• হরিদাস পাল  গপ্পো

  • ছায়া

    Debayan Chatterjee লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ০৪ মার্চ ২০২১ | ৪০৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • এখানে এখন বর্ষাকাল। এখানে, মানে বোম্বে-তে।


    এখানে প্রায় সারাদিন বৃষ্টি হয়। আমরা যে বাড়িটার যে ঘরটায় থাকি, তার জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখা যায়। দু'মাস হলো আমরা এখানে এসেছি। জানলার বাইরে একটা লতানে গাছ, এই দু'মাসে বৃষ্টির জল খেয়ে কতো বড় হয়ে গেছে - এখন জানলার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। পাতা বেয়ে ঘরে ফোঁটা-ফোঁটা জল পড়ে।


    এই বাড়িটা আমাদের নয়। আমাদের বাড়ি অনেকদূর। এই বাড়িটায় আমরা ভাড়া থাকি। এই একটা ঘরে আমরা তিনজন। আমি, মা, আর বাবা। ঘরটায় তিনটে চৌকি আছে, কুটকুটে কালো কম্বল বেছানো। দু'টো চৌকি জোড়া লাগিয়ে আমি আর মা শুই। আরেকটায় বাবা। ঘরটা স্যাঁতস্যাঁতে, দেয়ালে ড্যাম্প। খুব ছোটবেলায় আমরা এমনিই একটা ড্যাম্প কোয়ার্টারে থাকতাম। রাতে খুব ঠান্ডা লাগে। আমার সর্দি-কাশি হয়েছে। মাঝে মাঝে জ্বর আসে, আবার ঠিক হয়ে যায়। আমার বাড়ির কথা মনে পড়ে।


    এই বাড়িটার নাম মারুতি ভবন। গেটের ওপরে বড় বড় করে লেখা আছে।


    এই বাড়িটা থেকে বেরোলে বড় রাস্তা। রাস্তাটা ধরে একটু এগিয়ে বাঁ দিকে ঘুরলে আশ্রম। আশ্রমের দেয়াল গেরুয়া রঙের। না না, ঠিক গেরুয়া নয়, পিঙ্ক। আমরা সন্ধ্যেবেলায় আশ্রমে যাই। রাতের খাবারের আগে মন্দিরে আরতি হয়। এক মহারাজ বসে বসে ধুপকাঠির গন্ধ শোঁকেন। ঢাক বাজে, তাই আমার খুব ভালো লাগে। আমার কাছে একটা খুব মোটা বই আছে। শার্লক হোমস সমগ্র। আমি ঘরে ফিরে চামচ দিয়ে বইটার ওপর ঢাক বাজাই। আশ্রমে খাবার ঘর আছে। আমরা ওখানেই খাই। খাবার ঘরটার নাম অন্নং ব্রহ্মম। দরজার পাশে বড় বড় করে লেখা আছে।


    খাবার ঘরের উল্টোদিকের বড়ো বাড়িটার একতলায় গোবিন্দদার চায়ের দোকান। দোকানঘর নেই। লম্বা করিডরের কোণায় গোবিন্দদা টেবিল সাজিয়ে বসে। টেবিলে একটা চায়ের মেশিন। পেছনে দুটো বড় বড় আলমারি। আমি এর আগে কখনো চায়ের মেশিন দেখিনি। মেশিনের গায়ে লেখা নেসটি, নেসকফি।


    গোবিন্দদার দারুণ চেহারা। আমার মতো রোগা-প্যাঁটকা নয়। মাথার চুল কদমছাঁট। সাদা গোল-গলা গেঞ্জি, সাদা ধুতি পড়ে। এই ঠান্ডায় সকালবেলায় ঠান্ডা জলে চান করে আসে। গোবিন্দদা আমায় খুব ভালোবাসে। আবার আমাকে নিয়ে মজাও করে। সকালে হসপিটালে যাওয়ার আগে জলখাবার খেতে গেলে বলে -


    - কিঁ খাঁবি, টোঁস?


    কিন্তু গোবিন্দদার টোস্ট খুব বাজে, শক্ত শক্ত। টেনে টেনে ছিঁড়তে হয়। আমার ভালো লাগে না। টমেটো সুপ-টাও খেয়েছি একবার, খুব টক।


    গোবিন্দদা জানে আমি বই পড়তে ভালোবাসি। আমি আশ্রমের লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে আসি পড়বো বলে। একটা হ্যারি পটারের বই এনেছি। গোবিন্দদা মজা করে বলে, আমায় একটা বই-ভর্তি কাঠের বাক্সে ভরে সমুদ্রের জলে ফেলে দেবে।


    গোবিন্দদার দোকান ছাড়িয়ে এগোলে বাঁ-দিকে একটা ঘর। দরজায় লেখা, ডে কেয়ার। এই ঘরটায় কেমো হয়। রোজ না, বড় ডাক্তার যেদিন আসেন, সেদিন। সেদিন ঘরের বাইরে খুব ভিড় হয়। দরজার পাশে যে কাঠের বেঞ্চিটা আছে, সেটায় চাপাচাপি করে লোক বসে থাকে। আমি একজনকে চিনি। কেমো নিয়ে ওর মাথার চুল পড়ে গেছে। আমায় দেখলেই হাসে। মাথায় একটা স্কার্ফ পড়ে থাকে। হলুদ-সবুজ-লাল-কমলা ছোপ-ছোপ। আমার ক্লাসের মেয়েরা শীতকালে এমনি স্কার্ফ পড়তো।


    বড় রাস্তার ওইপাড়ে একটা পার্ক। মায়ের সঙ্গে বিকেলে সেখানে হাঁটতে যাই। অনেকে আসে। ওই স্কার্ফ পড়া বউটাও। আমায় দেখে হাসে, হাত নাড়ে। গোবিন্দদাও আসে। হাফপ্যান্ট, জুতো-মোজা পড়ে। দৌড়ে দশ বার পার্কটাকে পাক দেয়। আমায় দেখে হাসে, কথা বলে না।


    গোবিন্দদা যখন আমার মতন ছোট, তখন নাকি ও অ্যাথলিট ছিল। ব্যারাকপুরের আশ্রমে থাকত তখন, দৌড়ে প্রচুর প্রাইজ পেয়েছে। ওর সব ট্রফি ওই আলমারি দু'টোয় রাখা আছে।


    --


    এসব কবেকার কথা!


    আজ গোবিন্দদার সঙ্গে দেখা করতে খুব ইচ্ছে হলো। সকাল সকাল, ও দোকান খোলার আগে গিয়ে হাজির হলাম। গোবিন্দদা এল, ন্যাকড়া দিয়ে টেবিল মুছে ধুপকাঠি নাড়িয়ে দোকান খুললো। হঠাৎ, পেছন ঘুরে,আমার দিকে তাকিয়ে একবার থমকে দাঁড়িয়েই আবার ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লো। কে জানে, দেখতে পায়নি হয়তো।


    আসলে, আমি তো এখন একটা ছায়ার মতন হয়ে গেছি

  • বিভাগ : গপ্পো | ০৪ মার্চ ২০২১ | ৪০৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
নীল  - Jeet Bhattachariya
আরও পড়ুন
সবুজ - Jeet Bhattachariya
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • র২হ | 49.206.15.34 | ২০ মার্চ ২০২১ ১০:০৫103892
  • আগে পড়া হয়নি, হোঁচট পাথর পড়ে লেখকের অন্য লেখা পড়তে এলাম।

  • Debayan Chatterjee | ২২ মার্চ ২০২১ ১৮:২৮103962
  • ধন্যবাদ। কেমন লাগছে, জানাবেন।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন