• বুলবুলভাজা  পড়াবই  মনে রবে

  • কবিতার শ্রমণ

    রাহুল দাশগুপ্ত
    পড়াবই | মনে রবে | ২৯ নভেম্বর ২০২০ | ১৫৭০ বার পঠিত
  • অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। সংকীর্ণতার পরিধি অতিক্রম করে কবিতার দুনিয়ায় তিনি বিশ্বনাগরিকদুঃখী মানুষের মুখ নিরন্তর সঙ্গে রেখে বারবার ফিরে আসতে চেয়েছেন দেশ ও মাটির কাছে। আবার পরিভ্রমণ করেছেন গোটা বিশ্বে। আলোচনায় লেখক রাহুল দাশগুপ্ত


    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত একজন মানবিক কবি। প্রথমদিকে তাঁর কবিতায় ছিল, রোমান্টিকতা, আধ্যাত্মিকতা, অতীন্দ্রিয়তা, স্মৃতিমেদুরতা। তাঁর কবিতায় তখন ফিরে ফিরে এসেছে নানা দৃশ্য, অভিজ্ঞতা এবং তাদের জড়িয়ে থাকা নানা কল্পনা। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমিও আলপনা আঁকি কল্পনার বাঁকে–বাঁকে ফিরে।’ এ এক রোমান্টিক কবিরই উচ্চারণ। দু-চোখ ভরে তখন তিনি বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অরণ্য, মাটি, মানুষ, পরিবেশ দেখে চলেছেন। সমস্ত আকাশ তাঁর চোখে ফুটে উঠেছে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি হয়ে। সমস্ত পৃথিবী তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে একটা স্মৃতিচিহ্ন। একটি পাখির দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, ‘পাখিটির মাতৃভাষা চেয়ে থাকা।’ জীবনের সহজ, সরল দৃশ্যাবলি অনাবিল অথচ প্রাজ্ঞ উচ্চারণে উঠে এসেছে তাঁর কলমে। ‘বুধুয়ার পাখি’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘এইভাবে প্রতিদিন বুধুয়ার ডাকে/কানায়–কানায় আলো পথের কলসে ভরা থাকে।’

    ‘আলো’ বা ‘পথ’ অলোকরঞ্জনের প্রিয় শব্দ। তিনি গতি ভালোবাসেন। পথ তাঁর কাছে নিয়তির মতো। তিনি দেখতে পান, ‘একটি মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, তার/চেতনা থেকে ঝরছে মন্দার।’ তিনি আলো ভালোবাসেন। তাই লিখেছেন, ‘আমরা জন্মান্ধ চলি ভুলে গিয়ে নিহিত জ্যোতিকে।’ অন্তরের এই আলো, আত্মার এই জ্যোতি অলোকরঞ্জনের বড়ো প্রিয়। মানুষের দিকে তাকিয়ে তিনি এই নিহিত জ্যোতিকেই খোঁজেন এবং তার অন্ধের মতো অসহায় দশা দেখে মনে মনে ব্যথা পান। মানুষকে তিনি দিতে চান, ‘আলোর শুশ্রূষা’। যত তাঁর চেতনা আলোয় ভরে ওঠে, তত যেন মানুষ ও দুনিয়ার অবস্থা দেখে তাঁর বেদনাও বেড়ে যায়। তাঁর মনে হয়, ‘আমার চেতনা তাই বেদনারই এক নামান্তর।’ অলোকরঞ্জনের আর-এক প্রিয় শব্দ, ‘বেদনা’। বারবার তিনি বেদনার কাছে ফিরে ফিরে যেতে চান। তাই লেখেন, ‘আমারি বেদনা যেন চন্দন রাঙানো লাল চেলি।’ এভাবে বেদনার মধ্যেও তিনি সৌন্দর্যকে খুঁজে চলেন। এই বেদনার সূক্ষ্মতাকে তিনি অন্যভাবেও বলেন, ‘তোমরা জানো না, আমি অব্যক্ত ব্যথার স্বরাঘাতে/ জল চিরে নিয়েছি করাতে।’

    জীবনকে তিনি সংকেত, প্রতীক, উপমা, রূপকের মধ্য দিয়ে ধরতে চান। মামুলি, বাস্তব, আক্ষরিক অর্থ ছাড়িয়ে জীবনকে তিনি বৃহত্তর অর্থে বুঝে নিতে চান। কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি খোঁজেন এক আলোকিত জীবনে উত্তরণের পথ। অলোকরঞ্জনের কবিতায় অস্থিরতা নেই। তিনি প্রশান্ত, স্থিতধী, প্রাজ্ঞ। কখনও তাঁর কবিতায় রয়েছে বাঁকা সুর। কিন্তু তাঁর শ্লেষও মেধায় উজ্জ্বল। তাই তিনি লিখতে পারেন এমন লাইন, ‘একটি হাঁসের রাজ্যে হবো আমি প্রসন্ন উদাসী’। হাঁস তাঁর কাছে চরম বিশুদ্ধতা ও নিষ্পাপতার প্রতীক, স্তেফান মালার্মের মতোই।

    ঈশ্বরের সঙ্গে এই কবির যেন এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের সম্পর্ক। তিনি লিখেছেন, ‘বন্ধুরা বিদ্রূপ করে তোমাকে বিশ্বাস করি বলে/ তোমার চেয়েও তারা বিশ্বাসের উপযোগী হলে/ আমি কি তোমার কাছে আসতাম ভুলেও কখনো?’ তখন তাঁর ঈশ্বরের প্রতি এরকমই বিশ্বাস। তাই লিখেছেন, ‘মাঝে মাঝে স্পষ্ট করে বলা দরকার/ ঈশ্বর আছেন,/ মগডালে বসে থাকা পাপিয়াকে আর/ পর্যবসিত বস্তু পৃথিবীকে স্নান করাচ্ছেন।’ ঈশ্বর তাঁর কাছে অস্তিত্ব রক্ষার এক মূল খুঁটি, আধ্যাত্মিক অবলম্বনের ভরকেন্দ্র। নিজের কাছেই তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ‘ঈশ্বর তোমার বুকে তুমি বুঝি তাকিয়ে দেখবে না?’ ঈশ্বরকে তিনি নিজের জীবনে বন্ধুর মতোই পেতে চান। তাই লেখেন, ‘ঈশ্বরের পাশে গিয়ে সমধর্মী বন্ধুর মতন দাঁড়াব।’ কিন্তু তিনি এমন এক বন্ধু, যার কাছে সবসময় যাওয়া যায় না। তাই লেখেন, ‘তোমার কাছে যাবার সেতু জ্যোৎস্নায় ভরেছে/ তোমার কাছে আজ আমি যাব না।’ ঈশ্বরই যেন তাঁকে দেন, মানুষকে বিশ্বাস করার শক্তি। ‘ঈশ্বরের প্রতি’ কবিতায় তাই লেখেন, ‘যেদিকে ফেরাও উট, এই দ্যাখো করপুটে একটি গণ্ডূষ/ বিশ্বাসের জল।’ ঈশ্বরের নামে যাবতীয় মিথ্যেকে তিনি অস্বীকার করতে চান। পেতে চান খাঁটি ঈশ্বরকে। দেখতে পান, ঈশ্বরের গায়ে জড়ানো শোভন পোশাক। তাঁর ভেতরের খড়কে জ্বালিয়ে দেওয়ার কথা বলেন তিনি। তারপর ‘যেটুকু ঈশ্বর থাকবে সেটুকুই পর্যাপ্ত ঈশ্বর।’

    নিজের কবিতায় সারাজীবন যেন এক আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান চালিয়ে গিয়েছেন অলোকরঞ্জন। এক গভীর দার্শনিক আর্তি উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়, ‘আমারো হৃদয় এক নদী,/ আমার জীবন তবে এখনো হল না কেন মন্দিরের মতো মহাবোধি?’ তিনি চান, তাঁর জীবন হয়ে উঠুক মন্দিরের মতো মহাবোধির প্রতীক। বুদ্ধের মতোই যেন এক জীবন তিনি পেতে চান। তাই লেখেন, ‘আমার শরীর তুমি বুদ্ধের মতন শীর্ণ করো/ দীর্ঘ অপেক্ষায়, তীব্র অনাদরে।’ বারবার তিনি সাধক হয়ে উঠতে চান, হতে চান বুদ্ধের আপনজন, একজন শ্রমণ। তাই লেখেন, ‘আজকে আমার আয়ুর উঠোন কুয়াশা আর রোদে দারুণ একাকার/ একটু পরেই চীবর নিয়ে বেরিয়ে যাব আমি।’

    কিন্তু তিনি শুধু সাধকই নন, শিল্পীও বটে! তাই সত্যের পাশাপাশি খোঁজেন সৌন্দর্য। লেখেন, ‘সত্যের মুখ নিরপেক্ষ, আদিগন্ত, আর/ তার বিকীরণ লেগে সৌন্দর্যের মুখ অপরূপ।’ এই সৌন্দর্যকে খোঁজেন বলেই তিনি দেখতে পান, ‘সৃষ্টির আড়ালে এক পদ্ম আছে,/...আর তার পাপড়ি নীলার্দ্রনয়না।’ সত্য ও সুন্দর বারবার তাঁর কবিতায় একাকার হয়ে যায়। তিনি দেখতে পান, প্রজাপতিরা গর্ভবতী হয়েছে, আর জন্ম নিচ্ছে দেবদূতেরা। তমালছায়ার নীচে তৈরি হয় ধ্বনির মন্দির। জীবন ও শিল্প তাঁর কাছে পরিপূরক হয়ে ওঠে। তাঁরই ভাষায়, ‘বাঁচার ভিতের আজলে গেছে শিল্পের কারুকাজ,/ শিল্পের স্নায়ুতে গিয়ে আদিখ্যেতা করছে জীবন!’ কিন্তু কীভাবে এগোবেন একজন শিল্পী? কোন্‌ পথ নির্বাচন করবেন? এ সহজ কাজ নয়। কবির ভাষায়, ‘বাড়ির সামনে এখন উদ্যত হয়ে রয়েছে একরাশ চাবির পাহাড়।/ কোন্‌টা তোমার বাড়ির চাবি/ তোমাকেই সেটা খুঁজে নিতে হবে।’

    তিনি নিজে হতে চান একজন সাধক। তপস্বী। আর তাঁর জগতকে প্রসারিত, বিস্তৃত করে দেওয়ার জন্যই প্রয়োজন নারী ও প্রেমের। তাই তিনি লেখেন, ‘আমি হই অনুধ্যানী অশ্বত্থের মত মগ্নব্রতী/ আমার নীলিমা হও, ডালে ডালে ঝরাও প্রণতি।’ অলোকরঞ্জনের কবিতায় নারীও যেন আসে ধ্রুপদি আঙ্গিকে। নারীর দিকে তাকিয়ে তিনি বলে ওঠেন, ‘ধ্রুপদী দুঃখের পাহাড়ে বোসো/ দুঃখ চারিদিকে জলের মতো/ শুধুই মুছে যায় বিধুর অভিমান/ প্রেমিকমাত্রই অপরিণত।’ নারীর হাসি দেখে তিনি লেখেন, ‘উজ্জ্বল তোমার হাসি, দুর্লভ উপমা।’ সেই হাসি তাঁকে মনে করিয়ে দেয় দুঃস্থ, নিপীড়িত, শোকশীর্ণ নেয়ামৎ বুড়োর হাসিকে। অলোকরঞ্জন কখনোই যেন হতভাগ্য মানুষদের ভুলতে পারেন না। প্রেমে পড়ে তাঁর মনে হয়, ‘একটি নারী আমাকে খুব ভিতর থেকে টান দিয়েছে।’ সেই নারীকে নিয়ে তিনি ঘুরতে চান টিউলিপের অনন্ত বাগানে। টিউলিপ ফুলের হাসিগুলির একটি সংকলন করে যেতে চান তিনি। নারীর শরীরের বর্ণনাও ধ্রুপদি মাত্রা পায় তাঁর কলমে, ‘আমি দেখেছি রাগরাগিণী তার,/ বক্ষ জুড়ে অলখ এস্রাজে/ বেজেছে এক ধ্বনির মণিহার।’

    কখনও তাঁর মা–কে মনে পড়ে আর পবিত্র এক অনুভূতি জেগে ওঠে, ‘তার দিব্য দুই হাতে আমাকে ছুঁয়েছে কাল রাতে/ স্পর্শের অনলে কেঁপে পূণ্য হল আমার শরীর।’ তাঁর আরও মনে হয়, ‘কাল যদি ভরে ওঠে, তবে তার নিহিত ভাস্বর/ যে অমৃত সে তো তুমি।’ এভাবেই মা তাঁর কাছে হয়ে ওঠেন যাবতীয় শুদ্ধতা, পূণ্য এবং দিব্যতার প্রতীক। স্মৃতিতাড়িত অলোকরঞ্জন কখনও দেখতে পান বিধুশেখর শাস্ত্রীকে, কখনও ক্ষিতিমোহন সেনকে। তিনি লেখেন, ‘এই মুহূর্তে যে মানুষটি চলে যাচ্ছে আমি তাকে মন্ত্রের ভিতরে তুলে নিলাম।’ এইভাবে স্মৃতির মধ্য দিয়েও তিনি নিজের সাধনাকে চালিয়ে যান। ‘মন্ত্র’ শব্দটির তাই রয়েছে এক অব্যর্থ প্রয়োগ।

    সাঁওতাল পরগনার ক্ষুদ্র এক জগতের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দিয়ে যিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন, সারাজীবন ধরে ক্রমেই তিনি ব্যাপ্তি খুঁজে গিয়েছেন, নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন গোটা বিশ্বে। মা, দেশ বা ঈশ্বর, কেউ যেন তাই তাঁকে বলে ওঠে, ‘আমার হৃদয় থেকে তোমার হৃদয় ছিঁড়ে ফেলে/ মুক্ত হও, তারপর ব্যাপ্ত করো তুমিও নিজেকে...।’ নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়ার এই বাসনা অন্যত্রও ব্যক্ত করেছেন অলোকরঞ্জন, ‘যেই পথে নামি/ আমার আত্মার অজস্র–খচিত এক ত্রিভুবন দুলে ওঠে।’ ডানা মেলে নিজেকে মেলে ধরার, উড়ে যাওয়ার এই বাসনাই প্রতীকীভাবে ব্যক্ত হয়েছে এই ভাবে, ‘প্রত্যহ ঘেঁষে একটি সারস অন্তত একবার/ ডানা মেলে ধরে।’ তীব্র আক্ষেপে তিনি লেখেন, ‘আমি বুঝতে পারি না অদ্যাবধি/ মানুষ নিজেরই মধ্যে থাকতে চায় কেন, দুর্নিবার/ আত্মকেন্দ্রিকতার ঘোরে সাজে কেন জরিষ্ণু–জরতী!’



  • ক্ষুদ্রতা এবং সংকীর্ণতার পরিধি অতিক্রম করে তাই তিনি প্রকৃত অর্থেই যেন বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠেন। অনায়াসে তাঁর কলমে উঠে আসে, বারোটি মৃৎফলকে ক্ষোদিত বিশ্বের প্রথম প্রেমের উপন্যাস গিলগামেশ, পিন্ডার, অ্যারিস্টটল, লাওৎসে, টমাস অ্যাকুয়েনাস, ইরেসমাস, মোৎসার্ট, হ্যোল্ডারলিন, শোপেনহাওয়ার, স্ট্রিন্ডবার্গ, মালার্মে, কার্ল মার্কস, ব্রেশট, ভ্যান গঘের আঁকা ‘হিরণ্ময় প্লাবন’, নেলসন মান্ডেলা, যিনি এক নতুন সাহিত্যের জন্ম দিয়েছেন, ওক্তাভিও পাজ। তিনি অনায়াসে কঠোপনিষৎ থেকে উদ্ধৃতি দেন। অরণ্যপথে হেঁটে যেতে দেখেন হাইনরিশ ব্যোল এবং সলঝেনিৎসিনকে। মিকেলেঞ্জেলোর আত্মপ্রতিকৃতি দেখতে গিয়ে তাঁর মনে পড়ে যায় চণ্ডীদাসের হাসি। গোটা বিশ্বের মানুষ তাঁর আপনজন হয়ে ওঠেন। তিনি লেখেন, ‘আমি তোমার মুখ দেখিনি: নিগ্রো তুমি, না ইহুদি/ দেখেছিলাম হাতের তালুর বিচ্ছুরিত নীল বিভূতি!’

    কিন্তু এসবের পাশাপাশি গোটা বিশ্বের হিংস্র বাস্তবতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর চোখে। তীব্র শ্লেষে তিনি লেখেন, ‘এখন বেয়নেটের নীচে চলছে প্রগতি এবং সংরক্ষণশীলতার কানামাছি।’ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ফ্যাসিবাদীরা কোনো পত্রিকা বানালে তিনি তার গ্রাহক হবেন না কোনোদিন। দুনিয়ার প্রান্তিক মানুষেরা সবাই সমান, তাই নিগ্রোকে না পেলে অনায়াসে একটি সাঁওতালিকে বলি দিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। ব্যুরোক্র্যাসিকে নিয়ে তীব্র শ্লেষ করেন তিনি। ‘সূর্যমুখী’ তিনটি কালো ছেলে বুলেট খেয়ে পড়ে আছে, এই দৃশ্য তিনি সহ্য করতে পারেন না। তীব্র ঘৃণায় যেন চিৎকার করে ওঠেন, ‘এরা কি কোনোদিনই বুঝতে পারবে আমাদের যন্ত্রণা? আর ক’হাজার মানুষ মরে গেলে এরা আমাদের কান্নার আদল ঠাহর করতে পারবে?’

    আত্মপরিচয় নিয়ে তীব্র ঠাট্টা করে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা তখন মানুষ নই, বুদ্ধিজীবী।’ কিন্তু এ তো নিজের কাছ থেকেই ছিটকে সরে যাওয়া! বুদ্ধিজীবীদের তিনি ‘উন্নাসিক’ বলে বিদ্রুপ করেছেন, যাদের সঙ্গে বিদূষকের কোনো তফাত নেই। ‘কাপুরুষ’ কবিতায় বুদ্ধিজীবীদের তীব্র আক্রমণ করেছেন তিনি, যারা নেতারহাটের গণধর্ষণের দৃশ্য দেখে পাশ কাটিয়ে হেঁটে যায় ছদ্মরাবীন্দ্রিক সৌম্যতায়। কবির ভাষায়, ‘যেন কোনো দৃশ্যই ঘটেনি, এই নন্দিত বিবেকে!/না, এই ভারতবর্ষ আমার নিজস্ব কেউ নয়।’ এই বুদ্ধিজীবীদের কোনো স্বদেশ হয় না, কোনো ভারতবর্ষ হয় না, তাই কোনো ভূখণ্ডেও তাঁদের মৃত্যু হয় না। বায়বীয় জীবন কাটানোর পর তাঁদের শ্মশান শূন্যে স্থাপন করার আবেদন জানিয়েছেন কবি।

    অলোকরঞ্জনের একটি স্মরণীয় কাজ, তিতুমীরের জীবনের কয়েকটি অনুষঙ্গ নিয়ে রচিত, ‘বাঁশের কেল্লাটা চলছে’ সংলাপিকা। বাইরে গিয়ে, গোটা বিশ্বকে চিনে নিতে নিতে নিজের দেশের ইতিহাস, নিজের শিকড় যেন আরও বেশি করে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর চোখে। তিতুমীর এই সংলাপিকায় বলে ওঠেন, ‘হিন্দু, না মুসলমান, ওসব কিছুই বুঝি না, বুঝতেও চাই না। ও আসলে মানুষ নয়।’ অর্থাৎ ধর্ম নয়, মানুষকে তিনি মনুষ্যত্ব আছে কী নেই, তাই দিয়েই চিনতে চান। তিতুমীর আরও বলেন, আমরা যতটুকু স্বাধীন ততটুকুই মানুষ। এইভাবে তাঁর ভাষ্যে, স্বাধীনতা এবং মনুষ্যত্ব একাকার হয়ে যায়। কবির কাছে, তিতুমীর হয়ে ওঠেন একজন শিল্পী, একজন বাউল। তিনি লেখেন, ‘শিল্পী যখন নামে বিপ্লবে/নিজেকে সে ভাঙে, অন্যকে গড়ে।’ বাঁশের কেল্লা কবির কাছে হয়ে ওঠে যেন দেহতত্ত্বেরই গান। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা তছনছ হয়ে এক অদ্ভুত পরাবাস্তব সৌন্দর্য পায়। তিতুমীরকে তিনি তুলনা করেন বুদ্ধের সঙ্গে। আর অনুভব করেন, ‘আমাদের ভিতরে–ভিতের বাঁশের কেল্লাটা চলছে।’ ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের চলমান অরণ্যের কথা মনে পড়তে পারে। এই বাঁশের কেল্লা অক্ষয়, শাশ্বত, চলমান, আমাদের চেতনায় মিশে থাকা ইতিহাস, শেকড়, আবহমান বিপ্লবী সত্ত্বার প্রতীক।

    তিতুমীর বা বুদ্ধের মতো কখন কেউ মহাবিপ্লবী হয়ে ওঠেন? অলোকরঞ্জন লিখেছেন, ‘সে ছিল শহিদ সে ছিল প্রেমিক/ আর এই দুই সত্তা যখন/ মিলেমিশে যায় এক মোহানায়/ মহাবিপ্লবী শুধু তাকে বলা যায়।’ শহিদ ও প্রেমিকের এই মেলবন্ধনের তুলনাহীন উদাহরণ, সুভাষচন্দ্র। সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে এক অবিস্মরণীয় কবিতা লিখেছেন অলোকরঞ্জন, ‘একটি তরুণের স্বপ্ন’। এই কবিতায় আলবার্ট শোয়াইৎজারকে তিনি উদ্ধৃত করেছেন, ‘সূর্যের কোনো কিরণই বিলুপ্ত হয়ে যায় না।’ অথচ আমরা আজ প্রতিটি সূর্যরশ্মিকে খুন করার জন্য তৈরি। সুভাষচন্দ্র তাঁর চোখে, ‘জাতিস্মর এক শ্রমণ’, যাকে মনে রেখেছেন শুধু এলগিন রোডের থুত্থুড়ি বুড়ি একটা গাছ, যার সাক্ষ্যের কোনো মূল্যই নেই! যে মানুষ মৃত্যুর অধস্তন কর্মচারী হয়ে দিন কাটায় তারই প্রতিস্পর্ধী হিসাবে তিতুমীর বা সুভাষচন্দ্রকে ভাবতে চান অলোকরঞ্জন।

    একবার অলোকরঞ্জন প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘ছায়ার সঙ্গে ছায়া জুড়লে ভেসে উঠবে নাকি/ গোটা মানুষটাই?’ সারাজীবন যেন তিনি ছায়ার সঙ্গে ছায়া জুড়ে গিয়েছেন। তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে তাঁরই খণ্ড খণ্ড জীবনের প্রতিবিম্ব। সেই প্রতিবিম্ব বা ছায়াগুলোকে জুড়লেই যেন তাঁর গোটা জীবনটা পাওয়া যাবে। সেই জীবনে একটু একটু করে তিনি প্রাজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন, কিন্তু প্রশ্ন আর বিস্ময়ের মধ্যে জীবন কাটাতে কাটাতে ভেতরে ভেতরে বহন করে চলেছেন নিজের চিরকিশোর মুখ। একটি কবিতায় লিখেছেন, ‘আমি আমার চিরকিশোর মুখ/ সারাজীবন রক্ষা করব জীবনের এই মাটির ফুলদানিতে।’ জীবনকে তিনি আড়ম্বরহীন এক মাটির ফুলদানি ভেবেছেন। প্রকৃত সাধকের মতোই জীবনের কোনো মোহ তাঁকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি। কিন্তু সত্যিই কী চিরকিশোর থাকার সংকল্পে সফল হতে পেরেছেন? নিজেই সংশয়ী হয়ে লিখেছেন, ‘কিশোর না হতে পেরে ঐ দ্যাখো কৈশোর গেল ফিরে।’

    অলোকরঞ্জন তাঁর কবিতায় মিশিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, প্রজ্ঞা এবং পাগলামি। তাই লিখেছিলেন, ‘কবিতায় বাঁচে প্রজ্ঞাশাসিত অসুস্থ পাগলামি।’ সালভাতোর দালির ছবির মতোই তিনি দেখতে পান, রিস্টওয়াচটা দেয়ালঘড়ি হয়ে উঠে আরও বাড়তে থাকে এবং চৌচির করে দিতে চায় ঘরটাকে। এই প্রাজ্ঞ কবি শেষপর্যন্ত উপলব্ধি করেন, ‘গোটা সৃষ্টির ভিত্তি আসলে একটি দুঃখী মানুষের মুখ।’ এই মুখটাকে তিনি কখনও ভুলতে পারেন না। তীব্র ক্রোধে বলে ওঠেন, ‘প্রতিটা কবিতা জন্ম নেবে নিরপরাধ লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুজনিত বিবেকের পরিস্রুত আগুনের মধ্য থেকে।’ সৃষ্টির জন্য নির্জনতাকে বাসযোগ্য করে তুলতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু তবুও এক ব্যর্থতাবোধকে তিনি ভুলতে পারেন না, তাই লেখেন, ‘আজকে নিজের মধ্য থেকে বেরিয়ে গিয়ে যতগুলি সাঁকোই তৈরি করতে চেয়েছি, অসমাপ্ত থেকে গেল।’ তিনি যে ক্রমশ দুরূহ হয়ে উঠছেন, সেপ্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘যে গান গাইবে দুরূহতার মর্মবাণী জানুক এ–সভ্যতা,/ মরু যেমন নিজস্ব জল জানে।’ কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব? কবির ভাষায়, ‘আমাকে চৌদিক থেকে ছুঁয়ে থাকো, তাহলেই সব কথা টের পাবে।’

    অলোকরঞ্জন বিশ্বাস করতেন মানুষ ও জীবনের অবিনশ্বরতায়। তাই তিনি লিখেছেন, ‘না, এভাবে মানুষ কখনোই ফুরিয়ে যেতে পারে না/ শেষবার বাঁক নেবার আগে/ অনন্ত এক বিদীর্ণ কিংশুক/ উত্থাপিত করে শূন্যে/ কিংবা কোনো গ্রন্থাগারে রেখে যায় ধীমন্ত ঝিনুক।’ অর্থাৎ চলে যাওয়ার আগে সে রেখে যাবে স্থায়ী কোনো স্বাক্ষর। সারাজীবনে অজস্র কবিতা ও স্মরণীয় লাইন লিখেছেন তিনি। দুঃখী মানুষের মুখ তিনি কোনো দিন ভুলতে পারেননি। বারবার ফিরে আসতে চেয়েছেন দেশ ও মাটির কাছে। আবার পরিভ্রমণ করেছেন গোটা বিশ্বে। নিজের জীবনকে গড়ে নিতে চেয়েছেন একজন শ্রমণের মতো। ধাবিত হতে চেয়েছেন ঈশ্বরের দিকে, এক আলোকিত, আধ্যাত্মিক অভিযাত্রাকে সার্থক করে তুলতে চেয়েছেন। সত্য, সুন্দর, প্রেম ও মানবিকতার প্রতি তাঁর রয়েছে অনিঃশেষ তৃষ্ণা। মানুষের ভিতরের মনুষ্যত্ব, তেজ, বীর্য, সাহস ও ত্যাগ তাঁকে সম্মোহিত করেছে। আবার মানুষের প্রতি মানুষের অবিচার, তার ভণ্ডামো, অন্যায় দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। জীবনের রোজকার অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় একটি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। তবু সেই দৈনন্দিনতাকে অতিক্রম করে অলোকরঞ্জনের কবিতায় নিরন্তর উঠে এসেছে এক নান্দনিক আর্তি, আধ্যাত্মিক খোঁজ এবং উত্তরণের তৃষ্ণা...




    স্কেচ: হিরণ মিত্র
    গ্রাফিক্স: মনোনীতা কাঁড়ার
  • বিভাগ : পড়াবই | ২৯ নভেম্বর ২০২০ | ১৫৭০ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন