• বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  নববর্ষ

  • গুডবাই

    সাদিক হোসেন
    ইস্পেশাল | নববর্ষ | ১৫ এপ্রিল ২০২১ | ১৭৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • তুমি যদি গুডবাই বলো, তার মানে, গুডবাই বলা হয়ে গেল। কিন্তু মরবার আগে, প্রায়শই, এইসব ডায়লগ শেষ করে বিদায় নেবার সময় থাকে না। তাই, তখন, এই আচানক ঘটনাটিকে, যাতে অতটা আচানক বলে না মনে হয়– সেই কারণে, আমরা মৃত্যুকে আখ্যানে বর্ণিত কোন অনুষ্ঠানের মতোই উদযাপন করি।
    আমরা সব থেকে বেশি ভয় পাই ঘেঁটে যাওয়া পরিস্থিতির সামনে দাঁড়াতে। এই ‘ঘেঁটে যাওয়া’র ভেতর কোথায় কী ছন্দ লুকিয়ে রয়েছে তা জানবার জন্য জাসুসি চালাই। এবং প্রত্যাশিত প্যাটার্নটি না পেলে সাজিস রচনা করতে পিছপা হই না। অর্থাৎ, আমরা একইসঙ্গে ডিটেকটিভ এবং ষড়যন্ত্রকারী।
    বা, অন্যভাবে যদি বলা যায়– অনুমান বহির্ভূত যা কিছু, তাকে অনুমানের মধ্যে নিয়ে আসাটাই আমাদের আদিমতম প্রবণতা।
    কিন্তু কেন?
    এলা ব্যাগ থেকে জামাকাপড় গুলো নাবিয়ে ওয়াড্রবে তুলছিল। বলল, কিছু বললি?
    না তো। আমি ভ্রূ কোঁচকাই। ওর জানবার কথা নয় আমি এতক্ষণ ধরে কীসব ভাবছিলাম। তবু আন্দাজ করল কীভাবে?
    এলা এইরকমই। তুমি ওর সঙ্গে থাকলে কখনই অমনোযোগী হবার সুযোগ পাবেনা। ঠিক ধরে ফেলবেই। বললাম, তুই ফ্রেশ হয়ে নে। আমি লবিতে ওয়েট করছি।
    তুই থাকলেও আমি ফ্রেশ হতে পারি। এলা মুচকি হাসল।
    আমি ওকে পাত্তা না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলাম।
    হোটেলের নাম ‘প্যারাডাইস’। লবি বলতে রিসেপশনের সামনে দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা। একজন তেরো-চোদ্দ বছরের ছেলে রিসেপশনে বসে রয়েছে। এই ছেলেটাই এলার ভোটার কার্ড জেরক্স করে এনে দিয়েছিল। রুমসার্ভিসেও ও-ই। এখন সে বেশ সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমি ওর কিউরোসিটি আরও বাড়িয়ে দিয়ে সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ছেচল্লিশের দাঙ্গা’ বইটি খুলে ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’ চ্যাপ্টারটি পড়তে শরু করে দিলাম।
    দাদাজীর মৃত্যুর পর তার দেরাজ থেকে তরবারি হাতে জিন্নাহের একটি ছবি পাওয়া গেছিল। ছবিটি একটি প্রচারপত্র। তাতে কী লেখা ছিল তা ঠিক পড়া যাচ্ছিল না। তবে শিলা সেনের ‘মুসলিম পলিটিক্স ইন বেঙ্গল’ বইটিকে সূত্র হিসাবে ধরে নিলে এই প্রচারপত্রের ভাষা ছিল এই রকমঃ আশা ছেড়ো না। তলোয়ার তুলে নাও। ওহে কাফের, তোমার ধ্বংসের দিন বেশি দূরে নয়।
    আমার ভাবতে বেশ অসুবিধা হয় আমার পূর্বপুরুষ কোনও একসময় এই স্লোগানটির সঙ্গে একাত্মবোধ করেছিল।
    কিংবা এমনও তো হতে পারে, সময়ের উত্তেজনা তাঁকে এতটাই গ্রাস করে ফেলেছিল যে তিনি তাঁর স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিলেন!
    ‘সময়ের উত্তেজনা’ শব্দবন্ধটির প্রতি আমাদের মনোযোগী হওয়া জরুরি। এই শব্দবন্ধটি অনেকটা মদের মতো। এই শব্দবন্ধটি এমন এক পরিসর সৃষ্টি করে যেখানে ব্যাক্তিস্বাতন্ত্রকে অনায়াসেই ঊহ্য রাখা সম্ভব। ‘সময়ের উত্তেজনা’ একটি নেশা, যেখানে এই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মানুষগুলির আচরণকে আমরা তাদের নিজেদের দ্বারা সজ্ঞানে নির্বাচিত আচরণ হিসাবে ভাবতে চাই না। যেন কোনও মাতাল সুনসান রাতে গাল দিতে দিতে ঘরে ফিরছে। ‘সময়ের উত্তেজনা’ লঘু হয়ে এলে, তাই, একটি নিরাপদ আস্তানার সন্ধান আমরা পেয়ে যাব, এটুকু আশা করে থাকি।
    কিন্তু দাদাজী কি শেষপর্যন্ত কোনও নিরাপদ আস্তানার সন্ধান পেয়েছিলেন? কেনই বা তিনি জিন্নাহের ছবিটি কুটি কুটি করে কেটে ছিঁড়ে ফেলে দেননি?
    মৃতদের নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা প্রথমেই তাদের কাজকর্মকে তাদের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। যেন জীবিত অবস্থায় তাদের শরীরটি একটি মাধ্যম ছিল। এই কাজকর্মগুলি সেই মাধ্যমের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন, যখন তার শরীরটি আর নেই, সেই ‘কাজকর্ম’গুলি কোন আধার না পেয়ে, ঠিক আত্মার মতো, হাওয়ার মতো আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
    সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ছেচল্লিশের দাঙ্গা’ বইটি পড়তে পড়তে আমি ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টের দিনটার কথা ভাবছিলাম।
    সাদাসাদা হাওয়া যেন, ভূতের মতো, ভোর হচ্ছে– আমি দেখতে পাচ্ছি...
    তখনও আমাদের গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি আসেনি। ফলে এখনকার মতো লাউডস্পিকারে আজান শোনা যেত না। দম দেওয়া ঘড়িটা চারবার বেজে উঠতেই দাদাজীর ঘুম ভেঙে গেছিল। কিছুক্ষণ পরেই আজান দেবে। তার আগে দাঁতন করে সেহেরি খেয়ে নিতে হবে। এবারে এখনও অব্দি দাদাজীর একটাও রোজা ক্বাযা হয়নি।
    তিনি দাঁতন করতে করতে লক্ষ্য করলেন উঠোনের ডান দিকটা ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছে। তাঁর চোখটা জ্বালা জ্বালা করে উঠল। মনের ভেতর কেমন উদ্বেগ ঘনীভূত হল। কে একজন বিধবা যেন, রোগামতো, এই ভোরবেলা আঁচ ধরিয়ে চারদিক এমন ধোঁয়ায় ভরিয়ে দিয়েছে!
    তিনি বিধবা ও বৈধব্য কোনকিছুকেই চিনতে পারলেন না।
    কে? তিনি যেন শিস দিয়ে ডেকে উঠলেন।
    তখনি ধোঁয়ার ভেতর থেকে যে মুখটি উঁকি দিল, সে আর কেউ নয়, শিয়ালসদৃশ সন্দেহ।
    দাদাজী চমকে উঠলেন।
    ২রা অগাস্ট জিন্নাহকে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের রূপরেখা নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে জিন্নাহ জানিয়েছিলেন, I am not going to discuss ethics.তবে এসব খবর দাদাজী যে পেপার পড়ে জেনেছিলেন, তা নয়। তখন দাদাজীর পেপার পড়ার অভ্যেসও ছিল না। সেই সময় মসজিদে মসজিদে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের সাফল্যের জন্য প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল। দাদাজী সম্ভবত এইসব সোর্স থেকেই প্রত্যক্ষ সংগ্রামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।
    এখন ধোঁয়া কেটে গেছে। দাদাজী তৈরি। ঐ, তিনি চলেছেন ব্রিগেডে।
    দাদাজী চলেছেন; তাঁর পাশে পাশে শিয়ালসদৃশ সন্দেহ।
    একটি জাতি চলেছে আত্মহননের দিকে।
    আমাদের গ্রাম থেকে যে দলটি সোহরাবর্দির ভাষণ শুনতে রওনা দিছিল, তারা শিয়ালদহ স্টেশনে নেমেছিল। আর কিছুক্ষণ পর, ওখান থেকেই ব্রিগেড গ্রাউন্ডের দিকে তারা হাঁটা লাগাবে।
    সকালবেলায় ঠিক কাফনের মতো রোদ বিছিয়ে ছিল কলকাতার রাস্তায়। ঠিক যেন A4 সাইজের সাদা পেইজ। মার্জিন ধরে হেঁটে চলেছে ডট ডট পুরুষ। খসখসে সন্দেহ তাদের সারা গায়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।
    কদিন ধরেই গ্রামে গ্রামে ছুটছাট সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। নদীর ধারে একটা গলা কাটা লাশ কাদায় মুখ ঢুকিয়ে পানি খাচ্ছিল। ভোরের বেলায় দেখা গেছিল একটা বক এসে তার মাথার উপর বসে রয়েছে। কেউ কেউ ভেবেছিল কোথাকার লাশ হয়তো, জোয়ারের জলে ভেসে এসেছে, এখন জল সরে গেলেও মৃতদেহটি বাঁধা পড়ে গেছে। কিন্তু ওল্টানো হলে, সেটিকে চেনা গেল। সে ইয়াসিন। মাস খানেক আগে লীগে জয়েন করেছিল। এখন তার ফাঁক হয়ে থাকা গলায় কাদাপানি আর ঘাসের টুকরো ঢুকে রয়েছে।
    বউবাজারে ঢোকবার আগেই দাদাজীদের দলটা থেমে গেল। মানিকতলায় ২জন খুন হয়েছে। বউবাজারে লোকজন বল্লম নিয়ে ঘোরাফেরা করছে। কানে পাতলেই শোনা যাচ্ছে আরও অনেক কিছু।
    সেহেরি খাবার পর কলসি থেকে পানি ঢালতে গিয়ে দাদাজি খানিক থেমে গেছিলেন। সেই সময় নদীর পানি, পানির টানে দুলতে থাকা গলা কাটা মুর্দা নাকি আলো ফোটার পরেই সফেদ বকের উড়ে চলে যাওয়া-- কোনটি তাঁকে সবথেকে বেশি ভাবিয়ে তুলেছিল তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও, কলসি আর ঠোঁটের মধ্যিখানে আজান চলে আসায় তিনি সেহেরি খাবার পর আর পানি খেতে পারেননি।
    এখন তাঁর গলা শুকিয়ে গিয়েছে। জিভ আঠাল। তবু থেমে থাকলে চলবে না। দলটি আবার হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে।
    তুই বসির আলি, না? মাগুরার বসির আলি?
    হ। উত্তর দিয়েই দাদাজী চমকে উঠলেন। কে তাঁকে প্রশ্ন করল? তিনি আশপাশ তাকিয়ে আবার হাঁটতে লাগলেন।
    তুই রমজানকে চিনিস? কাদেরের বাপ রমজান? তোদের ঘরের উত্তর দিকে ওনার বাসা।
    কে? কে কথা বলে?
    আমি রে, আমি।
    কে?
    দাদাজী কোন প্রশ্নকর্তাকেই দেখতে পেলেন না।
    সেবার খালেদ মিঞার পুকুর কাটানোর সময় শিং মাছ ধরে ছ্যালো মনিরুদ্দুন। থামির ভেতর মাছটাকে নিয়ে তার কী দৌড়। ওদিকে ভাগ্যের মালিক আল্লা। মাছ বাছতে গে’ কাঁটা খেল আক্তারি। বলে কী না আঙুল থেকে কাঁটা নাকি বুকের দিকে উঠে আসতেছে। তখন ওনাকে নিয়েই টানাটানি পড়ে গেল। তোর মনে নাই?
    দাদাজী ঢোঁক গিলতে যাচ্ছিলেন। এদিকে থুতু গলার নিচে নামলেই রোজা ভেঙে যাবে। দলটা এগিয়ে গিয়েছে। তিনি পা চালিয়ে আবার দলটার সঙ্গে মিশে যেতে লাগলেন।
    তবু সন্দেহ তাঁর পিছু ছাড়ল না।
    আবার কিছু কিছু সন্দেহকে জিইয়েও রাখতে হয়। সিঁড়িতে পায়ের শব্দে তাকিয়ে দেখলাম রিসেপশনের ছেলেটা এখনো আড়চোখে আমাকে দেখছে।
    এলা ফ্রেশ হয়ে নেমে এসেছে। চল্। ও অর্ডার করল।
    এলার চুল ভিজে ভিজে। কানের পাশ থেকে ঘাড় বেয়ে যে জলের রেখা ওর টি-শার্টের ভেতর ঢুকে গেল তা ঘাম নয়; ঐ জলে সাবানের গন্ধ লেগে রয়েছে।
    এলা বলল, কোথায় খাবি?
    তুই বল।
    আমি ভাবছিলাম কী... এলা তার ভেজা চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলল, প্রথমে ভেবেছিলাম কতদিন পর কলকাতায় এলাম, বাঙালি খাবার খাব। কিন্তু এটা খুব প্রেডিক্টেবল হয়ে যাবে না? চল্ এক্সপেরিমেন্ট শুরু করা যাক।
    এলা প্রায় গলা ধাক্কা দিয়ে আমাকে রাস্তায় নামাল।
    কখন বৃষ্টি হয়েছিল খেয়াল করিনি। রাস্তাঘাট কাদায় প্যাচপ্যাচ করছে। তার মধ্যে একজন বয়স্ক মহিলা পিছলে পড়ে গেছিলেন। তাঁকে নিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড।
    এলা আমার থেকে খানিকটা এগিয়ে চলছিল। আমি দেখছিলাম, ও কেমন কলকাতার কাদামাটি মেখে দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছে। ওর স্লিপার থেকে ছিটকে বেরনো নোংরাগুলো যেন অনিয়ন্ত্রিত সংলাপ। যাকে অর্থপূর্ণ করে তুলবার জন্য নাট্যকার কোনরকম প্রচেষ্টা চালায়নি। যেন এগুলো আছে, তাই আছে; না থাকলেও কোনও খামতি হত না।
    এলা বলল, তুই প্রপের মতো বইটা ক্যারি করছিস কেন? রুমে রেখে আসতে পারতিস। আমার সামনে নিশ্চয় বই খুলে বসবি না এখন!
    তা বটে। আমি প্রসঙ্গ পাল্টালাম, কলকাতায় আসার পেছনে তোর প্ল্যানটা কী বল তো? জিজ্ঞেস করলেই চেপে যাচ্ছিস।
    বারে এখানে বড় হয়েছি, কলেজ লাইফ কাটিয়েছি, এখন থাকি না তো কী! সব টান তো আর শেষ হয়ে যায়নি।
    আজ্ঞে বুঝেছি। মানে টান।
    টাআআন। এলা ঘুরে গিয়ে বলল, মানে টাআআন। বুঝলি গরু!
    মানে রহস্য ঘনীভূত হোক?
    ঐ আর কী। এলা হঠাতই থেমে গেল, ধোসা খায়েগা?
    রেস্তোরাঁয় ঢোকার পরেই আবার ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আমরা তখন সবে খাওয়া শুরু করেছি।
    এলা বলল, আজকেই কাজটা সেরে ফেলব। তারপর দুদিন পুরো ফ্রি। তুই কিন্তু আমার সঙ্গে এখন যাচ্ছিস।
    আমি তো অফিস ছুটি করে নিয়েছি। যেতেই পারি। কিন্তু যাবটা কোথায়?
    আর কোন কমেন্টস নেই। ও মনযোগ সহকারে ধোসার আলু চিবোচ্ছে।
    কীরে?
    ভাবছি?
    কী?
    ও আমার বইটার দিকে তাকাল, ভাবছি তুই হঠাৎ ছেচল্লিশের দাঙ্গা নিয়ে কেন গল্প লিখতে যাচ্ছিস।
    ধুর কোথায় আর গল্প। এমনিই পড়ছি। কতগুলো ইমেজ মাথায় আসছে। কিন্তু এখনও কোন গল্পের দিকে ঠিক এগোতে পারিনি।
    লেগে থাক। তোর হবে।
    সে তো দেখতেই পাচ্ছি।

    কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টি থেমে গেলে এলা বেশ তৎপর হয়ে উঠল, চল্, আর দেরি করব না, ভিসিটিং আওয়ার্স শুরু হল বলে।
    যাচ্ছিটা কোথায়?
    শ্বশুরবাড়ি।

    কলকাতা শহরে ট্যাক্সিওয়ালারা মেয়েদের কথা শোনে বেশ। এলা একচান্সেই একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেল। তবে আমি ওর মুখে কেমন টেনশন দেখতে পাচ্ছিলাম। এলা আর আমাকে ধন্দে রাখল না--
    এলার প্রাক্তন শ্বশুর বার্ধক্যজনিত কারণে বেশ কিছুদিন যাবৎ ভুগছিলেন। এর মধ্যে একটা মেজর স্ট্রোক হয়ে গেছে দিন পনেরো আগে। বামদিক প্যারালাইসড। এখন আমরা ওনাকে দেখতে হসপিটালে চলেছি।
    ট্যাক্সি থেকে নেমে এলা একটু দাঁড়াল। যেন সে নিজের মধ্যেই নিজে ধাতস্থ হতে চাইছে। তারপর একাই হসপিটালের গেটের ভিতর চলে গেল।
    আমি এলার এই পেছন ফিরে না তাকিয়ে চলে যাওয়াটাই দেখছিলাম। সে যাচ্ছে। গেট পেরিয়ে, এমারজেন্সি ইউনিট পেরিয়ে...অনেক দূর পর্যন্ত তাকে দেখা যাচ্ছে। তারপর আর দেখা যাচ্ছে না।
    এলার এই ‘যাওয়া’ আর দাদাজীর ব্রিগেড গ্রাউন্ডের দিকে রওনা দেওয়া– এই দুই যাত্রা শুধু যে পরস্পরের বিপরীত তা নয়, কোন এক বিন্দুতে তারা পরস্পরকে ইন্টারসেক্টও করে।
    এলা তার প্রাক্তন সম্পর্কগুলির দিকে ফিরে যাচ্ছে। তার যাওয়ার মধ্যে অনেকাংশেই ফেরার অনুভূতি লুকিয়ে রয়েছে।
    অন্যদিকে দাদাজীর প্রতিটা পদক্ষেপ যেন তার পূর্ববর্তী পদক্ষেপকে এড়িয়ে চলতে চাইছে। তাই সন্দেহ যখন প্রায় শিয়ালের ভঙ্গিমায় তাঁকে গাঁ-গেরামের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, তিনি যারপরনাই বিব্রত বোধ করছেন। দাদাজীর ‘যাওয়া’ মূলত স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হবার একটা প্রসেস। তিনি এই প্রসেসটিকে ব্যাবহার করে স্মৃতির বাইরের কোন অঞ্চলে থিতু হতে চলেছেন। স্মৃতি এখানে মার্তৃগর্ভ সদৃশ। মার্তৃগর্ভ থেকে নির্গমন সম্ভব হলে তবেই জীবিতের নিজস্ব আইডেনটিটি প্রাপ্তি ঘটবে।
    হ্যাঁ, ১৯৪৬ সালের ১৬ই অগাস্ট দাদাজীর গায়ে গর্ভস্রাব লেগেছিল।
    ফিরে এসে এলা বিশেষ কথা বলল না। আমি তাকে চায়ের ভাঁড় এগিয়ে দিতে সে প্রথমে সিগারেটে সুখটান দিল।
    সন্ধে থেকে রাত অব্দি আমরা এমনিই ধর্মতলার রাস্তায় ঘুরলাম। এলা ফ্রুট জুস খেল। একটা ৭৫০-এর বোতল তুলল। একসময় বলে ফেলল, মাথার ভেতর হিংসুটেপনা কিরকির করছে।
    ওকে যখন হোটেলে পৌঁছে দিলাম তখন রাত সাড়ে দশটা। কোনরকমে লাস্ট ট্রেনটা পেয়ে গেছিলাম।
    Direct Action Dayy- লিখে গুগুলে সার্চ করলে একটা জমায়েতের ছবি দেখানো হয়। সাদাকালো অপরিষ্কার ছবি। প্রচুর মানুষ সামনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তারা কিছু একটা শুনছে, বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কারোর মুখ স্পষ্ট নয়। আমি জুম করে মুখাবয়বগুলি দেখতে চাইছিলাম। কিন্তু ছবির কোয়ালিটি এতই খারাপ যে স্ক্রিন জুড়ে শুধু পিক্সেল ফুটে উঠল।
    তিনদিন দাদাজীর কোন হদিস ছিল না। সেই সময় আব্বার বয়স ৫-৬ বছর। আব্বার বিশেষ কিছু মনে নেই। তবে দাদাজী বুঝি আর ফিরবেন না, এমন কথা আব্বা শুনেছিল, এটুকুই তার মনে আছে।
    দাঙ্গাবিধ্বস্ত শহরে দাদাজী কিভাবে তিনদিন কাটিয়েছিলেন? তিনি কি নিজের চোখে কোন হত্যা দেখেছিলেন?
    সাদা কাগজ চেটে চেটে একটা শিয়াল কালির দাগগুলোকে তুলে ফেলবার চেষ্টা করছে। রাত্তিরে স্বপ্নে দেখেছিলাম।

    অফিস যাব ব’লে তৈরি হচ্ছি, এলার ফোন এল– চলে আয়।
    গিয়ে দেখি সে রিসেপশনের ছেলেটার সঙ্গে তুমুল গল্প জুড়ে দিয়েছে। এখন আর ওর মুখে কোন টেনশনের ছাপ নেই। কাল বিকেলের মেয়েটা যেন অন্য কেউ ছিল।
    এলা আমার সঙ্গে ছেলেটার পরিচয় করিয়ে দিল, ও ভরত। ভরত শাহ। তবে আমরা ওকে ভারত বলেই ডাকতে পারি। কীরে তোকে ভারত বললে তুই কি রাগ করবি?
    ছেলেটা আমার দিকে চেয়ে হাসল।
    আমরা তিনজনেই বেরিয়ে পড়লাম।
    যথারীতি জানা যাচ্ছে না কোথায় যাচ্ছি।
    রিসেপশনে তখন অন্য একজন বসে।

    ট্যাক্সি থামল মোমিনপুরে। ভরতের চোখে সস্তার সানগ্লাস। এলা তার ডিএসএলআর থেকে ছবি তুলতে তুলতে হাঁটা লাগাল।
    মোমিনপুর থানার পাশেই হাতে-টানা রিক্সা স্ট্যান্ড। সেখান থেকে ডান দিক ঘুরে কিছুদূর এগোলে ‘প্রিয়াঙ্কা স্টুডিও’। এলা স্টুডিও পেরিয়ে আবার ডান দিক টার্ন নিয়ে একটা সরু গলির মুখে এসে দাঁড়াল।
    আমরা ওকে ফলো করছিলাম। কাছে যেতেই একটা নতুন তিনতলা বাড়ি দেখিয়ে বলল, এটাই ১৮ বি।
    তো? আমি ভরতের দিকে তাকিয়ে অবাক। ভরতও তথৈবচ।
    এলা ক্লাস নেবার ঢঙে জানাল, লেট পান্না চ্যাটার্জী এখানে থাকতেন। অবশ্য এই বাড়িটায় নয়। তখন এখানে একটা একতলা বাড়ি ছিল। চার ভাইয়ের একান্নবর্তী সংসার। ১৬ অগাস্ট এদের বাড়ি অ্যাটাকড হয়েছিল। তিন ভাইকেই খুন করা হয়। একমাত্র হীরানাথ শুধু প্রাণে বেঁচে গেছিল। পরের দিন যখন তাঁকে বাথরুমে খুঁজে পাওয়া গেল, তখনও তার জ্ঞান ফেরেনি।
    এসব কী বলছিস তুই?
    এলা আমাকে পাত্তা না দিয়ে ভরতের দিকে তাকাল, মিস্টার ভারত তুমি কি রিয়ালাইজ করতে পারছ আমি কী বলছি? জাস্ট ট্রাই টু লিসেন। কান পাতো। কান পাতলে তুমিও শুনতে পাবে কিভাবে ৩০ জন ৪০ জন মানুষ ঘেন্নায় গিজগিজ করতে করতে এই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। তোমার পাশ দিয়ে এখুনি একজন তলোয়ার নিয়ে চলে গেল। দেখতে পেলে?
    এলার নাটকীয়তায় ভরত কী করবে বুঝতে পারছিল না। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। ভরতকে হাসতে দেখে এলা নিজেও হেসে ফেলল।
    বুঝলি। আমরা ততক্ষণে আবার মেইন রোডে উঠে পড়েছি। এলা সিগারেট ধরিয়ে সেনটেন্সটা কমপ্লিট করল, প্রাক্তন হাজব্যান্ড একজন করাপ্ট পুলিশ অফিসিয়াল হলে অনেক সুবিধে পাওয়া যায়।
    সে তো দেখতেই পাচ্ছি।
    এলা আর কথা বাড়াল না।

    খিদিরপুর থেকে কয়েকজন যুবক বালিগঞ্জের লেকে সাঁতার কাটতে গেছিল। ফেরবার মুখে তারা ভবানীপুরে দাঙ্গার কথা শোনে। সেই থেকেই এই অঞ্চলে উত্তেজনা চলছিল।
    বেলার দিকে একজন মুদির সঙ্গে দোকান খোলা নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের বচসা শুরু হয়। বচসা থেকে হাতাহাতি। দোকানদার ছুরিকাহত হলেন।
    বিকেল পর্যন্ত থমথম করছিল পুরো এলাকা। মগরেবের নামাজের পর ‘নারা-এ-তকবীর’ শোনা গেল।
    ‘পাঠক বাড়ি’ বলে পরিচিত একটা হিন্দু বাড়ির উপর বোমা ফেলা হল।
    শিশির সরকারকে নিয়ে ক’ঘর হিন্দুদের বসবাস। বোমার শব্দে সেইসব ঘরগুলোতে আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিশ্চুপ পাড়া। পাড়ার ভেতরে কালো কম্বলে ঢাকা রয়েছে কতগুলো ঘর। কম্বলের তলায় জীবিতেরা পরস্পরের গায়ে নিশ্বাস ফেলছে।
    নেড়ি কুত্তারা ঘরের পাশে এসে কেঁদে যাচ্ছে যেন।
    শিশিরবাবু দরজায় কান পেতে সেই কান্না শুনছেন।
    ছাদে উঠলে দেখা যায় মশাল নিয়ে মিছিল চলেছে। সেই মিছিল থেকে ‘আল্লা-হো-আকবার’ ধবনি উঠছে বারবার।
    বাচ্চা আর মেয়েদের একটা ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তালার চাবি এখন শিশিরবাবুর পকেটে। তাঁর হাতে বন্দুক। তিনি ছাদে চলেছেন।
    মশাল নিয়ে এগিয়ে আসছে নারা-এ-তকবীর। গাছগুলো আর আকাশ থমথম করে উঠল। শিশিরবাবু বন্দুক তাক করলেন।
    ওয়ান...টু...থ্রি...ফায়ার।
    তারপর কালো। কোলাপসিপল গেটটা ভেঙে ফেলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। শিশিরবাবুর বিধবা দিদি তপতী; সে চেঁচিয়ে উঠল নাকি! ছাদের উপর কেউ আসছে না কেন? কেউ আসছে না কেন এখনও?
    শিশিরবাবু দখল হয়ে যাবার অপেক্ষায় বন্দুক নিয়ে বসে আছেন একা...

    শিশিরবাবুর দুই নাতি। বড় জন ব্যাঙ্গালোরে সেটেলড। ছোটর নাম সুভাষ। আমরা ওনার সঙ্গেই কথা বলতে এসেছি।
    এলা বুঝি সুভাষের সঙ্গে গতকালেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্সড করে রেখেছিল। তখন আমাকে কিছু জানায়নি। জাস্ট মিট করবার আগে জানাল, একটা ছোট্ট ঢপ দিতে হয়েছে। আমরা ওখানে যাচ্ছি একটা অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে। ওদের সঙ্গে কথা বলে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ নিয়ে নিউজ পেপারে ফিচার লিখব। আমি ‘দ্য হিন্দু’র জার্নালিস্ট। তুই কো-রাইটার।
    আর ভারত?
    ও জাস্ট আমাদের সঙ্গে আছে। এমনিই।
    সুভাষবাবু যদি আইডি কার্ড দেখতে চায়?
    শোন। এলা মুচকি হেসে বলল, প্রত্যেকের জীবনেই একজন করাপ্ট পুলিশ অফিসিয়াল থাকা অত্যন্ত জরুরি।
    অগত্যা আমরা সুভাষ সরকারের মুখোমুখি।
    সুভাষের বয়স আমার মতোই। এই ৩৫ কি ৩৬ হবে। ঘরদোর দেখে বোঝা যাচ্ছে পুরনো স্ট্রাকচারে তেমন পরিবর্তন আসেনি। তবে আমরা যে ঘরটায় এসে বসেছি তাতে এসি চলছে।
    সুভাষের স্ত্রী চা নিয়ে এল। সঙ্গে বিস্কিট আর দু’ প্লেট মিষ্টি।
    ভরতের দৃষ্টি মিষ্টির উপর নিক্ষিপ্ত। এলা ইশারায় অনুমতি দিতে তা জিহ্বার সান্নিধ্যে চলে গেল।
    এলা ছবি তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করল, সেদিনের সম্পর্কে কিছু বলুন।
    সুভাষ তাঁর স্ত্রীর দিকে তাকালেন, আমি তো তেমন বিশেষ কিছু জানিনা। কী বলব! আপনি জিজ্ঞেস করুন আমি বরঞ্চ উত্তর দিই।
    একজ্যাক্টলি। এলা ছবি তোলা থামিয়ে বলল, একটা সিগ্রেট ধরাতে পারি?
    সুভাষের স্ত্রী এসি অফ করে জানালা খুলে দিল।
    এলা পাকা জার্নালিস্টেদের মতোই শুরু করল, ফার্স্টলি আমাদের কনসেপ্টটা আপনার সঙ্গে শেয়ার করে নেওয়া উচিত। তাতে আপনিও ফ্রিলি কথা বলতে পারবেন। আমাদেরও সুবিধে হবে। আমরা এই ফিচারটাকে একটু অন্য এঙ্গেলে ভেবেছি। আমরা চাইছি সেইদিনের ভিক্টিমদের পরিবারে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ নিয়ে যেসব গল্প চালু রয়েছে, যেগুলো ইতিহাসের বইতে আমরা পাই না, সেই গল্পগুলিকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরব।
    আচ্ছা। সুভাষ বেশ গম্ভীর।
    এলা চায়ে চুমুক দিল, এবার আপনি বলুন সেইদিনটাকে নিয়ে আপনি আপনার বাবা-মার কাছ থেকে কী কী শুনেছিলেন।
    আমার বাবার বয়স তখন খুবই ছোট। আমার মা ছিলেন বর্ধমানের মেয়ে। তা আমার মামারবাড়ির ঐদিকে কোনও দাঙ্গা হয়েছিল কিনা তা তো কোনদিন শুনিনি।
    আপনার বাবার কথা বলুন।
    ঐ যে... কী বলতে গিয়ে সুভাষ থেমে গেলেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে উনি বাল্যস্মৃতি মনে করতে চাইছেন। যে সময়টায় শিশুরা বাবার কাছ থেকে রূপকথার গল্প শুনে থাকে।
    এলা সুভাষকে জানালার দিকে মুখ ফিরে দাঁড়াতে বলল। জানালার ওপারে খিদিরপুরের ঘিঞ্জি অঞ্চল। অনবরত ট্রাফিকের শব্দ ঘরের ভিতর ঢুকে আসছে। আমি সিওর নই এলার ক্যামেরা এইসব পরিপেক্ষিতকে স্থিরতা দিতে সক্ষম কি না।
    আপনি আপনার বাবার কথা বলছিলেন।
    হ্যাঁ। সুভাষ আবার চেয়ারে এসে বসল, আমার বাবার বয়স তখন খুব ছোট ছিল। ওনার বিশেষ কিছু মনে থাকার কথা নয়। তবে ঐ দিনটার কথা বলতে গেলেই উনি আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। হাজার হোক নিজের বাপকে হারিয়েছিল তো... ঐ আর কি... তবে ওরা আমাদের পরিবারের মেয়েদের গায়ে হাত দেয়নি। টাকাপয়সা সব লুট হয়ে গেছিল। ঠাম্মা তো বাবাকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিলন। সেখানে অনেকদিন পর্যন্ত ছিলেন। প্রায় বছর খানেক। তারপর, বোধহয় ৪৭এর পরে, আবার এখানে আসতে পারলেন।
    উনি কখনও এই ঘরটা বিক্রি করে দিয়ে অন্য জায়গায় চলে যাবার কথা ভাবেননি? মানে এখানেই তো উনি ওনার স্বামীকে খুন হতে দেখেছিলেন। সেই একই জায়গায় ফিরে আসা, বসবাস করা নিশ্চয় খুব কঠিন।
    তা তো বটেই।
    হয়তো সেদিনে যারা তোমাদের ঘর অ্যাটাক করেছিল... তুমিই বলছি তোমাকে... তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে উনি চিনতেন। রাস্তাঘাটে আবার তাদের সঙ্গে দেখাও হয়ে যেতে পারত। এই পসিবিলিটির মধ্যে বেঁচে থাকাটা তো অলমোস্ট আনবিয়ারেবল। তাই না?
    সুভাষ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কিন্তু কোন উত্তর দিলেন না।

    আমরা একটি সমাজকে তার না বলতে পারা কথাগুলোর মাধ্যমেই চিনতে পারি। কথাগুলো এলা বলেনি। ঘরে ফিরে তরবারি হাতে জিন্নাহের ছবিটা আবার দেখতে দেখতে আমার নিজেরই মনে হল। কিন্তু না বলতে পারা কথাগুলো আমরা জানব কিভাবে?
    সোহরাবর্দির ভাষণ শুনতে গিয়ে দাদাজী তিনদিন লাপাত্তা ছিলেন। হয়তো তিনি খিদিরপুর, মোমিনপুর বা একবালপুরের কোথাও, কোন দোস্তের চেনাশোনা কোন বাড়িতে মাথা গোঁজার ঠাই পেয়েছিলেন। কাছেদূরে টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটার শব্দ। মাঝে মাঝেই গুজব শোনা যাচ্ছে গরচার বস্তিতে আগুন লাগানো হয়েছে। এন্টালি জ্বলছে। থাকতে থাকতে দাদাজী শিউরে উঠছেন। কলেজ স্ট্রীটের জুতোর বাজারে আগুন লাগলে সেই আগুন বহু দূর থেকে দেখা গিয়েছিল।
    আমি দেখতে পাচ্ছিলাম একটা ৫ বছরের ছেলে উঠোনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে সামনের কাঁচা রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে। ঐ রাস্তা দিয়ে যে ঘরে ফিরছে সে ওর বাবা।
    দাদাজী দৌড়ে এসে ছেলেটিকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর তাঁকে চুমু খেতে খেতে নিঃশব্দে, প্রায় লুকিয়ে, ঘরে ঢুকে গেলেন।
    পরের দিন অফিস থেকে যখন ‘প্যারাডাইস’-এ গেলাম, এলা ততক্ষণে যথেষ্ট কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। ওর রুমে গিয়ে দেখি ভরত মেঝেয় শুয়ে বেহুঁশ। ওর হাতে যেটা জ্বলছে সেটা সিগারেট নয়।
    এলা বলল, বস, আমার পাশে এসে বস। তোর গল্প কতদূর?
    আমার বেশ ভয় করছিল, সেটা এখনও শুরু করিনি। কিন্তু এটা তুই করছিস কী? ভরতকে চরস খাইয়েছিস? ও এই হোটেলেই কাজ করে। জানাজানি হলে কী হবে জানিস? তোর তো কিছু হবে না। ওর কিন্তু চাকরীটা চলে যাবে।
    ওর নামটা এত সুইট। এলা প্রায় টলছিল, খাইয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ ঘুমোক। সব ঠিক হয়ে যাবে।
    তুই কিছু খেয়েছিস? খাবার আনাব?
    এলা ঝট করে শুয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ আর কোন সাড়াশব্দ নেই। তারপর আচমকাই উঠে বসল, তুই গল্পটা লিখছিস না কেন?
    চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে সে আবার খানিকটা স্বাভাবিক।
    দাদাজীর দেরাজ থেকে জিন্নাহের ছবি পাবার গল্পটা শুনে বলল, এটা তেমন কিছু নয়। ছবিটা দেরাজে রেখে দিয়েছিল। তারপর ভুলে গিয়েছিল। সব কথা সবসময় সবার মনে থাকে নাকি?
    আমি কিছুতেই ওর কথা মানতে পারছিলাম না। ওকে বললাম, আমাদের ফ্যামিলি সচেতনভাবেই এই ট্রুথটাকে ভুলে যাবার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। তা না হলে এত বড় একটা ঘটনা কেন আমি এতদিন পর জানালাম!
    ট্রুথ? এলা বেশ জোরের সঙ্গে হেসে উঠল, ট্রুথ...ট্রুথ...ট্রুথ হল ফ্যামিলির ছোট মেয়েটার ভ্যাজাইনার মতো। এটার এক্সিসটেন্স সব্বাই স্বীকার করে। কিন্তু এটার সামনাসামনি হতে কেউ রাজি থাকে না।
    এলা আগে থেকেই দুটো জয়েন্ট বানিয়ে রেখেছিল। সেটা শেষ হতে না হতেই মদ। সারাদিন অফিসে খাটাখাটনি গেছে। আমি আর তাকাতে পারছিলাম না। ও প্রশ্নটা করেই ফেলল, তুই কি চাস আমার কাছে?
    এসব প্রশ্নের কি কোনও সোজা উত্তর আছে? আমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। ও আমাকে টেনে নিল, I am not going to discuss ethics.
    এলা খাট থেকে নেমে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। ও ন্যাংটো। নিজের দিকে তাকিয়ে খুব সহজেই বলল, I am menstruating. তারপর যেন মুচকি হাসল, But I am not going to discuss ethics.
    এলা আমার উপর উঠে এসেছিল। প্রতিবারের ধাক্কায় খাটটা নড়ে উঠছিল। আওয়াজ হচ্ছিল। আমি আর এলার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। তবে আমি যে এলার শরীরের রক্তে ক্রমশ ভিজে যাচ্ছি তা বুঝতে পারছিলাম।

    যখন ঘুম ভাঙল, দেখি রুমে কেউ নেই। ভরত নেই। এলা নেই। এমনকি এলার রুকস্যাকটাও নেই।
    আমি দৌড়ে গিয়ে ওয়াড্রব খুললাম। ওয়াড্রব ফাঁকা।
    পুরো মাথা ব্লাঙ্ক।
    কতক্ষণ ধরে বসে আছি খেয়াল করতে পারছিলাম না। যেন এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা ধরে এখানেই এই রক্তমাখা বিছানাটায় বসে রয়েছি।
    এলা হোটেলের বিল মিটিয়ে দিয়েছিল। আমি যখন ‘প্যারাডাইস’ থেকে বেরোলাম তখন প্রায় দুপুর দুটো বাজে।
    এলার ফ্লাইট দুটো পনেরোতে। এখন ও হয়তো চেকিং-এ ব্যস্ত। ফোন করলে এনগেজড টোন পাব। কিংবা সুইচড অফ।
    ওকে গুডবাই লিখে হোয়াটস-আপ করে রাখব?
    আমি হাঁটতে হাঁটতে এসবই ভাবছিলাম।
    তারপর কখন চায়ের দোকানে ঢুকে পড়েছি বুঝতেই পারিনি।
  • বিভাগ : ইস্পেশাল | ১৫ এপ্রিল ২০২১ | ১৭৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
চম - dd
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই প্রতিক্রিয়া দিন