
এরপর পিনাকীর বয়ান– দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখি একতালার বারান্দায় পাঞ্জাবী পরা লম্বা সাদা দাড়ি, টুপি মাথায় এক বুড়া লোক বসে পেপার পড়ছে। সেটা দেখে তো আমার ভয় বেড়ে গেল আরও। ভাবি এই হুজুর যদি এখন দেখে এক ধুতি পরা লোক তার বাড়িতে উঁকি ঝুঁকি মারছে, তাহলে না জানি কোন ঝামেলা বাঁধায়? আমি সাহস করে লোহার গেটে ধাক্কা দিই। দাড়ি, টুপি ভদ্রলোক পেপার হাতে নিয়েই বাগান পার হয়ে লোহার গেট খোলেন। আমাদের দেখে একটু কপাল কুচকান। আমি তাকে লম্বা করে একটা সালাম দেই– ‘আসসালামালাইকুম চাচা। উনি কোলকাতা থেকে এসেছেন, একসময় এই বাড়িটা উনার বাবার ছিল, বাড়িটা জাস্ট একটু দেখতে এসেছেন।’ বলেই আমি বেশ নার্ভাস থাকি। কে জানে ভদ্রলোক এই নিউইয়র্ক কিন্ডারগার্ডেনের দীনিয়াতের টিচার কিনা। ছুটির দিনে হয়তো একটু আরাম করে বসছেন পেপার পড়তে, সেইখানে এক লোক কোলকাতা থেকে এসে যদি বলে এই বাড়ি আমার ছিল, তাহলে তার ভালো লাগার কথা না। পুরা ব্যাপারটায় একটা গ্যাঞ্জাম লেগে যাবার সম্ভাবনা আছে। ... ...

পরিত্যক্ত কবরখানার ভাঙ্গা দেওয়ালে হেলান দিয়ে গিরিরাজ বিড়ি খেতে খেতে চারপাশটা জরিপ করে নিল একবার। আগের থেকে অনেক বেশি জরাজীর্ন লাগছে জায়গাটা। অবশ্য সেটা স্বাভাবিক। রক্ষণাবেক্ষণ তো আর হয়নি গত এক বছরে! চারিপাশে ছাতামাথা বন্য গাছের দল নুয়ে পড়েছে। জমাট বাঁধা অন্ধকারের মধ্যে গাছের দলকে আলাদা করে আর বোঝা যাচ্ছে না, বরং সবশুদ্ধ তালগোল পাকিয়ে একটা জগাখিচুড়ি লাগছে। পাঁচিল ফাটিয়ে উঠে এসেছে অশ্বত্থের চারা। লণ্ডভণ্ড কবরগুলোর ওপরে বুনোঝোপের আড্ডা। হাঁটতে গেলে জঙ্গুলে শেকড় পা জড়িয়ে ধরে। মেঘ কেটে চাঁদের আলো পিছলে গেলে মনে হবে ফ্যাটফ্যাটে সাদা জংগল সমগ্র জায়গাটার দখল নিয়ে নিচ্ছে। গিরিরাজের আচমকা মনে হল, জঙ্গল আস্তে আস্তে তাদেরও হয়ত ঘিরে ধরছে। আর এখান থেকে বেরোবার পথ নেই। দুম করে বুকটা একটু কেঁপে গেল। তারপর আত্মসচেতন হয়ে ফালতু চিন্তা ঝেড়ে ফেলবার জন্য বিড়িতে জোরে জোরে টান দিয়ে মাথা ঝাঁকাল কয়েকবার। আজকের রাতে মগজ স্থির রাখা খুব জরুরী। ... ...

পার্বতী মেয়েটি বুদ্ধিমতী, ভীষণই বুদ্ধিমতী। তবে তার এই বুদ্ধিমত্তার সাথে যুক্ত হয়েছে গ্রাম্য অশালীন কৌতূহল আর অসহ্য বাচালতা। ‘রাজলক্ষ্মী’তে আসার পর পরই তা টের পেয়েছে মোনা, আর যতটা সম্ভব সাবধান থেকেছে আচরণে-কথায়। পারতপক্ষে সমীরের সাথে একা-একা কথাই বলেনি। সবার সাথে মিলে কথা বলার সময়ও যথাসাধ্য নির্বিকার থেকেছে, কখনও সাথে আসা আরও দু-বন্ধু নিশি-দ্যুতির চেয়েও বেশি। ভরা পূর্নিমায় সমীরদের শত বছরের পুরনো দালানের ছাদে বসে বন্যার ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’ শুনতে ইচ্ছে হলেও প্রাণপণে তা দমিয়ে রেখেছে। দমিয়ে রেখেছে বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা পাহাড়ী ছড়ায় সমীরের হাতে হাত রেখে পা ভেজানোর ইচ্ছেটাও। তবু বিকেলের জলখাবারে সমীরের বৌদি টেবিলে ফুলকো লুচি আর ছানার ডালনা এনে দিলে ওরা যখন ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়– শোন, শোন এগুলো মোটেই তোদের আজিজ সুপারের লুচি নয়, খেয়ে দেখ কী ভীষণ মোলায়েম আর টেস্টি, আরে এগুলো হল আসল লুচি, আজিজ সুপারে যা খাই ওগুলো তো ক্লোন রে ক্লোন, লুচির ক্লোন– তখন সমীর মুখ টিপে হেসে– খাও খাও, নিজের বাড়ি মনে করে খাও– বলে যখন মোনার প্লেটে আরও দুটি লুচি তুলে দেয়, তখন আর কারো চোখে না হোক পার্বতীর চোখে সন্দেহ ছাপিয়ে ‘চোর ধরে ফেলা’র মতো সাফল্যের আনন্দ পড়তে ভুল হয় না মোনার। নিশি-দ্যুতির সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপও করে মোনা। ওরা উড়িয়ে দেয়– দুর, গৃ-হ-প-রি-চা-রি-কা এত পাত্তা দেয়ার দরকার আছে? পাত্তা তো মোনা দিনে চায়নি। কিন্তু ওর মুখে লেগে থাকা রহস্যময় হাসি, চপলা দৃষ্টি, সুযোগ পেলেই গা ঘেঁষে অযাচিত কৌতূহল কেমন যেন উদ্দেশ্যমূলক মনে হয়। পাত্তা না দিয়ে উপায় থাকে না। সমীরকে বলেও ফেলে একবার– তোমাদের কাজের মেয়েটি ভারি ইঁচড়ে পাকা তো..., সমীর সুযোগ পেয়েই টিপ্পনি কাটে– ও বাবা এরই মাঝে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে কমপ্লেন শুরু হয়ে গেল? আপাত বিষয়টা হাসিঠাট্টার মাঝে ফুরিয়ে গেলেও শেষতক তো আর শেষরক্ষা হল না, পচা শামুকে পা কাটার মতো পার্বতীর কারণেই ঘটনা ঘোট পাকিয়ে গেল। ... ...

বারে বারে সে নিজের মাউথ অর্গান তুলে নিয়েছে ঠোঁটে। যা যা সুর শুনছে, সেগুলোকে নকল করবার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। সবসময় পারেনি। কিন্তু কোনও কোনও মুহূর্তে তার সুর হুবহু টিলার মাথার সুরের সংগে মিলে গেছে। রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছে তার সারা শরীর। আর যখনই এটা হয়েছে, ডেসমন দেখেছে টিলার মাথায় লোকগুলো গান বাজনা থামিয়ে দিয়েছে। থামিয়ে দিয়ে তার দিকে যেন তাকিয়ে থেকেছে। ডেসমনের গায়ে কাঁটা দিয়েছে। আপনা হতেই চুপ হয়ে গেছে তার মাউথ অর্গানও। তারপর সে দেখেছে, লোকগুলো সকলে যেন কোমরের ওপর থেকে শরীর একটু ঝুঁকিয়েছে তার দিকে। তারপর আবার শুরু করেছে গান। লোকগুলো কি তাকে অভিবাদন জানাল? ডেসমন ঠিক বোঝে না, তবে এরকম ভংগী সিনেমাতে দেখেছে। দেখেছে মাথায় টুপি কালো কোট আর মাছি গোঁফওয়ালা একটা লোকের সিনেমাতেও। কাউকে সম্মান জানাতে হলে মানুষ এমন ভাবে নুয়ে পড়ে। ডেসমনও মাথা ঝোঁকায়। প্রণাম করে মনে মনে। তারপর আবার মাউথ অর্গান তুলে নেয়। ... ...

স্বপ্নে বন্ধু রাসেলের লগে দেখা। কী যানি কইতেছিলাম। উ কইল, কথা সংক্ষেপ কর। মেয়েরে আনতে স্কুলে যাইতে হইব। আমি কইলাম, চল..আমিও যামু…আমারও যাইতে হইব। আমরা একটা মাঠের মধ্যে দিয়া হাঁটতে ছিলাম। মাঠে পানি জমছে। বৃষ্টির পানি। আমরা একটা সরু আলপথ দিয়া হাঁটতে ছিলাম। বৃষ্টির পানিতে মাছেরা সাঁতার কাটতেছে। মাছগুলারে চিনতে পারতে ছিলাম। খইলস্যা মাছ। ... ...

মোট আটজন। একটা ছোট বৃত্ত। চারটে বড় পাঁচ ব্যাটারীর টর্চ। জ্বলছে। একটা তার মধ্যে মাঝেসাঝে একটু পাড়াটা বা মাঠে চোখ বোলাচ্ছে। যেসব মনুষ্য এবং মনুষ্যেতর প্রাণীরা তাদের এই কার্যকলাপ নিরীক্ষণ করছে, তাদের মধ্যে কোনও অবাঞ্ছিত চাঞ্চল্য ঘটছে কিনা মেপে নিচ্ছে। আর বাকি তিনটে আলো স্থির। ঐ বৃত্তটার কেন্দ্রে। কেন্দ্র মানে ঠিক বিন্দু নয়। বরং আর একটা বৃত্ত। দু'জন কনস্টেবল শাবল দিয়ে ক্রমাগত ঝপাঝপ কুপিয়ে যার পরিধি আর গভীরতা সমানে বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনটে টর্চের সাথে পাঁচজোড়া চোখও ওই দিকেই নিবদ্ধ। বাকি একজোড়া চোখ আলাদা। সেও দেখছে ওদিকেই। কিন্তু ওই আলগোছে। মাঝেমাঝেই চোখ সরাচ্ছে। কখনও বুজছে। এই চোখজোড়ার মালিক গোটা দলটার মধ্যেই যাকে বলে অড ম্যান আউট। বাকিরা সবাই সশস্ত্র, সবার কাছেই থ্রি নট থ্রি রাইফেল, কেবল এই দলটার নেতা যে, স্থানীয় থানার মেজবাবু, এস আই দিবাংশু কর, যে সিগারেট টানছে, গর্ত খোঁড়াটা নজর করছে আর মাঝেমাঝে আড়চোখে ওই লোকটাকে দেখছে, তার খালি কোমরে সার্ভিস রিভলভার। কিন্তু এই লোকটা নিরস্ত্র। সুঠাম চেহারা, একটা চোখ আর ঠোঁটের কোনটা ফুলে রক্ত জমে আছে। পরনে একটা ছেঁড়া গেঞ্জি আর আস্ত লুঙ্গি। দুটো হাত সামনে জড়ো করা। হ্যান্ডকাফ লাগানো। কোমরেও একটা মোটা দড়ি বাঁধা যার খুটটা পেছনে এক কনস্টেবলের শক্ত মুঠোয়। ... ...

শাড়ির খসখসানি শুনে মেয়েমানুষ সেটা ওমর আলী আগেই বুঝেছিলো। তা মেয়েমানুষ হলেই তাকে হুট করে ঘরে বসতে দিতে হবে নাকি! ওমর আলী হানিফকে বকাঝকা করতে লাগল। দিনকাল বড় খারাপ। ৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। কাল সন্ধ্যাবেলাও মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা গুলি ফুটিয়ে জয় বাংলা বলে শ্লোগান দিয়েছে স্কুল ঘরের মাঠে। পুরো গ্রাম ভেঙ্গে পড়েছে তাদের দেখার জন্য। ঐ দলের পালের গোদা সেন্টু আজকাল কি রকম ঠেস মেরে মেরে কথা বলে। ছোকরার মাথায় কেউ ঢুকায় দিছে মেলিটারি আইসা ওমর আলীর বাড়িতেই বসছিল। খানাপিনা করছে। ওমর আলী ভাল উর্দু জানে। বাতচিৎ তার মাধ্যমেই হয়েছে। সেন্টু যে মুক্তিবাহিনীতে গেছে এইটা যদি মেজর সাবরে বলে ওদের বাড়িঘর সে জ্বালাই দিতে বলত, কি পারত না তখন ওমর আলী? গ্রামের মাইনষের উপকার করছে ওমর আলী। বাড়ি-ঘর জ্বালাইতে দেয় নাই। হিন্দু জেনানাদের নিজের ঘরে আশ্রয় দিছে। রাতের আন্দারে তাগো বর্ডার পার হইতে সাহায্য করছে। অহন যদি সেদিনকার চেংরা পুলাপান কান্দে মেশিনগান নিয়া চোখ গরম দেখায় কেমুন লাগে? ... ...

সকাল সকাল দুজন উঠোনে শুয়ে। এক বৃদ্ধ, এক কিশোরী। পুবদিক থেকে এক টুকরো এবড়ো-খেবড়ো বাঁজা জমি বিপুল উৎসাহে উঁকি দিয়ে দেখতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু এক গাঁ মানুষের কাঁধ ছাড়িয়ে মাথা তুলতে পারেনি। অবশ্য নতুন করে দেখার কী বা আছে তার? দেখা ছাড়া তার জীবনে আছেই বা কী? বর্ষা যায়, শরৎ যায়, তার শরীরে কেউ লাঙল দেয় না। আগাছা বুকে নিয়ে সারা দিনমান সে হাউ হাউ চেয়ে থাকে দূরের ধানক্ষেত সর্ষে ক্ষেতের দিকে। ক্রমশ গরু-বাছুর ফিরে গেলে তার বুক মাড়িয়ে সন্ধ্যা হেঁটে যায়। কাঁটা উঁচিয়ে রাত্রির বাড়ি ফেরা দেখে একমাত্র বামন খেজুর গাছটা। তারপর সেও ঘুমিয়ে পড়ে। মাঠ জেগে থাকে। সারারাত দেখে আর শোনে। পাশের বাড়িতে সবুজ কপাটওয়ালা দরজা বন্ধ করে রাত ফিসফিস করে। ... ...

অরূপ প্রথমে ভেবেছিল কম্পিউটারে বেশিক্ষণ কাজ করার জন্য চোখে ব্যথা হচ্ছে। সবাই যেমন বলে, টানা কিছুক্ষণ কাজ করার পর একটু বিশ্রাম, সবুজ গাছপালার দিকে তাকিয়ে থাকা – সে রকম করতে শুরু করেছিল। তারপর একদিন দোল-পূর্ণিমার রাতে ছাদে বসে নীপার সঙ্গে গলা মিলিয়েছিল – ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান। হঠাৎ আকাশে তাকিয়ে সে দেখতে পেয়েছিল চাঁদের চারপাশে রামধনুর সাত রং নিয়ে একটা বৃত্ত। সে কথা শুনে নীপা খুব অবাক হয়ে বলেছিল – কই, না তো। তারপর একদিন বাসের হেডলাইটের চারপাশে সে রকম রঙিন বৃত্ত দেখল। কিন্তু অরূপ খুব অবাক হয় যে, এই রামধনু নীপা দেখতে পায় না। ... ...

রুমেলার আকাশকে নিয়ে সমস্যা নেই। সমস্যা আকাশের বন্ধুর ফ্যামিলিকে নিয়ে। ঐ মেয়েটা একমাত্র চাকুরে নয়, ও গৃহবধূ। বাকি সবাই বিশাল বিশাল আই টি ক্যাট। কিন্তু সবচেয়ে জিতে গেছে যেন আকাশ আর নিশান্তের চোখে সুন্দরী ওই মেয়েটাই, এত ভাল সাজতে জানে। কী প্রপার ও। কী সুন্দর ওর পা, হাত। গাল, নাক। তা ছাড়া ও ভীষণ গোছানো। আকাশের বন্ধু নিশান্ত ওর বউকে নিয়ে পাগল। প্রশংসা শুরু করলে থামতে পারেনা। ... ...

বেশ দূর। বেশ কয়েক কিলোমিটার দূর। যখন পুলিশ স্টেশনে গেলাম দেখলাম বকুল বসে আছে। তার মুখ ফ্যাকাশে। নিজের নাম বলতেই পুলিশি স্টাইলে অফিসার কিছু প্রশ্ন করলেন আমাকে। তারপর একটা চিরকুট বের করে দেখালেন- দেখেন। সুইসাইড নোটে আপনাদের দুজনের নাম আর ফোন নম্বর লেখা আছে। অবশ্য তেমন কিছু না। শুধু লেখা আপনাদের সাথে যেন যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু আপনারাতো কোনো রিলেটিভ নন। স্রেফ বন্ধু। অবশ্য তার এক চাচাকেও ফোন করা হয়েছে বাড়িওয়ালার কাছ থেকে নম্বর নিয়ে। তিনি দুপুরের মধ্যেই এসে পড়বেন। তাকে বলা হয়েছে তিনি যেন ছেলের বাবাকেও খবর দেন। তিনিও হয়ত এসে পড়বেন বিকেলের মধ্যে। ...কিন্তু ঘটনা হলো কেন সে সুইসাইড করল? আপনারা কী জানেন এ ব্যাপারে? ...অত মানুষ থাকতে আপনাদের নাম কেন সে লিখে গেলো সুইসাইড নোটে? বিষয়টা পুলিশ হিসেবে আমাদেরকে অবশ্যই ভাবতে হবে... ... ...

চন্দ্রাবতী মায়ের প্রসঙ্গ তুলে খোঁটা দেয়, ‘বাবা তুমি কাপুরুষ’। এ শব্দটা মেয়ে শিখলো কোত্থেকে? মা ছাড়া বড় হওয়া গাঁও-গেরামের মেয়ে, কৈশোর না-পেরোনো বয়সেই অনেকখানি পরিণত। প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করা হয় না চন্দ্রাবতীকে, বরং আত্ম-আবিস্কারে মগ্ন হয় অঘোর গায়েন, সত্যি কি কাপুরুষ সে? দোষতো তার নিজের। কেনো নিজের অবস্থা বিবেচনা না করে সে আত্মসমর্পণ করেছিল প্রেম আর মোহের কাছে? তার বান্ধা পালা শুনে সুলেখা পাগল হয়েছিল বলেই কি নিজের অভাবী-আধপেটা জীবনে ওকে জড়ানো কোনো বিবেচনাসম্পন্ন কাজ ছিল? কিন্তু কীই বা করার ছিল? বয়সটা মোহাচ্ছন্নতার, অবাধ্য যৌবনের। কাপুরুষের মতো তখনো সুলেখার বারবার বিয়ে করার তাগিদকে অগ্রাহ্য করেছে সে, কালক্ষেপণ করেছে, ভৎর্সনা করেছে সুলেখাকে, ‘পাগলরে যদি বল নিজের ঘরে আগুন লাগাইয়া দিতে সে কি লাগাইবো?’ সুলেখাকে নিজের দুর্বহ জীবনের সাথে জড়াতে ঠিক বিবেক থেকে সায় পেতো না অঘোর -হয়তো এটা কাপুরুষতা। তবু সুলেখার সুখের কথা ভেবে কাপুরুষই থাকতে চেয়েছে সে, কিন্তু পারলো কই? ভালোবাসার ক্রমাগত আহবানের কাছে কত সময় কাপুরুষ থাকা যায়? ... ...

আমি নাড়ানাড়ি করছি একটা দূরবীন নিয়ে। দূরবস্তুর দর্শন সাধন যন্ত্রবিশেষ, টেলিস্কোপ। যার কাজই হ্ল দূরস্থিত বস্তুকে দৃশ্যতঃ নিকটস্থ বা বর্ধিত করা। গালিলেওর দূরবীন বলে চালানোর চেষ্টা করছে নাকি বিক্রেতা? না না, তা নয়। আমি যন্ত্রটির গুণাগুণ পরীক্ষার ছলে প্রথমেই বিক্রেতা যুবকের মুখের ওপর ফোকাস নিবন্ধ রাখলাম। সে আমার সামনে অনেক বড় হয়ে প্রতিভাত হ’ল। ঈষৎ লালচে দাড়ি। দাড়ির লোমকূপগুলি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বাঁ ঠোটের কোণে হসন্তের মত সামান্য কাটা দাগ। কোথকার মানুষ সে? ফ্রান্স? জার্মানী? স্পেন? পর্তুগাল? বুলগেরিয়া? রোমানিয়া? হাঙ্গেরি না কিরঘিজস্থানের? নাকি সিরিয়া ইরাক ইরান তুরষ্ক আফগানিস্থান মিশরের? ভারতীয়ও তো হতে পারে। কেননা আজ যারা ইউরোপের ভবঘুরে, জিপসী, রোমানী, এককালে তারা ছিল ভারতীয়ই। ... ...

আমাদের একতলার ছাদ। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়ছে সেই ছাদে। আর ছাদটাকে আমার মনে হচ্ছে যেন একটা তেপান্তরের মাঠ! অথচ চারপাশে হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা বহুতল আমাদের এই ছাদটাকে কেমন গায়েব করে রেখেছিল। জানো আব্বা, ইদানিং আমি ছাদে উঠলে খুব অসহায় বোধ করতাম। আকাশ দেখতে পাই না বলে নিজেকে মানুষ ভাবতে পারতাম না। দিগন্ত দেখতে পাই না বলে আমার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত। তাই পারত পক্ষে আমি আর ছাদে উঠতাম না। কিন্তু এখন মায়ের খোঁজে এসে এ কী দেখছি আমি? ছাদটা যেন আমাদের ছাদ নয়, সত্যিকারের একটা তেপান্তরের মাঠ হয়ে বিরাজ করছে। আমার অদ্ভূত লাগছে। ... ...

তখনই সবাই জানতে পারে যে, এই দু’মুখো যন্ত্রটি আদতে ফরেনের মাল। সাগরবালার শ্বশুর অর্থাৎ অজাত ফরেনের বাবা ফরেন শব্দটির ধ্বনিমাধুর্যে বিমোহিত হয়ে পড়ে। খেতে নিড়ানি দিতে দিতে, পিঠের দাদ চুলকোতে গিয়ে, এমন কী রাতে বিছানায় তার বউ মালতীকে সোহাগ করার সময় ফলুই বর্মন ‘ফরেন’ শব্দের মায়ায় আচ্ছন্ন হয়। শব্দটি নিয়ে সে মুখের ভেতরে এধার ওধার করে। তখন ধানের গোছ, দাদনিসৃত রস ও মালতীর শরীরের উষ্ণতা পার হয়ে সে নতুন এক রকম সুখ টের পাচ্ছিল। মালতী সন্তানসম্ভবা সে ঠিক করে ব্যাটাছুয়া যদি জন্মায়, তবে তার নাম হবে ফরেন বর্মন। বিশেষত তার নিজের নাম ফলুই হওয়ায় ‘ফ’-এর বংশানুক্রমিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এ-ও ঠাকুরের এক লীলা। ... ...

- সাল সত্তরের শুরুও হতে পারে, আবার ওয়াইটুকেও হতে পারে। তুমি কোনটা চাও? তুমি পরে আছো খুব হালকা নীলচে জামা, ছাই রঙের ট্রাউজার। ফুলশার্ট, পাড়ার দর্জি হারুদা বানিয়েছে। সন দুহাজার হলে জামাটা গোঁজা। চশমা সত্তর হলে নেই, নয়ত আছে। তোমার হাইট পাঁচ ফুট আট, গায়ের রং প্রায় ফরসা, গাল একটু বসা। কথা না বাড়িয়ে সোমনাথ হাঁটছিলো। গরম হাওয়া বইছে রাশবিহারী অ্যাভেনিউ বরাবর, ট্রামলাইন পেরিয়ে সে হাওয়া ঘুপচি দোকানগুলোয় ঝাপটা মারছিলো। - ক্যালিফোর্নিয়া গ্যাছেন? ওখানে এমনি হাওয়া দেয় গরমে ... ...

সুমনের কোন গন্ধবাতিক নেই। যেখানে সেখানে যে কোন গন্ধ তার নাকে লাগে না। বিশেষত যে গন্ধ যেখানে লাগবার কোনো প্রশ্নই উঠে না। ভালো কিংবা মন্দ হোক যে কোন রকম। গন্ধ তার প্রাত্যহিকতাকে কোনো ভাবেই প্রভাবিত করে না। গন্ধকে প্রিয় কিংবা অপ্রিয় কোনো সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করার বাতিক ও তার নাই, যেমন ছিল দুলালের। দুনিয়ার তাবৎ ভালো গন্ধকেই তার লাগতো হাসনাহেনা ফুলের মতো। কিন্তু এই ঝামেলা সুমনের নাই, পাশের দোতালা বাসায় পোলাও রান্না হলে ঘি গরম মশলা ফোড়নের গন্ধই নাকে লাগে তার, মেসে শুঁটকি রান্না হলে শুঁটকির। রোজ রাতে মধুবন রেস্তোঁরার পাশ দিয়ে ফেরার সময় ড্রেনে জমে পচে উঠা বাসি খাবারের নাড়ি-ভুড়ি উল্টে আসা গন্ধ আর বারান্দায় শিককাবাব ভাজার পেটের তীব্র ক্ষুধা জাগিয়ে দেয়া গন্ধ মিলেমিশে যে খানিক গন্ধময় ঘোর তৈরি করে তার ক্লান্ত ক্ষুধার্ত শ্রান্ত দেহ ঘিরে, তাও খুব স্বাভাবিকই বোধ হয় সুমনের। মোটেই তা বাতিকগ্রস্ততার পর্যায়ে পড়ে না। কিন্তু আজ ২৫ মাইল সি এন জি চালিত যান আর বর্ষার কাদা প্যাচপ্যাচে রাস্তায় ১০ মাইল রিক্সায় আদিত্যপুর গ্রামে দুলালের বাড়িতে পৌঁছে প্রথমেই তার চোখ যায় বাড়ির শেষ মাথায়। ... ...

ক্রিস্টাল হার্বাল ক্লিনিকে গিয়ে বলতে, গোটা ছয়েক ওষুধ লিখে দিল। সে ওষুধ আবার ওদের কাছ থেকেই কিনতে হয়। বিল হল চব্বিশ টাকা। সব ক্যানসেল করে একটা ট্যাবলেটের শিশি নিয়ে এলাম। রাত্তিরে দুটো বড়ি, ঘুমোবার আগে। সে কী কেলো বড়দা! কিছুতেই কিছু হয়না। ইংরিজির বদলে গড়িয়াহাট থেকে দুটো বাংলা সিডি আনা করালাম। মাতৃভাষায় যদি কিছু উপকার হয়। তাও হল না। ব্যবসাটা কোনওক্রমে করতে হয় তাই করা। লেখা ফেখা মাথায় উঠেছে। পুরো বনবনাইটিস। শেষে বড়দা, আপনার এই দোকানের উল্টোদিকে ওষুধ পাওয়া গেল। আপনার দোকান, যা কিনা আমায় ভাড়ায় দেওয়া - টিপটপ মিটশপ। প্রথম দিনেই বুঝেছিলাম দোকানটার আয়পয় ভালো। কিন্তু চার-চারটে বছর বসছি, এতদিনে একবারও এ বিষয়টা চোখে পড়েনি কেন কে জানে ! ফারুখ যখন রোজ দোকান বন্ধ করে, এই সাড়ে ন’টা নাগাদ, রাস্তার উল্টো ফুটে ম্যাক্সিমিনি বুটিকের মামনিরা তাদের ম্যানিকুইনগুলোকে জামা ছাড়ায়। রোগা রোগা ম্যানিকুইন, তাদের চ্যাপ্টানো নিতম্ব, বুকের কাছে সামান্য ঢিবি। ... ...

– ‘জিগেশ করছিলে না? কী করে বাঁচিয়ে রাখি? বড় মায়া দিয়ে বাবু। মায়া না থাকলি এ দুর্যোগে কিছুই রাখা যায় না। ঐ কচিগুলো, এত নেওটা আমার, এত মায়া যে ছাড়ি যেতি দিলাম না। এই মাঠও তাই। তোমাদের ফেলাট বানানোর গর্ত রোজ এসে গিলে ফেলতি চায় এই জমি। খুরপি নিয়ে লড়াই করি বাবু, মায়া দিয়ে আটকে রাখি যেটুকু জমিজমা পারি। আবার হেরে যাই যখন সব গর্তে ঢুকি যায়। রাবিশের নিচে ঢেকে যেতি থাকে বীজতলা, চার, ফসল সব। আবার খুরপি দিয়ে খুঁচোই। ফিরিয়ে আনি কিছু। লড়াই চলে গো বাবু। আমার ছেলেগুলো কই গেল দেখি! ’ ... ...

পহেলা বৈশাখ এলেই আজকাল একজনের কথা আমার মনে পড়ে। ভদ্রলোক আর আমি পাশাপাশি ডেস্কে বসে কাজ করতাম এক সময়। চাকরি ছেড়ে দেবার পরও তার সঙ্গে আমার প্রায়ই দেখা হতো। এখনো হয় কালেভদ্রে। আমাদের কলিগ সবিমল বসু ধর্ম নিয়ে প্যাঁচপ্যাচি ধরনের মানুষ। অফিস ছুটির পর দেখতাম কলা গাছের বাকল নিয়ে যাচ্ছেন। জিজ্ঞেস করলে বলত বাড়িতে কি নাকি পুজা আছে। সকালবেলা কখনো হাঁটতে বের হলেও দেখতাম ফুল কিনছেন। বাড়িতে নিজেই পুজা দেন। ঠাকুর দেবতায় খুব ভক্তি। আমাদের জীবন থেকে বাংলা কেলেন্ডার উঠে গেলেও সুবিমলকে দেখতাম বাংলা মাসের তারিখ পর্যন্ত মনে রাখছেন। উনার সঙ্গে কথা বলে মজা পেতাম কারণ উনি উনার জীবনে এখনো ইংরেজি তারিখের সঙ্গে বাংলা তারিখটি সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন। যেমন বৃষ্টি কম হচ্ছে, এ বছর বৃষ্টির দেখা নেই… সুবিমলদা বলে উঠতেন আষাড়ের আজকে ২ তারিখ ১৪ তারিখে রথযাত্রা। এর আগে বৃষ্টি হবে বলে মনে হয় না…। কিংবা পৌষ ২২ চলছে কিন্তু শীতের দেখা নেই ইত্যাদি…। ... ...