• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • নকশিকাঁথা (১৫)

    বিশ্বদীপ চক্রবর্তী
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ৩০ অক্টোবর ২০২১ | ২৫৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)

  • ১৫

    দুধের সরের মত ঘুম দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। চোখের কুয়াশা কাটতে একটা চেহারা ধীরে ধীরে আকার পেল। জানালা দিয়ে আসা সূর্যের আলো, মাথার রেশমি চুল বেয়ে, এক আলোর বলয়ে মেয়েটিকে ঘিরে রেখেছিল। আক্রামের চোখের মতই একটা হাসির রেখা ধীরে ধীরে মেয়েটির ঠোঁটের দুয়ার মুক্ত করল। বিছানার পায়ের কাছে দাঁড়ানো মেয়ে এবার হামাগুড়ি দিয়ে বিছানায় উঠে আক্রামের পাশে থেবড়ে বসে পড়ল, ধীরে ধীরে হাত রাখল আক্রামের কাঁধে। ঝাঁ-চকচকে করে মাজা পেতলের বাসনের মত সেই হাতের রং, আঙুলের নখ রাঙানো ঠোটের রঙে আর সেই হাতের স্পর্শ জলভরা মেঘের মত সম্ভাবনাময়।

    এই মেয়ে আক্রামের পরিচিত হবার কথা নয়, অথচ এর থেকে চেনা যেন কেউ নেই। এই মেয়ের স্পর্শের কোমলতা আর শরীরের আঘ্রাণ বড় গভীরভাবে পেয়েছে আক্রাম। কেমন করে সেটা মনে করে উঠতে পারছে না।

    আমি কোথায় – এই প্রশ্ন করল না আক্রাম। বরং জিজ্ঞেস করল, আমি কোথায় ছিলাম? কোথায় আছে জানাটাও জরুরি হবে। কিন্তু একটা ঘরে আছে, অনভ্যস্ত নরম বিছানায় শুয়ে রয়েছে সেটা তো অন্তত বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তার আগে কোথায় ছিল? যেন অনেকটা সময় সে ছিল কিন্তু ছিল না, তার শরীর অসম্ভব রকম জেগে ছিল, কিন্তু সে শরীর তার অধীনে ছিল না। মনে হয়েছিল ভেসে যাচ্ছে কোন স্রোতে, স্রোতের টানে কখনো মোহনার দুর্নিবার উচ্ছাস, আবার কখনো ভাঁটার মৃদু কলধ্বনি। কখনো তাকে জড়িয়ে ধরেছিল লতা-গুল্ম, বেষ্টন করেছিল সর্পিল পিচ্ছিলতায়। আক্রাম তার থেকে মুক্ত হতে চেয়ে যখন ছটফট করেছে, হঠাৎ সে নাগপাশ থেকে ছাড়া পেয়ে সর্বাঙ্গ হাহাকার করে উঠেছে। অথচ আবার এও মনে হয়েছে, যে এর কিছুই ঘটেনি, বরং সব রকমের ঘটনাকে অপেক্ষা করিয়ে রেখে সময় স্তব্ধ হয়ে গেছে।
    কোথায় ছিলে? তুমি আমার মধ্যে ছিলে, কিন্তু কোথাও ছিলে না। আমার নাচের তালে তালে তুমি কখনো উপরে উঠেছো, কখনো নিচে। তুমি আমাকে পাকে পাকে জড়িয়েছো, কিন্তু আমি তোমাকে ছুঁতেও পারিনি। তোমার উপরেও আমি ছিলাম, নিচেও আমি ছিলাম। অথচ তুমি কোথাও ছিলে বলে কেউ জানে না, তুমিও নয়। মেয়েটির কথার সঙ্গে চোখের তারায় ভাঙা কাচের মত অবিন্যস্ত ঝিকিমিকি। সেই আলো যেমন ঝকমকে, তেমনি তার রঙের মিশেল। হেঁয়ালি কথার মত খেয়ালি চোখের রঙটাও আক্রামের ঠাহর হচ্ছিল না।

    তুমি কে?
    আমার সঙ্গে জড়িয়ে রইলে এতগুলো দিন, আর আমি কে তাই বুঝতে পারছ না? চোখের ভাঙা কাচেরা এবার শব্দ নিয়ে মেয়েটির মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ল।
    আমি কত দিন অমনিভাবে ছিলাম?
    মেয়েটির দুই হাতের দশটা আঙুল আক্রামের কাঁধ থেকে নেবে বুকে খেলা করছিল। আমার যতগুলো আঙুল তোমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে, ঠিক ততদিন ছিলে তুমি আমার মধ্যে। মার্বেলের গুলির মত হাসিরা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। কিংবা ঠিক ততদিন তুমি কোত্থাও ছিলে না।

    আক্রাম ওর হাতের আঙুল গুনে শেষ করে উঠতে পারছিল না। মানুষের হাতে দশটার বেশি আঙুল তো থাকার কথা নয়। অথচ তার কাঁধ, বুক, পেট, উরু – সর্বত্র মেয়েটির আঙুলের স্পর্শ একই সঙ্গে অনুভব করতে পেয়ে গোনার চেষ্টা ছেড়ে দিল।
    হাল ছাড়া নাবিকের গলায় বলল, আমি এক দিন অথবা একশ’ দিন তোমার মধ্যে ছিলাম, কিংবা ছিলাম না। তাহলে তুমি কোথায় ছিলে?
    আমি তো নাচ করছিলাম।
    আমাকে নিয়েই নাচ করছিলে? এখনো আক্রামের অবাক হওয়া বাকি ছিল অনেক।
    বাহ করবো না? আমার দিনে বারোটা নাচ থাকে যে। মেয়েটির বলা সংখ্যায় একটা নিশ্চিত নির্দেশ ছিল, যেটা দরিয়ায় উথাল পাথাল আক্রামকে কিনারা পাওয়ার নিশানার মত এগিয়ে দেওয়া হল।
    তুমি আমাকে নিয়ে নাচ করেছো আর কেউ দেখতে পায় নি কি করে? এবার মেয়েটি বিছানার উপরেই উঠে দাঁড়াল। তার পরনে সেই লাল আর কালো স্কার্ট যার শুরুও নেই, শেষও নেই – যে আবরণে মেয়েটি সম্পূর্ণ ঢাকা থাকে, অথচ সমস্ত উন্মুক্ত করার সম্ভাবনাকে ডেকে আনে নাচের প্রতিটা পদক্ষেপে। যার বেষ্টনী থেকে নিজেকে মুক্ত করে সে যখন ঘরের বাতাসে উড়িয়ে দিল, সে এক বিশাল ঝড়ের মেঘের মত ভেসে রইল খানিক, তারপর মেঘের রক্তবর্ণ দুর্নিবার হাতছানি কালো রঙের অনিবার্যতার সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে মেঝেতে নেবে এসে পাহাড়ের স্তুপের মত ঘরের ছাদ স্পর্শ করে পড়ে রইল।

    আমার নাম রুথ, আমি স্কার্ট ডান্সার। আর এই যে স্কার্ট দেখছো, এটা লম্বায় একশ’ গজ, যার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে এই পৃথিবীর যত রকম চাওয়া আর পাওয়া, হরেক মানুষের আকাঙ্ক্ষা আর সংশয়, ঘর ছাড়া নাবিক আর ঘরে না ফিরতে চাওয়া ভবঘুরেরা এককাট্টা হয়ে। তাহলে কি আমি এটায় আমার মনের মানুষটিকে লুকিয়ে রাখতে পারি না যতদিন খুশি?

    এরপর রুথ আর কোন কিছুর আড়ালেই লুকিয়ে রইল না এবং ভোরের সূর্যের মত ডিমের কুসুম ভাঙা রঙ হয়ে আক্রামের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল। কতদিন ওর একশ’-গজি কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে ছিল, আক্রামের জানা হল না। তেমনি কতদিন সেই বিছানায় রুথের শরীরের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে নিজেকে হারিয়ে ফেলল, সেটাও হিসেবে রইল না। আক্রামের জাহাজ বন্দর ছেড়ে গেছিল কোনকালে। রুথের রোজ দিনকার বারোটা নাচের শো কতদিন যে হল না, তারও কোন ঠিকঠিকানা থাকল না। আক্রামের খিদে পেলে রুথকে খেল চেটেপুটে, রুথের তৃষ্ণা মিটল আক্রামকে আকণ্ঠ পান করে। রুথ আক্রামের কানে কানে কত কথা বলল। আক্রামের অনেক কথা বেরনোর জন্য রুথের বুকের মধ্যে গুঙিয়ে উঠল। রুথ বলল নিউ জার্সিতে তার সেই ছোটবেলায় মার কাছে নাচ শেখার কথা। আক্রাম জানাল বইরালি গ্রামের সুরমা নদীতে আব্বার সঙ্গে জাল ফেলে মাছ ধরার কথা। আক্রাম উঁকি দিল মারিয়া বনফান্তের কাছে রুথের ব্যালে শেখার দিনগুলোতে। রুথের গোলাপ পাপড়ি হাত আক্রামের লোহার মত শক্ত পেশি থেকে সুরমা নদীতে বৈঠা বাওয়ার আন্দাজ পেল। রুথের পায়ের বিভঙ্গ জুড়ে গেল ক্যানক্যান নাচ শেখার স্মৃতিকথায়। আক্রাম গেয়ে শোনাল মাঝি তর দ্যাশ কোথায় রে। সে গানের সঙ্গে শালতিতে শরীর ছড়িয়ে বাংলাদেশের আকাশের শুলুক নিল রুথ। দশ বছরের রুথকে যেদিন নিউ ইয়র্কের ডাইম মিউজিয়ামে নাচের জন্য ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই কথার কান্না আক্রামের বুকের ভিতরে বাজল। অতগুলো লোকের সামনে নাচতে ভয় পাওয়া মেয়েকে মায়ের বকুনি আর মাছ ধরতে গিয়ে জাল ছিঁড়ে ফেলে আব্বার হাতের ঠ্যাঙানির কথারা একে অপরের সঙ্গে দুঃখ ভাগ করে নিল। বডেভিল হাউজের নাচের গুরুর আশ্লেষে কচি শরীর রক্তাক্ত হওয়ার কথা বলতে বলতে রুথ জাহাজের চুল্লিতে কুঁকড়ে যাওয়া আক্রামের বুকের রোমে হাত বোলাল। আক্রাম বলল দরিয়ার কথা, বন্দরে বন্দরে দেখা নানান মানুষের হরেক আখ্যান। রুথ জানাল বারলেস্ক থিয়েটারে নাচের শেষে তার খোঁজে হন্যে হয়ে বেড়ানো নানান বয়সি মানুষের ব্যাখ্যান। এই নতুন দেশে এসে বসত বানানোর স্বপ্ন আক্রাম গোপন রাখল না। বেলাস্কো কোম্পানির হয়ে এত বছর নাচ করে এবার নিজের ডান্স কোম্পানি খোলার স্বপ্নের সঙ্গে আক্রামকে জুড়ে নিল রুথ।

    এমনিভাবে এতগুলো দিন কাটল। প্রথমে ডেনিসের মুখ সাজানোর বুড়ি আমান্ডা এসে দরজার বাইরে থেকে ফিসফিস করে ডাকল রুথ! শোয়ের জন্য তৈরি হওয়ার সময় বয়ে গেল যে। সে বুড়ি দরজায় কান পেতে শুধু মৌমাছির গুঞ্জন শুনে ভিতরে রুথ আছে কি নেই তার হদিশ পেল না। সময় সত্যিই যখন যায় যায়, শোয়ের জন্য লোকেরা পাগলা ঘোড়ার মত পা ঠুকছে, বেলাস্কোর বড়কর্তা আন্তোনিও এসে দরজায় মুষ্ট্যাঘাত করল, এই নাচনি তোর জন্য কি শো আটকে থাকবে? চারজনের বদলে তিনজনেই নেচেছিল সেদিন। কিন্তু নাচের শেষে আন্তোনিও নিয়ে এসেছিল সেই দুই মুশকো জোয়ানকে। দরজা ভেঙ্গে মাগিটাকে বের কর, আর রসের নাগরটাকেও। তারা লাথি মারল দরজায়, লোহার ডান্ডা এনে পিটল বেশ খানিক। কিন্তু না ভাঙল কপাট, না বেরোল স্কার্ট ডান্সার রুথ।

    অবশেষে যখন অনেক জ্যোৎস্না পেরনো রাত আর অগুন্তি সূর্যধোয়া দিন কাটিয়ে ওরা বাইরে বেরল, ক্রাম যে রুথের মনের মানুষ সেটা বুঝতে কারো বাকি রইল না। প্রথমেই তেড়ে এল আন্তোনিও। রুথের চোখের উপর বেলাস্কোর সঙ্গে করা কন্ট্র্যাক্ট ছিঁড়ল কুটি কুটি করে। যা মাগি, তোর মত নাচলেওয়ালি গলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বেলাস্কো থিয়েটারে তোর আর কোন জায়গা নেই।

    রুথ গলা তুলে হাসল। আমার কাজ অর্ধেক কমিয়ে দিলে আন্তোনিও। তোমার পাছায় লাথি মেরে আমি এমনিতেও বেলাস্কো ছেড়ে যাচ্ছিলাম। নাচাও তোমার আর যারা আছে।
    গত ক’দিনে রুথ না থাকায় শোয়ের টিকেট বিক্রি অর্ধেক। আন্তোনিও মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, এটা তো এমনি কাগজ ছিঁড়লাম। রুথ হচ্ছে বেলাস্কো থিয়েটারের জান। তাকে ছাড়া আমরা কি শো করতে পারি?
    রুথের কথাগুলো এবার বেরল ছররা গুলির মত। সেটাও আমি জানি না ভেবেছো? আন্তোনিও যে হাড়-হারামজাদা সেটা আমায় নতুন করে জানতে হবে? নিয়ে এসো আসল কন্ট্র্যাক্ট, তোমার হয়ে আমিই ছিঁড়ে দিচ্ছি।

    এবার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল আন্তোনিও। তার টিকালো নাক রেগে পতপত করে উঠল পতাকার মত। চোখের থেকে পোড়া আগুনের ছাইয়ের মত হলকা বেরল। ওমনি ছিঁড়লেই হল, গুনে গুনে পাঁচশ’ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কন্ট্র্যাক্ট থেকে ছাড় পেতে হলে।

    সাপের মত ফনা তুলে ফোঁস করে উঠল রুথ। পাঁচশ’ ডলার কি হাতের মোয়া? বেলুজ্জে, নিজের মায়ের শরীর বেচে থিয়েটার খুলেছিস, তোর ওই লকলকে জিভটা টেনে ছিঁড়তে পারলে আমার বুক জুড়ায়।
    আর তুই বেশ্যা মাগি, বুক নাচিয়ে অনেক তো টাকা কামিয়েছিস। টাকা দে, না হলে এই ব্যাটা লস্করকে দেবো ফের জাহাজিদের হাতে ধরিয়ে।

    সে হল এক ভীষণ বচসা। ভোরের খোঁজে পাখিরা ঘুমের থেকে উঠে উড়বার তোড়জোড় করছিল, আবার নিজের নিজের বাসায় গিয়ে ডানা গুটিয়ে ঘাপটি দিল। রাতের শেষে যে ক’জন মাতাল পথের ধুলায় লুটিয়ে পড়েছিল, অসময়ে খোঁয়ারি ভেঙে গালিগালাজ করতে করতে বাড়ির পথ ধরল। টেন্ডারলয়েনের মাথার উপর দিয়ে যাওয়া সেই সকালের রেল কেন যে মাঝপথে আটকে গেল, নিউ ইয়র্ক হেরাল্ডের তাবড় সাংবাদিক কিছুতেই সেটার হদিশ করতে পারল না। আমান্ডা গোল থামাতে মাঝখানে এসে পড়েছিল, আন্তোনিওর দাবড়ানিতে ছাদের থেকে মাকড়সার মত ঝুলে রইল। সেই দুই ষণ্ডা জোয়ান রুথের দুহাত ধরে চ্যাংদোলা করে আন্তোনিওর ঘরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, রুথের চোখের আগুনের গোলায় ওখানেই কাটা সৈনিক হয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল।

    সব লড়াই একদিন নিকেশ হয়। আন্তোনিও আর রুথের মধ্যেও শেষমেশ রফা হল। রুথ খুলবে তার নিজের নাচের কম্পানি, কিন্তু নাচবে বেলাস্কো থিয়েটারে। বেলাস্কোকে তার নতুন কম্পানির সঙ্গে কন্ট্র্যাক্ট করতে হবে।
    আন্তোনিও চোখ পিটপিট করে বলল, তাহলে এবার কি রুথ সোলো ডান্স করবে শুধু?
    অনেক বাদে হাসি ফুটল রুথের মুখে, চোখের থেকে খুশিতে চলকে পড়ল সুরমা নদীর জল। না, সোলো ডান্স না। রুথের সঙ্গে নাচবে ক্রাম। রুথ আর ক্রাম একসঙ্গে আসবে মঞ্চে।

    আন্তোনিও জোব্বা থেকে চশমা বের করে চোখে আঁটল। এতক্ষণে তার দৃষ্টি পুরোদস্তুর পড়ল আক্রামের উপর। দুই পা এগিয়ে গরু কেনার মত আক্রামের হাত-পা টিপে টিপে দেখল। তারপর খিকখিক করে হাসল হিক্কা তোলার মত। চেহারাটি বেশ খোলতাই, হাতে পায়ে চেকনাই দিচ্ছে খুব, বয়েসেও বেশ কচি ধরেছিস এবার মাগি। কিন্তু বিছানায় সরেস হলেই কি হাত পা খেলিয়ে নাচতে পারবে?
    নাচ কি আন্তোনিও রুথের থেকে বেশি বোঝে?
    সে না হয় হল, কিন্তু লোকে পয়সা দিয়ে শুধু তো নাচ দেখতে আসে না। দেখে নাচনেওয়ালির কোমর, বুক, পাছা। এর নাচ দেখে কি পাবে তারা?
    তোর মনটা যেমন নীচ, তোর মুখের কথাতেও পোকা। নাচ দেখতে যদি না আসে, তাহলে যা না টেন্ডারলয়েনে কত বেবুশ্যে মাগি আছে, নিয়ে এসে নাচা না তাদের।
    আহা রাগ করছিস কেন? আমাকে ব্যবসার কথাটা তো ভাবতে হবে। এখন ওরা চারজোড়া শরীর দেখে, এরপর দেখবে শুধু একা রুথকে। তার উপরে যদি একটা উটকো লোক স্টেজে ঘুরে বেড়ায়, তাদের নেশা চটকে যাবে না?
    আন্তোনিও যতই বদমাশ হোক, আগে তো ভাবতাম ব্যবসাবুদ্ধি আছে। মাথায় কি তোমার গু-গোবর, বোঝো না আমার সঙ্গে যখন হিন্দু ফকির একসঙ্গে নাচ করবে, তখন কেমন ভাবে দর্শক নাচের মধ্যে একদম ঢুকে যাবে? আর নিজেদের হিন্দু ফকির বলে ছবি বানাতে ওদের কত সুবিধা হবে? ওরা আগে নাচ দেখতো, এখন মনে মনে রুথের সঙ্গে শরীরে শরীর জুড়ে নাচতেও পারবে।

    চোখটা উত্তেজনায় বড় বড় হয়ে গেল আন্তোনিওর। বাহ, ধান্দাটা তো মন্দ নয়। এমন নাচ এই তল্লাটে আর কেউ দেখেনি। খুব ভাল হবে।
    এত সব উথাল পাথালের মধ্যে আক্রাম এতক্ষণ ছিল শুধুই দর্শক। এবার আর থাকতে না পেরে বলে উঠল, আমি যে নাচতে জানি না রুথ। আমাকে নৌকা বাইতে দাও, বেয়ে দেব যে জোয়ার হোক কি ভাটা। মাছ ধরতে পাঠাও। হাডসনের জলে জাল ফেলে মাছ ধরে আনব। চুল্লিতে আগুন ঠেলতে হলে সেও পারি। কিন্তু নাচ করেছি নাকি কখনো? তাও আবার তোমাদের ইংরাজি নাচ।

    এখন আন্তোনিওকে যেন আর চেনাই যায় না। সে মুখে ফেনা তুলে গালি-বকা বেলাস্কোর কর্তা নয় যেন। একেবারে জিগরি দোস্তের ভঙ্গিতে আক্রামের কাঁধে চাপড় মারে, রুথ যখন বলছে, তুমি সব পারবে। পারতেই হবে, আমি নতুন কন্ট্র্যাক্ট লিখছি যে।

    এরপর শুরু হল আক্রামকে নাচ শেখানো। আক্রাম যত উপরে পা তোলে, ব্যালেরিনা রুথ চেঁচায় – ক্রাম, আরও উপরে। মনে করো বাতাসে রুথ ভাসছে, তাকে পা দিয়ে ছুঁয়ে দিতে হবে।
    সত্যিই নাচের তালে তালে মাথার উপরে ভাসে রুথ, আক্রাম পা তুলতে তুলতে ছাদ ফুঁড়ে বুড়ো আঙুল বের করে দেয়। তারপর সেই ভাসমান মেয়ে ধুপ করে নিচে পড়তে চায়, তাকে লুফে নিয়ে আক্রাম এক পায়ের উপর চরকি পাক খায়।

    এমনি তাদের নাচ শেখা চলতে থাকে। তাদের নাচের চাপে কাঠের মেঝেতে সুরমা নদীর মত ঢেউ খেলে। রুথ আর ক্রাম যদি নাচতে নাচতে ভাসতে চায়, ছাদের পাটাতনগুলো সরে গিয়ে আশমানের চাঁদোয়া ঘরের মধ্যে এনে ফেলে। কোন কোন রাতে নাচতে নাচতে দুজনে তারাভরা আকাশে ভেসে ভেসে গায়ে জ্যোৎস্না মাখে। রুথের হাত ধরে টেন্ডারলয়েনের সব অলিগলিতে নেচে বেড়ায় আক্রাম। কোনো কোনো দিনে তারা সমুদ্রতীরে বালিতে শুয়ে রোদ মাখে। এমনিভাবে একদিন তাদের দেখা হয়ে গেল পাঁচকড়ি মণ্ডলের সঙ্গে।

    প্যালেসে একই কাঠের ঘোড়ায় দু’জনে চেপে পাক মেরেছিল। জায়েন্ট হুইলে চেপে উঠে গেছিল অবসারভেটরিতে। সেইখান থেকে কত দূরদূর যে দেখা যাচ্ছিল। আক্রামের কাছে সবই নতুন। রুথের কাছে কিছুই আর পুরনো নয়। নোনা বাতাস, রোদের পরশ আর বালির আস্তরণ ঝুরঝুর করে গড়িয়ে পড়ছিল দুই ভিনদেশির শরীর ঘিরে। আঙুলে আঙুল জড়িয়ে বোর্ডওয়াকে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আক্রামের ডান হাত সজোরে চেপে ধরে রুথ, ক্রাম, ওই দ্যাখো। তোমার হিন্দু ফকিরের পোশাক।

    পাঁচকড়ি মণ্ডল তার পশরা সাজিয়ে বসেছিল প্যালেসের ধার ঘেঁষে, বোর্ডওয়াকের রাস্তায়। পাঁচকড়ির কাছে কত রকমের কাজ ছড়ানো। সে ক্রাম নামে লোকটির মধ্যে দেশোয়ালি গন্ধ খুঁজে পায়, কিন্তু সেদিকে মন না দিয়ে নিজের পশরা দেখাতে থাকে।
    এইটে হল জাইমাজ, দোয়া মাঙার জন্য এইখেনে বসে হিন্দুরা।
    ফকিরের আসন হবে বেশ, কি রঙ-বেরঙ। নেচে উঠল রুথের চোখ।
    এইযে, আর এটি হল বস্তানি, পুঁথি রাখার জন্য।
    আর ওই যে লাল আর কালোয় বিছানো রেশমি কাপড়টা? সেটা কি?
    এটাকে কয় বালিশ কাঁথা, দাঁত বের করে হাসল পাঁচকড়ি। এরে মাথায় রেখে শুলে একশ’ একখানা খোয়াব দেখবে পাক্কা।

    পাকা ব্যবসায়ী পাঁচকড়ি এরপর এগিয়ে দেয়, আর এইটা দেখো, এর নাম আরশিলতা। তোমার যত আতর আর সুগন্ধি আছে তার গন্ধ আগলে রাখার থলে।
    এইভাবে এক এক করে সে এগিয়ে দেয় খাট, কাঁথা, জিলাফ, দস্তরখান এমনি আরও কত রকমারি চিকনের সামগ্রী। যা দ্যাখে, তাই নিতে ইচ্ছা করে রুথের। কিন্তু হিন্দু ফকিরের আলখাল্লা কোথায়? ব্যাপারি, আমাকে একটা ফকিরের পোশাক দেখাও।
    এমন পোশাক তো নেই। এই কথা পাঁচকড়ির পেটে আসে, কিন্তু মুখে আসে না। বরং বলে, কেমন আলখাল্লা চাই মা জননী, আমি সেসব জোগাড় করে নে আসব’খন।

    রুথ তার কল্পনার ফকিরের পোশাকের বর্ণনা দেয়। তার নাচের পোশাকের মতই বাতাসে উড়বে সেই পোশাক। কখনো সেটা ফকিরের ডানা হবে, কখনো গায়ের ছাল। এমন আলখাল্লা যার জানালা থাকবে বন্ধ, কিন্তু দরজা থাকবে উন্মুক্ত। ফকিরের বুকের উদারতা ঢেকে দেবে না, তার শিশ্নের উষ্ণতা বরফে চাপা পড়বে না। পা উপরে ওঠাতে পারবে আকাশ ছুঁয়ে, হাত অবারিত থাকবে রুথকে কোলে নিয়ে চর্কিপাক দেওয়ার জন্য।

    এতসব বিন্যেস শুনে পাঁচকড়ি মাথা চুলকায়। তারপরে বলে, এই পোশাকের রঙ কি হবে? কমলা?
    না, রাতের অন্ধকারের মত। তার মধ্যে তারার মত ফুটে থাকবে পৃথিবীর সব রঙ।
    এখন কালো কাপড় পায় কোথায়, সেটা ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস করল, ইনিই কি সে ফকির?
    রুথ হ্যাঁ বলতেই, একগাল হাসে পাঁচকড়ি। তালে এনার মাপ নিয়ে নিই একবার। আপনে কি আমাদের দেশের লোক নাকি মশাই?
    আক্রাম মাথা নাড়ল।

    তাহলে একটা কথা বলি, আপনের কাছে লুকিয়ে কি লাভ। আমরা তো আলখাল্লা রাখি না। তবে উনি যেমন বলছেন, আমি কালো কাপড় কিনে আপনের মাপে আলখাল্লা বানিয়ে নানারঙের আরশিলতা সেলাই করে দিতে পারি। মন্দ হবে না দেখতে, পাঁচকড়ি মণ্ডল শুধু ব্যাচে না, হাতের কাজও বোঝে খানিক।
    ঠিক আছে পাঁচকড়িদাদা, তাই করো। সোৎসাহে সম্বন্ধ পাতায় আক্রাম। আমার নাম আক্রাম আলি, রুথের সঙ্গে নাচ করি।
    সে তো বড় ভাল কথা, আক্রাম ভাই। আমি সব কিছু নিজের হাতে বানিয়ে নিয়ে যাবো। রুথকে বলল, তবে এটা তো একদম বিশেষ করে বানানো। মজুরিটা কিছু বেশি পড়বে আজ্ঞে।

    সেদিন অনেক জিনিস কিনে ফিরল রুথ। কোথায় আলখাল্লা নিয়ে আসতে হবে তার হালহদিশ দিয়ে দিল পাঁচকড়িকে। রুথের প্রেমে যতই ডগোমগো হোক, নিজের দেশের সাথির খোঁজ পেয়ে আক্রামের মনের বল ভরসা যেন বাড়ল একটু।

     

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ৩০ অক্টোবর ২০২১ | ২৫৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ৩০ অক্টোবর ২০২১ ১১:৪৭500416
  • এই পর্ব  অপূর্ব
  • প্রতিভা | 2401:4900:3ee6:512a:0:62:4f0c:5901 | ০১ নভেম্বর ২০২১ ১০:৪৩500520
  • অসাধারণ! অসাধারণ! 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন