• বুলবুলভাজা  গপ্পো

  • বিজ্ঞাপন-বিরতির পর

    শৌভ চট্টোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ১১ জুলাই ২০১১ | ১৮৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কাল রাতে আমি প্রথমবার উল্কাপাত হতে দেখি। আকাশ ছিলো পরিষ্কার। ও প্রচুর গ্রহ-নক্ষত্রের সমাবেশ ছিলো। আমি তাদের আলাদা করে বোঝার চেষ্টা করি। এইভাবে কোথা দিয়ে য্যানো রাত ফুরিয়ে আসতে থাকে।

    দ্রুত সকাল হয়। রোদ ভীষণ হয়ে ওঠে। অফিস যাওয়ার কথা ভাবতে পারি না।

    -----------

    বিকেলে বেড়াতে বেরোই। আমার বাড়ির কাছেই একটি মল আছে। আমি সেখানে যাই। ও বিভিন্ন দোকানে ঘুরে ঘুরে সুন্দর করে সাজানো জিনিশগুলি নেড়েচেড়ে দেখি। কখনো কখনো সেলসম্যান ও সেলসগার্লরা আমাকে সেইসব জিনিশের বিষয়ে বিস্তারিত জানায়। ও আমি এতে খুবই আনন্দ পাই।

    এভাবেই একটি দোকানে আমার সঙ্গে অ্যালিসের দ্যাখা হয়ে যায়। আমি ওকে চিনতাম না। ওর মুখের সঙ্গে আমার প্রিয় এক অভিনেত্রীর (মুম্বাই) মুখের বিশেষ সাদৃশ্য লক্ষ্য করে আমি ওর প্রতি আকৃষ্ট হই। হুক থেকে ঝোলানো বিভিন্ন আকার ও প্রকারের ব্রেসিয়ারের সামনে ও দাঁড়িয়ে ছিলো। কিছুটা চিন্তিত বলেও মনে হয়। আমি গিয়ে ব্রেসিয়ারগুলি নিরীক্ষণ করি। একটি সেলসগার্ল আমার দিকে এগিয়ে আসে।

    এরপর আধঘন্টা ধরে আমি অ্যালিসকে অনুসরণ করি। মলের ভিতরে। ও তার কর্মপন্থা বিষয়ে আমার আর কিছুই জানতে বাকি থাকে না। আমি লক্ষ্য করি। যেভাবে ও সবার নজর এড়িয়ে শেলফ থেকে জিনিশ তুলে নিজের ব্যাগে চালান করে দ্যায়। ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সতর্কতা ওর আঙুলে মিশে থাকে। আমি ওর কাজে খুবই তৃপ্তি পাই।

    অ্যালিসও বুঝতে পেরেছিলো। আমি ওকে অনুসরণ করছি। সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ আমরা মল থেকে বেরিয়ে আসি। সেই প্রথমবার। অ্যালিস আমার দিকে সোজাসুজি তাকায়। ও হেসে বলে, "মাই নেম ইস জন, অ্যালিস জন।'

    ----------

    এরপর প্রায় প্রত্যেকদিনই আমাদের দ্যাখা হতে থাকে। অফিসের পর। অ্যালিস আমাকেও ওর কৌশলগুলি শিখিয়ে দ্যায়। প্রথম প্রথম ভয় ছিলো। কিন্তু ক্রমশ আমি এই কাজে দক্ষ হয়ে উঠি। একদিন দোকান থেকে আস্ত একটি শেভিং সেট তুলে আনি। যা ছিলো বিদেশী ও যথার্থই মূল্যবান। আমি অ্যালিসকে বলি, "এই রেজার আমার গালের আকার অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেয়। ও এর ডবল ব্লেড ফর্মুলা দ্যায় এক অভূতপূর্ব মোলায়েম অনুভূতি।'

    অ্যালিস সপ্রশংস চোখে আমার দিকে তাকায়। আমি মুগ্ধ হয়ে যাই।

    ----------

    অ্যালিস আমার সঙ্গে আমার ফ্ল্যাটে আসে। রাত্তিরে। আমরা একসঙ্গে শুই। ও তারপর থেকে অ্যালিস আমার ফ্ল্যাটেই থাকতে শুরু করে।

    ----------

    আমাদের ঘরে জিনিশপত্র স্তূপাকার হয়ে ওঠে। আমি শ্যানেলের পারফিউম, আরমানির শার্ট ও রোলেক্সের ঘড়ি ব্যবহার করতে থাকি নিয়মিত। আমার চামড়া ক্রমশ আরো চকচকে হয়ে ওঠে। চুল হয় ঘন। আর রেশমের মতো কোমল। একদিন অফিস যাওয়ার পথে আমার সঙ্গে একটি গাড়ির ধাক্কা লাগে। ড্রাইভারের মাথা ফাটে। ও পাঁজরের চারটি হাড় টুকরো হয়ে ভেঙে যায়। অথচ, আমি অক্ষত থাকি। ও এতে আমার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। অফিসে সবাই আমাকে সম্বর্ধনা দ্যায়। ও কুর্নিশ করে।

    ----------

    আমরা ক্রমশ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠি। এমনকি, অ্যালিস একদিন গয়নার দোকান থেকে হীরের নেকলেস নিয়ে আসে। আমিও দু-তিনটে আংটি তুলে নিই। দোকানে খদ্দের ছিলো যথেষ্টই। চোখেমুখে দ্যুতি ছিলো তাদের। আমাদের জন্যে ঠান্ডা পানীয় আসে।

    বাড়ি ফিরে। অ্যালিস হীরের নেকলেসটি গলায় পরে। ও জামাকাপড় খুলে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। সেই অবস্থায় আমাকে বলে, "জারা জারা কিস মি কিস মি কিস মি। জারা জারা টাচ মি টাচ মি টাচ মি।'

    আমি ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরি। চুমু খাই। ও চুমু খেতে খেতে জড়ানো গলায় বলি, "হাম হোঙ্গে কামিয়াব। হাম হোঙ্গে কামিয়াব।'

    ----------

    দিন ক্রমশ দীর্ঘ হয়। নিরক্ষীয় সন্ধ্যাগুলি আমরা গান গেয়ে অতিবাহিত করি।

    ----------

    একদিন। আমি অ্যালিসকে বলি, "রাত নশিলি, মস্ত শমা হ্যায়।'

    অ্যালিস বলে, "লেট'স হ্যাভ সাম রৌনক শৌনক। লেট'স হ্যাভ সাম পার্টি নাও।'

    আমরা সদর স্ট্রিটে যাই। একটি রেস্তোরাঁ পছন্দ হয়। মিস্টার বিলিকেন'স বার অ্যান্ড রেস্টোরান্ট। সায়েবি নাম দেখে আমি খুশি হই।

    কোনো টেবিল ফাঁকা ছিলো না। কোণার দিকে একটি টেবিলে এক দাড়িওয়ালা যুবককে একা বসে থাকতে দেখি। ও তার হাতে একটি বই খোলা ছিলো। আমরা ওই টেবিলে গিয়ে বসি।

    লোকটি মুখ তুলে তাকায়। ও বলে, "আমার নাম অরূপরতন ঘোষ।'

    আমরা উত্তর দিই না। তুড়ি মেরে ওয়েটারকে ডাকি। আমি একটি বড়ো ভদকার পেগ অর্ডার করি। অ্যালিস জিন দিতে বলে।

    আমরা চুপচাপ মদ খাই। অরূপরতন একাই কথা বলে যায়। ও কবিতা নামে কোনো মেয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়। মেয়েটি ওকে ছেড়ে চলে গ্যাছে। অথবা মরে গ্যাছে সম্প্রতি। অরূপরতনকে যারপরনাই দু:খিত ও কাতর বলে মনে হয়। আমি ওর জন্যেও একটি ভদকার অর্ডার দিই।

    অরূপরতনের কথা বলার ধরণ ছিলো অদ্ভুত। ও অ্যালিসের দিকে তাকায়। আর বলে, "একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে দৃশ্যত সুনীল, কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে স্বচ্ছ্ব জলে ডুবে গ্যালো।'

    আমার মনে হয় ওর অ্যালিসকে ভালো লেগেছে। আর অ্যালিসও খিলখিল করে হাসে। হাসতেই থাকে।

    অরূপরতন আরো বলে, "হে অনেক আমগাছের দেশ, তোমাদের একমুহূর্ত ভালো লেগেছিলো, ভালো লেগেছিলো তোমাদের সদাসর্বদা।'

    অ্যালিস হাসতে থাকে। আমি বলি, "কুছ তো বাত হ্যায়। কুছ খাস হ্যায় জিন্দগি মে।'

    অরূপ চুপ করে যায়। আমি ওকে আমাদের কর্মপন্থা সম্বন্ধে খুলে বলি। ওর চোখেমুখে উৎসাহ ফুটে ওঠে। ও মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোনে। এমন কি, আমি ওকে এ কথাও বলি। যে আমি কবিতাকে খুঁজে বের করবোই। যত টাকা লাগে। কৃতজ্ঞতায় চোখে জল এসে যায়। আমি অরূপকে একটি হীরের আংটি উপহার দিই।

    ----------

    আমাদের নেশা হয়ে গিয়েছিলো। ও আমরা পয়সা মিটিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি।

    রাস্তায় দু-একটি কুকুর শুয়েছিলো। আর অল্প কিছু হেডলাইটের আলো। অরূপ ও অ্যালিস গলা জড়াজড়ি করে হেঁটে যায়।

    অরূপ বলে, "অ্যালিয়েনেশন অফ লেবার একটি বাস্তব ও ঐতিহাসিক সত্য। সর্বহারা ও পুঁজিপতির মধ্যে যে অন্তর্নিহিত শত্রুতা, তার থেকে নিজেকে আলাদা করার অর্থ বাস্তব সত্য থেকে নিজেকে আলাদা করা।'

    অন্ধকারে রাস্তাঘাট অচেনা লাগে। অরূপের হাতে আমার দেওয়া হীরের আংটি জ্বলজ্বল করছিলো। অ্যালিসের হাসি ও অরূপের গলা শোনা যায়। আমি এগিয়ে যেতে থাকি।
  • বিভাগ : গপ্পো | ১১ জুলাই ২০১১ | ১৮৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন