• হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • হিমালয়ান্ ব্লুজ (শেষ পর্ব)

    Debayan Chatterjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ২৩ মে ২০২১ | ৪৮৭ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • যাত্রা শুরু (শেষ পর্ব)


    কাকভোরে ঘুম ভেঙে গেল।


    সাধারণত আমার ঘুম একটু বেলা করে ভাঙে। ফোনে টাইম দেখলাম - চারটে চুয়ান্ন।


    অ্যালার্ম বাজতে এখনো ছ'মিনিট বাকি। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম।


    ভাল করে আলো হয়নি এখনো। নোংরা খড়খড়ে পর্দা সরিয়ে ফাইবার গ্লাসের জানলাটা খুললাম। জানলার বাইরে একটা গ্রিল দেওয়া।


    রাস্তা ওপারে মাসির হোটেল। হোটেলের শেডের পেছনে বিষ্ণু ঘাটের লাল মন্দির ক'টা দেখা যাচ্ছে। মন্দিরের চূড়োর ফাঁকে ফাঁকে একটুখানি গঙ্গা। দেখি, আকাশে ভোরের রং লাগছে।


    গতকাল সন্ধ্যেবেলায় হরিদ্বারে এসেছি। আজ সকালেই আবার বেরিয়ে যাব। হরিদ্বার এলে প্রত্যেকবার এই গেস্ট হাউসেই উঠি। মাড়োয়ারিদের গেস্ট হাউস। মোটের ওপর পরিষ্কার-পরিছন্ন। একতলায় রাধাকৃষ্ণের মন্দির আছে।


    গেস্ট হাউসের চা-টা ভাল নয়। এত সকালে আমার একার জন্য লিকার চা এরা করবে না - সরপড়া দুধ চা দিয়ে যাবে।


    মাল বিশেষ কিছু বের করিনি, তাই প্যাকিং কিছুই নেই। গরম জলের বালতি আনিয়ে নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। ব্রাশ করে, গোঁফ-দাড়ি কামিয়ে নিলাম। দু'সপ্তাহ এখন এতেই চলবে। চান করতে করতে বাথরুমের আয়নায় ভাপ জমে গেল। হাত দিয়ে মুছে নিতে গিয়ে একটা কবেকার পুরোনো কালো টিপ পেলাম।


    নিচে বুড়োর দোকানে চা খেতে নামলাম। বাইরে মোলায়েম ঠান্ডা। উলের টুপি-পড়া গুঁফো বুড়োর ঠেলা থেকে ভোঁ-ভোঁ করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। বাতাসে কেরোসিনের গন্ধ। এক কাপ লিকার চা, দু'টো লেড়ো বিস্কুট।


    মাসির হোটেলের সামনে এক ভদ্রলোক চেয়ারে বসে আছেন। ব্রেকফাস্টের মেনু চিৎকার করে বলার সময় এখনো হয়নি। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম - টিফিনে কি আছে?


    ভদ্রলোক বোধহয় একটু বিরক্ত হলেন। বললেন - ক'টা বাজে? লুচি হবে, আলুর তরকারি হবে। তবে এখন নয়, আটটার পর।


    - আটটার আগেই আমি বেরিয়ে যাব।


    - কোথায় বেরোবেন? কালই তো এলেন! আজই ফেরা?


    - ফেরা-ই বলতে পারেন। একটু পাহাড়ের দিকে যাব ভাবছি।


    গেস্ট হাউসের বিল মিটিয়ে স্যাক নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছি, একজন বৃদ্ধ বাঙালি ভদ্রলোক দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলেন - আপনার পিঠে কি ওটা হোল্ড-অল্?


    আমি হাসলাম। বললাম - না, ওটা রুকস্যাক।


    ওঃ! আমি ভাবলাম হোল্ড-অল্ বুঝি, আজকাল পিঠে করেও নেওয়া যায়। হোল্ড-অল্ দেখেছ তো? ব্যাগও, বিছানাও!


    এই বলে ভদ্রলোক চলে গেলেন।


    হোটেলের সামনে ইজাহার খান গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে। স্যাকগুলো ওপরে তুলে প্লাস্টিকের শিট দিয়ে ঢেকে ভাল করে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হল। গাড়ির ড্যাশবোর্ডে একটা ধূপ জ্বলছে, সেটা ফেলা করালাম। ধূপের গন্ধে আমার বমি-বমি লাগে।


    রেয়ার-ভিউ মিররে্ কোরানের বয়েত লেখা একটা লকেট মতন ঝোলানো। লম্বা রাস্তা, ওটার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যাবে নিশ্চয়ই।


    বিষ্ণু ঘাটের ব্রিজ পেরিয়ে হাইওয়েতে এসে উঠলাম। গতকাল রাতে ব্রিজের মুখে বসে একজন বৈরাগী দোতারা টাইপের একটা ইন্সট্রুমেন্ট বাজাচ্ছিলেন। খুব ভাল লাগছিল শুনতে।


    সকালের আলোয় ঝকঝক করছে গঙ্গার জল।


    শিবের বিরাট কিম্ভূত মূর্তিটা পেরিয়ে অনেকদূর এসে পড়েছি। এখানে একটা রেলওয়ে ক্রসিং আছে। গাড়ি থামলে বাচ্ছারা এসে ছোট-ছোট লাল ফল বিক্রি করে। কি ফল, নাম জানিনা।


    একটা মালগাড়ি পেরোচ্ছিল। এবার আর বাচ্ছাগুলোকে দেখতে পেলাম না।


    দূরে সবুজ পাহাড় দেখা যাচ্ছে।


    এবার একেবারে ব্যাসী পৌঁছে থামব। রাস্তার পাশে বেদব্যাসের মূর্তি। মূর্তির হাতের ফাঁকের পাইপ দিয়ে জল পড়বে - তাতে মুখ ধোব। ব্রেকফাস্ট করব - পরোটা, সবজি, আচার, টক দই। রাস্তার ধুলো বসা কাঁচের গ্লাসে করে এক গ্লাস নিম্বুপানিও খেতে পারি।


    হোটেলের সামনে একটা পাহাড়ি কুকুর থাবার ওপর মুখ রেখে চুপ করে রোদে শুয়ে থাকবে।


    আবার গাড়ি চলবে। লাল কাপড়-পড়া সাধুর গায়ে ধুলো ছিটিয়ে এগিয়ে যাব। মিররে্ দেখব - সাধু স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


    গাড়ির ওপর পাহাড়ের ছায়া পড়বে। ছায়া ছেড়ে কখনো কখনো পাহাড়ের নরম রোদে গিয়ে পড়ব।


  • বিভাগ : ভ্রমণ | ২৩ মে ২০২১ | ৪৮৭ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
একক - Debayan Chatterjee
আরও পড়ুন
ছায়া - Debayan Chatterjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • b | 14.139.196.12 | ২৪ মে ২০২১ ১১:১০106389
  • খুব ভালো জায়গাতে শেষ হল। 

  • Debayan Chatterjee | ২৪ মে ২০২১ ১৪:৫১106393
  • অনেক ধন্যবাদ, b!

  • ইন্দ্রাণী | ২৪ মে ২০২১ ১৫:০২106396
  • বড় সুন্দর।
    এর বেশি বলতে নেই। রোদ আর ছায়াটুকু চোখে নিয়ে চুপ করে যেতে হয়।

  • Debayan Chatterjee | ২৪ মে ২০২১ ১৯:৩৯106402
  • আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, ইন্দ্রাণী।

  • শঙ্খ | ২৪ মে ২০২১ ২৩:০৯106404
  • আমার এই লেখাটা পড়তে পড়তে মাথার মধ্যে কে যেন বলেই চলেছে আনফোল্ডিং আনফোল্ডিং , খুব অস্ফুটে, কারা যেন পাকদ্ন্ডি বেয়ে উঠে চলেছে অনেক ওপরে। তাদের মুখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তবু যেন মনে হয় তারা চেনা কেউ। তাদের গায়ের ওপরে রোদে ছায়ায় নক্সা কাটছে হিলিবিলি, আর ওপর থেকে ঝাঁপিয়ে নামা ঠান্ডায় ঘাড়ে একটা শিরশিরে আরামের অনুভূতি। 

  • | ২৪ মে ২০২১ ২৩:১৯106405
  • এই সিরিজটা পড়লেই আমার পিঠঝুলিটা পেড়ে টেড়ে ঝেড়েঝুড়ে বেরিয়ে  পড়তে ইচ্ছে করে। 

  • kk | 97.91.195.43 | ২৫ মে ২০২১ ০৬:৪৪106408
  • খুব ভালো লাগলো এই সিরিজটা। লেখার স্টাইল এত সুন্দর -- মিনিমালিস্ট আর্টের মত।

  • সম্বিৎ | ২৫ মে ২০২১ ০৮:৫৯106409
  • শুরুটা ভাল লাগছিল। একটু পরে লেখাটা স্টাইল হয়ে গেল।

  • Debayan Chatterjee | ২৫ মে ২০২১ ২১:১২106423
  • যারা মন্তব্য করেছেন - সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।


    সম্বিৎবাবুর মন্তব্যটা বেশ ইন্টারেস্টিং ;)


    লেখাটা সম্বন্ধে দু'-একটা কথা:


    পরিচালক রিচার্ড লিঙ্কলেটার একজায়গায় বলেছেন - ছেলেবেলা নিয়ে কোনো সিনেমা করতে গিয়ে একজন পরিচালক ঠিক যে যে জিনিসগুলো বাদ দিয়ে দেবেন, উনি ঠিক সেই জিনিসগুলো নিয়েই একটা সিনেমা (বয়হুড) বানিয়েছেন।


    এই লেখাটায় আমি সেই চেষ্টাটাই করেছি। পাহাড় বাদ দিয়ে পাহাড় নিয়ে লেখার চেষ্টা।


    কেমন হয়েছে - জানিনা।

  • aranya | 2601:84:4600:5410:58e0:cf4e:8ef7:ba0c | ২৬ মে ২০২১ ০৫:৫৬106428
  • sundar

  • বিপ্লব রহমান | ২৮ মে ২০২১ ১০:১২106500
  • ভারি সুন্দর লেখা। 


    লকডাউন পেরিয়ে এপারে আবারও বাস চালু হয়েছে। আমিও পাহাড়ের রোদ গায়ে মাখতে ব্যাকপ্যাক নিয়ে বেরুচ্ছি। 


    শুভ 

  • Debayan Chatterjee | ০১ জুন ২০২১ ১৮:২১106706
  • অনেক ধন্যবাদ, বিপ্লববাবু।


    কোথায় যাচ্ছেন? শুভ যাত্রা!

  • বিপ্লব রহমান | ০২ জুন ২০২১ ১৬:১৫494468
  • @ দেবায়ন, 


    এপারে আমাদের রাঙামাটি আর কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে যাচ্ছি ঘুরতে। ফিরে এসে লিখবো ভাই। 


    আপনি আরও লিখুন 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া দিন