এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  অপর বাংলা

  • 'এসব দেখি কানার হাট বাজার!'

    বিপ্লব রহমান লেখকের গ্রাহক হোন
    অপর বাংলা | ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | ৬৫২ বার পঠিত

  • বাংলাদেশে পালাগানে 'ধর্মীয় অনুভুতিতের আঘাত' দেওয়ার নামে বাউল আবুল সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে 'তৌহিদী জনতা', পরে সরকার এ সংক্রান্ত মামলায় আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করেছে।

    এছাড়া বাউল আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে বের করা একাধিক প্রতিবাদ মিছিলে এই 'তৌহিদী জনতা' প্রকাশ্যে হামলা করেছে। এমনকি তাদের নেতারা ফেসবুকে প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদে মারপিট ও হত্যার হুমকি দিয়ে ফৌজদারি অপরাধ করে চলেছে।

    ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার হাসিনা জামানায় ২০১৩ সাল থেকে মুক্তমনা শিক্ষক অভিজিৎ রায়সহ ব্লগার হত্যার ব্লাসফেমাসের কালে সরকারের নিরব ভূমিকার মতোই ইউনূস সরকারও রহস্যজনক ভূমিকা নিয়েছে।
    শীত শুরু হতে না হতেই তাদের সাইবার পুলিশ গিয়েছে দীর্ঘ শীত নিদ্রায়।
    সত্যিকার অর্থে দু-একটি মিহি বিবৃতির পুষ্প নিক্ষেপ করা ছাড়া ইউনূস সরকারের এই 'তৌহিদী জনতার' কেশাগ্র স্পর্শ করার হিম্মত নাই, কারণ এদের শেকড় অনেক গভীরে। সে বিষয় পরে আবারও বলা হচ্ছে।


    জানতে ইচ্ছে করে এই 'তৌহিদী জনতা'ই কি বেগম রোকেয়ার নারী শিক্ষার আন্দোলনের বিপক্ষে রক্ষণশীল ভূমিকা নিয়েছিল? এরাই কি নজরুল ও ইকবালকে 'কাফের' ফতোয়া দিয়েছিল? এরাই কি দেশ বিভাগের সময় 'লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান' আন্দোলন করেছে?

    পরে স্বাধীন বাংলাদেশে বাউল শাহ আব্দুল করিমকে একঘরে করেছিল? ড. আহমদ শরীফকে 'মুরদাত', অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে 'নাস্তিক' ও তসলিমা নাসরিনকে 'কাফের' ট্যাগিং করেছে?
    বিশ্বের দেশে দেশে, এমন কি নিকটতম দেশে যেখানে শিয়া-সুন্নি-ওহাবি-হিন্দু-মুসলিম-শিখ সেখানে 'তৌহিদী জনতার' রূপ কী?


    একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যেসব শক্তি লড়েছিল, তার ভেতরে অন্তর্নিহিত ছিল ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ।

    এই নির্মম বাস্তবতা, তথা সিআইএ'র প্রক্সি যুদ্ধের তালাশ ৩৬ জুলাইয়ের আন্দোলনের কালেই একাধিক লেখায় বলা হয়েছে (দ্র. পূর্বতন লেখাসমূহ), কাজেই তার পুনরুল্লেখ বাহুল্য।

    মনে করিয়ে দেওয়া ভাল, ৩৬ জুলাইয়ের আন্দোলনের নেতৃত্ব ফ্যানাটিকদের কাছে বেহাত হওয়ার জেরে বাংলাদেশে হাসিনা জামানার অবসানের পর ইউনূস জামানারকালে আলোচ্য অপশক্তি খুব দ্রুতই আত্মপ্রকাশই শুধু করেনি, এরা রীতিমতো মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, বাঙালি সংস্কৃতি, ধর্ম নিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, সুফিবাদ, ভাববাদ, ধর্মীয় স্বাধীনতাসহ সব ধরনের উদার ও সুকুমার চর্চার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছে।

    কিন্তু 'তৌহিদী জনতার' কোনো আন্দোলনের ইস্যুই চাল-ডাল-তেল-নুনের, তথা মৌলিক মানবিক ইস্যুর নয়, সবই ধর্মীয় সুড়সুড়ির।

    আর বাউল গানে জীবাত্মা- পরমাত্মার যে গভীর আধ্যাত্মিক দর্শনের কথা বলা হয়, তা বোঝার মতো মগজ জিহাদি 'তৌহিদী জনতার' নাই।


    এসব কারণেই সরকার বদলের সাথে সাথে এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ কখনো 'তৌহিদী জনতার' ব্যানারে, কখনো ভিন্ন ভিন্ন নামে মুজিব-হাসিনা ফ্যাসিবাদ দমনের নামে মব জাস্টিসে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, মেহেরপুরে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যসহ দেশের অসংখ্য মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ধ্বংস করেছে।

    এরাই একের পর এক পীর-ফকির-আউলিয়ার মাজার ধ্বংস, বাউল ফকিরদের চুল কেটে-মারপিট করা, দুর্গাপূজায় ইসলামি সংগীত পরিবেশন, কাদেয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা ও ইসকন নিষিদ্ধের আন্দোলন ইত্যাদি করেছে।

    এই ফ্যানাটিকরা সেনাবাহিনী সহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে
    নূরাল পাগলার দরবারে হামলা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা নূরাল পীরের মরদেহ কবর থেকে তুলে প্রকাশ্যে পুড়িয়েও ফেলেছে!

    বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত শিক্ষক ও শরীর চর্চার শিক্ষক নিয়োগের বিরোধিতায় এই জেহাদিরাই বিশাল বিশাল মিছিল করেছে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে।
    সবশেষ এরাই ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাতে নামে বাউল আবুল সরকারকে গ্রেপ্তারে বাধ্য করেছে, আবার তার মুক্তির দাবিতে বের করা প্রতিবাদ মিছিলে হামলাকারী এই 'তৌহিদী জনতাই'।


    লক্ষ্যনীয়, দু-একটি বিবৃতি দিয়েই
    ইউনূস সরকার হাত ধুয়ে ফেলেছে, 'তৌহিদী জনতার' বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান নেওয়ার মতো শক্তি ও সদিচ্ছা কোনটাই তাদের নাই। কারণ 'তৌহিদী জনতার' সুতো বাঁধা অনেক দূরে।

    আবার স্থানীয় পর্যায়ে এই 'তৌহিদী জনতার' সাথে অনেকটা প্রকাশ্যেই বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি হাত মিলিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে গড়ে ওঠা ছাত্র- জনতার রাজনৈতিক দল এনসিপির এক নেত্রী তো সরাসরি বাউলদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাকে বাউল বিরোধী একশনে প্রকাশ্যে দেখাও গেছে।

    কিন্তু তার দল এ বিষয়ে আশ্চর্য নিরব, উপরন্তু তারা 'ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত' দেওয়ার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। অবশ্য অনেক দেরিতে হলে প্রধান দল বিএনপি বাউল আবুল সরকারের মুক্তি দাবি করেছে।

    আর বাম প্রগতিশীল ও সেক্যুলার দল ও সংগঠন প্রথম থেকে সোচ্চার রয়েছে, 'তৌহিদী জনতার' সমস্ত ফ্যানাটিক তাণ্ডবের বিরুদ্ধে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছে, প্রতিবাদী বাউল গানের আসর হচ্ছে, আরও সিরিজ কর্মসূচি চলছে। ফাঁক তালে পতিত আওয়ামী লীগও নেমেছে আবুল সরকার ইস্যুতে। তাদের অবশ্য অনলাইন আর এআই ভরসা, অফলাইনে কোনো অবস্থান নেই।


    এদেশ নিশ্চয়ই এখনও হলি আর্টিজান ট্র‍্যাজেডির কথা ভোলেনি। ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় মোট ২৯ জন নিহত হন। এর মধ্যে ২০ জন জিম্মি (১৭ জন বিদেশি এবং ৩ জন স্থানীয়), দুই পুলিশ সদস্য, পাঁচ জঙ্গি এবং বেকারির দুই কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

    আইএসআই-এর সহযোগি ওই একটি জঙ্গি হামলায় পুরো বিশ্ব কেঁপে উঠলে হাসিনা সরকার বাধ্য হয়ে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ জঙ্গিগোষ্ঠী দমনে নামে।
    সময় থাকতেই ফ্যানাটিকদের এই বিষদাঁত ভাঙা না হলে কালে কালে জিহাদের আরও অনেক হলি আর্টিজান সৃষ্টি হওয়া বিচিত্র নয়। অতএব সাধু সাবধান।।

    ______
    আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে বাউল গানের আসর

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • অপর বাংলা | ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | ৬৫২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে প্রতিক্রিয়া দিন