এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ভ্রমণ

  • অচিনপুরের বালাই 

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ভ্রমণ | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ৮৮০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • মিনিট দশেক গড়ানোর পর, রিকশর চেনটা ঝড়াক করে খুলে গেল। একধারে দাঁড় করিয়ে রিকশওয়ালা পেছনে চলে গেল চেন সেট করতে। সিটে বসে আমি একটা সিগারেট ধরালাম। রিকশর নিচে চেন সেট করে, ওর সিটে বসতে বসতে বলল, “ওরা আপনার কে হয়, বাবু?” সেই ‘মেয়েছেলে’ কথাটা কানে বাজার পর, ওর সঙ্গে কথা বলার তেমন ইচ্ছে হচ্ছিল না। তবু প্রশ্নের উদয় হলে, উত্তর না দেওয়াটা আমার দিক থেকে চূড়ান্ত অভদ্রতার প্রকাশ হবে। তাই বললাম, “কেউই হয় না, ভাই। আজকে সকালে এখানে আসার সময় ট্রেনে পরিচয়, তারপর থেকেই…”।

    “বাবা, ট্রেনের পেত্থম পরিচয়েই এতো?” কিছুটা শ্লেষ নিয়ে বলল, রিকশওয়ালা। ওর মন্তব্যের ইঙ্গিতটা রীতিমতো আপত্তিকর। এতো মানে, কিসের এতো? কথায় কথা বাড়ে, অতএব আমি নীরব হয়েই রইলাম। আমার নীরবতা ওকে আরো উস্কে দিল বোধ হয়। একটু পরেই বলল, “আপনাদের মতো বাইরের - শউরে লোকদের ভালোমানুষি ভাঙিয়েই ওদের সংসার চলে, বাবু। ওরা ভালো লোক না…”।

    আমি খুব বিরক্তির সঙ্গেই জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনার নাম কী, ভাই”?
    “আজ্ঞে, মিলন, সবাই মিলে মিলে বলে ডাকে”।
    “দেখুন মিলন, ভাই। আমি এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে কোন কথা কিংবা আপনার কোন মন্তব্যই শুনতে চাই না। আপনি চুপচাপ রিকশ চালিয়ে, আমাকে স্টেসনে পৌঁছে দিন, ব্যস…”।

    মিলন বেশ কিছুক্ষণ নীরবে রিকশ চালাতে লাগল, তারপর আবার বলল, “আমার আর কী বলুন। বাইরে থেকে আমাদের জায়গা দেকতে এসেচেন, আপনাদের মতো লোককে সতক্কো করার জন্যেই বলা। তা নইলে বলুন না, সরকারি ঘরে থাকে, কাজকম্ম কিছু করে না। লোকটাও তো লুলা। সারা বছর কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায় শুনেছি…। পেটের ভাত, পরনের কাপড় জুটছে কোত্থেকে? লুলা আবার নাকি গান গায় – গান গাওয়ার এতো ফুত্তিই বা পায় কোথায় বলেন না? সব ওই মেয়েছেলেটার…”।

    খুব রুক্ষ কণ্ঠে বললাম, “এখনই রিকশ দাঁড় করাও, মিলন। আমি নেমে যাব”। মিলন ব্রেক দিয়ে রিকশ দাঁড় করাল, তারপর অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এস্টেসনে যাবেন না?”
    “না”। আমি রিকশ থেকে নেমে রাস্তায় পা দিলাম। পকেট থেকে পার্স বের করতেই মিলন বলল, “পুরো টাকাটাই কিন্তু লাগবে, এক টাকাও কম লিবনি…”।

    একটা বাইকের শব্দ পাচ্ছিলাম পিছন থেকে, সেটা আমাদের পেরিয়ে যেতে যেতে ব্রেক দিয়ে দাঁড়াল। আরোহী বাইকে বসেই বলে উঠলেন, “আরেঃ বাবু, আপনি? স্টেসন যাচ্ছিলেন নাকি? নেমে পড়লেন কেন, কোন পব্লেম?”
    আমি আরোহীকে দেখে চিনতে পারলাম, হেসে বললাম, “হামিদভাই? ভেবেছিলাম রিকশতেই স্টেসনে যাব। কিন্তু নাঃ,  এখন ভাবছি হেঁটেই যাবো”।
     
    হামিদভাই রাস্তার ধারে বাইক স্ট্যাণ্ড করিয়ে কাছে এগিয়ে এলেন, মিলনের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে, আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হয়েছে বলেন তো?” আমি হাসলাম, বললাম, “কিছু না। ওর কথাবার্তা আমার ভাল লাগছিল না। কথা না বলে, চুপ করে চালাতে বললাম, তাও শুনল না,  বক বক করেই চলেছে। তাই…। এই নাও ভাই, তিরিশটাকা…।
    হামিদভাই আমার হাত চেপে ধরলেন, “দাঁড়ান বাবু। তিরিশ টাকা কিসের রে, মিলে? স্টেসনের ভাড়া তিরিশটাকা?”
    মিলনের সুর এখন অত্যন্ত মৃদু, বলল, “আচ্ছা বাবু, কুড়িটা টাকাই দ্যান”।
    হামিদভাই ছাড়ার পাত্র নন, আমার হাত থেকে দশটাকার একটা নোট নিয়ে, মিলনের হাতে দিয়ে বললেন, “এই নে ধর। আমি হলে টাকা তো দিতামই না, উলটে কানের নিচে দিতাম এক কানচাপাটি…”।
    আমি হামিদভাইকে অনুরোধ করলাম, “হামিদভাই, আপনার কথাও থাক, আমার কথাও রাখুন – কুড়িটা টাকা দিতে দিন”।
     
    হামিদভাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তারপর বললেন, “আচ্ছা নে, বাবু যখন দিচ্ছেন। এ টাকা নিয়েই তো ঢুকবি গিয়ে সেই চুল্লুর ঠেকে, হারামজাদা। আসেন বাবু, বাইকে চড়েন”। শেষ কথাটা বললেন আমারই উদ্দেশে।  
    “আরে না, না, তার কী দরকার”, “আমি হেঁটেই চলেই যাবো, আদ্দেক রাস্তা তো এসেই গেছি” – এসব নিম-ভদ্রতার কথা বলে অকারণ কাল হরণ করলাম না। নীরবে উঠে বসলাম, হামিদভাইয়ের পিছনে। মিলন রিকশ ঘুরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ফিরে গেল  – হয়তো হামিদ ভাইয়ের ভয়ে, অথবা কে জানে নেশার অনিবার্য টানে।
    বাইক চালাতে চালাতে হামিদভাই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনারে দেখে তো রাগী মনে হয় না। কিসের জন্যে রেগে গেলেন বলেন তো? যার জন্যে মাঝ রাস্তায় দুম করে নেমে পড়লেন? এখান থেকে রিকশতেও মিনিট দশেক তো লাগবেই”।
    আমি হাসলাম, বললাম, “তা একটু রাগ হয়েছিল বৈকি! প্রথমে তো বালাই আর লাজবন্তীর সঙ্গে আমার কিসের সম্পর্ক জিজ্ঞাসা করল। তারপর ওদের নিয়ে এমন কিছু বলতে শুরু করল, যা কানে তোলা যায় না…। বারণ করলাম, শুনল না, বক বক করেই চলল”।
    “ইস্‌স্‌স্‌, তখনই যদি বলতেন, শালার দুখান দাঁত অন্ততঃ আমি উপড়ে নিতাম”।
    মিনিট দু-তিন হবে, হামিদভাই বড়ো সাজানো একটা দোকানের সামনে বাইক দাঁড় করিয়ে বললেন, “আসেন বাবু, গরিবের দোকানে বসে একটু চা খেয়ে যাবেন”। তারপর গলা তুলে হেঁকে বললেন, “আনিমুল, দুইখান চেয়ার বাইরে দে তো…”।
    আনিমুল নামের কিশোর ছেলেটি দুখানা প্লাস্টিকের চেয়ার এনে রাখল – দোকানের সামনের সিমেন্ট বাঁধানো ধাপিতে। একটা ঝাড়ন দিয়ে চেয়ারদুটো ঝেড়েও দিল। হামিদভাই বললেন, “বসেন, বাবু। এটি আমার ছোট ভাই”। আনিমুল আদাব জানাল। আমিও নমস্কার করলাম জোড়হাতে।  
    আমি চেয়ারে বসতে হামিদভাইও আমার সামনে বসলেন, তারপর আনিমুলকে বললেন, “আম্মিকে বলে দু কাপ চা নিয়ে আয় তো, তুইও খাবি নাকি? থালে তিনটে বলিস”। আনিমুল দৌড়ে চলে যাচ্ছিল, হামিদভাই হেঁকে বললেন, “চা যেন ফাস্কেলাস হয়…”।
    তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই আমার দোকান বাবু। মা লক্ষ্মীর কৃপায় এই আমাদের প্রধান ভরসা। পিছনেই আমাদের বাসা। কিছু জমিজিরেত আছে। বছর দুয়েক হল, পাইকিরি মালের ডিস্টিবিউটরি শুরু করেছি। ওটা আর একটু দাঁড়িয়ে গেলে, এ দোকান আনিমুলকে দিয়ে দেব”। একটু বিরতির পর বললেন, “আব্বা চলে যাওয়ার পর কবছর খুব আতান্তরে পড়েছিলাম, বাবু, আল্লার মেহেরবানি আর আপনাদের আশীব্বাদে – এখন কিছুটা…। তা কেমন দেখলেন, বাবু, আমাদের জায়গাটা?”
    ওঁনার কথা শুনতে শুনতে দোকানটা দেখছিলাম ভাল করে। এমন জায়গায় এরকম সম্পন্ন দোকান বসাতে পর্যাপ্ত মূলধনের প্রয়োজন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমি উত্তর দিলাম, “ভীষণই ভালো লাগল, হামিদভাই। অচেনা অজানা জায়গায় এমন হুটহাট বেরিয়ে পড়া, আমার একধরণের নেশা বলতে পারেন। বহু জায়গা দেখেছি, কিন্তু এমন খুব একটা দেখিনি। এখানকার লোকজন, আপনি, মালতীমা, সকালের সেই বাচ্চা ছেলেমেয়েরা, আর সবার বড়ো, বালাই আর লাজবন্তীদি…। এতটুকুও বাড়িয়ে বলছি না, হামিদ ভাই। এমন আনন্দ বহুদিন পাইনি”।
    হামিদ ভাই চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, “আপনি যাকে বালাই বলছেন, তাকে আমরা বাউলকা বলি, বাউলকাকা। আর কাকিমা। দুজনেই অদ্ভূত মানুষ, বাবু। বাউলকাকার মুখে সর্বদাই হাসি আর গান। আল্লা, মানে আপনাদের ভগবান যেন ভর করে আছেন বাউলকাকাকে। কখনো রাগতে দেখিনি, লোভ নেই, হিংসে নেই। দুবেলা দুমুঠো ভাতের যোগাড় হলেই, ব্যস্‌, খুশি”।
    একটু থেমে আবার বললেন, “আমাদের এখানে ঈদের সময় বেশ বড়ো মেলা বসে, বাবু, ঈদের নামাজ শেষ হলে ঈদগার মাঠে। যেমন আপনাদের মেলা হয় চড়কে আর শিবরাত্রিতে। সেখানে এই দিগড়ের অনেক ফকির, দরবেশ আসেন, আমরা ডাকি বাউলকাকাকে। তাঁদের ধর্মকথা, আলোচনা আর তার সঙ্গে বাউলকাকার দু চার পদের গান – সকলের মন জয় করে নেয়, বাবু। বাউলকাকার কাছে, হিন্দু, মুসলমান, ধনী, দরিদ্র, ব্রাহ্মণ, ছোটজাত – কিচ্ছু নেই, সবাই ইনসান, মানুষ। স্বার্থের জন্যে কাউকে তেলও দেন না, আবার কাউকে তুচ্ছ জ্ঞানও করেন না”।
    এসময় আনিমুল একটা স্টিলের প্লেটে তিন কাপ চা নিয়ে এসে আমাদের সামনে ধরল, আমি তুলে নিলাম একটা কাপ। হামিদভাই একটা, বাকি কাপ আর প্লেট নিয়ে আনিমুল দোকানের ভেতরে ঢুকে গেল। চায়ে চুমুক দিয়েই আমি বলে ফেললাম, “বাঃ। এসময় এরকম চাই যেন মন চাইছিল”। এ আমার মনরাখা কথা নয় - এলাচ, আদা, তেজপাতা দেওয়া ঘনদুধের চা, কিন্তু পরিমিত মিষ্টি।
    হামিদভাই হাসলেন, বললেন, “এটা আমার আম্মুই বানাতে পারেন, ছোটবেলাতে যখন আমরা চা খেতাম না, খুব ঠাণ্ডার দিনে এমন চা বানিয়ে দিতেন আব্বুকে”।
    আমি চায়ে চুমুক দিতে দিতে হামিদভাইয়ের দোকানের দিকে আবার মন দিলাম। চালডাল, তেলনুন, মশলাপাতি। নানা রকমের চকোলেট, বিস্কিটের পাকেট থরে থরে সাজানো। সঙ্গে আছে খাতা, কাগজ, পেন, পেনসিল, স্কুল কলেজের স্টেসনারি। সাবান, শ্যাম্পু, তেল, ক্রিম, মেয়েদের সাজের মনোহারি সরঞ্জাম। তার সঙ্গে কোদাল, তাগাড়ি, বেলচা। নারকেলের দড়ি, নাইলনের দড়ি, লোহার তার, ফুলঝাড়ু, নারকেলের ঝ্যাঁটা। সিগারেটের প্যাকেট, বিড়ি, দেশলাই, গুটখার প্যাকেট। বহুল প্রচলিত বহুবিধ স্ন্যাক্সের প্যাকেট ঝুলছে অজস্র। নাম করা সব ঠাণ্ডা পানিয় এবং জলের বোতল।
    চা শেষ হয়ে গেল, দোকানের পসরা সম্ভার দেখা শেষ করা গেল না। দোকানের বিচিত্র পসরার প্রাচুর্য থেকে এটাও বোঝা গেল, এ অঞ্চলে স্বচ্ছল অধিবাসীর সংখ্যাও নিশ্চয়ই প্রচুর। হামিদভাইয়ের বিপুল লগ্নি নয়তো ব্যর্থ হতো। নিয়মিত ঝড়-ঝঞ্ঝায় পীড়িত হলেও, এখানকার মানুষ স্বাভাবিক নিয়মেই উৎরে ওঠেন সে সংকট। ঘুরে দাঁড়াতে পারেন জীবনের মূল স্রোতে। ও বেলায় মালতীমা আর বালাইয়ের ইতিহাস শুনে যতটা মন খারাপ হয়েছিল, এ বেলায় কিছুটা স্বস্তি মিলল।
    চা শেষ করে আমি সিগারেট ধরালাম, হামিদভাইকে দিতে গেলাম, হামিদ ভাই নিলেন না। চুপিচুপি বললেন, “মাপ করবেন, বাড়িতে ও সব খাই না। আম্মু একদম পছন্দ করেন না”। একটু পরে হামিদ ভাই বললেন, “বাউলকাকার পা দুটো কী করে কাটা যায় শুনেছেন?”
     
    আমি বললাম, “শুনেছি। বালাই নিজেই বলল। আশ্চর্য! ওই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে, ওর মুখে বিষাদের ছায়া মাত্র দেখতে পেলাম না। স্বাভাবিক হাসি মুখে এমন করে বলল, মনে হল যেন খুব একটা মজার গল্প শোনাচ্ছে”।
    উচ্ছ্বসিত হয়ে হামিদ ভাই বললেন, “অ্যাই। এই কথাটাই আমি বলতে চাইছিলাম। আমার আব্বুর কিতাব-টিতাব পড়ার খুব ঝোঁক ছিল। তাঁর কাছে শুনেছিলাম, আপনাদের শাস্ত্রে নাকি আছে, শত দুঃখেও যিনি উতলা হন না, সুখের দিনেও যিনি উদাসী থাকেন, যাঁর মনে লোভ, ভয় বা রাগ নেই, তাঁরাই নাকি সত্যিকারের জ্ঞানী?”

    আমি অবাক হয়ে বললাম, “হ্যাঁ এ কথা আমাদের গীতাতে আছে, আপনার বাবা গীতা পড়েছিলেন! কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে অর্জুন যখন একান্তই নারাজ হলেন, তাঁকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করার জন্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে কথাগুলি বলেছিলেন, সেগুলির সংকলনই গীতা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতার সাংখ্যযোগ অধ্যায়ে অর্জুনকে বলেছিলেন,
    “দুঃখেষু অনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।
    বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীঃ মুনিঃ উচ্যতে।।
    বাংলায় এই শ্লোকের মানে হল - যিনি দুঃখের সময় উদ্বেগ করেন না, যিনি সুখের সময় উদাসীন থাকেন, যিনি সমস্ত আসক্তি, ভয় এবং  ক্রোধ জয় করতে পেরেছেন, সেইরকম যোগীকেই স্থিতধী বা স্থিতপ্রজ্ঞা মুনি বলা হয়”।*
    “ঠিক। বাউলকাকাকে যখনই দেখি। আমার আব্বুর ওই কথাগুলি মনে পড়ে”।

    দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। আমি ভাবছিলাম, সকালে হামিদভাইকে যেভাবে বুঝেছিলাম, এখন সেই মানুষটাই কত আলাদা। বিষয়ী লোক ব্যবসা-পত্র ভালই বোঝেন। অর্থ উপার্জনের পথে অনেক গলিঘুঁজি, অনেক ঘাঁতঘোঁত জেনেছেন, অনেক ফড়ে-ফেরেব্বাজ সামলেছেন। অথচ তাঁর অন্তরে বসত করেন তাঁর আব্বাজান – একজন মোরশেদের মতোই যিনি পুত্রকে জীবনের সঠিক পথ দেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পিতার আকস্মিক মৃত্যু, পুত্রকে ভয়ংকর এক সংকটের পথে ঠেলে দিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা হামিদভাইকে শিখিয়েছিল বাস্তববোধ, অতএব তিনি সে পথে না হেঁটে – নতুন পথ খুঁজে নিয়েছেন।

    সদর শহর, ছোটবড়ো নানান শহরের হাল-হকিকত বুঝে, পাকা ব্যবসায়ীদের ধড়িবাজি সামলে, নিজের হাতেই ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছেন সমৃদ্ধির দিকে। সেই কারণেই, সকালে তাঁর মুখে শুনেছি শহরবাসীদের প্রতি তিক্ত বিরক্তি। অথচ এখন এই সন্ধ্যায় পাখিরা যখন সারাদিনের খাদ্য সন্ধান সেরে নিশ্চিন্তে নিজনিজ বাসায় ফিরেছে। ঠিক সেই সময়েই, আপন হাতে গড়ে তোলা ঝকঝকে দোকানের সামনে, নিশ্চিন্তে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিতে পারলেন কত সহজেই। বিষয় উপার্জনের তীব্র বিষেও তিনি মোরশেদ পিতার কথাগুলি অনুভবে রেখেছেন আজও।

    হামিদভাই সকালে আমাকে বলেছিলেন, “রাজধানীর লোকেদের পেটে আর মুখে আনকথা। তাদের সব্বোদাই যেন লোক ঠকানোর ব্যবসা। এ আমি পেতক্ষ দেখেছি, বাবু”। আমি মনে মনে হাসলাম। গ্রাম হোক বা শহর, ধনী হোক বা দরিদ্র, হিন্দু হোক বা মুসলমান, আসলে প্রত্যেক মানুষের অন্তরেই দুই বা ততোধিক সত্ত্বা আছে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের এই সত্ত্বাগুলিই ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে আমাদের বিচিত্র চিন্তা-ভাবনা এবং মননের নিয়ামক।

    দোকানের দেওয়ালে একটা বড়ো ঘড়ি ছিল, সেটার দিকে তাকিয়ে বললাম, “এবার যে আমাকে উঠতেই হবে, হামিদভাই”। হামিদভাই হয়তো তাঁর বাল্য এবং কৈশোরে ফিরে গিয়েছিলেন – তাঁর আব্বাজানের স্নেহমাখা শাসনের দিনগুলিতে। একটু চমকে, নিজের হাতঘড়ি নিরীক্ষণ করে বললেন, “মিনিট কুড়ি পরেই একটা ট্রেন আছে কলকাতার, এটা মিস করলে পরেরটা প্রায় একঘন্টা পরে। চলেন আপনারে ছেড়ে আসি”।
    চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, মৃদু আপত্তির সুরে বললাম, “এখান থেকে স্টেসান কদ্দূর? আমি না হয়...”।
    হামিদভাই বাইকের চাবি নিয়ে বাইকের দিকে এগিয়ে বললেন, “ওদিকে আমার একটু কাজও আছে, আসেন। আনিমুল, দোকানে থাক, আধাঘন্টার মধ্যেই আসছি”। দাদার ডাকে আনিমুল দোকানের বাইরে বেরিয়ে এল, সলজ্জ হাসিমুখে আমাকে আদাব করে বিদায় জানাল, আমি হেসে বললাম, “চলি, আনিমুলভাই, ভালো থেকো”।

    চার-পাঁচমিনিটের মধ্যেই আমরা স্টেসনে পৌঁছে গেলাম। বাইক থামিয়ে হামিদভাই জিজ্ঞাসা করলেন, “রিটান টিকিট আছে তো? তাহলে, সোজা প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ুন”।
    আমি বাইক থেকে নেমে মৃদু হেসে বললাম, “রিটার্ন টিকিট ছিল, কিন্তু সেটা বালাইয়ের হাতে জমা দিয়েছি, আমার ফোন নম্বর লিখে। কাজেই টিকিট একটা কাটতে হবে...”।
    হামিদভাই হো হো করে হেসে উঠলেন, বললেন, “বুঝেছি, টিকিট কাউন্টার ওই যে সামনে, বাঁদিকে”।

    আমি দুই হাত তুলে নমস্কার করলাম, বললাম, “সারাটাদিন বড়ো আনন্দে কাটল, হামিদভাই। আপনাদের সকলকে আমার সারাজীবন মনে থাকবে”।
    হামিদভাইও জোড়হাতে নমস্কার করলেন, বললেন, “আদাব, দাদা। সকালে প্রথম পরিচয়ে আপনাকে যেমন মনে হয়েছিল, এখন বুঝলাম আপনি তেমন না। আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে আমারও খুব ভালো লাগল”।
    আমি হাসিমুখে বললাম, “আমি আরও খুশী হলাম, ভাই, বাবু থেকে আপনার দাদা হতে পেরে”।
    হামিদভাই হাসলেন। তারপর আমার দুটো হাত ধরে বললেন, “ভালো থাকবেন দাদা, আসি?”। আমি হেসে সম্মতি দিলাম।
    বাইক স্টার্ট করে বেরিয়ে গেলেন হামিদভাই, আমিও এগিয়ে গেলাম টিকিট কাউন্টারের দিকে। পিছনে রইল, এখন আর ততটা অচেনা নয়, সেই অচিনপুর। রইলেন আশ্চর্য কিছু মানুষজন – আর তাঁদের সঙ্গে আমার মাত্র একটি দিনের আন্তরিক সাহচর্য। এই মধুর স্মৃতি আমি বহন করে ফিরে যাবো রাজধানী কলকাতায়। নির্জন শীতের বিকেলে যখনই মনে পড়বে এঁদের কথা... আমার বালাইয়ের কথা মনে পড়লেই - কর্মক্লান্ত মনের সমস্ত আপদ-বালাই দূর হয়ে যাবে।   

    (শেষ) 
     
    [* শ্রী মদ্ভগবদ্গীতার সাংখ্যযোগ অধ্যায়ের ৫৬তম শ্লোকের সরল বাংলা অনুবাদ এই লেখকের “চিরসখা হে” বইটি থেকে নেওয়া হয়েছে।]   
     
  • ধারাবাহিক | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ৮৮০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 2601:84:4600:5410:a896:a19:758:54d5 | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১১:৪৮504114
  • সুন্দর 
  • swapan kumar mondal | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০৯:০১504142
  • পড়তে ভালই লেগেছে কিন্তু বালাই বা লাজবন্তীর মুখে যেসব কথা বসানো হয়েছে সেগুলো বড্ড কৃত্তিম লেগেছে আরো কথ্য ভাষা ব্যবহার করলে ভাল লাগতো।
  • Kishore Ghosal | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ২১:৪৯504160
  • @স্বপনবাবু, মন দিয়ে পড়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞ রইলাম। 
    ভাষার ব্যাপারে বলি, আমার দেশ বর্ধমানে, কিন্তু প্রায় আজন্ম বেড়ে উঠেছি কলকাতার পরিবেশে। তাই মাত্র একদিনের জন্যে দক্ষিণ বঙ্গের ওই অঞ্চলে গিয়ে, ওঁদের ভাষা অবিকল লেখার সাধ্য আমার হয়নি - এ আমার অক্ষমতা। কিছু কিছু কথার ধরন, যেগুলো মনে ছিল,  সেগুলিই ব্যবহার করেছি। 
     
    অনেক শ্রদ্ধা নেবেন, আপনার সমালোচনা আমি কৃতজ্ঞ মনে স্বীকার করলাম। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন