• বুলবুলভাজা  গপ্পো

  • তৃতীয় শিবির

    শৌভ চট্টোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১০ | ২২১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • দুপুর ।। স্বমেহন, অথবা যুদ্ধের আগে

    ২০০৭-এর ২৪শে আগস্ট, প্রথম ও শেষবার, রন বুঝতে পারে জাল বাস্তবিক কতদূর ছড়িয়ে পড়েছে।

    এর আগে, সে যে কিছুই আন্দাজ করেনি এমন নয়। তবুও সে চুপ করে ছিল, ভেবেছিল সবটাই দেখার ভুল, অথবা মনের। কিন্তু সেইদিন, তার ভুল ভাঙে। এতদিন-বসবাসের নিরাপদ দুর্গটি চোখের সামনে ভেঙে যেতে দেখে সে স্তম্ভিত হয়। ঘুরন্ত পাখার সামনে জরুরি সিগারেট ধরানোর মতো অসহায়তা ছিল তার, সেইদিন।

    অথচ, সকালে বৃষ্টি হয়েছিল। নরম ও বিপজ্জনক এক আবহাওয়া ছিল দুপুর অবধি।

    আসলে হয়েছিল কি, সেদিন রন আপিশে যায়নি। জ্বরভাব ছিল সকাল থেকেই। দুপুরে খেয়ে উঠে, সময় কাটানোর জন্যে, সে উদয়ন ঘোষের "কনকলতা" বইটা খুঁজেছিল খুব, অত্যন্ত নিষ্ঠায় আন্ডারলাইন করা বইখানা তার। না পেয়ে, সারা ঘর হাঁটকে এলোমেলো করেছিল, যেমন তার অভ্যাস। অগোছালো বুকর‌্যাক আরো ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছিল, আচমকা হানায়। অবশেষে, একটি অপ্রত্যাশিত কানাচে বইটা পেয়েও গিয়েছিল হঠাৎ। আর, সেই পাওয়ার আনন্দে, বিজয়ীর মতো বইশুদ্ধ হাত মাথার ওপরে তুলতেই, তার কপালে, চুলে, মুখে, চোখের পাতায় ঝরে পড়েছিল পাউডারের মতো গুঁড়ো গুঁড়ো পাতা, পাতার টুকরো। মলাট উল্টে দেখেছিল, ভেতরে শুধু পেটমোটা উইপোকাদের পরিপাটি ঘরবসত, মাটির দাগ। অক্ষরের চিহ্নমাত্র নেই। গোপন সন্দেহের বশে, পাগলের মতো, সে বুকর‌্যাকের সমস্ত বই, এমনকী ঘরের এদিকে ওদিকে অথবা টেবিলে স্তূপাকার, মেঝেতে ছড়িয়ে ফেলে ক্ষয়ক্ষতির হিসেবনিকেশ করার একটা মরিয়া চেষ্টা করেছিল ততক্ষণাৎ। তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এইরকম --

    ক . যেগুলোর চিহ্নমাত্র পাওয়া যায়নি

    - বন্দুকের নল থেকে একদা (উদয়ন ঘোষ)
    - মুকুলেশের মা যা হইবেন (উদয়ন ঘোষ)
    - স্বপনের ম্যাজিক রিয়ালিটি (উদয়ন ঘোষ)
    - আসলে এটা রামায়ণ চামারের গল্প হয়ে উঠতে পারত (সুবিমল মিশ্র)
    - সুবিমলের বিরুদ্ধে সুবিমল (সুবিমল মিশ্র)
    - ওয়ান সট (অবনী ধর)
    - রন্ধনশালা (বাসুদেব দাশগুপ্ত)
    - নষ্ট আত্মার টেলিভিশন (ফাল্গুনি রায়)

    খ . সামান্যই অবশিষ্ট, পাঠযোগ্য নয়

    - অবনী বনাম শান্তনু (উদয়ন ঘোষ)
    - আসানসোলের লক্ষ্মী (উদয়ন ঘোষ)
    - কনকলতা (উদয়ন ঘোষ)
    - হাশিসতরণী (বারীন ঘোষাল)
    - কলকাতা (কমল চক্রবর্তী)
    - ধ্বংসস্তূপ (অরূপরতন বসু)
    - মুখার্জিকুসুম (শংকর লাহিড়ি)
    - রাখা হয়েছে কমলালেবু (স্বদেশ সেন)

    গ . ক্ষতবিক্ষত, তবু আংশিক পাঠযোগ্য

    - বন্দুক বিজয় (কমল চক্রবর্তী)
    - বালি ও তরমুজ (প্রসূন বন্দ্যো:)
    - খেলাধুলা (বাসুদেব দাশগুপ্ত)
    - ৫০টি গল্প (সন্দীপন চ®)
    - প্রত্নজীব (জয় গোস্বামী)
    - আলেয়া হ্রদ (জয় গোস্বামী)
    - পুরী সিরিজ/আবার পুরী সিরিজ (উৎপলকুমার বসু)
    - প্রতিদ্বন্দ্বী (সুনীল গ®)

    ঘ . সম্পূর্ণ অক্ষত

    - মোহন অমনিবাস (শশধর দত্ত)
    - স্বপনকুমারের যাবতীয় বই
    - প্রথম আলো (সুনীল গ®)
    - সেই সময় (সুনীল গ®)
    - কাছের মানুষ (সুচিত্রা ভট্টাচার্য)
    - দূরবীন (শীর্ষেন্দু মুখো:)
    - পাগলি তোমার সঙ্গে (জয় গোস্বামী)
    - হিরোশিমা, মাই লাভ (সন্দীপন চ®)

    এহেন অতর্কিত অন্তর্ঘাতে রন পাজলড হয়ে পড়ে প্রথমটায়, কিছুটা অবাক। তারপরেই এল ভয়, শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল ঠাণ্ডা স্রোতের মতো। আর সেই সঙ্গে নসিয়া, শরীরের মধ্যে অÏÙÛর ভাব। সে, কাঁপা-কাঁপা হাতে, স্বপনকে টেলিফোন করেছিল।

    'স্বপন, ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চায়। আমাকে বাঁচা তুই।'

    বিকেল ।। সরল যন্ত্রের ছবি

    বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ স্বপনের সঙ্গে রনের দেখা হয়েছিল পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে, এশিয়াটিক সোসাইটির উল্টোদিকের ফুটপাথে। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে স্বপনের আপিশ। ও সে সোজা চলে এসেছিল আপিশফেরত। স্বপনের গায়ে একটি ভারি ও লম্বা ঝুলের পুরোন কোট ছিল। রোঁয়া ওঠা, যা আগস্ট মাসে কলকাতার ভ্যাপশা গরমে নিতান্তই বিসদৃশ। অবশ্য, রন এসব কিছুই খেয়াল করেনি।

    দুজনে বিভিন্ন রেস্তোঁরা ও পানশালার পাশ দিয়ে সোজা এগিয়ে যেতে থাকে। এখন সবে বিকেল, তাই লোকজন বিশেষ নেই।

    খণ্ড স্বচ্ছলতা। তার গায়ে স্ফীতি লেগে আছে।
    রাস্তায় হাওয়া কিছু বেশি।

    হাঁটতে হাঁটতে তারা প্রাচীন কবরখানাটির সামনে এসে পৌঁছয়। ও সোজা ভিতরে ঢুকে পড়ে। এইখানে উইলিয়াম জোনস-নামক প্রাচ্যবিদ মহাত্মার কবরটি বিশেষ বড় এবং ছায়াময়। ওরা তার পাশেই একটি অপেক্ষাক«ত ছোট কবরের ছাতার তলায় গিয়ে বসে। এইসময়, আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়।

    একটা সিগারেট ধরিয়ে রন গোটা ব্যাপারটা স্বপনকে বিস্তারিতভাবে জানায়। স্বপন কিছু বলে না। কেবল সিগারেট টানতে থাকে।

    রন বলে যায়, "ভাবতে পারছিস তুই, স্বপন? উদয়নের সমস্ত বই, সুবিমল . . . এমনকী স্বদেশ সেন, কমল চক্রবর্তী অবধি . . . কেটে ছারখার করেছে . . . কিচ্ছু বাকি রাখেনি প্রায়। ওই পেটমোটা উইপোকার দল . . .।'

    স্বপন সিগারেট ফেলে দেয়। ও তারপর রনকে চুপিচুপি বলে, "তোকে বলা হয়নি আসলে। আমার সেইসব বইগুলো, উদয়নের "আমি এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে", কিংবা তুষারের "শেষ নৌকা", সেগুলোও খুঁজে পাচ্ছি না কয়েকদিন হল। আর, আর আমাদের পত্রিকার পরের সংখ্যার প্রুফ, সেটাও . . ."

    দূরে গাড়ির আসা-যাওয়ার শব্দ এইখানে বেশ পরিষ্কার শোনা যায়। বৃষ্টি ধরে এসেছিল। আলো যৎসামান্য, ও হলুদ।

    এখন স্বপন উঠে দাঁড়ায়। দুহাতে কোটটা ফাঁক করে ধরে। বলে, "আমি কিন্তু ছাড়ব না, রন। আই উইল ডেফিনিটলি প্রোটেস্ট। প্রোটেস্ট রন, প্রোটেস্ট। ইয়েস ইয়েস, প্রোটেস্ট। আমি, আমি এ নিয়ে আন্দোলন করব। প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখব। সংসদে বিল আনব।"

    রন কোটের ফাঁক দিয়ে ঠিক কী দেখেছিল, তা জানা যায়নি। কিন্তু, সে যারপরনাই মুগ্ধ ও বিবশ হয়ে পড়ে।

    আর তখনই, পায়ের নিচে ধকধক করে ওঠে মাটি। মাটির নিচে চাপা পড়া কয়েকশো বছরের প্রাচীন পাঁজরের হাড়, ও হৎপিণ্ড…লি। সেই যেসব সাহেবসুবোরা মরে-হেজে ভ¨ত হয়ে গিয়েছিল কবেই, ডিহি কলকাতায়, ম্যালেরিয়া-কালাজ্বর-আমাশায় ভুগে, ডুয়েল লড়ে, ঘোড়ায় চেপে, ট্রেনে কাটা পড়ে, তরজায়, চাপান-উতোরে, তাদের উঠে আসার সময় হল ফের।

    দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে এরপর।
    ছায়া অবলুপ্ত হয়।

    সন্ধ্যে ।। দুর্গের ছায়া, ধার্য দৃশ্যগুলি

    স্বপন, মোড়ের কাছে এসে, মেট্রো ধরবে বলে বাঁ-দিকে বেঁকে গিয়েছিল। আর রন, ডানদিকে ঘুরে ধর্মতলার দিকে হাঁটতে থাকে। মিউজিয়ামের সামনে, পিকাসোর বিষন্ন ক্লাউনটি রেলিং-এ হেলান দিয়ে বসেছিল। লম্বা নীলচে আঙুলে শুকনো রুটির টুকরো এবং এনামেল।

    অনুভ¨ত পণ্যের ভার। সন্ধ্যা মাংসল হয়ে আছে।

    কী এক প্রচন্ড নেশা রনকে চেপে ধরে। এক্ষুণি বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না। বরং সে এখন একটু মদ্যপান করবে বলে ÏÙÛর করে। ও লিন্ডসে স্ট্রিটের কাছে একটি বার কাম রেস্তোরাঁয় তাকে ঢুকতে দ্যাখা যায়।

    রেস্তোরাঁটি ছিল ভদ্র ও পরিচ্ছন্ন। প্রায়শ আসা-যাওয়ার সু¤বাদে ওয়েটার তথা দারোয়ানরাও রনকে চিনে ফেলেছিল। তার পছন্দের টেবিলটি সর্বদাই যাতে সে ফাঁকা পায়, সে ব্যাপারে তাদের নজর ছিল। রনও ভদ্রÙÛ বখশিশ দিয়ে তাদের খুশি করত।

    আজ, ঢোকামাত্রই, কোণার টেবিল থেকে কেউ তার নাম ধরে ডেকে ওঠে--"রন! রন!" রন দেখতে পায়, নন্দিনী তার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে। রন টেবিলের ফাঁক দিয়ে সেইদিকে এগিয়ে যায়।
    কলেজে পড়ার সময় থেকেই রন কবিতা লিখত।
    নন্দিনী তাকে একদিন শোরি মিঞার টপ্পা গেয়ে শোনায়।
    এরপর, তাদের মধ্যে প্রেম হয়ে যায়।
    নন্দিনীর বাড়িতে সে কয়েকবার গিয়েছিল। সেখানে যামিনী রায়ের আঁকা মূল ছবি দেখেছিল সে। কলেজ ছাড়ার পর অবশ্য তাদের মধ্যে যোগাযোগ বিশেষ ছিল না।

    নন্দিনীর টেবিলে এক লালমুখো সাহেবকে বসে থাকতে দ্যাখে রন। রনকে দেখে সাহেবটি নিজেই উঠে দাঁড়ায়। ও টুপি খুলে বলে--"মাই নেম ইজ বন্ড, জেমস বন্ড।"
    সাহেব এক আমেরিকান জাহাজের ক্যাপ্টেন। জাহাজটি এক সপ্তাহের জন্যে খিদিরপুরে এসে ভিড়েছে। নন্দিনী তাকে এইসব প্রয়োজনীয় তথ্য জানায়।
    নন্দিনীর অনামিকায় একটি উজ্জÆল পাথর জড়ানো ছিল। অ্যাকোয়ারিয়ামের ÏÙÛর জল ও রকমারি আলোর প্রতিফলনে তা থেকে বিচ্ছুরণ প্রভৃতি ঘটে।

    এরপর, তারা তিনজনে মিলে প্রচুর মদ্যপান করে। সাহেবের অনুরোধে নন্দিনী একটি বিদেশি গান গেয়ে শোনায়। গানটি ছিল স্কটল্যান্ডের এবং আনুনাসিক সুর ছিল তাতে। সাহেব এতে প্রচুর আমোদ পায়। ও টেবিল ঠুকে তাল দিতে থাকে।
    গান শেষ হলে সাহেব তার লগবুক পড়ে শোনায়।

    "This day at Shankhrail, I ordered Captain Brooke to come up with his vessel to Chuttannuttee, where we arrived at noon, but found the place in a deplorable condition nothing being left for our present accomodation, the rain falling day and night. . ."

    নন্দিনী সাহেবের কোলে গিয়ে বসে। ও গলা জড়িয়ে ধরে। সে একটি হলুদরঙের শিফনের শাড়ি ও হাতকাটা ব্লাউজ পরে ছিল। সাহেব নন্দিনীর কাঁধ থেকে শাড়ির আঁচল সরিয়ে দ্যায়। মদ্যের ক্রিয়ায় তার গরম লাগতে শুরু করে এবং ঘাম হয়। তখন সাহেব শার্টের ওপরের বোতাম…লি সব খুলে ফ্যালে।

    চলে আসার আগে রন বলেছিল, "সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে নন্দিন। উইয়ে কেটে ফেলছে সবকিছুই।"
    নন্দিনী হাত নাড়তে নাড়তে বলেছিল, "রন! রন!"

    রাত ।। অন্যান্য জরুরি শব্দ

    স্ট্যান্ডে কোনো বাস ছিল না। রন কার্জন পার্কের বেঞ্চিতে বসে জিরোয় খানিক। এখানে আলো নেই। সিগারেট ধরাবে বলে দেশলাই জÆ¡লতেই সে লক্ষ্য করে তার সামনে একটি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ও উগ্র সেন্টের গন্ধ নাকে আসে। মেয়েটির সঙ্গে চোখাচোখি হতে মেয়েটি বলে, "লাগবে না কি?"

    এই সময়, একটি বাসের হেডলাইট মেয়েটির শরীরে এসে পড়লে রন অত্যন্ত অবাক হয়ে লক্ষ্য করে মেয়েটির স্তন নেই, ভুরু নেই, ঠোঁট নেই, হাতের আঙুল নেই। শুধু লালচে ঘা দগদগে হয়ে আছে। রনের চোখে বিস্ময় লক্ষ্য করে মেয়েটি বলে, "ও কিছু নয়। উইয়ে খেয়ে নিয়েছে সবকিছুই।"

    এতক্ষণে রন খেয়াল করে তাকে ঘিরে আছে একটি নিশ্ছিদ্র মেয়েলি ভিড়। তাদের স্তন নেই, চোখ নেই, হাত নেই, পা নেই, যোনি নেই, পেট নেই। সেন্টের আর ঘামের গন্ধে হাওয়া ভারি হয়ে ওঠে। মেয়েটি পুনরায় জিজ্ঞেস করে, "লাগবে না কি?"

    রনের ঘেন্না বা ভয় কোনোটাই করছিল না। বরং ভিতরে ভিতরে সে এক চোরা উত্তেজনা বোধ করতে থাকে। এই ব্যাপার লক্ষ্য করে সে নিজেও খুব অবাক হয়ে যায়।


    রন মেয়েটিকে দুশো টাকা দিতে রাজি হয়। ও দুজনে একটি ট্যাক্সি করে আউট্রাম ঘাটে যায় হাওয়া খেতে। যেতে যেতে রন মেয়েটির নাম জিজ্ঞাসা করলে মেয়েটি বলে, "নন্দিনী।" রন খেয়াল করে, মেয়েটির মুখের মধ্যে বাস্তবিক নন্দিনীর আদল রয়েছে।

    স্মৃতি অবলুপ্ত। পেশী সঙ্কুচিত হয়। লাফানোর ঠিক আগের মুহূর্ত।

    নদীর ধারে সিঁড়িতে বসে নন্দিনী "দিল চিজ ক্যায়া হ্যায় আপ মেরি জান লিজিয়ে" ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ গান গেয়ে শোনায়। রন অভিভ¨ত হয়ে যায়।
    এরপর স্মৃতি থেকে সে নন্দিনীকে বাসুদেব দাশগুপ্তের লেখা "বমনরহস্য" গল্পটি (রন্ধনশালা, ১৯৭৫) শোনায়। গল্পটি এইভাবে শুরু হয়েছিল --

    "আকাশে বিমান উড়ল গর্জন করে। চারিদিকে আওয়াজে কাঁপিয়ে ল্যাজের কাছ থেকে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বিমান উঁচুতে উঠল আরো। অল্পক্ষণের মধ্যেই সু¤কুমারের বাড়িটাকে একটা ছোটবেলার খেলনার মতো মনে হয়। জানলা দিয়ে আমরা কয়জনা তাকিয়ে রইলুম নিচে।"
    ও গল্পের শেষ অংশটি ছিল এইরূপ--
    "শরীরের সমস্ত নালী-প্রণালী যেন পাক দিয়ে ওঠে। চোখের সামনে সমস্ত দোকানঘর বোঁ বোঁ করে ঘুরতে থাকে। সব আলো অন্ধকার হয়ে নেমে আসে চকিতে। শেষবারের মতো সামলাবার চেষ্টা করি নিজেকে। কিন্তু পারি না। বিয়ে-বাড়িতে যা খেয়েছিলাম সব গলগল করে বেরিয়ে আসতে থাকে। ওয়াক, ওয়াক শব্দ তুলে আমি বমি করে যাই। বমি করে যাই রক্তাক্ত পথের উপরে। সমস্ত চর্বিত মাংসের টুকরো, সমস্ত জীবনভোর ধরে খেয়ে যাওয়া যাবতীয় মাংসের টুকরো আমি বমি করে উগরে বার করতে থাকি। বমির তোড়ে আমার নি:শ্বাস যেন আটকে আসে। আমি বমি করি।"

    রন লক্ষ্য করে, নন্দিনীর স্মৃতিশক্তি ভালো। ও পরেরদিন সে তাকে বাসুদেবের অন্যান্য গল্প, এমন কি অবনী ধর ও সুবিমল মিশ্রের কিছু গল্প শোনাবে, এইরূপ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

    পরের দিন ।। দেয়ালে নখের আঁচড়, গ্র্রাফিত্তি

    পরের দিন, অর্থাৎ ২৫শে আগস্ট, কলকাতার বিভিন্ন ছোটবড়ো লাইব্রেরিতে আচমকাই আগুন লেগে যায়। এ ধরণের অন্তর্ঘাতমূলক কাজকর্ম কে বা কারা করেছিল, আর তাদের উদ্দেশ্যই বা কী ছিল, এ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটে না। কাগজে এ ব্যাপারে বিস্তর লেখালিখি হয়। ও বর্তমান সাহিত্যের অবক্ষয়ী চেতনা এবং ক্রমহ্রাসমান পাঠকসংখ্যাকে এই নাশকতার জন্যে পরোক্ষে দায়ী করা হয়।

    বিকেলে নন্দিনীর সঙ্গে দেখা করতে রন কার্জন পার্কে গিয়েছিল। কিন্তু নন্দিনী তাকে চিনতে পারেনি। গতরাতের কোনো স্ম«তিই ছিল না তার। তবুও তারা আউটÊ¡ম ঘাটে যায়। ও সেখানে রন একটি নৌকো ভাড়া করে। মাঝনদীতে গিয়ে আচমকাই বড়ো ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকোটি দুলে উঠলে গলুইয়ের কিনারায় বসে থাকা নন্দিনী জলে পড়ে যায়। রন পাশেই বসেছিল। তখন জোয়ার সমাগতপ্রায়। তাই মাঝি ঝুঁকি নেয়নি। নৌকোটি নিরাপদে ঘাটে ফিরিয়ে আনে।

    সেদিন সারা সন্ধ্যে ও এমন কি অনেক রাত পর্যন্ত রন অপেক্ষা করেছিল। ভেবেছিল পুলিশ আসবে।
    কিন্তু পুলিশ আসেনি।
    অবশেষে, ভোরের দিকে, সে ঘুমিয়ে পড়ে।
    তখনো আকাশ ধোঁয়াটে। ও খবরে বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল।

  • বিভাগ : গপ্পো | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১০ | ২২১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন