
সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোনআমি একটু নড়েচড়ে গেছি। অভিজিৎ রায়ের প্রোফাইল এখনও জ্বলজ্বল করছে ফেসবুকে। পাঁচ ঘন্টা আগে শেষ আপডেট। বিডি নিউজের একটা লেখার লিংক। অভিজিতেরই লেখা। সাত্র নাথিংনেস বিজ্ঞান এসব নিয়ে লেখা একটা ছোট্টো প্রবন্ধ।তার প্রথম লাইন "কেন কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?" আর সেই আপডেটের ঘন্টা পাঁচেক পরে পড়ছি বিডি নিউজেরই আরেকটা লিংক। এটা খবর। "একুশের বইমেলার থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা লেখক অভিজিৎ রায় ও ব্লগার রাফিদা আহমেদ বন্যাকে। তাদের দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অভিজিতের মাথায় গুরুতর জখম হয়েছে, আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তার স্ত্রী রাফিদার।" শুনছি, আহত নয়, মারাই গেছেন অভিজিত। শেষ লেখার লাইনটা শুধু উল্টে গেছে। কিছু থাকার বদলে কোনো কিছুই আর নেই। প্রশ্নটাও থেকেই গেছে। কেন কোনো কিছু থাকার বদলে নেই হয়ে গেছে? কেন?
সোজাসুজি জানার কোনো উপায় নেই। কিন্তু তাও আমি একটু নড়েচড়ে গেছি। কেন? অভিজৎকে কি আমি চিনতাম? বলা কঠিন। খুব অনুসরণ করেছি তো নয়, মুক্তমনার লেখক হিসেবে একরকম করে চিনতাম। গুরুতে একটা লেখা ছাপা হয়েছিল, তার কিঞ্চিৎ সম্পাদনা করেছি। দু-চারটি বাক্য বাদ দিয়েছি, নাড়াচাড়া করেছি। মেল চালাচালি হয়েছিল কি? নিশ্চয়ই হয়েছিল, কিন্তু মনে পড়েনা। খুঁজে বার করা যেতে পারে, কিন্তু এখন, ঠিক এই মুহূর্তে খুঁজে বার করতে চাইছিনা। পারবও না, ইচ্ছেও নেই। কখনও সাক্ষাৎ, ফোনে কথাবার্তা? হয়নি। তাহলে কেন লিখছি? কারণ, আমি নড়েচড়ে গেছি। কেন? একটা লোক, যে এতদিন পাশেই ছিল, নেট দুনিয়ায় গা ঘেঁষে ছিল, ইচ্ছে হলেই টুক করে ফেসবুকে একটা মেসেজ কিংবা মেল করে দিলেই ধরে ফেলা যেত, সে তো আমার পড়শীই ছিল এতদিন। আমার পড়শী, আমার পাশের বাড়ির লোক, স্রেফ বাংলা লেখার জন্য, বাংলা ভাষায় লেখার জন্য, বাংলা ভাষায় নিজের চিন্তা প্রকাশ করার জন্য লাশ হয়ে যাবে, এটা অচিন্তনীয় না? সন্ত্রাস-টন্ত্রাস তো পৃথিবীর অন্যপ্রান্তের বিষয় ছিল। যা নিয়ে তত্ত্ব করতে হয়, মূল্যবান মতামত দিতে হয়। কিন্তু ঠিক পাশের বাড়ির লোকের মুন্ডু কেটে নিয়ে গেলে কেঁপে যাবনা?
আমি নড়েচড়ে গেছি, কারণ, আমি এসবকে এতদিন দূরের জিনিস ভেবেছি। দূরবীন দিয়ে দেখা বৃহস্পতির উপগ্রহের মতো। এই তো কদিন আগে নেটে চেনা এক মহিলার উপরে ফতোয়ার কথা পড়লাম নেটে। মহিলা নিজের অসম্ভব উদ্বেগের কথা লিখছিলেন। চিৎকার করে জানাচ্ছিলেন মৌলবাদীদের কথা। লোকে নানা মতামত দিচ্ছিল। পক্ষে বিপক্ষে। কোন মতামতটা হিন্দু মৌলবাদীদের পক্ষে যাবে, কোনটা বিপক্ষে, এইসব। আমি দূর থেকে বসে দেখেছি, নিস্পৃহতায়। কেন? দূরের জিনিস ভেবেছি বলেই তো। তত্ত্বকথা ভেবেছি বলেই তো। আজ দুম করে সব কাছে চলে এসেছে, আজ আমি মহিলার নাম আর লিখছিনা। ভয়ে লিখছি না। কারণ এসব আর শখের তত্ত্বচর্চা নয়, লেখার জন্য এখন আমার পাশের বাড়ির লোককে কুপিয়ে মারা হয়। মহিলার নাম নিলে, কি জানি, তাঁরও মুন্ডু উড়ে যেতে পারে। বৃহস্পতির উপগ্রহ দূবরীনে দেখার পর গ্যালিলিওর ও এরকমই হয়েছিল নিশ্চয়ই। এটা তো ঠিক মহাজাগতিক ব্যাপার নয়, বৃহস্পতির উপগ্রহই হোক আর বিশ্বজগৎ, সে তো দূরের কিছু নয়, স্রেফ ওইটুকু দেখার জন্যই মানুষকে যেতে হতে পারে ইনকুইজিশনে।
আমি নড়েচড়ে গেছি, কারণ, লেখার জন্য জীবন দেওয়া আর দূরের জিনিস নয়। এ যেন ব্রেখটের নাট্যতত্ত্ব, নিদারুণ বিচ্ছিন্নতায় অন্য একটা নাটকের দৃশ্যাবলী দেখার পর, দুম করে অনুভব করা, আরে এ তো আমারই কথা বলছে। আমার বা আমার পাশের বাড়ির। কিন্তু শুধু সেটুকুই নয়। এখানে রয়ে গেছে আরেক পরত ম্যাজিক রিয়েলিজম। কাঁটাতারের বেড়া। একই ভাষায় কথা বলি, আমি আর অভিজিৎ। বলি নয়, বলতাম। একই বিষয় নিয়ে তক্কো করতাম। করিনি, কিন্তু করতেই পারতাম। ভালোবাসতে পারতাম, ঝগড়া করতে পারতাম। নেট জগতে, গুরুর গ্রুপে, গুরুর পাতায়, যেখানে খুশি। সেজন্যই তো পাশের বাড়ির লোক মনে হয়, হচ্ছে, বা হবে। কিন্তু তারপরেও অভিজিৎ মারা গেলে আমার কিচ্ছু করার নেই। আমি নন্দীগ্রামের মিছিল দেখেছি, কলরবের মিছিল দেখেছি, থাকি বা না থাকি, উত্তাপ নিয়েছি, মতামত দিয়েছি। কাউকে কোথাও একটা জবাব দিয়েছি বলে মনে হয়েছে। আমার জবাব দেবার একটা জায়গা আছে বলে মনে হয়েছে। কিন্তু এখানে? আমার পড়শী খুন হয়ে গেলে আমার কিচ্ছু করার নেই। কারণ ওটা অন্য দেশের ব্যাপার। ওটা বাংলাদেশ। ওরা ওদের ব্যাপার নিজেরা বুঝে নেবে। কারণ মধ্যে আছে কাঁটাতার। আমার পড়শী খুন হবে, খুন হয়ে যাবে, মাথায় বাড়ি খেয়ে ছটফট করবে, আমারই মাতৃভাষায় চিৎকার করবে, আর আমি কাঁটাতারের এপাশ থেকে জুলজুল করে দেখব। এতেও যদি নড়ে না যাই তো কিসে যাব?
ছোটোবেলায় গণসংগীত শুনতাম। সাথীদের খুনে রাঙা পথে দেখো, হায়নার আনাগোনা। কাঁটাতারের এপার থেকে এখন আমি হায়নার আনাগোনা দেখছি। আমি বহু হাজার মাইল দূর থেকে অফিস ফাঁকি দিয়ে শুধু লিখছি। নিরাপদে বসে। কারণ আমি এটুকুই পারি। মিছিলে আমার অধিকার নেই। ওদের ঝুঁকি ওদের, আমার নয়। ওদের ভূখন্ড ওদের, আমার নয়। আমার হাত-পা বাঁধা। আমার তেমন দুখ নেই, নড়ে-চড়ে যাওয়া আছে। আর আছে একটু ক্রোধ। আর মাঝে-মাঝে ঝিলিক মারছে একটা সুখস্বপ্ন। কোনো ভাবে এই কাঁটাতারটা ওপড়ানো যায়না? মৌলবাদকে রোখা যায়না একসঙ্গে?
এ হয়তো ঠিক লেখা হলনা। কতো কিছু জরুরি কথা বাদ গেল। এবং এ সবই ইনস্ট্যান্ট কফির মতো চটজলদি আবেগের কথা। অফিসের ডেস্কে বসে ১০ মিনিটে লেখা। তবে নড়ে গেছি কথাটা মিথ্যে নয়। আর ক্রোধটাও আশা করি জাস্ট এই কি-বোর্ড পিষেই উবে যাবেনা। বাংলাদেশের বন্ধুরা হাত বাড়ান। সঙ্গেই আছি।
dd | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০২:৪২68945
Du | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০২:৪৮68965
শ্রী সদা | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৩:০২68947
Du | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৩:০৩68966
শ্রী সদা | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৩:১৪68948
Tim | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৩:৩২68949
pi | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৩:৫১68967
pi | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৩:৫৩68968
riddhi | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৩:৫৮68950
lcm | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৪:০৮68951
a x | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৪:১০68952
dd | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৪:১২68954
a x | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৪:১২68953
শ্রী সদা | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৪:২৭68955
শ্রী সদা | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৪:২৯68956
শ্রী সদা | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৪:৫৯68957
Z | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৫:২৮68969
cm | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৫:৩১68958
b | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৫:৪৬68970
Tim | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৫:৪৭68959
a x | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৬:০০68971
ন্যাড়া | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৬:০৮68972
sda | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৬:১৬68973
I | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৬:৩৫68974
Du | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৬:৪০68960
pi | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৭:০৬68975
pi | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৭:১৬68976
I | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৭:১৯68977
pi | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৭:৩৭68978