• বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  নববর্ষ

  • ফেরা

    শঙ্খ করভৌমিক
    ইস্পেশাল | নববর্ষ | ১৫ এপ্রিল ২০২১ | ৩২৬ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • এসব কথা আমার বাবা কাকার মুখে শোনা। দেশের বাড়ির গল্প। তবে কিনা, দেশের বাড়িটা এখন অন্য দেশে।

    উত্তর পূর্বের যে ছোট শহরে কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমাদের বাড়ি ছিল, এবং মামাবাড়ি এখনো আছে (এর কোনোটাই কিন্তু আমাদের আদি বাড়ি বা মামাবাড়ি নয়, আমার ঠাকুর্দা এবং দাদামশায় পকেচক্রে এসে এই শহরে থেকে গিয়েছিলেন।), সেখান থেকে গাড়িতে করে টিলা-জঙ্গলের রাস্তা ধরে ঘন্টাখানেক গেলে এক প্রাচীন কালীমন্দির আছে। কালীমন্দিরের পেছনে আছে এক দীঘি। দীঘির অন্য পাড়ে কাঁটাতারের বেড়া। তার পর কিছুটা নেই মানুষের জমি- নো ম্যানস ল্যান্ড। তারপর আবার একপ্রস্থ কাঁটাতার। তস্য পেছনে একটা রেলস্টেশন। রেললাইনের একপাশ থেকে একটা শাখা বেরিয়ে এসে নো ম্যানস ল্যান্ড ভেদ করে আমাদের দেশের সীমানায় ঢুকে পড়ে কয়েক গজ এগিয়ে থেমে গেছে। কাঠের স্লিপার উধাও, লোহার পটিগুলো জং ধরে ধরে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

    তার পেছনে একটা সাদামাটা দালানে সে দেশের সেনাবাহিনীর অস্থায়ী চৌকি।

    সেনাবাহিনী ঘাঁটি গেড়ে বসার আগে ওটা ছিল স্কুল। সেই স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন আমার বাবার ঠাকুর্দা, আমার প্রপিতামহ।

    এখনো কালেভদ্রে সেদিকে গেলে, আমাদের সীমানার ভেতরে সবচেয়ে উঁচু যে টিলাটা রয়েছে তার ওপর দাঁড়ালে স্কুলটা, মানে সৈন্য ঘাঁটিটা দেখা যায়। আমাদের শহরে কোনো রেললাইন না থাকলেও, গভীর রাতে কান পাতলে পরে আমাদের প্রপিতামহের ভূতপূর্ব স্কুলের পাশ দিয়ে ছুটে চলা রেলগাড়ির গম্ভীর ভোঁ শোনা যায়।

    দেশ ভাগের পর যারা সর্বস্ব ছেড়ে ওপার থেকে এসেছিল, আমাদের বাপঠাকুর্দা কিন্তু তাঁদের মধ্যে নেই। এঁরা এসেছিলেন আরো আগে। আমার ঠাকুর্দা ব্রিটিশ আমলে পুলিশে কাজ করতেন। আমাদের ছোট্ট দেশীয় রাজ্যটি যখন স্বাধীন ভারতে যোগ দিল, তখন তিনি এখানে চাকরি নিয়ে আসেন, এখানেই কর্মজীবন শেষ করেন।

    তখন আমাদের ছোট শহর যেন নতুন সভ্যতার আলো দেখা আফ্রিকার কোনো গহীন জনপদ। পাহাড় থেকে নেমে আসা দাঁতাল হাতি শহরের রাস্তায় নেমে হুটোপাটি করে, নাম তার গনেশ। আদিবাসী দেবতার পূজার রাত্রে শহরের রাস্তায় কেউ বেরোলে প্রাণদন্ড হয়। রাজার রাজত্ব গেলেও তাঁকে সবাই মহারাজ বলে, তাঁর স্ত্রীকে মহারাণী।

    সে যাই হোক, আসল গল্পটা এটা নয়। এরও অনেকটা আগের ঘটনা। আমার বাবা তখন বালক। বাবার ছোটবেলা কেটেছে চা বাগান এলাকায়। দিনদুপুরে বাঘ বেরোয়। সপ্তাহে একবার স্থানীয় ডাক হরকরা ছাতুয়া বুড়ো আসে চিঠি নিয়ে। মোড়ের মাথায় তার তালপাতার তৈরি ছাতাখানা দেখতে পেলে 'চিঠি চিঠি' করে দৌড়ে যাওয়া তখন বাবাদের একমাত্র বিনোদন।

    সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশপাশ হবে। আমার ঠাকুর্দা কলকাতায় চাকরি করতে গেলেন। সঙ্গে নিলেন আমার বাবাকে। কলকাতায় পিতাপুত্রের সংসার কিছুটা দাঁড়িয়ে যাবার পর ঠিক করলেন ঠাকুমা আর কাকা পিসিদের নিয়ে যাবেন।

    একজন গ্রাম সম্পর্কের দাদু, তাঁর নাম সোনাদাদু কি রাঙাদাদু কিছু একটা হবে, তাঁর ওপর ভার পড়ল বাড়ি দেখেশুনে রাখার।

    নির্দিষ্ট দিনে গরুর গাড়িতে রওনা দিলেন ঠাম্মা, বড়কাকু আর পিসিরা। গরুর গাড়ির পেছন পেছন আসছে বড়কাকুদের পোষা কুকুর ভুলু। সেই সকাল থেকে যাত্রা শুরু হয়েছে, ভুলুর চলার বিরাম নেই।

    অবশেষে, যখন রেলগাড়িতে চাপা হল। বড়কাকু ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখতে পেলেন, ট্রেনের সঙ্গে দৌড়ের অসম প্রতিযোগিতায় নেমেছে ভুলু। একটু পরে তাকে আর দেখা গেল না।

    বহুদিন পর সেই গ্রাম সম্পর্কের দাদুর কাছ থেকে একটা চিঠি এসেছিল। তাতে বিষয় সম্পত্তির আপডেট ছিল। কুশলপ্রশ্নাদি ছিল।

    আর কাঠখোট্টা বৈষয়িক কথাবার্তার শেষে লেখা ছিল "ভুলু আর ফিরা আসে নাই।"


    ~~ গুরুচণ্ডা৯তে আগে প্রকাশিত ~~

  • বিভাগ : ইস্পেশাল | ১৫ এপ্রিল ২০২১ | ৩২৬ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Jaydip Jana | ১৮ এপ্রিল ২০২১ ১৬:২৩104877
  • পুরো গল্পটা রুদ্ধশ্বাসে পড়লাম যদিও ছিন্নমূল মানুষের এমন গল্প শুনেছি জানিও। কিন্তু  শেষলাইনটায় কেমন যেন মনটা হু হু করে উঠলো...

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন