• বুলবুলভাজা  খ্যাঁটন  হেঁশেলে হুঁশিয়ার  খাই দাই ঘুরি ফিরি

  • পাকশালার গুরুচণ্ডালি (১)

    শারদা মণ্ডল
    খ্যাঁটন | হেঁশেলে হুঁশিয়ার | ২৮ অক্টোবর ২০২১ | ১০১৭ বার পঠিত | রেটিং ৪.৭ (৬ জন)
  • ছবি - র২হ


    বাপের বাড়ি - মামার বাড়ি


    খাতি নাতি বেলা গেল
    শুতি পালাম না।
    দুয়ার দিয়া হাতি গেল
    দেখতি পালাম না।

    ছড়াটা ছোটবেলায় শুনেছিলাম মায়ের মুখে। সত‍্যি সত‍্যি ঘর-বার সব কিছু সামলাতে সামলাতে মেয়েদের জীবনে সময় বড় আক্রা, তাই দুয়ার দিয়ে হাতি চলে গেলেও দেখতে যাবার সময় হয় না। আর ঘর-বার সব কাজের আসল উদ্দেশ্য হল পেটপুজো। এ পুজোয় ত্রুটি চলে না। হেঁশেলের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলে ব‍্যক্তির, পরিবারের, এলাকার, জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি। আর টাঁকশাল, হাতিশাল, ঘোড়াশালের মতো পাকশালের গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। সেখানে উচ্চকোটির ব্রাহ্মণ‍্য রান্নার সঙ্গে ব্রাত‍্যজনের চণ্ডালি রান্না অনায়াসে সহাবস্থান করে। সেজন্য, আজ একটু পাকশালার গল্প বলি।


    রোজকার পাঁচালি


    আমি বড় হয়েছি পাতিপুকুরের সরকারি আবাসনে। ছোটবেলায় আমাদের মত কোয়ার্টারগুলোতে চৌকো চৌবাচ্চার মত মাটির উনুন করা ছিল। উনুনের মুখে দেওয়ালে ছিল ধোঁয়া বেরনোর পাইপ। উনুন ধরানোর সময় একটা মোটা লোহার ঢাকনা দিয়ে চাপা দেওয়ার নিয়ম ছিল, যাতে উনুনের ধোঁয়া বাইরে না গিয়ে, পাইপ দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু পাইপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তাই ঢাকনাটা কোনো কাজে আসত না। আমার কাছে, মায়ের রোজ সকালে উনুন ধরানোটা, ছিল ভীষণ কষ্টের। কারণ আমি কোনোরকম ধোঁয়া সহ‍্য করতে পারিনা, ভীষণ শ্বাসকষ্ট হয়। তবে একবার উনুন ধরে গেলে আর চিন্তা নেই। একটা পিঁড়িতে উবু হয়ে বসে মা রান্না করত। রান্না হয়ে গেলে ভিজে ন‍্যাকড়া দিয়ে উনুন নিকোনো হত আর উনুন থেকে একটা সুন্দর সোঁদা গন্ধ উঠত, ঠিক বৃষ্টি পড়লে যেমন হয়, তেমন। আমার বোন ঐ গন্ধের লোভে উনুন চাটত। অনেক বারণ, বকাঝকা করলেও তাকে থামানো যেত না। উনুনে সোঁদা গন্ধ উঠলেই, পিলপিল করে দৌড়ে ছোট্ট জিভ বার করে উনুন চেটে দিত। ভাঁড়ে রসগোল্লা বা দই এলেও সেই সব ভাঁড় কামড়াত। এত দুরন্ত, সামলানো যেত না – বাবা ওর নাম দিয়েছিল বিলবিলে বাহাদুর। সকলে যখন জিজ্ঞেস করত, বাবা কি নাম দিয়েছে? – গরবিনী উচ্চকন্ঠে ঘোষণা করত – বিব্বিলে ভা-দুর। আমি বইপত্র নিয়ে থাকতাম, রান্নাঘরের দিকে অত নজর ছিল না, কিন্তু বোনের ছিল। দুপুরবেলা যখন কেউ দেখত না, ও-ই গিয়ে শিক দিয়ে, বড়দের মত উনুন খোঁচাত। একবার ড্রয়ারে লাল-নীল ক‍্যাপসুল দেখে, টুক করে জল দিয়ে খেয়ে নিয়েছিল। বাড়িতে বস্তা করে কয়লা, ঘুঁটে দুই-ই থাকত। পরের দিকে অবশ্য কোক-কয়লা এল। সব বাড়িতেই কয়লা-ভাঙা হাতুড়ি থাকত। গুঁড়ো কয়লা মেখে গুল দেওয়া হত।

    সকালের মূল রান্নার পর্ব মিটে গেলে, বিকেলের চা, জলখাবার, রাতের রান্না সব কেরোসিনের স্টোভে হত। আমার বাবা রোজ সন্ধ‍্যেবেলায় স্টোভ খুলে, মুছে, পলতে পরিয়ে, পরদিনের জন্য রেডি করত। আর খবরের কাগজ দিয়ে, হারিকেনের চিমনিও মুছে রাখতে হত, কারণ বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও, লোডশেডিংটাই ছিল স্বাভাবিক ব‍্যাপার। প্রদীপের, হারিকেনের সলতে আর স্টোভের পলতে – বারবার জেনে নিতাম মায়ের কাছে। পলতে সলতে গুলিয়ে যেত আমার।

    কোয়ার্টারের দেওয়ালে সিমেন্টের তাকে মা ঠাকুর পেতেছিল। রোজ সন্ধ‍্যেবেলা ধূপ দেখিয়ে এলাচদানা আর জল দিত ঠাকুরকে। ধূপ দেওয়ার সময় হলেই একলাফে মায়ের সামনে সামনে ঘুরতাম – ওমা, ওমা, আমায় একটু পুজো কর। মা-ও হেসে আমার আর বোনের সামনে ধূপ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লক্ষ্মী-সরস্বতী পুজো করত। পুজো শেষ হওয়ার পর মিনিট পাঁচেক গেলেই দু’জনে এলাচদানাগুলো পেটে পুরতাম। কিন্তু বৃহস্পতিবারের পর্ব একটু দীর্ঘ ছিল। সেদিন এলাচদানার বদলে ঠাকুরের থালায় গুড়ের বাতাসা আয় আয় করে ডাকত। মা আসন পেতে, লাল পাড় ছালের কাপড় পরে, লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়তে বসত। সন্ধ‍্যেগুলোয় কারেন্ট থাকা ছিল ভাগ্যের ব‍্যাপার। বেশিরভাগ দিনই হারিকেনের আলোয় মায়ের দু’পাশে ঘেঁষে বসে পাঁচালি শুনতাম। গরম, ঘাম, মশা – এগুলো কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হত। চারিপাশে মন্দ মন্দ মলয় বাতাস বইত। ঘরের আকাশে অকাল-পূর্ণিমার জোছনার সিঁড়ি নেমে আসত। সেই সিঁড়ি বেয়ে লক্ষ্মী ঠাকরুণকে পিঠে নিয়ে নেমে আসত ধবধবে সাদা প‍্যাঁচা।


    রান্নার প‍্যাঁচ


    বাবা রোজ সকালে বাজারে যেত, কখনো আমিও সঙ্গে যেতাম। বাবা ঘুরে ঘুরে বাজার করত। পোনা মাছের ঝোল বা ঝালটাই বেশি হত। তবে ইলিশ, ট‍্যাংরা, পার্শে, চিংড়ি, তেলাপিয়া এগুলোও বাদ যেত না। মায়ের ইস্কুল যাবার তাড়াহুড়ো থাকত। বাবা আমাদের ইস্কুলের বই আর টিফিন গুছিয়ে, ভাত খেয়ে ন’টার মধ্যে বেরিয়ে যেত। মা রান্না করে, বাসন ধুয়ে, আমাদের রেডি করত। তারপর তিনজন একসঙ্গে ইস্কুলের উদ্দেশে পাড়ি দিতাম। তাও এক-একদিন ব‍্যাজ, বেল্ট কিছু পরতে ভুল হয়ে গেলে, প্রার্থনার সময়ে শাস্তির লাইনে দাঁড়াতে হত। খুব তাড়া থাকত বলে মা প্রেসার-কুকারে রান্না পছন্দ করত। কুকারে দু’পলা সর্ষের তেল গরম করে, পাঁচফোড়ন, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে, তাতেই আলু-পটল নেড়ে নিয়ে হলুদ, নুন আর ধনে গুঁড়ো দিয়ে, কষে জল দিয়ে, প্রেসার কুকার ঢাকা দিয়ে দিত। একটা সিটি পড়লেই, ঢাকা খুলে ভাজা মাছগুলো দিয়ে ঝোলটা দু’মিনিট ফুটিয়ে নামিয়ে নিত। মাছের ঝোলে মা আদাবাটা বা জিরে গুঁড়ো ব‍্যবহার করত না। পটলের বদলে কাঁচকলা, সজনে ডাঁটা, বেগুন – যখন যেমন থাকত, তাই দিয়েই মাছের ঝোল হত। আর মাছের ঝাল করতে গেলেও ঐ পাঁচফোড়ন, কাঁচালঙ্কাই দেওয়া হত, কিন্তু তারপর ঐ তেলেই এক টিপ হলুদ, নুন আর জল দিয়ে দেওয়া হত। আর তাতে ভাজা মাছ দিয়ে ফোটানো হত। ছুটির দিনে মাছের ঝালে সর্ষে বাটা বা পোস্ত বাটা পড়ত। কখনো ক্বচিৎ সর্ষে, পোস্ত মিশিয়েও দেওয়া হত। মাছের ঝোল আর ঝালের তফাৎ হল – ঝালে কোনো জিরে, ধনে পড়ত না। আর বেগুনের ঝোলে মাঝে মাঝে হাল্কা করে সর্ষের জল দিত মা। যেদিন বাবা রান্না করত, মাছের ঝাল নামানোর আগে ফুটন্ত কড়ায় অল্প একটু রসুন বাটা দিয়ে দিত। মা কিন্তু রোজকার রান্নায় পেঁয়াজ, রসুন আর শুকনো লঙ্কার ব‍্যবহার এড়িয়ে চলত। মায়ের ধারণা ছিল, ওসব বেশি খেলে আমাদের শরীর গরম হয়ে যাবে। তবে মা বলত, রান্নায় স্বাদ করতে হলে, নামানোর আগে আর একবার ফোড়ন দিতে হয়। মায়ের ছোটবেলায় দিদা নাকি এভাবে দু’বার ফোড়ন দিয়ে রান্না করত। আর যেহেতু শীতকাল ছাড়া টমেটো পাওয়া যেত না, তাই এখনকার মতো সবেতে টমেটো দেওয়ার চল ছিল না। একটু বড় হলে আমি মাঝেমধ্যে রান্না করার চেষ্টা করতাম বটে, কিন্তু সফল হতাম না। বেগুন ডুবছে না বলে ঝোলে একগঙ্গা জল দিয়ে ফেললাম। মাছের ঝাল করতে গিয়ে তেলে হলুদ দিয়ে খুন্তি নেড়ে যাচ্ছি, আমার বিস্ফারিত চোখের সামনে হলুদ পুড়ে কুচকুচে কালো হয়ে গেল। মাকে এসে আবার কড়া মেজে নতুন করে বসাতে হল। আবার একদিন ঢিমে আঁচে মাছ ভাজতে গিয়ে মাছ পুড়িয়ে ফেললাম। রান্না শেখার প্রতি হতাশ হয়ে পড়ছিলাম। কিন্তু অবাক কাণ্ড, আমার অত দুরন্ত বোন বেশ রান্না শিখতে লাগল। মা হাসত, কিন্তু রাগ করত না।

    বাবা এক একদিন বাজার থেকে মোটা দাঁড়াওলা কাঁকড়া আনত। সেদিন কষিয়ে কাঁকড়ার কালিয়া রান্না হত। মাছ বা কাঁকড়ার কালিয়া হলে, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, শুকনো লঙ্কাবাটা সবই পড়ত। কার্পণ্য করা হত না। মা বলত, কাঁকড়া ভাজাও মাছের মত হবে। গনগনে আঁচে একপিঠ লাল হলে, উল্টে দিয়ে আর এক পিঠ লাল করতে হবে। বেশি নাড়ানাড়ি বা ঢিমে আঁচ এখানে চলবে না। কখনও আবার সর্ষে দিয়ে কাঁকড়ার ঝাল বা নারকেল দুধ দিয়ে কাঁকড়ার মালাইকারিও হত। বাবা কইমাছ খেতে ভালোবাসত। তাই তেলকইটাও হত।

    পাতিপুকুরে পাইকারি মাছের বাজার আছে। তাই বাড়িতে মাছ নানারকম আসতে কোনো অসুবিধে ছিল না। চিংড়িটা আকার প্রকার ভেদে মা নানাভাবে রান্না করত। ঝোলের লম্বা আলু, লম্বা করে ঝিঙে, আর মোটা করে পেঁয়াজ কেটে চিংড়ি দিয়ে ঝোল করত মা। এটা এখন আমার কর্তা খুব পছন্দ করে। ঝিঙে, পেঁয়াজ, আলু একসঙ্গে প্রথমে ভেজে নেওয়া হয়। তার পর তেল ছেড়ে গেলে, সবজিগুলো খুন্তি দিয়ে চারপাশে সরিয়ে মাঝখানটা ফাঁকা করে দিত মা। তেল গড়িয়ে এসে মাঝখানে জড়ো হত। সেখানে জিরে, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দেওয়া হত। তারপর নুন হলুদ দিয়ে কষে জল দিয়ে ঢাকা দেওয়া হত। আলু সেদ্ধ হলে ভাজা চিংড়ি দিয়ে আরও দু’-তিন মিনিট ঢাকা খুলে ফোটানো হত। আমরা ঝাল খেতে পারতাম না বলে, ঝোল ফোটার সময়ে মা ফোড়নের শুকনো লঙ্কা তুলে ফেলে দিত। এতে মিষ্টি পড়ত না, তবে খেতে মিষ্টি মিষ্টি লাগত। মা বলেছিল, ঐ মিষ্টত্ব আসে পেঁয়াজ থেকে। এই রান্নায় পেঁয়াজটাকে মশলা নয়, সবজি হিসেবে ব‍্যবহার করা হয়। এছাড়া একপলা সর্ষের তেল গরম করে, তাতে পাঁচ ফোড়ন, একটু রসুন ছেঁচা আর দু’টো কাঁচালঙ্কা-ছেঁচা ফোড়ন দিয়ে, ঐ তেলেই নুন-হলুদ-মাখা ছোটো চিংড়ি ভেজে নিত মা। তারপর জল দিয়ে ফুটিয়ে পাতলা ঝাল করত। এই রান্নাটা খুব ভালো লাগে আমার। এছাড়া শুধু পাঁচ ফোড়ন, কাঁচা লঙ্কা, টমেটো, হলুদ, নুন দিয়েও ঝাল করত। লোকজন এলে একটু তরিবত করার জন্য শুকনো লঙ্কা আর সর্ষে বাটা যোগ করে দিত। চিংড়ি মাছের মালাইকারিতে কিন্তু মা পেঁয়াজ দিত না, নারকেল-কোরা-বাটাও না। সর্ষের তেলে জিরে, শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে চিংড়িগুলো ভেজে নিত। তারপর হলুদ, আদাবাটা, জিরেবাটা, নুন, মিষ্টি দিয়ে কষে, নারকেল দুধ দিয়ে ফোটাত। কাঁচালঙ্কা দিয়ে মাছের ঝাল বা ঝোলে মা নামানোর দু’মিনিট আগে ফুটন্ত কড়ায় একটু কাঁচা তেল ছড়িয়ে দিত। ঐ ঝাঁঝটা রান্নায় মিশে গিয়ে বেশ ভালো লাগত। এইসব রান্নায় মিষ্টি পড়ত না। কিন্তু কালিয়া বা মালাইকারি জাতীয় তরিবতের রান্নায় মিষ্টি পড়ত, আর নামানোর আগে কাঁচা তেল দেওয়া হত না। আমি বিয়ের পরে রান্না ক‍রতে গিয়ে, ল‍্যান্ডলাইনে ফোন করে করে মায়ের কাছ থেকে পদ্ধতি জেনে নিতাম। নিজের মনে একটা ব‍্যাকরণ ঠিক করে নিয়েছিলাম।


    • যে কোনো মাছের ঝোল সবজি দিয়ে করতে হলে, উপকরণ পাঁচ ফোড়ন, কাঁচালঙ্কা, হলুদ, ধনেগুঁড়ো, নুন
    • গুলে মাছের ঝোলে কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন, হলুদ, আদাবাটা, কালোজিরে বাটা
    • বেগুন দিয়ে মাছের ঝোলে ১ নম্বর উপকরণের সঙ্গে পাতলা সর্ষে-বাটার জল যুক্ত হবে
    • ট‍্যাংরা মাছের ঝোলে টমেটো-বাটা আর ধনেপাতা-বাটা দিয়ে কষলে রান্না প্রথম বিভাগে পাশ হবে
    • ভেটকি মাছের ঝোল ৩ নম্বর নিয়মে বেশি ভালো হয়
    • কালিয়া হলে প্রথমে গরম মশলা, তেজপাতা ফোড়ন, ফোড়ন ভাজা হয়ে গন্ধ বেরোলে, তেলে চিনি দিয়ে ক‍্যারামেল করে গলিয়ে নিতে হবে। চিনি লালচে তরল হবার সঙ্গে সঙ্গে কড়ায় পেঁয়াজ-কুচো দিয়ে দিতে হবে। চিনি চিটচিটে হবার আগে দিলে ভালো
    • মাছের ঝাল আগে যেমন বলা হয়েছে তেমন
    • টাটকা ইলিশ হলে মাছ ভাজা হবে না। কাঁচা ইলিশের ঝাল হবে। কিছুদিনের পুরোনো হলে ইলিশ হাল্কা ভেজে নিতে হবে। এতে কালোজিরে কাঁচালঙ্কা চলে, তবে মা পাঁচফোড়ন কাঁচালঙ্কাই দিত। হলুদ, নুন, অল্প টক দই, দু’চার দানা চিনি, কাঁচা তেল ছড়িয়ে, কাঁচা মাছ দিয়ে ফুটবে। পাতলা সর্ষে ধোয়া জল দিত মা। আর ইলিশ ভাপা করতে হলে উপকরণ একরকম, কেবল অনুপাত আলাদা। ভাপায় ফোড়ন পড়বে না। জল পড়বে না, সর্ষে বাটার অনুপাত বেশি হবে। চিংড়ি ভাপাতে দই আর চিনি পড়বে না, কিন্তু একটু আদাবাটা যোগ করতে হবে।

    রাতের দিকে মা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডালনা করত। নানারকম উপকরণ দিয়ে ডালনা হত, যেমন - পাঁপড়ের ডালনা, পেঁপের ডালনা, পটলের ডালনা, কাঁচকলার ডালনা, শীতকাল হলে ফুলকপির ডালনা, গ্রীষ্মের শুরুতে এঁচোড়ের ডালনা, ছুটি থাকলে ছানার ডালনা – এইরকম হত। আর সব যুগের হিট আইটেম ডিমের ডালনা তো ছিলই। কখনও সখনও আলু কড়াইশুঁটির দমও বানানো হত। তবে ডিমের ডালনা বাকি পৃথিবী আলু সেদ্ধ করে করলেও, বাড়িতে মা জিরে, তেজপাতা, গরম মশলা ফোড়ন দিয়ে আলু ভেজে করত।

    আলুর দম আর ধোঁকার ডালনা আমাদের বাড়িতে রান্না হত না। তার কারণ হল, বাগবাজারে একটা ছোট্ট দোকান ছিল। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে শালপাতার খুরিতে গোল গোল ছোটো আলুর লাল টকটকে দম বিক্রি হত। কাঠি ফুটিয়ে আলু তুলে খেতে হত। আর ফড়িয়াপুকুরে টকি শো হাউসের রাস্তায় আর একটা ছোট দোকানে ধোঁকার ডালনা বিক্রি হত। ও দু’টো জিনিস খেতে ইচ্ছে হলে বাবা দোকান থেকেই আনত। আমরাও ইস উস করে নালে ঝোলে হয়ে উদরপূর্তি করতাম। এছাড়া ঘুগনি আর ছোলার ডাল নিয়েও একই কথা। ইস্কুল থেকে ফেরার পথে, বাগবাজার স্ট্রিটে একটা ছোটো দোকানের বেঞ্চে বসে আমরা – মানে মা, আমি, বোন – প্রায়ই ঘুগনি খেতাম। আর শ‍্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় থেকে দীনেন্দ্র স্ট্রিটের মুখের দিকে হেঁটে এলে, বাঁদিকের ফুটপাতের ধারে বেশ কিছু মিষ্টির দোকান ছিল। ওখানে আমরা কচুরি আর ছোলার ডাল খেতাম। ছোটবেলায় যখন প্রেশার কুকার ছিল না, তখন বাড়িতে ঘুগনির মটর, ছোলার ডাল সেদ্ধ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কারণ আবাসনে যে জল কলে আসত, তা হল লালচে, কষা, ভূগর্ভস্থ জল। ঐজন‍্য বৃষ্টি নামলেই অনেক বাড়ির গিন্নি মাঠে হাঁড়ি-কুড়ি বসিয়ে দিতেন। কিন্তু নিবেদিতা ইস্কুলের চাকরির জন্য মায়ের পক্ষে ওসব করা সম্ভব ছিল না। দোকান থেকে আর কয়েকটা জিনিস খুব খেতাম, পাঁচমাথার মোড়ের গোলবাড়ি থেকে ডিমের ডেভিল আর মুগের লাড্ডু। অন্য সব দোকানে লম্বা করে কাটা অর্ধেক ডিমের ডেভিল হত। কিন্তু গোলবাড়ির ডেভিলে আস্ত ডিম থাকত। মুগের লাড্ডু আমি এত ভালোবাসি বলে, আজও আমার মেজ-নন্দাই যখন পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা থেকে আমাদের বাড়িতে আসেন, তখন বড় কৌটো ভর্তি করে স্পেশাল সাইজের মুগের লাড্ডু অর্ডার দিয়ে বানিয়ে আনেন আমার জন্য। ওঁর চেনা দোকানে ওটা ভালো করে। আরও একটা জিনিস ছিল। শ‍্যামবাজার আর বাগবাজারের সন্ধিস্থলে দ্বারিকের দোকানে, বিরাট উনুনে ফেনা-ওঠা দুধ ফুটত। লোকে এক গ্লাস দুধ কিনে খেত, আর তাতে রসগোল্লার রস মিশিয়ে পরিবেশন করা হত। ঐ দুধের গেলাস বড় প্রিয় ছিল, মাঝে মাঝে খেতাম। সেদিন বহু বছর পরে গিয়েছিলাম ঐ দোকানে – ঠাটবাট সব পাল্টে গেছে। ছানার মুড়কি আর ক্ষীরের চপ কিনলাম কন‍্যাকে খাওয়াবো বলে। ছোটোবেলায় ক্ষীরের সিঙাড়া খুব ভালো লাগত। সেটা ছেলেবেলাতেই লুকিয়ে আছে। আজ আর খুঁজে পাই না।


    ক্রমশ...

     

  • বিভাগ : খ্যাঁটন | ২৮ অক্টোবর ২০২১ | ১০১৭ বার পঠিত | রেটিং ৪.৭ (৬ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কবীর | 2402:e280:3d17:13c:ec93:4fa4:9f06:dad | ৩০ অক্টোবর ২০২১ ০০:৫১500403
  • খুব ভালো। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন