• টইপত্তর  বাকিসব  মোচ্ছব

  • আহিরণ নদীর বুক ফাটে, মুখ ফোটে না -  পর্ব ৩

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    বাকিসব | মোচ্ছব | ০৯ অক্টোবর ২০২০ | ২৮৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • (৪)

      ভরদুপুরে ছুরিগাঁয়ে সবার ভাতঘুম ছুটে গেল এক বিকট শোর-শরাবা আর হেঁড়ে গলার আওয়াজে।

     সবাই উৎকর্ণ, আওয়াজটা কিসের? কোত্থেকে আসছে?

    সপুরণ দেবাঙ্গন পান্তাখেয়ে জানলা দিয়ে আসা রিমির ঝিমির বৃষ্টির ছাঁট আর জোলো হাওয়ায় কাঁথা গায়ে টেনে শুয়েছিল।  বৌয়ের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে চোখ লেগে গেছল।  ধড়মড়িয়ে উঠে বৌকে হাঁক পাড়ল।  কাহে কী চিঁ-পোঁ?

    আওয়াজ এগিয়ে আসছে রহসবেড়া পাড়ার দিক থেকে ,  ক্রমশঃ মন্দিরের কাছ দিয়ে এসে বাঁয়ে ঘুরে গেল।

    কানহাইয়া অগরওয়াল আটা পেষার চাক্কি বন্ধ করে ক্যাশ মেলাচ্ছিল।  চটপট তিজোরিতে চাবি লাগিয়ে বারান্দায় এল।  আওয়াজ চলে গেছে লাইনপাড়ার দিকে।

    ধীরহে মাস্টারজি স্কুল সেরে বাড়ি এসে হাত-পা ধুয়ে সবে খেতে বসেছেন এমন সময় সেই আওয়াজ।  মেয়েকে বললেন –দেখ না ও সুরভি, ই কা তামাশা হ্যাঁয়?

       লাইনপাড়ায় গায়ে গায়ে বাড়ি।  সবার খাপরার ছাত, মাটির দেয়াল ও উঁচু বারান্দা, জঙ্গলের চুরির কাঠ দিয়ে তৈরি থাম, কড়িবরগা , দরজা।  দরজা ও চৌকাঠে গাঁয়ের ছুতোরের হাতে তৈরি লতাপাতার নকশা।   কারো কারো বারান্দার দেয়ালে নীল-হলুদ রঙে আঁকা ফল খাচ্ছে টিয়ে পাখি বা কেওটের নৌকো করে নদী পেরোচ্ছেন রাম-সীতা।  দুই সারি বাড়ির মাঝখান দিয়ে চলে গেছে চিলতে পায়ে চলার গলি, ঢালু হয়ে নেমে গেছে আহিরণ নদীর পাড়ে।

      গলির মধ্যে সেই বিকট হেঁড়ে গলার আওয়াজ ও তার সঙ্গে গাড়াবাজার শব্দ  দু’পাশের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে যেন দ্বিগুণ হয়ে উঠছে।

    লজঝরে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বাঁধা অ্যামপ্লিফায়ার,  হাতে চোঙা, পঞ্চায়েতের চৌকিদার বনরাজ সিং ঠাকুর ঘোষণা করছে—‘সুনো  সুনো! সারে গাঁওয়ালে সুনো’।

    পেছন পেছন আসা গাঁড়াপাড়ার মহেশ আর শীতল দুটো নাগাড়া, সঙ্গে ইস্পাতের পাতলা তলোয়ারের লম্বা বাঁকানো ফলা, হাতে সাইকেলের টায়ারের টুকরোর মত কিছু দিয়ে পিটছেঃ ডুম ডুম ডুম, ডুমক-ডুম। 

    ‘ পরশো এতোয়ারকে দিন—ডুম ডুম ডুম—হমারে গাঁও মেঁ—ডুম ডুম- এক ব্যাংক খুলেগী—ডুমডুম ডুডুম ডুম।  ব্যাংক কা নাম –ডুম ডুম--গ্রামীণ ব্যাংক—ডুডুম ডুম।

    কলেশরাম গৌটিয়াকে মকান মেঁ—ডুম ডুম ডুম।   মন্ত্রীজি আহি—ডুডুম ডুডুম ডুডুম--রাজধানী দিল্লি লে—ডডম ডডম ডডম, সারে গাঁওয়ালে আও, মাইপিলা আও, ডম ডমা ডম , ডম ডমা ডম। গাঁওকে ইজ্জত কা সওয়াল।

    ডুম ডুম ডুম, ডুমক-ডুম।  ডুম ডুম ডুম, ডুমক-ডুম। 

    এবার দুই গাঁড়া মহেশ আর শীতল তলোয়ার যুদ্ধের ভঙ্গিতে পাঁয়তারা কষে নাচে।

    দুপাশে বারান্দায় সারি সারি মেয়েমদ্দর ভীড়। সবাই জানতে চায় হল টা কী?

    গর্বিত মুখে বনরাজ সবাইকে দেখে। আজ ওর দিন; সহজে মুখ খুলবে না। পঞ্চায়েতের নগণ্য কর্মচারি বটে, কিন্তু আজ ওর দিন। সরকারি ঘোষণা করার বরাত পেয়েছে। ভাল হোক সরপঞ্চ সায়েবের।  উনি কুমারসায়েব, কিন্তু গরীব ভাইকে ভোলেন নি। রক্তের টান বলে কথা।

    যাহোক, সবাই অনুনয় বিনয় করলে ও ঢোঁক গিলল, কিন্তু কী বলবে? ও নিজেই ভাল বোঝেনি। ফলে ঢ্যাঁড়া পেটার সময় যা বলেছিল তাই একটু ঘুরিয়ে বলল—মন্ত্রীজি আওথে; গাঁও কে ইজ্জত কা সওয়াল। সব্বোজন আইহ, ইতোয়ার কে দিন, সুবহ দশ বাজে।

    কিন্তু জনগণের কৌতুহল বড় বিষম বস্তু।  মন্ত্রীজি আহি? সচ্চি মেঁ? হমন কে  ছুরি গাঁও মা ? কাবর ? হমন লা কা মিলি?

    (আরে কৌন মন্ত্রী? ভোপালওয়ালে কি দিল্লিওয়ালে? ইঁহা আকে কা করহি?

    কা করহি? ব্যাংক খোল দেহি।   ও কা চীজ হোথে?

    মন্ত্রী সত্যি আসছেন? আমাদের এই গাঁয়ে , কেন বল দেখি? আমরা কী পাবো? আর কোত্থেকে আসছেন? ভোপাল নাকি দিল্লি? এই ব্যাংক কাকে বলে?

    বনরাজ সিং এর ওর মুখের দিকে তাকায়। তারপর ধীরহে গুরুজিকে দেখতে পেয়ে পাবলিককে বলে—মোর মুড়ি লা ঝন খাবে।  যাও, মাস্টারলা পুছিহ।  ওহ জরুর জানথে।

    আমার মাথা খেও না , মাস্টারকে শুধোও। ও নিশ্চয় জানে।

    মাস্টার বিরক্ত; কিন্তু বনরাজকে মানা করতে পারে না । কারণ, মাস্টারের ঘরের পেছনের আঙিনায় তৈরি হয় মহুয়ার মদ। লাইনপাড়ার ঘরে ঘরে এটা সাইড বিজনেস।  কিন্তু ধীরহে গুরুজির ঘরের জিনিস এখানে ব্র্যান্ডের সুখ্যাতি পেয়েছে।  একফোঁটা জল মেশানো নেই।  আঙুল ডুবিয়ে মাচিস মারলে প্রদীপ হয়ে জ্বলবে। বনরাজ শুধু ওর নিয়মিত গ্রাহক নয়, আবগারী বিভাগ থেকে যখন রেইড হয়, তখন বনরাজ খবর পেয়ে আগেভাগে গুরুজিকে সতর্ক করে দেয়।  তাই কিছু হিংসুটে মাস্টার গোপন শিকায়ত করেও গুরুজির একগুছি ‘বাল ভি বাঁকা নহী কর সকে’।  

    আসলে উচ্চবর্ণের লোকেরা অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের লোকেদের বাড়বাড়ন্ত দেখতে পারে না ।   তাই প্রমোশনের সময় এলে একমাস আগে ডি ই ও , অর্থাৎ জেলা শিক্ষা অধিকারীর অফিসে বেনামী কমপ্লেনের লাইন লেগে যায়।  অথচ, এরা অনেকেই সন্ধ্যের দিকে গুরুজির ঘরে এসে বোতল নিয়ে যায়; অবশ্যি কনসেশন দামে।

    বনরাজ ও উচ্চবর্ণের; তবে ও অন্যদের মত নয়। মনটা ভালো । সেবার গুরুজির বৌ ঘরের তৈরি মাল টেনে পুরো টল্লি হয়ে ঘরের মধ্যে আঃ আ-আজা অঙ্গভঙ্গি করে গাইতে থাকলে গুরুজি বনরাজকে খবর দেয়। ও একঘন্টার মধ্যে কাঠঘোরা মহকুমা হাসপাতাল থেকে ডাক্তার নিয়ে আসে । ডাক্তার অবস্থা দেখে বললেন—পেট থেকে পাম্প করে অ্যালকোহল বের করতে হবে; তোমরা পেশেন্টকে চেপে ধর।

    ডাক্তারের সঙ্গে আসা ড্রেসার বয় পাম্প বের করল। দুজন মিলে রোগিণীকে চেপে ধরল। কিন্তু ডাক্তার যেই পাম্প নিয়ে এগিয়েছেন মহিলা এক ঝটকায় তার রোগাপটকা স্বামী শুদ্দু সবাইকে মাটিতে ফেলে দিয়ে খাটে উঠে সবাইকে চ্যালেঞ্জ করতে লাগল আর গালাগালির তুবড়ি রোঘা- বেররা ( মরুটে, বদমাশ) ছাড়িয়ে উচ্চমার্গে পৌঁছে গেল।

    তখন বনরাজ পেছন দিয়ে এসে জাপটে ধরে ওর হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল। ডাক্তার ও তার সঙ্গী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

     গুরুজি অকৃতজ্ঞ নয়। সাতদিন পরে বনরাজকে ডেকে এক বোতল ‘ফিরি’তে দিয়েছিল।

     এবার সবার চোখ ফিরল ধীরহে গুরুজির দিকে।

    উনি স্কুলে সামাজিক বিজ্ঞান পড়ান; তবে নীচু ক্লাসে।

     আমতা আমতা করে বললেন যে ব্যাংক খুব জরুরি জিনিস ।  ওখানে টাকাপয়সা রাখলে চোরডাকাত কিছু করতে পারে না । কারণ গরমেন্টের গার্ড পাহারা দেয়।

    একটা সমবেত দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।

    গাঁয়ের ভাঁড় রসেলুর গলায় আক্ষেপ ফুটে উঠল- ই সব আমিরলোগ কে বাত।  হমার ঘর মা ফুটি কৌড়ি নহি তো কা ধরকে ব্যাংক যাবো?

    সবাই সায় দিল—হঁয় হঁয়; হ-হো, হ-হো!

    ধীরহে গুরুজি সামলানোর চেষ্টায় বললেন—আরে জরুরত কে সময় কর্জা পাবে গা।

    রহেলুর সখী শিবরাম ওরফে ঠিবু মুচকি হাসে।  গুরুজির ঝাঁসেবাজিকে পাত্তা দিও না । কেউ মিনি মাগনা কর্জা দেয় না , গাঁয়ের ধন্নাশেঠও না । সবাই জমানতদার নেয়, ঘরবাড়ি লিখিয়ে নেয়।  কোন বছর যদি ফসল মার যায় তো ব্যাংকের লোক এসে তোমাদের গরুবাছুর নিয়ে যাবে, ঘরবাড়ি কুর্কি করে নেবে।  সরকারি ব্যাপার। পুলিশ আদালত সব সরকারের।  তোমরা ভেবে দেখ।

    জনতা বিপন্ন; জনতা মাথা চুলকোয়। 

    গুরুজি ও বনরাজ একে অন্যকে দেখে।

    শেষে গুরুজি গলা তোলে- এই ঠিবু হচ্ছে দিল্লাগি -মাস্টার। সবকথায় বাগড়া দেওয়া ইয়ারকি মারা ওর স্বভাব।  ওর কথা বিশ্বাস না করে সেদিন চলে এস ব্যাংকের সভায়। সোজা মন্ত্রীজিকে জিগ্যেস করে নিও।

    কলেশরাম গৌটিয়ার বাড়িতে হইচই। যেন মেয়ের বিয়ে।

    সরপঞ্চ কুমারসায়েব থেকে শুরু করে সবার নাওয়া খাওয়া বন্ধ হবার উপক্রম।   এই এলাকার কোন গাঁয়ে কেউ আজ অব্দি কোন জলজ্যান্ত মন্ত্রী চোখে দেখে নি।  অন্ততঃ দিল্লিওলা মন্ত্রী।  রাজ্যের রাজধানী সেই ভোপালে ট্রেনে যেতে প্রায় আঠেরো ঘন্টা।  আর গরীবগুর্বোর দৌড় বিলাসপুর পর্য্যন্ত; খুব বেশি হলে রায়পুর যা ছত্তিশগড় অঞ্চলের রাজধানী। একমাত্র সরপঞ্চ কুমারসায়েব আর লাক্ষার ব্যাপারী দীনেশ অগ্রওয়াল জীবনে দু’বার ভোপাল গেছে, রায়পুর বিশবছরে বারপাঁচেক আর জেলাসদর বিলাসপুর মাসে-দুমাসে একবার।

    জেলা কলেক্টর খবর পাঠিয়েছেন যে উনি আসবেন; আসবেন জেলার পুলিশের সুপারিডেন্ট, ওদের প্রতিনিধি হয়ে কটঘোরা মহকুমা সদরের হাকিম বা সিটি ম্যাজিস্ট্রেট রোজ একবার করে ঢুঁ মেরে যাচ্ছেন। 

    যেন কোন খ্যানত না হয়।  যেন খাতিরদারি সুরক্ষা সব নিয়মমত হয়।  কলেক্টর মহকুমা হাকিমকে বলেছেন যে যদি কোন ভুলচুক হয় তো কলেক্টরের সি আর এ আঁচড় পড়বে।  তাহলে মহকুমা হাকিম ও বাদ যাবেন না ।  ওঁর ট্রান্সফার হবে অম্বিকাপুরের অন্তর্গত সুরজপুরে, আদিবাসী বনাঞ্চল।  হাকিম তাঁর আমলাদের বললেন খ্যানত হলে উনি সবকটাকে হয় লেলুঙ্গা, ধরমজয়গড় নয় নাগলোক বা সাপের ডেরা বলে কুখ্যাত তপকরাতে পাঠাবেন।

    তাই সরপঞ্চ ও অন্যান্য পঞ্চ এবং কাপড়চোপড় -তথা- হরেকরকম্বা ব্যবসায়ের সিন্ধি ও অগরওয়াল দোকানদারদের চৌপাল বসেছে কলেশরামের বাড়িতে।  ক’টা লোহার চেয়ার লাগবে কত দরি বা সতরঞ্চি বিছাতে হবে, মন্ত্রীজির সঙ্গে কয়জন পাত্র-মিত্র-অমাত্য আসবেন, নাস্তা-জলপান ইত্যাদির খরচ কে দেবে, ইতরজনের জন্যে মাটির খুরিতে চা- তার ব্যবস্থা কী ভাবে হবে ? তারপর আছে রঙিন কাগজের মালা দিয়ে সজাবট ও ফুলদানি এবং পুষ্পহার দিয়ে স্বাগত করার প্রোগ্রাম।  বাসরাস্তার মোড়ে বড় করে ‘ব্যানার’ টাঙানো হবে। তাতে লেখা—“ চন্দন, বন্দন, অভিনন্দন!”

    স্কুলের দিদিমণিরা কিছু ছাত্রীদের নিয়ে ‘স্বাগতম, সুস্বাগতম’ গান গেয়ে অভ্যর্থনা করবে।   আর মাইক ও ফোটোগ্রাফার? কোরবা থেকে আনতে হবে। 

     এমন সময় বিলাসপুর-কোরবা রুটের অশোক বাস সার্ভিসের নতুন চালু হওয়া বাস থেকে নামল একটি বছর পঁচিশের ছেলে।  সে বাসের খালাসিদের দিয়ে ছাদ থেকে নামাল একটা সদ্য রঙ করা সাইনবোর্ড, যাতে হলুদ রঙের পৃষ্ঠপটে নীল রঙ দিয়ে লেখা “ বিলাসপুর রায়পুর ক্ষেত্রীয় গ্রামীণ ব্যাংক” , মাঝখানে গরুর গাড়ির চাকা—বোধহয় ব্যাংকের লোগো।  তার নীচে ছোট্ট করে লেখা ‘ভারতীয় স্টেট ব্যাংক দ্বারা প্রায়োজিত’।

    ছাত থেকে নেমেছে ছোট বড় আরও কয়েকটি প্যাকেট।  আর পেছন পেছন পাজামা শার্ট পরা একটা ঢ্যাঙা মত লোক।

    ভাদ্রমাসের গরমে এরা ঘেমে নেয়ে ক্লান্ত।  কিন্তু পাজামা-শার্ট লোকটি বেশ চালাকচতুর। সে কমবয়েসি ছেলেটিকে আশ্বস্ত করল—পরেশান মৎ হোইয়ে স্যারজি, সব ঠিক হো জায়েগা। ম্যায় হুঁ না!

    ছেলেটির চেহারায় টেনশন আগের মতই।  সে রসেলুর দোকানের বেঞ্চিতে বসে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল-- কড়িমিঠি চায়, দো’কাপ ।

    রসেলু ধূর্ত চোখে এই নতুন চিড়িয়াকে জরিপ করে কথায় কথায় জেনে নিল যে এই ছোকরা নতুন ব্যাঙ্কের শাখা প্রবন্ধকজী আর মাত্র ছ’মাস হল চাকরিতে জয়েন করেছে।  হেড আফিস ওকে এই শাখা ‘উদঘাটন’ এর জন্যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছে।  আর পাজামা শার্ট হল হেড অফিসের একজন চাপরাশি, যে অনেক অভিজ্ঞ এবং এইসব শাখার ‘উদ্ঘাটন’ সমারোহ ওর জন্যে বাঁয়ে হাত কা খেল। এর জন্যে সম্ভাবিত সব সমস্যা ও চুটকি মেঁ নিপটা সকতে হ্যাঁয়।  তাই ব্যাংকের চেয়ারম্যান ওকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন , সব ব্যবস্থা আগাম দেখে নিতে।

    রসেলু ওদের চায়ের সঙ্গে দু’প্লেট গরম ভাজিয়া দিল।  ছেলেটি বিপন্ন চোখে তাকাল, এর অর্ডার তো দেয় নি!

    --আরে খাইয়ে, খাইয়ে। রসেলু বরাভয় দেয়।  সেই সাতসকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। আর বিলাসপুর থেকে এখানে আসতে আসতে বাসের ঝাঁকুনিতে সেসব কখন হজম হয়ে গেছে। 

    ওরা কৃতজ্ঞ চোখে তাকায়, খেতে শুরু করে । 

    রসেলু জেনে নেয় হেড অফিসের চাপরাশি তো সেদিনের পর বিলাসপুর ফিরে যাবে। কিন্তু একজন স্থায়ী পিওন তো চাই ! সে তো স্থানীয় হলেই ভাল হয়।

    ছোকরাটি মাথা নেড়ে সায় দেয়।  বলে পার্মানেন্ট কোন পিওন এখন সম্ভব নয় । দৈনিক চারটাকা মজুরিতে লোক নেওয়া যেতে পারে , পদনাম—‘সুইপার কাম ওয়াটারম্যান’। 

    কাজ? কাজ বলতে ব্যাংক ঝাঁট দিয়ে মুছে তকতকে করে রাখা। কাছের কুয়ো থেকে বালতি করে পানীয় ও কাজের জল নিয়ে আসা।  অফিসের সময় গ্রাহকদের ও ব্যাংক স্টাফকে ভাউচার, লেজার ইত্যাদি যুগিয়ে দেওয়া।  ম্যানেজার বললে নাস্তা-চায় নিয়ে আসা।  ব্যাংকের স্টেশনারি গুছিয়ে রাখা, রোজকার ভাউচার সংখ্যা মিলিয়ে সুতোয় গেঁথে তারিখের লেবেল লাগিয়ে সামলে রাখা।  ফিল্ড ভিজিটের সময় সঙ্গে তল্পিবাহক হিসেবে যাওয়া।  রোজ সাইকেলে করে দশকিলোমিটার দূরে ডাকঘর যাওয়া; গ্রাহকদের বাড়ি গিয়ে নোটিস সার্ভ করে আসা,--এককথায় জুতোসেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সবই। ও হ্যাঁ, এই পিওনকে অন্ততঃ ক্লাস এইট পাস হতে হবে।

    বটেই তো, বটেই তো! রসেলু বুঝদারের মত মাথা নাড়ে।

    ব্যাংক হল গে’ লিখাপড়ি জানা লোকের জায়গা। 

    এবার ও সাইনবোর্ডটি মন দিয়ে দেখে। জানতে চায় অন্য প্যাকেটগুলিতে কী আছে।

    আছে লেজার, ক্যাশ রেজিস্টার, ক্যাশবুক ও পাসবুক।  মন্ত্রীজি সেদিন নিজের হাতে কিছু নতুন গ্রাহকদের পাসবুক দেবেন।

    আখবরওয়ালারা ফোটো খিঁচবে? পরের দিন পেপারে ছাপা হবে?

    নিশ্চয়ই।

    এবার রসেলু নববিবাহিত নারীর মত ব্রীড়াবনত  হয়ে নীচু গলায় বলে—আমার বচত খাতা  না কী বলে , সেটা খুলে দিন। আমি সকাল থেকে যত বিক্কিরি হয়েছে সেই রোকড়া গোটাটা দিয়ে গ্রাহক হতে চাই।

    নতুন শাখা প্রবন্ধকের চোখে বিদ্যুৎ খেলে যায়।

    সে বলে যে খাতা খোলা হবে কাল।  এখনও দুদিন সময় আছে। ও কথা দিচ্ছে যে এই ব্যাংকের প্রথম গ্রাহক হবে রসেলু ।  আর মন্ত্রীজির হাত থেকে প্রথম পাসবুকটি ওই নেবে। ওর অ্যাকাউন্ট নম্বর হবে ১/১।

    হতভম্ব রসেলু জানতে চায় যে দুটো ১ কেন? আরে ছুরি গাঁয়ের সূচক সংখ্যা ১; ছোটকি ছুরি ২ এইরকম। তবে ওর খাতা নম্বর থাকবে সেই ১।

    শুধু একটা কথা, রসেলু কাল-পরশুর মধ্যে আরও পাঁচটা গ্রাহক নিয়ে  আসুক।  ওর আত্মীয়, ভাই বেরাদর, বন্ধুবান্ধব—যেই হোক।

    রসেলুর মুখে ছায়া ঘনায়। চেষ্টা করব, কিন্তু যদি না পারি?

    কথা বন্ধ; দুজন দুজনকে অপলক দেখে। ছোকরা হেসে ওঠে।

    কোঈ বাত নেহি। হমারী দোস্তি বনে রহেগী। পর আপ কোশিস তো করো।

     এবার ওরা ওঠে। ছেলেটি পকেটে হাত দিতে গেলে রসেলু হাত চেপে ধরে বলে আপনি গাঁয়ের মেহমান,আজ প্রথম দিন। আপনার থেকে চায়-নাস্তার পয়সা নিলে অধর্ম হবে।

    ছেলেটি কঠিন গলায় বলে – আমি বিনেপয়সায় খাবার খাইনে।

    রসেলু  হেসে ওঠে। ঠিক আছে।  পরে আমার খাতায় জমা করে দেবেন।  ও আওয়াজ দেয়—একটি বছর ষোল’র ছেলে বেরিয়ে আসে।  ও আদেশ দেয় যে এইসব সাইনবোর্ড ও স্টেশনারি যেন কলেশরামের বাড়িতে নয়া ব্যাংকের কামরায় পৌঁছে দেওয়া হয়।

    ওরা রওনা দেয়। রসেলু পেছন পেছন দশ কদম চলতে চলতে বলে—এ আমার ছেলে ঠুল্লু ; চালাকচতুর, পরিশ্রমী। একে আজকে কিছু দিতে- টিতে হবে না ।  আর ও মিডল স্কুল পাস , একটু দয়াদৃষ্টি রাখবেন।

    (৫)

    অবশেষে এসে গেল এতওয়ার বা রোববার।

    গোটা ছুরি গাঁয়ে লোকজন শনিবারের রাত প্রায় জেগে কাটিয়েছে।  দিল্লি থেকে মন্ত্রীজি আসবেন, সোজা কথা! অনেকেই জানে না দিল্লি ঠিক কতদূরে।

    রাজপরিবারের সঝলা কুমার, মানে সরপঞ্চ গেছেন বটে সে অনেক বছর আগে। উনি বললেন – উও ভারী সহর হ্যাঁয় জী। বড়ে বড়ে সড়ক, লাখো লোগ, বহোত গাড়ি –সব দৌড়তে হ্যাঁয়। রাস্তে মেঁ লালবাত্তি জ্বলতে হ্যাঁয়, গাড়ি রুক জাতী হ্যাঁয়। সব লোগ আংরেজি মেঁ গোঠিয়াতে ; মাইপিলা টুরা-টুরি সব্বোঝন। অউ আব্বর উঁচা মকান। তঁয় সর উঠাকে দেখবে তো  গর্দান টেরা হো জাহী।

    সে খুব বড় এক শহর। চওড়া চওড়া রাস্তা, লাখে লাখে লোক আর গাড়ি—সব দৌড়ুতে থাকে। লালবাতি জ্বললে থেমে যায়। ওখানে সবাই ইংরেজিতে কথা বলে। মেয়ে মদ্দ, ছোঁড়া ছুঁড়ি –সবাই। আর কত উঁচু বাড়িঘর। চোখ তুলে দেখলে ঘাড় মটকে যাবে।

    দেখে কে বহোত চীজ হ্যাঁয় জী; লালকিলা, কুতুবমিনার, বাদশাহ লোগোঁ কে মকবরা।  পর মোর শির চকরাথে; দুবারা নহী জানা।  কহ দিয়ে ব্যস।

    ওদেশে দেখার অনেক কিছু রয়েছে; কুতুবমিনার, লালকেল্লা, বাদশাদের কবর। কিন্তু আমার মাথা ঘোরে , আর কখনও যাব না, -- কয়ে দিলুম, ব্যস।

    সবাই সেজেগুজে সকাল ন’টা থেকে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার দুপাশে সদর মহকুমা থেকে পুলিশের দল এসে দুপাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে হঠো হঠো করছে। ভীড় দেখে পঞ্চু ওর গুপচুক (ফুচকা) এর ঠেলা এককোণে লাগিয়েছিল। তারপাশে মঙ্গলুর পানঠেলা। পুলিশের লাঠির গুঁতোয় ওরা পাততাড়ি গোটালো।  রাস্তায় জল ছেটানো হচ্ছে বার বার।  মন্ত্রীজি কি ধূলোর মধ্যে হাঁটবেন নাকি?

    ওদিকে ব্যাংকের সামনের দেওয়ালে গজাল মেরে সাইনবোর্ড লাগানো হয়ে গেছে। বারান্দায় দুটো টেবিল।

    একটা টেবিলে উপর ব্রিফ কেস খুলে ম্যানেজার ছেলেটি একের পর এক অ্যাকাউন্ট খুলে সাইন নিয়ে পাসবুক তৈরি করছে। আর পাশের টেবিলে হেড অফিস থেকে আসা চাপরাশি একটা বেগনি কালি লাগানো স্ট্যাম্পপ্যাড নিয়ে নতুন গ্রাহকদের হাত ধরে ধরে অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফর্মে টিপছাপ নিচ্ছে।

    খাতা খোলার জন্যে চাই মিনিমাম পাঁচটাকা।  সরযুবাঈ আঁচলের খুঁট থেকে গিঁট খুলে যে পাঁচটাকা বের করল সেটা দুমড়ে মুচড়ে গেছে। ম্যানেজার বলল এই নোট চলবে না । সরযূর মাথায় বাজ! এটা ও স্বামীর থেকে না জানিয়ে চালের হাঁড়ির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল। ওর কাছে আর তো নেই ।  অনুনয়-বিনয় করে বলল যে পরে নোট বদলে দেবে। আজ যেন ওকে ফেরানো না হয়।  ম্যানেজার নোট ফেরত দিয়ে বলল খাতা খুলে গেছে। যেদিন ভাল নোট বা পাঁচটাকার সিক্কা নিয়ে আসবে সেদিন পাসবুকে এন্ট্রি করে ওর হাতে দেওয়া হবে।

    সরযূর পেছনে লাইনে দাঁড়ানো বিসাহু অধৈর্য হচ্ছিল। আওরত জাত হল বেওকুফ। ওদের ব্যাংকে আসার দরকার কি? ওরা এসব নিয়মকানুনের কী বুঝবে! খামোখা সময় বরবাদ করা।  আরে বাবা এসব হল পুরুষের আঙিনা ।

    ও সরযূকে একরকম খসকো-খসকো করে ঠেলে সরিয়ে গর্বিত মুখে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ম্যানেজারকে বলল খাতা খুলে দিন, আমি বিসাহুরাম যাদব। কিন্তু মুখভর্তি পান, ফলে কথা স্পষ্ট হল না । বিরক্ত ম্যানেজার বলল পান ‘বাহর থুককে আও’।

    আট আনার পান বাইরে থু করে ফেলে দিতে হবে? এই চ্যাঙড়া ছোঁড়া ভেবেছে কী! সে যাকগে, বিসাহু ওকে পরে দেখে নেবে। একদম নাপ দেঙ্গে সালে কো! সারে হোঁশিয়ারি নিকল জায়েগি। কিন্তু এখন ও বারান্দার কোনায় গিয়ে পিক গিলে হাত দিয়ে মুখ মুছে কামিজের পকেট থেকে দশটাকার নোট বের করে টেবিলের সামনে হাজির হল।

    বিসাহুর দশটাকার নোটে পানের পিকের দাগ।

    ম্যানেজার আবার বিরক্ত। এই গেঁয়োগুলোকে ব্যাংকের আদব-কায়দা রীতি রেওয়াজ শেখাতে কতদিন লাগবে কে জানে!

    হতভম্ব বিসাহু ক্রুদ্ধ চোখে ম্যানেজারের দিকে তাকায়। বলে যে ওর সরকারি নিয়মকানুন ভালই জানা আছে। ও এই গাঁয়ের গেঁয়ো লোক নয়।  মহকুমা সদরে কৃষিবিভাগের চাপরাশি। থাকে অফিসের পাশের গাঁ ফরসাবাহারে । ছুরি হল ওর শ্বশুরবাড়ি। এখানে ব্যাংক খুলছে তাই শালাশালীর অনুরোধে ও খাতা খুলতে এসেছে।  নইলে এই গেঁয়োদের জন্যে খোলা গ্রামীণ ব্যাংকে ও সু-সু করতেও আসত না ।  ওর নোটে কোন খারাবি নেই , খুঁত নেই । নম্বরটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এখন ম্যানেজার বেশি নাজ-নখরা করলে ওর শ্বশুরবাড়িতে ‘পেস্টিজ’ যাবে। ফলে ও বাধ্য হয়ে সোজা মন্ত্রীজির কাছে কমপ্লেইন করবে।  ও সরকারি আদমি, মন্ত্রীজি অবশ্যই ম্যানেজারের বেয়াদপি সহ্য করবেন না । এখন ছোকরা ভেবে দেখুক।

    ছোকরা তিরিশ সেকেন্ড ওর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। নিঃশ্বাস নেয়, মনে মনে ইনডাকশন ট্রেনিং এর ম্যানুয়াল আওড়ায়।  তারপর শান্ত গলায় বলে—অগলা আদমী আ জাও, নেক্সট!

    ভীড়ের মধ্যে একটা হুররে গোছের আওয়াজ ওঠে। কেউ বলে –আরে দামাদবাবু, জাও; শ্বশুরাল জাকে আরাম করো।

    কেউ ফক্কুড়ি করে চিমটি কাটে।  চল না গা! তোলা ছোটি শালী বুলাথে। আহিরন তির ঘুমায়ে বর লে যাবে ওলা!

    যা না রে! ছোট শালী ডাকছে যে; ওকে আহিরণ নদীর পাড়ে ঘুরিয়ে আন।

    ক্রুদ্ধ অপ্রস্তুত বিসাহু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে চায় কে এই ছ্যাবলা !

    অন্যদিক থেকে শোনা যায়—হাঁ হাঁ; জা। ছুপাছুপি খেল গা। অব হমন লা কাম করে দে।

     হ্যাঁ হ্যাঁ; যা। গিয়ে লুকোচুরি খেল গে। কিন্তু আমাদের কাজ করতে দে!

    এবার বিসাহুকে সামলানো মুশকিল হল। ওর মুখগহ্বর থেকে সিগরির কয়লার আগুনের হলকার মত বেরিয়ে আসতে লাগল অদৃশ্য মক্কারদের উদ্দেশ্যে মা-বাপ তুলে গালাগালি এবং সামনে আসার চ্যালেঞ্জ ।

    সেই চ্যালেঞ্জ কোন পুরুষ গ্রহণ করল না ।  কিন্তু ভীড় ঠেলে বেরিয়ে এল একটি মেয়ে। সে অনায়াসে বিসাহুর হাত ধরে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল- হঠ রে রোঘা! জব মন্ত্রীজি আহি তব নালিশ কর লেবে। অব খসক।

    মেয়েটি সোজা ম্যানেজারের সামনে গিয়ে বলল খাতা খুলানা হ্যাঁয়। দশ রুপিয়া।

    স্তম্ভিত ভীড় থেকে আওয়াজ উঠল। লাইন মেঁ নহী থী।  ওকর খাতা লা ঝন খুলিহ সাহাব।

    লাইনে ছিল না ; ওর খাতা যেন খুলো না সাহেব!

    ম্যানেজার বিপন্ন বোধ করে, হেড অফিস থেকে আসা অভিজ্ঞ চাপরাশির দিকে  তাকায়। সে চোখ সরিয়ে নেয়।  সমস্যার সমাধান মেয়েটি নিজেই করে নেয়।

    ভীড়ের দিকে তাকিয়ে কেটে কেটে বলে—কেইসে? সবঝন একহী লাইন মে কেইসে? মরদ আঊরতমন সব জগাহ মা অলগ অলগ লাইন লগাথে; এতি একহী লাইন? ছুরি গাঁওকে অলগ কানুন হবে কা? ই হ্যাঁয় আউরত মন কে লাইন। পহেলা ম্যায়। সারে বাঈমন মোর পাছু আ জাও।

     সবদেশে মেয়েদের জন্যে আলাদা লাইন হয়, ছুরি গাঁয়ে নতুন নিয়ম নাকি? সব মেয়েরা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে পড়। মেয়েদের আলাদা লাইন আমার থেকে শুরু হল।

    এবার হেড অফিসের চাপরাশি গলা তোলে। বলে ঠিক কথা।  দুটো লাইনে সব লেগে পড়। মেয়েরা! এই  মেয়েটির পেছনে এস।  একজন ছেলের লাইন থেকে, তার পর একজন মেয়েদের লাইন থেকে। এক কে বাদ এক; আমি দেখব যাতে কোন অন্যায় না হয়।

    ম্যানেজার কৃতজ্ঞ বোধ করে।  সে ফর্ম নিয়ে নাম জিজ্ঞেস করে। দ্রুপতী বাঈ।  তারপর মেয়েটি ব্লাউজের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা দশটাকার নোট বের করে।  ম্যানেজারের চোখে পড়ে সুডৌল স্তন; কপালের ঊপর একটা কাটা দাগ, সেলাইয়ের।  ও বুঝতে পারে মেয়েটির চোখ সজাগ, ওর দৃষ্টিকে অনুসরণ করছে। ও লজ্জা পায়।  সামান্য ঘামে ভেজা উষ্ণ নোটটি ড্রয়ারে ঢোকায়।  তারপর মেয়েটির দিকে না তাকিয়ে ওকে টিপছাপ দিতে পাশের টেবিলে যেতে ইশারা করে। মেয়েটি কোন কথা না বলে টেবিল থেকে ম্যানেজারের কলমটি তুলে নিয়ে ফর্মে দাগ দেয়া জায়গায় একটু বড় বড় তেরছা অক্ষরে লেখে দুরুপতী বাঈ।

    ম্যানেজার আবার ওর দিকে তাকায়। এবার ও লাইন থেকে সরে গেলে পাশের লাইন থেকে এক আধবুড়ো বলে ওঠে- আব্বর টেইম লাগিস; অব মোর কাম লা কর দেহ জী!

    ম্যানেজার নেক্সট বলার আগেই রাস্তার দিক থেকে হল্লা শোনা যায়—মন্ত্রীজি আ গয়ে! মন্ত্রীজি আ গয়ে! লাউড স্পীকারে বেজে ওঠে দেশভক্তির গান—মেরে দেশ কী ধরতী সোনা উগলে, উগলে হীরামোতি।

    মাথায় লালবাতি লাগানো গোটা কয়েক সাদা অ্যামবাসাডর গাড়ি পুকুর থেকে উঠে গা ঝাড়া দেওয়া রাজহাঁসের গরিমায় এগিয়ে আসছে।   তার আগে চোখে রোদচশমা পরনে সাফারি স্যুট জনাকয়েক হোমরাচোমরা দ্রুত পায়ে ব্যাংকের প্রবেশপথ আড়াল করে দাঁড়িয়ে গেছে।  মাথায় গান্ধীটুপি গলায় উত্তরীয় পরনে দামি খাদির স্যুট স্থানীয় বিধায়ককে সবাই চেনে।  উনি ইংরেজ আমলে রায়বাহাদুর খেতাব পেয়েছিলেন।  পৈতৃক সম্পত্তি ছুরি গাঁয়ে  এবং  আহিরণ নদীর ওপারে ও বাঙ্গো নদের কুলে অজগরবাহার বনের ধারে সতরেঙ্গা, জেঙ্গা আদি গাঁয়ে এর কত হাজার একর জমি পতিত পড়ে আছে তা বোধহয় উনি নিজেও জানেন না ।  থাকেন বিলাসপুরে দুর্গের মত একটি বিশাল বাড়িতে।  তার আউট হাউসে একটি ধর্মশালা মত আছে, যাতে ছুরি গাঁ থেকে কেউ শহরে গেলে ওখানে রাতটা কাটাতে পারে । 

     গত তিনটি বিধানসভা নির্বাচনের সময় ভোটের সাতদিন আগে ওঁকে সবাই এ গাঁয়ে দেখেছে।  উনি মধ্যাহ্ন ভোজন সেরেছেন রাজবাড়িতে।   ওঁর জীপ গাড়ি নিয়ে চেলাচামুন্ডারা ছুরির সাতটি পাড়া চষে বেরিয়েছ্বে। আর সহিস মহল্লা ও ধনরাস বানচর এসব পড়োশি ছোট ছোট গাঁয়ে –যাদের জনসংখ্যা মেরেকেটে ৬৯৭ কি ৫৩৪—গরীবগুর্বোদের পাড়ায় গিয়ে নোটের বান্ডিল খুলে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছে।  কোমরে ঘুনসি বাঁধা ন্যাংটোপুটো কালোকোলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ের দল মহানন্দে গাড়ির পেছনে দৌড়েছে ঘুড়িধরার মত আনন্দে। আর বড়রা হাত জোড় করে দাঁড়িয়েছে ঝোলাভর্তি নারঙ্গি বা ধেনোমদের বোতল পাবে বলে।  দেখ, কথা দিয়েছ, কোন গড়বড় না হয়।  সবাই কৃতজ্ঞতায় গলে যায়। বলে নুন খেয়ে গুণ না গাইলে ধম্মে সইবে। আমরা বাপ-পিতামোর সময় থেকে শুধু আপনাকেই চিনি; মারলেও আপনি, বাঁচালেও আপনি। আমাদের দিক থেকে কথার খেলাপ হবে না । একটু দয়াদৃষ্টি রাখবেন গো! বিলাসপুরে আমাদের মুখিয়া কোন কাজ নিয়ে গেলে ওর মাথায় যেন রায়বাহাদু্রের বরদহস্ত থাকে।  দারোয়ান যেন দেখা করতে দেয়।  সেবারের মত না হয়। 

    থাকবে, থাকবে! সেবারে নতুন দারোয়ান ছিল যে! কিস্যু জানত না । ওটা অ্যাকসিডেন্ট।  সে কি রোজ রোজ ঘটে?

    আজকে বিধায়কজি কাউকে দেখছেন না ; ওঁর লক্ষ্য শুধু মন্ত্রীজির গাড়ি। এটা যে ওনার পৈতৃক গাঁ। আও-ভগতে যেন ত্রুটি না হয়। কোন ব্যাটা মুখ্যু-মাতাল যেন সামনে না পড়ে । 

       গাঁয়ের লোকজন মন্ত্রীমশাইকে প্রথম দফায় চিনতে ভুল করল। মালা দিল কলেক্টরকে। সরপঞ্চ ধমক খেয়ে তোতলাতে লাগল।  মন্ত্রীজি ভাল মানুষ; কিছু মনে করেন নি, বরং প্রশ্রয়ের হাসি হেসেছেন। যথারীতি অনেকগুলো মালা পরানো হল। স্বাগতগীতের সময় ছিল না । স্কুলের বাচ্চারা ‘ভারত মাতা কী জয়’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। কলেক্টর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে মাইকে ঘোষণা করে দিলেন যে ওঁদের আরও অনেকগুলো কার্যক্রম আছে। ব্যস্ত কার্যক্রম। তাঁর মধ্যেও মন্ত্রীজি দয়া করে এসেছেন এ ছুরিগাঁয়ের পরম সৌভাগ্য।  তবে এখানে এই প্রোগ্রামের বরাদ্দ সময় আধাঘন্টা।  ওঁর ভাষণের পর পাসবুক বিতরণ করে উনি ফিরে যাবেন বিলাসপুর। সেখানে আরও কার্যক্রম আছে।      

        মন্ত্রীজি গাঁয়ের জনতা ও বিধায়কজিকে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন যে এই ব্যাংক গরীবদের জন্যে খোলা হয়েছে। শুধু গরীবরাই এখানে কর্জ পাবে, বড়লোকেরা নয়। তবে টাকা জমা রাখলে তারা ভাল সুদ পাবে।  মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীজি আমাদের মাতা সমান। উনি চান যে গাঁয়ে গাঁয়ে মহাজনী শোষণ বন্ধ হোক। তাই এই ব্যাংক।  গরীবেরা এখানে ঢুকে অধিকারের সঙ্গে কর্জ চাইতে পারে । এমনকি বিয়েশাদি, বালবাচ্চার পড়াশুনো সবকিছুর জন্যে কর্জ দেওয়া হবে। কেউ যেন সুদখোরের কাছ থেকে ঘটিবাটি বন্ধক রেখে লোন নিয়ে ভিটেমাটি চাটি না করে।

    সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। আবার শোনা গেল ভারতমাতার নামে জয়ধ্বনি। এবার পাসবুক বিতরণের পালা। মোট দশটি পাসবুক মন্ত্রীজি দেবেন। উনি চলে গেলে বাকি পাসবুক সরপঞ্চ কুমারসাহেব দেবেন।

    প্রথম পাসবুক খাতা ক্রমাংক ১/১, রসেলু।  হ্যাঁ, ম্যানেজার কথা রেখেছে। চারদিকে হাততালি, ক্যামেরার ঝলক। কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে রসেলু, মন্ত্রীজির পায়ে হাত দিয়ে কপালে ঠেকায়।  ১/১০ পাসবুকটির গ্রাহক দ্রুপতী বাঈ। ও পায়ে হাত দিতে গেলে মন্ত্রীজি মানা করে মাথায় হাত ছুঁইয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেন যে ওর আদমি কী কাজ করে? উত্তরে দ্রুপতী জানায় যে ওর কোন মরদ নেই । মন্ত্রীজি মুচকি হেসে কলেক্টরকে ইংরেজিতে বলেন যে এটা কি ঠিক হল? মহাভারতে দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামী  এই গাঁয়ের দ্রৌপদীর একটাও না ? ঘোর কলি!

    সবাই মুচকি হাসে।  সঙ্গের এলিট গোষ্ঠীর একজন ইংরেজিতে বলে—আপনার আশীর্বাদে জুটে যাবে। আপনি ব্রাহ্মণ।  আবার হাসি।

     উনি প্লেট থেকে গুণে দুটি কাজু আর দুটো কিসমিস তুলে মুখে দিয়ে সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে হাত নেড়ে গাড়িতে উঠলেন।  গাড়ি এগিয়ে গেল। জনতা জয়ধ্বনি করল।

     এবার বাকি পাসবুক দেওয়ার পালা। সরপঞ্চের নির্দেশে বনরাজ সিং চোঙা ফুঁকে ঘোষণা করে দিল যে সবাই যেন চা খেয়ে যায়। এর খরচ গ্রাম পঞ্চায়েতের।

     ধীরে ধীরে ভিড় কমতে লাগল।  এই সু্যোগে ম্যানেজার মাইক খোলার আগে পাবলিকের উদ্দেশে একটা ছোটখাট বক্তৃতা দিয়ে বোঝাল যে ব্যাংকে লেনদেন এর জন্যে কী কী জরুরি আর ব্যাংক খোলা ও বন্ধ হওয়ার সময় সারণী কী।  এটা জানাতেও ভুলল না যে এই ব্যাংক সোমবার বন্ধ থাকবে, শনিবার আদ্দেক দিন। কিন্তু রবিবার খোলা থাকবে, যাতে সেদিন ছুরির হাটের দিন, লোকজনের কোন অসুবিধে না হয়।

    একঘন্টার মধ্যে সরপঞ্চের ‘যাও সবে নিজ নিজ কাজে’ নির্দ্দেশ পেয়ে সবাই ঘরে ফিরে গেল। ক্লান্ত ম্যানেজার চাপরাশিকে বলল কালকের দিনটাও থেকে যাও। একটা দিন তোমার সাহায্যে নর্মাল ব্যাংকিং তো হোক।

    বেলা চড়ছে। ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দূর। ব্যাংকের সামনের রাস্তায় একটা কালো গোরু চরে বেড়াচ্ছে। অন্যমনস্ক ম্যানেজার ভাবে কালো গোরুর দুধ নাকি মিষ্টি হয়। রসেলুর ছেলে ঠুল্লু কাল থেকে সকালে এসে ঝাঁটপাট দিয়ে ব্যাংক খুলবে। বলল কালো গরুর দুধ নিয়ে আসবে যদি সাহাব খেতে চান। আর চায়ের জন্যে আনবে গুঁড়ো দুধ।

    এমন সময় শোনা গেল চেনা সুরে কেউ গান গাইতে গাইতে রাস্তা দিয়ে আসছে।

    উৎকর্ণ ম্যানেজার চিনতে পারে যে সুরটা হল নাগিন সিনেমার হিট ‘মন ডোলে রে, তন ডোলে রে’।

    কিন্তু কথা গুলো ছত্তিশগড়ি।

    ঠুল্লু হেসে বলল—সাহাব ও হল ঝোলটু পাগলা। ওর বৌদি খাবারে বিষ মিশিয়ে ওকে পাগল করে দিয়েছে, বাড়ি থেকে বার করেও দিয়েছে। ও এর তার দ্বারে মেগে খায় আর সারাদিন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গান গায়।

    ‘তোর দাঈ মর গয়ে, তোর দদা মর গয়ে। তোর লেইকা পড়ে বিমার রে,

    অব কউন চরায়ে ছেরি-বোকরা’।

    তোর মা গেছে মরে, তোর বাপ গেল  মরে; তোর ছেলেটাও হবে বিমার,

    আজ কে চরাবে তোর ছাগলছানা?

    (চলবে)
আরও পড়ুন
ছড়া - Ramit Chatterjee
আরও পড়ুন
লোনার - Saswati Basu
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অরিন | ১১ অক্টোবর ২০২০ ১৪:০৬732947
  • বড়  সুন্দর এই vignette ।  পড়ে  মন ভরে  গেল । 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন