এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  অর্থনীতি

  • অর্থনীতি ও নোবেল পুরস্কার ​​​​​​২০২২ পর্ব ৮ 

    হীরেন সিংহরায় লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | অর্থনীতি | ০২ ডিসেম্বর ২০২২ | ৪০৩ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  •  অর্থনীতি ও নোবেল পুরস্কার ​​​​​​২০২২ 
    পর্ব ৮ 
     
    বেড়ালটা খুশি হয়ে বলল হ্যাঁ এ তো বোঝাই যাচ্ছে – চন্দ্রবিন্দুর চ , বেড়ালের তালব্য শ আর রুমালের মা -হল চশমা কেমন হল তো ? আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না কিন্তু পাছে বেড়ালটা হেসে ওঠে তাই সঙ্গে সঙ্গে হুঁ হুঁ করে গেলাম****
     
    হযবরল
    সুকুমার রায় 
     
     
    জুলাই আগস্ট কর্ম বিরতির কাল । অর্ধেক ইউরোপ ছুটি কাটাতে বাকি ইউরোপে সাময়িক আস্তানা গাড়ে।  প্যারিসের পথে বিনামূল্যে গাড়ি পার্ক করা সম্ভব , কিন্তু চুল কাটার নাপিত মেলা শক্ত।
     
    ডেবিট ক্রেডিট, দুনিয়ার আর্থিক কচকচি ভুলে দু সপ্তাহের ছুটির প্রথম দিনটি কাটাতে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের গভর্নর মারভিন কিং তাঁর অতি প্রিয় লরডস ক্রিকেট মাঠে  উপস্থিত হয়েছেন। পাশে প্রাক্তন ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল অ্যাথারটন। সামনে সবুজ গালচেয় তেরো জন সাদা ফ্লানেল পরা মানুষ। এই তো সুদিন,  এই রকমই দিন ।
     
    শান্তি বিঘ্নিত করে ফোন বাজলো ।
     
    এম সি সি প্যাভিলিয়নে মোবাইল অনুমোদিত ছিল  না ( আমি তার ভুক্তভোগী) , তবে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের গভর্নরের হাত থেকে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার হিম্মত দ্বার রক্ষীর নেই । খোদ ব্রিটিশ পাউনডের নোটে এই ভদ্রলোকের সই থাকে।
     
    ফরাসি ব্যাঙ্ক বি এন পি ( বাঁক নাসিওনাল দু পারি ) তাদের আপন হেজ ফান্ড  থেকে টাকা জমা বা তোলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।  এই ফান্ডে ঝুঁকি হয়তো একটু বেশি তবে সেখানে খদ্দের টাকা জমা রাখে, বি এন পির ধুরন্ধর ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজাররা  সেটি খাটিয়ে ভালো আয়ের ব্যবস্থা করবে এই আশায়।  আজ তারা বলেছে আমেরিকান মর্টগেজ বাজারের অনিশ্চয়তা , বিশেষ করে কমজোরি,  স্বল্প সামর্থ্যের মানুষদের দেওয়া  ঋণ ( সাব প্রাইম মর্টগেজ ) ও তা থেকে প্রসূত নানান বিচিত্র প্রকৃতির ঋণের সমষ্টি দিয়ে তৈরি সি ডি ওর  (কোলাটারালাইজড ডেট  অবলিগেশন ) কেনা বেচার সঠিক দাম কী হতে পারে সেটা কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না । মোদ্দা কথা বি এন পি বললে আমরা  যে ধন সম্পত্তির কাগজ হাতে ধরে বসে আছি তার বাজার দর কি সেটাই যদি না জানি তাহলে আমাদের ফান্ডে  যারা টাকা রেখেছে তাদের লগ্নির মূল্যের প্রাত্যহিক , সাপ্তাহিক হিসেব কেমন করে দেব ? তাই আপাতত আমরা কোন লগ্নিকারকের টাকা জমা নেবো না আর যা জমা আছে তা তুলতেও দেবো না ।  
     
    মারভিন কিং বলতেই পারতেন ফরাসিরা কিসুই বোঝে না । চিলে কান নিয়ে গেছে শুনেই চিলের পেছনে দৌড়য় । হাতে পিমসের গ্লাস নিয়ে আমি এখন বরং পরবর্তী ওভারটি  দেখায় মন দিই ।
     
    বলতে পারলেন না। আলুওলার কাছে যেমন আলু , ব্যাঙ্কের কাছে তেমনি অর্থ -সেটা  তার ধমনিতে দৌড়োয়  । কোনো  কারণে তার স্রোত বন্ধ হলে অথবা ঢিমে তালে বইলে দেহ যন্ত্রটি থেমে যেতে পারে। আজ এক ফরাসি  ব্যাঙ্কের ঘরে টাকার টানাটানি পড়েছে শুনেই বাকি  ইউরোপীয় ব্যাঙ্ক মুক্ত কচ্ছ হয়ে আপন ভাঁড়ারে কুলুপ লাগানোর কাজে ব্যস্ত হলেন । আমার যা টাকা আছে তা সিন্ধুকেই থাক কাউকে ধার দিয়ে অতিরিক্ত দু পয়সা আয় করে আর কাজ  নেই।  ব্যাপার গুরুতর ।
     
    ফলং -  মড়ক
     
    সব ব্যাঙ্কের দুয়োরে ধার নেওয়ার জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে মানুষ , কিন্তু সবার ভল্টে  হাজার আমানতকারীর  টাকা জমা  নেই। তাই  বাজার থেকে স্বল্প সুদে উধার নিয়ে বেশি সুদে ধার দেওয়াটাই তাদের ব্যবসা। অন্যান্য ব্যাঙ্কারের কাছ থেকে টাকা না পেলে সে ব্যবসা চলে কিমিতি ?
     
     প্রাণধারণের সমস্যা,  যার অন্য নাম  লিকুইডিটি ক্রাইসিস।
     
    সবুজ পীচের ওপরে তেরো জন সাদা ফ্লানেল পরিহিত খেলোয়াড় নয়, মারভিন কিং ততক্ষণে  কয়েকটি মাটির পুতুল দেখছেন । তার মধ্যে সবচেয়ে ভঙ্গুর পুতুলটির নাম নর্দার্ন রক বিল্ডিং সোসাইটি যার খাতার  পঁচিশ শতাংশ আমানতকারীদের টাকা আর বাকিটা আসে অন্যান্য ব্যাঙ্ক , কর্পোরেট বা ফান্ড  থেকে,  যারা ধার দেন এক , তিন, ছয় মাস বা বছরের কড়ারে।  সেই টাকা নর্দার্ন রক তার খদ্দেরকে পনেরো বিশ তিরিশ বছরের মর্টগেজ দেওয়ার কাজে লাগায় । স্বল্প মেয়াদি ধার নেওয়ার  সুদ কম,  লম্বা মেয়াদের মর্টগেজে সুদ বেশি – শনৈ শনৈ  অগ্রসর।  
     
    মারভিন কিং খেলার  মাঠ ছেড়ে ধাবিত হলেন ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডে তাঁর কুঠুরিতে । তাঁর সে বছরের গরমের ছুটি শেষ।  পরের তিন বছর কোন অবকাশ পাবেন না ।
     
    ৯ আগস্ট ২০০৭
     
    ঠিক সেই মুহূর্তে ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী আলিষ্টেয়ার ডাউলিং স্পেনের সমুদ্র সৈকতে বসে গুগলের স্ক্রিনে মনোনিবেশ করছিলেন । বি এন পির  ফান্ড  বন্ধ করা এবং তৎক্ষণাৎ ইউরোপীয় বাজারে অর্থ সরবরাহ সঙ্কটের খবরটুকু দেখা মাত্র তিনি হাল হকিকত জানবার জন্য আপন দফতরের (ইউ কে ট্রেজারি ) ল্যান্ড লাইনে ফোন করলেন। সেই দিনটার বিষয়ে তিনি পরে লিখেছিলেন
    ‘আগস্ট মাস । সবাই ছুটিতে । ফোন কেউ ধরে না । মনে হল একজন লোক ও তার কুকুরের ওপরে ব্রিটেনের আর্থিক স্থিতির দায়িত্ব অর্পিত ছিল’*   
     
    এবার নর্দার্ন রক মারভিন কিঙের  পদতলে লুটিয়ে পড়লো ।
     
     ‘প্রভু, আইন মোতাবেক আপনি আমাদের শেষ পারানির কড়ি দেওয়ার কাণ্ডারি (লেনডার অফ লাস্ট রেসর্ট) আপনি না দেখিলে আমারে দেখিবে কেবা ?’ মারভিন কিং প্রথমে রুষ্ট ভাব দেখালেন – তোমরা যদি যথার্থ বিবেচনা পূর্বক ব্যবসা করতে না পারো আমি তার হ্যাপা সামলাতে যাবো  কেন ? আচ্ছা, আপাতত এই তিন বিলিয়ন পাউনড  দিচ্ছি ম্যানেজ করো গে।‘
     
    শিগগির বোঝা গেলো এতে কেঁচে গণ্ডূষ মাত্র হয়, বাজার থেকে ধার না পাওয়ার জন্য যে  খামতি পড়েছে তার পরিমাণ কম করে  তিরিশ বিলিয়ন পাউনড। সে খবর রটি  গেল গ্রামে।
     
    শুক্রবার , ১৪ সেপ্টেম্বর , ২০০৭
     
    সকালবেলা ,  তখনও নটা বাজে নি , আমার একমাত্র চৈনিক কর্মী ডেভিড ঝু ভগ্নদূতের মতো এসে বললে , ‘ বস, হই হই কাণ্ড।  নর্দার্ন রকের সামনে ডিপোজিটররা টাকা তোলার জন্যে লাইন লাগিয়েছে‘।  সকালের কফি পরে না হয় খাওয়া যাবে , দুজনে মিলে সেই দৃশ্য পরিদর্শনে গেলাম দু মিনিট  হেঁটে । বেসিংহল এভেনিউতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড অফিসের অনতিদূরে,  ৫১ নম্বর মুরগেটে  নর্দার্ন রকের ব্রাঞ্চের সামনে আমানতকারিদের লাইন। সবাই টাকা তুলতে চান ( একত্রিশ হাজার পাউনড অবধি আমানত বিমা  দ্বারা সুরক্ষিত তখন , ( বর্তমানে ৭৫০০০ পাউনড )। কেউ ক্রাচে ভর করে  , কেউ  হুইল চেয়ারে, মায়েরা পেরাম্বুলেটর ঠেলে ।  নীরবে  নিশ্চুপে  ।
     
    এর নাম  রান অন দি ব্যাঙ্ক ? 
     
    রাস্তার অন্য ফুটপাথে আমাদের মতন আরও কৌতূহলী দর্শকের সমাবেশ । এমন দৃশ্য আমি কখনো দেখি নি , বাবার কাছে  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত বাদে রান অন দি ব্যাঙ্কের গল্প শুনেছি । পরে জানা গেলো একশ ষাট বছর আগে নাকি এ দেশে শেষ বার এমন ঘটনা ঘটে । ভারতে তখন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ।
     
