• বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  নববর্ষ

  • ঐপার

    অনুরাধা কুন্ডা
    ইস্পেশাল | নববর্ষ | ১৫ এপ্রিল ২০২১ | ৫৭৬ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • নয়নতারা একগামলা ভাত গোয়ালে গরুর মুখের সামনে ঢেলে দিলেন।
    ছেলের রাগ হল।ছেলের বউ দুপদাপ করে উঠে দোরে খিল দিল।
    এই বাজারে এক গামলা ভাত নষ্ট করার আক্কেল নয়নতারার কী করে হয়!
    অনেক কষ্টে জমিটুকু কেনা গেছে।এখন নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।নেহাত বড়ছেলের মাষ্টারি আর টিউশন আছে তাই ভিক্ষে করতে হচ্ছে না।
    উঠে যাবার আগে বড় বউয়ের মুখে এই কথাগুলো নয়নতারাকে শুনতে হল। আবাগীর বেটির দেমাক কত! বর দু পয়সা কামায় বলে মেজাজ কত! ভাতের খোঁটা দেয়! নাতনিটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল।নয়নতারা পোনা মাছের ঝোলে আলু, উচ্ছে, বেগুন , পলতাপাতা সব ছেড়ে দিয়ে খুন্তি নাড়তে লাগলেন। রেগে গেলে মাথাতে আগুন জ্বলে।
    দোষের মধ্যে নয়নতারা চাল অনেকটাই বেশি নিয়ে ফেলেছিলেন আজ। খাওয়ার মুখ আটটা।নাতনির খোরাক ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। ভাত রান্না হল ষোলো জনের। ভাদ্র মাসের গরমে ভাত জল দিয়ে রাখলেও ওবেলা গ্যাঁজলা উঠে যাবে। এত ভাত তবে কী হবে?

    ছেলে বলেছিল আজ মায়ের হাতের রান্না খাবে।তাতেই নয়নতারার মাথাটা ধরেছিল। পার্টিশন! যত দোষ পার্টিশনের। না হলে এক গামলা ভাত রান্ধনের জন্য নয়নতারাকে ছেলে বৌ খোঁচা দিতে পারে? তাও যদি আরেকটা ছেলেপুলে হত। একটা মেয়ে নিয়ে দ্যাবাদেবী সারাক্ষণ আদিখ্যেতা করছে! মাণিকগণ্জের বাড়িতে নয়নতারা নিজের সাতটা ব্যাটা বেটির সঙ্গে কতগুলো ভাগ্নে ভাগ্নীও মানুষ করে ফেলেছেন। তবে ভাত রাঁধতে হত না। অতগুলো মানুষের ভাতের হাঁড়ি কি তেরো বছরের নতুন বউ সামলাতে পারে না মাড় গালতে পারে? বড় জা আর শাশুড়ি প্রায় সমবয়সী। তাঁরাই বলেছিলেন , এ বাড়িতে বউরা ভাতের মাড় গালে না। অত বড় হাঁড়ির ওজন বউ মানুষের নেওয়া নিষিদ্ধ। মাড় গালে মইনা নাগী। মণিভূষণ নিয়োগী।বাপ মা মরা ছেলে। ভাতের মাড় গালা থেকে শুরু করে তরতর করে নারকেল গাছে উঠে নারকেল পাড়া, সব পারে।এমনকী ইজারা নেওয়া পদ্মার বুকে জাল ফেলে যে কটি ইলিশ ওঠে, সবকটি ঘরে এনে তুলতে পারে মইনা নাগি।
    তাই চালের মাপ থাকে না নয়নতারার। এই জমি তাঁর স্বামীর টাকাতে কেনা।বড় ছেলে কিছু দিয়েছে। নয়নতারার জেদে দুটি গরু আছে। ক্যান, তাগো দুগা ভাত দিলেই তোমাদের গায় লাগে ক্যান?
    মইনা নাগী এই এতো বড় গামছা দিয়ে ভাতের হাঁড়ি নামায়। বড় জায়ের ছয়জন, নয়নতারার সাতজন, ছোট জায়ের চারজন দাওয়ার উপর পিঁড়ি পাইতা বসে। ছোট গামলাতে ভাত নামাইয়া দেয় মণি।নয়নতারা ভাতটুকু বেড়ে দেন।
    পার্টিশন না হইলে এত সর্বনাশ হইত?
    তেরো বছরে বিয়ে।পনেরো থেকে বাহান্ন পর্যন্ত নয়নতারার সন্তান হয়েছে।শেষটি হয়েছে এইপারে এসে। তাই নিয়ে বড়ছেলের রাগের অন্ত নেই।
    ঋতুনিবৃত্তিকালে নয়নতারার বড় ঘাম হয়। মাথা ঘোরে। যখন তখন মেজাজ গরম হয়। তারপর ভাত রাঁধতে হলে চাট্টি চাল যদি বেশি নিয়েই ফেলেন, বড় বউয়ের অত গায়ে লাগে ক্যান? তর সোয়ামি তো আমার পোলা বটে। টাকা তা তার!
    এই ভাবে রাগে গরগর করতে করতে নয়নতারা গরুর মুখের সামনে ভাত ফেলে দিয়েছিলেন।
    ছেলেও যে তাতে অত রেগে যাবে ভাবতেই পারেননি। কাতল মাছের গাদা , পেটি, পটললতি, আলু , উচ্ছে একসঙ্গে ঝোলে ফুটছে।
    মেজ মেয়ে দেখে কঁকিয়ে উঠল। অ মা, এ কী করসো?
    নয়নতারা উত্তর না দিয়ে উঠোনের কোণে নারকেল গাছটি দেখতে লাগলেন।
    স্বামী মারা যাবার পর থেকে তাঁর আর অসুবিধে হয় না।গরু আছে।দুধ টুকু খান।আর মিষ্টি একটা হলেই হল। অত তরিবৎ করে রান্না পোষাবে না।
    যা দিমু তাই খাইবা। নয় যাও, হোটেলের লগে যাও। বলে ঝোল নামিয়ে দিলেন।
    স্বামী গেলেন স্ট্রোকে।বড় ভাশুর স্ট্রোকে। ছোট দেওর নিজের ভাগ বুঝে আলাদা হয়ে গেল। মণি নাগী আইল না। ওপারে থেকে গেল। নয়নতারা ভাবেন, আর কিছুদিন বাদে আবার ওপারে যাওয়া যাবে। ভাশুর, দেওর না থাক, বড় জা থাকবে। আবার আগের মত বড় হাঁড়িতে চাল ফুটবে টগবগ করে। নয়নতারা ছোট গামলাতে ভাত নিয়ে ছেলেপুলের পাতে ঢেলে দেবেন।এর ব্যত্যয় হতেই পারে না। বড়বউয়ের বাপের বাড়ি কলকাতা। সে কথায় কথায় ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে, ঐপারে এই ছিল, সেই ছিল, আপনাদের সকলের জমিন্দারি ছিল! আর কত শুনব। নেহাতই কপালদোষে এইবাড়িতে পড়েছি। এখন অপচয় করা মানে বোঝেন কিছু?
    মেজছেলে আলাদা থাকে বউ নিয়ে। সেজটার চাকরিবাকরি নেই। বউ বাচ্চা আছে।ছোটটা হাঁটতে চলতে পারে।মাথায় নেই কিছু। এত কিছু বোঝার পর নয়নতারা আর কী বুঝবেন?
    মৃদুস্বরে বলেছিলেন, গোপালের মনে রসবড়া খাওনের শখ হয়।
    পিতলের গোপাল নিয়ে এসেছেন ওপার থেকে।লুকিয়ে। গোপালের শখে তাঁর বড় সুখ।
    বউ মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল, বললেই পারেন আপনার রসবড়া খেতে শখ যায়।গোপালের নাম নেন কেন?

    রাত গভীর হলে নারকেল গাছের মাথায় চাঁদ ওঠে। গরুগুলো অনেকদিন বাদে আজ ভাত পেয়েছে।হোক রাগের মাথায় দেওয়া ভাত।তবু পেয়েছে তো!
    নয়নতারার ঘুম আসে না।
    আজ মাছের ঝোল কেউ খায়নি।সারাদিন বাড়িতে বিস্তর রাগারাগি।
    ইচ্ছে করে খাওয়া নষ্ট করতে তোমার মা ঐ ঝোল বানিয়েছে। বলেছে বড় বৌ।
    ধামা ধরা ছেলে সায় দিয়েছে।
    শরীরে জ্বালা ধরে। শীর্ণ হয়ে আসছে হাত পা।দৃষ্টি শক্তি কমছে। তাও চাঁদ পরিস্কার দেখা যায়।
    ঠিক ঐ পারে যেমন দেখা যেত।
    বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে নয়নতারা মনে মনে গোয়ালন্দ হাঁটা দেন।কতদূর জানেন না।একবার স্টিমারে চাপতে পারলেই হল। মনি নাগী বা গিয়াসুদ্দিন ঠিক নামিয়ে নেবে।
    নিজের দুমুঠো ভাত। বাকি ভাতটা গরুর মুখে তুলে দিলে কেউ কিছু বলতে পারবে না আর।
    ঐ পারেও বুঝি এইরকম চাঁদ দেখা যায়? এইরকম রাত! ভাবতে ভাবতেই শরীর জুড়ায়।
    নয়নতারার হাঁটা শেষ হয় না। দ্যাশে ফেরা লাগব। যতদূর হাঁটন লাগে।
    হাঁটার পথে নকুল পড়ে যায়।সহদেব পড়ে যায়। অর্জুন পড়ে যায়।
    স্ট্রোক কী নয়নতারার জানা নেই।বলেন সন্ন্যাসরোগ। স্বামীর মৃত্যুর পর চুল ছেঁটে ফেলেছেন নয়নতারা। ওপারে সবাই চিনতে পারবে তো?
    ভীম পড়ে যায় শেষে।বড় ভাসুরের আদরের ছিলেন তিনি। দেখতে ছোট খাট নাকে নোলক বউটি।
    পিছনে শুধু দুটি গাভী।এবং বাছুর।
    এদের নিয়ে ঢুকতে দেবে তো ঐপারে? দ্যাশে ফেরা ছাড়া গতি নাই যে আর!
    বড়বউ দরজা খুলে দেখে।
    বলে , শুয়ে পড়ুন। শরীর খারাপ হলে আবার ডাক্তারের পেছনে গচ্চা দিতে হবে।
    নয়নতারা মুখ ফিরিয়ে দেখেন, বড়বউটার মুখখানও শুকনা। না খেলে যেমন হয়।
    তিরিশ জনের পাত পডুক বা আটজনের, মেয়েমানুষের পাত শেষে পড়ে।গরুর মত।
    মনে মনে বলেন, চল, একসঙ্গেই হাঁটি।
  • বিভাগ : ইস্পেশাল | ১৫ এপ্রিল ২০২১ | ৫৭৬ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • chaitali chattaraj | ১৬ এপ্রিল ২০২১ ১২:৪৬104794
  • ভালো লাগলো, খুব মনের মতো লেখা l


    কি করে গ্রাহক হতে হবে, বোঝার মতো করে জানালে আগ্রহী 

  • সায়ন্তনী | 103.121.205.172 | ১৬ এপ্রিল ২০২১ ১৪:২৩104799
  • খুব ভাল লাগল।

  • | ১৬ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৩৫104800
  • ভাল লাগল। 

  • অভিষেক ঝা | 27.131.212.91 | ১৬ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৫৬104802
  • মোটিফ, সিম্বল ও গল্প মিশমিল খেয়ে যে গদ্য তৈরি করছে তা একইসাথে জোরালো ও সুদিং

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন