এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  ঘুমক্কড়

  • মোহিনী ধূবেলা

    সমরেশ মুখার্জী লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | ঘুমক্কড় | ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ৬৪১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৩ জন)
  • বিশাল তিনটি হ্রদ, কিছু সবুজ, কয়েকটি সুরম‍্য স্মৃতি‌সৌধ নিয়ে একান্তে পড়ে আছে মহারাজা ছত্রশাল বুন্দেলার রাজধানী - ধূবেলা। পাহাড়বেষ্টিত বুন্দেলখন্ডের এই লুকানো জহরৎ ভরিয়ে দেবে দরদী পর্যটকের মন। তার মায়াবী আকর্ষণ মস্তানি বাঈয়ের কিংবদন্তী‌প্রতিম সৌন্দর্যের মতোই মোহিনী।

       নির্জন ঐতিহাসিক স্থান আমায় টানে। তা যদি কোনো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে হয় তো সোনায় সোহাগা। ২০১৯এ ২৩ দিনের একাকী ভ্রমণে মধ‍্যপ্রদেশে দেখেছি তেমন বেশ কিছু স্থান। ধূবেলা তাদের অন‍্যতম।
     
     বুন্দেলখন্ডে বৃহত্তর পান্না এলাকায় সপ্তদশ শতকে মহারাজা ছত্রশাল এখানে স্থাপনা করেন তাঁর রাজধানী। আজ‌ও তিনি এখানকার মানুষের মনে গভীর শ্রদ্ধা‌য় আসীন। তাই ধূবেলার মৌ-সাহানিয়া গ্ৰামে মহারাজা ছত্রশাল খেল ময়দানের দেওয়ালে লেখা শ্লোগান - 'বুন্দেলখন্ড কে লাল, ঘর ঘর ছত্রশাল'। তাঁর‌ নামে‌‌ই ছত্তরপুর জেলা, কলেজ, রেল স্টেশন। অলিম্পিকজয়ী সুশীল কুমার ১৪ বছর বয়স থেকে যে আখড়ায় কুস্তির প্রশিক্ষণ পেয়েছেন সেটি‌ও উত্তর দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়ামে। 
       জেলা সদর ছত্তরপুরের ৪৫ কিমি উত্তর-পূর্বে খাজুরাহো‌র মন্দির‌রাজি তাদের অনুপম ভাস্কর্যের দৌলতে মাথায় পড়েছে বিশ্ব ঐতিহ্যের মুকুট। হয়েছে বিমান‌বন্দর। তাই বছরভর দেশী, বিদেশী ট‍্যুরিস্ট সমাগমে খাজুরাহো সরগরম। সেই ভীড়ের কণামাত্র‌ নেই ছত্তরপুরে‌র ১৫ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে ধূবেলা‌য়। আমার কাছে শাপে বর। 

    ২৭.২.১৯ সকাল ৯টায় টিকমগড়ে ডঃ শ‍্যামাপ্রসাদ মুখার্জী অন্তঃরাষ্ট্রীয় বাসস্ট‍্যান্ড থেকে উঠলাম ২৭ সীটারের লোকাল বাসে। গুড়গুড় করে সে বাস ১০০ কিমি দুরে ছত্তরপুর পৌঁছালো ১২টায়। টিকমগড়ের মতো ছত্তরপুরের আন্তরাজ‍্য বাসস্ট‍্যান্ড‌ও দেখি ডঃ শ‍্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সম্মানে নামাঙ্কিত। বিদিশার ম‍্যাপে দেখেছিলাম মুখার্জী নগর। সেও নিশ্চয়ই ওনার নামে। অর্থাৎ এখানে শ‍্যামাপ্রসাদ বেশ মান‍্যতাপ্রাপ্ত।
    বাসস্ট‍্যান্ডে এক দোকানে টসটসে সদ‍্য ভাজা ছানার জিলিপি দেখে মন হু হু করে ওঠে। মিষ্টি‌ আমার প্রিয়। স্বাদে এবং দর্শনে। সত্তরের দশকে দেশের বাড়িতে ময়রার দোকানে দেশী ঘিয়ে ভাজা ছানার জিলিপি‌র স্বর্গীয় স্বাদ স্মৃতি‌তে অক্ষয়। তখন দাম ছিল চার আনা পিস। এখানে ১০ টাকা। স্বাদ মন্দ নয়। তিনটে খাস্তা কচুরি ও  দুটো জিলিপি সহযোগে ৩৫ টাকায় হয়ে গেল সুন্দর নোনা মিঠে লাঞ্চ‍। 

    এভাবেই হয় আমার কম খরচে ভোজন এবং ভ্রমণ।
    উঠলাম হরপালপুরের ভীড়ঠাসা লোকাল বাসে। সীট নেই। লোহার পোষ্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে  এক স্থানীয় যাত্রীর সাথে খোশ গল্প শেষ হ‌ওয়া‌র আগেই পৌঁছে গেলাম ধূবেলা। মাত্র আধঘন্টার পথ। বেলা একটা বাজে। পর্যটকবিরল ছোট্ট গ্ৰাম। অটোরিক্সা‌‌ নেই। আগে পিছে দুটো স‍্যাক নিয়ে চারশো মিটার হেঁটে পৌঁছলাম প্রবেশপথে। পাশেই হজরত বলিউদ্দীনের মাজার। জানতাম ধূবেলা‌র দ্রষ্টব্য স্থান‌গুলি‌‌ বেশ ছড়ানো। ভাবি পিঠের ৭০ লিটারের গোব্দা স‍্যাকটা দরগার কেয়ারটেকারের জিম্মায় রেখে গেলে কেমন হয়।

    বৃদ্ধ মোবারক আলী আমার মনোবাঞ্ছা শুনে বলেন, বেশ তো, রেখে যান কিন্তু সাড়ে পাঁচটার মধ‍্যে চলে আসবেন। আমি তারপর চলে যাই ঘরে।

    বড় স‍্যাকটি মাজারে চাচা‌র জিম্মায় রেখে ঝাড়াহাতপা হয়ে এগোই

     ঝকঝকে নীল আকাশ - সবুজ ক্ষেত -  রুক্ষ লালচে পাহাড়ের কোলাজে পথশোভা অপূর্ব। 

    "লাল-নীল-সবুজের‌ই মেলা বসেছে" - ন বছর বয়সে সাদা কালোতে 'চিরদিনের' সিনেমায় উত্তমকুমারের কণ্ঠে মান্না দের অপূর্ব গায়কীতে অবিষ্মরণীয় সেই গানের রঙিন আবেশ দেখি পথের পাশে। আহা! এমন পথেই তো হেঁটে মজা। অনেক পরে জানতে পারি ১৯৬৯ সালে ঐ সিনেমা‌য় নচিদা সুরটি ১৯৬৩ সালে পপস্টার ক্লিফ রিচার্ডের গা‌ওয়া অতি জনপ্রিয় গান We are all going on a summer holiday থেকে ইয়ে করেছি‌লেন।  
     
    ফেব্রুয়ারি‌র শেষেও ধূবেলা লেকের আকার ঘোর বর্ষা‌য় তার বিস্তারের ইংগিতবাহী। অনেক দুরে পাহাড়ের মাথায় আঁচিলের মতো কিছু দেখতে পাই। (লাল তীর)। লেকের পাশে যে ওটা রাণী কমলাপতির স্মৃতি‌সৌধ তা আসার আগে হোম‌ওয়ার্ক করে জানি। (সবুজ তীর)। 

    স্থানীয় একজনের সাথে কথা বলে জানলাম, ঐ আঁচিল‌টা সিদ্ধবাবা মন্দির। বলি, কোনো সাধুবাবা থাকেন নাকি ওখানে? তিনি বলেন, না, না, কেউ থাকে না ওখানে। ওটা একটা শিব মন্দির। প্রার্থনা‌য় ভক্তের মনস্কামনা পূর্ণ হয়, তাই ঐ নাম। স্থানটি তিনশো বছরের প্রাচীন, ছোট্ট মন্দির‌টি অবশ‍্য হালের। সোমবার কিছু ভক্ত যান। শিবরাত্রি‌তে অনেকে আসে‌ন। এছাড়া সারা বছর জনহীন‌ই থাকে। 
    জানতে চাই, ওখানে যেতে পারি? চুরি ছিনতাই‌ বা বণ‍্যজন্তুর ভয় নেই তো। কথা বলে বুঝি, প্রায় চার কিমি দুর, শ তিনেক ফুট উঁচু পাহাড়ে ওঠার পথে কিছুটা সিঁড়ি আছে বাকিটা গিরিশিরা ধরে উঠতে হবে। হাঁটায় বা ওঠায় আমার অসুবিধা নেই। লোকজন কেউ যায়না,  তাই লুটবেটা কাকে? ফলে চোর ছ‍্যাঁচোর‌ও নেই। পান্না টাইগার রিজার্ভ থেকে কচিৎ কখনো ডোরাদা বা দিদিমণি হাওয়া খেতে এদিক ওদিক গেলে‌ও এতোটা আসেন না, ভর দুপুরে তো নয়‌ই। সুতরাং বাস্তবিক বিপদের কোনো ভয় নেই। 
       হাইওয়ে থেকে দেড় কিমি হেঁটে পৌঁছ‌ই মিউজিয়ামে‌র গেটের সামনে করনের চায়ের দোকানে। এবার একটু চা খেতে হবে। মহারাজা ছত্রশাল মিউজিয়াম ১২.৯.১৯৫৫ সালে নেহরু‌জী কর্তৃক উদ্বোধিত মধ‍্যপ্রদেশের প্রথম রাজ‍্য পুরাতাত্ত্বিক সংগ্ৰাহলয়। অর্থাৎ এটি ASI এর অধীনে নয়। ঘন গাছপালায় ছাওয়া সুন্দর পরিবেশ। 

    মহারাজা ছত্রশাল সংগ্ৰহশালার প্রবেশপথ

    সংগ্ৰহশালার অন্দরে - মাঝে তরোয়াল উঁচিয়ে মহারাজ
    মনে হয় আধবেলায় ধূবেলার কিছু‌ই ভালো করে দেখা হবে না। একটা রাত থাকলে ভালো হতো। কিন্তু এখানে দুটি রিসর্টের নূন্যতম রেট‌‌ও আমার ঝোলাপিঠে ভ্রমণ বাজেটের বাইরে। চা খেতে খেতে করণকে শুধাই, তোমার দোকানের ঐ চৌকিতে আমি রাতে শুতে পারি? ম‍্যাট আছে আমার কাছে। পাতবো বডি ফেলবো, সকালে চলে যাবো। তাহলে সিদ্ধবাবার মন্দির‌ ঘুরে আসা যায়। এমন আজব আব্দার শুনে দৃশ‍্যত বিষ্মিত হয়ে করণ বলে, আপনি যদি থাকতে পারেন আমাদের অসুবিধা নেই। আমরা রাতে দোকানে‌র নীচে‌ ঘরে থাকি। আপনি ঘুরে আসুন। পিতাজী এলে আমি বাইকে করে দরগা থেকে আপনার স‍্যাকটা নিয়ে আসবো। চাচাকে আমি চিনি। এতো মেঘ না চাইতে‌ জল! ক‍রণকে ধন‍্যবাদ জানিয়ে দ্রুত এগো‌ই পাহাড়ের দিকে। 

    ভেবেছিলাম মিউজিয়াম গেটের ডাইনে করণের চায়ের দোকানে বডি ফেলবো কিন্তু বিধি বাম…
       কিছুটা যেতে লেকের ধারে মহারাজা ছত্রশালের পত্নী রাণী কমলাপতির অষ্টভূজাকার সৌম‍্য স্মৃতি‌সৌধ। দুর থেকে ঠিক বুঝতে পারি নি। কাছ থেকে বুন্দেলা শৈলী‌র সৌধ‍্যটি বেশ লাগে। সাতটি গম্বুজের শিরে ওল্টানো পদ্মপাঁপড়ির আকার। পশ্চাৎপটে নীল আকাশ ও খয়েরি পাহাড়। একদম ছবি। কিন্তু কোনো দর্শক নেই। 


    ওখান থেকে আধা কিমি দুরে একটি তেমাথা। বাঁদিকের পথ গেছে মোতি বাগে কৃষ্ণ প্রণামী মন্দির। সামনের‌‌টা উঠে গেছে মাহেবা গেটে। দুরে পাহাড়শিরে মন্দিরকে দিকচিহ্ণ করে ডানহাতি মেঠো বনপথে এগোলাম। অদূরে তপসী‌জী মন্দির। তার একটু দুরে ডানদিকে ফাটা-পাহাড়ের গায়ে বাদলমহল। ধূবেলা‌য় মহারাজা‌র প্রথম বাসস্থান। পরে তিনি চলে যান লেকের পারে মহলে, যেটি এখন মিউজিয়াম। এটি বহুদিন পরিত্যক্ত তবু এখনও বেশ ভালো‌ অবস্থায় আছে।

    পরিত‍্যক্ত বাদল মহল
       বনপথে দেখা আলাপ হয় ফরেষ্ট গার্ড শ্রীবাসের সাথে। কেউ দেখার নেই কিন্তু সে তার ডিউটি মন দিয়ে করছে। সুঠাম শরীরে পাকানো গোঁফের ফাঁকে হাসিটি বেশ উষ্ণ। সাইকেলের রডে বাঁধা টাঙ্গিটা ভরসা‌দায়ক। শ্রীবাস বলে, এই মাহেবা গ্ৰামের লোকগুলো‌ খুব পাজি। বিশেষ করে মাইয়ার দল। আমরা দুজন গার্ড সতর্ক থাকি বলে কয়েকটা ফরেষ্ট কেস দিয়েছি। তাই বড় গাছ কাটতে সাহস পায় না  কিন্তু ফাঁক পেলেই বাড়ির মেয়ে বৌদের পাঠিয়ে দেয়। ওরা ডালপালা কেটে পালায়। দেখুন কত গাছের নীচের ডালগুলো সাফ হয়ে গেছে। এভাবেই ক্রমশ জঙ্গল সাফ হয়ে যাবে। শ্রীবাসের খেদোক্তিতে‌ আরণ‍্যকের রাজু পাঁড়ের মমতার অনুরণন অনুভব করি। সে নির্জন সরস্বতী‌কুণ্ডের পারে মনের আনন্দে নতুন গাছের বীজ বুনতো। শ্রীবাস পুরোনো গাছ বাঁচাতে মরীয়া। বুঝিনা উজ্বলা প্রকল্পে বিলোনো আট কোটি গ‍্যাস সিলিন্ডার গ্ৰামের বাড়িতে পৌছায় না নাকি ওদের স্বভাব যায় না মলে। 
    জায়গা‌টা একদম বিরান। একলা, বুড়ো বয়সে দুঃসাহস দেখানো ঠিক নয়। বাড়িতে বৌ ছেলে ছেড়ে এসেছি। তাই শ্রীবাসকেও শুধোই, ভাই যাবো ঐ মন্দিরে, চুরি ছিনতাইয়ের ভয় নেই তো? শ্রীবাস বলে, না, না, ওসব কোনো ভয় নেই, তবে সাবধানে যাবেন, পড়ে টড়ে যাবেন না যেন। আমার নম্বর রাখুন। কোনো অসুবিধা হলে ফোন করবেন, আশেপাশে‌ই আছি, দশ মিনিটের মধ‍্যে চলে আসবো। আবার ভারতের হৃদয়ের মানুষের সহৃদয়‌তায় মুগ্ধ হ‌ই। এমন কতবার যে হয়েছি!

    সাইকেলে বাঁধা টাঙি সমেত বনরক্ষী শ্রীবাসের উপস্থিতি বেশ ভরসাদায়ক

       কিছুটা চলার পর নজরে আসে পাহাড়ের পাদদেশে একটা মামূলী সাদা তোরণ। সেখান থেকে পাহাড়ে উঠে গেছে সিঁড়ি। খানিকটা উঠে‌ই শেষ। দুর থেকে দেখা পাহাড়ের মাথায় আঁচিল‌টা এবার একটু স্পষ্ট হয় (লাল তীর)।
     পথের পাশে একটা পাথরে বসে আছে শ্রীবাসের জোড়িদার। তার পাশে বসে খানিক গল্প করছি দেখি গরু খেদানোর মতো তিনটি গ্ৰাম‍্য মহিলা‌র পিছনে গজগজ করতে করতে আসছে শ্রীবাস। দুর থেকে চেঁচিয়ে বলে, বাবুজি এদের ছবি তুলে নিন, সদরে 'রিপোট' ক‍রতে হবে। আমি মোবাইলে ছবি তোলার ভাণ করি। মাথায় কাটা ডালের বোঝা নিয়ে ওরা ভীতু খরগোসের মতো দ্রুত পা চালায়। কাছে এসে শ্রীবাস বলে, আমি ওদের বলেছি সদর থেকে অফিসার এসে এই যে তোদের ছবি নিল, এতে প্রমাণ রয়ে গেল। ফের যদি এদিকে আসিস তোদের মরদকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাবে। তখন বুঝবি ঠ‍্যালা। 
    মেট্রোর ফুটপাতের ফ‍্যাতফ‍্যাতে পাতলুন ও বছর বারোর রঙচটা জামা পরে পাথরে বসে আছে সদর থেকে আসা অফিসার! আপন মনে নিঃশব্দে হেসে বলি, কিন্তু, ওরা তো একগলা ঘোমটা টেনে গেল? মুখ তো কারো দেখা‌ই গেল না? এ ছবিতে কী হবে? শ্রীবাস বলে, বাবুজি, ওরা ভয় পেয়ে ঘোমটার ভেতর দিয়ে আপনাকে কেমন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছি‌ল খেয়াল করেন নি? ঐ ভয় পাওয়ানোটা‌ই উদ্দেশ্য। ওতেই যা হয়। জানি তো কিছুই করার নেই। কর্তব‍্যবোধে শ্রীবাসের উপস্থিত‌বুদ্ধি‌র তারিফ করি মনে মনে।


       কিছুটা সিঁড়ি, বাকি‌টা পাথর ধরে উঠতে আঁচিলটি এবার পরিস্কার দৃশ‍্যমান হয়। কতদূর থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল সে আমায়।


    মন্দিরের চাতালে গিয়ে বসি। ছোট্ট জনহীন মন্দির। ফুল, ফল, নারকোল কিছুই পড়ে নেই। তাই কোনো শাখামৃগ‌ও নেই। আকাশে মেঘ ঘনিয়ে আসছে। বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সবুজ ক্ষেত, লাল মাটি, হ্রদের নীল জল ও খয়েরি পাহাড়ের বর্ণাঢ‍্য ক‍্যানভাসে পড়েছে চালধোয়া ফ‍্যাকাশে আলো। একপাশে মেঘফুঁড়ে তৈরি হয়েছে অপূর্ব একটি 'জ‍্যাকবস ল‍্যাডার'। দুরে নীচে ধূবেলা লেকের বিস্তার এখান থেকে পাখির চোখে অন‍্যরকম লাগে। (লাল তীর)। সেই ঝিমঝিমে নির্জনতায় বুঁদ হয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসে ছিলাম। 



    হঠাৎ বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামতে হুঁশ ফেরে। দ্রুত পা চালিয়ে নেমে একটানা হেঁটে করণের দোকানে ফিরে আসি। করণ নেই। দোকানে বসে আছেন তার পিতা। করণের সাথে কী কথা হয়েছে জানাই। পিতা বলেন, হ‍্যাঁ, করণ আমায় বলেছে আপনার কথা। তারপর কাঁচুমাচু মুখে যা বলেন শুনে আমি হতবাক! 
    বেড়াতে বেরিয়ে আমি নিজের দুনিয়ায় অন‍্য ধুমকিতে বুঁদ হয়ে থাকি। তখন দেশ বিদেশে‌র খবর, রাজনৈতিক তরজা পড়তে ভালো লাগে না। তাই নিউজ, ভিউজ ইত্যাদি দেখি‌ না। নিত‍্যদিন ওসব দেখে তিতিবিরক্ত হয়ে‌ই তো কদিনের জন‍্য এসকেপিস্টের মতো যাই পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে। তখন‌ আর ওসব দেখে মুড অফ করতে চাই না। তাই গতকাল যে পাকিস্তানের অন্দরে ঢুকে বালাকোটে ভারত এয়ার স্ট্রাইক করেছে, গোয়ালিয়র এয়ারবেস থেকেই গেছি‌ল লড়াকু বিমান, তার ফলে দেশের মধ‍্যে তৈরী হয়েছে চাপা তনাও, জারি হয়েছে হাই এ্যালার্ট, মহারাজা ছত্রশাল মিউজিয়াম অতি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিসৌধ, পুলিশ এসে হুঁশিয়ারি দিয়ে গেছে - অনজান বেগানা পরদেশী‌ থেকে সাবধান। এমতাবস্থায় আমায় দোকানে থাকতে দিলে পুলিশের ঝামেলা হতে পারে ….।  
     
    পরিস্থিতির শিকার হয়ে হতাশ হলাম।  শুধু রাতে শোয়ার জন‍্য ধূবেলা রিসর্টে ১৫০০ টাকায় থাকা আমার কম খরচে ভ্রমণ দর্শনের সাথে যায় না। পত্রপাঠ  প্ল্যান বি ছকে ফেলি। ধূবেলা‌য় কালকেও কাটাতে হবে। অত‌এব এখন ছত্তরপুর গিয়ে বাসস্ট‍্যান্ডের কাছে কোনো বাজেট হোটেলে থেকে সকালে চলে আসবো। আধ ঘন্টার তো রাস্তা। তাতে সাকূল‍্যে খরচ হবে চারশোর কম।
     
       দ্রুত হেঁটে সোয়া পাঁচটায় দরগায় ফিরে পিঠে স‍্যাক তুলছি। চাচা বলেন, চলে যাচ্ছেন? এর মধ‍্যে‌ই দেখা হয়ে গেল ধূবেলা? হঠাৎ মাথায় বিদ্যুৎ চমকায়। শুধো‌ই, চাচা, পাঁচিলে‌র কোনে ঐ ঘরটা কিসের?  (লাল তীর)। চাচা বলেন, ওটা একটা স্টোর তৈরি হচ্ছে। বলি, একটু দেখতে পারি? দরজা খোলেন চাচা। মেঝে অসমাপ্ত, দেওয়ালে রঙ হয়নি। একটা‌ই জানলা। তাতে গ্ৰীল আছে পাল্লা নেই। লোহার দরজা। একপাশে ডাঁই করা কয়েক বস্তা সিমেন্ট, কোদাল, কড়াই, বালতি। বাকিটা খালি। চায়ের দোকানে প্রত‍্যাখ‍্যাত হয়ে জেদ চেপে গেছে। 
    বলি, চাচা, আজ রাতটা কি এখানে থাকতে পারি? এখানে!? কণ্ঠে বিষ্ময় ও জিজ্ঞাসা নিয়ে আকাশ থেকে পড়েন চাচা। বলি, কেন? কোনো অসুবিধা আছে? না… মানে … উবড়খাবড় মেঝে … চারপাই‌‌‌ও নেই। এখানে শোবেন কীভাবে? থতায় চাচা। বলি, চাচা, আমি এক ভবঘুরে মুসাফির। দিনক্ষণ ঠিক করে, হোটেল, গাড়ি বুকিং করে আরাম করে ঘুরি না। তাই একা বেরোই, কারুর সাথে পোষাবে না বলে। পাহাড়ি গুহায়, শীতে খোলা আকাশের নীচে প্লাসটিক শীটের তলায় রাত কাটিয়েছি। সে তুলনায় এ তো জন্নত। 
    আমার কথায় গভীর প্রত‍্যয় অনুভব করেও চাচা চিন্তিত মুখে বলেন, কিন্তু এখানে রাতে আজ অবধি কেউ থাকে নি। আমি‌ও একটু পরে মাজারে অগরবাত্তি লাগিয়ে চলে যাবো। এমন অনজান, বিরান জায়গায় সম্পূর্ণ একা থাকতে আপনার অস্বস্তি হবে না?  বলি, চাচা, ভুতে আমার বেজায় ভয় কিন্তু থাকবো তো সন্ত বলিউদ্দীনের দরগায়। এখানে আমায় ভুতে ভয় দেখাতে আসলে‌ও তাঁর পূণ‍্যাত্মা নিশ্চয় আমায় রক্ষা করবেন। তবে আসল ভয় তো মানুষকে। লোহার মজবুত দরজা ও জানলায় লোহার  গ্ৰীল থাকায় সে ভয়‌ অমূলক। তাছাড়া আমি যে এখানে আজ রাতে থাকবো তা তো আপনি ছাড়া আর কেউ জানবে না। তাহলে মনে ছাড়া ভয়টা আর কোথায়? 
       আমার বিশ্বাস, যুক্তি ও জেদের জোরালো ককটেলে চাচা একটু বিহ্বল হয়ে পড়েন। হয়তো পরদেশী‌র এহেন বাহাদুরি‌ দেখে চমকিত‌ও হন। তাই আর না করতে পারেন না সাধাসিধে চাচা। বরং কোত্থেকে একটা বড় ফাটা তেরপল এনে চার ভাঁজ করে বিছিয়ে দেন মেঝেতে। তাতে উঁচু‌নীচু মেঝে কিঞ্চিৎ মোলায়েম হয়। মাজারে ধূপ দিয়ে, হাঁটু মুড়ে চাচা আমার জন‍্য জোড়হাতে প্রার্থনা করেন, মেরে মালিক, ইয়ে পরদেশী রাহগীর আপকা শরণমে ইঁয়াহা আজকি রাত গুজারনা চাহতা হ‍্যায়। ইনহে সলামৎ রাখনা মেরে হুজুর। প্রার্থনা শেষে চাচা যখন তিনবার টেনে টেনে আল্লাহু আকবার (সর্বশক্তিমান, মঙ্গলময় আল্লাহ আপনার সহায়) বলে তালু ছোঁয়ান চোখে - গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে আমার। চলে যাওয়ার আগে সাবধান করে দেন চাচা, আভি মহল ঠিক নেহি হ‍্যায় বাবুজি, দের তক বাহার মত রহনা। অর্থাৎ করণের পিতার মতো চাচাও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল।
       সাড়ে পাঁচটা বাজে। দ্রুত পা চালাই প্রায় এক কিমি পূবে গ্ৰামের প্রান্তে এক টিলার মাথায়। ওখানে‌ও একটা ছোট্ট মন্দির রয়েছে দেখেছি। পাহাড়ের মাথায় কিছু একটা থাকলে যেন চুম্বকের মতো টানে আমায়। আর একটা আকর্ষণ ওখান থেকে পশ্চিমা‌কাশে অস্তগামী সূর্যের হাতছানি। ওখান থেকে দেখলাম এযাবৎ দেখা কয়েকটি মনে রাখার মতো সূর্যাস্তের একটা। ধূবেলা লেকের জলে লেগেছে সোনালী আগুন। পুবে ডাইনে বিশাল জগৎসাগর লেকের পারে কালো গম্বুজ‌ওয়ালা শনিমন্দিরটা অদ্ভূতদর্শন। দুরে নীচে এঁকেবেঁকে অলস অজগরের মতো শুয়ে আছে ছত্তরপুর ঝাঁসি সড়ক। তার একপাশে অনেকটা জায়গা নিয়ে তৈরি ধূবেলা রিসর্ট। আসন্ন সন্ধ্যায় তার বাগানে জ্বলে উঠেছে আলো। পাহাড়ের টঙে বসে সেই বিরাট চিত্রিত ক‍্যানভাস ছেড়ে নামতে ইচ্ছে করে না। 

      
     তবু একসময় নামতে‌ই হয়। না থাকলেও পায়ে পায়ে দেখতে যাই ধূবেলা রিসর্ট। ফাঁকা রিশেপসনে আলাপ হয় রিসর্টের মধ‍্য তিরিশের মালিক শৈলেন্দ্র কৌশিকের সাথে। কথাবার্তায় বুঝি বুন্দেলখন্ডের ইতিহাসের ওপর সম‍্যক জ্ঞান আছে তাঁর। সুন্দর এক কাপ বড় চা খাওয়ান। খুব প্রয়োজন ছিল। তবে পয়সা নেন না। রিসেপসনের টিভিতে বালাকোট সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে এ্যাঙ্করদের হাই ডেসিবেল দাপাদাপি দেখে বলি একটু আস্তে করলে আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতাম। তৎক্ষণাৎ টিভি বন্ধ করে বলেন, অনেকক্ষণ ধরে এইসব চলছে। আমার‌ও আর ভালো লাগছিল না, বলুন। বলি, নেটে পাওয়া তথ্য অনুসারে মস্তানি‌বাঈ নাকি ছত্রশালের রক্ষিতা ইরানি সুন্দরী রূহানী বাঈয়ের গর্ভজাত জারজ কণ‍্যা। এ কী সত‍্য? 
    শৈলেন্দ্র বলেন, হ‍্যাঁ এরকম একটা কাহিনী চালু আছে বটে তবে বুন্দেলখন্ডের মানুষ তা বিশ্বাস করে না।  মহারাজা ছত্রশাল ছিলেন এক প্রজাবৎসল, সচ্চরিত্র রাজা। আজীবন তিনি ছিলেন তাঁর একমাত্র পত্নী দেবকুমারী‌র প্রতি নিবেদিত। তাঁর নামে লেকের পারে কমলাপতি স্মৃতিসৌধ নিশ্চয়ই দেখেছেন। ছত্রশাল ছিলেন তাঁর গুরু প্রাণনাথের একনিষ্ঠ ভক্ত। এমন মানুষ ইরানি রক্ষিতা নিয়ে মাখামাখি করবেন, এ আমরা মানি না। গিয়ে দেখবেন মস্তানিমহলের সামনে সরকারি ফলকে লেখা, মস্তানিবাঈ নাকি ছিল ছত্রশালের রাজনর্তকী। হায়! ইতিহাস কী ভাবে বিকৃত হয়। মস্তানিবাঈ ছিলেন তরবারি চালনার সাথে নৃত‍্যকলাতেও পারদর্শী। কিন্তু সে তো ছিল মীরাবাইয়ের মতো ভক্তিরসে জারিত নৃত‍্য। কেবল পালকপিতা ছত্রশালকে‌ই তিনি নিবেদন করতেন তাঁর নৃত‍্যকলা। রিরংসাতাড়িত সভাসদদের মনোরঞ্জনের জন‍্য তিনি কখনো লাস‍্যময় নৃত‍্য প্রদর্শন  করেন নি।
       আটটা নাগাদ দরগাহ‌র অসমাপ্ত ভাঁড়ার ঘরে ঢুকে দরজায় হুড়কো টানি। বিজলি বাতি নেই। মোম জ্বালিয়ে ফাটা তেরপলের ওপর প্লাস্টিক, ম‍্যাট, চাদর বিছিয়ে বিছানা করি। জুগাড়ী মেথডে মশারী টাঙ্গাই। সাপ, ইঁদুর, আরশোলা, পোকামাকড় থেকে বাঁচতে এই সাবধানতা জরুরী। আশির দশকে কলকাতার একটি পাহাড়ি ক্লাবের সভ‍্য হয়েছিলাম। ক্লাব সদস্যদের সাথে একবার রাখা মাইনস স্টেশনে নেমে ওখান থেকে বারো কিমি জাঙ্গল ওয়াক করে রোয়াম হয়ে বাঁকাইকোচা গেছি‌লাম। গহীন জনহীন অরণ‍্য। প্লাস্টিক শীট দিয়ে সারভাইভাল শেলটার বানিয়ে খোলা আকাশের নীচে দু রাত ছিলাম। চাচাকে হাওয়ায় ফেকিনি। 
    তবে পাহাড়ি ক্লাবের বড় দলের সঙ্গে ছাড়া অমন জায়গায় একা তো প্রশ্ন‌ই আসে না, দু তিনজন মিলেও যেতে সাহস পেতাম না। কিন্তু ঐসব এলাকা নাকি ছিল একদা একাকী অরণ‍্যচারী বিভূতিভূষণের বিচরণক্ষেত্র। 
     
    সেবার ওখানে মশার কামড়ে দলের কয়েকজনের সেরিব্রাল ম‍্যালেরিয়া হয়েছিল। আমি অল্পে‌র ওপর দিয়ে বেঁচে যাই। কিন্তু এক দাদাকে আর জি কর হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। কয়েকদিনের জন‍্য কোমায় চলে গেছি‌লেন। ক্লাব সদস‍্য  ডঃ সূর্য শেখর ওখানে ছিলেন বলে বিশেষ যত্নে, চিকিৎসা‌য় বেঁচে ফেরে সে। সেই অভিজ্ঞতা ভুলি নি। একাকী ভ্রমণে কোথায় থাকবো ঠিক নেই বলে একটা একানে মশারী সাথে থাকে।
    মোম নিভিয়ে অন্ধকারে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে মোবাইলে তোলা ছবিগুলো দেখছিলাম। কী দরকার আলো জ্বালিয়ে বাইরের লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার। কিছুক্ষণ পর শুনি বাউন্ডারি ওয়ালের লোহার গেট খোলার মৃদু আ‌ওয়াজ। তারপর একটা পদশব্দ। এদিকেই আসছে। স্ক্রিন অফ করে অন্ধকারে খোলা জানলায় চোখ রাখি। একটি কালো মাথা বাইরে গরাদের কাছে এসে থামে। ভিতরে উঁকিঝুঁকি মারে। চাচা তো বললেন রাতে এখানে কেউ আসে না। তাহলে? কয়েক মুহূর্তে‌র জন‍্য বিকেলে চাচা‌কে প্রদর্শিত ঠুনকো সাহসের ভিত নড়ে যায়। সাসপেন্স ভাঙ্গে ছায়ামূর্তি‌টির আওয়াজে, আঙ্কল আপ ইধর হ‍্যায় ক‍্যায়া? মানে আগন্তুক জানে এখানে আঙ্কল গোছের কারুর থাকার কথা। কৌন? ছায়ামূর্তিটি বলে, আঙ্কল, ম‍্যায় আহাদ। আব্বাজান নে ভেজা আপকা খবর লেনে কে লিয়ে। 
    বাইরে এসে আহাদের সাথে হাত মেলাই। তার আব্বাজানের দায়িত্ব‌বোধের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হ‌ই। আহাদ বলে, আব্বাজান বললেন, এক পরদেশী ওখানে একা রয়েছেন, যা গিয়ে তোর ফোন নম্বর‌টা দিয়ে আয়। আপনি আমার নম্বর রাখুন। আমরা কাছেই গাঁ‌ওতে থাকি। কোনো অসুবিধা হলে ফোন করবেন। আমি তুরন্ত বাইকে চলে আসবো। তারপর একটু ইতস্তত করে বলে, এখানে আশপাশে কোনো খাবার হোটেল নেই, আমি ঘর থেকে আপনার জন‍্য কিছু খাবার আনতে পারতাম কিন্তু …। 
    বাক‍্যটা অসমাপ্ত রেখে চুপ করে যেতে বুঝি ও জানে আমি হিন্দু, ওদের বাড়ি‌র খাবার খাবো না। কিন্তু ও কী করে‌ জানবে এই পৈতেহীন কুলীন বামুনের ওসব ছুৎমার্গ নেই। একটু পজ নিয়ে আহাদ বলে, আঙ্কল, চলুন আমার সাথে বাইকে মৌ সাহানিয়া, মাত্র দু কিমি, ওখানে হোটেলে খেয়ে নেবেন কিছু, আমি অপেক্ষা করবো, খাওয়া‌র পর ছেড়ে দেবো এখানে। আহাদের পিঠ চাপড়ে বলি, তুমি যে আমার জন‍্য এতোটা ভাবছো, তাতেই বড় ভালো লাগলো। তবে তার দরকার হবে না। একা বেড়াই তো, এমন পরিস্থিতি‌র জন‍্য আমার কাছে সবসময় যা শুকনো খাবার থাকে তাতে এক দুদিন দিব‍্যি কাটিয়ে দিতে পারি। এতো একটা রাতের ব‍্যাপার। তুমি এসো, চাচাকে আমার ধন‍্যবাদ জানি‌ও। 
    একটু পরে মুড়ি, ছোলা‌ বাদাম ভাজা, খেজুর, কাজু, শোনপাঁপড়ি দিয়ে হালকা ডিনার করি। হাই‌ওয়ের ধারে ফাঁকা জায়গা। পাল্লাহীন খোলা জানলা দিয়ে ফুরফুর করে বেশ ঠান্ডা হাওয়া আসছে। গরাদে দুটো সিমেন্টের ব‍্যাগ গুঁজতে  কিছুটা ম‍্যানেজ হয়। মশারী টাঙাতে এদিকে জানলার গরাদ কাজে আসে। ওদিকে বেবাক খালি দেওয়াল। কী করি? তাকের একদিকে রঙের ডাব্বা অন‍্য দিকে বালতি উপুড় করে রাখি। ইঁট চড়িয়ে ওজন বাড়াই। অতঃপর ডাব্বা ও বালতির হ‍্যান্ডেলে মশারীর দড়ি বাঁধি। সুন্দর সটান মশারী টাঙানো হয়ে যায়।
    এসব হচ্ছে অতীতে শৈলারোহণ কোর্সে সারভাইভাল, ইমপ্রোভাইজেশন নিয়ে পাহাড়ি দাদাদের কথায় দানা বাঁধা আত্মবিশ্বাসের ফল - The situation where I have to stay on the way in this kind of hobo style solo trip, may not be always ideal -  I just need to make it workable for me. 
    সেই সকালে টিকমগড় থেকে বেরিয়েছি। দুবারে সাড়ে তিন ঘন্টার বাস যাত্রা, নয় কিমি হাঁটা, দুদিকের পাহাড়ে ওঠা নামা - বয়স তো সাড়ে আটান্ন হতে চললো, শরীরের আর দোষ কী। ক্লান্ত লাগছে। তবে তাতে ভালো‌ই হয়। জমাট এক ঘুমে রাত কাবার। ভীতু‌র ডিম আমার কাছে ভুতের ভয় ঘেঁষতেই পারে নি রাতে‌। 
       বুন্দেলখন্ডের অনেক এলাকায় তখন‌ও নিদারুণ দারিদ্র্য। প্রত‍্যন্ত গ্ৰামে বাড়িতে মেয়েরা এক কাপড়ে থাকে। সায়া ব্লাউজ জোটে না। গ্ৰামবাসীরা পেটের দায়ে শহরে চলে যাচ্ছে রোজগারের আশায়। তখনও ওখানে চা, পোহা, জিলিপি পাঁচ টাকায় পাওয়া যেতো। অনেকদিন‌‌ আমি প্রাতরাশ সেরেছি পনেরো টাকায়। গতকাল কমলাপতি সৌধে ASI ঠিকে গার্ডকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি, ওর মাইনে তিন হাজার। বিশ টাকা বখশিস দিতে তার মুখে চোখে কৃতজ্ঞতার ঝলক নজর এড়ায় নি। বলেও ফেললো, আপনাদের মতো যারা দুর থেকে আসেন, তারাই কিছু বখশিশ দেয়। স্থানীয়‌রা তো আসে হৈ হট্টগোল করতে, দেওয়া‌লে নাম লিখতে, পড়েশান করে রাখে। 
    পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দরগা পরিসর ঘুরে দেখলাম। সন্ত বলীউদ্দিনের মূল মাজার ছাড়াও পরিসরে আরো অনেক‌গুলি সমাধি পাথর রয়েছে‌। 

    সন্ত বলীউদ্দিনের মাজার
    একটু পরে সাতটা নাগাদ এসে হাজির চাচা। বলি, কী হোলো, এতো তাড়াতাড়ি? কাল তো বললেন, আটটা নাগাদ আসেন? চাচা বলেন, বাবুজী, কাল ঘরে চারপাইতে গদ্দায় শুয়ে আপনার কথা ভেবে খুব খারাপ লাগছিল। শুতে কষ্ট হয়েছে না? ঠান্ডা লেগেছে না? অচেনা মানুষের এমন অকৃত্রিম উদ্বেগ, মমতা স্পর্শ করে। বলি, কোনো কষ্ট হয় নি। এই দেখুন না মশারী খাটিয়ে কেমন আরামে ঘুমিয়েছি। 


    আমার মশারী খাটানোর কায়দা দেখে চাচা বলেন, ভালো‌ আইডিয়া লাগিয়েছে‌ন তো! কথার মাঝে একশোটা টাকা বার করে চাচার বুকপকেটে গুঁজে দি‌ই। দরগার চাকরিতে চাচা‌ও হয়তো হাজার দুয়েকের বেশি পান বলে মনে হয় না। তাই অসম্পূর্ণ গুদামের অসমান মেঝেতে শুয়ে আমি যে একশো টাকা বখশিস দেবো চাচা হয়তো স্বপ্নে‌ও ভাবেন নি। বিহ্বল হয়ে বলেন, আমি কিন্তু পয়সার আশা করে আপনাকে থাকতে  দিই নি। বলি, তা আমি জানি। মনে ভাবি, আপনি থাকার কারণ জানতে চাননি, আধার কার্ড দেখতে চাওয়া তো দুর আমার নাম, মোবাইল নম্বর অবধি জানতে চাননি - স্রেফ মুখ দেখে এক সম্পূর্ণ অজ্ঞাতপরিচয় বিধর্মী মুসাফির‌কে নিঃসংকোচে বিশ্বাস করেছেন - এসবের পয়সায় তোলমোল হয়‌ না। বলি, আমি খুশি হয়ে দিলাম চাচা, চা নাস্তা করবেন। 
       হঠাৎ গভীর আবেগে আমায় দুহাতে জড়িয়ে ধরে ক্ষীণকায় মানুষ‌টি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বিড়বিড় করতে থাকেন - ইয়ে আল্লাহ, ইনসানিয়ৎকি কদর করনে ওয়ালে এ রাহগীর, দুনিয়া‌মে জাঁহাভি রহে, ইসে হর বলা, হর মুসিবৎসে সে বচাকে রাখনা মেরে মৌলানা...। চাচা‌র আবেগ আমাতে সংক্রামিত হয়। চোখ ভিজে আসে। চাচার চড়ুই‌পাখির মতো শীর্ণ শরীরটা চাপা কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে।  চাচাকে জড়িয়ে ধরে পিঠে নিঃশব্দে চলে বেড়ায় আমার সমর্পিত হাত। মনে হয় বেড়াতে গিয়ে মনোরম ঐতিহাসিক স্থান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হ‌ওয়া অবশ্যই আনন্দ‌দায়ক তবে এহেন সব অনমোল মানবিক অভিজ্ঞতা‌‌‌ই আমার কাছে একাকী ভ্রমণের আসল প্রাপ্তি‌। পর্যটক‌রা খাজুরাহো এলে দেখতে যান পান্নার হীরের খনি। ২০১৭তে খাজুরাহো গিয়ে‌ আমি হীরের খনি দেখতে যাই নি। ওসবে আমার কোনো আগ্ৰহ‌ই নেই। এবার তো ধূবেলা‌তে‌ই দেখা হয়ে গেল অনমোল হীরা।

       কাল ৯ কিমি হেঁটে অনেক সময় লেগেছে। আজ চাচা নিজে থেকেই বলেন, আমার সাইকেল নিয়ে যান, তাহলে সময় বাঁচবে। প্রথমে গেলাম চায়ের দোকানে। সাতসকালে আমায় দেখে করণের পিতা অবাক।  জানতে চান, কাল রাতে কোথায় ছিলাম। সব শুনে ম্লান হয়ে যায় মুখটা। বুঝি কাঁটা‌টা কোথায়  বিঁধলো। প্রসঙ্গান্তরে যাই। দু কাপ চা ও এক প‍্যাকেট পার্লে জি বিস্কুট দিয়ে হালকা প্রাতরাশ সেরে সাইকেল ওনার দোকানে রেখে গেলাম পাহাড় টঙে গৌরিয়া মাতার মন্দির। 
    সকালের আলোয় পাখির চোখে ধুবেলা লেক ও চারপাশের দৃশ‍্য যেন এইচডি ওয়ালপেপার। জনহীন মন্দিরের চাতালে গিয়ে বসি। কতো দূর অবধি দেখা যাচ্ছে। দুরে নীচে কোথাও থেকে ভেসে আসছে মাইকে সুরেলা সুফি ভজন। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। নির্জন মন্দিরে কিছুক্ষণ বসে শুনি। মন জুড়ি‌য়ে যায়। মনেই হয় না এখানে বসে আমার শোনা উচিত জয় হনুমান জ্ঞান গুণ সাগর বা  ওম নমোঃ শিবায় ভজন। ভাবাবেগে কাঁটাতারের বেড়া খাড়া করা অসম্ভব। যা ভালো লাগার, তা লাগবেই। যেমন লেগেছিল ২০১০এ মহরমের দিন হায়দ্রাবাদে। কুতব সাহি সমাধি চত্বরে একটি সমাধি সৌধের অভ‍্যন্তরে ঢুকে আমার অনুরোধে মুখ উঁচু করে নামাজের আজান  দিয়েছিলেন মুসলিম গাইড। সেই প্রতিধ্বনি‌ত আজান শুনে আবেগে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল।

    গৌরিয়া মাতা মন্দির। 
    নামার পথে দেখলাম মহারাজার জ‍্যেষ্ঠ‍্যপূত্রে হৃদয়শাহর মহল। অনেকাংশে‌ এখন ভগ্ন। তবু যা টিকে আছে তাও বেশ সুন্দর।

    হৃদয়শাহ মহল - সম্মুখভাগ

    হৃদয়শাহ মহল - অন্তরমহল 
     অতীতে মহারাজা‌র প‍্যালেস‌ই এখন হয়েছে মিউজিয়াম। তার পাশে‌ই মস্তানিমহল। ছত্রশালের সৈন‍্যবাহিনীর সাথে এক যুদ্ধে সপরিবারে মৃত‍্যু হয় এক মুসলিম জায়গীরদারের। ঘরের কোনে ভয়ে সিঁটিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো একটি শিশু কন‍্যা। দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছত্রশালের বুক মুচড়ে ওঠে। বুকে জড়িয়ে ধরে ফুটফুটে শিশু‌টিকে নিজের প্রাসাদে নিয়ে এসে কন‍্যাসম আদরে প্রতিপালন করতে লাগলেন তাকে। কৃষ্ণ প্রণামী সম্প্রদায়ের গুরু প্রাণনাথের একনিষ্ঠ শিষ্য মহারাজা ছত্রশালের জাত পাত ধর্মের ভেদ ভাব ছিল না। তাই মেয়েটিকে ধর্মান্তরিত না করে এক মুসলিম কন‍্যা হিসেবে‌ই লালন করেন। শেখান ঘোড়ায় চড়া, অসি চালনা, নৃত‍্যকলা। সেই শিশু কন‍্যাটি‌ই অপূর্ব সুন্দরী মস্তানি বা‌ঈ। নিজের মহলের পাশে পালিতা কন‍্যা‌র জন‍্য বানিয়ে দেন ছিমছাম মস্তানিমহল। ১৭ বছর বয়সে বাজীরাও‌কে বিয়ে করে পূণে চলে যাওয়া ইস্তক মস্তানি‌ এখানে‌ই ছিলেন।

    মস্তানি মহল - সম্মুখভাগ

    মস্তানি মহল - অন্তরমহল
      পাহাড় থেকে নেমে কিছুটা গিয়ে তিন্দনি দরোয়াজা পেরিয়ে গেলাম ভীমকুন্ড। জঙ্গলে‌র মধ‍্যে চারটি মহাভারত‌কালীন মন্দির, একটি স্টেপ ওয়েল। একদম জনহীন, নির্জন জায়গা। 

    সেখান থেকে কালকের পথে কিছুটা গিয়ে সোজা উঠলাম মাহেবা গেট। বেশ বড়। রাজকীয় বিশালতা, ঐশ্বর্য‌ময়। ১৬৭৮এ মাহেবা থেকে মৌ সাহানিয়া যাওয়ার রাস্তায় তৈরি। 

    গেটে থেকে একটু দুরে শীতলগড়ী। অতীতে ছত্রশালের নাতি কিরাত সিংহের বাসস্থান। অক্ষত দ্বিতল ভবনটির অবস্থান অনবদ‍্য। ওখান থেকে বাঁদিকে পাহাড়ের শিরে কালকে দেখা সিদ্ধবাবা মন্দির, বাদলমহল, ডানদিকে ধূবেলা লেক, দূরে পাহাড়ের মাথায় গৌরিয়া মাতা মন্দির (লাল তীর), যেখানে একটু আগে গেছি‌লাম, ছবির মতো লাগছে। কাছে সাদা কৃষ্ণ প্রণামী মন্দির। (সবুজ তীর)


    ১৭৩১ সালে ৮১ বছর বয়সে এইখানে রাজবেশ ও তরবারি মাটিতে রেখে, প্রিয় ঘোড়া ভলেভাইকে একটা গাছে বেঁধে, গুরুধ‍্যান করে মহারাজা ছত্রশাল অন্তর্ধান করেন। 

    তার প্রভু তাকে স্বেচ্ছায় ছেড়ে গেছে উপলব্ধি করে অনতিবিলম্বে ভলেভাই‌ও প্রাণত‍্যাগ করে। বহু খোঁজাখুঁজি করেও মহারাজের নশ্বর দেহ পাওয়া যায়নি। দু বছর পর হৃদয়শাহ এইখানে তাঁর পিতার গুরুদেব প্রাণনাথজীর স্মৃতি‌তে এই মন্দির নির্মাণ করে কুলপুরোহিত বদ্রীদাসজীকে নিয়োগ করেন নিত‍্যপূজায়‌। আজ‌ও তাঁর‌ই বংশধর এই মন্দিরের পূজারী। 

    কৃষ্ণ প্রণামী মন্দির
      অন্তর্ধানের তিন বছর আগে ১৭২৮ সালে এলাহাবাদের মোগল শাসক পাঠান বাঙ্গাশ খান বিরাট বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করতে আসে আজীবন মোগলবিরোধী ছত্রশালের রাজ‍্য পান্না। ৭৮ বছর বয়সে মহারাজ‌কে শেষবারের মতো ধরতে হয় তরবারি। সঙ্গী বহু যুদ্ধের বিশ্বস্ত সাথী ভলেভাই। অসম যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত বুঝে ছত্রশাল সাহায্য চান প্রথম বাজীরাও পেশোয়া‌র কাছে। 
    শিবাজী‌র পর মোগলবিরোধী মারাঠা সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ এই পেশোয়া দ্রুত সাড়া দেন। দুজনের মিলিত প্রতিআক্রমণে বাঙ্গাশ খান রণে ভঙ্গ দেয়। 
     
    সেই সময় বাজীরা‌ও কিছুদিন ছিলেন ধূবেলায়। তখন ২৮ বছরের ত‍রতাজা যুবক ইতোমধ্যেই আট বছর বিবাহিত। প্রথম পত্নী কাশিবাঈ আছেন পূণেতে। তবু সতেরোর সদ‍্য প্রস্ফুটিত মস্তানি‌র সুহানী হসীন সাহচর্যে মোহিত হয়ে গেলেন বাজী রাও। ছত্রশাল বুঝলেন এসব বয়সের অমোঘ ধর্ম। এদিকে তাঁর‌ও অনেক বয়স হয়েছে। মস্তানি‌র জন‍্য চিন্তা হয়। কৃতজ্ঞ মহারাজা তাঁর রাজ‍্যের এক তৃতীয়াংশ ও পালিতা কন‍্যা মস্তানির হাত তুলে দিলেন বাজীরাওয়ের হাতে। এক্ষেত্রে মুসলিম কন‍্যা বলে বাজীরাওয়ের কোনো দ্বিধা ছিল না। কিছু হৃদয়াবেগের কাছে ধর্মীয় অনুশাসন‌ও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। 
     
    তবে বিয়ে করে মস্তানি‌কে পূণে নিয়ে যেতে তখনকার কট্টর ব্রাহ্মণ পুরোহিত‌সমাজের অসহযোগিতা বাজী‌রা‌ওয়ের মতো দুর্ধর্ষ যোদ্ধা‌ও সামাল দিতে পারলেন না।  মস্তানি‌কে রাখতে হোলো আলাদা। বলিউড সিনেমার দৌলতে বাজীরা‌ও চরিত্রে রণবীর সিং ও মস্তানি‌র চরিত্রে দীপিকার মুচমুচে আখ‍্যান এখন সবার জানা। 
    ছত্রশালের সাথে বাজীরাওয়ের সম্পর্ক ছিল পিতা পুত্রের মতো। ছত্রশালের ধূবেলা‌র অরণ‍্যে স্বেচ্ছা অন্তর্ধানের পাঁচ বছর প‍রেও যখন তাঁর কোনো হদিস, দেহাবশেষ কিছুই পাওয়া গেল না, তিনি মৃত ধরে নিয়ে বাজীরাও কৃষ্ণ মন্দিরের পাশে ১৭৩৬ সালে ছত্রশালের বিশাল স্মৃতি‌সৌধটি নির্মাণ ক‍রান।  দ্বাদশ বাহুবিশিষ্ট ত্রিতল সৌধের শিরে একটি বিশাল গম্বুজ। বাইরে বারোটো অষ্টভূজাকার মিনার। বুন্দেলা শৈলীর এক ভব‍্য নিদর্শন এই সৌধ‍্যটি। প্রাঙ্গনে‌র এক পাশে‌ তৈরী হলো ভলেভাইয়ের ছোট্ট স্মৃতি‌সৌধ। (লাল তীর) মহারাজের আমৃত্যু বিশ্বস্ত সঙ্গীর স্মৃতি সৌধে‌র উপযুক্ত স্থান। আমি  যখন গেছি‌লাম, তখন তাতে চলছিল মেরামতি।


    মহারাজা ছত্রশাল স্মৃতিসৌধ

    মহারাজা ছত্রশাল স্মৃতি‌সৌধ (নীল তীর) থেকে ভলেভাই সমাধি (হলুদ তীর), সিদ্ধবাবা মন্দির (লাল তীর) এবং বাদলমহল (সবুজ তীর)
      ছত্রশাল স্মৃতিসৌধ দেখে মাহেবা তিরাহাতে (তেমাথা) ছত্তরপুর ঝাঁসি হাইওয়েতে উঠলাম। নৌগাঁওয়ের দিকে দু কিমি গিয়ে ডানদিকে পড়লো গতকাল বিকেলে পাহাড়ের ওপর থেকে দেখা বিশাল জগৎসাগর হ্রদ। তার কিনারে শনি মন্দিরের কালো গম্বুজ এখন দিনের আলোয় ঝকমক ক‍রছে। এটি‌‌ও প্রাচীন। বানিয়ে‌ছিলেন মহারাজা ছত্রশাল ও তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র জগৎরাজ। তার নামেই জগৎসাগর লেক।

    জগৎসাগর লেক

    প্রাচীন শনিমন্দির - হালে রূপ ফেরানো হয়েছে


    হাইওয়ের পাশে বেশ বড় মহারাজা ছত্রশাল খেল ময়দান - স্মৃতি‌বেদীতে ভলেভাই পৃষ্ঠে মহারাজ। সিমেন্টের গোলাপি মঞ্চের মাঝে হলুদ প্রেক্ষাপটে লেখা - বুন্দেলখণ্ড কী লাল - ঘর ঘর ছত্রশাল

         বেলা একটা নাগাদ ফিরে এলাম দরগাহ। আজ চাচার সাইকেলের দৌলতে ১২ কিমি‌ পথে হাঁটার সময় বাঁচতে সব কিছু  বেশ আয়েশ করে দেখা হলো। চাচাকে সেলাম করে চলে আসছি - চাচা বললেন, একটু দাঁড়ান। নির্বিঘ্নে ভ্রমণ সম্পন্ন করে সুস্থ শরীরে বাড়ি ফেরার জন‍্য উনি আমার জন‍্য মাজারের সামনে দাঁড়িয়ে সন্ত বলীউদ্দিনের দোয়া মাঙলেন। আমি ভিডিও নিলাম। সেটাও থাকলো এখানে। এই সব ভ্রমণস্মৃতি আমৃত্যু সঙ্গী হয়ে থাকবে। ধূবেলা আমার প্রত‍্যাশাকে ছাপিয়ে গেছে। আকণ্ঠ ভ্রমণতৃপ্তি নিয়ে এগোলাম পরবর্তী গন্তব্যের পথে - এক নির্জন পাহাড়ি জৈনতীর্থে।  সেখানে‌ও তৃপ্ত হয়েছিল আমার ভ্রমণতৃষ্ণা। সে বৃত্তান্ত পরে কখনো আসতেও পারে।

    (লেখাটি ২০১৯এর ডিসেম্বরে একবিংশ‌তিতম বার্ষিক 'ভ্রমণ আড্ডা' পত্রিকা‌য় প্রকাশিত হয়েছিল। হার্ড কপি পত্রিকার পৃষ্ঠা‌ সংখ্যা‌র সীমাবদ্ধ‌তায় লেখাটি সেখানে ছিল ২৫০০ শব্দের। ছবি‌ও ছিল‌না। গুরুচণ্ডা৯তে স্থানে‌র সীমাবদ্ধ‌তা না থাকায় মন খুলে লিখে তৃপ্তি পেলাম। শব্দ সংখ্যা দাঁড়ালো ৪২০০ - লো রেজোলিউশন রাখায় ৩৭টি ছবি সহ লেখাটির pdf হয়েছে মাত্র 6.2 MB)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ভ্রমণ | ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ৬৪১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • দীপাঞ্জন মুখোপাধ্যায় | ১৯ অক্টোবর ২০২৩ ১২:১১524774
  • এই চলার পথের বাইরে [অফবিট] ভ্রমণে ধূবেলা বেশ অন্যরকম লাগল। দরগায় রাত কাটানোটা এডভেঞ্চারাস। 
  • ইন্দ্রাণী | ১৯ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:৫৮524783
  • "হঠাৎ গভীর আবেগে আমায় দুহাতে জড়িয়ে ধরে ক্ষীণকায় মানুষ‌টি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বিড়বিড় করতে থাকেন - ইয়ে আল্লাহ, ইনসানিয়ৎকি কদর করনে ওয়ালে এ রাহগীর, দুনিয়া‌মে জাঁহাভি রহে, ইসে হর বলা, হর মুসিবৎসে সে বচাকে রাখনা মেরে মৌলানা...। চাচা‌র আবেগ আমাতে সংক্রামিত হয়।"

    পাঠকের অন্তরেও এই আবেগ সঞ্চার হয় অনায়াসে। মন ভরে গেল। বিশেষ করে এই যে দিবারাত্র লড়াই ঝগড়া, কুৎসিৎ গালিগালাজ চলছে তো চলছেই - কোনোদিন থামবে বলে মনেই হয় না যখন , সেই সময় এমন একটি ভ্রমণকথা বড় শান্তি দিল।
    উৎসবের প্রাক্কালে খুব বড় উপহার দিলেন আপনি।
  • সমরেশ মুখার্জী | ১৯ অক্টোবর ২০২৩ ১৬:৫১524785
  • @ দীপাঞ্জন, অরুন্ধতী,

    পাঠানুভব ব‍্যক্ত করার জন‍্য ধন‍্যবাদ। সঙ্গে থাকবেন। ক্রমশ এই সিরিজে আসবে এমন নানা স্বল্প পরিচিত জায়গায় কথা। কিছু সুন্দর মানুষের কথা। এতোদিন খালি ঘুরেছি। লিখেছি কম। এখন মনে হয় অমন কিছু অভিজ্ঞতা, ছবি আরো পাঁচজনের সাথে শেয়ার করার মতো। তাই লিখবো।

    নির্জনতাপ্রিয় ভ্রামণিকের জন‍্য সর্বাঙ্গে মহারাজা ছত্রশালের স্মৃতি‌বিজরিত ধূবেলা একটি মাণিক‍্য বিশেষ। ঐ ভ্রমণে আরো অনেক কিছুর সাথে আমার কাছে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য লেগেছে - পাহাড় টঙে সিদ্ধবাবা মন্দির হাইকিংয়ের  মনোরম অভিজ্ঞতা - একদম সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। 

    আর অমূল‍্য প্রাপ্তি চাচার দোয়া। 

    একটা মজার কথা উল্লেখ করতে ভুলে গেছি। পরদিন সকালে করণের চায়ের দোকানে গিয়ে মিউজিয়ামের কাছে দেখি স্থানীয় কয়েকটি কিশোরী দলবেঁধে এসেছে। মস্তানি‌বাঈ মহল দেখে একটি মেয়ে অবাক হয়ে বলে - তো ইঁয়াহা রহতি থি দীপিকা? আমি প্রথমে ভেবেছিলাম মস্করা করছে বোধহয়। তার‌পর দেখি সহজ সরল গ্ৰামের মেয়ে, বোকাসোকা মুখভাব। শহুরে মস্করা করার মতো হাবভাব‌ই নয় ওর। ঠিক তাই। অন‍্য একটি অপেক্ষা‌কৃত চৌখশ মেয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে বলে - দুর, পাগলি, ও তো পিকচার থি, ইঁয়াহা পে অসলি মস্তানি‌বাঈ রহতি থি, ও ভী বহুউউত সাল পহলে। প্রথম মেয়েটি বাস্তবিক অবাক হয়ে বলে - অচ্ছাআআআ!

    @ ইন্দ্রানী,

    আপনি আমার ধূবেলা ভ্রমণ অভিজ্ঞতার বুলস আইতে হিট করেছেন। আজ‌ও আমার জন‍্য চাচা‌র দোয়া‌ মাঙার ঐ ভিডিও‌টি দেখলে চোখ ভিজে আসে। আর এক জায়গার প্রসঙ্গে লেখায় আসবে - প্রাক্তন ফৌজী হাফিজ‌ভাইয়ের কথা। ব‍্যক্তিগতস্তরে এখনো মানুষের শুভবুদ্ধি হারিয়ে যায় নি - তবে মব সাইকোলজি‌র প্রভাবজনিত আচরণ কখনো তা ভুলিয়ে দেয়। এটা খুব দুঃখজনক।

    সামূদায়িক স্তরে চতুর্দিকে যা হয়ে চলেছে দেখে মন বিষন্ন হয়ে যায়। এই গুরুতেও নিয়ত কিছু বিশেষ ধরণের লেখা‌র ওপর কর্কশ, কুৎসিত, বিষাক্ত মন্তব্য দেখে এখন ও ধরনের লেখার শিরোনাম দেখলে খুলেও দেখি না। মুড অফ হয়ে যায়। অথচ ঐ ধরণের লেখা‌র পঠিত সংখ‍্যা নিমেষে পাঁচশো হাজার পেরিয়ে যায়। 
  • Ranjan Roy | ১৯ অক্টোবর ২০২৩ ১৯:৪৭524794
  • কী আর বলব! আপনার জন্য রইল উষ্ণ  আলিঙ্গন। 
    ইন্দ্রাণীর বক্তব্যটি আমারও। 
     
    ১৯৮০-৮১ সাল। তখন ছত্তিশগড়  অঞ্চলকে দক্ষিণ পূর্ব  মধ্যপ্রদেশ বা দক্ষিণ কোশল ধরা হত। সদ্য গড়ে ওঠা রিজিওনাল রুরাল ব্যাংক বা গ্রামীণ ব্যাংকে চাকরি। ইউনিয়ন ফর্ম করছি। লোকজন ভয় পাচ্ছে। ট্যুর করছি গোটা মধ্য প্রদেশের  ছয়টা জেলা, যেখানে গ্রামীণ ব্যাংক খুলেছে। সেবার  মধ্যপ্রদেশের স্টেট ফেডারেশনের সেক্রেটারি নির্বাচিত হল  টিকমগড় -ছতরপুর ব্যাংকের ডি আর বিজয়।
      ওর  ইয়েজদি মোটর সাইকেলের পেছনে বসে ঘরে বেড়াই বুন্দেলখণ্ডের  বিভিন্ন এলাকা। যাই খাজুরাহো--পাশেই ওদের বমিঠা ব্রাঞ্চ। তারপর  ও আমাকে রাত্তিরে শুয়ে শোনায় রাজা ছত্রসালের কাহিনী। ওর সঙ্গে ঘুরে দেখা হয় ছত্রসালের আরাধ্য দেবতার মন্দির। মস্তানী এবং রাণী কমলাপতির প্রাসাদ। মাজার দেখা হয় নি। 
      তখন বয়েস মাত্র তিরিশ-- ভোজনং যত্র তত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে। 
    পকেটে পয়সা নেই তো কী হয়েছে। বিশ্বাস করতাম-- ঘুরে বেড়াতে বেশি পয়সা লাগে না; চাই বড় কলজে এবং দেখার চোখ। সেটা আপনার মধ্যে আঠেরো আনা আছে দেখছি।
    আজ সেসব স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে। তবু আপনার লেখায় বুন্দেলখণ্ডের মাটির ঘ্রাণ পেলাম। 
    এখন ভোপালের হাবিবগঞ্জ স্টেশনের বিশাল পুনর্নিমাণের পর নাম হয়েছে রাণী কমলাপতি জংশন। 
  • সমরেশ মুখার্জী | ১৯ অক্টোবর ২০২৩ ২২:১৩524812
  • হাবিবগঞ্জ যে 'রাণী কমলাপতি জংশন' নাম হয়েছে জানতাম না। ঝাঁসি স্টেশনে‌র নাম বদল হয়ে যে 'বীরাঙ্গনা রাণী লক্ষ্মী‌বাঈ জংশন' হয়েছে - সেটাও হালে জানলাম।
  • reeta bandyopadhyay | ২২ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:৩১524996
  • মনে ভরে গেল ।
  • শিবাংশু | ২৭ অক্টোবর ২০২৩ ২৩:৩৫525247
  • পড়ছি, 
    যে বিষাক্ত সময়ের উদ্বেগ সবার বোধে ছায়া ফেলছে, বিশ্বাস করি তা সাময়িক। ভারতবর্ষ য়ুরোপ নয়। নেশনতত্ত্বের বিষে জর্জরিত ইতিহাস বহন করে বেড়ায় তারা। হীরেনস্যারের লেখায় তার ইশারাগুলি আমাদের সতত সাবধান করে। এদেশের মেজাজটা য়ুরোপিয় নেশনতত্ত্বের বিপরীত। ভারতবর্ষ একটি বিস্ময়। একটা দুটো শয়তান তার আত্মাকে বিনাশ করতে পারে না। 
  • kaktarua | 192.82.150.103 | ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ০০:৫৮526757
  • বড় ভালো লাগলো পড়তে !
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন