বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  খ্যাঁটন  হেঁশেলে হুঁশিয়ার  খাই দাই ঘুরি ফিরি

  • পাকশালার গুরুচণ্ডালি (৪৩)

    শারদা মণ্ডল
    খ্যাঁটন | হেঁশেলে হুঁশিয়ার | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৩৬৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ছবি - র২হ


    আকাশ ভরা সূর্য তারা




    পাকশালে ওঠে কলমের তান
    হাসি মুখে সুখী মানুষের ভান।
    আঁচলেতে ঢাকা আবেগের বান –
    কিছু তো বলার থাকে।
    কিছু পাগলামি, কোন অভিমান
    চুড়ি রিনিঠিনি, কাঁকনের গান –
    (শুধু) রক্তের নাকি হৃদয়ের টান?
    মায়েরা কেবলই ডাকে।

    আজ দিনটা শুরুই হল এক অদ্ভুত ঝামেলার মধ্যে দিয়ে। এক রাঁধুনি বৌয়ের দুরন্ত মেয়ে সব সময়ে আগানে-বাগানে হুটোপাটি করে বেড়ায়। ঐ সময়ে কিছু ঘাস পাতা গায়ে লেগে সারা গায়ে অ্যালার্জি বেরিয়ে গেল। রান্নাঘর থেকে হঠাৎ দেখি সে পাগলের মত দৌড়ে আসছে। তাড়াতাড়ি তাকে ধরে বলি, “হয়েছেটা কী?” কিন্তু সে উত্তর দেবার আগেই দেখি তার সারা গায়ে লাল লাল দাগড়া দাগড়া ফুলে উঠেছে। ঘরে এই মূহূর্তে অ্যান্টি অ্যালার্জিক ওষুধ কিছু নেই। তাড়াতাড়ি একজন ডাক্তারবাবুকে ফোন করে পাশের বাড়ির ফুচনকে ওষুধ আনতে পাঠানো হল। সে ছুটল সাইকেল নিয়ে। এ তো আর শহর নয়, ওষুধের দোকানটা বেশ দূরে। এদিকে বাচ্চাটা তো গাঁ গাঁ করে চিৎকার করছে। কী যে করি! হঠাৎ শাশুড়ি মায়ের একটা কথা মনে পড়ে গেল। রান্নাঘরের পাশে একটা ঘৃতকুমারীর ঝোপ আছে না! দৌড়ে গিয়ে ঘৃতকুমারীর পাতা কেটে ব্লেড দিয়ে চিরে ভিতরের জেলিগুলো বাচ্চাটার গায়ে অল্প অল্প করে লাগিয়ে হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করলাম। তার মা আবার এই সময়েই কোথায় গেছে কে জানে বাবা! হঠাৎ কোথায় কোথায় যে উধাও হয় এরা। যাই হোক, দোকান থেকে আনা ওষুধ খাইয়ে মেয়েটা একটু সুস্থ হল। তারপর তাকে এক গ্লাস সরবত খাইয়ে শুইয়ে দিলাম। ঘুমিয়ে পড়ল। তার মায়ের দেখা নেই। এই বাচ্চাটার একটা ভাইও আছে। মেয়েটার নাক আর ওপরের ঠোঁট এতটাই চাপা, যে মুখে মুখে সকলে ওকে ‘চ্যাপ্টা’ বলে ডাকে। যদিও শেখানো হয়, যে কানাকে কানা বলতে নেই, কিন্তু মুখে মুখে যে নাম চলে – কে আর বদল করবে তাকে? ওর মা কিন্তু মেয়ের খুব সুন্দর একটা নাম দিয়েছে। সঠিক নামটা বলব না, ধরে নিই ওর ভাল নাম শ্রাবণী। বেশ মিষ্টি মেয়ে। আর মায়ের কথা – কী আর বলি, যত বলব কম পড়বে। মায়ের নামের অর্থ মিলিয়ে কাছাকাছি নাম দিলাম গৌরী। আগে ও এ তল্লাটে থাকত না। বাইরে বাইরে কাজ করত। বিয়ে করে এই গ্রামে বসত করেছে। গায়ের রঙ অবশ্য মা কালীর সঙ্গে বেশি মেলে, আর চেহারাখানি পুরুষ্টু, তবে তলতা বাঁশের মত খাড়া। ওর অনেক গুণ, কিছু লেখাপড়া জানে। কবে নাকি ছোটদের ইস্কুলে নাচ গান শেখাত। একবার বলেছিল আমায়। শ্বশুরবাড়িতে ওকে কেউ মেনে নেয়নি, নিত্য অশান্তি। কারণ ওর বর (ধরে নিলাম পলাশ) গৌরীর থেকে বছর দশেকের ছোট। আর অশান্তির সবচেয়ে বড় কারণ হল, গৌরী একজন গুণিন। তুক গুণ করা, বাণ মারা – সব কাজ জানে। আজ অবশ্য পাতালঘর সিনেমার অপয়া মল্লিকের মত ও গ্রামের কোনো কেস সল্ভ করতে উধাও হয়েছিল কিনা, সেটা আমি জানি না। তবে হওয়াটা খুবই সম্ভব।

    গৌরী যতক্ষণ আমাদের বাড়িতে থাকত, আমি এক মনে ওকে লক্ষ্য করতাম। ওর মাথার চুল চেহারার সঙ্গে মানানসই লম্বা আর তেল চপচপে। এখানকার সব গরীব মেয়েদের চুল থাকে রুক্ষ – কেবল ভাল কোথাও যেতে হলে মাথায় তেল দেয়, তাই ও অন্যদের থেকে আলাদা। গৌরীর মুখ বেশ লম্বাটে, মাঝখানে সিঁথি করা চুলগুলো কোঁকড়ানো, সিঁথিতে খুব চওড়া করে সিঁদূর পরে। এমন সিঁদূর পরা রাঁধুনি আমাদের বাড়িতে বিরল। শতকরা নব্বইজন শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত, আর বাকিরা বিধবা। গৌরীকে আমি পছন্দ করতাম, কারণ বাকি রান্নার বৌদের মত ও না বলে কিছু সরাত না। আর রাত পর্যন্ত থাকত, বাকিদের মত পালাই পালাই করত না। রাত বাড়লে, সবার খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে, বীরদর্পে এসে দাবী করত – ‘বৌদি, এগুলো আজ বেশি হয়েছে, বাড়ি নিয়ে যাই?’ আমি সানন্দে রাজি হতাম। অন্য বৌ-রা বাণ মারার ভয়ে হোক বা ওর ব্যক্তিত্বের সামনে গুটিয়ে গিয়েই হোক, ওর ওপরে খুব একটা কিছু বলত না। আমি দেখতাম ও একটা বালতির ভেতরে ভাত, তরকারি যত্ন করে সাজাত। তারপরে শালপাতার থালা ঢাকা দিয়ে বালতির মুখটা শক্ত করে বাঁধত। শেষে একটা অদ্ভুত কাণ্ড করত। ঐ শালপাতার থালার ওপরে দৃষ্টিকটুভাবে বেশি পরিমাণে, ধরা যাক, দু’-তিন খাবলা নুন ছড়িয়ে দিত। আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এত নুন কী হবে?’ সে দৃষ্টি স্থির করে উত্তর দিলে – “গভীর রাতে খাবার নিয়ে বনজঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাব। তেনাদের নজর তো পড়বেই। সেই নজর লাগা খাবার নিজেরা খেলে অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে। তাই নুন দিয়ে ঢেকে দিতে হয়।” আমার হাসি পেলেও, তা গোপন করি – ইচ্ছে করে নানা প্রশ্ন করে ওর কথা শুনি। এখানকার মূর্খ মেয়েদের মত – আলটপকা, অর্ধেক বোঝা যায় না, যুক্তিহীন কথা – গৌরী বলে না। আর স্থানীয় ওড়িয়া-মেশা বাংলায় নয়, স্পষ্ট কলকাত্তাইয়া বাংলা ভাষায় কেটে কেটে কথা বলে আমার সঙ্গে। বুঝতে পারি বহুদিন বহু ঘাটের জল খেয়ে ও এই গ্রামে থিতু হয়েছে। গৌরী কি সত্যি সত্যি ভূতের ভয় পায়? ওর দুর্জয় সাহস – তার প্রমাণ আমি অনেক ঘটনাতেই পেয়েছি। ভূতপ্রেত তো ওর পোষা থাকা উচিত। ভূতে ও বিশ্বাস করে, এ বিশ্বাস আমার অন্তত হয় না। বাড়তি নুন জমিয়ে, ও কি সংসারের সুরাহা করে? নুনের আর কত দাম?

    গৌরীর অবর্তমানে ওকে নিয়ে খুব আলোচনা চলে এ বাড়িতে। রান্নাঘরের পল্টন তো নিশ্চিত – গৌরী বাণ মেরেই দশ বছরের ছোট পলাশকে বশ করে বিয়ে করেছে। আমি হেসে একদিন দেওরকে জিজ্ঞেস করি – ‘সত্যি নাকি রে?’ সে যা উত্তর দিলে, আমি তো স্তম্ভিত। দেওর আমাকে বললে, “তুমি কি এ’কথা জানো, আমার মেয়ে যে অষ্টপ্রহর তোমার গায়ে লেপ্টে থাকে, তাতে অনেকেই মনে করে, তুমি কর্ণাকে বশ করেছ? আমাকে অনেকে ইঙ্গিতও দেয়, আমি যেন সাবধান হই। মানুষ স্বার্থের চশমা পরা চোখে যে সম্পর্কের তল পায় না, তাকেই দেগে দেয় – বাণুয়া কেস বলে।”

    যাই হোক, সাত-পাঁচ আকাশকুসুম ভাবছিলাম, বেলা বয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ কর্ণা এসে ঝাঁকুনি দেয়, ও জেঠিমা!
    – কী?
    – চ্যাপ্টার গায়ে কী পাতা লাগিয়েছিলে?
    – ঘৃতকুমারী।
    – সেটা আবার কী? তোমাদের কিচেন গার্ডেনে এইসব হারবাল মেডিসিন যোগাড় রেখেছ?
    – এই তো, এ’পাশে এসে দেখ। অ্যালোভেরা চিনিস না?
    – ও-ও! এটাই অ্যালোভেরা? পাশে এই শুয়ে থাকা মোটা পাতাগুলো কী?
    – পাথরকুচি। কারোর পেটে ব্যথা হলে তোদের ঠাকুমা এই পাতা থেঁতো করে তার পেটে লেপে দিত। খুব আরাম হয়।
    – তাই নাকি? জেঠিমা, ও জেঠিমা, আমার পেটে পাথরকুচি বসিয়ে দাও না। সকাল থেকে পিরিয়ডের খুব ব্যথা হচ্ছে।
    – সে কী? এতক্ষণ বলিসনি কেন? পাথরকুচি লেপে দিলে ভীষণ ঠান্ডা হয়ে যায় পেট। পিরিয়ডের ব্যথায় তো ঠান্ডা চলবে না। তুই বস এখানে। এক কাপ লিকার চা খা। গরম জল বসিয়ে দিচ্ছি, হট ওয়াটার ব্যাগে ভরে তলপেটে কোমরে সেঁক দিলে আরাম হবে। ফ্লো ঠিক মত চালু হয়েছে?
    – না।
    – ঐ জন্য ব্যথা হচ্ছে। একটা দিন ওয়েট কর। কাল দেখবি ব্যথা কমে যাবে।
    – জেঠিমা, আমাকে হাসাও না। মন খারাপ লাগছে। মেয়েদের এ কী জ্বালা?
    – জ্বালা আবার কিসের? এ তো প্রকৃতির নিয়ম।
    – ধুর, এর আবার প্রকৃতি। প্রকৃতি মেয়েদের ব্যথা দেবে কেন? ও কি মেয়েদের শত্রু? মেয়েরা ঘরে থাকবে, পুরুষেরা বাইরে কাজ করবে – এসব কিছু বুঝি প্রকৃতি বলে দিয়েছে? আহা রে! পুরুষের কোনো ভূমিকা নেই – ধোয়া তুলসি পাতা।
    – হা হা হা, পেটে ব্যথা হচ্ছে – এটা হবেই। তার জন্য খেপে যাচ্ছিস কেন? তোর শরীরে যখনই একটা ডিম তৈরি হচ্ছে, তখন একটা ভ্রূণ তৈরির সম্ভাবনাও তো তৈরি হচ্ছে। তাই শরীর জরায়ুর ভিতরে একটা বিছানা বানিয়ে রাখে। কিছু রক্ত এসে রেডি হয়ে থাকে, ভ্রূণ এলে তাকে খাবার, অক্সিজেন সব যোগান দেবে বলে। তারপর যখন দেখে প্রস্তুতি দরকার লাগল না, তখন শরীর রক্তটা বাইরে বার করে দেয়। সিম্পল। রক্ত দেখে তো বোঝা যাবে যে তুই একদম সুস্থ পরিপূর্ণ মানুষ। যে হরমোনের জন্য এই সিস্টেম চালু থাকে, তার জন্য মেয়েরা সুন্দর দেখতে হয়, হার্টের স্বাস্থ্য ভাল থাকে। নে, চা খা।

    – তাই নাকি? এতে তাহলে খারাপ কিছু হবে না? কিন্তু আমি মন্দিরে যাচ্ছিলাম, রান্নার ঐ পিসিটা যে বারণ করল, বলল আমি এখন অশুচি, তাই মন্দিরে উঠতে পারব না!
    – ভ্যাট, ও সব বাজে কথা। ওরা জানে না, তাই এসব বলেছে। আগেকার দিনে তো আর প্যাড, মেন্সট্রুয়াল কাপ এসব ছিল না। যেখানে যাবে, সেখানে রক্ত গড়িয়ে পড়লে অসুবিধে, তাই বারণ করত হয়তো। এখন তো আর সে অসুবিধে নেই। তাই নিয়মও নেই। মানে যদি কোথাও থেকেও থাকে, সে নিয়ম ফেলে দিতে হবে। নে, এবার গরম জলটা নে। আর এই ভাজাগুলো খা।
    – কীসের ভাজা?
    – কুমড়ো ফুলের, একদম টাটকা। রুণাজেঠু একটু আগেই গাছ থেকে পেড়েছে। বেসন আর চালের গুঁড়োর মণ্ডে ডুবিয়ে ভাজা হয়েছে – একদম গরম।
    – হুমম, বেশ ভাল খেতে। এই ফুল সবাই খেতে জানে জেঠিমা?
    – বাঙালি মাত্রই জানে, মানে আমি তাই ভাবতাম। তবে একবার অন্যরকম দেখেছিলাম।
    – কী রকম?
    – ঐ একজন বিই কলেজের ছাত্র রঞ্জাকে ফিজিকাল সায়েন্স পড়াতে আসত, তাকে আমি এই কুমড়ো ফুলের ভাজা খেতে দিলাম। সে পড়াতে পড়াতে নির্বিবাদে খেয়ে নিল। পরের সপ্তাহে এসে বলল, “আন্টি, মাকে বললাম জানেন, সেদিন গাঁদা ফুলের বড়াটা দারুণ হয়েছিল।”

    – গাঁদা ফুল? গাঁদা ফুল খাওয়া হয়?
    – তা তো জানি না, তবে সেই থেকে ঐ স্যারের সাঙ্কেতিক নাম হয়ে গেল গাঁদাফুল।
    – হা হা হা হা। হা হা হা হা। জেঠিমা এইরকম আরও কয়েকটা মজার কথা বল না।
    – মজার কথা কিনা জানি না। তবে আমারও এমন একটা নাম আছে কলেজে।
    – তোমার? বল শুনি।
    – আমি বেশ অল্প বয়সেই কলেজে চাকরি পেয়েছিলাম। সে সময়ে কলেজের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তখনও পড়াচ্ছেন। রিটায়ার হননি। একজন কমার্সের স্যার ছিলেন রঘুমণি বসু। পুরো স্টাফরুম একেবারে মাতিয়ে রাখতেন। উনি ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে খবর টেনে বার করতেন, যে তারা স্যার-ম্যাডামদের কী নামে ডাকে।
    – কীভাবে?
    – ধর বাংলা বিভাগের দুটো মেয়ে টিফিনে বাইরে খেতে যাচ্ছে। রঘুমণিবাবুর সামনে পড়ে গেল। উনি চোখ গোল্লা করে বললেন –
    ‘কিরে ছুটি হয়নি, বেরিয়ে যাচ্ছিস যে বড়?’
    ‘খেতে যাচ্ছি স্যার, আবার চলে আসব।’
    ‘অ। তা পরীক্ষা এসে গেল, সাজেশন নিবিনি?’
    ‘হ্যাঁ স্যার, হ্যাঁ স্যার, দিন না।’
    ‘কাল দেব, যদি একটা কথা বলিস।’
    ‘কী স্যার?’
    ‘বলে ফেল দিকি, কাকে তোরা ল্যাংচা বলে ডাকিস?’

    – হা হা হা হা, তারপর?
    – উনি একদিন খবর আনলেন, নতুন দিদিমিণির নাম হয়েছে “নান”।
    – নতুন দিদিমণি মানে তুমি?
    – হ্যাঁ।
    – নান কেন? তুমি কি নিবেদিতা ইস্কুলের মত সন্ন্যাসিনী সেজে যেতে কলেজে?
    – সে নান নয়। আমি তো বেঁটে, মোটা, নাক খাঁদা, চাকা মুখ। তাই স্টুডেন্টরা নান রুটি নাম দিয়েছে।
    – সেই কথা জানাজানি হতে স্টাফরুমে হুল্লোড় পড়ে গেল। বাংলা বিভাগে ছিলেন শ্যামল সেনগুপ্ত। আজ পঁচিশ বছর হতে চলল, তিনি আজও আমাকে নানু বলে ডাকেন।
    – নানু? জেঠিমা তুমি কলেজের নান রুটি? হা হা হা হা, হো হো হো হো।
    – অত জোরে হাসিস না। পেটে লাগবে। ব্যথাটা কমেছে?
    – কী ব্যথা? ওহ, পিরিওডের? ভুলে গিয়েছিলাম। জেঠিমা খিদে পাচ্ছে, কী খাই?
    – খিদে? ভাত খেতে একটু দেরি আছে। তুই বরং এখন একটা ওমলেট খা।
    – না, না। ওমলেট ভীষণ একঘেঁয়ে। নতুন কিছু খাব।
    – একঘেঁয়ে? ওমলেট? পৃথিবীতে ফ্রেঞ্চ, আমেরিকান, দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান – কতরকম ওমলেট আছে, তুই জানিস?
    – না তো!
    – হুঁ হুঁ, তবে? আজ বরং ফ্রেঞ্চটাই খেয়ে দেখ।
    – তুমি উঠবে না। ঐ ওদের বল করে দেবে। তুমি আমার পাশে বসে থেকে আমাকে হাসাও।
    – না ওটি হবে না। তোর বা রঞ্জার পারটিকুলার কোনো খাওয়া-পরার ব্যাপার হলে সেটা আমি অন্য কারোর ওপরে ছাড়ি না। ও আমার একটা প্রতিজ্ঞা আছে। আরে জামাটা ছাড়। ধরে রাখলে কী করে হবে?

    – আগে প্রতিজ্ঞার ব্যাপারটা বল, তারপরে উঠবে।
    – সে অনেক কথা, এখন সময় নেই, তোদের ছোটবেলার ব্যাপার।
    – বল শিগগির। শর্টেই বল না হয়।
    – একবার পুজোর সময়ে রঞ্জার তখন পাঁচমাস বয়েস। হঠাৎ করে বাড়িতে সকলে বলল, রঞ্জার তো বিজোড় মাসে বয়স চলছে। আর সবাই বাড়িতে আছে। তাই অষ্টমীর দিন ওর মুখে ভাত হবে। সন্ধ্যেবেলা মুখে ভাত হল। বাড়ির দুর্গাপুজোর পায়েস দেওয়া হল। কেউ একজন বলেছিল রুপোর চামচ নেই? তখন ঠাকুর ঘরের রুপোর টাকা টিউব ওয়েলের জলে ধুয়ে তাই দিয়ে ওর মুখে পায়েস দেওয়া হল। তারপর রঞ্জার এমন শরীর খারাপ হল, কুড়িদিন পার্ক নার্সিং হোমে রাত জাগতে হল। আমার তো আগে দু’বার গর্ভপাত হয়ে গিয়েছিল, তোর জেঠু এমন করতে লাগল, বলছে যে এই মেয়ের কিছু হয়ে গেলে মেট্রোয় ঝাঁপ দেব। ঈশ্বরের অশেষ কৃপা, তিনবারের বার ভগবান আর দুঃখ দেননি।

    পরে আমি অনেক ভেবেছি জানিস। সকালের পায়েস, বিকেলে সেটা কয়েকমাসের বাচ্চার পক্ষে বিষ, গ্রামে তো অত ঢাকা-চাপা দেবার অভ্যেস নেই। আর এ বাড়িতে সব কিছু কাজের লোকের ওপরে নির্ভর। রুপোর টাকার কোনো দরকার ছিল না। তাও যখন দেওয়া হল, সেটা মুখে লাগানোর আগে গরম জলে ফুটিয়ে নেওয়া দরকার ছিল। আর এ জায়গাটা ঊপকূল। ভূগর্ভস্থ জলস্তর মাটির খুব কাছে। বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দিয়ে গিয়ে প্রাকৃতিকভাবে ফিল্টার হওয়ার সুযোগ পায় না। তাই জলের কোয়ালিটি খুব খারাপ। এখন আমরা বড়রা কেনা জল খাই। ঐ জলে ধুয়ে বাচ্চার মুখে দেওয়া অন্যায় হয়েছিল। আমি কিন্তু তখন প্রফেসর। পুঁথিগত জ্ঞান-বিজ্ঞান সবই জানা ছিল। কিন্তু আমি হাতেকলমে রান্নাবান্না নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। বইয়ের জগতে বাস করতাম। সবকিছুতে বড়দের ওপরে নির্ভর করে চোখ বুজে বসে থাকতাম। আমি তখন মা হয়েছি, তবে প্রকৃত মা হতে পারিনি। অযোগ্য ছিলাম। সেই ঘটনা থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, রান্না আমায় শিখতে হবে। আর হেঁশেলে কর্ত্রী হতে হবে। মূর্খ রাঁধুনিদের ওস্তাদি বন্ধ করতে হবে। আর সন্তানের খাওয়া দাওয়ার জন্য গুরুজন, লঘুজন কারোর ওপরে ভরসা করব না, ভগবান এলেও না।

    – বুঝলাম, আর আমার কেসটা কী হয়েছিল?
    – আমরা যখন এখানে এই গ্রামের বাড়িতে আসতাম, তোর বাবা তোকেও নিয়ে আসত। তুই তো খুব ছোট তখন, তোর সঙ্গে দেখাশোনার জন্য একটা মেয়ে আসত। এক শীতকালের কথা বলছি। এখানে বালিয়াড়ির ওপরে রাতে বাঘের মত ঠান্ডা পড়ে, সেটা তো জানিস। আমরা হু হু করে কাঁপছি, আর তুই দেখি সোয়েটার খুলে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। আমি বারণ করছি। কিন্তু ঐ মেয়েটা শুনছে না। বলছে – বার বার খুলে ফেলছে, কী করব? পরদিন, তোর বাবা এল ভর দুপুর বেলা, চড়া রোদ, তখন লাফিয়ে উঠে মেয়েটা সোয়েটার, মোজা, টুপি সব পরিয়ে তোকে ঢেকে দিল। তারপরে তোর এমন ঠান্ডা লাগল, হাঁপের টান উঠে, কেশে কেশে দম বন্ধ হবার যোগাড়। সেই তোকেও আবার হাসপাতালে ভর্তি করতে হল। তখন আমি বলে দিলাম, এর পর থেকে যদি তোর বাবা তোকে নিয়ে আসে, আমার তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে, কোনো মেয়ে থাকা চলবে না। আমি যদি আগেই ঐ মেয়েটাকে ঢিট করে দিতাম, তাহলে তোর তো এত কষ্ট হত না। প্রথম দিকে তো অভিজ্ঞতা থাকে না। অনেক ভুল করেছি জীবনে।

    – হা হা হা, ভাগ্যিস ওরকম হল, সেই থেকে আমি তোমার আন্ডারে হয়ে গেলাম। আচ্ছা জেঠিমা, মা যদি আমার কাছে থাকত?
    – সে তো তুই-ই বেছে নিয়েছিলি। কচি গলায় বললি, বাবা জঙ্গলে গেলে জঙ্গলে যাব, জলে গেলে জলে যাব। তোকে তো আর কেউ শেখায়নি।
    – বাবার সঙ্গে, জেঠু, তুমি, রঞ্জা, ঠাকুমা, ঠাকুর্দা, পিসিরা, এই ঘর দুয়ার – ছোটবেলায় মনে হয় ছাড়তে পারিনি। সব মানুষেরই কিছু দুঃখ থাকে, তাই না জেঠিমা?
    – হ্যাঁ, সে তো থাকবেই। আমরা সাধারণ মানুষ, দুঃখ জয় করতে পারি না। কত বড় বড় মানুষের কত দুঃখ থাকে।
    – যেমন?
    – আমাদের নিবেদিতা ইস্কুলের অশেষপ্রাণা মাতাজী, ভগিনী সুধীরাকে নিয়ে একটা বই লিখেছেন – ‘অনন্যা সুধীরা।’ সেই বইয়ে একটা কথা পড়লাম জানিস – খুব খারাপ লাগল।
    – কী কথা?
    – সুধীরার ছোটবেলার বান্ধবী ছিলেন মৃণালিনী ঘোষ (বসু)।
    – তিনি কে?
    – ঋষি অরবিন্দের স্ত্রী।
    – তাঁর কী হয়েছে?
    – আলিপুর বোমার মামলায় ১৯০৮ সালে অরবিন্দ জেলে বন্দি হলেন। তারপরে ১৯১০ সালে পণ্ডিচেরি চলে গেলেন।
    – হ্যাঁ, বইতে পড়েছি।
    – তিনি চলে যাবার পরে মৃণালিনী খুবই ভেঙে পড়েছিলেন। তখনকার সমাজ তো, স্বামী পরিত‍্যক্তা বলে গঞ্জনা দিত। মনে একটু শান্তি পাবার জন্য সুধীরার সঙ্গে বার বার সারদা মায়ের কাছে ছুটে যেতেন। ভগ্ন স্বাস্থ্য, ভগ্ন হৃদয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুতে তিনি মারা যান।

    – সে কী গো, ডাক্তার আর. জি. করের মত এঁকেও স্প্যানিশ ফ্লুয়ে খেল?
    – হ্যাঁ, দেখ – অসুখ, মৃত্যু এগুলো হতে পারে। আমি যখন সমানে কুমুদিনীকে খুঁজে চলেছি। তখন জানতে পারলাম, যে লীলাবতীর মেয়ে কুমুদিনীর পত্রিকায় অরবিন্দ কারাকাহিনী লিখেছিলেন। মানে কারাজীবনের অভিজ্ঞতা সেখানে প্রকাশিত হয়েছিল। ইউটিউবে আছে, শুনতে পারিস। অরবিন্দ ঐ কুমুদিনীর মাসতুতো দাদা, বড় মাসি স্বর্ণলতার ছেলে। কিন্তু এগুলো শুনে, পড়ে আমি অরবিন্দকে নিয়েই মেতে উঠেছিলাম। একবারের তরেও তাঁর বৌয়ের কথা আমার মাথায় আসেনি। সুধীরার জীবনী না পড়লে কোনোদিন অনুভবেও আসত না। ভগিনী সুধীরা তো আমাদের ইস্কুলে মেয়েদের হোস্টেল – মাতৃমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মৃত্যুর আগে বান্ধবী মৃণালিনী হাতের বালা খুলে মাতৃ মন্দিরের মেয়েদের পড়াশোনার খরচের জন্য দিয়ে যান। সেই ফান্ড কিন্তু আজও চলছে। কিন্তু আমি বা আমার বন্ধুরা কেউ এ’কথা জানতাম না।

    – সারদা মা সকলকে ভালবাসতেন। বিরাট গুণ।
    – সে তো নিশ্চয়ই। সঙ্ঘজননী। তিনি ছাতা ধরে ছিলেন বলেই মিশন প্রতিষ্ঠা হতে পেরেছিল। নিবেদিতাকেও আপন করে নিলেন। বিদেশি বলে দূরে ঠেলেননি। বাগবাজারে মেমসাহেব সমাজের নিয়ম ভেঙে মেয়েদের ইস্কুল করছেন, সেখানে উনি দাঁড়িয়ে থেকে উদ্বোধন করছেন। নিজে পুজো করছেন। ইস্কুলের বাড়িতে এসে থাকছেন। সারদা মা এভাবে না আগলালে নিবেদিতার ইস্কুল সমাজে এত দ্রুত গ্রহণযোগ্য হত না। এখন দেখ, সমাজ বদলাচ্ছিল। যুগ সন্ধিক্ষণে বড় বড় ঘটনা ঘটছিল। তাই বলে মৃণালিনীর দুঃখটা তো মিথ‍্যে হয়ে যায় না।

    – সত্যি কথা গো জেঠিমা। আমারও তো কষ্ট হচ্ছে। তাও সারদা মায়ের কাছে হয়তো শান্তি পেতেন। অরবিন্দ অত বড় মানুষ, পণ্ডিচেরির আশ্রমে অল্পবয়সী বৌটার একটু জায়গা হল না গো?
    – অরবিন্দ যখন ডেকে পাঠালেন, তখন তাঁর ওপারের ডাক এসে গেছে। বেঁচে থাকতে যে মানুষটা তাঁকে এত ভালবাসত, তাঁকে অবহেলা করলেন। অরবিন্দের বৃহৎ জীবনে মৃণালিনী কোল্যাটারাল ড্যামেজ।
    – ঠিক, একদম ঠিক কথা বলেছ জেঠিমা।
    – আর একটা অদ্ভুত কথা কী জানিস, আমরা ইস্কুলে পড়ার সময়ে শুনেছিলাম। এই যে তুই বলছিলি না, রান্নার পিসি তোকে, পিরিয়ড হয়েছে বলে মন্দিরে উঠতে বারণ করেছে। সারদা মা এই সংস্কার সেই যুগে মানতেন না। তিনি পুজো করতেন। তাই সেই ছোটবেলা থেকে আমার এই সংস্কার তৈরিই হয়নি।
    – তাই নাকি? টাইগ্রেস জেঠিমা, টাইগ্রেস। সারদা মা বাংলার বাঘিনী। সারদা মা কবে মারা গেছেন।
    – ১৯২০।
    – তার মানে একশ’ বছর আগে যে বাজে সংস্কার ভেঙে গেছে, আজও এই পিসিগুলো সেই অন্ধবিশ্বাস ধরে রেখেছে? আশ্চর্য তো?
    – সেটা ওদের দোষ নয়, শিক্ষার বিস্তারের খামতি, সমাজের ব‍্যর্থতা। তাছাড়া প্রাচীন সংস্কার ভেঙে, নতুন চেতনা সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছোতে সময় লাগে। সবে তো একশ’ বছর গেছে। তবে এখনকার ছেলেমেয়েরা খুব যুক্তিবাদী। এবারে খুব দ্রুত ঐ সংস্কার ভেঙে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস।

    – আচ্ছা জেঠিমা, আমাদের কুমুদিনী তো নিবেদিতা ইস্কুলে ছিলেন। উনি সারদা মাকে দেখেছেন?
    – নিশ্চিত করে বলা তো সম্ভব নয়, তবে দেখার সম্ভাবনা আছে। কল্পনা করা যেতে পারে যে দেখেছেন।
    – হুঁ, কুমুদিনী দেখেছেন কল্পনা করতে পারলে বেশ আনন্দ হয়, যেন আমিই দেখেছি সারদা মাকে।
    – হা হা, কুমুদিনী যদি নাও দেখে থাকেন, তাও তুই দেখতে পাবি সারদা মাকে।
    – কী করে?
    – চলে যা দক্ষিণেশ্বরে। নহবতে, কুঠিবাড়িতে মা আছেন। নয়তো যা জয়রামবাটীতে। আমার মা পার্কিনসনে শয‍্যাশায়ী হবার আগে মাকে নিয়ে শেষবার ওখানেই বেড়াতে গিয়েছিলাম। আশ্রমে ছিলাম। মহারাজেরা এত যত্ন করেন, মা বলেছিল – ঠিক যেন মনে হচ্ছে, মামার বাড়ি এসেছি। ওসব জায়গায় ঘুরে বেড়ালেই মনের চোখে দেখতে পাবি সারদা মাকে।
    – ঠিক যেন, এখনও তিনি বেঁচে আছেন তাই তো? আচ্ছা জেঠিমা, রামকৃষ্ণ তো গলার ক্যান্সারে মারা গেছেন। সারদা মা কী করে মারা গেলেন?
    – তিনি গেলেন কালাজ্বরে। সারা শরীর জ্বরে ভুগে পোড়া কাঠের মত কালো হয়ে গিয়েছিল। নড়াচড়ার শক্তি ছিল না। ঐ বইটাতেই পড়েছি। আগে জানতাম না।
    – সে কী? জেঠিমা, রামকৃষ্ণদেবের গলার কষ্ট নিয়ে যাত্রা হচ্ছে, নাটক হচ্ছে, সিনেমা হচ্ছে, থিয়েটার হচ্ছে। কই, সারদা মায়ের কষ্ট নিয়ে তো কিচ্ছু হচ্ছে না।
    – আরে শান্ত হ’। লাফিয়ে উঠছিস কেন? পেটে ব্যথা লাগবে।
    – আরে, ছাড় তো ব্যথা-ফ্যথা। এসব শুনলে মাথায় আগুন ধরে যায় জেঠিমা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ – বুঝতে পারছ? সব ভাঙচুর করে দিতে ইচ্ছে করে।

    – এখানে কিচ্ছু ভাঙতে হবে না। চুপ করে বোস।
    – নাও জেঠিমা, এবারে তুমি ফ্রেঞ্চ ওমলেট কর। আমি দেখি, মাথাটা ঠান্ডা করতে হবে।
    – বিশেষ কিছু ব্যাপার নয়। দুটো ডিম ফেটিয়ে একটু নুন দিয়ে দিলাম। এই কাঁটা চামচটা দিয়ে ডিমটা খুব ভাল করে ফেটা, যাতে একেবারে ক্রীমি একটা ফেনার স্তর হয়ে যায়।
    – বেশ, করছি। দেখ, হয়েছে?
    – এবারে নন স্টিক প্যান গ্যাস ওভেনে বসিয়ে একটু মাখন দিলাম। মাখনটা গরম হয়ে বুদবুদ কাটবে, কিন্তু লাল যেন না হয়। খুব তাড়াতাড়ি ডিম ফেটানোটা প্যানে ঢেলে দে। এবারে বাঁ হাতে প্যানটা গ্যাস থেকে একটু ওপরে তুলে ধরে দ্রুত হাতে ডিমের মণ্ডটা নেড়ে দিতে হবে। দেখ, কেমন মাঝখানে মাঝখানে অল্প জমে জমে ছানা কাটার মত দেখাচ্ছে। গোল মরিচের গুঁড়ো দিয়ে দিলাম। এখানে চিজ নেই। থাকলে চিজ কুরে দেওয়া যেত। এবারে ওপরের স্তরটা এরকম তরল থাকতে থাকতেই হাল্কা হাতে অমলেটটা রোল করে ফেলতে হবে। চেপেচুপে খোলা প্রান্তটাও আটকে দিতে হবে। হয়ে গেল ফ্রেঞ্চ ওমলেট।

    – বেশ ফুলো আর নরম গো জেঠিমা। এরকম আগে খাইনি। আর আমেরিকান হলে কেমন হত?
    – ওটাও সোজা। শুধু নানারকম সবজি, কিমা, চিজ সব দিয়ে পুর বানিয়ে ওমলেটের ওপরে এক পাশে রেখে অন্য পাশটা মুড়ে দিয়ে আধখানা চাঁদের মত দেখতে হবে। আর পুর দিয়ে বেশ মোটাসোটা হবে।
    – বেশ বেশ, আর ইন্ডিয়ান?
    – যেগুলো বললাম, সেগুলো ওদেশের নামে চলছে বটে, এখানে সব ইন্ডিয়ানাইজড। তবে আসলি ইন্ডিয়ান ওমলেট রান্নার পিসিরা খুব ভাল করতে পারে। বড় বড় পেঁয়াজ কুচি আর বড় বড় কাঁচা লঙ্কার টুকর দিয়ে এপিঠ-ওপিঠ লাল করে সর্ষের তেলে ভাজা দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান পরোটা ওমলেট।
    – ঠিক ঠিক, ছোট থেকে তো ওটাই খাচ্ছি। তবে দেখ জেঠিমা আমাদের মত রান্নার মেগা হটস্পট দেশে একরকম ওমলেটটা ঠিক খাপ খায়? তুমি বল।

    – একরকম তোকে কে বলল? আরো আছে। তোর জেঠু কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করত। তখন বাসনকোসন বলে তো বিশেষ কিছু ছিল না, একটা ছোটমত কেলে-কষটা কড়া আর একটা যোগ্য জুড়িদার হাঁড়ি ছিল। রোজ আলুসেদ্ধ, ডিমসেদ্ধ ভাত খেয়ে অফিসে যেত। মাঝে মাঝে মুখ বদলের জন্য ওমলেট বানানোর চেষ্টা করত। কিন্তু ঐ সুন্দর কড়ায় ওমলেট তুলতে পারত না, ছিঁড়ে যেত। তাই নিজেরাই খুন্তি দিয়ে ছিঁড়ে নিয়ে দ্য ব্যাচেলর্স ভুজিয়া ওমলেট বানাত।
    – হা হা হা, বেশ বেশ, একদিন আমাকেও এভাবেই ওমলেট বানাতে হবে। কিন্তু একটা কথা, এত ডিটেলস তুমি জানলে কীভাবে?
    – তুই কী প্রশ্ন করছিস? আমি জানব না? ঐ অফিসেই তো জেঠুর সঙ্গে আমার দেখা হল।
    – ওহ, হো হো হো হো, সেই আচার দিয়ে প্রোপোজ? আর কোনো প্রকার আছে জেঠিমা?

    – সব শুনতে গেলে বেলা পুইয়ে যাবে। তুই পাহাড়ে যা। দেখবি ডিম ফেটিয়ে তার মধ্যে একদলা সেদ্ধ নুডলস দিয়ে চাউ ওমলেট বানাচ্ছে। বেশ পেট ভরে। আবার আমি যখন কলেজ থেকে ফিরি, পেটে ভীষণ খিদে, হাত পা চলছে না, এদিকে বাড়ির লোকও খিদে পেটে বসে আছে, তখন আমি পটাপট ইনস্ট্যান্ট নুডলস দু’-মিনিটে অল্প জলে সেদ্ধ করে ডিম ফেটানোয় ফেলি। ওটা হল ওয়ার্কিং ওমেন্স চার্মিং ওমলেট। আবার আমাদের বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের ফুটপাথে রেলিঙের ধারে এক দম্পতি খাবারের দোকান করে। আমরা রেলিঙের ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে খাই। মোটা পিস কাটা পাঁউরুটি ফেটানো ডিমের ওপরে ফেলে ঘুরিয়ে মুড়ে দেয়। ওটা হল দ্য ইউনিভার্সাল টিফিন ওমলেট।
    – হা হা হা হা, এ তো দেখছি অষ্টোত্তর শত রকমের দিকে যাচ্ছে।
    – যাবেই তো। ওমলেট হল এমন একটা জিনিস, তুই যেমন করবি তেমন হবে।
    – তালিয়া তালিয়া।
    – এসো এবার নাইয়া। বেলা যায়, চান করে আয়।
    – জেঠিমা, ও জেঠিমা – কোমর কনকন, পা টনটন। আজ চানটা বাদ দেওন।
    – মানে? চান করবি না?
    – চানটা আজ একটু বাদ দিলে হয় না? রান্নার পিসিগুলো বলছিল – এই ক’দিন চান না করতে। আমারও আলিস্যি লাগছে।
    – কর্ণা, ভাল হবে না কিন্তু, আমি অনেকক্ষণ থেকে তোর পিছনে সময় ব্যয় করছি – সেটা রান্নার পিসিদের মুখের ঝাল খেয়ে চান না করার জন্য নয়। পিরিয়ডের সময় আরও বেশি করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। চান তো করতে হবেই। প্যাড কতক্ষণ আগে বদল করেছিস।?
    – কাল রাত্তিরে পরেছিলাম।
    – মানে? সকালে উঠে বদলাসনি? এ ম্যা গো!
    – না না, বেশি দাগ তো লাগেনি এখনও, শুধু ব্যথাটা বেশি হচ্ছিল।

    – আরে মুশকিল, দাগ বেশি না লাগলেও প্রতি বেলায় প্যাড বদল করতে হবে। ঘাম, দেহরস এগুলো আছে না? প্রতিবার ধুয়ে খুব শুকনো করে মুছতে হবে। নইলে ইনফেকশনের ভয় থাকে। শিগগির চানে যা।
    – কিন্তু কমর দর্দ –
    – আমি কুসুম গরম জল বাথরুমে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর কোনো কথা নয়। গেলি? নইলে রু-ণা-দা তোমার সেই বড় লাঠিটা কোথায় গো?
    – আরে যাচ্ছি যাচ্ছি বাবা, উফ্‌ফ্‌।


    ক্রমশ...
  • খ্যাঁটন | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৩৬৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন