• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • নকশিকাঁথা (৭)

    বিশ্বদীপ চক্রবর্তী
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৮ আগস্ট ২০২১ | ৪৫৪ বার পঠিত
  • নকশিকাঁথা – উপন্যাসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বাঙালি অভিবাসী জীবনের না জানা সময়

    ১৮৯০ এর দশক। তখন আমেরিকা এক সন্ধিক্ষণে। কালো মানুষেরা সদ্যই স্বাধীন। কিন্তু আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে বিভিন্নভাবে তাদেরকে আবার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। অন্যদিকে শিল্প বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে এসে মধ্যবিত্ত সাদা মানুষের আমেরিকা নিজেদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য পেরিয়ে ধর্ম এবং সংস্কৃতির খোঁজ শুরু করেছে। বিবেকানন্দের আমেরিকা বিজয়, হিন্দু ধর্মের জন্য আমেরিকার কৌতূহল এবং পৃষ্ঠপোষকতার খবর আমাদের জানা আছে। কিন্তু এই আগ্রহ শুধু ধর্মের ক্ষেত্রে নয়। পণ্য এবং বিনোদনের জগতেও ছিল। তারই হাত ধরে এমনকি বিবেকানন্দ আসার আগেও আমেরিকায় এসে গেছিল চুঁচুড়া, তারকেশ্বর, চন্দনপুর, বাবনানের কিছু লোক তাদের চিকনের কাজের পসরা নিয়ে। হাজির হয়েছিল উত্তর আমেরিকার সমুদ্রতটে। ছড়িয়ে পড়েছিল আমেরিকার বিভিন্ন শহরে, সংসার পেতেছিল কালোদের সমাজের অংশ হয়ে। শুধু চিকনদারেরা নয়। শতাব্দীর শেষের দিকে বৃটিশ জাহাজ থেকে পালিয়ে নিউ ইয়র্কে নেবে যাচ্ছিল সিলেট, চট্টগ্রাম থেকে আসা মাঝি-মাল্লারাও। মধ্য আমেরিকার শিল্পাঞ্চলে কাজের অভাব ছিল না কোন।

    বড় অদ্ভুত এই সময়। একদিকে দ্রুত শিল্পের বিকাশ ঘটছে, দেশ বিদেশ থেকে মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে আমেরিকায়। আবার পাশাপাশি কালোদের উপর নিপীড়ন বাড়ছে, এশিয়া থেকে আসা অভিবাসীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে সব নিয়মকানুন। বাবনানের চিকনদার আলেফ আলি আর পাঁচকড়ি মণ্ডল, সিলেটের গোবিন্দ সারেং কি আক্রাম, বেদান্ত সোসাইটি গড়ে তুলতে আসা অভেদানন্দ - এমনি আরও অনেকের জীবন জড়িয়ে যাবে অনেক রঙের মানুষের দেশ আমেরিকার এক উথালপাথাল সময়ে, বুনবে নানা রঙের নকশিকাঁথা।




    গোবিন্দ সারেং তাজ্জব। ছেলেটা গেল কোথায়? দ্যাখ না দ্যাখ, একটা জোয়ানমদ্দ কর্পূরের মত উবে যায় কী ভাবে? এই তো এখুনি পাশে দাঁড়িয়েছিল। নাচ দেখছিল। দেখছিল মানে একেবারে চোখে কাঁঠালের আঠা লাগিয়ে দেখছিল। সেটাও ঠাহর করেছে গোবিন্দ। চোখ ছানাবড়া, পায়ে সওয়ারি ফেলা ঘোড়ার মত তাল ঠুকছে। নাচ দেখে যে তার শরীরে দরিয়ার উথালপাথাল উঠেছিল, তা আর বলে দিতে হয় না। কিন্তু সেসব ঠিক আছে। গোবিন্দর নয় দুকুড়ি বয়েস পেরিয়েছে। বিবিবাচ্চা ঘরে রেখে এসেছে। আক্রাম তাগড়া জোয়ান। শরীরে ক্ষিধে থাকাই তো ঠিক।

    এখন নাচ শেষ। সে গেলটা কোথায়? একবার যেন মনে হল আক্রামকে সোঁ করে প্রায় বাজপাখির মত উড়ে নাচের মঞ্চে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছিল। কিন্তু তাই বা কী করে হবে? গেলে তো সেখানে ঠাহর হত। ওই যে দুটো সাত হাত লম্বা নিগ্রো পাহারায় আছে, ওরা জামাই আদর করতো না এতক্ষণে? কই, কাউকে চোখেও পড়ল না। মেয়েগুলো যেমন যেমন মাথার উপর দিয়ে ঘাঘরা ঘুরিয়ে পেছনপানে চলে গেল, মঞ্চের সামনেটা রইল ফাঁকা।

    ভিড় কী জায়গাটায়! ল্যাটা মাছের মত লোক কিলবিল করছে। যারা ছিল সব কটাই মদ্যপ, নেশায় চুর। এত হল্লা জুড়েছে! আর খিস্তি খেউড়। সামনে যাওয়ার জন্য হাতাহাতি পর্যন্ত চলেছে। এত গণ্ডগোলে একটা লোককে হঠাৎ হারিয়ে ফেলা অসম্ভব নয় কিছু। নাচ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সবাই বেরিয়ে যাচ্ছে। খালি হলেই আক্রামের সুলুক পাবে সেই ভরসায় গোবিন্দ দাঁড়িয়ে রইল খানিক। কোথায় কী? সব শুনশান। কাজের মধ্যে ওই দুই মুশকো জোয়ান ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করতে চলে এলো। পরের শো শুরু হবে, লোক ঢুকবে। বাধ্য হয়ে গোবিন্দ বেচারা বেচারা মুখে বাইরে পা বাড়াল, জান পড়ে রইল ওখানেই।

    হে মার্কেটের বাইরে এসে দাঁড়াল গোবিন্দ সারেং। খানিক আগে আক্রামকে নিয়ে এই পথে হেঁটে এসেছে। কত আমোদ, কত রসের কথা। আর এখন! একলা না ভেকলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গোবিন্দ। এই বিদেশ বিভুঁয়ে ছেলেটাকে একলা ছেড়ে সে যাবে কোথায়? তাছাড়া সে যদি জাহাজে একা ফিরে যায়, কথা উঠবে না? চাই কী পুলিসেও খবর যাবে। লস্কর মাল্লারা মাঝে মাঝেই নিজেদের মধ্যে মারাপিট করে। জাহাজে তো হরদম হচ্ছে। কখনো জুয়া খেলে টাকার বাটোয়ারা নিয়ে, ডাঙ্গায় এলে মেয়ে নিয়েও হয়। এছাড়া নেহাতই নেশাভাং করে খুনোখুনি পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। সুতরাং নাচ দেখতে দেখতে আক্রাম উবে গেছে একথা বললে কেউ বিশ্বাস যাবে না।

    অন্ধকার নেমেছিল বেশ খানিকক্ষণ। কিন্তু ম্যানহাটানের রাস্তায় চাঁদের আলোর বান ডেকেছে। রাস্তার দুধারে গোল গোল বাতাবি লেবুর মত ইলেক্ট্রিকের আলো, খাম্বা থেকে ঝুলছে একটু বাদে বাদে। এবার জাহাজে কলকাতা ছাড়ার আগে হ্যারিসন রোডে এমনি আলো দেখেছে। কিন্তু সে যেন একটা দুটো, লোককে পথ দেখানর জন্য। এমন কী আগের বার যখন এই এলাকায় এসেছিল গোবিন্দ, সেও বছর তিনেক হল, এমন আলো দেখেছে হাতে গোনা। এখন রাস্তাজোড়া রোশনাই। আলোয় আলো। অন্য সময় হলে এই দেখে গোবিন্দ বিহ্বল হয়ে যেতে পারত। এখন আক্রাম সঙ্গে থাকলে সে বেচারার অবাক হওয়ার কোন সীমা থাকতো না। এই সাদা সাদা বাতাবি লেবুর মত আলোগুলোয় হে মার্কেট, বাকিংহাম প্যালেসের উপর কাকজ্যোৎস্নার ফিনিক। টেন্ডারলয়েন এখন এক মায়াপুরী। মায়াপুরীই বটে। এমন এক জলজ্যান্ত ছেলেকে কোন জিন এসে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল। কী কুক্ষণে যে শোর লিভ নিয়ে নেমেছিল! আর নামলই যদি তবে মরতে এমন অলুক্ষুনে জায়গায় কেন পা রাখল! পথের ধারে দাঁড়িয়ে নিজেকে এমনি কষছিল গোবিন্দ সারেং।

    তখন যদি পথ চলতি কেউ গোবিন্দর দিকে ফিরেও তাকাত, দেখত একটা ভিনদেশি লোক, যার পোশাকআশাকে না আছে ছিরি, না আছে ছাঁদ; পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভ্যাবলার মত এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর নিজের হাতের মুঠিতে মাথা ঠুকছে। কিন্তু ম্যানহাটানের এই স্বর্গপুরীতে লোকে উর্বশীর নাচ দেখতে আসে, জুয়ার বাজিতে পৃথিবী মুঠোয় চায় কিংবা সুরা পান করে ফুর্তি মানায়। গোবিন্দর মত একটি অতি সাধারণ লস্কর দিক নিশানার খোঁজে পথের মাখখানে দাঁড়িয়ে থাকলে তাদের বয়েই গেছে। সন্ধে হতেই ভিড় আরো বেড়ে গিয়েছিল। পিলপিল করে লোক নামছে সেভেন্থ অ্যাভেনিউয়ের রেল স্টেশনে আর ব্রিজ ধরে নেমে এসে জুটে যাচ্ছে আমোদে। কার সময় আছে অন্য লোকের রেয়াত করার?

    মাথায় একরাশ চিন্তার বোঝা নিয়ে বিভ্রান্তের মত কতক্ষণ যে এমন হেঁটেছিল গোবিন্দ জানে না। হঠাৎ হেঁইও বলে এক চিৎকার আর পিঠে ছপটির বাড়ি খেয়ে পথের ধারে ছিটকে পড়ল গোবিন্দ। তাকে মাটিতে ফেলে রেখে আট ঘোড়ার বাগি টগবগিয়ে চলে গেল। পিছনে বসে থাকা গাড়োয়ানটা তার হাল দেখে হেসে কুটোপাটি।

    কিন্তু সেদিকে খেয়াল ছিল না গোবিন্দর। মাটিতে ছিটকে পড়ে মাথাটা ঠুকে গিয়েছিল পথের ধারের ল্যাম্পপোস্টের খুঁটিতে। মাথাটা ঝনঝন করে উঠেছিল, রক্তও ঝরছিল বেশ। জাহাজের লস্করের জান অনেক কড়া হয়। তাই এই বেদনা এমন কিছু জোরালো নয় তার জন্য। কিন্তু মনের জোর চলে গেলে পথের ধারে পড়ে থাকতেও বেশ লাগে। টেন্ডারলয়েনের রাস্তায় নেশাভাং করে এমন পড়ে থাকে অনেক লোক, তাই ছবিটা এমন কিছু নতুন নয়। কিন্তু অন্য দিকের ফুটপাথ থেকে পথচলতি এক নিগ্রো মহিলা দেখেছিল গোবিন্দর ছিটকে পড়ে যাওয়া। বিশাল তার চেহারা, মাথায় দুদিকে পেতে আঁচড়ানো কোঁকরা কালো চুলে সাদার ছোপ বয়েসটাও যে কম নয় সেটা বুঝিয়ে দেয়। তার বিশাল গোল চেহারার জন্যও বটে, হাতের ঢাউসব্যাগ জিনিশ ভর্তি থাকার সুবাদেও, রাস্তা পার হয়ে গোবিন্দ অবধি এসে পৌঁছাতে তার অনেকটা সময় লাগল। গোবিন্দ তখনো চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে। সে নিগ্রো মহিলা এতই লম্বা যে ঝুঁকে পড়লেও তার মাথা গোবিন্দর থেকে সাত হাত উঁচুতে। চেহারা যেমন বিশাল, গলা তার তেমনি সরু। যেন শরীরের ভেতর থেকে শব্দ বেরিয়ে আসার জায়গা পাচ্ছে না। তাই সে যখন ‘Hey man, you gittin up?’ বলে হাঁকাহাঁকি করছে, গোবিন্দর কাছ থেকে তেমন সাড়া শব্দ বের করতে পারে নি। তার ওই চেহারার জন্য মাটিতে উবু হয়ে বসার চেষ্টা করাও বৃথা। দুচারবার ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে নাছোড়বান্দা মহিলা তার হাতের পোঁটলাটাই উলটে দিল গোবিন্দর মাথায়। তার ভিতরে ছিল হরেক রকম ছোট বড় টিনের বাক্স। সব ঝনঝন করে গোবিন্দর চারপাশে গড়িয়ে পড়ল। যদি গোবিন্দ কোন ঘোরের মধ্যে থাকে সে এবার থতমত খেয়ে উঠে বসতেই মহিলা নিজের বুকে ক্রস এঁকে একবার জেসাসকে ধন্যবাদ দিয়ে নিল। তারপর একমুখ হেসে বলল ‘I sees you fallin’ and talks to god. Saves the littil man!’

    তার তুলনায় গোবিন্দ নিশ্চয় লিটিল, কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু গোবিন্দর জন্য এই মহিলা ফেরেস্তা। গোবিন্দ সব টিনের বাক্স গুছিয়ে জড়ো করতে করতে নিজের পেটের কথা, মনের কথা হুড়হুড়িয়ে বলে ফেলল। আক্রামের হারিয়ে যাওয়ার কথায় সে মহিলা খুব একচোট হাসল। তার রিনরিনে গলার হাসি পাহাড়ের গা ফেটে ঝর্ণাধারার মত বিস্ময়কর। অত ভেবো না কো, এমন কত লোক এই চত্বরে এসে হারিয়ে যায়, হুরী পরীদের ছেড়ে তাদের আর বাইরের জগতে ফিরতে ভালই লাগে না। সে সেয়ানা ছেলে! তার খোঁজ ছেড়ে তুমি বরং তোমার জায়াজে ফেরত যাও গে। কথা বলতে বলতেই সে মহিলা নিজের রুমাল নিয়ে গোবিন্দর রক্ত মাখা মাথায় ফেট্টি বেঁধে দিচ্ছিল।

    গোবিন্দর মন মানে না, আক্রামকে না নিয়ে সে ফিরবে কেমন করে? তার গাঁয়ের ছেলে। এই টেন্ডারলয়েনে এসে যদি কোন জিনের খপ্পরে পড়ে থাকে তাকে বাঁচিয়ে ফেরত নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তো তারই। নাহলে গাঁয়ে ফিরে আক্রামের আব্বুর সামনে সে দাঁড়াবে কোন মুখে? বুড়ো আসলাম খানের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল গোবিন্দর। এগু কিতা করিলা গোবিন? ভরসা করি ছাওয়ালডারে তের লাগু ছাইর‍্যা দিলাম, তারে কোন দরিয়ায় ভাসাইয়া দিলা নু? শুধু আসলাম মিয়া নয়। গাঁও গেরামে কোথাও মুখ দেখাতে পারবে গোবিন্দ সারেং? সে তার মনে জানে আক্রামকে না নিয়ে ফিরতে পারলে দরিয়া থেকে দরিয়ায় ভেসে বেড়াতে হবে তাকে, নিজের বাঁধা ঘাটে আর লাগতে পারবে না এই জীবনে।
    কী হল? মুখে কথা নেই কেন? হাঁটতে পারছ না? খুব উদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞেস করল সে নিগ্রো মহিলা।

    যাওয়ার জায়গা নেই গো আমার মা জননী। সত্যি সত্যি সেটাই মনে হচ্ছিল গোবিন্দর। এতদিনের পোড় খাওয়া জাহাজি সে। সামনে থেকে অনেক লোকের মরণ সে দেখেছে। সে আরেক রকম। জাহাজে ঝড় ঝঞ্ঝা হয়। কত দেশ ঘোরে তারা, মরণ অসুখ বাঁধিয়ে বসে। পরিবার যখন চোখের জলে বিদেয় করে, আবার দেখা হবে কিনা সে কথা যে যায় সে জানে না, যে পিছনে পড়ে শুধু আল্লার দোয়া চায় তারও জানা থাকে না। তাই বলে মেয়েছেলে নিয়ে ফুর্তি করতে এসে জলজ্যান্ত ছেলে হাফিস হয়ে যাওয়া? আসলাম খান যদি বলে, আমার পোলাডারে মাটি দিছো নু গোবিন? তফন চড়াইছু নি উয়ারে? কী বলবে গোবিন্দ?
    না, আক্রামকে ছেড়ে সে একা জাহাজে ফিরতে পারবে না।
    তাহলে তুমি যাবে কোথায়? কাউকে চেনো এই শহরে?

    ঘনঘন মাথা নাড়ল গোবিন্দ। তার পোড়খাওয়া তামাটে মুখের ভাঁজ বুকে গুমড়ানো কথাগুলোর জানান দেয়। জাহাজের আগুন ঠেলতে ঠেলতে হলুদ হয়ে যাওয়া চোখ ইতিউতি চায়। বেলচা ঠেলে কড়া পড়ে যাওয়া হাতের মোটা মোটা আঙ্গুলগুলো মাথা চাপড়ানো ছাড়া আর কিছুই যেন করতে চায় না। গোবিন্দর মনে হল বিদেশ বিভুঁয়ে এই নিগ্রো মেয়েই বুঝি তার মা হয়ে এসেছে, সে একেবারে পায়ে লুটিয়ে পড়ল।
    আরে আরে করো কী? যদি যাওয়ার কোন ঠাঁই না থাকে, আজ রাতে আমি থাকতে দিচ্চি তুমায়। কাল কোথাও জায়গা খুঁজে নেও বাপু। নাইলে জায়াজে ফিরতি যেও তকন।
    আমি ফিরতে পারব না সেখানে। আবার না ফিরলে ওরা ঠিক খুঁজতে বেরোবে আমাকে। জাহাজ ঘাট ছেড়ে বেরনো অবধি আমাকে একটা থাকার জায়গা দাও মা জননী।



    সাদা দাঁত বের করে হাসল সে। দ্যাখো, কেমন ঠিক জায়গায় এসে পড়েচো। আমার নাম টোনিয়া। টোনিয়া জনসনের বোর্ডিং হাউস আচে একখান। কিন্তু বাপু, সে কেবল মেয়েদের ঠাঁই। তোমাকে আমি সেখেনে কদিন নুকিয়ে থাকতে দিতে পারি, কিন্তু তারপরে নিজের জায়গা খুঁজে নে বেইরে যাবে সেটি যেন মনে থাকে। বলে দিলাম একন থেকে।

    এ যেন মেঘ না চাইতেই পানি। গোবিন্দ তার পাতলুনের জেব থেকে পড়ে থাকা ডলারের দুমড়ানো নোট বের করে কটা।

    থাক থাক, এখন তোমার নিজের কাজেই টাকা লাগবে । কিন্তু শোন, আমার ওখেনে আর দশটা ছুঁড়ি থাকে, তুমি যেন একটু সামাল দিয়ে থেকো। সেটা আগে থেকে জানিয়ে দিলাম। ওখেনে কোন গোল হলে ঘাড় ধইরে বের কইরে দেবো।

    বোঝা গেল টোনিয়ার গলা যতই বাচ্চা মেয়ের মত রিনরিনে হোক, সে নিজেও অনেক ঘাটের জল খাওয়া মানুষ। ম্যানহাটনে বোর্ডিং হাউজ খুলে বসেছে, নিগ্রো হলেও সে হেলাফেলার লোক নয়। তার আশ্রয়ে আরও পাঁচজনা থাকে, তাদের দেখভাল করার দায়িত্ব টোনিয়ার মাথায়। যেসব মেয়ে থাকে তার বোর্ডিং হাউজে তারাও যে সব ধোয়া তুলসী পাতা সেরকম তো নয়। কিন্তু তারা বাইরে যা করে করুক, নিজের চত্বরে সে কোন ঝামেলা ঢুকাবে না।

    টোনিয়ার পিছু পিছু গোবিন্দ সারেং চলল। বেশি দূরে নয়, সেভেন্থ অ্যাভেনিউতে একটা দোতলা কাঠের বাড়ি। বাইরের দরজার মুখে বোর্ড লাগান – টোনিয়াজ বোর্ডিং হাউজ। তাই বলে এমন কিছু জাঁদরেল বাড়ি নয়, তবে শক্ত পোক্ত। কাঠের দেওয়ালে হলুদ আর বাদামি রঙের পোঁচ খুব পুরনো নয়। বাড়ির একপাশ দিয়ে কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। সেখানে সারি সারি ঘর, একেক তলায় পাঁচ ছটা করে হবে। বেশ কটা ঘরে আলো জ্বলছে, আবার দুই একখানা অন্ধকার। দোতলায় ঘরগুলোর সামনে দিয়ে টানা বারান্দা চলে গেছে, বারান্দার রেলিংয়ের মাঝখানের একটা পাট ভাঙা, ঝুলছে। সেদিকে দেখিয়ে টোনিয়া হাসল, দেকেচো ওখেনটা কেমন আড় হয়ে ঝুলচে? অর্থপূর্ণ হাসি হেসে তাকাল গোবিন্দর দিকে।

    গোবিন্দ কীভাবে জানবে। নিজের বাড়ি ভাঙায় ওর হাসি কেন পাচ্ছে সেটাও বোধগম্য নয়।

    ওখেনে যে ঘরের দরজাটা দেকচো, সেই ঘরে থাকতো ক্যাটো। অনেকটা বাপের রং পেয়েচিল, মাথার কোঁকড়া চুল না থাকলে নিগ্রো বলে ঠাহর করা মুশকিল। সে মেয়ের পিছুতে ঘুরঘুর করত হরেক লোক। তা ঘুরুক, শুক আমার কি। কিন্তু টোনিয়ার বাড়িতে সেসব হবে না কো। গত বিশ্যুতবার রাত্রে আওয়াজ শুনে যেয়ে দেকি কোন সে এক মুশকো জোয়ান ক্যাটোর ঘরে। আমাকে দেখেই সে মরাটা ঝড়ের বেগে ঘর থে পেলিয়ে রেলিং টপকে নিচে ঝাঁপ মেরেচে। খুব একচোট হাসল টোনিয়া।

    সে এমন লাফাল যে তোমার বাড়িই ভেঙে পড়ল? গোবিন্দর কথার মধ্যেই ছিল ভাবটা যে কে জানে কত বছরের পুরনো তোমার ঘর বাড়ি। বাইরে রং চড়িয়ে কলি ফিরিয়েছে হয়তো। টোনিয়ার শান্ত মাতৃসমা মুখ নিমেষে দপদপিয়ে জ্বলে উঠল।
    O’ that man! Big black prancing tomcat of a nigger! Can’t nobody escape Tonia, I grabs him some day.
    বোঝা গেল প্রয়োজনে হাতাহাতি করতেও পিছপা নয় টোনিয়া। আর লোকটাকে যে ছাড়বে না সেটা ভেবে খুশি হয়ে আবার হাসিতে ফিরে গেল টোনিয়া। যে মুশকো চেয়ারা ছিল, নিচের চাতালটা চোট খায়নি কো, সেই ভাগ্যি মানি। বেচারা যাওয়ার বেলা পাতলুন অবধি পড়ার সুযোগ পায়নি কো। তোমার কপাল ভাল। ক্যাটোর ঘরটাও ফাঁকা, সঙ্গে ওই লোকটার শার্ট আর পাতলুন মাগনা পেলে।
    কেন ক্যাটো আর থাকচে না?
    বললাম না, টোনিয়ার উপর কোন জারিজুরি খাটবে নি কো। এখেনে থেকে আমি ব্যবসা করতে দেবো নি, আমার বোর্ডিং হাউজের একটা নাম আচে। এখেনে চারদিকে ঘরে ঘরে এই ফিকির চলে, কিন্তু টোনিয়ার বাড়িতে কক্ষনো নয় কো।

    অতএব ক্যাটোর ঘরে গোবিন্দর ঠাঁই হল। ওকে ঘরে ঢুকিয়ে টোনিয়া পাশের ঘরের মেয়েটাকে ডেকে আনল। সে মেয়ের নাম আফ্রিকা।

    দ্যাখো গোবিন, তুমি তো এখন কদিন বাইরে বেরোবে নি। আফ্রিকা এখেনে তোমার জন্যি দিনে তিনবেলা খাবার এনে দেবে খন। আমি ওকে বলে দিয়েচি। এই ঘর বাইরে থেকে যেমন তালা দেওয়া ছেল তেমনটিই থাকবে। আফ্রিকা এসে তালা খুলে তোমাকে দে যাবে।

    আফ্রিকা বেশ সরু চোখে মাপছিল গোবিন্দকে। তার গায়ের রং কালচে নীল, মাথার চুলে ছোট ছোট বিনুনি। চেহারা তার যেমন ধারাল, ছড়ানো সুপুষ্ট ঠোটের থেকে ঝরে পড়া কথার ধার কিছু কম নয়।
    You Tonia thros Cato out one day, next day you git a man in the room.
    Nobody never fucks a man in Tonia’s house. Africa wants gitting out with Cato? ফুঁসে উঠল টোনিয়া। বাড়িটা তার, সে কৈফিয়ত দেবে না আফ্রিকার কাছে।
    ক্যাটো আফ্রিকার বন্ধু ছিল, কিন্তু আর ঘাঁটাতে চাইল না টোনিয়াকে। I ain’t never said nothin’ like that. মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল সে মেয়ে।

    ওদের পিছন পিছন ঢুকে ঘরে উঁকি মেরে দেখল গোবিন্দ। ঘর তেমনি অবস্থায় পড়ে আছে। বিছানার একধারে মেঝেতে সেই প্যান্টালুন, জামা, একটা মেয়েলি রাত পোশাক টোপর করে রাখা। বিছানার চাদর একধারে ঝুলছে। বোঝা গেল ঘটনাটি সদ্য ঘটেছে, সে মেয়ে চলে যাওয়ার পর কেউ এই ঘরে আর ঢোকেও নি। ক্যাটো সেই মেয়ের পোশাক, দেরাজে পড়ে থাকা টুকিটাকি জিনিস তুলে নিল। টোনিয়ার কথায় লোকটার ছেড়ে যাওয়া জামা কাপড় পড়ে রইল গোবিন্দর জন্য। কিন্তু সেসব পরবার কোন চেষ্টা করেনি গোবিন্দ। এরা বেরিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করতেই সে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল। কত দিন বাদে দুলুনি ছাড়া কোন বিছানায় শুয়েছে গোবিন্দ। আক্রামের কথা আর মনেও রইল না তার, এক মুহূর্তে সে ঘুমিয়ে কাদা।


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৮ আগস্ট ২০২১ | ৪৫৪ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন