এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • যে চুক্তিরা কাল্পনিক

    দীপাঞ্জন মুখোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ০৯ জুন ২০২৩ | ৭৬১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • এক

    বোতলটা প্রায় শেষ করে আনার পথে, ঋষি যখন একটা সিগারেট ধরাতে যাচ্ছিল, আমি ওকে একটা রোবটের মত হাত নেড়ে বারণ করলাম। তারপর সৌরিশের দিকে ঘুরে গিয়ে বললাম - "সৌরিশ আর এক গ্লাস করে হবে, তারপর আজকের মত শেষ সিগারেটটা ছাদে গিয়ে খাবি নাকি?"

    এই কথাটা শুনে নিয়মমাফিক সৌরিশ আর ঋষি দুজনেই হেসে উঠল। ঋষি মুখ থেকে সিগারেট নামিয়ে ঢুকিয়ে রাখল আবার প্যাকেটে, "তুই আর তোর ছাদে যাবার নেশা!"- চেঁচিয়ে উঠল সৌরিশ - "চল, যাব আর কি।"

    আসলে যে কোনো বন্ধুর থাকার জায়গায় রাত্তিরে গেলেই আমি একবার না একবার সেখানকার ছাদে যেতে চাই। এই বাস্তবতা আমার সব বন্ধুরা জানে। অনেকে আড়ালে এর জন্য আমাকে গালাগালি দেয় অথবা হাসাহাসি করে, কিন্তু এই মুদ্রাদোষ আমি ছাড়তে পারিনা কারণ অনেকক্ষণ বন্ধ ঘরে বসে থাকার পর ঐ হাওয়া বাতাস অন্য রকম অনুভূতির জন্ম দেয়। এরাও জানত, এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল আমি কখন কথাটা তুলব।

    ঋষিদের এই ছাদটা আবার হাফ ছাদ । মানে আসলে এটা একটা লিফট ঘরের ওপর উঠে বসে থাকা যেখানের মেঝেতে যখন মৃদু কম্পন হয় মাঝে মাঝে, তখন বোঝা যায় মেঝের একটা স্তর নীচেই একটা লিফট ওঠানামা করছে। নীচের আসল বড় ছাদটায় ডিশ অ্যান্টেনার ভিড় আর জামা কাপড় মেলার তার টাঙানো ক্রিস ক্রস ভঙ্গিতে। একটা কোনমতে হেলিয়ে রাখা লোহার সিঁড়ি ধরে ধরে এই ছোট হাফ ছাদে উঠে আসা যায় । সিঁড়িটা পাকাপোক্ত নয়, ওঠা নামার সময় দুলতে থাকে মাঝে মাঝে। নেশার ঘোরে আরও বিপজ্জনক।

    "এই জায়গাটায় থেকে থেকে শিকড় বাকড় গজিয়ে যাচ্ছে। এবার বাড়িটা পাল্টাতে হবে। " - সত্যিই ঋষিদের এই হাফ ছাদে আমি তিনবছর ধরে আসছি। ওরা বছর বছর ভাড়া বাড়ালেও এই ফ্ল্যাটটা ছাড়ে না, বেশি ভাড়া দিয়ে থাকে। আসলে ল্যাদখোর আর কি। 

    নতুন বাড়ি মানেই নতুন একটা ছাদে ওঠার লোভ।  ঋষির মুখে বাড়ি বদলানোর কথা শুনেই আমার একটা ভালো কথা মনে পড়ল, কাল সকালেই দারুককে একবার ফোন করতে হবে। ঋষিদের মত ল্যাদ খেলে আমার চলবে না কারণ শুধু শুধু বেশি ভাড়া দেওয়া আমি পছন্দ করি না। 

    প্রতি এগারো মাস পর পর দারুককে স্মরণ করতে হয় কারণ দারুক আমাকে এই শহরে থাকার জন্য নতুন বাড়ি খুঁজতে, ভাড়া নিতে সাহায্য করে। এবছরের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ চলে এসেছে। বিনিময়ে একমাসের ফ্ল্যাটভাড়া ওকে পারিশ্রমিক হিসেবে দিতে হয়। মাটির নিচে লুকনো গুপ্তধনের সংকেতের মত এ শহরের ভূমিপুত্র দারুক জানে কোন কোন কোণে ভাড়ার ফ্ল্যাট খালি আছে। ওর সব চেনা ব্রোকারদের দল তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কের মধ্যে এলাকা ভাগ করে রেখেছে। শহরের যে জায়গায় চাওয়া যাবে সেখানেই পাওয়া যাবে মাথা গোঁজার জায়গা। সমস্যা একটাই, সবজায়গায় ব্যাচেলরদের ভাড়া দেওয়া হয় না। তাই দারুকের সঙ্গে বেরোলেও আমাকে অনেক ঘুরতে হয়। 

    দারুককে যখন চিনতাম না তখন কয়েকবছর তো আমরা বন্ধুরাই নিজেরা মিলে ইন্টারনেটে খুঁজতাম কোথায় ফ্ল্যাট ভাড়া দিচ্ছে, তারপর ফোন করে সেসব ছুটির দিনে দেখতে যেতাম। একবার সেরকম এক ৩ বেডরুম হল রান্নাঘর ফ্ল্যাটে গিয়ে আমরা চারজন এদিক ওদিক ঘুরে দেখেছিলাম, একটা মেয়ে ফ্রিজ থেকে কিছু বের করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে হলে এসেছিল। ভুল করে ভাড়াটে ছেলেটাকে তুষার মুখ ফসকে জিজ্ঞেস করে বসেছিল-"উনি আপনার গার্লফ্রেন্ড?"

    একথায় তাকে দৃশ্যত অপ্রস্তুত মনে হয়েছিল এবং সে ভুরু কুঁচকে বলেছিল - "নো, ফ্রেন্ড অনলি" । আমি মনে মনে প্রমাদ গুণে তখন অন্যদিকে তাকিয়ে ডবল ডোর ফ্রিজের গায়ে লাগানো নানা জায়গা থেকে জোগাড় করা মনোহারি চুম্বকগুলো দেখছিলাম, নানারকম বিদেশী জায়গায় ঘুরতে গেলে লোকেরা যেরকম কেনে এবং বাড়ি ফিরে এসে ফ্রিজের গায়ে লাগিয়ে রাখে ।  এর কিছুক্ষণ বাদে বাকি ঘরগুলো দেখতে দেখতে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছিল এবং ফ্ল্যাট দেখা হয়ে গেলে আমরা সে বাড়ির ঢাকা দেওয়া ছাদে উঠে সেখানে কিছুক্ষণ বসেছিলাম এবং নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলাম যে তুষারের হঠাৎ করে ওই কথাটা ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করা উচিত হয়নি। কিছুক্ষণ বাদে অবশ্য ছেলেটাও ওপরে উঠে এসেছিল সিগারেট খেতে এবং কথায় কথায় আমাদের জানিয়েছিল, আমরা ভাড়া নিতে পারলে সে বেঁচে যাবে কারণ বারবার আমাদের মত ফ্ল্যাটের মালিকের পাঠানো  লোকেরা ফ্ল্যাট দেখতে এসে তার দরজায় বেল বাজাচ্ছে, বিরক্তির একশেষ ।  সে এ ভাড়ার ফ্ল্যাট সে ছেড়ে দিয়ে পাঁচবছর আগে একটা ফ্ল্যাট কিনেছিল সেখানে আগামী সপ্তাহে চলে যাবে। তারপর সেখানে সে নিজেই ফ্ল্যাট মালিক, আর কেউ তাকে এরকম ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার জন্য এসে বারবার বিরক্ত করতে পারবে না। 
     
    শেষমেশ আমদের সেই ফ্ল্যাটটা ভাড়া নেওয়া হয়নি। 

    দুই

    সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখলাম ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। পুরো হাট করে নয়, অর্ধেক। বাইরে উঁকি মেরে দেখলাম বাকি সব ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে বাচ্চাদের ছোট ছোট জুতো রাখা। অন্য দুটো ফ্ল্যাটের দরজার পাশে ঢাকা দেওয়া জুতো রাখার প্লাইউডের সস্তা বাক্স, দরজার সামনে পাপোষ। এই সমস্ত ফ্ল্যাটে কারা থাকে কে জানে। আমি কোনওদিন স্বচক্ষে কাউকে দেখিনি। 

    আরো একবার দালানের কমন আলোটা নেভানো কিনা দেখে নিয়ে, বাইরে বেরিয়ে এসে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিলাম, নীচে চা খেতে নামব।

    কাজের মাসি যাবার সময় দরজা লাগাতে ভুলে গেছিলেন নিশ্চয় । তবে তাতে কিছুই যায় আসে না, কারণ নেবার মত কিছুই তো এই ফ্ল্যাটে নেই। এটা যেমন আমি খুব ভালোভাবে জানি, কাজের মাসিও তেমনভাবেই জানেন। তাই মাঝেমাঝেই তিনি কাজ করে বেরিয়ে যাবার সময় দরজা লাগিয়ে যেতে ভুলে যান । আজও সেরকম একটা দিন।

    কয়েকদিন আগেই এই ফ্ল্যাট ছাড়ার একমাসের নোটিস দিয়ে দিয়েছি । এই ফ্ল্যাটটার মালিক আসলে এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা কিন্তু ফ্ল্যাটটা ভাড়া নেবার সময় ওনার জামাই বালার সঙ্গেই বেশিরভাগ কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন এই ফ্ল্যাট ভাড়াই তার শ্বাশুড়ির একমাত্র উপার্জন, ফলে ফ্ল্যাট ভাড়ার চুক্তিতেও স্পষ্ট লেখা আছে ভাড়ার টাকা যেন মাসের পাঁচ তারিখের মধ্যে তার অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায়।

    ফ্ল্যাট ভাড়া নেবার সময়েই ঐ জামাইয়ের কথাবার্তা শুনে আমার মনে হয়েছিল, এই ফ্ল্যাটটা সম্পর্কে তার একটা নির্লিপ্তি আছে, কিন্তু শুধু তার স্ত্রীর মুখ চেয়ে তিনি ভাড়াটেদের সঙ্গে কথা বলা, চুক্তি সই করানো এসব কাজ দায়সারা ভাবে করেন।

    তাও সেদিন যখন ফোন করে বললাম ফ্ল্যাট ছাড়ব, বালাবাবু গলায় একটা ভান করলেন অবাক হবার - "সেকি এত তাড়াতাড়ি?"
    - "তাড়াতাড়ি কোথায়? কন্ট্রাক্ট তো শেষ হতে চলল । তারপর তো নতুন কন্ট্রাক্ট করলেই ভাড়া বাড়াবেন টেন পারসেন্ট । তাছাড়া আমি এখন একাই আছি । ডবল ভাড়া কে দেবে?"
    - "তো নতুন থাকার জায়গা পেলে?"
    - "না, খুঁজতে বেরোব। আগে নোটিশ। তারপর নতুন ভাড়া।  "
    - "না পেলে?"
    - "পেয়ে যাব"
    - "এত্ত কনফিডেন্ট? যাকগে তুমিও পারলে তোমার অফিসে বা চেনাজানা কাউকে বল যদি ভাড়া নেয়।"
    - "দেখছি।"
    - "নীচে রমনের কাছে চাবি রেখে যেও। ওকেও আমি আলাদা করে বলে রাখছি টু লেট ঝোলাতে । "

    এখন বালাবাবু একটা মেসেজ করেছে দেখলাম – আধঘণ্টার মধ্যে একজন দেখতে আসবে । ততক্ষণে দারুকেরও চলে আসার কথা । তার মধ্যে দেখার দেখতে না এসে পৌঁছলে রমনের হাতে চাবি দিয়ে আমি বেরিয়ে যাব । এখন আমার নিজের ফ্ল্যাট খোঁজাটা বেশি দরকার ।

    নীচে এই ফ্ল্যাটবাড়ির চব্বিশ ঘণ্টার ওয়াচম্যান রমন গ্যারাজে কোনও একটা ফ্ল্যাটের গাড়ি ধুচ্ছিল । ও একদিন কথায় কথায় আমাকে বলেছিল এই কাজের টাকা জমিয়ে একদিন নিজের একটা বাইক সারানোর দোকান খুলবে। ও নিজেও এই শহরের লোক নয়, সেদিক দিয়ে আমার সঙ্গে মিল আছে, যদিও আমার মত কিছুদিন বাদে বাদেই বারবার ওকে থাকার জায়গা খুঁজতে হয় না ।

    বেরিয়ে উল্টোদিকের দোকানে চা নিলাম, সঙ্গে দুটো বিস্কিট । এই চায়ের দোকানের দেওয়ালে চিপসের প্যাকেট ঝোলে সারি সারি । তাদের পিছনদিকে একটা কাবার্ডের ভেতর একটা কালো রঙের বেড়াল থাকে রাতে। সে এখন চিপসের সারির ফাঁক দিয়ে মাথা বের করছে দেখলাম। আর একটু বাদেই লাফ মেরে বাইরে ঘুরতে চলে যাবে । সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরে যখন আবার এখানে চা খাই, কয়েকদিন দেখেছি সেও সারাদিন বাইরে ঘুরেফিরে আসার পর দোকানের একপাশে বসে থাকে । দোকান বন্ধ করার সময় দোকানদার চিপসের সারি দুদিকে পর্দার মত সরিয়ে ধরে তার জন্য । আর সে লাফ মেরে ঢুকে যায় তার রাতের জায়গায় ।

    এই ফ্ল্যাট ছাড়ার সময় সঙ্গে যাবে শুধু কয়েকটা প্যাকিং বাক্সে বাসনপত্র আর সুটকেস ভর্তি জামাকাপড়, ব্যাস । খাট, তোষক, ওয়াশিং মেশিন, ফ্রিজ সবই বালাবাবুদের ।

    চা খেয়ে ফেরার সময় দেখলাম একটা ছেলে আর একটা মেয়ে সিঁড়ির নীচে  দাঁড়িয়ে দারুকের খাতায় এন্ট্রি করছে , এরাই কি ফ্ল্যাট দেখতে এসেছে?

    "আপনাদের মধ্যে কে ভাড়া নেবে?”, আমার প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটা এগিয়ে এসে জানায় – "আমি" ।
    "আপনি একাই ভাড়া নেবেন?"
    - "না, আমার কো টেনান্ট আছে আরেকজন মেয়ে, সে অন্য ফ্ল্যাট দেখতে গেছে।"
    - "ও"

    ফ্ল্যাট দেখতে দেখতে মেয়েটা হাত দিয়ে রান্নাঘরের দেওয়ালে ঘষছিল, আমার দিকে ফিরে একবার বলল - " বেশি তেলের ছাপ তো নেই দেখছি, আপনি রান্না করেন না তেমন?"
    - "নাহ রান্না তেমন ভারী কিছু করিনা, তবে চিমনিটা ভালোই সার্ভিস দেয়, দেওয়াল বেশি তেল চিটচিটে হবার কথা নয়"
    - "আচ্ছা "

    মেয়েরা ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে এলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রথমেই স্নানের ঘর, রান্নাঘর, ব্যালকনি এগুলো দেখে । তারপর বসার আর একদম শেষে শোয়ার ঘর দেখে। আমি বহুবার এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছি ।

    পিছন থেকে জামার হাতায় একটা টান পড়তে, ঘুরে ছেলেটার নিচু স্বরে অতি পরিচিত প্রশ্নটা শুনতে পেলাম - "এখানে পার্টি করলে চারপাশের ফ্ল্যাটে কেউ কিছু বলে?"
    - "কি ধরনের পার্টি করতে চাও? তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।"
    - "না সেরকম কিছু না । ওই একটু নাচ, গানবাজনা ।"
    - "নাহ কি আর বলবে? কমন দেওয়াল নেই । তবে খুব জোরে লাফালাফি করলে নিচের তলায় আওয়াজ যেতে পারে ।"

    মেয়েটার গতিপ্রকৃতি দেখে বোঝা যাচ্ছিল না ওর ফ্ল্যাট পছন্দ হয়েছে না হয়নি। আমার অবশ্য তাতে কিছুই যায় আসে না । আমাকে বালা ফ্ল্যাট দেখাতে বলেছিল আমি দেখিয়ে দিয়েছি। বাকিটা ও চাইলে বালার সঙ্গে বুঝে নেবে।

    আমাকে একটা নকল হাই তুলতে দেখে মেয়েটা নিজেই বলল  - "ঠিক আছে, আমি ফাইনাল করলে বলে দেব ওনারকে কল করে"
    - "ওঃ সিওর"

    তিন

    - "পাশের ঘরে কে থাকে?"
    - "কেউ থাকে না, ফাঁকাই "
    - "গাঁজা দিচ্ছিস কেন? কোন মেয়েকে তুই লুকিয়ে রেখেছিস?"
    - "কিচ্ছু লুকিয়ে রাখিনি। কি আজব মুশকিল!"
    - "দরজা খুলি তাহলে?"
    - "হ্যাঁ ঠেললেই খুলে যাবে, ভেজানো আছে শুধু "

    তুষার ভয়ে ভয়ে ঠেলল দরজাটা। খুলেও গেলো। তবু ওর অন্ধকার চোখে মুখে আমি দেখতে পাচ্ছি ভয় । ভয় কাটাতে দরজার পাশেই হাত ঢুকিয়ে আলোটা জ্বেলে দিলাম ।

    ফাঁকা ঘর, কোনও আসবাব নেই, একদিকের দেওয়াল জোড়া কাবার্ড। ধুলো নেই কারণ ঘরটা নিয়মিত পরিষ্কার করেন কাজের মাসী । ফাঁকা ঘরটা যেন তুষারের ভয় পাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছিল ।

    - "যাহ শালা এ ঘরটা ফাঁকা নাকি?"
    - "হ্যাঁ, প্রতীক ছিল তো এতদিন। আগের মাসে ছেড়েছে। বিয়ে আছে, বলল আর থাকবে না । "
    - "প্রতীক মানে যে মালটা আমাদের সঙ্গে অফিসের ট্রেনিঙে ঢুকেছিল? বিয়ে করছে?"
    - "হ্যাঁ ওই। তার জন্যই আরও বেশি করে এটা ছেড়ে দিচ্ছি । একা একা এত বড় ফ্ল্যাটে বেকার লাগে থাকতে।"

    তুষার হঠাৎ কদিনের জন্য অফিসের কি কাজে এসেছে, তাই চলে এল দেখা করতে । ওকে তো কলেজ থেকেই চিনি, সেই সূত্রে শুরুর দিকে আমরা এক ফ্ল্যাটেই ছিলাম কয়েকজন মিলে। তারপর সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল এদেশ ওদেশ ।

    "ইয়ে মানে, দয়িতাকে সেদিন কলকাতার রাস্তায় দেখলাম বুঝলি তো, পাশের অফিসটা থেকে বেরচ্ছিল।" - ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেটের ছাইটা মেঝেতে ঝেড়ে বলল তুষার । আড়চোখে দেখল কথাটা শুনে আমার মুখে কোনও ভাবান্তর হল কিনা।

    একটু ভাবান্তর তো হবেই। আমি জানতাম ও ইচ্ছে করে এইসব পুরনো দিনের গল্প তুলবে। কিন্তু সেসব এক ফেলে আসা জীবনের গল্প। ফেলে আসা জিনিসের দিকে তাকানো আমার ধর্ম নয়। 

    - "সে তো দেখবিই। এখন তো ওখানেই ফিরে গেছে, তোর মতো।"
    - "তোর এই ইচ্ছে করে বাইরে থাকার ব্যাপারটা বুঝি না। ওখানে থাকলে অ্যাট লিস্ট থাকা খাওয়ার চিন্তাটা তো নেই।"
    - "ধুর প্লেনে তো দুঘণ্টা লাগে মোটে, যখন ইচ্ছে এমনি গেলেই হয়। "
    - " হুম।"
    - "মনে আছে, সেই স্বর্ণকমল বাড়িটার ফ্ল্যাটে, দয়িতার একটা জন্মদিনে তুমুল হইহল্লা করছিলাম আমরা রাত তিনটের সময়?"
    - "হ্যাঁ, তারপর সেই চারশতিনের লোকটা বেরিয়ে এসে আমাদের বেল বাজিয়েছিল। "
    - "হাহাহা, তারপর ইচ্ছে করে দয়িতাকেই এগিয়ে দিয়েছিলাম আমরা দরজা খোলার জন্য। ও দরজা খুলতেই ধমক - এত রাতে মস্করা হচ্ছে জন্মদিনের নামে? ঘুমুতে দেবে না তোমরা??"
    - "হাহা, সেদিন দয়িতা ছিল বলে ও ব্যাটা আর কিছু বাজে কথা বলেনি। আমরা ছেলেরা কেউ দরজা খুললে নির্ঘাত কাঁচা খিস্তি দিয়ে দিত।"
    - "ওর এমনিতেই প্রচুর খার ছিল আমাদের ওপর। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা সোসাইটিতে ভাড়া থাকলেই অনেক ম্যারেড মাঝবয়সীদের হাত কামড়ায় । ওরা মনে হয় ভাবে - এরা কত মজা করে নিচ্ছে আর আমরা ..., তাড়াও এদের ।  "

    চার

    অফিস থেকে ফিরে অসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ফোনের শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। তুলতে গিয়ে দেখলাম রাত একটা বাজে। এসময় একজনই ফোন করতে পারে।

    "কিরে অমর্ত্য, যাবি নাকি চা খেতে?"
    "আসছি" - ঘুমজড়ানো গলায় উত্তর দিই ।

    একা থাকতে কিছুটা ভয়ই পাই আমি। আকাশপাতাল চিন্তা করতে একেবারে ভালবাসি না, তবু ফাঁকা ফ্ল্যাটে একা থাকলে সেসব কীভাবে যেন এসেই যায়। তাদের থেকে পালাতে চাইলেই আমি বাইকে উঠে বসে এক্সিলারেটর ঘোরাই। গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে গলিতে আসতে না আসতেই বুঝতে পারি আমি পালাতে সক্ষম। কারণ বাইক চালাতে চালাতে অন্য কোন চিন্তা মাথায় আসে না। আসা সম্ভব নয়। এলে, দুর্ঘটনা ঘটে যাবে।

    এই জন্যই রাত্তিরে সমরেশদের সঙ্গে একটু দূরে একটা দোকানে চা খেতে যাওয়াটা অনেক সাহায্য করে। এত রাতে এই পুরো এলাকায় ওই একটা দোকানই খোলা থাকে। দিনের বেলা দোকানদারের বৌ দোকানে বসে, রাত্তির বেলা দোকানদার নিজেই।

    আজ চায়ের দোকানে লোডশেডিং। গরমের চোটে শাটার পুরো তোলা, দুটো মোমবাতি জ্বলছে। দমকা বাতাসে তাদের শান্ত শিখা মাঝে মাঝে ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে।  রাত এগারোটার পর চা আর সিগারেটের দাম পাঁচ টাকা করে বেশি। মাঝে মাঝে সামনে বড়রাস্তা দিয়ে পুলিসের জীপ লাল নীল আলো নিভিয়ে চুপিসারে টহল মারতে মারতে যায়। চা খেতে খেতে সমরেশদের সঙ্গে টুকটাক কথা হয় । থাকার জায়গা খুঁজতে খুঁজতে পেয়েছি গতকাল, সেসব কান্ডই বলছিলাম ওদেরকে।

    একটা ডুপ্লের সন্ধান পেয়ে দারুকের সঙ্গে দেখতে গেছিলাম। ডুপ্লে মানে একটাই ফ্ল্যাটের ভেতরে দুটো তলা । সেখানে ওপরের তলার ব্যালকনির লাগোয়া ঘরে হালকা গাঁজার গন্ধসমেত সাদা ধোঁয়া ভাসছিল। একটা মেয়ে বিছানায় চাদর চাপা দিয়ে একপাশ ফিরে শুয়ে ছিল। টেবিলের ওপর একটা জলভরা বং আর মেয়েটার ঘুম থেকে উঠে খাবার জন্য চকোলেট মুসকেক রাখা। ছেলেটা লাল চোখে নিজের চকোলেট মুসটা খেতে খেতে ফ্ল্যাট ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল। জায়গা পছন্দ হল, কিন্তু ভাড়াটা আয়ত্তের বাইরে বলে নিতে পারলাম না ।

    পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মত এ শহরে যুবক যুবতী ব্যাচেলরদের জন্য সোসাইটিতে ফ্ল্যাটের ভাড়া দেওয়া কমে আসছে ক্রমশ। ম্যারেজ সার্টিফিকেট না দেখালে বহু জায়গায় দারুকদের নতুন  ভাড়া দেওয়ার জন্য দেখাতে বারণ করে রেখেছে ফ্ল্যাট মালিকরা। শেষে ফ্ল্যাটবাড়ি নয়, একটা একলা দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ির তিনতলায় ছাদের ওপরে একটা ঘর, লাগোয়া বাথরুম আর রান্নাঘর পাওয়া গেল। নীচে একতলায় মেয়েরা আর দোতলায় একদল ছেলেরা ভাড়া থাকে । কাউকে তখন বাইরে দেখলাম না তবে পরে ধীরে ধীরে আলাপ করে নেওয়া যাবে নিশ্চয়। পাড়াটা একেবারে শান্ত, সব এই রকমই বাড়িতে ভর্তি । কয়েক মিনিট হাঁটলে চায়ের দোকানও আছে । বাড়িওলার সঙ্গে পাকা কথা ঠিক করে, উল্টে পালটে নতুন চুক্তির খসড়াটা দেখে নিলাম। একতরফা বাড়িওলার চাপানো সাধারণ রেন্ট এগ্রিমেন্ট যেখানে ভাড়াটের দিক থেকে কোনও শর্ত নেই।  সেই একই মোটামুটি বয়ান, ভাড়া নিতে নিতে দেখে, পড়ে, অভ্যেস হয়ে গেছে। তিনমাসের ভাড়া অগ্রিম সিকিউরিটি ডিপোজিট। ছাড়ার সময় সেখান থেকে একমাসের ভাড়া কাটা হবে রং করানোর জন্য। ঘরের ভেতর কোথাও কিছু ভাংচুর বা নতুন করে কোনও স্ট্রাকচার বানানো যাবে না। বিদ্যুৎ বিল সময়ে মেটানো ভাড়াটের দায়িত্ব, ইত্যাদি...

    চা খেয়ে ফেরার সময়, আমাদের বাইকগুলোর চোখের সাদা আলোয় জ্বলে নেভে ফাঁকা আধো অন্ধকার রাস্তা । নিঝুম চাঁদের আলোয় চার অশ্বারোহী যেন তাদের ঘোড়াগুলোকে নিয়ে সার্কাসের গোল বলটার ভেতরে চরকিপাক খাবার বদলে, এক অনন্ত সরলরেখাপথে দৌড়ে যেতে থাকে ।

    পাঁচ

    পৃথারা তিনজন মেয়ে একটা নতুন ফ্ল্যাটে শিফট করেছে, সেখানেই এসেছি আজ। মুখে স্পষ্ট কিছু না বললেও ওর রিসেন্ট ব্রেক আপের পর হাবেভাবে পৃথা ইদানীং আমার পিছনে পড়েছে ।

    গতকাল ফ্ল্যাট ছাড়বার সময় বালাবাবু এসেছিল । দেখে নিল সব আলো, পাখা, চিমনী, গিজার চলছে? কাবার্ডের সব তাক ফাঁকা? চাবিগুলো লাগছে ঠিকঠাক? দরজা জানলা বন্ধ হচ্ছে? বাথরুমের কলে জল পড়ছে? তারপর ওর শ্বাশুড়ির আগে থেকে সই করা একটা চেক বার করল। সেখানে সিকিউরিটি ডিপোজিটের ফেরতের টাকার অঙ্কটা বসিয়ে এগিয়ে দিল আমার দিকে ।

    আরও বলছিল - "এখনও এই ফ্ল্যাটটা কেউ কনফার্ম করল না। একমাসের ভাড়া মার গেল মনে হচ্ছে। " আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে ওকে ফ্ল্যাটের দুটো চাবি ফেরত দিয়ে বেরিয়ে গেলাম ফ্ল্যাট থেকে। ও ভাড়াটে পেল কিনা তাতে আমার কি আর যায় আসে। আসলে আমরা দুপক্ষই জানি, আর কিছুদিন বাদেই দুজনে দুজনের ফোন নম্বর মুছে ফেলব মোবাইল থেকে।

    - "কার দেখা পেলাম আজকে গুরু। বহুদিন পর ... "
    - "পুলিশ ছুঁলে আঠেরো ঘা, আর অমর্ত্য ছুঁলে আঠেরো পেগ! "
    - "ধুর, এই কথাটা আমার সম্পর্কে বাজারে শোনা যায় । সত্যি সত্যি যদি কেউ আঠেরো পেগ গেলে, তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে । কিন্তু আমি অবশ্যই বেঁচে আছি, ফলে ওসব... "
    - "হ্যাঁ আমি তো সবাইকে বলিই ওসব আরবান লেজেন্ড । সত্যি সত্যি অমর্ত্য কেন, কেউই কখনো আঠেরো পেগ গিলতে পারেনা, আর তাছাড়া..."

    সবে গল্পগুলো জমে উঠেছে এমন সময় ওদের জানলার বাইরে রাস্তার ধারের ট্রান্সফর্মারটা দুম করে ফেটে গেল। নীল একটা ধোঁয়া ট্রান্সফর্মার থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল হাওয়ায়। এক দেড়মিনিট সবাই চুপ করে বসে থাকল অন্ধকারে, যেন আমাদের ঝুলিতে থাকা সব অকথিত গল্প বলা শেষ হয়ে গেছে। তারপর ফ্ল্যাটবাড়ির জেনারেটর চালু হতেই পানাহার চাঙ্গা আবার ।
     
    রাত আরও গভীর হলে, একসময় আমি আবিষ্কার করি পার্টি মোটামুটি শেষ, বাকি দুজন হোস্টেস এবং পার্টির বাকি অতিথিরা ছিটকে গেছে তাদের নিজস্ব ঘরের ব্যক্তিগত দুনিয়ার দিকে। বসার ঘরের লবিতে জেগে বসে আছি শুধু পৃথা আর আমি । তখন ফাঁক পেয়ে পৃথা আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে - "সেদিন তোকে যে প্রশ্ন করেছিলাম উত্তর দিলি না?"

    আমি মাথা নাড়ি, চোখ বুজে সোফায় পিঠে হেলান দিয়ে বসি। উত্তর না পেয়ে ও ঘরের একদিকে লাগানো আয়নার সামনে গিয়ে, ঘরের মধ্যে ঘূর্ণায়মান ডিস্কো এলইডির রঙিন অন্ধকারে একদৃষ্টে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকে। সম্ভবত নিজের নারীত্ব এবং পুরুষকে সিডিউস করার ক্ষমতা সম্পর্কে আহত বোধ করে অথবা আমার পৌরুষ সম্পর্কে সন্দীহান হয়। আর ওর সেই নিজেকে হাঁ করে নিজেকে গিলতে থাকা দেখে আমি বুঝতে পারি এভাবে নিরালায় নিজের দিকে তাকিয়ে থাকাকেই নিঃসঙ্গতা বলে। পৃথাকে সেই নিঃসঙ্গতা একটা তিনদিনের উপোসী কুকুরের মত কামড়াচ্ছে, আমি সেটাও আন্দাজ করতে পারি। পৃথার বাইক চালানোটা শিখে নেওয়া উচিত। আমিই শিখিয়ে দেব না হয়, অবশ্য শর্তাবলী প্রযোজ্য। 

    একসময় আমার কানে ফিসফিস করে ওর কথা শুনতে পাই - "আমি শুতে গেলাম। দরজা লক করছি না । বেশি দেরি করিস না কিন্তু..."

    একথা শুনে চোখ খুলে দেখি রাত সাড়ে তিনটে বাজছে।

    একা একা এঘরে তখন আমার মাথায় আবার ভুলভাল চিন্তা আসতে শুরু করে - আসলে এইসব সম্পর্ক কি একরকমের মনে মনে অন্যের শর্তে তৈরী চুক্তিতে সই করা নয়? এভাবেই কি এক চুক্তি শেষ করে আরেক চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া?

    রাত্তিরের শহরের নিঝুম রাস্তায় বাইক চালানোর জন্য মনটা উশখুশ করে ওঠে। আমি জানি এ শহরের ঘুম খুব পাতলা, আমি রাস্তায় বাইক নিয়ে বেরোলেই হালকা জেগে উঠবে। কিন্তু এই অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় এত রাতে বাইক চালিয়ে ফেরা উচিত নয়। তাই আপাতত পৃথার দেওয়া শর্তে ওর চুক্তিতে সই করে, উঠে ওর ঘরের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে আমার মনে পড়ে গেল, ওদের এই নতুন বাড়িতে এসে আমার ছাদে ওঠা হল না। অন্য কোনওদিন হবে কিনা কে জানে?
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ০৯ জুন ২০২৩ | ৭৬১ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ইঁদুর  - Anirban M
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ইন্দ্রাণী | ১০ জুন ২০২৩ ০৩:৩৮520346
  • ভালো লাগল। ছাদের ব‍্যঞ্জনা বিশেষ করে। তবে শেষ লাইনটি হয়তো অতিরিক্ত। তার আগের লা‌ইনেই থেমে গেলে হত?
    কিছু বানান, কয়েকটি বাক্য গঠন এডিট করার সময় শুধ‍রে নেওয়া যেতে পারে।
  • kk | 2601:14a:502:e060:8abb:8e6f:262b:1930 | ১০ জুন ২০২৩ ০৫:১৬520347
  • ভালো লাগলো। দীপাঞ্জনের লেখার হাত ভারী তরতরে।
  • | ১০ জুন ২০২৩ ০৮:২৩520350
  • বাহ ভাল লাগলো গল্পটা।
     
    এবং শেষ লাইনটা বাড়তি লাগল আমারো। 
  • দীপাঞ্জন মুখোপাধ্যায় | ১১ জুন ২০২৩ ২৩:২৮520371
  • আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। শেষ লাইনটা আসলে ওই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা অনিশ্চয়তা তৈরী করার জন্য রেখে দিয়েছি , সেজন্য হয়ত পড়ে অতিরিক্ত মনে হতে পারে। আগের লাইনে থেমে গেলেও হয়।
     
    দায়িত্ব, নারীত্ব, শ্বাশুড়ি এরকম কয়েকটা বানান এবং কয়েকটা বাক্য যা আপাতত চোখে পড়ল ঠিক করে দিয়েছি। 
  • দীমু | 182.69.177.187 | ১২ জুন ২০২৩ ০০:৪৫520373
  • laugh​ শেষ লাইনটা থাকলে মনে হয় বেশি ওপেন এন্ডেড লাগছে।  না হলে "পরেরদিন এলে মনে করে উঠতে হবে। " এরকম দিলেও হয় laugh
  • অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ১২ জুন ২০২৩ ০৭:১৮520376
  • ওপেন এন্ডেড ত অবশ্যই, তার সাথে যেন আর একটা সূচনার আভাষ। 
    পরিবর্ত বাক‍্যটিতে সেই জোরটা পাচ্ছিনা। তাই আমার জন্য প্রথম ভার্সানে যে লাইনটি দিয়েছ সেটাই ঠিক লাগছে।
  • ইন্দ্রাণী | ১২ জুন ২০২৩ ১০:০২520380
  • আমার একটা নিদারুণ বদ স্বভাব হল, কোনো গল্প নিয়ে কিছু বলতে গেলে, নিজের তথাকথিত লেখক সত্ত্বা বেরিয়ে আসে কখনও যার মুন্ডুর মধ্যে সর্বদা ঘুরে বেড়ায় 'নৈঃশব্দের সামর্থ্য' শব্দবন্ধটি। এই কারণে কম গাল খাই নি।
    কাল সেই বদ স্বভাব আবার প্রকটিত হয়েছে। সেখান থেকেই শেষ লাইনটি অতিরিক্ত মনে হওয়া। আর শেষ বাক্যটি রেখে দিলেও, বাক্যগঠনে অতিকথন মনে হয়েছে।মন্তব্য যখন করেই ফেলেছি, তখন আরো খানিক ব্যাখ্যা করার দায় আমারই।
     
    কিন্তু দীপাঞ্জন, আমার এই কথা মেনে নেওয়ার কোনো দায় নেই আপনার। আপনি লেখক। এবং লেখার সময় সব লেখকই একা। তার পাশে তখন নেতি বা ইতিবাচক কোনো আলোচকই নেই।

    দেখুন, গল্পর শিরোনামের জন্য মূলত শেষ লাইনটি আমার অতিরিক্ত মনে হয়েছে। গল্পের নাম যেখানে চুক্তির কাল্পনিকতার কথা বলে, তখন এই ইশারা থেকেই পাঠক( পড়ুন আমি) বুঝে নেয় যে সম্পর্ক আপাত, অনিশ্চিত। শেষ লাইন দিয়ে তাকে হাইলাইট করা শিল্পসম্মত নয় বলে আমার মনে হয়েছে। দ্বিতীয়ত শেষ লাইনটির গঠন।
    "পরে আবার অন্য কোনওদিন হবে কিনা, কে জানে?"
    পরে, আবার অন্য কোনওদিন - পর পর এই তিনটি শব্দের মধ্যে যেকোনো একটি-ই যথেষ্ট নয়? 'হবে কী না, কে জানে' সম্বন্ধেও সেই একই বক্তব্য।
    নৈঃশব্দের সামর্থ্য আমাকে বলে, শেষ লাইন মুছে দিতে। বলে, একান্তই লাইনটি রেখে দিতে চাইলে, এরকম কিছু হোক-
    অন্য কোনোদিন। হয়তো।
  • দীমু | 182.69.177.187 | ১৩ জুন ২০২৩ ০১:৪৯520392
  • এতটা বিশদে আলোচনা করার জন্য অনেক ধন্যবাদ ইন্দ্রাণী, অমিতাভদা। প্রথম পুরুষে লেখা বলেই মনে হয় আমার অবচেতন থেকে বাক্যটা এরকম একটা প্রশ্নের মত করে উঠে এসেছিল এবং সেটাই লিখেছি। অনেকটা দোনামোনা করার  সময় বা কোনো কাজ করার আগে কনফিডেন্ট না হলে আমরা নিজেরাই নিজেদের যেরকম প্রশ্ন করি, সেরকম ভাবে। 'আজ বৃষ্টি হবে নাকি? ছাতা নিয়ে বেরোবো?'  বা 'কাজটা ঠিক করছি?'র মত। 
     
    নামকরণ বিষয়ে এটুকু বলতে পারি যে আমার কাছে কাল্পনিক এবং অনিশ্চিত সমার্থক শব্দ নয়। শেষ লাইনে নামকরণকে হাইলাইট করতে চাইনি। আমি যেকোনো গল্পের শেষটা পাঠকের ওপর ছেড়ে দিতে চেষ্টা করি। শেষ লাইনের পরে অনেক কিছু ঘটতে পারে - হয়ত এরপর পৃথার ঘরে না গিয়ে অমর্ত্য সারারাত ছাদে ছিল , বা হয়ত একা ছাদে গিয়ে দিনের শেষ সিগারেট খেয়ে নিচে নেমে পৃথার ঘরে গেছিল , বা হয়ত দুজনে মিলে ছাদে গেছিল এবং অমর্ত্য আচমকা বুঝতে পেরেছিল পৃথাও তার মতন ছাদ ভালোবাসে ,.... যে যেরকম ভাববেন। 
  • ইন্দ্রাণী | ১৩ জুন ২০২৩ ০৫:৪১520395
  • থ্যাঙ্কু দীপাঞ্জন। ভালো লাগল।
    তর্কের কিছু নেই এখানে। গল্প ভালো লেগেছে তো আগেই বলেছি। আপনার গল্পে ব্যঞ্জনা, ঈশারা পেয়েছি বলেই কিছু 'আলোচনা' করলাম। এইটুকু না পেলে কিছুই বলতাম না।

    আন্তরিক শুভেচ্ছা জানবেন।
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক প্রতিক্রিয়া দিন