ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • নকশিকাঁথা (২৯)

    বিশ্বদীপ চক্রবর্তী
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ২৪১ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • নকশিকাঁথা – উপন্যাসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বাঙালি অভিবাসী জীবনের না জানা সময়


    ১৮৯০ এর দশক। তখন আমেরিকা এক সন্ধিক্ষণে। কালো মানুষেরা সদ্যই স্বাধীন। কিন্তু আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে বিভিন্নভাবে তাদেরকে আবার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। অন্যদিকে শিল্প বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে এসে মধ্যবিত্ত সাদা মানুষের আমেরিকা নিজেদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য পেরিয়ে ধর্ম এবং সংস্কৃতির খোঁজ শুরু করেছে। বিবেকানন্দের আমেরিকা বিজয়, হিন্দু ধর্মের জন্য আমেরিকার কৌতূহল এবং পৃষ্ঠপোষকতার খবর আমাদের জানা আছে। কিন্তু এই আগ্রহ শুধু ধর্মের ক্ষেত্রে নয়। পণ্য এবং বিনোদনের জগতেও ছিল। তারই হাত ধরে এমনকি বিবেকানন্দ আসার আগেও আমেরিকায় এসে গেছিল চুঁচুড়া, তারকেশ্বর, চন্দনপুর, বাবনানের কিছু লোক তাদের চিকনের কাজের পসরা নিয়ে। হাজির হয়েছিল উত্তর আমেরিকার সমুদ্রতটে। ছড়িয়ে পড়েছিল আমেরিকার বিভিন্ন শহরে, সংসার পেতেছিল কালোদের সমাজের অংশ হয়ে। শুধু চিকনদারেরা নয়। শতাব্দীর শেষের দিকে বৃটিশ জাহাজ থেকে পালিয়ে নিউ ইয়র্কে নেবে যাচ্ছিল সিলেট, চট্টগ্রাম থেকে আসা মাঝি-মাল্লারাও। মধ্য আমেরিকার শিল্পাঞ্চলে কাজের অভাব ছিল না কোন।


    বড় অদ্ভুত এই সময়। একদিকে দ্রুত শিল্পের বিকাশ ঘটছে, দেশ বিদেশ থেকে মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে আমেরিকায়। আবার পাশাপাশি কালোদের উপর নিপীড়ন বাড়ছে, এশিয়া থেকে আসা অভিবাসীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে সব নিয়মকানুন। বাবনানের চিকনদার আলেফ আলি আর পাঁচকড়ি মণ্ডল, সিলেটের গোবিন্দ সারেং কি আক্রাম, বেদান্ত সোসাইটি গড়ে তুলতে আসা অভেদানন্দ - এমনি আরও অনেকের জীবন জড়িয়ে যাবে অনেক রঙের মানুষের দেশ আমেরিকার এক উথালপাথাল সময়ে, বুনবে নানা রঙের নকশিকাঁথা।

    ২৯



    মেলেনির ঘুম ভেঙে গেল।
    মেলেনি কোনো একটা স্বপ্নে ভাসছিল। অথবা স্বপ্নের রেণু গুনগুন করছিল মেলেনির ঘুমে। হঠাৎ কোনো গোঙানির শব্দে চটকা ভাঙতেই, স্বপ্নটা টুকরো টুকরো হয়ে কোন অন্ধকারের কোটরে ঢুকে পড়ল, বিছানায় জবুথবু হয়ে উঠে বসা মেলেনি মনে করতে পারল না আর। পোশাক ঘামে ভিজে গেছে, হয়তো কোনো দুঃস্বপ্ন। সেটা মনে করে তার বুক কেঁপে উঠল। কেইশার বাচ্চা হবে যে কোনো দিন। ইনোসেন্টের বউ কেইশা। ওর কিছু খারাপ যেন না দেখে থাকে স্বপ্নে। গোঙানির শব্দ কি ও-ই করেছে?
    এখন আবার বাতাসে নিস্তব্ধতা, পাতার চুপিসাড় শব্দ ছাড়া কোথাও কোনো হেলদোল নেই।

    গত বছরের ঝড় ঘরের চালের দু’-চার জায়গায় ক্ষতচিহ্ন রেখে গেছে, সেখান দিয়ে ফটফটে চাঁদের আলো ঢুকে পড়ে মেঝেতে তুলোর ওড়াউড়ি চলছে। সেই ছায়া বাঁচিয়ে আলগোছে পা রেখে দরজা খুলে বাইরে উঁকি দিল মেলেনি। দরজা খুললেই পথের দু’পাশে সার সার বাড়ি। ছোট, কাছাকাছি জড়াজড়ি করে থাকার মত একে অপরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। চাঁদের আলো সব বাড়ির ক্ষত ঢেকে দিয়েছে, নিবিড় শান্তি বাসা বেঁধেছে পাড়ার আনাচে-কানাচে।

    বেশ কয়েক মাস হল মাউন্ট বাউ এসেছে মেলেনি। এর আগেও ইনোসেন্ট আসতে বলেছে। কতবার। একেবারে, বরাবরের মত। তাদের নিতে নিউ অরলিন্স অবধিও এসেছিল, মেলেনি ফিরিয়ে দিয়েছে। শহর ছেড়ে, মেয়েকে ফেলে, আসতে মন চায়নি। অ্যাবিয়েল নাছোড়, সে আসবে না শহরের জীবন ছেড়ে। দোষ নেই, ওর জন্ম যে শহরেই। কাপাস তুলোর আবাদে তো জন্মায়নি মেয়ে। কালো মাটির আকর্ষণ থাকার কথা নয়।

    মাউন্ট বাউ নিয়ে শুনেছে অনেক কথা আগেও। ইশাইয়া মন্টোগোমারির নাম তাদের কে না জানে। সাতাশি সনে মিসিসিপির এই জলাজঙ্গলে কালোদের বসতি গড়ে তুলতে এসেছিল সে’ লোক। চারদিকে ঘন জঙ্গল, জলা। এইসব জঙ্গল সাফ করে বসতি গড়তে হবে। ইশাইয়া জায়গায় জায়গায় ঘুরে কালোদের আসার জন্য ডাক দিত। নিজের বউ জশুয়াকে নিয়ে শুরুতেই চলে এসেছিল ইশাইয়া। সঙ্গে আরও কিছু পরিজন।

    হঠাৎ করেই এই সুযোগটা এসেছিল ইশাইয়ার কাছে। লুইভিল-নিউ অরলিন্স-টেক্সাস রেলরোডের হয়ে জমির দালালি করত। রেল কোম্পানি যাত্রীবাহী ট্রেন চালাবে মিসিসিপি বদ্বীপের বুক ফুঁড়ে, যার বেশিটাই জলাজঙ্গল। তাদের চাই পথের দু’পাশে ছোট-বড় শহর। সাদারা এসে বসতি বানাচ্ছিল এদিক-ওদিক। বলিভার কাউন্টির পিছন দিককার নিচু জমি ইশাইয়ার হাতে এসে গেছিল, সস্তায় পেয়ে কিনে নেয়। কিন্তু শুধু জমি কিনলেই তো চলে না, একটা শহর বসাতে গেলে লোকবল চাই।

    তার একটা স্বপ্ন ছিল। শুধু নিগ্রোদের নিয়ে একটা শহর গড়ার স্বপ্ন। যেখানে কালোদের জীবন নিজেদের হাতে থাকবে, তাদের পথ চলতে গিয়ে সাদাদের হামলার মুখে পড়তে হবে না। নিজেদের জমি থাকবে, ব্যবসা থাকবে, বাচ্চাদের জন্য স্কুল, চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, দাঁতের ডাক্তার – এরকম এক বিশাল ছক তার মাথায়। এক উন্মুক্ত জীবনের হাতছানি। এই কথা মুখে নিয়ে লোক জড়ো করতে বেরিয়ে গেছিল ইশাইয়া। নিজে, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-পরিজন তো এনেইছিল, আরও যারা আসতে চায়। সদ্য স্বাধীন হওয়া নিগ্রোদের কেউ কেউ এসে গেছিল। ধীরে ধীরে একশ’, দুশ’, চারশ’ ঘর বসে গেছিল এই নতুন শহর মাউন্ট বাউতে।

    বড় কঠিন দিন সেসব। বসতযোগ্য ছিল না জায়গাটা। তবেই না সেটা কালোদের হাতে এসেছে। বড় বড় সাইপ্রাস, চ্যাম্পিয়ন, পায়ে চলার জায়গা না ছেড়ে দাঁড়িয়ে, ডালপালা জড়িয়ে নিবিড় জঙ্গল। জলাজমিতে ক্যাটটেইল, কাঁটাধর জলগোলাপ মাকড়সার জালের মত থিকথিক করছে। আর আছে সাপ। র‍্যাট্‌ল্‌ স্নেক, কপারহেড। কখন পায়ে জড়িয়ে মরণ ডেকে আনবে কেউ জানে না। আর ছিল কালো ভালুক। একা পেলে ছিঁড়েখুঁড়ে রেখে দেবে। তার মধ্যে একদল কালো মানুষ দিনরাত এক করে গাছ কেটে, চেরাই করে মাথায় করে নিয়ে এসেছে। এক গলা জলে দাঁড়িয়ে জলা সাফাই করেছে। জল ছেঁচে মাটি বোঝাই করে জমি বানিয়েছে। দিনভর তাদের কাজের গান ভেসে বেড়াত মাউন্ট বাউয়ের বাতাসে। ইশাইয়া তাদের মনে স্বপ্ন ভরে দিতে পেরেছিল।

    নিজেদের জমি, নিজেদের শহর – যেখানে মাথার উপর ছড়ি ঘোরানোর জন্য কোনো সাদা লোক মজুত নেই, আসতে চাও না এমন একটা জায়গায়? যেখানে বাঁচার জন্য সারাক্ষণ বুকে পাথর নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয় না, সাদা মেয়েদের দিকে চোখ তুলে চাইলে বেঘোরে মারা যাওয়ার কোন ভয় নেই। চাও না এমন একটা পিঠসোজা করা শান্তির জীবন? এভাবেই বলত ইশাইয়া। তার কথায় আগুনের ফুলকি থাকত, মুখে মুখে ছড়িয়ে যেত রঙমশাল।

    এসেছিল অনেকেই, আবার অনেকেই আসেনি। সবাই তার কথায় গলে যায়নি, এটা সত্যি। মাসের পর মাস গাছ কেটে, জলা বুজিয়ে, একটা শহর গড়ে তোলায় হিম্মত লাগে। মনের জোর। আর ভিতর থেকে আসা কোনো তাগিদ। চারদিকে রেলরোড গড়ে উঠছে, সেখানে মেলা কাজ। সেসব ছেড়ে কেন আসবে এই বাদাবনে? অনেকের মুখে এমন কথাও ছিল। গুডম্যান পরিবারেও কোনো সাড়া জাগেনি। বাপের মত ইনোসেন্টও জুটে গেছিল রেলরোডের কাজে। পয়সা পেত ঠিকঠাক। বাপ আর ছেলে শুধু নয়, মেলেনিও আসতে চায়নি।

    কিন্তু রেল রোডের সাহেবের সঙ্গে বচসা হল একদিন। সেই ঘটনা আরও গড়াতে পারত, নিগ্রোদের মরে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট কায়দাকানুনের প্রয়োজন কোনোদিনই ছিল না। ক’দিন লুকিয়ে রইল ইনোসেন্ট। তারপর একদিন ধুত্তোর বলে পাড়ি দিল এই শহরে। তখনও নামেই শহর, এমনিতে সদ্য বনকাটা ধু-ধু প্রান্তর, এখানে-ওখানে কাটা গাছের গুঁড়ি মাথা উঁচিয়ে আছে। সেসব পেরিয়ে, সাফ-না-হওয়া জলাজঙ্গল। বেঁচে থাকার সংগ্রাম ছিল রোজকার। আসেনি মেলেনি, মেয়ে অ্যাবিয়েলকে নিয়ে ট্রেমেই থেকে গেছে। শহরের টান বড় কড়া।

    এতকাল বাদে তবে এসেছে। ইনোসেন্ট আসার পাক্কা পাঁচবছর পার করে। ছেলে নিজের জমি পেয়েছে, ঘর তুলেছে, বিয়েও করেছে। সব এখানে। এতদিনে এসে পৌঁছাল মেলেনি। দেখার জন্য, ক’দিন থাকার জন্যেও। দেখতে দেখতে বেশ কয়েক মাস গড়িয়ে গেছে, শিকড় চারাতে শুরু করেছে কেমন একটা। দোটানায় ফেলছে। বুঝতে পারছে মেলেনি। এই বয়সে এসে একটা নিজের জায়গা, জমির স্বাদ পাচ্ছে। ছেলের সঙ্গে আবাদেও যায়। কোনো এক যুগে সাদা মালিকের জমিতে গতর কম খাটায়নি। নিজের জমিতে নিজের তুলো ফলানোর নেশা লেগে যাচ্ছে মেলেনির বুড়ো হাড়ে।

    আজ এমন দুধপুকুর-জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া শহরের সারি সারি বাড়িগুলোর মধ্যে চুপ করে বসে থাকা শান্তি খুঁজে পাচ্ছিল মেলেনি। আধো অন্ধকারে নরম পায়ে উঠোনে নেমে এসেছিল। মনে হচ্ছিল, ঘুম থেকে উঠে আবার এক মায়াবী স্বপ্নের জগতে ঢুকে পড়েছে। কতটা সময় এভাবে গেছিল জানে না, ইনোসেন্টের গলার আওয়াজে চমক ভাঙল।
    “You hearin’ that mother?”
    আবার করে ঘুমের থেকে জেগে উঠল যেন, আর সঙ্গে সঙ্গে কানে গেল কেইশার গলা। একটা সুর, মাঝে মাঝে গভীর গোঙানির শব্দ।
    আজকেই? সময় কি হয়েছে? আমি কি আসব?
    হ্যাঁ, বলতে বলতে গলা কেঁপে উঠল ইনোসেন্টের।

    মেলেনি আগেও অনেক মেয়ের সঙ্গে জন্ম প্রদক্ষিণ করেছে। বাচ্চার জন্ম দেওয়াটা তার কাছে অত জটিল মনে হয়নি কখনো। ধাই মা হওয়ার জন্য কী লাগে? ঠান্ডা মাথা আর কিছু সাধারণ জ্ঞান। প্ল্যান্টেশানে থাকার সময় পোয়াতি মেয়েদের হ্যাপা তো কিছু কম সামলায়নি মেলেনি। একটি প্রাণ মায়ের পেটে শূন্যে ঝুলে থাকে – ঠিক যেমন পাকা আপেল। একসময় ঝুঁকে থাকা গাছের ডাল থেকে টুপ করে মাটিতে খসে পড়ে, বাচ্চাও তেমনি।

    হাতে-কলমে জানার সেই জোর বুকে নিয়ে, পিঠ সোজা করে, মেলেনি এগিয়ে গেল কেইশার ঘরের দিকে। সে জানে, বিচলিত ইনোসেন্টের ত্রস্ত চোখ তার পিঠে এঁটুলির মত আটকে আছে। প্রথম বাপ হওয়া কম পুরুষ দেখেনি মেলেনি। এ আবার নিজের ছেলে। এই সময় এদেরকে ব্যস্ত করে রাখতে হয়। তাই যেতে যেতে থমকে দাঁড়াল মেলেনি। ইনোসেন্ট, যা দেখি বাপ, একটা বড় হাঁড়িতে করে গরম জল কর। আর আগুন জ্বালতে হবে উঠোনে, তার জন্য কাঠ চিরে সাজিয়ে রাখ।

    যতক্ষণ বাচ্চা না হচ্ছে, এইরকম কাজে ভুলিয়ে রাখতে হবে ছেলেকে। মেলেনির ঠোঁট চিরে হাসিটা শেষ রাতের চাঁদের মত একবার ভেসে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল।
    কেইশা নিজের ঘরে হেঁটে বেড়াচ্ছিল – গলায় সুর ভাঁজতে ভাঁজতে – মাঝেমাঝেই যা গোঙানিতে মিশে যাচ্ছিল। বেশ লম্বা মেয়েটা। এক মাথা কোঁকড়া চুল। গাঢ় বাদামী শরীর তেল চকচকে, ঘরের স্তিমিত আলো চলকে যাচ্ছিল গাল, ঠোঁট বেয়ে। মেলেনি ঘরে ঢুকতে ক্লান্ত চোখ তুলে তাকাল মেয়েটা, ঠোঁটের কোণে ফিকে হাসি। আশা আর ভয় মেশানো ছিল সে হাসিতে। পেটটা সামনে ঝুলে পড়েছে, ঠান্ডা। হাত দিয়ে ছুঁয়ে নড়াচড়া টের পেল মেলেনি।
    আসছে? ফিসফিস করে জানতে চাইল কেইশা।

    মেলেনি ওর ঘামে ভেজা হাত নিজের মুঠিতে নিয়ে নিল। এখনো সময় আছে। কেইশার শরীরে উত্তেজনা টের পাচ্ছিল মেলেনি, ঘামে পিচ্ছিল হয়ে আছে তার ত্বক।
    চলো তোমাকে তৈরি করিয়ে দিই। হাত ধরে কেইশাকে বিছানায় এনে বসাল মেলেনি। যত্ন করে চুল আঁচড়িয়ে দিল মেয়ের, চুলে আঙুল ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে নারকেল তেল দিয়ে মালিশ করল, চুল বেঁধে বিনুনি ঝুলিয়ে দিল সাপের ফণার মত। আরামে কেইশার শরীরে ঝিম ধরল।

    তারপর কেইশাকে বিছানায় শুইয়ে গন্ধতেল মাখাল সারা শরীরে। বড় ভাল মেয়েটা। চেহারাতেও টানটান, জুতসই। এক বছর তো সবে বিয়ে হয়েছে, টসটসে শরীর। বাচ্চা বিয়োতে কষ্ট হবার কথা নয় – মনে হল মেলেনির। এই ক’দিন আগে অবধি কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে মাঠে কাজ করেছে। গায়েগতরে জোর আছে মেয়ের, রূপও আছে। ভারী হয়ে থাকা গাঢ় বাদামী স্তনে তেল ডলে দিল মেলেনি, হালকা হাতে উঁচু হয়ে থাকা পেটে তেল ছড়াতে ছড়াতে ভাবল, নাভি যেমন নিচের দিকে চেয়ে আছে, ছেলেই হবে ইনোসেন্টের। তার অভ্যস্ত হাত তেল মাখিয়ে দিল নাভিতে, দুই ঊরুতে, জঙ্ঘায়। কেইশার কাতরানি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছিল। মেয়ের রূপ দেখতে দেখতে ভাবল মেলেনি, সাধে এত তাড়াতাড়ি পেটে বাচ্চা এসেছে তোর? এমন মেয়ের দিকে কোনো পুরুষ শুধু চেয়ে থেকে শান্ত থাকে বুঝি? ভেবেই ফিক করে হেসে ফেলল মেলেনি। হাসিটা ছড়িয়ে পড়ল কেইশার মুখেও, আশ্বাস নিল যেন মেলেনির কাছ থেকে। তার উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে এসেছিল অনেক, চোখ থেকে ভয় সরে যাচ্ছিল।

    এরপর গরম জলে স্নান করাল কেইশাকে। সেই জলে ছড়িয়ে দিল ফুলের পাপড়ি, বৃষ্টিধারার মত কেইশার শরীরে ছড়িয়ে দিল সুগন্ধি জল। তেলসিক্ত ত্বকে জলবিন্দু শিশিরের মত জেগে রইল শরীরি উপত্যকায়। ফুলের পাপড়ি লেপ্টে রইল স্তনবৃন্তে, জঙ্ঘায়, গর্ভমূলে। এইভাবে প্রত্যাশী মা সুগন্ধি হল। সুখে তার চোখ নিমীলিত এখন, যেন ঘুমিয়ে পড়বে এখুনি।

    ইনোসেন্ট গরম জল এনে দিয়েছিল এতক্ষণে। জলের মধ্যে মেলেনি ছড়িয়ে দিল মরিচা, পুদিনাপাতা, মৌরি আর তুলসী। কেইশাকে ধীরে ধীরে বিছানায় বসিয়ে বড় পাত্রে করে খাইয়ে দিল ঢকঢক করে। কেইশার ঘুমে বুঁজে আসা চোখ আবার সতেজ হল, কালো মার্বেলের মত চকচক করছিল এখন। পুরু ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্না বিকশিত হল। তার সুদৃঢ় স্তনযুগল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে উঠল সন্তানের বাসনায়।
    মেলেনি ওর আঙুলে আঙুল জড়িয়ে দাঁড় করিয়ে দিল মেঝেতে। তারপর ঘর জুড়ে হাঁটতে থাকল দু’জনে, মেলেনি গলা মেলাল কেইশার সঙ্গে। সেই গানে সুর আছে, কথা নেই কোনো। এই সুরে দুঃখও নেই, আনন্দও নেই। আছে প্রতীক্ষা। প্রত্যাশা। প্রস্তুতি।

    মেলেনি যখন দরজা খুলে বাইরে এল, সকালের আলো গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে উঠোনে ছেয়ে গেছে। উঠোনভর্তি লোক এখন। কালো কালো মাথায় ছেয়ে গেছে। মেলেনির কোলে কাপড়ে জড়ানো সন্তান। ইনোসেন্টের ছেলে।
    উঠোনে একটা গুঞ্জন উঠল। ছড়িয়ে পড়ল হাসি, টলটল করে উঠল উচ্ছসিত চোখেরা। সুর বেজে উঠল মাউন্ট বাউয়ের নতুন সন্তানের আগমনে।
    Bless the Lord oh my soul
    Oh my soul
    Worship His Holy name
    Sing like never before
    Oh my soul
    I’ll worship Your Holy name
    গানে গানে গমগম করে উঠল নতুন সকাল। উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছিল আকাশে-বাতাসে। মেয়েরা উঁকি দিয়ে এল কেইশার ঘরে। বুড়োরা উঠোনের কোনায় বসে পাতায় তামাক জড়িয়ে ধূম্রজাল বানাল। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা চত্বর জুড়ে ছোটাছুটি করে হুল্লোড় বাঁধাল। পুরুষেরা ইনোসেন্টের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবাদে যাওয়ার পথে পা বাড়াবে কি বাড়াবে না, এলেন ইশাইয়া। সঙ্গে জশুয়ার হাতের পাত্রে উপঢৌকন। মাউন্ট বাউতে নতুন জীবনকে স্বাগত জানাতে এসেছেন শহরের প্রথম দম্পতি। লম্বা, শক্ত কাঠামোর ইশাইয়া জীবনে অনেক ঝড় জল সয়েছেন, তবে গিয়ে ছোটবেলার ক্রীতদাস আজ এই শহর গড়েছেন। মাথার চুল আর ঘন নেই, মুখের দাড়িতে পাক ধরেছে। ধারালো নাক আর ছুরির ফলার মত ঝকঝক করা চোখ তাকে আলাদা করে দেয় সবার থেকে। উঠোন ঢুকতে ঢুকতে ইশাইয়ার ঈষৎ ঝুঁকে পড়া কাঠামো শিরদাঁড়া টানটান করে দৈর্ঘ্যে বেড়ে গেল আরও।

    চারদিকে আবার একটা কলরোল উঠল।
    মাউন্ট বাউ ইশাইয়া মন্টোগোমারির ধ্যান জ্ঞান। এই শহরের নিরাপত্তা আর স্বাতন্ত্রের দিকে তাকিয়ে দিনে দিনে সাদাদের আনা অনেক আইন উনি মেনে নিয়েছেন। তার জন্য বদনাম কুড়িয়েছেন যথেষ্ট। এই তো সেদিন ফ্রেডেরিক ডগলাস তাকে কালোদের ভবিষ্যতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার দায়ে দুষেছেন। সেটা আজ বলে শুধু নয়, সেই নব্বই সালে মিসিসিপি কন্সটিটিউশনাল কনভেনশনে, যেদিন কালোদের ভোটের অধিকার সীমিত করার বিলে হ্যাঁ বলেছিলেন, সেই থেকে এমনি কথা শুনে আসছেন। সেই সভায় তিনি একাই তো কালো ছিলেন, সবার হয়ে বলার জন্য। কিন্তু কী করতে পারতেন মন্টোগোমারি? জন্মেছিলেন দাস হয়ে, এই যে তিলে তিলে কালোদের জন্য একটা নিজের জায়গা গড়ে তুলছেন, সেটা যে নিমেষে নেই হয়ে যেতে পারে – সেটা জানতেন যে। এই লোকগুলোকে এই শহরে ডেকে এনেছেন। তাদের বলেছেন, সারা জীবন তো সাদা মালিকের জন্য জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদ বসিয়েছ। এই তোমাদের সুযোগ – নিজের জন্য জমি পাওয়ার, আবাদ বানানোর। পারবে না সেই শ্রম দিতে? তারা কথা শুনেছে, এই যে দশ বছরে এখন এই শহরে চার হাজার লোক হয়েছে, নিজেদের দোকান করেছে, তুলোর চাষ হচ্ছে, সব তো নিজেদের। ইশাইয়ার বোন স্কুল খুলেছে, কালোদের এত বড় চার্চ এখানে, টাকা ধার দেওয়ার জন্য ব্যাঙ্ক হয়েছে নতুন। এখন নিউ অরলিন্সের কটন এক্সচেঞ্জে নিজেদের তুলো দরদাম করে বিক্রি করছে মাউন্ট বাউয়ের কালো চাষীরা। হত এসব কিছু, যদি সেদিন ইশাইয়া সাদাদের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ না মিলাতেন? লম্বা লড়াইতে এগিয়ে পিছিয়ে যুদ্ধ করতে হয়, জীবন এটাই শিখিয়েছে তাকে। তবু মাঝে মাঝে ক্লান্ত লাগে, বিভ্রান্তও। কোথাও কিছু কি ভুল হচ্ছে? এতগুলো লোক তার দিকে তাকিয়ে আছে যে। শুধু এখানে নয়, এই শহরের সাফল্য দেখে আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে সাদাদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে আরও কিছু শহর গড়ে উঠছে এমনি। তার ব্যর্থ হবার অবকাশ নেই।

    এখন এই সকালে ইশাইয়া চোখ থেকে সব ক্লান্তি সরিয়ে ফেললেন। চোখে আনলেন আশার উজ্জ্বল আলো। জশুয়ার বয়ে আনা উপঢৌকন দিয়ে বরণ করলেন নতুন আসা প্রাণ। নামকরণ করলেন ছেলের। ফেথফুল ইনোসেন্ট গুডম্যান।
    মেলেনির নাতি। সে জানে, তাকে এবার এখানেই থেকে যেতে হবে। তার নাতি ফেথফুল এই মাউন্ট বাউয়ের স্বাধীন বাতাসে বড় হবে। তার দিকে কোনো সাদা লোক ঘেন্নার চোখে তাকাবার সুযোগ পাবে না। সে পূর্বপুরুষের দাস হওয়ার গ্লানি রোজকার জীবনে জড়িয়ে বড় হবে না। তার ছোটবেলার স্মৃতিতে থাকবে – কোনো ভয় ছাড়া ঘুরে বেড়ানোর সকাল, তার কৈশোর প্রাণবন্ত হবে মাউন্ট বাউয়ের মুক্ত বাতাসে। সে ছোটবেলা থেকেই মেরুদণ্ড সোজা রেখে হাঁটা শিখবে, ইশাইয়ার মত।

    মেলেনি গুডম্যান পরিবারের ভবিষ্যৎ এখানে ছেড়ে কখনোই আর ফিরে যেতে পারবে না নিউ অরলিন্সের বাড়িতে।

  • | রেটিং ৪.৫ (২ জন) | বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ২৪১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে প্রতিক্রিয়া দিন