• হরিদাস পাল  আলোচনা  অর্থনীতি

  •  ইন্ডিয়ান ইকনমিস্টস ফর ইকুয়ালিটি'র পক্ষ থেকে নয়া কৃষি বিল নিয়ে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীকে লেখা  একটি খোলা চিঠির অনুবাদ    

    Soumava Basu লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | অর্থনীতি | ০৯ জানুয়ারি ২০২১ | ১৯০ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • মাননীয় শ্রী নরেন্দ্র সিং তোমার মহাশয়,

     সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে থাকা আমরা ৪০ জন অর্থনীতিবিদ, যাদের গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু হল ভারতীয় অর্থনীতি,আশা রাখি ভারতীয় অর্থনীতিতে নানাবিধ বৈষম্য  দূরে সরিয়ে একদিন আয় এবং ধন সম্পদের সুষমবন্টন সম্ভবপর হবে।  সেই অবস্থান থেকেই নতুন কৃষি আইন সংস্কারের প্রেক্ষিতে  দিল্লীতে চলতে  থাকা কৃষক আন্দোলন নিয়ে আমরা সকলে চিন্তিত।

     একথা অনস্বীকার্য যে, ভারতের ছোট এবং প্রান্তিক চাষিদের ফসলের সঠিক দাম এবং  বিপণনের  সুবিধা পাওয়া  প্রয়োজন। কিন্ত কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা প্রবর্তিত নতুন কৃষি আইন আদৌ ছোট এবং প্রান্তিক চাষিদের সেই সমস্ত সুবিধা করে দিচ্ছে কিনা সেই বিষয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে। বিশেষত  যখন ভারতবর্ষে অতিমারির জন্যে লকডাউনের দরুন বাকী সকল ক্ষেত্রে সরকারি তৎপরতায় বিলম্ব দেখা গেছে, ঠিক সেই সময়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে যে পদ্ধতি অবলম্বন করে এই আইন পাশ করানো হয়েছে, তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই এই আইনের বিরুদ্ধে  মত পোষণ করেছেন। তাঁরা মনে করেন এতে লাভের থেকে ক্ষতিই হবে বেশী।  যুক্তিস্বরূপ নিম্নলিখিত বিষয় গুলো উপস্থাপন করা হল।     

    ক) নতুন কৃষি আইনের অন্যতম বিষয় হল  চুক্তি চাষ।  প্রথমেই প্রশ্ন জাগে ভারতবর্ষের  কৃষি ব্যবস্থায়  যেখানে ছোট এবং প্রান্তিক চাষির আধিক্য, সেখানে চুক্তি চাষের এর ফল কী দাঁড়াবে?  ভারতবর্ষ ,  ব্রাজিল এবং  আফ্রিকার বিভিন্ন  দেশের  (ভারতের মতন আফ্রিকা, ব্রাজিলের কৃষি ব্যবস্থাতেও ছোট এবং প্রান্তিক চাষির আধিক্য)  কৃষি   নিয়ে অসংখ্য গবেষণা পত্র এটা বুঝিয়েছে যে   চুক্তি চাষ ছোট এবং প্রান্তিক চাষিদের  কল্যাণের থেকে ক্ষতিই বেশী করবে। অথচ নতুন কৃষি আইনে চুক্তি চাষের এই  গুরুত্ব ঠিক কাদের স্বার্থে সেটা সুস্পষ্ট নয়।  এছাড়াও কৃষিপণ্যের বিক্রি হয় মূলত বেসরকারি বাজারের মাধ্যমে, আর খুব কম পরিমাণে বিক্রি  এবং এই বাজারকে খানিকটা নিয়ন্ত্রন করা হয় এপিএমসি-র মাধ্যমে। এই নতুন আইনগুলির মাধ্যমে কৃষকদের বর্তমান  সমস্যাগুলির  সমাধানের চেষ্টা না করে বরং বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলি যেগুলো খানিকটা হলেও কৃষকদের সুবিধা করে দিচ্ছিলো সেগুলিকে আরও দুর্বল করে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই নতুন আইনগুলি বেসরকারি, কর্পোরেট স্বার্থকেই রক্ষা করবে বলে মনে হয়। এর ফলে  ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের বাজারের উপর নিয়ন্ত্রন আরও কমে যেতে পারে এবং এপিএমসি – কে এড়িয়ে গেলে তাঁদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যেতে পারে।

    বিগত তিন দশকে ভারতীয় অর্থনীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল বেসরকারী কর্পোরেট সংস্থাগুলির ক্ষমতায়ণ। সাম্প্রতিক অতীতের বিভিন্ন লো স্ক্যামে কেন্দ্রীয় সরকারের নিস্ক্রিয় ভূমিকা আর তারপর এই ধরনের নতুন আইন কর্পোরেট স্বার্থে লাগাম টানার ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়সেই প্রেক্ষিতে, নতুন কৃষি আইন যে ছোট এবং প্রান্তিক চাষি দের স্বাধীনতা খর্ব করবে সেই বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এর ফলে ছোট ও প্রান্তিক চাষিরা কর্পোরেটের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। যা গ্রাম ও শহরের মধ্যের বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করা যায়।

    খ) যে কোন সুস্থ গণতান্ত্রিক দেশেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রয়োজনের কথা এবং তৃণমূল স্তর থেকে উঠে আসা দাবিগুলিকে মান্যতা দেওয়া হয়। ভারতবর্ষের সংবিধান প্রণেতারা একথা মাথায় রেখেই কেন্দ্র–রাজ্য–স্থানীয় এই বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক ক্ষমতার সুষ্ঠু বিন্যাসের কথা বলেছিলেন।  ভারতীয় অর্থনীতিতে কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন পলিসি বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজ্য সরকারের কিঞ্চিৎ স্বাধীনতা থাকে । রাজ্যগুলি  তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন কৃষি সংক্রান্ত পলিসি গ্রহণ করেছে বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু এই নতুন আইন  পরোক্ষভাবে রাজ্য সরকারের সেই কিঞ্চিত স্বাধীনতাকেও খর্ব করছে।

    এছাড়াও বিগত ৫-৬ বছর ধরে সারা দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও দলিত সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে। এই নতুন আইনের বিরুদ্ধে কৃষকদের আন্দোলনকেও  নানাভাবে একটি বিশেষ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও একটি বিশেষ রাজ্যের আন্দোলনের তকমা দেওয়ার  চেষ্টা করা হয়েছে, যদিও বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্ট দেখিয়েছে এই আন্দোলন সারা ভারতের প্রতিটি রাজ্যের কৃষকদের আন্দোলন। ভারতবর্ষের মতন এইরকম বহু ভাষাভাষীর ও বহু সংস্কৃতির একটি কৃষিপ্রধান দেশে, কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি-নীতি প্রত্যেকটি রাজ্যের এবং প্রত্যেকটি সম্প্রদায়ের প্রয়োজন এবং চাহিদা অনুযায়ী হওয়াই বাঞ্ছনীয়

    অতঃপর, আমাদের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন, উপরোক্ত যুক্তিগুলি বিবেচনাপূর্বক কৃষক শ্রেণীর কল্যাণ সাধনের কথা মাথায় রেখে যেন সত্বর এই আইন প্রত্যাহার করা হয়। এছাড়াও কৃষি সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের আগে যেন অতি অবশ্যই কৃষি ব্যবস্থার সকল অংশীদার -যেমন কৃষক, সম্প্রদায়সমূহ, সকল রাজ্য, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গবেষক, প্রমুখ সবার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে একটি সর্বসম্মত সমাধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়।

     ধন্যবাদান্তে,

    ইন্ডিয়ান ইকনমিস্টস ফর ইকুয়ালিটি

    এই গ্রুপের  প্রতিনিধিস্বরূপঃ

    Sripad Motiram (Associate Professor of Economics, University of Massachusetts Boston)

    Sirisha Naidu (Associate Professor of Economics, University of Missouri Kansas City)

    Smita Ramnarain (Associate Professor of Economics, University of Rhode Island)

    Smriti Rao (Professor of Economics and Global Studies, Assumption University, Massachusetts)

    Vamsi Vakulabharanam (Co-Director, Asian Political Economy Program, and Associate Professor of Economics, University of Massachusetts Amherst).

  • বিভাগ : আলোচনা | ০৯ জানুয়ারি ২০২১ | ১৯০ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • প্রতিভা | 116.72.130.29 | ০৯ জানুয়ারি ২০২১ ১৬:০৮101582
  • অত্যন্ত সুলিখিত ও যথাযথ । অনুবাদও প্রাঞ্জল। অনুবাদককে ধন্যবাদ। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু প্রতিক্রিয়া দিন