    ব্রিটিশ করদাতার টাকাকে উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ বলে বিলিয়ে দিয়ে কিছু কাউবয় ব্যাঙ্কার  এবং তাদের ব্যাঙ্ককে বাঁচাতে  চান নি মারভিন কিং। শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক বিবেচনার চেয়ে  রাজনৈতিক স্বার্থ বড়ো হয়ে উঠল । তবু  মারভিন কিং লড়াই করেছিলেন তৎকালীন লেবার প্রধানমন্ত্রী গরডন ব্রাউনের সঙ্গে । বলেছিলেন আমি সরকারের আদেশে চলি না । আপনারাই ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন এই মাত্তর দশ বছর আগে । সেই সঙ্গে  দেশের ব্যাঙ্কের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিয়েছেন আলাদা দফতর , ফাইনানশিয়াল সার্ভিসেস অথরিটিকে । তারা এতদিন কি করছিল ? দেখেনি স্বল্প মেয়াদের ধার নিয়ে লম্বা মেয়াদে মর্টগেজ দিয়েছে এরা । ভাবে নি বাজারি জমার  (হোলসেল ডিপোজিট )  স্রোত বাজারি গুজবেরই  কারণে শুকিয়ে যেতে পারে ? এই  দেখাশোনার কাজটা এককালে আমরা করেছি, সাফল্যের সঙ্গে ।
     
    প্রসঙ্গত , লন্ডন সিটিতে কর্ম জীবন শুরু করার সময় ( ১৯৮৫) একটি রসিকতা  শুনতাম
     
    প্রশ্ন : কোন আমন্ত্রণ পেলে আপনি অভিভূত নয়,  ভীত হবেন ?
    উত্তর: ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডে চা পানের  ! 
     
    ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড দেশের এবং লন্ডন বাসি বিদেশি ব্যাঙ্কের দেখা শোনার জিম্মেদার ছিল , তাদের কাছে সাপ্তাহিক রিটার্ন পাঠানো আবশ্যিক ।  সেটা কাগজে কলমে । অধিকন্তু তাঁরা আরেকটি কাজ করতেন। যদি কোন ব্যাঙ্কের কাজকর্মে সন্দেহ বা প্রশ্ন জাগে , তাদের চা পানের আমন্ত্রণ পাঠানো হতো ( গল্প আছে এক জার্মান ব্যাঙ্কার খুব উৎসাহিত হয়ে  লোকজনকে জানিয়েছিলেন ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড তাঁকে চা খেতে ডেকে সম্মান জানিয়েছে - পরে  তাঁকে বোঝানো  হয় এ শুধু চায়ের  দিন নয় , এর পেছনে গভীর রহস্য আছে )।  চিঠি নয় ( ‘  ইট হ্যাজ কাম টু আউয়ার অ্যাটেনশন ‘! ) সমন নয় , ব্যাঙ্কের ভেতরে দেওয়ালে ঘেরা বাগানের সামনে চায়ের পেয়ালা হাতে নিতান্ত হালকা চালে কঠিন কথাগুলি- যাকে বলে বিটউইন দি লাইনস-  বলা হয়েছে। এর নাম ব্রিটিশ আণ্ডার ষ্টেটমেনট । আমন্ত্রিত ব্যাঙ্কার সেটি অনুধাবন পূর্বক সভাত্যাগ করেছেন । দ্বিতীয়বার চায়ের আহ্বানের আকাঙ্ক্ষা  পোষণ করেন নি ।  
     
    সরকারের সঙ্গে অসম সংগ্রামে কিং হারলেন – কিছুদিনের মধ্যেই নর্দার্ন রকের জাতীয়করণ সম্পূর্ণ হলো -  খরচা ৩২ বিলিয়ন পাউনড ।
     
    এর নাম বেল আউট । তার  জন্য  মারভিন কিং কোন খেতাব অর্জন করেন নি ।  বরং পরের দু বছর আরও কিছু প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানোর কাজে ব্রতি হয়েছেন।  হতে হয়েছে  । কেননা গোটা দেশে তখন লঙ্কাকাণ্ড ।
     
    বেল আউট তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা ফেড গভর্নর বেঞ্জামিন বেরনানকে ঠিক সে সময়ে কি করছিলেন?  
     
    তিনি বেল আউটের কোন সম্ভাবনা দূর দিগন্তে  দেখতে পান নি । আকাশ নির্মল ।  
     
    ১৭ মে , ২০০৭ তিনি বললেন
     
    আমরা মনে করি  স্বল্প অর্থ ক্ষমতার মানুষদের ( সাব প্রাইম সেক্টরের ) ঋণ জনিত সমস্যাগুলি সীমিত থাকবে । আমরা মনে করি না  দেশের আর্থিক অবস্থা  অথবা অর্থনৈতিক সংস্থা গুলির ওপরে তার বিশেষ কোন প্রভাব পড়তে পারে । সাব প্রাইম সহ দেশের সমস্ত মর্টগেজের  সঠিক পরিশোধ করা হচ্ছে । বাড়ি ঘরের দাম বেড়েছে , বাড়ির মালিকের ধনবৃদ্ধি হয়েছে । ফলে আগামী দিনের  ই এম আই দেওয়া সহজ ও সম্ভব হবে **।
     
    ফরাসি ব্যাঙ্ক বি এন পি ইতিমধ্যে সর্ব সমক্ষে ঘোষণা করেছে সাব প্রাইম জনিত শঙ্কার ফলে লগ্নিকারকের জমা ধনের পরিমাপ করা যাচ্ছে না , উলটে ইন্টার ব্যাঙ্ক লেনদেন কমে গেছে ।  
     
    এই দ্বিতীয় মন্দার বহুদিন বাদে বেঞ্জামিন বেরনানকে বলেছেন অর্থনৈতিক ওলট পালটের সঙ্গে সাব প্রাইমের কোন সম্পর্ক ছিল না ।

    নিউ ইয়র্ক ব্রঙ্কসের ইতালিয়ান অভিবাসীর পুত্র,  একটি মর্টগেজ ব্যাঙ্কের কর্মচারী আঞ্জেলো  মতসিলো ও মেইনের ডেভিড লোব এক লক্ষ ডলার ধার ধোর  করে ক্যালিফোর্নিয়ায় কান্ট্রিওয়াইড নামে একটি মর্টগেজ ব্যাঙ্ক খোলেন ১৯৬৯ সালে । নামেই ব্যাঙ্ক । আমানতকারীদের  টাকা জমা নেবার লাইসেন্স ছিল না । তাঁরা বাজারি ( হোলসেল )  টাকা তুলে বাড়ি কেনার জন্য ধার দিতেন । প্রকাশ্যে বলতেন আমরা কোন ব্যাঙ্ক নই -কেবল বাড়ি কেনার জন্যে ধার দিয়ে থাকি ।  মর্টগেজের টাকা শোধ হলে আমাদের দেনদারদের টাকা ফেরত দিই ।
     
    প্রথমদিকে ব্যবসা ছোট, ধার দেওয়ার মতন টাকা কোথায় ?  সলোমন ব্রাদারসের লুই রানিয়েরি  মর্টগেজ বন্ড আবিষ্কার করার  সঙ্গে সঙ্গে কপাল খুলে গেলো।  খাতায় মর্টগেজ বুক করো , ওয়াল স্ট্রিট ব্যাঙ্কাররা সেটা কিনে নেওয়ার জন্য হাঁ করে আছে । এবার নতুন খদ্দেরকে সেই টাকা ধার দাও। দেদার ফাইনান্সিং হলো – বাড়ি কেনার জন্যে ৯০% ধার দেওয়াটা দস্তুর ছিল।  আভ্যন্তরীণ ই মেলে ব্যাঙ্গক্তি দেখা গেছে- এবার কেউ মর্টগেজ চাইলে তাকেই বোধহয় আমরা ফি দেবো ।  একসময়ে সারা আমেরিকার তেরো  শতাংশ মর্টগেজ দেওয়া হয়েছে কান্ট্রিওয়াইডের কাউনটারে ।

    আঞ্জেলো মতসিলোর নামে আমেরিকান ফাইনান্স দুনিয়া ওঠে বসে । পৃথিবীর ৩২জন শ্রেষ্ঠ সি ই ওর একজন বলে সম্মানিত হলেন তিনি ।
     
     ২০০৭ নাগাদ  সাব প্রাইম লোনের বাজারে টালমাটাল দেখা  গেলো – অনাদায়ী ঋণের সংখ্যা বাড়ে, ই এম আই দিতে অপারগ মানুষ বাড়ির চাবি ব্যাঙ্কের লেটার বক্সে ফেলে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় । বাড়ির দাম তেমনি থাকে, বিশেষ ওঠে না। ঋণ প্রার্থীর সংখ্যা কম । ওয়াল স্ট্রিটের শকুনরা ততদিনে কেমন করে যেন বুঝতে পেরেছেন এই ধান্দায় কোথাও গলদ আছে , টিকবে না । কাজেই নতুন মর্টগেজ না কিনে তাঁরা এক নতুন অস্ত্রে শান দিচ্ছেন । এযাবৎ কেনা মর্টগেজ দিয়ে তৈরি বিষাক্ত ঋণের সমষ্টি শুধু বিক্রি নয়, তার বিমা বিক্রি করার দোকান খুলে ফেলেছেন।এর নাম ক্রেডিট ডিফল্ট সোয়াপ। এটা আগেও ছিল তবে এক্ষেত্রে তার  ব্যবহার পদ্ধতি একটু আলাদা। এই যে নানান বাড়ি ঘরের মর্টগেজ- ভালোর সঙ্গে মন্দ, অথবা কেবলই মন্দ  ঋণের বান্ডিলটি বেঁধে ( সি ডি ও ) আপনাকে তাঁরা  বেচেছেন  সেটি যদি অনাদায়ী হয়ে পড়ে তার ইনসিউরেনসও কিনতে পারেন – সি ডি ওতে বার্ষিক  ৬%পাচ্ছেন এবার ধরুন ৩%  আপনি দিলে সেই সি ডি ওর ঝুঁকিও গোল্ডম্যান নেবে । ওয়াল স্ট্রিট বন্ড বানিয়ে পয়সা বানায় , সেই বন্ডের ভেতরে অনেক কুচরো ময়লা গুঁজে ঋণ সমষ্টি বেচে আর সেটার ওপরে বিমা ! আসতে টাকা যেতে টাকা ! 
     
     কান্ট্রিওয়াইডের সমস্যা হলো ওয়াল স্ট্রীট নতুন মর্টগেজ কেনার ব্যাপারে হাত গুটিয়ে ফেলেছে , নিজের মূলধন হতে  ধার দেওয়ার এলেম কান্ট্রিওয়াইডের নেই, ভাঁড়ে মা ভবানী।  একদা সর্বত্র পূজিত আঞ্জেলো ব্যাঙ্ক কেনার খদ্দের খুঁজতে থাকেন ।  বকরার অভাব নেই । ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকা তাদের কিনে নিলো নাম মাত্র দামে, চার বিলিয়ন ডলারে।  
     
     আটলান্টিকের ওপারের এক শহরে  আমানতকারী নয় , কেবল  বাজার থেকে টাকা ধার করে  বাণিজ্য করার বিপদ নর্দার্ন ট্রাস্ট  প্রমাণ করেছে । কিন্তু সেটা ফেড গভর্নর বেঞ্জামিন বেরনানকে অথবা কান্ট্রিওয়াইডের দেখভাল যাঁদের করার কথা সেই অফিস অফ দি কমপট্রলার অফ কারেন্সির  চোখে পড়ে নি।
     
    ৩১শে অক্টোবর, ২০০৭ , বেল আউটের মহান প্রবক্তা  বেঞ্জামিন শালোম বেরনানকে ঘোষণা করলেন:
     
    ঋণদাতা এবং লগ্নিকারককে তাঁদের আপন সিদ্ধান্ত জনিত ফল থেকে রক্ষা করা ফেডারাল রিজার্ভের দায়িত্ব নয়, হওয়া উচিত নয় ***।
     
    ঠিক এক বছর বাদে ১৬১ বছরের পুরনো ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক লেমান ব্রাদারস দেউলে ,  বেয়ার স্ট্যারন, মেরিল লিঞ্চ বিক্রি হবে। গোল্ডম্যান মরগান সিটি সহ অনেক ব্যাঙ্ক এমনকি জেনারাল মোটরসের গাড়ি বেচা কোম্পানি , এ আই জির মতন বিমা সংস্থাকে তাঁদের আপন সিদ্ধান্ত জনিত ফল থেকে রক্ষা করার  জন্য করদাতাদের ঘাড়ে বিশাল বোঝা এবং অবশ্যম্ভাবী মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি চাপিয়ে দিয়ে আমেরিকান ট্রেজারি রাজকোষ উন্মুক্ত করে দেবেন –সেটি সুসম্পন্ন করার  ভার পড়ল যে করণিকের ওপর তাঁর নাম বেঞ্জামিন বেরনানকে।
     
    ২  ডিসেম্বর, ২০২২ 
     
    পরিশিষ্ট:
     
    · * I rang the Treasury. It was August. There was one man and a dog in charge of financial stability “ Alistair Dowling Chancellor of the Exchequer ( 2007-2010)  "
     
    · **Given the fundamental factors in place that should support the demand for housing, we believe the effect of the troubles in the subprime sector on the broader housing market will likely be limited, and we do not expect significant spill overs from the subprime market to the rest of the economy or to the financial system.  The vast majority of mortgages, including even subprime mortgages, continue to perform well.  “ Benjamin Bernanke Fed Statement  May 17, 2007
     
     
    · *** It is not the responsibility of the Federal Reserve- nor would it be appropriate-to protect lenders and investors from the consequences of their financial decisions . Benjamin Bernanke Fed Statement Oct 31,2007
     
    · **** সি ডি ওর শ্রেষ্ঠ সরলীকৃত উদাহরণ 
     
  • আলোচনা | ০২ ডিসেম্বর ২০২২ | ৪০৩ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    থ: ! - Bitan Polley
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Kishore Ghosal | ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:৪৭514365
  • বিষয়টা মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে, তবে বিপদটা বুঝতে পারছি । সাধারণ মানুষকে আর্থিক বিপদে ঠেলে দিয়ে, অর্থনীতি নির্ধারক মাতব্বর ব্যক্তিরা, নিজেদের হাত ঝেড়ে ফেলায় অত্যন্ত দক্ষ। 
  • হীরেন সিংহরায় | ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:১৭514419
  • আমাদের অর্থ নিয়ে  যে কারবার তাঁরা করেন সেটিকে ব্যাংকার বর্গ এক কঠিন অবোধ্য বসতু বানানোর চেষ্টায় সর্বদা রত থাকেন। লোকে ব্যাপারটা বুঝে ফেললে তাঁদের আয়ের ক্ষতি! সাধ্যমত সেই মোহ আবরণটা উন্মোচন করতে চাইছি। সব সময় সফল হই না 
  • পলিটিশিয়ান | 2603:8001:b102:14fa:266:2393:ce75:b16b | ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ ১৯:৪৮514426
  • একটু সময় নিয়ে এই পর্বটা পড়তে হবে। একবার চোখ বুলিয়েছি, আর একবার দেখা দরকার।
     
    ক্রুগম্যান একদা বলেছিলেন ব্যাংকিং এবং ফাইন্যান্স বোরিং হওয়াই মঙ্গল। এক্সটিক হলে ভয়ের ব্যাপার।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন