবার সুপারিশে সে এখানে এসেছে। সঙ্গে রয়েছে অচ্যুত। তাকে অনাদার করে, সে সাধ্য কার?
    হোটেলের যে ঘরটি নিমাইয়ের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল, তাতে ওদের গোটা বাড়িটি ঢুকে যাবে। যে বিছানায় ও জিরিয়ে নিয়েছিল, তেমন নরম বিছানায় আগে কখনও শোয়নি। যে বাথরুমে স্নান করেছিল, তেমন সুন্দর বাথরুম আগে কখনও দেখেনি। একটু পরে তৈরি হয়ে সে নীচে নেমে এসেছিল। আর খাওয়াদাওয়ার এলাহি আয়োজন দেখে তার চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল। প্রতিটি খাবারই ছিল অসম্ভব সুস্বাদু। আর সে প্রচুর পরিমাণে খেয়েছিল। যখন সে বাবার জাহাজে এসেছিল, তখন সে ছিল খুবই স্বল্পহারী। এত লোভ তার ছিল না। এখন তার খেতে খুব ভালো লাগছিল। প্রচুর খেয়েও যেন তার তৃপ্তি হচ্ছিল না। আরও খাওয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠছিল। নিজের এই পরিবর্তনে সে নিজেই বেশ অবাক হয়ে গেছিল। তখনও সে বুঝতে পারেনি, তার মধ্যে একটা প্রচণ্ড অভাববোধ তৈরি হয়েছে। সেই অভাবটাকেই বেশি খেয়ে কৃত্রিমভাবে এইভাবে সে মেটাতে চাইছে।
    তার শুধু মনে হচ্ছিল, অভিনয় করে এদেশে কত কিছু পাওয়া যায়। বুড়ো অভিনেতার মতো মানুষেরা সারাজীবন শুধু কষ্টই করে যান। কখনও কিছু পান না। গোটা জীবন ধরে শুধু দিয়েই যান। এরকম যে একটা পাওয়ার জগৎ আছে, তাই তাঁরা জানেন না। এসব ব্যাপারে তারা পুরোপুরি উদাসীন। নিজেদের কাজ আর লক্ষ্য নিয়েই সবসময় মগ্ন হয়ে আছেন!
    কিন্তু সে আরও বেশি অবাক হয়েছিল অচ্যুতকে দেখে। খুব কম খাচ্ছিল অচ্যুত। আর মাপা ও সংযত আচরণ করছিল। এত খাদ্য দেখেও ওর কোনো লোভ হচ্ছিল না। বরং মাঝে মাঝে কৌতুকের চোখে তাকিয়ে নিমাইয়ের খাওয়া ও লক্ষ করছিল। হৃদয়পুর দ্বীপে প্রথম আসার পর নিমাই কিন্তু নাবিকটির মুখে শুনেছিল, অচ্যুত প্রথমদিকে প্রচুর পরিমাণে খেত। খেতে খুবই ভালোবাসত সে। ধীরে ধীরে একটু একটু করে খাওয়া কমিয়ে এনেছে। আসলে ওর মধ্যে অভাববোধই কমে এসেছে। বরং প্রাপ্যের অতিরিক্ত পেয়ে পেয়ে স্বভাবের দিক থেকে ও অনেক সতর্ক হয়ে গেছে। নিজেকে লম্বা দৌড়ের ঘোড়া ভাবছে। আয়ুকে সঞ্চয় করতে চাইছে।
    ঠিক এই সময় ধ্রুপদী ফোন করেছিল ওকে। নিমাই বলেছিল, “খুব খাচ্ছি আমি।”
    ধ্রুপদী শ্লেষের স্বরে বলে উঠেছিল, “সে তো খাবেই! আর কখনও যদি না জোটে!”
    —অচ্যুত কিন্তু খুব মেপে খাচ্ছে...
    —ও এসব অনেক খেয়েছে। আরও অনেক খাবে। এটা ও জানে বলেই...
    হঠাৎ ফোন কেটে গিয়েছিল। একটা গাড়িতে করে ওদের পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল অডিটোরিয়ামে। সেখানে অন্য অভিনেতাদের দেখে একদম আত্মহারা হয়ে গেছিল নিমাই। প্রায় প্রত্যেককে ডেকে ডেকে নিজের অভিনয়ের একটা করে সিডি বিলি করেছিল। বুড়ো অভিনেতার উদ্যোগেই এটা সম্ভব হয়েছিল। অভিনয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি পাওয়ার সময় এই সিডিটাই ওকে জমা দিতে হয়েছিল। প্রায় পঁচিশটার মতো কপি এনেছিল সে। আর গোটা সময়টায় অচ্যুত ওর দিকে কৌতুকের চোখে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিল।
    নিমাই হাত খালি করে বসেছিল একটা চেয়ারে। তার সিডিগুলোকে নিতান্ত হেলাফেলা করেই নিয়েছে সবাই। কেউ হাতে নিয়ে ভালো করে সেগুলোর দিকে তাকিয়েও দেখেনি। কেমন একটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই নিজেদের ব্যাগে ভরে নিয়েছে। যে এইভাবে নিজের সিডি বিলি করে বেরায়, লোকের কাছে তার কাজের কী গুরুত্ব থাকতে পারে? নিমাই অবশ্য কারণটা তখনও বুঝতে পারেনি। সে বুঝতে পারল পরে, অভিনয় শুরু হওয়ার পর।
    একজনের পর একজন অভিনেতা মঞ্চে উঠে নিজেদের একক অভিনয় দেখাচ্ছিল। দর্শকেরা খুবই আগ্রহ নিয়ে প্রতিটি অভিনয় দেখছিল। কিন্তু ক্রমেই তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছিল। অভিনেতারা স্রেফ ভাঁড়ামো করছিল। তাদের অভিনয় দর্শকদের মনে কোনো দাগই কাটতে পারছিল না।
    পরে নিমাই সবুজ কালিতে নিজের নোটবুকে লিখেছিল, “আমি বুঝতেই পারিনি, অনুষ্ঠানটা ছিল স্রেফ উপলক্ষ্যমাত্র। অভিনেতারা আসলে এসেছিল দামি খাবার, বিদেশি মদ আর মেয়ে নিয়ে ফুর্তির লোভে। হ্যা, রাষ্ট্রের টাকায় স্রেফ মজা লুটতেই এসেছিল তারা। দর্শকদের প্রতি, নিজেদের কাজের প্রতি কোনো নিষ্ঠা বা দায়বদ্ধতাই তাদের ছিল না। তারা দর্শকদের ঠিক যোগ্য ছিল না। দর্শকদের বিরক্তি উদ্রেক করা ছাড়া আর কিছুই তারা করছিল না। আর আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এদের আমি নিজের সিডিগুলো বিলিয়ে দিলাম! সম্পূর্ণ অপাত্রে দান করে এলাম জীবনের হাড়-পাঁজরগুলোকে? বুড়ো অভিনেতার রাত জেগে করা পরিশ্রমকে?”
    অচ্যুত দর্শকদের পরিচিত। অন্যদের তুলনায় বেশিই হাততালি পেল সে। দর্শকরা কী চায়, সে তা বোঝে। তাদের মন বুঝে অভিনয় করার আশ্চর্য ক্ষমতা আছে তার। সর্বত্রই নিজের এই ক্ষমতা সে প্রয়োগ করে। আর সবার চেয়ে বেশি হাততালি কুড়িয়ে নিয়ে যায়।
    নিমাই স্বগতোক্তি করে উঠল, “অভিনয়ের নামে স্রেফ চাতুরিমাত্র! এটা কোনো শিল্পীর কাজ নয়। জাদুকরের কাজ হতে পারে। বাবার মতো...”
    নিমাইকে ডাকা হল সবার শেষে। মিনিট কুড়ি ধরে সে নিজের একক অভিনয় দেখাল। তার অভিনয়ের পর একটিও হাততালি পড়ল না। কিন্তু গোটা হল স্তব্ধ হয়ে বেশ কয়েক মিনিট বসে রইল। কারও যেন নড়াচড়া করারও ক্ষমতা ছিল না। তারপর সম্মোহিতের মতোই তারা উঠে দাঁড়াল। আর একজন একজন করে হল ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
    একজন মধ্যবয়সী মহিলা তার স্বামীর কানে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল।
    স্বামীটির ভুরু কুঁচকে গেল। তারপর খুব বিরক্ত হয়ে সে বলে উঠল, “আঃ, এত জোরে শব্দ কোরো না। আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছি না...”
    নিমাই পোশাক বদলে অডিটোরিয়ামের বাইরে প্রশস্ত চত্বরে এসে দাঁড়াল। সামনেই একটা ফোয়ারা। সেদিকে নিবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে ছিল সে। বোধহয় ওই জলের উচ্ছ্বাসের মধ্যে ধ্রুপদীকে খুঁজছিল। তার ভেতরে আজ এক অদ্ভুত তৃপ্তি। জয়ের স্বাদ। তার আত্মবিশ্বাসকে যারা ধসিয়ে দিতে চেয়েছিল, তাদের অন্তত একটা জবাব দিতে পেরেছে সে। অন্তত ধ্রুপদীর আজ এখানে থাকা উচিত ছিল। মেয়েটা শুধু একের পর এক ব্যর্থতার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। এই সাফল্যের ছবিটা ওরও খুব দেখা দরকার ছিল।
    হঠাৎ অল্পবয়সী একটা মেয়ে এগিয়ে এল নিমাইয়ের দিকে। তারপর একটা খাতা আর পেন এগিয়ে দিয়ে বলল, “একটা অটোগ্রাফ দেবেন...”
    খুব অবাক হল নিমাই। কেউ তারও অটোগ্রাফ চাইতে পারে, এ যেন ভাবাই যায় না! একটু কৌতুক করেই সে জানতে চাইল, “আমার অটোগ্রাফ চাইছ কেন?”
    “কী প্রতিভা আপনার!” চোখ বড়ো বড়ো করে নিজের উচ্ছাস প্রকাশ করতে চাইল মেয়েটি। তারপর একটু লজ্জা পেয়েই যেন বলে উঠল, “আর কী প্যাশন!”
    নিমাই মেয়েটির খাতায় অটোগ্রাফ দিয়ে মুখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেল, অচ্যুত ওর দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! কী হিংস্র দেখাচ্ছে সেই দৃষ্টি!
    মেয়েটি বলে যাচ্ছিল, “আমার বাবা এই দ্বীপের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের অধিকর্তা। আপনার অভিনয় দেখতে দেখতে আজ বারবার তিনি বলেছেন, গ্রেট! ওয়াট আ গ্রেট পারফরম্যান্স! কোথায় ইনি লুকিয়ে ছিলেন এতদিন? সত্যিই, কোথায় আপনি লুকিয়ে ছিলেন এতদিন? একদিন আমাদের বাড়িতে আসবেন? আমরা সবাই আপনার সঙ্গে ভালো করে আলাপ-পরিচয় করতে চাই...”
    নিমাই ভান করল, যেন অচ্যুতকে সে দেখতেই পায়নি। মন দিয়ে সে কথা শুনছিল মেয়েটির। স্বীকৃতি। সার্টিফিকেট! আহা, এরই অপেক্ষায় সে ছিল এতদিন! আর সত্যিই, সেই সুখের মুহূর্তে, সে আন্তরিকভাবেই অচ্যুতের দৃষ্টিকে নিজের মন থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল...



    হৃদয়পুরে পৌঁছে সরাসরি রেস্তোরাঁয় গেল নিমাই। রেস্তোরাঁটি বানিয়েছে শুভাশিসের কোম্পানি। এই দ্বীপের সবচেয়ে দামি আর বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ এটি। আজ ওকে আর ধ্রুপদীকে বাবার খাওয়ানোর কথা। এটার কথা বাবাই বলে দিয়েছিলেন। ধ্রুপদী অনেকক্ষণ ধরেই ওর জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু বাবার বদলে এল। নাবিকটি। এতে ওরা দুজনেই খুব অবাক হল। আহতও।
    ধ্রুপদী জানতে চাইল, “বাবা আসবেন না?”
    —না, হঠাৎ একটা কাজে আটকে গেছেন। আমাকেই পাঠালেন তাই। আর বললেন, আপনাদের পছন্দমতো খাবার খেতে। কোনো সংকোচ না করতে।
    নিমাই আর ধ্রুপদীর খাওয়ার ইচ্ছাটাই চলে গেছিল। বাবার খাওয়ানোর কথা। অথচ বাবাই অনুপস্থিত। নিমন্ত্রণ করেও তিনি আসেননি। এতে যেন ওদের প্রতি বাবার তাচ্ছিল্যই প্রকাশ পাচ্ছে। আর ওদের তুচ্ছতা। অল্প খেয়েই ওরা উঠে পড়ল।
    বাবার আজ একটা অভিনয় শেখানোর অ্যাকাডেমি উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা। সঙ্গে যাবে অচ্যুত, শুভাশিস আর অমলকান্তি। সামনে অচ্যুতের প্রচুর ব্যস্ততা। বিদেশেও যেতে হবে তাকে। নিমাইয়ের সঙ্গে ফিরে আসার সময় লঞ্চের ডেকে বসে সে সবের ফিরিস্তি দিচ্ছিল সে। নিমাই মনে মনে ভাবছিল, ওর জন্য অনেক কাজ রেখেছেন বাবা। কিন্তু তার সামনে কী রয়েছে?
    নিমাইয়ের সামনে কোনো কাজ নেই। কাল থেকে সে পুরোপুরি বেকার। সার্টিফিকেটটা হাতে এলে অবশ্য...
    এই দ্বীপের গায়েই নদীর একটা মোহনা আছে। নদীটি এসে সমুদ্রে পড়েছে। ধ্রুপদীকে সঙ্গে নিয়ে নিমাই একটা নৌকোয় উঠে বসল। তারপর দুজনে মিলে নৌকোয় চেপে নদীতে ভাসতে লাগল। নদীর দু-ধারে ঝাউ, নারকেল, তালের সারি। কখনও কালচে-সবুজ বন। হঠাৎ একটা ফাঁকা জায়গা, সেখানে একটা প্রাচীন সিনাগগ, তার গায়ে হিব্রুতে লেখা প্রস্তর ফলক। তারপর আবারও বন। দু-জনেরই খুব ভালো লাগছিল। ওদের কেউ চেনে না। কেউ ওদের স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু ওরা দু-জনে তো একে অপরের জন্য আছে। সেটাই বা কম কী!
    ধ্রুপদী বলছিল, “কালকের ওই অপমানের পর আজকের এই সুযোগ! আমি কিন্তু বুঝতে পেরেছি ব্যাপারটা...”
    নিমাই কৌতূহলী হয়ে ধ্রুপদীর দিকে তাকাল। ধ্রুপদী বলল, “নিজের সুনাম রক্ষার ব্যাপারে বাবা খুবই সাবধানী। তোমাকে ওই চোর অপবাদ, ফাঁকিবাজ বলা, আমাকে চাকরি দিয়ে রসিকতা করা, এসব করে কী বাবার সুনাম বজায় থাকত? তবে তোমাকে কিন্তু একা ছাড়তে পারেননি বাবা। নিশ্চিন্ত থাকতে সঙ্গে অচ্যুতকে পাঠিয়েছেন। তুমি কী ভাব, অচ্যুত ওখানে স্রেফ অভিনয় করতে গেছে? তোমার প্রতিটা গতিবিধির ওপর নজরদারি চালিয়েছে সে। তোমার প্রতিটি উচ্চারণ, প্রতিটি চালচলন খুঁটিনাটিসহ বাবার কাছে গিয়ে বর্ণনা করেছে। কোথায় আছ তুমি! তবে আজকের এই সুযোগটার পর কোনো সমালোচনা করতে আমরা কিন্তু দু-বার ভাবব। আমাদের মুখ বন্ধ করতেই এই ব্যবস্থা।
    “তারপর দুপুরের এই খাওয়ানোটাও আছে।” নিমাই বলল।
    —হ্যাঁ। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। বেশ খেলাম আমরা। এখন বাবার গুনগান তো গাইতেই পারি...
    নিমাই বলল, “কিন্তু কালকের ব্যাপারটা? ওটা আমি এখনও বুঝতে পারছি না...”
    —আসলে নরমে-গরমে তোমাকে শায়েস্তা করার চেষ্টা করছে ওরা। কাল ছিল গরম। আজ হয়েছে নরম। তোমাকে একটু ঘাবড়ে দিতে চেয়েছিল সবাই মিলে। একটু সমঝে দিতে চেয়েছিল। তাই ওইভাবে এলোপাতাড়ি অভিযোগ। কিছু প্রমাণ করতে চায়নি। তোমাকে ওই বদনামের বিষয়টা তোলার ব্যাপারে কোনো সুযোগ দিতে চায়নি। তা ছাড়া তুমিই বা ওই লোকগুলোকে অত সাহায্য করতে গেছ কেন? তুমি জানতে না, সুযোগ পেলেই বন্দুকের নল ওরা তোমার দিকেই ঘুরিয়ে দেবে?
    —নাঃ! ওদের আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি। বাবার আপত্তি সত্ত্বেও...
    “ওরা তো বাবার খাস লোক।” হঠাৎ বলে উঠল ধ্রুপদী। “বাবাই বা আপত্তি করলেন কেন?”
    নিমাই বলল, “সেটাও একটা রহস্য বটে!”
    ধ্রুপদী হেসে উঠল খুব জোরে। তারপর বলল, “আসলে কোনো কিছুই রহস্য নয়। সবটাই ব্যাবসা, বুঝলে? পুরোটাই আসলে লেনদেনের ব্যাপার। বাবা ওদের ব্যবহার করছেন। ওরা বাবাকে। আসলে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। বাবা বেশি পাকা লোক। তিনি ওদের সন্দেহও করেন। তিনি জানেন, ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে ওরা আসলে সস্তায় রফা করার চেষ্টা করছে। তাই তিনি প্রথমে রাজি হননি। আসলে রাজি না হয়ে তোমার মাধ্যমে তিনি ওদের সতর্ক করতে চাইছিলেন। বোঝাতে চাইছিলেন, বেশি চালাকি তিনি সহ্য করবেন না। ওরাও সতর্ক হয়ে গেল। আর বাবাও অমনি রাজি হয়ে গেলেন। তোমার এখানে কোনো ভূমিকাই নেই। তোমাকে দু-পক্ষই ব্যবহার করেছে মাত্র। দু-পক্ষই সমানভাবে বঞ্চিত করেছে। তুমি ওদের বাবার খাস লোক ভেবে সাহায্য করতে গেলে। ওরা তার সুযোগ নিল। আবার ওদের হয়ে বাবাকে রাজি করাতে গিয়ে বাবাকে সুযোগ করে দিলে। বাবাও তোমাকে নিজের প্রয়োজন মতো ব্যবহার করে নিলেন। তোমার কথা কেউ ভাবেনি। আর ভাববেই বা কেন? তুমি তো কোনো হিসাবেই আসো না! সার্টিফিকেটটাই পাওনি এখনও। আমি অবশ্য এখনও বুঝতে পারছি না, ওরা বাবার খাস লোক হলে তোমার কী? লোকের কথায় তুমি অত গলে যাও কেন? তাদের জন্য অমন সর্বস্ব পণ করার বাসনা কেন জাগে তোমার?”
    নিমাই জলের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখ খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। ধ্রুপদী জলে হাত ডুবিয়ে রেখেছিল। খুব ঠান্ডা জল। সেই ঠান্ডায় তার সারা শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝেই গভীর আবেশে সে চোখ বুজে ফেলছিল।
    একসময় ধ্রুপদীই বলে উঠল, “আসলে তুমি সবসময়ই ভেবেছ বাবার কাজটা যাতে ভালোভাবে হয়। তার জন্য লোকের কাছে তুমি প্রিয় হলে, না অপ্রিয়, সেই চিন্তা কখনই তোমার মাথায় আসেনি। তুমি অনায়াসে লোকের কাছে অপ্রিয় হয়েছ। লোকে তোমাকে ভুল বুঝেছে। কিন্তু বাইরে সেটা প্রকাশ করেনি। মনে মনে তোমাকে ঈর্ষা করেছে। তোমাকে শাস্তি দেওয়ার কথা ভেবেছে। বাইরে বুঝতে দেয়নি কিছু। তুমি তাদের মুখোশের আড়ালে থাকা মুখগুলোকে চিন্তে পারোনি। ওরা এমনি এমনি তোমার বিরুদ্ধে বন্দুকের নল ঘুরিয়ে দেয়নি। ওরা আসলে রাগে ফুঁসছিল। উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় ছিল। তোমার ও ওদের, দু-পক্ষের এই আচরণে সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে বাবার। তোমার সুনাম জোটেনি। অথচ তোমার শ্রম তাঁর খুব কাজে এসেছে। তুমি দিনরাত খেটে কাজ করেছ, নিষ্ঠা ও শ্রম দিয়েছ, আবার অপ্রিয়ও হয়েছ। ফলে সহজেই তোমাকে বদনাম দেওয়া গেছে। বাবা কিন্তু কারও কাছে অপ্রিয় হননি। তিনি সবার কাছেই নিজের সুনাম বজায় রেখেছেন। বদনাম দেওয়ার দরকার পড়লে, কারও ঘাড়ে দোষ চাপানোর হলে, উনি অনায়াসে তোমার ঘাড়ে সেটা চাপিয়ে দিয়েছেন। কারণ, ঘাড়টা তুমি বাড়িয়েই ছিলে। নিজের আত্মরক্ষার কথা তুমি ভাবোনি। নিজের সুনামের কথা ভাবোনি। নিজে প্রিয় হওয়ার কথা ভাবোনি। এসবই তোমার বিরুদ্ধে গেছে। তোমাকে ডাস্টবিনের মতো ব্যবহার করা হয়েছে। যখন ইচ্ছা হয়েছে সেই ডাস্টবিনে সমস্ত আবর্জনা ফেলা হয়েছে। আর নিজে উনি সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত হয়ে থেকেছেন। ওঁর সমস্ত দুর্নীতি, চালাকি আর অবিচারের দায় গিয়ে পড়েছে তোমার ঘাড়ে! নিজেকে খুব মেধাবী, যোগ্য আর ভালোমানুষ দেখাতে গেছ বাবার কাছে। এখন বাকি জীবন ধরে তার ফল ভোগ করো...
    নিমাই যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, কীভাবে সে প্রতারিত হয়েছে! কিন্তু, এবার সে জানতে চাইল, “তোমার সঙ্গে উনি অমন করতে গেলেন কেন? তুমি তো কিছু করোনি...”
    “করিনি মানে?” ধ্রুপদী বলল, “প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমাকে সমর্থন করেছি। সেটা আমার অপরাধ নয়? তোমার প্রতি যে অন্যায় ও অবিচার হয়েছে, তার প্রতিবাদ করেছি। সেটা অপরাধ নয়? যে দেশে প্রশ্ন করাই অপরাধ, সে দেশে নিজের অপরাধের পরিমাণ আমি ক্রমে বাড়িয়েই গেছি। আমার অনেক বড়ো ক্ষতি হতে পারত। উনি সামান্য একটু ঠাট্টা করে ছেড়ে দিয়েছেন। হয়তো খুবই নিষ্ঠুর সেই ঠাট্টা। আমার মনে উনি আশা জাগিয়েছেন। নিশ্চয়তাবোধ জাগিয়েছেন। নিরাপত্তার লোভ দেখিয়ে কারও কাছ থেকে তা কেড়ে নেওয়া নিষ্ঠুর ঠাট্টা ছাড়া আর কী! ভাবো তো, আমার কোনো দোষ হয়নি। আমি যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করেছি। অর্থাৎ কোনো কারণই নেই। তবু আমি বিতাড়িত হয়েছি। এটাকে শাস্তি ছাড়া আর কী বলা যায়? উনি আসলে আমাকে শাস্তিই দিতে চেয়েছেন। দেখাতে চেয়েছেন, চাইলে আমি কত সুখী হতে পারতাম। স্বস্তি পেতে পারতাম। সেই সুখ ও স্বস্তির অনুভূতি কেমন হয়। অথচ নিজের হঠকারিতায় সুখের সমস্ত সম্ভাবনাই আমি জলাঞ্জলি দিয়েছি। আমাকে আসলে উনি পথে আনতে চেয়েছেন। আর কেন সেটা চেয়েছেন, সেটা তো তুমি জানই… ”
    “তোমার অতুলনীয় সৌন্দর্যের জন্য।” নিমাই বলল।
    “এটাও কিন্তু তোমার বিরুদ্ধে গেছে।” ধ্রুপদী বলল। “আমি এত সুন্দর বলেই তোমার দরিদ্র থাকা জরুরি। দরিদ্র মানুষ একজন সুন্দরী নারীর দায়িত্ব নেবে কী করে? আর যতদিন সে অক্ষম থাকবে, ততদিনই অন্যদের সুযোগ থাকবে। তাই না?” ধ্রুপদী আবার খুব জোরে হেসে উঠল।
    নিমাই কেমন যেন হকচকিয়ে গেল সেই হাসিতে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “চমৎকার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তোমার! আমার খুব আপশোস হয় অন্য একটা কারণে। বাবার এতো কাছাকাছি আসার সুযোগ পেলাম। খুব ইচ্ছে ছিল, অভিনয় নিয়ে আমার মতামত, পড়াশুনো আর ধ্যানধারণাগুলো ওঁর সঙ্গে বিনিময় করি। অন্য সবকিছু না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু একজন তরুণ অভিনেতা যখন একজন প্রবীণ অভিনেতার কাছে আসে, তখন সে সবার আগে কী চায়? শিখতে চায়। নিজের সবকিছু যাচাই করে দেখতে চায়। নিজের ভাবনাগুলোকে প্রকাশ করতে চায়। আর প্রবীণ মানুষটির প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজে আরও পরিণত হয়ে উঠতে চায়। কতবার বাবার কাছে ছুটে ছুটে গেছি। নতুন কিছু পড়লে বা নতুন কোনো ভাবনা এলেই আলোচনা করতে চেয়েছি। কিন্তু ওসবে কখনই ওঁর কোনো আগ্রহ দেখিনি। উনি কখনও আমার সঙ্গে কিছু বিনিময় করতে চাননি। অভিনয় নিয়ে ওঁর সঙ্গে আলোচনা করতে গেলেই উনি কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যেতেন। কথা ঘোরাতে চাইতেন। আমাকে এগোতেই দিতেন না। ওর অনিচ্ছা দেখে আমিও আর কিছু বলতাম না। আমাদের মধ্যে অভিনয় নিয়ে আর কোনো কথাই হত না। আমার অভিনয় নিয়েও কখনও উনি কোনো আগ্রহ দেখাতেন না। কখনও কিছু জানতে চাইতেন না। আমাকে ভাবিয়ে ছাড়তেন, ওঁর কাছে আমি একজন ফাইল সংগ্রাহক ছাড়া আর কিছুই নই। এ নিয়ে আমার মধ্যে প্রচণ্ড কষ্ট হত। ভেতরে ভেতরে ছটফট করতাম। নিজেকে ওঁর কাছে মেলে ধরতে চাইতাম। কিন্তু ওঁর দিক থেকে কোনো উৎসাহই ছিল না। প্রেরণাও ছিল না। এ এমন এক বঞ্চনার অনুভূতি, যার সঙ্গে অন্য কোনো বঞ্চনার তুলনাই হয় না... ”
    ধ্রুপদী কিছুক্ষণ নিবিষ্ট হয়ে নিমাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ওর হাত ধরে কোমল স্বরে বলল, “তুমি যা কিছু পেতে পারতে, তার সব কিছুই হারিয়েছে নিজের দোষে। তোমার চিন্তাভাবনার গোড়াতেই গলদ রয়েছে। তুমি সেগুলোই প্রত্যাশা করো, যা তুমি কখনোই পাবে না। আর এর জন্য দায়ী তোমার ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। তুমি যাকে বঞ্চনা ভাবছ, তা মোটেই বঞ্চনা নয়। বাবার দিক থেকে ভেবে দেখো। উনি স্রেফ আত্মরক্ষা করে গেছেন। তুমি যা নিয়ে আলোচনা করতে চাও, সে বিষয়ে ওঁর কোনো ধারণাই নেই। উনি। কী বিনিময় করবেন তোমার সঙ্গে? তুমি ওঁকে দোষারোপ করছ। উনি মনে মনে হাসছেন। ওঁর ব্যাপারে তোমার প্রত্যাশা খুব বেশি। একটু তলিয়ে দেখলে বুঝতে পারতে, এই প্রত্যাশায় বাস্তবতা কিছু নেই। উনি শুধু তোমার সঙ্গে নয়, সকলের সঙ্গেই যে ধরনের আলোচনা করেন, যে সব বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন, মতামত দেন, তার সঙ্গে কোথাও কী তোমার দুনিয়ার কোনো মিল আছে? তাহলে তুমি আশা কর কী করে? মনে আছে, তুমি একদিন আমার সামনে মিশরের প্রাচীন অভিনয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলে। উনি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বিষয়টাকে স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেদিনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম। গোটা দুনিয়ার কাছে যা গভীর আগ্রহের বিষয়, তা নিয়ে ওঁর এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য কেন? আসলে উনি ব্যাপারটা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আর সেকথা প্রকাশ করতেও চান না। আসলে উনি নিজেকে বাঁচাতে চান। আত্মরক্ষা করতে চান। এই কারণেই, প্রকৃত বৈদগ্ধ্যকে উনি ভয় পান। যে-কোনো চুটকি, অগভীর আলোচনায় ওঁর এত আগ্রহ। উনি তাদের সঙ্গেই মেশেন, যারা ওঁকে বিপদে ফেলবে না। ওঁকে স্বস্তিতে থাকতে দেবে। তোমাকে বেশি বাড়তে দিলে সেটা ওঁর পক্ষে অস্বস্তির কারণ হতে পারত। ওঁর সুনামের পক্ষে সেটা ভালো হত না। অথচ তুমি সেই চেষ্টাই করে গেলে। মানে, ওঁর ফাইল গুছিয়ে গেলে। উনি সেটাকে স্রেফ সুযোগ হিসাবেই নিলেন। তোমাকে আসলে বাড়তে দিলেন না। কিন্তু বেড়ে যাওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে রাখলেন চারপাশে। তুমি সেই পরিবেশটাকেই বিশ্বাস করলে। সুযোগের অপেক্ষায় রইলে। প্রতারণাটাকে ধরতে পারলে না... ”
    একদমে কথাগুলো বলে ধ্রুপদী থামল। জোরে জোরে শ্বাস নিল কয়েকবার। নিমাই বিষণ্ণ স্বরে বলল, “তাহলে আমার কী করা উচিত ছিল?”
    ফাইল গোছাতে আর সার্টিফিকেটটার জন্য অপেক্ষা করতে। নিজেকে অত প্রকাশ করতে গেছ কেন? নিজের ওই বিপুল প্রস্তুতিকে? ওদের ভয় পাইয়ে দিয়েছ তুমি! ওরা তোমাকে বিপজ্জনক ভাবছে। নিজেদের ঠুনকো সম্মান বাঁচাতেই তোমাকে নানাভাবে হেনস্থা করে চলেছে। ওপরে ওপরে গুরুত্ব দিলেও ভেতরে ভেতরে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে গেছে তোমাকে। এসবই হয়েছে তোমার নির্বুদ্ধিতার জন্য। কাদের কাছে নিজেকে প্রমাণ করতে গেছ তুমি? কাদের কাছে নিজের বীরত্ব দেখাতে গেছ? এটা কি সেই যুগ? নিজেকে আসলে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভেবে ফেলেছ তুমি। তাই তোমার এত দুঃখ। তুমি সার্টিফিকেট পাবে কি না, আমার অন্তত যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে!
    “আমি এখন কী করব ধ্রুপদী?” ভেঙে পড়া গলায় বলল নিমাই, “নিজেকে এখন আর আমার মানুষ বলেই মনে হয় না। যেন একটা ছায়ামানুষে পরিণত হয়েছি আমি! মনে হয়, রক্ত-মাংস-হাড়-মস্তিষ্ক-হৃৎপিণ্ড-মেরুদণ্ড-হাত-পা-চোখ-কান, কিছুই আমার নেই। গলায় কোনো স্বর নেই, চোখে কোনো দৃষ্টি নেই, কানে শোনার ক্ষমতা নেই। আমি স্রেফ তুলোর মতো একদলা ছায়ার সমষ্টি। ছায়া ছাড়া আমার আর যা কিছু আছে, সবটাই মিথ্যা। প্রতারণা। প্রহসন। মানুষ হিসেবে আমার কোনো ভূমিকাই নেই। আমি টিকে আছি স্রেফ একজন ছায়ামানুষ হিসেবে। যখন আমি এই জাহাজে এসেছিলাম, তখন আমার অনেক স্বপ্ন ছিল, জেদ ছিল, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল। তখন আমার মগজ ছিল, হৃদয় ছিল, বিবেক ছিল। সব ব্যাপারে আমার মতামত ছিল। নিজের ব্যক্তিত্বকে আমি টের পেতাম। নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করতাম। এখন ছায়া ছাড়া আর কিছুই অনুভব করতে পারি না আমি। যেন আমি বাতাসের সঙ্গে বাতাস হয়ে মিশে আছি। বাতাসেরও জোর বেশি আমার থেকে। একমাত্র ফাইল হাতে নিয়ে এখন আমি স্বস্তি বোধ করি। অন্য সব কিছুই, এমনকি আমার মন, আমার শরীর, আমার উপস্থিতি, পরিবেশ, বাস্তবতা, গতিবিধি, সবকিছুই আমার পক্ষে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে! কেন এখানে এসেছি, সেকথাও যেন ভুলে যাই মাঝে মাঝে। সার্টিফিকেটটাও যেন গত জন্মের ব্যাপার বলেই মনে হয়। চারদিনে সবকিছুই কেমন বদলে গেল... ”
    ধ্রুপদী হঠাৎ নিমাইয়ের খুব কাছে এসে ওর চুলে কয়েকবার বিলি কেটে দিল। তারপর খুব জোর দিয়েই বলল, “তোমাকে ওরা যা বানিয়ে দিতে চেয়েছে, আসলে মোটেই তুমি তা হওনি। যদি হতে, আজ সকালে কেউ এসে তোমায় বলত না, ‘কী প্যাশন!’ বা ‘গ্রেট পারফরম্যান্স!’, যদি হতে, তাহলে আজ হলের সমস্ত দর্শক ওইভাবে চুপ করে যেত না। তোমাকে ওরা মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায়নি। ছায়ামানুষ বানিয়ে দিতে চেয়েছে। তুমি সেই ছায়ামানুষকেই দেখতে পেয়েছ। এ তোমার রূপান্তর নয়, বাধ্যতা মাত্র। আসলে তোমার জেরাপর্ব চলছে। ওরা সবাইকেই এভাবে জেরা করতে থাকে। ওরাই দেশ। তুমি নিছক একজন শিল্পী। কিন্তু এই দেশে শিল্পচর্চা করতে গেলেও ওদের মাপের হয়ে উঠতে হবে। যতক্ষণ না তা হতে পারবে, ততক্ষণই ওরা জেরাপর্ব চালিয়ে যাবে। নানাভাবে তোমাকে বাজিয়ে দেখবে। মেপে দেখবে। শাস্তি দিয়ে যাবে। আর একসময় তোমার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করেই ছাড়বে। আসল ছায়ামানুষ সেই, যে নিজেকে জানে না, নিজেকে মানুষ বলে ভাবে, অথচ ভাঁড়ের মতো আচরণ করে আর আত্ম-প্রতারণা চালিয়ে যায়। প্রথম যখন এই দ্বীপে আসি, আমিও একজন ছায়ামানুষই ছিলাম। একটুও সতর্ক ছিলাম না। নিজেকে মানুষ বলে ভাবতাম। নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করতে পর্যন্ত ভয় করত। সবসময় নিজের ওজন বয়ে বেড়াতাম। আর প্রতিবাদের মধ্যেই, ক্ষোভ প্রকাশের মধ্যেই নিজের অস্তিত্বকে টের পেতাম। আমি যে জীবনের সঙ্গে কত বড়ো প্রতারণা করে চলেছি, সেটা টের পেলাম এখানে এসে। বুঝতে পারলাম, এতদিন। শুধু মানুষের ভূমিকায় অভিনয় করে এসেছি। আসলে ছিলাম ছায়ামানুষ। আমি বদলে যেতে চাইলাম। আর চিহ্নিত হয়ে গেলাম। তোমাকে চিহ্নিত করেছে তোমার মেধা। তুমি ওদের মাপে পড় না। আসলে ওরা তোমাকে বর্জন করার আগেই তুমি ওদের বর্জন করেছে। ওরা তোমাকে নির্বাসন দেওয়ার আগেই তুমি নিজের নির্বাসনকে বেছে নিয়েছে। আমি কিন্তু তোমার মতো নই। কয়েকটা দিন একটু রেগে ছিলাম মাত্র। স্বভাবেই আমার প্রতিবাদ, হয়তো তাই... ”
    নিমাই হঠাৎ ধ্রুপদীকে নিজের কাছে টেনে নিল। তারপর তীব্র আশ্লেষে ওর ঠোঁটটাকে নিজের ঠোঁটের ভেতর নিয়ে চুমু খেল। কিন্তু ধ্রুপদী আলতো করে ওকে ঠেলা দিয়ে সরে এল। তারপর মাথার চুল ঠিক করতে করতে বলল, “তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ।”
    এই মেয়েটি যেন একটা রহস্য। নিমাই অবাক হয়ে জানতে চাইল, “মানে?”
    গোধূলি ফুরোতে চলেছে। অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। নৌকোটা একটা চরে গিয়ে ঠেকেছে। এই চরটাও অন্ধকার। মৃদু মৃদু দুলছে নৌকোটা। নিমাই হাতের বৈঠা দুটো নৌকোয় তুলে রেখে আবার জানতে চাইল, “কী বলতে চাও তুমি?”
    ধ্রুপদী কঠিন স্বরে বলল, “মানুষ হয়ে দেখলাম, কোনো লাভ নেই। ওতে অনেক ঝক্কি। আমার ছায়ামানুষ হয়ে থাকাই ভালো। এটা একটা বিভ্রমের মতো। লোকে মানুষ বলেই ভাববে। আমিও প্রতিবাদ করে যাব। আবার কেউ আমাকে বিরক্তও করবে না। আমি ছায়ার সঙ্গে ছায়া হয়ে মিশে থাকব। এই দুনিয়ার ভোগসুখে নিজেকে ভাসিয়ে দেব। বাবার প্রস্তাব তাই ফেরাতে পারলাম না। গতকালই। তোমার মনে আছে, আমি আড়াই ঘণ্টা পরে এলাম? অথচ মাত্র এক ঘণ্টা লাগার কথা। আমি বাবার কাছে ছিলাম। শুধু তাই নয়, বাবা যখন চাইলেন, আমি না করতে পারিনি। তুমি জান না, এসব লোক কী ক্ষিপ্রতার সঙ্গে নিজেদের চাহিদা মেটান! আমি যা করেছি, সবটাই আত্মরক্ষার জন্য। ভেসে থাকার জন্য। না হলে তোমার মতোই আমি তলিয়ে যেতাম... ”
    বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছিল নিমাই। চোখে ঝাপসা দেখছিল সে। তারপর বলল, “তুমি তাহলে আত্মসমর্পণ করে এলে? সব কিছু বুঝেও?”
    ধ্রুপদী বলল, “সব কিছু বুঝেছি বলেই তো! বাবা কেন বাবা, কেন তিনি সর্বশক্তিমান, সেটাই উনি তোমাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন। আসলে পক্ষও তাঁর, বিপক্ষও তাঁর, সমর্থনও তাঁর, প্রতিবাদও তাঁর, তিনিই একমাত্র মানুষ, বাকি সবাই ছায়ামানুষ। আমি কী করতে পারতাম? তোমার পক্ষ নিয়েছিলাম আমি। তার জন্য যথেষ্ট শাস্তি পেতে হয়েছে আমাকে। এভাবে চলতে পারে না। আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। সার্টিফিকেট পেতে হবে। জীবনে আমি সুখী হতে চাই। স্বস্তি চাই। সেই সুযোগও পেয়েছি আমি। কিন্তু তার বদলে বাবাকে আমি সমস্ত জানিয়েছি। নিজের হৃদয়কে আমি পাথর করে তুলেছি। তুমি আমার সমর্থনকে অস্বীকার করতে পারতে, আমার প্রতিবাদকে অগ্রাহ্য করতে পারতে। তোমার আরও নমনীয় হওয়া উচিত ছিল। বাবার কাছে গিয়ে তুমি আত্মসমর্পণ করতে পারতে। বাবা নিছক একজন ব্যক্তি নন। তিনি একটা ব্যবস্থা। ক্ষমতা-ব্যবস্থা। তুমি সম্পূর্ণ একা। কী করতে পার তুমি? তুমি নিজেই নিজের পরিণতি বেছে নিয়েছ। নিজেকে প্রকাশ করে ফেলেছ। সার্টিফিকেট যারা পেতে আসে, তোমার মতো হঠকারিতা করলে তাদের চলে না। অনেক সতর্ক থাকতে হয়। বাবা তোমাকে সুযোগ দিয়েছিলেন। আর তুমি বেছে নিলে তোমার নিয়তিকে... ”
    “তুমি কী এটাই চেয়েছিলে? এই জন্যই এত কথা বলতে আমায়?” বিপন্ন গলায় জানতে চাইল নিমাই। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছিল। স্বর ভেঙেচুরে যাচ্ছিল।
    ধ্রুপদী আর কিছু বলার আগেই একটা ছায়ামূর্তি ঝাঁপিয়ে পড়ল নৌকোর মধ্যে। নিমাইকে কোনো প্রতিরোধের সুযোগ না দিয়েই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল জলের মধ্যে। সামান্য একটু আলোড়ন। তারপরই জলের ওপরটা আগের মতোই শান্ত, স্তব্ধ, মসৃণ হয়ে গেল।
    ধ্রুপদী প্রচণ্ড ক্রোধে কাঁপছিল। ছায়ামূর্তিটির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, “এ কী করলে তুমি?”
    ছায়ামূর্তিটি শান্ত গলায় বলল, “কোনো উপায় ছিল না।”
    —বাবার অনুমতি নিয়েছ? এরকম কিন্তু কথা ছিল না। আগে জানলে...
    —খুব বেড়ে গেছিল ও।
    —কাপুরুষের মতো কথা বোলো না!
    —ওর মেধা, ওর প্রতিভা, ওর দৈহিক সৌন্দর্য, আমি কোথায় থাকতাম?
    —তাই বলে এভাবে শাস্তি দেবে? ছিঃ!
    “কী বলতে চাও তুমি?” ছায়ামূর্তিটি একটানে নিজের মুখোশ খুলে খেলল। অচ্যুতকে এবার পরিষ্কার দেখা গেল। শান্ত গলায় আবার সে জানতে চাইল, “ও বেঁচে যাবে না তো?”
    —গেলেই বা! এত ভয় তোমার মনে? ওকে তুমি ধাক্কা দিয়েছ, সেটাই তো যথেষ্ট। আজ সকালের বদলা নিয়েছ তুমি। সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছ, তুমি কতদূর যেতে পার। আর কী চাই তোমার? ও বাঁচল কী মরল, তাতে কী যায় আসে তোমার? আর ওর কথা যদি বল, তাহলে বলব, ওর দিক থেকেও বাঁচা বা মরায় আর কোনো তফাৎ হবে না। ওর শুধু এই ধাক্কাটারই দরকার ছিল। এই দেশটাকে ও এখন পুরোপুরি চিনে গেছে...



    বাবার ঘরে ঢুকে ওরা দু-জন যাকে দেখল, নিমাই তাঁকে একবারই দেখেছে। সেই লোলচর্মের জরাজীর্ণ বৃদ্ধ। অসম্ভব নিষ্ঠুর একটি মুখ। মন দিয়ে একটির পর একটি ব্যাংকের চেক লিখে যাচ্ছেন। তাঁর সামনে টেবিলের ওপর স্তুপ জমে আছে। বৃদ্ধ ওদের দিকে তাকালেন।
    অচ্যুত বলল, “কাজ হয়ে গেছে।”
    “অন্য কোনো দেশ হলে তোমাকে বলত খুনি।” বাবা শান্ত স্বরে বললেন। “কিন্তু কারও মতো হতে আমি রাজি নই। আমি আমার মতো। আমার চোখে তুমি একজন সন্ত। এই দেশের চোখে তুমি একজন সন্ত। আর লোকে তোমাকে সেভাবেই চিনবে।”
    বাবা ফোন করলেন। ওপাশ থেকে একইসঙ্গে ভেসে এল শুভাশিস আর অমলকান্তির গলা। তারা বলল, “বলুন, বাবা!”
    “দেশে শান্তি বজায় রাখার জন্য আমরা সর্বোচ্চ মূল্যের যে সার্টিফিকেটটা দিই, অচ্যুতকে সেটা দিয়ে দাও। কাল ঘোষণাটা করবে।”
    —আচ্ছা, বাবা।
    বাবা এবার ধ্রুপদীর দিকে তাকালেন। তিনি অসম্ভব হাঁপাচ্ছিলেন। ধ্রুপদী বলল, “আপনি এত হাঁপাচ্ছেন কেন?” “তোমাকে, তোমার বুকে, শেষ চুমুটা খাওয়ার পর থেকেই... ” কোনোমতে বাবা বললেন।
    —ওঃ, আমি এক্ষুনি হাসপাতালে ফোন করছি...
    —আমি হাসপাতালে যাব না। আমাকে হুইস্কি এনে দাও।
    অচ্যুত ছুটে গেল। তারপর বাবার ঠিক পিছনের দেয়ালে একটা কাঠের আলমারি খুলে দামি দুটো হুইস্কির বোতল বার করে নিয়ে এল।
    বাবা অনেকটা হুইস্কি নিজের গলায় ঢেলে নিলেন। এতে তাঁর হাঁপানি আরও বেড়ে গেল। তিনি ধ্রুপদীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছ তুমি! হ্যাঁ, তোমার সার্টিফিকেটের ব্যাপারে আমি কথা বলেছি। কালই ওটা পাকা হয়ে যাবে। পরশু বিদেশ চলে যেও। কাল পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকো। তোমাকে দেখলেও... ”
    তাঁর গলার স্বর বিষণ্ণ শোনাল। আর কিছু বলতে পারলেন না তিনি। প্রবলভাবে হাঁপাতে লাগলেন।
    নাবিকটি এক প্লেট খিচুড়ি, বেগুন ভাজা আর ওমলেট নিয়ে এল। হুইস্কির বোতলটা পাশে সরিয়ে রেখে বাবা সেগুলোই গোগ্রাসে খেতে লাগলেন। অদ্যুতের খুব খিদে পেয়েছিল। সে একদৃষ্টিতে বাবার খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল।
    বাবা বলছিলেন, “গতকাল অনেক রাতে নিমাইকে ডেকেছিলাম। একটু অভিনয় করে দেখালাম। ওর মুখ দেখেই বুঝলাম, ওর ভালো লাগেনি। না, হয়তো এটুকুই নয়। ওর বোধহয় মনে হয়েছে, অভিনয়টা কিস্যু হয়নি। তারপর বললাম, ওদের দ্বীপে শুভাশিস যে মস্ত অডিটোরিয়াম বানিয়েছে, তার জন্য অভ্যাস করছি। কথাটা শুনেই ওর মুখটা ছোটো হয়ে গেল। জানতে চাইলাম, কিছু বলতে চাও তুমি? ও সংকোচ করছিল। আমি ওকে সাহস জোগালাম। নির্ভয়ে মুখ খুলতে বললাম। আমি জানতাম, এখানে আসার পর থেকেই ও আমার যতগুলো অভিনয় মঞ্চে বা সিডিতে দেখেছে, আমার বৃদ্ধ বয়সে করা অভিনয়, সবগুলো সম্পর্কেই ওর একটাই মত। কিস্যু হয়নি। তবু একটু বাজিয়ে দেখতে চাইলাম। আর ও একটু ঘুরিয়ে সেই কথাই বলল। আমাকে জানাল, আমার সঙ্গে মাটির কোনো যোগ নেই। আমি অনেক ওপরে উঠে গেছি। আমার অভিনয় তাই কিছুটা ভাসা ভাসা মনে হচ্ছে ওর চোখে। বরং ওর দ্বীপে অনেক অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে আছে। তারা সব চমৎকার অভিনয় করছে। বড়ো মঞ্চে তাদের একবার সুযোগ পাওয়া দরকার। আর তাদের ওপর আমি যদি ভরসা করতে না পারি, অন্তত বুড়ো অভিনেতাকে একবার ডাকা হোক। তিনি এখনও সুযোগ পেলে বুড়ো হাড়ে ভেলকি দেখিয়ে দেবেন। আমি কি ওর কথাগুলো একটু বিবেচনা করে দেখতে পারি?”
    “ওঃ, কী সাংঘাতিক!” অচ্যুত বলে উঠল, “আপনি সহ্য করলেন ওর এইসব কথা?”
    “আমি শুধু মুচকি হাসলাম।” কথাটা বলেই বাবা লক্ষ করলেন, অচ্যুত একদৃষ্টে তার খাবারের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি বুঝতে পারলেন, ছেলেটার খিদে পেয়েছে। আর সেটা বুঝেই যেন চুপ করে গেলেন। আর আগের চেয়েও বেশি মন দিয়ে খেতে লাগলেন। অচ্যুতের মনে পড়ল, এখানে আসার পর প্রথম দিন কত খাতির করে তাকে খাওয়ানো হয়েছিল। আর আজ বাবা সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন, কোনো আগ্রহই নেই তার, একজন ক্ষুধার্তকে সামনে দাঁড় করিয়ে তিনি অনায়াসে খেয়ে চলেছেন।
    ফিসফিস করে ধ্রুপদীর কানে কানে সে বলল, “এরকম নিষ্ঠুর না হলে বোধহয় সর্বশক্তিমান হওয়া যায় না!”
    “শক্তিকে প্রকাশ করে ফেললে সে দুর্বল হয়ে যায়।” ধ্রুপদী বলল। “শক্তি ততক্ষণই শক্তি, যতক্ষণ তা গোপন থাকে। প্রকাশ্য হলেই তা দুর্বলতা হয়ে যায়।”
    অচ্যুতের পাশেই দাঁড়িয়েছিল নাবিকটি। সে এগিয়ে এসে বলল, “আপনি একটু খাবেন?”
    “কেন?” অচ্যুত জানতে চাইল।
    নাবিকটির মুখে সহানুভূতি। সে বলল, “আপনাকে দেখে ক্ষুধার্ত মনে হচ্ছে।”
    “তাই নাকি?” অচ্যুত অবাক হওয়ার ভান করল। তারপর বলল, “হতে পারে। দিতে পারো। তবে অল্প করে।”
    যেন খেতে রাজি হয়ে নাবিকটিকে সে কৃতার্থ করে দিয়েছে! এসব কৌশল তার বাবার কাছ থেকেই শেখা।
    নিজের ইচ্ছাকে কখনও নির্লজ্জভাবে প্রকাশ করতে নেই। রেখেঢেকে প্রকাশ করলেই তার সম্মান থাকে।
    ধ্রুপদী ফিসফিস করে বলল, “অল্প করে কেন?”
    অচ্যুতও খুব আস্তে ধ্রুপদীর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “বাবার কাছে কোনো দর্শনার্থী এলে উনি কী করেন দেখেছ কখনও? হয়তো তার জন্যই সকাল থেকে অপেক্ষা করে আছেন। কিন্তু তিনি এলে, তা তিনি যত বিশিষ্ট ব্যক্তিই হোন, বসিয়ে রাখেন। এই যে তিনি অপেক্ষা করেন, তাতেই যেন বাবার গুরুত্ব বেড়ে যায়। এমনও হয়, বাবা যেন তাঁর কথা ভুলেই গেলেন। নাবিকটি এসে বেশ কয়েকবার বাবাকে মনে করিয়ে দিল। তারপর তিনি যান। কখনও তাড়াহুড়ো করেন না। ব্যস্ততা দেখান না। দর্শনার্থী যখন ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠে, একবার চোখের দেখা দেখার জন্য, একটু কথা বলার জন্য ছটফট করে, তখনই তিনি দেখা দেন। তার দেখা পেয়ে লোকটি যেন কৃতার্থ বোধ করেন। এতে বাবার সুবিধা হয়। প্রথম থেকেই তাঁর সঙ্গে তিনি কর্তৃত্ব নিয়ে কথা বলতে পারেন। নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার কত কৌশলই যে তিনি জানেন!”
    —তার মানে ওই ‘অল্প’ কথাটাতেই তুমি নিজের সম্মান রাখলে!
    —ঠিকই বলেছ। নইলে খুব হ্যাংলা মনে হত আমাকে। যে উঁচুতে উঠতে চায়, বড়ো হতে চায়, তার নিজেকে ‘হ্যাংলা’ দেখালে চলে না। ওই নিমাইয়ের মতো! সার্টিফিকেটটার জন্য কী ছটফটানিই না ছিল ওর! ওকে দেখলেই বোঝা যেত। যে-কোনো পরিস্থিতিতেই সংযম ধরে রাখতে হয়, এটাই কী বাবার শিক্ষা নয়?
    হাতে খিচুড়ির প্লেট নিয়ে এক মুঠো খিচুড়ি মুখে দিতেই অচ্যুত যেন অমৃতের স্বাদ টের পেল। কিন্তু খুবই অল্প দিয়েছে নাবিকটি। অচ্যুত সত্যিই বুঝতে পারেনি, আক্ষরিক অর্থেই তাকে এত অল্প দেওয়া হবে। কিন্তু এর চেয়ে বেশি চাওয়ার সাহস তার নেই। অচ্যুত খুব ধীরে ধীরে ওই অল্প খিচুড়িই তারিয়ে তারিয়ে খেতে লাগল। বাবা কিন্তু ওর দিকে ভ্রূক্ষেপও করলেন না। যেন তাঁর সামনে একটা ভিখারি দাঁড়িয়ে আছে। তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেই তিনি বড়ো বড়ো গ্রাসে খুব দ্রুত খেতে লাগলেন।
    কিন্তু হঠাৎ তিনি উঠে দাঁড়ালেন। অচ্যুত খাওয়া থামিয়ে দিয়েছিল। ধ্রুপদীও বুঝতে পেরেছিল, কিছু একটা হয়েছে। তিনি দরজার কাছে পৌঁছোনোর আগেই হড়হড় করে অনেকটা পায়খানা তার পায়জামার তলা দিয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল।
    এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে ধ্রুপদী চোখ বুজে ফেলল। অচ্যুত কিন্তু হতভম্বের মতো বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দেখে তিনি হুঙ্কার ছাড়লেন, “কী দেখছ? মজা? বেশ মজার ব্যাপার হচ্ছে এখানে, তাই না?”
    তারপরই তিনি দরজা দিয়ে বাইরে চলে গেলেন।
    অচ্যুতের আর খাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। নাবিকটি ছুটে এসেছিল। দ্রুত একটা কাপড় দিয়ে সে পায়খানাটা মুছে ফেলল। তারপর জায়গাটা ধুয়ে দিল। গোটা মেঝেতে অতি সামান্য চিহ্নও রইল না। কিন্তু অচ্যুত আর ধ্রুপদীর মনে পায়খানাটা যেন লেগে রইল। ওরা কিছুতেই ভুলতে পারছিল না।
    ওরা অপেক্ষা করছিল বাবার ফিরে আসার জন্য। কিন্তু তার বদলে নাবিকটিই একটু পরে প্রবল হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এল। ধ্রুপদী ওকে দেখেই বুঝতে পারল, সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটেছে!
    নাবিকটি বলল, “কার অপেক্ষায় আপনারা বসে আছেন?”
    “মানে?” দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল।
    “উনি যে আপনাদের ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেন... ”
    নাবিকটি চলে যেতেই ধ্রুপদী আর অচ্যুত একে অপরের মুখে শোকের বিষণ্ণতা খুঁজল। কিন্তু শোক কোথাও ছিল না। অচ্যুত হঠাৎ তীব্র আক্রোশে ফেটে পড়ল, “ওঃ, শান্তির জন্য আমার সার্টিফিকেট!”
    নিজের ক্ষোভকে গোপন করতে না পেরে ধ্রুপদীও আক্ষেপের সঙ্গে বলল, “আর আমার সার্টিফিকেট! বিদেশ যাওয়া!”



    নিজের দ্বীপে শেষপর্যন্ত ফিরে এসেছে নিমাই। এখানেই বাবার জন্ম। বাবার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী এখানেই বাবাকে দাহ করা হয়েছে। ভিড়ের মধ্যে মিশে অনেকের সঙ্গে সে-ও শবানুগমন করেছে। কেউ তাকে ডাকেনি। সে যা করেছে, নিজের ইচ্ছাতেই করেছে। এই লোকটা সার্টিফিকেটের লোভ দেখিয়ে তাকে নিয়ে গেছিল হৃদয়পুর দ্বীপে। তারপর তাকে খুন করতে চেয়েছিল। নিমাই কিন্তু কখনও তাঁর মৃত্যু চায়নি। তাঁর দীর্ঘজীবন কামনাই করেছে বরাবর। তাঁর সমস্ত হারিয়ে যাওয়া কাগজপত্র অতি যত্নে উদ্ধার করেছে। নিজের সর্বস্ব দিয়ে তাদের আগলেছে আর তাদের উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে চেয়েছে। বাবার ভবিষ্যৎ নানা পরিকল্পনার সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করতে চেয়েছে বারবার।
    কিন্তু এমন হঠাৎ কেন চলে গেল লোকটি? কী হয়েছিল তার?
    গোটা দেশ জেনে গেছে, তার ক্যানসার হয়েছিল। নিমাই কিন্তু জানত না সেকথা। কতবার লোকটির কাছে গেছে সে। ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলেছে। লোকটি ঘূণাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি, তাঁর ক্যানসার হয়েছে। অভিনয়টা সত্যিই তাঁর রক্তের সঙ্গে মিশে ছিল! অনেক প্রতিভা ছিল তাঁর। কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রতিভা ছিল যেখানে, যে ব্যাপারে, তাকেই তিনি কখনও প্রকাশ্যে আনেননি। এও ছিল তার এক চতুর কৌশল। লোকে জানত, নেহাৎ শখে তিনি মাঝেমধ্যে অভিনয় করেন। তিনি জানতেন, জীবনটাই তাঁর অভিনয়।
    বাবার শেষকৃত্য নিয়ে বেশ একটা উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছে। সবাই বেশ সেজেগুজে এসেছে। একে অপরের কুশল জানতে চাইছে। সবার মুখেই হাসি। খুশি খুশি ভাব। সবাই যেন একটা পবিত্র কর্তব্য সারতে এসেছে। কারও মধ্যে কোনো শোক নেই। নিমাই মন দিয়ে সবার মুখগুলো দেখছিল। শোকের চিহ্ন খুঁজছিল। কিন্তু লোকে যেন ধরেই নিয়েছে, উপস্থিতিটাই যথেষ্ট।
    একজন রাজনৈতিক নেতা ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন। তাঁর মুখ-চোখের ভাব অত্যন্ত ক্রুদ্ধ। তিনি বললেন, “বাবার উত্তরাধিকারী কে আছেন?”
    নিমাই মনে মনে ভাবল, বাবা! সবার কাছেই তিনি বাবা!
    নিজের মেয়ে পরমাকেই উইল করে বাবা তার সর্বস্ব দিয়ে গেছেন।




    পরমা সেই সময় উকিলের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত ছিল। উকিলকে সে বলছিল, “তাহলে মোট কত কোটি বললেন?”
    উকিল সংখ্যাটা বললেন।
    —আঃ, একটু জোরে বলুন না।
    উকিল ইশারায় প্রথমে তাকে চুপ করতে বললেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, “এসব কথা কী জোরে বলা যায়? তাও এখানে?”
    মেয়েটি এবার ধৈর্য হারিয়ে বলে উঠল, “কেন বলুন তো!”
    —আপনি না ওঁর মেয়ে!
    পরমা হোহো করে হেসে উঠল। তারপর বলল, “ওর মতো লোকের আবার কোনো সম্পর্ক হয় না কী? আমি বুঝি স্রেফ হিসেব। আপনি টাকার অঙ্কটা বলুন... ”
    ঠিক সেই সময় কে যেন পরমাকে পিছন থেকে ঠেলা দিল। প্রচণ্ড ক্রদ্ধ হয়ে সে পেছনে ফিরেই সেই রাজনৈতিক নেতাকে দেখতে পেল। রাজনৈতিক নেতাটি অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “একটু শুনুন না, কথা আছে... ”
    “না, অসম্ভব, আমি ব্যস্ত আছি এখন।” পরমা বলল।
    “আপনার শুধু সম্পত্তি নিয়ে চিন্তা!” রাজনৈতিক নেতাটি বিরক্ত হয়ে বলে উঠল।
    “আর, আপনার তোভোট, তাই না?” ততোধিক বিরক্ত হয়ে পরমা ঝাঁঝিয়ে উঠল।
    এদিকে, কে বাবার মুখাগ্নি করবে, তাই নিয়ে চুল্লিতে ঢোকানো বাবার মৃতদেহের সামনে শুভাশিস আর অমলকান্তির হাতাহাতি শুরু হয়ে গিয়েছে। আর সেই সুযোগে টুক করে বাবার মুখে আগুন দিয়ে এল অচ্যুত। সবটাই মিডিয়ায় ছবি হয়ে গেল। মিডিয়ার লোক এখানে থিকথিক করছে। এখন প্রতিটি মুহূর্তই ইতিহাস। বাবার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়।
    একজন সাংবাদিক তো ধ্রুপদীর কানে কানে বলছিল, “বাবা যখন আপনার সামনে পায়খানা করে দিলেন, ছবি তুলে রাখলেন না কেন?”
    “আর বলেন কেন!” ধ্রুপদী বলল, “ঠিক সেই সময়ই আমার হাতে মোবাইল ফোনটা ছিল না!”
    শ্মশান-চত্বরে যেন মেলা বসে গেছে। ফুচকা, ঝালমুড়ি, রোল, চাউমিন বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। গোটা চত্বরের আকাশে রঙবেরঙের বেলুন উড়ছে। ছোটো ছোটো বাচ্চারা একে অপরের দিকে বুদবুদ ছুড়ে মারছে। এখানে যে কারণে এত লোক জমা হয়েছে, সেই কারণটাই যেন হারিয়ে গেছে। কারও কোনো হুঁশ নেই। সেই দিকে তাকিয়ে ধ্রুপদী ফিসফিস করে বলে উঠল, “বাবা দেখলে খুশি হতেন।”
    পরমা হাসল। তারপর বলল, “যা বলেছ! মানুষ বেহুঁশ হয়ে থাকবে, এটাই ওঁর পছন্দ ছিল।”
    অমলকান্তি আর শুভাশিস তো আজ রাতেই অডিটোরিয়ামে স্মরণসভা ডেকেছে।
    —আমি তোমার ওপরই সভা পরিচালনার ভার ছেড়ে দিতে চাই।
    ধ্রুপদী হাসল। পরমা বলল, “ওঁর শ্রাদ্ধের ব্যাপারটাও তোমাকেই দেখতে হবে... ”
    “শ্রাদ্ধ?” চমকে উঠল ধ্রুপদী। “ওঁর শ্রাদ্ধ হবে নাকি?”
    “নিশ্চয়ই।” পরমা জোর দিয়ে বলল।
    —সে কী! উনি তো ঘোর নাস্তিক ছিলেন।
    —সে তো লোকের চোখে উনি অনেক কিছুই ছিলেন!
    ইশারাটা বুঝতে পারল ধ্রুপদী। তারপর বলল, “খুব গোপনে করতে হবে কিন্তু।”
    —তা তো বটেই। কাকপক্ষী জানলেও চলবে না।
    —বাইরে থেকে পুরোহিত আনা যাবে না।
    —তুমিই ঠিক করো, কে তাহলে...
    —অচ্যুতকে বলব। ও খুব বিশ্বস্ত...
    পরমা রাজি হল। তারপর বলল, “শুনেছি, নিমাই বলে ছেলেটা বেঁচে আছে... ”
    “হ্যাঁ, আমিও শুনেছি।” ধ্রুপদী বলল। “কয়েকজন দেখেছে ওকে।”
    —ওকে আমি হুমকি দিয়ে ফোন করেছিলাম, জান?
    “তাই নাকি!” ধ্রুপদী অবাক হয়ে তাকাল।
    —বাবা ওর হাতে সমস্ত কাগজপত্র তুলে দিয়েছিলেন। নাবিকটি জানিয়েছিল আমাকে।
    —সে তো ফাইল গুছোবে বলে।
    —আমি কী আর অতশত বুঝেছি! সোজা ওকে ফোন করলাম। তারপর বললাম, তুমি কিন্তু একটা পয়সাও পাবে না। লাভের একটুকরো গুড়ও আশা করো না তুমি...
    “তারপর?” ধ্রুপদী শ্বাসরুদ্ধ হয়ে শুনছিল।
    —ছেলেটা তো বেজায় হকচকিয়ে গেল। কোনোরকমে তোতলাতে তোতলাতে বলল, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কী বলছেন আপনি? কেন বলছেন? আমি ভাবলাম, ছেলেটা অভিনয় করছে। বাবার ওখানে সবাই পাকা অভিনেতা। তাই আবার শাসিয়ে বললাম, আমাকে কী ভেবেছ তুমি? আই অ্যাম অ্যান ইনটেলিজেন্ট উওম্যান! শুনে তো ছেলেটা আরও ঘাবড়ে গেল! তখন আমি ব্যাপারটা বুঝে গেছি। ফোন নামিয়ে আমার সে কী হাসি!
    “নিমাই ওসব হিসেব-নিকেশ একেবারেই বুঝত না।” ধ্রুপদী বলল। “কিন্তু ওর টাকাপয়সার খুব দরকার ছিল। ও সত্যিই জানত না, কীভাবে আখের গুছোতে হয়। দু-পয়সা করে নিতে হয়। এখানে সবাই লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে। আরামে-আয়েশে থাকছে। আমোদে-আহ্লাদে ফুর্তি করছে। নিজেদেরটা গুছিয়ে নিচ্ছে। আর ও তো একবার দু-চার হাজার টাকা কামাতে গিয়ে, তাও বাবার অনুমতি নিয়ে, দারুণ হেনস্থা হয়েছিল! নাঃ, এসব ব্যাপারে ও খুবই ইনোসেন্ট ছিল। নিজের কাজ ছাড়া ও আর কিছুই বুঝত না। তাহলে ও সবার টার্গেট হয়ে গেল কেন?” পরমা হালকা কৌতুকে জানতে চাইল।
    —এখানে যে কাজটাই কেউ করে না। সবাই কাজ না করেই সব কিছু পেতে চায়। গুছিয়ে নিতে চায়। আরাম-আয়েশ-আমোদ-আহ্লাদ-প্রভুত্ব-অর্থ চায়। তার ওপর ওর মেধা ছিল। যেটা ছিল বলে ও এই দেশের পক্ষে দারুণ বিপজ্জনক। ও সবকিছুই বুঝতে পারছিল। আর ভেতরে ভেতরে তা নিয়ে ওর মনে তীব্র আক্রোশও তৈরি হচ্ছিল। ওকে রুখে দেওয়া দরকার ছিল।
    “কিন্তু এখন কী হবে?” পরমা জানতে চাইল। “ও যে আবার ফিরে এসেছে!”
    —কিছুই হবে না। যতদিন বাবা ছিলেন, ও ছিল বাবার একজন ছায়ামানুষ। এখন বাবা নেই। সেই ছায়াটুকুও আমরা ইতিহাস থেকে মুছে দেব।
    “সেটাই ভালো!” পরমা গভীর স্বস্তিতে বলে উঠল, “ইতিহাস বড়ো কঠিন ঠাই। যার হাতে ক্ষমতা আছে, সে-ই ইতিহাস তৈরি করে। ও মানুষ হতে চেয়েছিল বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে। ছায়ামানুষ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায়নি। ও মানুষ হয়ে ওঠার আগেই বাবা ওকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। এখন ওর ছায়াটুকুও মুছে দেওয়াই ভালো... ”
    হঠাৎ পরমা দেখতে পেল, নাবিকটি মোবাইলে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। অনেকক্ষণ ধরে। সে নাবিকটির কাছে গিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “তোমার ফোনের বিল কে দেয়?”
    ফোনটা রেখে নাবিকটি একটু ত্রস্ত হয়ে তাকাল। তারপর বলল, “এতদিন তো বাবাই দিতেন।”
    পরমা একইরকম শান্ত স্বরে বলল, “বাবা তো আর নেই। এবার থেকে নিজের বিল নিজেই দিও। আর শোনো... ”
    নাবিকটির মুখ করুণ দেখাচ্ছিল। সে তাকিয়ে রইল। তার দিকে নিষ্ঠুর চোখে তাকিয়ে পরমা বলল, “বুঝতেই পারছ, এখন আর এত লোকের আমার দরকার নেই। আজ রাতেই তোমার যা কিছু আছে সব নিয়ে বাবার বাংলো ছেড়ে চলে যেও। তোমাকে তো বাবা... ”
    ধ্রুপদী কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, “কী ব্যাপার বলো তো?”
    পরমা একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল, “বাবাকে বেশ ভালোই বশ করেছিল ও। অত করে বারণ করলাম, তবু ওর একটা কাজের বন্দোবস্ত করে দিলেন। বাবা তো বুঝতেই পেরেছিলেন, আর বেশিদিন নেই। এখন আমি বরখাস্ত করলেও ও সেই কাজে যোগ দেবে। আগামী মাসেই ওর যোগ দেওয়ার কথা... ”
    ধ্রুপদী হাসল। তারপর বলল, “বাবা হয়তো ভেবেছিলেন, অল্পবয়সী ছেলে, ওরও তো একটা জীবন আছে... ”
    পরমা ভুরু কুঁচকে ধ্রুপদীর দিকে তাকাল। তারপর বলল, “ওর জীবন না হয় ও নিজেই বুঝে নিক। বাবার যেচে চাকরি দেওয়ার কী ছিল! এই ব্যাপারটাই আমি বুঝি না। চাকরদের কখনও বিশ্বাস করতে নেই। কখনও না। সবসময় সন্দেহ করতে হয়। বাবাই তো একথা শিখিয়েছিলেন।”
    নাবিকটির চোখের কোণে একবিন্দু জল টলমল করছিল। তবু সে বলল, “নিমাইয়ের ব্যাপারে প্রথম খবর আমিই কিন্তু আপনাকে দিয়েছিলাম… ”
    “এতদিন বাবার কাছে রইলে, শিখলে কী!” তীব্র শ্লেষে বলে উঠল পরমা। তারপর যোগ করল, “আমি তোমাকে সার্টিফিকেট দিচ্ছি। আর তুমি কেঁদে ভাসাচ্ছ! যাও, যাও, দূর হও...”
    পরমা হাত নেড়ে এবার অমলকান্তিকে ডাকল। তারপর বলল, “আজকের স্মরণসভা চালানোর দায়িত্ব আমি ধ্রুপদীকে দিয়েছি। মিডিয়াকে জানিয়ে দিন।”
    কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গোটা দেশ জেনে গেল, বাবার স্মরণসভা চালানোর সমস্ত দায়িত্ব ধ্রুপদীর।



    নিমাই যখন স্মরণসভায় ঢুকল, ধ্রুপদী তখন প্রকাশ্যেই অমলকান্তির কোলে বসেছিল। অমলকান্তি ওর থুতনিটা ধরে বলছিল, “এখনও অভিমান করে আছ সোনামনি?”
    —করব না, আমার সার্টিফিকেট, আমার বিদেশযাত্রা, লোকটা কেমন ফাঁকি দিয়ে চলে গেল, একবার জানতে পর্যন্ত দিল না, দিন শেষ হয়ে এসেছে...
    —জানতে দিলে কী করতে তুমি?
    —সবাই যা করত। ওকে খরচের খাতায় ধরে নিত...
    —সেটা উনি কখনও চাইতে পারেন? শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উনি কর্তৃত্ব দেখিয়েছেন এবং আনুগত্য পেয়েছেন। একজন সর্বশক্তিমান কী অন্য কিছু চাইতে পারেন?
    শুভাশিস তখন মাইকে ঘোষণা করছে, “এবার সভানেত্রী ধ্রুপদী এই স্মরণ সভার দায়িত্ব নিতে মঞ্চে উঠে আসছেন...”
    এক লাফে কোল থেকে নেমে গেল ধ্ৰুপদী। সত্তর-আশিটা ক্যামেরা তার দিকে তাক করা হল। ধ্রুপদীকে আজ অপূর্ব সুন্দরী দেখাচ্ছে। অত্যন্ত দামি একটা শাড়ি পরে এসেছে সে। আর খুব স্বচ্ছ। চড়া প্রসাধনে সেজেছে। যেন মনে হচ্ছে, কোনো সিনেমার শুটিংয়ে এসেছে। স্মরণসভা শুরু হয়ে গেল।
    নিমাই দেখল, এই সভাতেও কারও মুখে কোনো শোক নেই। সবাই বেশ ফুর্তিতে আছে। নাবিকটি সবার সামনে গিয়ে ট্রেতে করে ফিশ ফ্রাই, চিপস আর কোল্ড ড্রিংকস ধরছে। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে, লোকের খুব খিদে পেয়েছে। তারা অল্পে সন্তুষ্ট নয়। তারা আরও চাইছে। স্মরণসভার দিকে কারও নজর নেই। বাবার যে বিশাল তৈলচিত্রটি রাখা আছে, সেদিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না একবারও। সবার দৃষ্টি সুস্বাদু খাবারের দিকে। নাবিকটিও একা যেন পেরে উঠছে না।
    অচ্যুতকে সামনে পেয়ে নাবিকটি একসময় বলে উঠল, “অবস্থাটা দেখেছেন? লোকে যেন এখানে শুধু খেতেই এসেছে... ”
    অচ্যুত কৌতুক করে বলল, “বাবা তো খেতে খুব ভালোবাসতেন। এইভাবে, মানে বেশি বেশি খেয়ে, লোকে বাবাকেই আসলে স্মরণে করছে... ”
    নাবিকটি কিন্তু গম্ভীর হয়েই বলল, “ব্যাপারটা খুবই কুরুচিকর, তাই না? অন্তত শোকের কোনো প্রকাশ নেই এতে... ”
    হোহো করে হেসে উঠল অচ্যুত। তারপর বলল, “এরপর তুমি বলবে, মেশিনগান, স্টেনগান, রাইফেল বা কামান দেখেও লোকে শোকপ্রকাশ করবে! বাবা ছিলেন ওইসব অস্ত্রের মতোই, বুঝলে? শক্তির আধার। মানুষকে নিয়ে ছেলেখেলা করে গেছেন তিনি। পছন্দ না হলে ঝাঁঝরা করে দিয়েছেন তাকে। লোকে এখন তার জন্য শোক প্রকাশ করবে?”
    নিমাই দেখতে পাচ্ছিল, দর্শকাসনে বসে লোকেরা নিজেদের মধ্যে নানা শলাপরামর্শ করছে। সবই ধান্দার কথা। কে কার সঙ্গে খেতে যাবে, কে কার সঙ্গে শুতে যাবে, কে কোন্‌ উপায়ে কিছু অর্থ পাবে, কে কীভাবে একটু সুযোগ পাবে, এইসব নিয়েই কথা। তবে সবার মুখে মুখে ঘুরে ফিরে আসছে একটাই শব্দ। সার্টিফিকেট। ওটা সবারই দরকার। বাবার দিকে কারো কোনো মন নেই। বাবার কথা শোনার, তাঁর স্মৃতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার মতো সহিষ্ণুতা কারও নেই।
    মঞ্চে বসে থাকা ধ্রুপদীর দিকে তাকিয়ে একজন সাংবাদিক হঠাৎ জানতে চাইল, “বাবার কাজগুলো কী হবে?”
    —ওগুলো সব গোছানো হয়ে গেছে। এবার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
    —শুনেছি, মোট দুশো তিরাশিটা ফাইল আছে।
    —ঠিকই শুনেছেন।
    —ওগুলোর ভেতরে এ দেশের সম্পদ রয়েছে। আমরা তাই জানতে চাই...
    —ওসবের ব্যবস্থা ওঁর মেয়ে পরমাই করবেন। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন।
    —পরমা দেবী একা কী পারবেন?
    —একা কেন? আমরা সবাই আছি। অচ্যুত আছেন, শুভাশিস আছেন, অমলকান্তি আছেন। আর আমি, আপনি কী আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না?
    গোটা হলে একটা হাসির ঢেউ উঠল।
    “এইসব ফাইলের বাইরেও কি আর কিছু থাকতে পারে?” সাংবাদিকটি আবার জানতে চাইল।
    “হ্যাঁ, পারে।” ধ্রুপদী সটান উত্তর দিল।
    —সেগুলোর কী হবে?
    —খুঁজে দেখা হবে।
    —কে দেখবে? নিশ্চয়ই পরমা দেবী নন?
    “কেন?” ধ্রুপদী জানতে চাইল।
    —শুনেছি বাবার কাজ নিয়ে ওঁর কোনো উৎসাহ নেই। উনি শুধু একটা জিনিসই বোঝেন...
    আবার বাবা! এই সাংবাদিকের কাছেও! নিমাই ভাবল।
    —আপনি ভুল শুনেছেন।
    —আপনিই তাহলে বলে দিন, ঠিকটা কী?
    ঠিকটা!” ধ্রুপদী হাসল। তারপর বলল, “এর উলটোটাই ঠিক। খুব কম মেয়েই আছেন, যিনি বাবার কাজ নিয়ে এতখানি ওয়াকিবহাল... ”
    “বাবার যোগ্য মেয়েই উনি!” সাংবাদিকটি বসে পড়ল।
    ঠিক সেই সময় শুভাশিস অমলকান্তির কানে কানে বলছিল, “প্রচারের সব আলোটা ধ্রুপদী কেমন নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে, দেখছ তো?”
    অমলকান্তি ধ্রুপদীর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। একটু বিরক্ত হয়েই সে বলে উঠল, “আরে, এখন আর বাবা নেই মাথার ওপর। ওকেও তো করে খেতে হবে... ”
    শুভাশিস ব্যাপারটা বুঝল। যদিও অমলকান্তিকে নিয়ে ধ্রুপদী যে বাড়াবাড়ি শুরু করেছে সেটা তার কিছুতেই মাথায় ঢোকে না। সুন্দরী মেয়েরা কেন যে কদাকার পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হয়!
    ঠিক সেই সময় পরমা অচ্যুতের কানে কানে বলছিল, “আবার কবে আমাদের দেখা হবে?”
    —তুমি যখন চাইবে! তবে...
    পরমা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। কয়েক মাস আগেই তার ডিভোর্স হয়েছে। মেয়েকে নিয়ে এখন একাই থাকে সে।
    অচ্যুত বলল, “শান্তির জন্য আমার সার্টিফিকেটটা... ”
    পরমা হাসল। তাকে আজ খুব ঝলমলে দেখাচ্ছিল। তারপর বলল, “আজ রাতে আমায় যখন প্রথম চুমুটা খাবে, তখনই না হয় ওটা নিয়ে কথা বলা যাবে?”



    নিমাই ধীরে ধীরে হল থেকে বেরিয়ে এল। ওরা ওকে মুছে দিয়েছে। বাবাকে নিয়ে ওর নিষ্ঠা, ওর শ্রম, ওর ভালোবাসা, কোনো কিছুই স্বীকার করতে চায় না ওরা। ওর কাজটুকুও ওর বলে মানতে চায় না। ওর ছায়াটুকুও আর মাড়াতে চায় না কেউ। আর ধ্রুপদী? ওর প্রতি অনেক অবিচারের কথা বলেছে সে। শেষ আর চূড়ান্ত অবিচারটা শেষপর্যন্ত ওকেই করতে হল! হয়তো এরকমই হয়।
    গেটের বাইরে আসতেই নিমাই দেখতে পেল, তল্পিতল্প নিয়ে আরও একজন ওর জন্য অপেক্ষা করছে। নিমাই দেখেই চিনতে পারল। নাবিকটি দাঁড়িয়ে আছে। নিমাইকে দেখেই সে বলে উঠল, “আপনি চুপ করে রইলেন কেন?”
    “কী বলতাম আমি?” নিমাই পালটা জানতে চাইল।
    —এটা অবশ্য ঠিক। কেউ সমর্থন করত না আপনাকে। হাসির খোরাক হয়ে যেতেন। এমনকি হল থেকে সম্মান নিয়েও বেরোতে পারতেন না। ওরা আপনাকে লাঠি দেখিয়ে, অপমান করে, তাড়িয়ে দিত।
    নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নাবিকটি আবার বলল, “বাবার কাজগুলোকে রক্ষা করতে পারবে না ওরা। ওগুলো ধুলোর মধ্যে ছিল, ধুলোতেই আবার ফিরে যাবে। না, পুরোটা ঠিক বললাম না আমি। ওরা সেটুকুই রক্ষা করবে, যেটুকু থেকে টাকা পাওয়া যাবে।”
    “পরমা দেবী?” হঠাৎ জানতে চাইল নিমাই। “বাবার কাজের ব্যাপারে এত ওয়াকিবহাল! এত উপযুক্ত মেয়ে! উনি কি চাইবেন না... ”
    নাবিকটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “উনি টাকা ছাড়া কিছু বোঝেন না।”
    নিমাই হঠাৎ হেসে ফেলল। তারপর বলল, “তাহলে তো দেখছি আমার কাজ আমারই রইল। আমি যা করে এসেছি, তা একমাত্র আমিই জানি। আমি যা করতে পারতাম, তা একমাত্র আমিই পারি। কাজ করতে হলে, আমার কাছেই আসতে হবে। ইতিহাস আমাকে মুছে দিক বা না দিক... ”
    —কেউ আপনার কাছে আসবে না। কাজ নিয়ে কেউ ভাবে না। আপনাকে ছাড়াই ওদের যথেষ্ট অর্থ, সম্পত্তি, খ্যাতি, প্রতিপত্তি আছে। আপনাকে ছাড়াই অদের চলে যাবে। ওদের কাছে বাবা ছিলেন ওরা যা চায় তারি উৎস। একটা যন্ত্র বাবা কাউকে মানুষ বলেভাবতেন না। অরাও কাউকে মানুষ বলে ভাবেনি। ওরা শুধু একে অপরকে ব্যবহার করে গেছে। ভালোবাসা কোথাও ছিল না। কেউ চায়নি, বাবা বেঁচে থাকুক। বাবার চলে যাওয়া ওদের অনেক কিছু দিয়েছে। যেটুকু দেয়নি, তার জন্য ওরা কেউ কোনোদিন বাবাকে ক্ষমা করবে না। ওরা বাবার চেয়ে কেউ কিছু কম নিষ্ঠুর নয়...
    —কিন্তু কাজগুলো হারিয়ে গেলে ইতিহাসের সঙ্গে সে হবে এক বিশ্বাসঘাতকতা।
    —লোকে আপনাকেই বিশ্বাসঘাতক বলবে। ইতিহাসও তাই বলবে।
    “কেন?” নিমাই অবাক হল। “একথা বলছেন কেন আপনি?”
    —কারণ, কাউকে তো বিশ্বাসঘাতক সাজাতে হবে। ওরা আপনাকেই বানিয়ে দেবে। নিজেরা কেউ খারাপ হতে চাইবে না। কেউ নিজের সুনামের এতটুকু ক্ষতি করতে চাইবে না। কিন্তু আপনাকে ছাড়বে না ওরা। লোকে সৎ লোককে ছাড়ে না। তাকে তার সততা আর সারল্যের উপযুক্ত প্রাপ্য দিয়ে ছাড়ে। ওরা বুঝিয়ে ছাড়বে, আপনি বাবার কী কী ক্ষতি করেছেন। বাবার সঙ্গে কতখানি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। ইতিহাসের সমস্ত ক্ষতি ওরা আপনার ওপরেই চাপিয়ে দেবে। এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন...
    নিমাই মৃদু হাসল। তারপর হঠাৎ নাবিকটির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, “ধ্রুপদীর ব্যাপারটা আপনি জানতেন?”
    “নাঃ!” নাবিকটি ক্লান্ত স্বরে বলল। “জানব কী করে? বাবার ডান হাতের খবর বাঁ হাত জানত না। আর আমরা জানব?”
    “ধ্রুপদী এরকম করল কেন?” নিমাই বলল। আসলে ধ্রুপদীর আচরণকে কোনো ভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারছিল না সে।
    “এটা হতই।” নাবিকটি কিন্তু একটুও ঘাবড়াল না। বলল, “বিশ্বাস করুন, অন্য কিছু হওয়ার উপায় ছিল না! একটু দূরে উলটো দিকের ফুটপাথে স্ট্রিট লাইটের নিচে চার-পাঁচ বছরের অনেকগুলি শিশু দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে রংবেরঙের বেলুন। সেইসব বেলুনে বাবার ছবি। বাবাকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছে এরা। কিন্তু স্মরণসভায় প্রচণ্ড ভিড়। তাই ভেতরে ঢুকতে পারছে না। প্রথম দিন বাবার কাছে এসে এরকম শিশুদেরই দেখতে পেয়েছিল নিমাই।
    শিশুরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠছিল, “বাবা, বাবা, তোমাকে আমরা ভুলব না।”
    পরে নিজের নোটবুকে সবুজ কালিতে লিখেছিল নিমাই, “ওই শিশুরাই আমার দেশ। এরা বাবাকে জানে না। আর না জেনেই তাঁকে ভালোবাসে। তাই তাদের ভালোবাসা এত খাঁটি।”
    নাবিকটি অন্ধকারে মিলিয়ে গেছিল। নিমাই তার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। কিন্তু সেখানে অন্ধকার। দূরে বুড়ো অভিনেতার বাড়ির সামনে ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যেই নিজের অসুস্থ মাকে দেখতে পেল সে। দ্রুত পা। চালিয়ে সেখানে পৌঁছোল নিমাই।
    নিজের ঘরে সরু খাটে বুড়ো অভিনেতা শুয়ে আছেন। কোনো গদি নেই সেই খাটে। জরাজীর্ণ একটি কাঠের তক্তার ওপর একটা ময়লা চাদর বিছানো। দেখেই বোঝা যায়, মৃত্যুশয্যায়। নিজের বলতে তাঁর কেউ ছিল না। বিয়ে করেননি। গোটা জীবনটা অভিনয়কে দিয়েছেন। অন্য কোনো ভাবনা ছিল না তাঁর। তাঁকে ঘিরে নিমাইয়ের বয়সী দশ-বারোজন ছেলে-মেয়ে। এরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত কুশলী অভিনয়শিল্পী। এদের কথাই নিমাই বলতে চেয়েছিল বাবাকে। তাদের প্রত্যেকের চোখেই জল।
    পেছন থেকে এসে নিমাইয়ের কাঁধে হাত রেখেছিলেন তার মা। হঠাৎ জানতে চাইলেন, “অমন করে কী দেখছিস বাবা?”
    নিমাই মায়ের হাতের ওপর হাত রেখে বলল, “দেখছি, প্রকৃত শোক!”
    নিমাইয়ের মা অবাক হয়ে তাকালেন তার দিকে। নিমাই আবার বলল, “প্রকৃত শোক দেখতে এরকমই হয়, তাই না মা? বুকের একদম গভীর থেকে উঠে আসে?”
    “কেন বলছিস একথা?” মা জানতে চাইলেন।
    —কী আর বলব মা! একটু আগেও আমি শোক দেখতেই গিয়েছিলাম। দেখলাম, শোক কোথাও নেই। হাসির নাটক চলছে! প্রহসনও বলতে পার! শুধু লেনদেনের হিসাব, মিথ্যা, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা, আত্মপ্রচার, আত্মবিজ্ঞাপন, গুছিয়ে নেওয়া। কোথাও আমি শোককে খুঁজে পেলাম না। আর এখানে কত সহজেই সেই শোককে দেখতে পাচ্ছি। মন আমার জুড়িয়ে গেছে মা। ভেতরটা ভরে উঠেছে। একজন খাঁটি মানুষ চলে গেলে শোক আপনিই আসে। শোক কোনো ফালতু ব্যাপার নয় মা। জীবনের এই ঐশ্বর্যকে সব জায়গায় পাওয়া যায় না...
    নিমাইয়ের মা চুপ করেই রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “তোকে খুব অসুস্থ দেখাচ্ছে বাবা!”
    “সার্টিফিকেটটা ওরা আমাকে দিল না মা!” ভাঙা গলায় বলল নিমাই।
    “আরে সেটা শুনেই তো বুড়ো অভিনেতা অমন অসুস্থ হয়ে পড়লেন... ”
    নিমাই বুঝতে পারল। সর্বশক্তিমানের মৃত্যুর খবর পেয়েই বুড়ো অভিনেতা বুঝে গেছিলেন, নিমাইয়ের আর এ জীবনে সার্টিফিকেট পাওয়া হল না! নিজের সমস্ত স্বপ্নকে চুরমার হয়ে যেতে দেখে এই শেষ বয়সে অসুস্থ শরীরে তিনি আর সহ্য করতে পারেননি।
    নিমাইয়ের মা বলছিলেন, “জ্ঞান হারানোর আগেও উনি ফুঁসছিলেন আর বলছিলেন, ওরা ওকে পেতে দিল না। জয়ের স্বাদ। সাফল্যের স্বাদ। কিছুতেই ওরা ওকে সার্টিফিকেটটা দিল না। মিথ্যা লোভ দেখাল শুধু। আর ব্যবহার করে গেল। সৎ ও ভালো মানুষদের জন্য আর কিছুই খোলা রাখেনি ওরা। শ্বেতপাথরের মন্দিরের চাতালে দুটো বিশাল স্তম্ভের মাঝখানে অচেতন অবস্থায় উনি পড়েছিলেন।”
    বুড়ো অভিনেতাকে দাহ করার পর সেই ছেলেমেয়েরা নিমাইকে ঘিরে বসল। পাশেই সমুদ্র। সমুদ্রের ধার দিয়ে ঝাউ, নারকেল, তাল গাছের সারি। গোটা শ্মশানে একটা শান্ত, স্নিগ্ধ নীরবতা। তারা বলল, “আমরা সবাই মিলে অভিনয়ের একটা দল গড়েছি। তুমি সেই দলের দায়িত্ব নাও নিমাইদা। আমাদের শেখাও... ”
    নিমাই শান্ত স্বরে বলল, “সে আর হয় না। ওরা আমাকে শেষ করে দিয়েছে রে। তবু যদি সার্টিফিকেটটা থাকত!”
    একটি মেয়ে উঠে দাঁড়াল। তার নামও ধ্রুপদী। সে বলল, “তুমি ঠিক আগের মতোই আছ নিমাইদা!”
    “তুই ভালো করে আমার দিকে তাকিয়ে দেখ। আগে আমি মানুষ ছিলাম। এখন আর নই। ওরা আমাকে ছায়ামানুষ বানিয়ে দিয়েছে। আমার ভেতরে আর আমি নেই। শুধু ছায়া পড়ে আছে। আমার আর কাউকে কিছু দেওয়ার নেই। এই মৃত দেশে মানুষের আত্মাগুলো সব মরে গেছে। তোরা আর আমার কাছে আসিস না। নিজেদের বাঁচা। আমার কাছে এলে, শুধু ছায়া মেখে ফিরে যাবি... ” তীব্র আবেগে বলে উঠল নিমাই।



    ওরা আস্তে আস্তে একের পর এক উঠে চলে যায়। নিমাই ওদের দিকে পিছন ফিরে সমুদ্রের দিকে তাকায়। একটা উঁচু ঢিপির ওপর চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকে। তারপর শুয়ে পড়ে একসময়। আকাশে ঝলমল করছে অনেক তারা। স্থির চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। সেই তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা স্বপ্ন দেখার চেষ্টা করে। স্বপ্নকে ডাকে। সচেতনভাবে। জীবনে এই প্রথম। একটা স্বপ্নের খুব দরকার। হঠাৎ নিমাই দেখতে পায় একটা ছিপছিপে নৌকো এগিয়ে আসছে ঘাটের দিকে। কোনো প্রাচীন বইয়ে এরকম একটা নৌকোর দৃশ্য দেখেছিল সে। সেই নৌকোয় একা একজন মাঝি। “আ সলিটারি বোটম্যান!”
    নিজেকেই ফিসফিস করে বলল নিমাই। অন্ধকারে মিশে আছে সে। তবু সে যে আছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে। একটা বিষাদের সুর বাজছিল কোথাও।
    নিমাই বুঝতে পারে, তাকেই নিতে এসেছে নৌকোটি। সে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। মুহূর্তের জন্য তার চোখে ভেসে ওঠে হৃদয়পুর দ্বীপে দেখা সেই লাইটহাউস। কিন্তু টাল সামলাতে না পেরে গড়িয়ে পড়ে যায় সমুদ্রের জলে। সে টের পায় সে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। কেউ কী তাকে ঠেলা মেরেছে? সে ঠিক বুঝতে পারে গড়িয়ে পড়ার সময় তার কিছুই করার থাকে না। সমুদ্রের জলে পড়েও তার কিছু করার থাকে না। হঠাৎ আগের ছবিটি মুছে যায়। তার বদলে অন্য একটা ছবি ভেসে ওঠে। একটা অন্ধকার ঘরে টুলের ওপর সে বসে আছে। তার উলটোদিকে একজন উর্দি পরা মানুষ। একটার পর একটা প্রশ্ন করে চলেছে। তার চোখের ভাষায় হুমকির পর হুমকি। তার হাতে একটা সার্টিফিকেট। সার্টিফিকেটে ওর নিজের ছবি। এই সার্টিফিকেটটাকেই বাবার টেবিলে দেখতে পেয়েছিল সে।
    লোকটির প্রশ্নগুলো কিছুই বুঝতে পারছিল না নিমাই। দুর্বোধ্য, অব্যক্ত একটা যন্ত্রণা হচ্ছিল তার ভেতরে। জেরার পর জেরায় খুবই ক্লান্ত বোধ করছিল। তীক্ষ দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে ছিল সার্টিফিকেটটার দিকে। আর কান পেতে শুনছিল গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। এই শব্দটি ওর খুব প্রিয়। গির্জার ফ্রেস্কোগুলোও খুব সুন্দর। কালই একবার গিয়ে দেখতে হবে। শুধু একবার যদি ওই ধুলোয় ধূসর হয়ে যাওয়া কাগজটা ওর হাতে দিত লোকটা। খুব যত্ন করে আগে ধুলোগুলো পরিষ্কার করত সে। তারপর সেটাকে ল্যামিনেশন করে নিজের আলমারির লকারে রেখে দিত। কিন্তু লোকটা এখনও দিচ্ছে না কেন? কেন ওইভাবে ধরে আছে কাগজের টুকরোটা? বিশ্রিভাবে ওর চোখের ওপর নাচাচ্ছে? চোখের ইশারায় ওকে ধুলোমাখা মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসতে আর ক্ষমা চাইতে বলছে? নিমাইয়ের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে যায়। এবার ওকে কাগজটা কেড়েই নিতে হবে। আর তখনই লোকটার হাত থেকে খসে যায় কাগজটা। একটা ঘোরের মধ্যেই তলিয়ে যেতে থাকে নিমাই। চোখ বুজে আসে তার। আর ওর সেই প্রায় বুজে আসা চোখের ঠিক সামনেই পূর্ণিমার আলোয় ঝিকমিকিয়ে ওঠা জলে ভাসতে ভাসতে বহু দূরে চলে যেতে থাকে একটা সার্টিফিকেট...



    (সমাপ্ত)
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১২ ডিসেম্বর ২০২০ | ১০১২ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • :|: | 174.255.130.19 | ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ ০৫:৩৩101090
  • এইটেই শেষ পর্ব ছিলো? 

  • Guruchandali | 136.228.209.39 | ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ ০৫:৩৬101091
  • হ্যাঁ। 

  • Guruchandali | 136.228.209.39 | ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ ০৫:৩৯101092
  • জুড়ে দেওয়া হল। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন