
যেদিন স্কুল থেকে অবসরে গেলেন-তারপর থেকে তিনি বলছেন আর আমি লিখছি চিঠি। মাজেদ - তোমাদের কাছে কখনো গুরু দক্ষিণা চাইনি। কিন্তু কিছু বই চাই। প্রাপক মাজেদ অথবা আলী নূর। কোন এক মোসাব্বির পাঠিয়ে দিচ্ছেন ডাকে কিছু টাকা। আমরা দুজনে মিলে বুক লিস্টি বানাতে লেগে যাই। আর চিঠি লিখি মুক্তধারায়, বাংলা একাডেমীতে-জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনীতে। কাউকে লিখি-ভিক্টর হুগোর অমনিবাস আমাদের দরকার। একদিন লিখতে দেওয়া হল একটি সাইনবোর্ড - সুভদ্রা স্মৃতি গ্রন্থাগার। ... ...

আমি গল্প লিখতে পারিনা, সবার সব কিছু অ্যাটেম্পট নেওয়াও উচিৎ না; ফলে এরপর অনেক প্রাইভেট টিউশন, ইউথ ফর ইকুয়ালিটি, রিসেশন, অনসাইট পেরিয়েও তিতিরকে খেলতে দিচ্ছি সুবাইয়ের সাথে। সুবাইয়ের বাবা শুকদেব আমার বাড়ির নীচের গ্যারাজে থাকতো একসময়, এখন প্লাম্ববিং-এর কাজ খুব ভালই করছে, ইন্দিরা যোজনায় বেশ সুন্দর একটা থাকার জায়গা বানিয়ে নিয়েছে, বিশ্বকর্মাপুজোর দিন ওদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করে। তাই, তিতির সুবাইয়ের সঙ্গে বর-বউ খেলছিলো দেখে ওদের কাউকে কিচ্ছু বলিনি। ... ...

প্রথমে দেখতে পাই নি। ছিল হয়তো,খেয়াল করি নি। টিফিনের সময় চোখে পড়ল। বছরের মধ্যিখানে নতুন ছেলেপুলে ভর্তি হওয়া পাড়াগাঁয়ের স্কুলে এমন কিছু বিরল ঘটনা নয়। তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেইও। প্রথম দিন গোবেচারার মতো পেছনের বেঞ্চিতে বসে থাকবে,কেউ লক্ষ্য করবে না। দিদিম২৪৬৭;২৪৯৫; নাম জিজ্ঞেস করবেন, জানতে চাইবেন আগে কোন স্কুলে পড়ত। শহরের স্কুল থেকে এসে থাকলে নরম হেসে বসতে বলবেন। ... ...

পাহাড়ঘেরা সবুজ উপত্যকার মাঝে একফালি হ্রদ। রিশা নামে এক বাচ্চা মেয়ে ঐ উপত্যকায় রোজ তার গরুছাগলের পাল নিয়ে চরাতে যায়, ফিরে আসে সন্ধ্যায়। খুব ছোটবেলাতেই রিশার বাবা-মা মারা যান। ওর আর কোন ভাইবোনও ছিলোনা। তাই সে একাই থাকে। সারাদিন মাঠের ধারের একটা গাছের নিচে রিশা বসে বসে আকাশপাতাল ভাবে। কখনও বা ঘুমিয়েও পড়ে। ঘুমোলেই ওর স্বপ্নে হানা দেয় এক অদ্ভুৎ সুরেলা গান। মানুষের গলায় গাওয়া গান না, যেন বাঁশী আর অজানা আরো কিসের সব মিঠে ধ্বনি মিলেমিশে ঐ অপার্থিব সুর রচনা করেছে। রিশা ঘুম ভেঙে মুষড়ে পড়ে। ঐরকম একটা বাজনা থাকলে সে সারাদিন বসে বসে বাজাতে পারতো। ... ...

আজ দশ বছর পর সেই ঘরে দাঁড়িয়ে তিন ভাই-বোন। বহুদিন পর সবাই মিলে এক জায়গায় হওয়া গেছে। দিদিভাইয়ের বাচ্চা দুটো সারা ঘর জুড়ে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। আলমারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ ছোট মেয়েটা একটা পুরনো শিশি বার করে এনে পিউকে দেখিয়ে বলল, "এটাতে কী আছে মিমি? তোমরা এরকম ধুলোবালি জমিয়ে রাখো কেন বোতলে করে?' উত্তরে অবাক হয়ে দেখল তিন জনের মুখে হাসি, চোখে জল। ... ...

হলটায় রোজ রোজ একটাই সিনেমা চলে। মিনিটরা আরো মিনিটদের ডাকে, ঘন্টারা আরো ঘন্টাদের, দিন,সপ্তা,মাস,বরষ ডাকে। আরো সব দিন, সপ্তা,মাস, বরষকে। সবার চোখের মণি জুড়ে এই একটা সিনেমাই চলে। মানুষ গুলো তাতে হাঁটে, বসে, ঘোরে, ফেরে। মানুষগুলোর চারপাশে হাওয়ায় ধুলোর কণার মত কথা ওড়ে। ছোটছোট গোলগোল কথা, বড়মত কোণাচে কথা, ভাঙাভাঙা গুঁড়োগুঁড়ো কথা।ওড়ে। সিনেমাটায় ঠিক এত ঘন্টা এত মিনিট পরে একটা মেরুন রঙের ট্রাম চলে যায়, সেই সময়েই রাস্তা পেরোয় একটা হলুদ ছাতা, আকাশ জুড়ে বিষ্টি থরথর ক'রে কাঁপতে থাকে। ... ...

স্বপন সিগারেট ফেলে দেয়। ও তারপর রনকে চুপুচুপি বলে, "তোকে বলা হয় নি আসলে। আমার সেইসব বইগুলো, উদয়নের 'আমি এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে', কিংবা তুষারের 'শেষ নৌকা', সেগুলোও খুঁজে পাচ্ছে না কয়েকদিন হল। আর, আর আমাদের পত্রিকার পরের সংখ্যার প্রুফ, সেটাও . . .' দূরে গাড়ির আসা-যাওয়ার শব্দ এইখানে বেশ পরিষ্কার শোনা যায়। বৃষ্টি ধরে এসেছিল। আলো যৎসামান্য, ও হলুদ। এখন স্বপন উঠে দাঁড়ায়। দুহাতে কোটটা ফাঁক করে ধরে। বলে, "আমি কিন্তু ছাড়ব না, রন। আই উইল ডেফিনিটলি প্রোটেস্ট। প্রোটেস্ট রন, প্রোটেস্ট। ইয়েস ইয়েস, প্রোটেস্ট। আমি, আমি এ নিয়ে আন্দোলন করব। প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখব। সংসদে বিল আনব।" ... ...

এই অসুখের পোশাকি নাম মানডে ব্লুজ। কাজে যাবার অনীহা। বিশেষ করে রবিবার সন্ধ্যায় এই মহামারীর প্রকোপ বাড়ে। আর লোকে ভিড় জমায় এই ক্যাফেতে। বিয়ার আর বাংলা খেয়ে নিজেদের চাঙ্গা করার জন্য। টেবিলে-টেবিলে ধোঁয়া ওঠে। গজল্লায় গমগম করে চারদিক। ফুর্তির ফোয়ারা ছোটে। মেয়েরা প্রেমিকের কোলে উঠে বসে। ছেলেরা হেঁড়ে গলায় গান গায়। ... ...

না যান, না যান, না যান মাহুত রে, / মাহুত বাড়িতে বহেন রে হাল। / ভালে না হয় হাতীর চাকিরি, সাথে সাথে কাল।। ... ...

মরা সাহেবের টেবিল দিয়েই সেদিন শুরু হয়েছিলো - আসলে কি, অফিসে পরপর দুজন বড়সাহেব একই ঘরে মরে যাওয়ার পর প্রাণে ধরে এমনিতেই ওখানে আর কেউ ঢুকতে চাইছিলো না। প্রথম জন টিকলো একটি গোটা মাস, মরলো শনিবার, অফিস ছুটি হলো মঙ্গলবার। দ্বিতীয়জন বড়দিনের ঠিক আগে জিমখানায় দৌড়তে গিয়ে হাঁসফাঁস করে মাটিতে ঘামতে ঘামতে মরে গেলো, সে ছিলো হপ্তাখানেক। দুর্ঘটনার এখানেই শেষ নয়, এক ভরদুপুরে উড়ো খবর এলো যে ওপরের তলায় ডানদিকের ঘরের সাহেব নাকি ছুটিতে ছিলো,বউবাচ্চা সমেত গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করে সেও নাকি মারা গেছে। খবরটা সত্যি। ... ...

আব্বার সাথে রাশেদের আজ আশ্চর্য শত্রুতা। আজ সারাদিন, দিনমান। ছোট্ট চায়ের টেবলের দু'পাশে ওরা দু'জন ঠিক দুই যুযুধানের মতন দাবার গুটি নিয়ে বসে আছে সকাল থেকে। কখনও গালে হাত, কখনও বাঁকানো ভ্রূ, কখনও চুপচাপ। আব্বার অফিস ছুটি আজ, রাশেদের ইশকুলও তাই। ওদের সারা ঘরে ছুটির আমেজ এলিয়ে আছে, বসার ঘর থেকে রান্নাঘর, সেখান থেকে বারান্দায়, সবখানে। আপাতত শুধু ছুটি নেই দুজনের মাথার ভেতর, তুমুল তান্ডব তাতে, যুদ্ধ পরিকল্পনায় ব্যস্ত, আর বাইরে তবু বেশ নিরাবেগ, অথবা ভঙ্গিটা সেরকমই, খাঁজ কাটা সুন্দর কাঠের সাদা কালো সৈন্যদের ওরা লেলিয়ে দেয় একে অপরের দিকে। ... ...

অতসী দাঁড়িয়ে আছে এক্সাইড হাউসের মোড়ে। যেখানে হলদিরামের দোকান, তার সামনে। নীলরঙা শিফন শাড়ীতে। অফিস কেটেছে অতসী। অতসী দেখতে মোটামুটি। শ্যামলা, সামান্য স্থূলকায়া। এখন সকাল এগারোটা। বাসে অফিসযাত্রীর ভীড় এখনো পুরো মাত্রায়। সরকারী চাকুরেদের বাজার,ছেলে-মেয়েদের স্কুল, পাড়ার গলির মুখে প্রাত:কালীন গুলতানি, রুটি-ভাত-চচ্চড়ির আহার সেরে এটাই অফিস যাওয়ার আসল সময়। ... ...

আজ অনেকদিন পরে এমনটা হল। এই মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়া। অন্ধকারে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে চোখ বন্ধ করে। ঘুমের আমেজ যেন চোখের পাতা ছেড়ে পালিয়ে না যেতে পারে! চোখ খোলা যাবেনা কোনোমতেই, তাহলেই ঘুমের দফারফা। রাত এখন কটা কে জানে? ইস, কমপক্ষে ছ ঘন্টা না ঘুমোলে কাল সারাদিন টানতে পারা যাবে না। অফিসে সীটে বসলেই ঘন ঘন হাই উঠবে, কাজে বিরক্তি আসবে। ... ...

তিনমাস জাহাঁ আরা'র সাথে কাটিয়ে কলকাতা ফিরে এল আব্দুল সাত্তার ঠাকুর। জাহাঁ আরার আকুল কান্না তার কানে যেন সর্বক্ষণ বাজে। কোন কাজে মন বসে না সাত্তারের। চোখের সামনে নানা আকারে ঘুরে বেড়ায় জাহাঁ আরা। কখনো সে এইটুকুনি ছোট্ট এক মেয়ে হয়ে যায়, যে কিছুতেই নতুন শাড়িটিকে সামলাতে পারে না। এদিক গোঁজে তো ওদিক খুলে যায়, আঁচল সামলায় তো পিঠ বেরিয়ে যায়। ... ...

ডাইনিং টেবিলে একটা মাছি লেপ্টে আছে। আধঘন্টা আগে ওখানে আমার চায়ের কাপটা ছিলো। মাছিটাও ছিলো বোধহয় একই জায়গায়। এখন কাপ নেই, মাছির মৃতদেহ পড়ে আছে। আমি তখনও এই চেয়ারটাতেই ছিলাম, এখনও আছি। সেই থেকে ঠায় তাকিয়ে আছি মরা মাছিটার দিকে। কাজ না থাকলে যা হয় আর কি! হাতে সত্যিকারের কাজ না থাকলে একসঙ্গে অনেক কিছু করা যায়। ... ...

এই খেলাটা একা খেলতে হয়। একা একা। নিজে নিজে। শুধুই নিজের সঙ্গে।খুব কিছু লম্বা নয় খেলার সময়টুকু। আধঘন্টামত।কিছু কমই হয়তো। খেলাটা একদিন নিজেই শুরু করেছিল ও। নিয়মকানুন ঠিক করেছিল। কিম্বা হয়তো খেলতে খেলতেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। শুধু এখনও জানে না খেলা আরম্ভের সময়টা। ঠিক কখন্ শুরু হয়। একটা হুইশলের আওয়াজ হয় কোথাও। কোথাও একটা। আর ও খেলতে শুরু করে দেয়। ... ...

এদেশে আসার পর চার্চের ভেতরে ঢোকা আমার এই দ্বিতীয়বার। প্রথমবার এসেছিলাম গ্র্যাডস্কুলের বন্ধু ডায়ানার বিয়ের অনুষ্ঠানে। এই শহরের একটি ক্যাথলিক চার্চের শান্ত ও সাদার সমারোহে বিয়ে হয়েছিল ওর। কনের সাদা ওয়েডিং ড্রেস, মাথায় সাদা ফুল, টেবিলে টেবিলে সাদা ফুলের বোকে, ব্রাইডমেডের মাথায় সাদা টিয়ারা - সাদার ঔজ্জ্বল্যে কেমন চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল সেদিন। ... ...

ইয়োর অনার, আমি সত্যি কথাই বলব। আমি তো আর কম দেখলাম না, স্যার, জগতটা যদি ঠিকঠাক দেখেন আপনার ঘেন্না করবে স্যার! এভাবে বেঁচে থাকাও অন্যায়। বাপ ফাপ জানি না কিন্তু যা কিছু করছি তাতে তো কিছু সুবিধার বুঝছি না। আজ আমাদের মানুষ মরছে কাল ওদের। আচ্ছা স্যার আমাদের তোমাদের কী? মানুষের ভাগ বাটোয়ারা সেসব তো হত স্যার মিশরে, হলিউডের ফিল্মে। লোহার শিকলের ঝনঝন শব্দ, মানুষ মরুভূমির বুকে পাথর টেনে আনছে, পিরামিড তৈরি হচ্ছে। ... ...

প্রণম্য পাঠক, এই মুহূর্তে আপনি বাহিরে আসিলেন, মোবাইল বোতামে মৃদু চাপ দিলেন, ভূগর্ভ হইতে কামোদ্দীপক আশ্চর্য স্লিক শকট অনুগত ভৃত্যের মত আপনার সম্মুখে গরুড়সদৃশ করজোড় ভঙ্গিতে একরূপ উদয় হইল বলিয়া-- এই সমস্তই আমি জ্ঞাত আছি। আপনার জিহ্বা নাচিতেছে প্রশ্ন করিবার নিমিত্ত, অজস্র প্রশ্নে সজ্জিত আপনার যোদ্ধ্বৃবেশ-- ইহাও আমি বিলক্ষণ অবগত। তবে, এখনকারটি হইল, "কে বে তুই?' অর্থাৎ, আমি কে? বলিবার কথা, এই প্রশ্নটি এক অনন্তকে টানিয়া আনে এবং মনুষ্য প্রজাতিকে নানাভাবে বিড়ম্বিত করে। ... ...

গ্রামের নাম ছোট দেওয়ান পাড়া বললে কেউ চিনবে না, "ঠাউর বাড়িত যামু' বললে সাত মাইল দূরের ঐ মহকুমা শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যে কেউ তোমাকে নরাইল থানার ছোট দেওয়ান পাড়া গ্রামের ঐ ঠাকুর বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা বাৎলে দেবে, হাতে সময় থাকলে পৌঁছেও দেবে। এমনই তাঁদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি। সেই গ্রামের নাম ছোট দেওয়ান পাড়া আর সেই ঠাকুর বাড়ির ঠাকুর আব্দুল গাফ্ফারের কথা বলতে গেলে অনেক কথাই চলে আসে সে সব কিস্সা কিন্তু গল্পকথা নয়। ... ...